📄 ১৭. হিদায়াত দানকারী একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা
আল্লাহ তা‘আলার বাণী,
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ
“তুমি যাকে পছন্দ করো, তাকে হিদায়াত করতে পারবে না।
ছহীহ বুখারীতে ইবনুল মুসাইয়্যিব (রহঃ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
«لَمَّا حَضَرَتْ أَبَا طَالِبٍ الْوَفَاةُ، جَاءَهُ رَسُولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - وَعِنْدَهُ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَبِي أُمَيَّةَ وَأَبُو جَهْلٍ، فَقَالَ لَهُ: يَا عَمِّ، قُلْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، كَلِمَةً أُحَاجُّ لَكَ بِهَا عِنْدَ اللَّهِ»، فَقَالَا لَهُ: أَتَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ؟ فَأَعَادَ عَلَيْهِ النَّبِيُّ؟ ، فَأَعَادَا، فَكَانَ آخِرَ مَا قَالَ: هُوَ عَلَى مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ، وَأَبَى أَنْ يَقُولَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، فَقَالَ النَّبِيُّ؟ : «لَأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ، مَا لَمْ أُنْهَ عَنْكَ»، فَأَنْزَلَ اللَّهُ - عز وجل -: {مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ} الْآيَةَ، وَأَنْزَلَ اللَّهُ فِي أَبِي طَالِبٍ: {إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ}
“যখন আবু তালিবের মৃত্যু উপস্থিত হল তখন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে আসলেন। আব্দুল্লাহ বিন আবি উমাইয়্যাহ এবং আবু জাহেল আবু তালিবের পাশেই উপস্থিত ছিল। রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, ‘চাচা, আপনি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলুন। এটি এমন একটি কালিমা, আপনি যদি তা পাঠ করেন, তাহলে এর দ্বারা আমি আল্লাহর কাছে আপনার জন্য বিতর্ক করবো, তখন তারা দু’জন তাকে বলল: তুমি আব্দুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করবে? নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কালিমা পড়ার কথা আরেকবার বললেন। তারা দু’জনও আবু তালিবের উদ্দেশে পূর্বোক্ত কথা আরেকবার বলল। আবু তালিবের সর্বশেষ অবস্থা ছিল, সে আব্দুল মুত্তালিবের ধর্মের উপরই অটল ছিল এবং ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলতে অস্বীকার করেছিল। তখন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আপনার ব্যাপারে যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে নিষেধ না করা হবে ততক্ষণ আমি আপনার জন্য মাগফিরাত কামনা করতে থাকবো। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াত নাযিল করেন:
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ
“মুশরিকদের জন্য মাগফিরাত কামনা করা নাবী এবং মু’মিনদের জন্য শোভনীয় নয়।” (সূরা আত তাওবা: ১১৩) আল্লাহ তা‘আলা আবু তালিবের ব্যাপারে এই আয়াত নাযিল করেন,
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ
“তুমি যাকে পছন্দ করো, তাকে হিদায়াত করতে পারবে না। কিন্তু আল্লাহ যাকে চান তাকে হিদায়াত করেন।” (সূরা আল-কাসাস: ৫৬)
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয় গুলো জানা যায়:
১) أنك لا تهدى من أحببت “তুমি যাকে পছন্দ করো, তাকে হিদায়াত করতে পারবে না”। এ আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) সূরা তাওবার ১১৩ নং আয়াত অর্থাৎ
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَىٰ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّnَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ
“নাবী ও মু’মিনদের উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য মাগফেরাত কামনা করবে, যদিও তারা নিকটাত্মীয় হয়, এ কথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামী”-এর তাফসীরও জানা গেল।
৩) একটি বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা জানা গেল। আর সেটি হচ্ছে, قل لا إلـه إلا الله “আপনি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলুন” রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর কথার ব্যাখ্যা। এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা এক শ্রেণীর তথা কথিত জ্ঞানের দাবিদারদের বিপরীত। তারা দাবি করে থাকে যে, অর্থ না বুঝেই এবং ইখলাস ব্যতীত শুধু যবান দিয়ে এটি পাঠ করলেই নাজাত পাওয়া যাবে। তাদের দাবি সম্পূর্ণ অবাস্তব।
৪) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুপথ যাত্রী আবু তালিবের ঘরে প্রবেশ করে যখন বললেন, চাচা, আপনি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলুন, এ কথার দ্বারা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর কি উদ্দেশ্য ছিল তা আবু জাহেল এবং তার সঙ্গীরা ভাল করেই বুঝতে পেরেছিল। আল্লাহ তা‘আলা ঐ ব্যক্তির অমঙ্গল করুন! যে ইসলামের মূলনীতি কালেমা তায়্যেবার অর্থ সম্পর্কে আবু জাহেলের চেয়েও অধিক অজ্ঞ।
৫) আপন চাচার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তীব্র আকাঙ্খা ও প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন।
৬) যারা আব্দুল মুত্তালিব এবং তার পূর্বসূরীদেরকে মুসলিম হওয়ার দাবি করে, এখানে তাদের দাবি খন্ডন করা হয়েছে।
৭) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় চাচা আবু তালিবের জন্য মাগফিরাত চাইলেও তার গুনাহ মাফ হয়নি, বরং তার মাগফিরাত চাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
৮) মানুষের উপর খারাপ বন্ধুদের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে থাকে।
৯) পূর্বপুরুষ এবং সৎ লোকদের প্রতি মাত্রতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শনের কারণেই মানুষ গোমরাহ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১০) আবু জাহেল কর্তৃক পূর্ব পুরুষদের প্রতি অন্ধ ভক্তির যুক্তি প্রদর্শনের কারণে বাতিল পন্থীদের অন্তরে সংশয়ের সৃষ্টি হয়।
১১) সর্বশেষ আমলের শুভাशुभ পরিণতির প্রত্যক্ষ প্রমাণ। কেননা আবু তালিব যদি শেষ মুহূর্তেও কালিমা পড়ত তাহলে তার বিরাট উপকার হত।
১২) এ বিষয়টিতে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত যে, গোমরাহীতে নিমজ্জিত লোকদের অন্তরে বাপ-দাদাদের رسم-রেওয়াজের প্রতি চরম ভক্তি ও ভালবাসা রয়েছে। কেননা আবু তালিবের ঘটনায় যা বর্ণিত হয়েছে, তা হলো রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ঈমান আনার কথা বারবার বলার পরও কাফির মুশরিকরা তাদের পূর্ব পুরুষদের মিল্লাতের অনুসরণকেই যুক্তি হিসাবে পেশ করেছে। তাদের অন্তরে বাপ-দাদাদের ধর্মের প্রতি সম্মান থাকার কারণে এবং সেটি তাদের নিকট সুস্পষ্ট হওয়ার কারণেই তারা মাত্র একটি দলীলকে যথেষ্ট বলে মনে করেছে।
টিকাঃ
৭২. এখানে বুঝানো হয়েছে, কেউ কাউকে সুপারিশ এর মাধ্যমে উপকার করতে সক্ষম নয় এবং আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তিদানের ক্ষমতা রাখে না। তেমনি কেউ কাউকে হিদায়াত দানেরও ক্ষমতা রাখে না, যতক্ষণ না আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি হয়। রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে হিদায়াতের মালিক নন বলে ঘোষণা করা হয়েছে, তা হচ্ছে হিদায়াতের তাওফীক দেয়া। আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কেউ এ প্রকার হিদায়াতের মালিক নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَن تُؤْمِنَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ
“আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউই ঈমান আনতে পারে না”। (সূরা ইউনুস: ১০০)
নূহ (আঃ) তার পুত্রকে হিদায়াত করতে পারেননি, স্ত্রীকেও সৎ পথে আনতে পারেননি। ইবরাহীম খলীল (আঃ) তার পিতাকে দীনের পথে আনয়ন করার চেষ্টা করেও সফল হননি। লূত (আঃ) এর ক্ষেত্রেও একই কথা। তার স্ত্রীকে সৎপথে আনতে পারেননি। আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম ও ইসহাক (আঃ) এর ব্যাপারে বলেন,
وَبَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَىٰ إِسْحَاقَ ۚ وَمِن ذُرِّيَّتِهِمَا مُحْسِنٌ وَظَالِمٌ لِّنَفْسِهِ مُبِينٌ
“তাকে (ইবরাহীমকে) এবং ইসহাককে আমি বরকত দান করেছি। তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক সৎকর্মী এবং কতক নিজেদের উপর স্পষ্ট যুলুমকারী। (সূরা সাফফাত: ১১৩)
আর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে প্রকার হিদায়াত করতে সক্ষম বলে কুরআন সাক্ষ্য দিয়েছে, তা হচ্ছে হিদায়াতের পথ দেখানো। তিনি এবং সকল নাবী-রাসূলই মানুষকে হিদায়াতের পথ দেখিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা সূরা শূরার ৫২ নং আয়াতে বলেন,
وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
“নিশ্চয় আপনি সরল পথপ্রদর্শন করেন”।
৭৩. এখানে সম্মানিত লেখক ঐ সমস্ত অজ্ঞ মুসলিমদেরকে বুঝিয়েছেন, যারা নিজেদেরকে মুসলিম বলে দাবি করে, কিন্তু ইসলামের মূল বাণী তথা কালিমা তায়্যেবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর অর্থ বুঝে না। অর্থ না বুঝার কারণে তারা এর মর্মার্থের বিপরীত কর্মকাণ্ডে যেমন পীর, কবর ও মাযার পূজায় লিপ্ত হয়।
📄 ১৮. সৎ লোকদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করাই বনী আদমের কুফরীতে লিপ্ত হওয়ার এবং তাদের সঠিক দ্বীন বর্জন করার কারণ
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ
“হে আহলে কিতাব, তোমরা তোমাদের দীনের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করো না”। (সূরা আন নিসা: ১৭১)
ছহীহ বুখারীতে ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا
“কাফিররা বলল: ‘তোমরা নিজেদের মা‘বূদগুলোকে পরিত্যাগ করো না। বিশেষ করে ‘ওয়াদ’, ‘সুআ’, ‘ইয়াগূছ’ ‘ইয়াঊক’ এবং ‘নসর’কে কখনো পরিত্যাগ করো না। (সূরা নূহ: ২৩) -এর ব্যাখ্যায় বলেন, এগুলো হচ্ছে নূহ আ. -এর গোত্রের কতিপয় সৎ ব্যক্তির নাম। তারা যখন মৃত্যুবরণ করল, তখন শয়তান তাদের কওমকে বুঝিয়ে বলল, যেসব জায়গায় তাদের মজলিস বসত সেসব জায়গাতে তাদের মূর্তি স্থাপন করো এবং তাদের সম্মানার্থে তাদের নামেই মূর্তিগুলোর নামকরণ করো। তখন তারা তাই করল। তাদের জীবদ্দশায় মূর্তিগুলোর পূজা করা হয়নি ঠিকই; কিন্তু মূর্তি স্থাপনকারীরা যখন মৃত্যুবরণ করল এবং পরবর্তীতে আগমনকারী লোকেরা মূর্তি স্থাপনের ইতিহাস ভুলে গেল, তখনই মূর্তিগুলোর ইবাদত শুরু হল।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন, একাধিক আলেম বলেছেন, ‘যখন সৎ ব্যক্তিগণ মৃত্যুবরণ করলেন, তখন তাদের গোত্রের লোকেরা তাদের কবরের উপর অবস্থান করা শুরু করল। এরপর তারা তাদের প্রতিকৃতি তৈরী করল। এভাবে বহুদিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর তারা তাদের ইবাদতে লেগে গেল।
উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
«لَا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، إِنَّمَا أَنَا عَبْدٌ، فَقُولُوا: عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ»
“তোমরা আমার মাত্রতিরিক্ত প্রশংসা করো না। যেমন প্রশংসা করেছিল খ্রীস্টানরা মারইয়াম তনয় ঈসা আ. এর। আমি আল্লাহ তা‘আলার বান্দা মাত্র। তাই তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা এবং তাঁরই রাসূল বলবে”।
রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো ইরশাদ করেছেন,
«إِيَّاكُمْ وَالْغُلُوَّ، فَإِنَّمَا أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ الْغُلُوُّ»
“তোমরা দীনের ব্যাপারে غلو) লূ) তথা বাড়াবাড়ি ও সীমা অতিক্রম করা থেকে সাবধান থাকো। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো দীনের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করার ফলেই ধ্বংস হয়েছে”।
ছহীহ মুসলিমে (হা/২৬৭০) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত এক হাদীছে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
هَلَكَ الْمُتَنَطِّعُونَ ثَلَاثًا
“দীনের ব্যাপারে সীমা লংঘনকারীরা ধ্বংস হয়েছে।” এ কথা তিনি তিনবার বলেছেন।
উদাহরণসহ নিম্নে আলোচনা করা হলো :
১. আক্বীদার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা বলতে যা বুঝায় : কালামপন্থীরা (ধর্মতাত্ত্বিক) আল্লাহর গুণাবলী প্রমাণ করতে বড় বড় কথা বলে। আল্লাহর গুণাবলী প্রমাণ করতে তারা বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং গভীর চিন্তা-ভাবনা করে। এভাবে তারা নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হয়। অবশেষে তাদের এ গভীর চিন্তা-চেতনা তাদেরকে দু’টি বিষয়ের কোন একটির দিকে পৌঁছিয়ে দেয়, তা হচ্ছে:
১. التمثيل) সাদৃশ্য স্থাপন করা)
২. التعطيل সিফাত-গুণহীন মনে করা। কেননা তারা আল্লাহর সৃষ্টির সাথে তার সাদৃশ্য স্থাপন করে বলে, এটাই হচ্ছে আল্লাহর সিফাত-গুণাবলী প্রমাণ করার অর্থ। এভাবে তারা আল্লাহর সিফাত প্রমাণ করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করে এমনকি আল্লাহ নিজের জন্য যা কিছু প্রত্যাখ্যান করেছেন তারা তা সাব্যস্ত করে। অথবা তারা আল্লাহকে গুণহীন মনে করে বলে যে, এটাই হলো সৃষ্টির সাদৃশ্য হওয়া থেকে তাকে পবিত্র মনে করার অর্থ।
তারা ধারণা করে যে, আল্লাহর সিফাত-গুণ সাব্যস্ত করলে তার সাথে (সৃষ্টির) সাদৃশ্য স্থাপন করা হয়। তাই আল্লাহ যেসব গুণাবলী নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন তারা তা প্রত্যাখ্যান করে।
তবে মধ্যমপন্থী উম্মত এ ব্যাপারে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। আল্লাহর গুণাবলী সাব্যস্তকরণ, তা প্রত্যাখ্যান করা এবং তাকে পবিত্র মনে করার ব্যাপারে তারা গভীর চিন্তা-ভাবনায় মগ্ন থাকে না। বরং শব্দগত বাহ্যিক অর্থই তারা গ্রহণ করে বলে এসব ব্যাপারে অতিরিক্ত কোন কিছু চিন্তা করা আমাদের জন্য শোভনীয় নয়। ফলে তারা পথভ্রষ্ট হয় না। বরং তারা সঠিক পথে অবিচল থাকে।
পারসিক ও রোমক এবং অন্যান্যরা দ্বীন ইসলামে প্রবেশ করে এসব বিষয়ে গভীর চিন্তা ভাবনা, তর্ক-বিতর্ক এবং প্রতিযোগিতা করতে শুরু করে যা শেষ হচ্ছে না। অবশেষে তারা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। আমরা আল্লাহর নিকট এ থেকে নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি। উম্মতের পরবর্তীগণ (نص (নছ-মূল বিধানের উপর ভিত্তি করে এমন সববিষয় উদ্ভাবন করেছে, যা ছাহাবীগণ উদ্ভাবন করেননি। অথচ তারা ছিলেন মধ্যমপন্থী উম্মত।
২. ইবাদতের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করার অর্থ : ইবাদতের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা বলতে কঠোরতা আরোপ করা।
যেমন ইবাদতের কোন অংশ ছুটে যাওয়াকে কুফরী ও ইসলাম থেকে বহিষ্কার মনে করা। এরূপ খারেযী ও মু‘তাযিলা সম্প্রদায় বাড়াবাড়ি করত: বলে, যে ব্যক্তি কাবীরাহ গুনাহ হতে কোন একটি গুনাহ করে, সে ইসলাম হতে বের হয়ে যায়, তাকে হত্যা করা ও তার সম্পদ হরণ বৈধ। আর নেতার বিরোধীতা করা ও রক্তপাত ঘটানোকেও তারা বৈধ মনে করে।
এরূপই মু‘তাযিলা সম্প্রদায় বলে, যে ব্যক্তি কাবীরাহ গুনাহ করে সে ঈমান ও কুফরী উভয়ের মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকে। আর এটাই কঠোরতা যা মানুষকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে।
অপরদিকে এরূপ কঠোরতাকে মুরজিয়ারা সহজভাবে গ্রহণ করে বলে, মানুষ হত্যা, যিনা ব্যভিচার, চুরি, মদ্যপান এ জাতীয় কাবীরাহ গুনাহ মানুষকে ঈমানহীন করে না। এসবের দ্বারা ঈমানের কোন অংশের কমতিও হয় না। ঈমানের জন্য কেবল স্বীকৃতিই যথেষ্ট। আর কাবীরাহ গুনাহকারীর ঈমান জিবরাঈল আলাইহিস সালাম ও রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মতই। কেননা, ঈমানগত বিষয়ে মানুষের মাঝে কোন তারতম্য নেই (সকলের ঈমান সমান)। এমনকি তারা বলে, ইবলীসও মু’মিন কারণ সে আল্লাহকে স্বীকার করে। যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ তা‘আলা তাকে (ইবলীসকে) কাফের আখ্যা দিয়েছেন? তখন জবাবে তারা বলে, তার স্বীকারোক্তি সত্য নয় বরং সে মিথ্যাবাদী। আজকাল ঐসব (মুরজিয়ারা) বাস্তবে অনেক মানুষকে সংশোধন করতে চায়। আর এসব ব্যাপারে সহজ করাকে উৎকৃষ্ট মনে করে।
অপরদিকে প্রথম দল (খারেযী ও মু‘তাযিলা সম্প্রদায়) এসব ব্যাপারে কঠোরতা আরোপ করাকেই উৎকৃষ্ট মনে করে।
আর আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মত হচ্ছে ঈমান বৃদ্ধি পায় ও কমে। পাপাচারীর ঈমান তার পাপ অনুযায়ী কমে। ঈমান থেকে সে বহিষ্কার হবে না। যতক্ষণ না কুফরীর ব্যাপারে স্পষ্ট দলীল প্রমাণ না পাওয়া যায়।
৩. المعاملات) লেনদেনের) ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করার অর্থ:
কোন বিষয়ের সবকিছু হারাম মনে করে কঠোরতা আরোপ করা এমনকি যদিও তা কোন কিছুর माध्यम হয়ে থাকে। মানুষের জাগতিক জীবনে আবশ্যকীয় প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন কিছু করা জায়েয নয়।
যারা সূফীবাদী তারাই এ পন্থা গ্রহণ করেছে। যেমন তারা বলে, যে ব্যক্তি দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকে সে পরকাল কামনা করে না। আরো বলে, তোমার জরুরী প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন কিছু ক্রয় করা জায়েয নয়। এধরনের আরো অনেক কথা তারা বলে।
এ কঠোরতা অবলম্বনকারীর বিপরীতে শিথিলপন্থীরা বলে, সকল কিছু হালাল হওয়ার কারণে সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক দিক শক্তিশালী হয়। এমনকি সূদ খাওয়া ও প্রতারণা করাকেও তারা বৈধ মনে করে। নাউযুবিল্লাহ। তারাই শিথিলতাকে উৎকৃষ্ট মনে করে ব্যবসায়ী পণ্যের দাম ও গুণাগুণ বর্ণনার ক্ষেত্রে এসব লোককে মিথ্যা বলতে দেখা যায়। সব ক্ষেত্রেই (দুনিয়াবী স্বার্থে) দু’এক টাকা উপার্জনের জন্য তারা মিথ্যা কথা বলে থাকে। নিঃসন্দেহে এটাই হচ্ছে শিথিলতাকে উৎকৃষ্ট মনে করা।
আর এক্ষেত্রে মধ্যপন্থা হচ্ছে দলীল-প্রমাণ ও যুক্তি সাপেক্ষে সবধরনের লেনদেন ক্রয়-বিক্রয় বৈধ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আল্লাহ তা‘আলা ব্যবসাকে বৈধ করেছেন এবং সূদকে হারাম করেছেন। (সূরা আল-বাক্বারা ২:২৭৫)।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়
১) যে ব্যক্তি এ অধ্যায়সহ পরবর্তী দু’টি অধ্যায় বুঝতে সক্ষম হবে, ইসলামের সঠিক শিক্ষা সম্পর্কে মানুষ কতটুকু অজ্ঞ, তার কাছে তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। সে সাথে আল্লাহ তা‘আলার কুদরত এবং মানুষের অন্তর পরিবর্তন হওয়ার ক্ষেত্রে এমন আশ্চর্যজনক বস্তু দেখতে পাবে, যা মানুষের বিবেককে হার মানায়।
২) এ কথা জানা গেল যে, সৎ ব্যক্তিদেরকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কারণেই পৃথিবীতে সর্বপ্রথম শিরকের উৎপত্তি হয়েছে।
৩) যে বিষয়ের মাধ্যমে নাবীগণের দ্বীনে সর্বপ্রথম পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল, তাও জানা গেল। এর কারণ সম্পর্কে জ্ঞান লাভের সাথে সাথে এ কথাও জেনে নেয়া যে, আল্লাহ তা‘আলাই নাবীদেরকে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য পাঠিয়েছেন।
৪) ‘শরী‘আতে ইলাহী’ এবং অপরিবর্তিত স্বভাব’ ‘বিদ‘আতকে’ প্রত্যাখ্যান করা সত্ত্বেও লোকদের মধ্যে বিদ‘আতকেই কবুল করে নেয়ার প্রবণতা রয়েছে।
৫) উপরোক্ত সকল গোমরাহীর কারণ হচ্ছে, হকের সাথে বাতিলের সংমিশ্রণ। সৎ লোকদেরকে মাত্রতিরিক্ত ভালবাসার মাধ্যমেই এর সূচনা হয়। অতঃপর কতিপয় আহলে ইলম তথা জ্ঞানী ও দীনদার ব্যক্তি সৎ নিয়্যাতে কিছু কাজ করেন। পরবর্তীতে লোকেরা মনে করে উক্ত কাজে আলেম ও সৎ লোকদের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। অর্থাৎ প্রথমে সৎ লোকদের মূর্তি ও ছবি এ নিয়্যাতে বানানো হয় যে, তাদের ছবি দেখলে আল্লাহর ইবাদতে আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু পরবর্তীতে আগমনকারী লোকেরা মনে করে তাদের পূর্ব পুরুষগণ এ মূর্তিগুলোর উসীলা দিয়ে আল্লাহর ইবাদত করত অথবা মনে করত এরাই মা‘বূদ কিংবা আল্লাহর শরীক কিংবা আল্লাহর দরবারে সুপারিশকারী। সুতরাং এরা মানুষের ইবাদত পাওয়ার হকদার।
৬) সূরা নূহের ২৩ নং আয়াতের তাফসীর।
৭) মানুষের প্রকৃত অবস্থা এই যে, তাদের অন্তর হকের প্রতি খুব কমই আগ্রহী থাকে এবং তারা দিন দিন হক থেকে পিছিয়ে যায়। সে তুলনায় বাতিলের প্রতি তাদের অন্তর ক্রমান্বয়ে বেশী অগ্রসর হয়।
৮) এ অধ্যায়ে সালফে ছলেহীন থেকে বর্ণিত উক্তির দলীল পাওয়া যায়। তা হচ্ছে বিদ‘আত কুফরীর কারণ।
৯) বিদ‘আতের পরিণতি কত ভয়াবহ, -শয়তান ভাল করেই তা জানে। যদিও বিদ‘আতকারীর নিয়্যাত ভাল হয়। এ জন্যই শয়তান আমলকারীকে বিদ‘আতের দিকে নিয়ে যায়
১০) “দীনের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করা নিষেধ” এ সাধারণ নীতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা এবং সীমা লংঘনের পরিণতি সম্পর্কে ভালভাবে জ্ঞান লাভ করা জরুরী।
১১) সৎ কাজের নিয়্যাতে কবরের পাশে অবস্থান করার ক্ষতি সম্পর্কে অবগত হওয়া গেল।
১২) মূর্তি বানানো বা স্থাপনের নিষেধাজ্ঞা এবং তা অপসারণের হিকমত সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা।
১৩) শিরক কাকে বলে তা বুঝতে হলে নূহ আ. এর জাতির সৎ লোকদের ঘটনা জানা জরুরী। এ ঘটনা জানার অপরিসীম গুরুত্ব থাকার পরও লোকেরা এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ বে-खबर।
১৪) সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, বিদ‘আতীরা তাফসীর ও হাদীছের কিতাবগুলোতে ঐ ঘটনা পড়ছে এবং তার অর্থও ভালভাবে বুঝতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাদের অন্তরের উপর পর্দা ঢেলে দেয়ার কারণে তারা বিশ্বাস করে যে, নূহ আ. এর কওমের লোকদের কাজই ছিল শ্রেষ্ঠ ইবাদত। তারা আরো বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ ও তার রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিষেধ করেছিলেন সেটা ছিল, কেবল এমন কুফরী, যার ফলে জান-মাল বৈধ হয়ে যায়। অর্থাৎ তাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া যায়।
১৫) এটা সুস্পষ্ট যে, ‘নূহ’ আ. এর জাতির লোকেরা তাদের কাজ দ্বারা সুপারিশ ছাড়া আর কিছুই চায়নি।
১৬) তো ছাওয়াবের কাজ মনে করে করা হয়। তাই এতে পাপের অনুভূতি থাকে না। তাই তাওবারও প্রয়োজন অনুভূত হয় না।
১৭) তাদের ভুল ধারণা এটাই ছিল, যেসব পন্ডিত সৎ লোকদের ছবি বা মূর্তি তৈরী করেছিল, তারাও শাফা‘আত লাভের আশা পোষণ করত।
১৮) নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্পষ্ট ভাষায় দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। তার নিম্নোক্ত বাণীর মধ্যে এই কথার প্রমাণ মিলে। তিনি বলেছেন: “তোমরা আমার মাত্রতিরিক্ত প্রশংসা করো না যেমন খ্রীস্টানরা মারইয়াম তনয়ের মাত্রতিরিক্ত প্রশংসা করত।” সে নাবীর প্রতি আল্লাহর পক্ষ হতে দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক, যিনি সুস্পষ্ট করে সত্যের দাওয়াত মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছেন।
১৯) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপদেশ দিয়েছেন যে, দীনের ব্যাপারে সীমা লংঘনকারীদের ধ্বংস অনিবার্য।
২০) ‘নূহ’ (আঃ) -এর জাতির ঘটনার মধ্যে এ কথা সুস্পষ্ট যে, ইলমে দীন উঠে যাওয়ার পূর্বে এবং জ্ঞানীদের মৃত্যুবরণ করার পূর্বে সৎ লোকদের ছবি বা মূর্তিগুলোর পূজার সূচনা হয়নি। এর দ্বারা ইলমে দীন থাকার মর্যাদা আর না থাকার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জানা গেল।
২১) আরো জানা গেল যে, আলিমগণের মৃত্যুবরণের মাধ্যমেই ইলমে দীন উঠে যায়।
২২) কবরের পাশে আল্লাহর ইবাদত করার ব্যাপারে যেখানে কঠোর শাস্তির ঘোষণা রয়েছে, সেখানে ঐ সৎ লোকের উদ্দেশে ইবাদতকারীর ব্যাপারে কী বিধান আসতে পারে?
টিকাঃ
৭৪. কওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ: আল্লাহ তা‘আলা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন কেননা, বাড়াবাড়ির কারণে বিভিন্ন রকম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ:
১. যাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয়েছে তা প্রশংসনীয় হলে তার মর্যাদা উন্নত হবে। আর নিন্দনীয় হলে মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে।
২. যাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয়, তার ইবাদত করার প্রতি মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়, যা সীমালঙ্ঘনকারীদের মাধ্যমে ঘটে।
৩. এ বাড়াবাড়ি আল্লাহকে সম্মান প্রদর্শনে বাধা দান করে। কেননা, মানুষ হক-সত্য অথবা বাতিল-মিথ্যার সাথে নিয়োজিত হয়। তাই সৃষ্টির অতিশয় প্রশংসা ও সম্মান নিয়ে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হলে মানুষ এর সাথেই সম্পৃক্ত থাকে এবং আল্লাহ যা ওয়াজিব করেছেন তা ভুলে যায়।
৪. উপস্থিত ব্যক্তিকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হলে ঐ ব্যক্তি অহংবোধে মেতে উঠে এবং নিজেকে সম্মানিত মনে করে বিস্ময় প্রকাশ করে। আর প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করা হলে তা ব্যক্তির জন্য ক্ষতিকর। ফলে অতিশয় প্রশংসা ও অধিক নিন্দায় শত্রুতা, বিদ্বেষ, সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি অনিবার্য হয়।
৭৫. ছহীহ বুখারী হা/৪৯২০।
৭৬. ছহীহ বুখারী হা/৩৪৪৩।
৭৭. ছহীহ: ইবনে মাজাহ হা/৩০২৯।
৭৮. কওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ: এ হাদীছে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উম্মতকে সীমালঙ্ঘন করা হতে সাবধান করেছেন এবং তিনি প্রমাণ পেশ করেছেন যে, বাড়াবাড়ি করা ধ্বংসের কারণ। কেননা তা শরী‘আত বিরোধী ( مخالف (বিষয়। আর পূর্ববর্তী উম্মতগণ এ কারণেই ধ্বংস হয়েছে। সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা হতে জানা গেল বাড়াবাড়ি দু’টি কারণে হারাম :
প্রথম : (বাড়াবাড়ি সম্পর্কে) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সতর্কীকরণ। কোন বিষয়ে সতর্ক করা তা নিষিদ্ধ বুঝায়।
দ্বিতীয় : সীমালঙ্ঘন জাতির ধ্বংসের কারণ। যেমন পূর্ববর্তী উম্মতগণ এ কারণে ধ্বংস হয়েছে। আর যার কারণে মানুষ ধ্বংস হয় তা হারাম।
ইবাদত করার দিক থেকে মানুষের শ্রেণী বিভাগ:
ইবাদতের দিক থেকে মানুষ দু’শ্রেণীতে বিভক্ত। আরো একটি শ্রেণী হচ্ছে মধ্যমপন্থী।
(ক) তাদের মাঝে কতিপয় চরম সীমালঙ্ঘনকারী।
(খ) কতিপয় শিথিলপন্থী। এবং কতক রয়েছে মধ্যমপন্থী।
আর উভয়ের মাঝে মধ্যপন্থা হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন। যারা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে তারা এটা বাদ দিয়ে কোন দিকেই ধাবিত হয় না। তাই মধ্যম পন্থাই ওয়াজিব। সুতরাং দ্বীনের ব্যাপারে কঠোরতা, অতিরঞ্জন, শিথিলতা প্রদর্শন এবং মনোযোগী না হওয়া জায়েয নয়। বরং উভয় অবস্থায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে।
আর সীমালঙ্ঘনের রয়েছে বিভিন্ন প্রকার। তন্মধ্যে কয়েকটি হলো :
১. আক্বীদায় সীমালঙ্ঘন করা।
২. ইবাদতে সীমালঙ্ঘন করা।
৩. লেনদেনে সীমালঙ্ঘন করা।
৭৯. কওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ: পৃথিবীতে সংঘটিত প্রথম শিরকের পরিচয় ও সংগঠনের কারণ: তা হলো, নূহ আলাইহিস সালাম এর সম্প্রদায় যে সবমূর্তি পূজা করতো, তা ছিল নেককারলোকদের মূর্তি। তাদেরকে নিয়ে বাড়াবাড়ি সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের ইবাদত করতো। তাই সৎলোকদের নিয়ে বাড়াবাড়ির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়।
৮০. কওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ: সর্বপ্রথম যার মাধ্যমে নাবীগণের দ্বীনের পরিবর্তন ঘটে তা হচ্ছে শিরক। আর সৎলোকদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করাই ছিল এর মূল কারণ।
৮১. উপরোক্ত সকল গোমরাহীর কারণ হচ্ছে হকের সাথে বাতিলের সংমিশ্রণ, আর লেখক এখানে উল্লেখ করতে চান, যে, হকের সাথে বাতিলের সংমিশ্রণ হয়ে থাকে দু’টি কারণে :
প্রথম কারণ : নেকলোকদের প্রতি (মাত্রতিরিক্ত) ভালবাসা। এ জন্য নেক লোকদের প্রতি ভালবাসার নিদর্শন স্বরূপ মানুষ তাদের প্রতিমূর্তি তৈরী করে। আর বুযুর্গদের সাথে সাক্ষাৎ লাভ করতে উৎসাহী হয়।
দ্বিতীয় কারণ : কতিপয় জ্ঞানী ধার্মিক ঐ অতিরিক্ত ভালবাসার মাধ্যমে কল্যাণ লাভের ইচ্ছা করে। আর মানুষ ঐসব নেকলোকদের ইবাদতে আগ্রহী হয়। কিন্তু তাদের পর তারা মূলত অকল্যাণই করে এ আলোচনা হতে বুঝতে হবে যে, যারা দ্বীনকে বিদ‘আতের মাধ্যমে শক্তিশালী করতে চায়, তার উপকারের চেয়ে মারাত্মক ক্ষতি সাধন হয়। উদাহরণ স্বরূপ যারা রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করে, তার জন্মদিন পালন করত এর মাধ্যমে কল্যাণের ইচ্ছা করে। এ বিদ‘আতী কর্মের মাধ্যমে তারা কল্যাণ লাভের ইচ্ছা করলেও উপকারের চেয়ে মারাত্মক ক্ষতি সাধন হয়। কেননা, তা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শরী‘আতহীন কর্মে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। অতঃপর বছরের অবশিষ্ট দিন গুলোতে (বিদ‘আতীদের মাঝে) শরী‘আতহীন শৈথিল্যতা দেখা যায়। এজন্য যারা এসব বিদ‘আতী কর্মের মাধ্যমে সীমালঙ্ঘন করে, তারা স্পষ্ট শরী‘আত সম্মত কাজে শৈথিল্যতা প্রদর্শন করে থাকে। তারা অন্যদের (ধার্মিকদের) মত উদ্যমী নয়।
৮২. তা ছাড়া ইবলীস অন্যান্য পাপের চেয়ে বিদ‘আতকেই বেশী পছন্দ করে। কারণ পাপ থেকে তাওবা করা সহজ হলেও বিদ‘আত থেকে তাওবা করা সহজ নয়। কারণ বিদ‘আত তো ছাওয়াবের কাজ মনে করে করা হয়। তাই এতে পাপের অনুভূতি থাকে না। তাই তাওবারও প্রয়োজন অনুভূত হয় না।
৮৩. কবরকে আঁকড়ে ধরার ক্ষতি হচ্ছে, তা কবরপূজার দিকে ধাবিত করে। এ বিষয়ে একটি উদাহরণ হলো : কোন সৎলোকের কবরের নিকটে কুরআন তিলাওয়াত কিংবা দান-ছদাক্বাহ করে যদি কেউ এ বিশ্বাস পোষণ করে যে, এসবের কারণেই কারো মঙ্গল হয় তাহলে এটা বিদ‘আত বলে গণ্য হবে। যা কখনো কখনো বিদ‘আতীকে কবরপূজার দিকে আকৃষ্ট করে।
📄 ১৯. সৎ লোকের কবরের পাশে আল্লাহর ইবাদতকারীর ব্যাপারে যেখানে কঠোর শাস্তির ঘোষণা রয়েছে
ছহীহ বুখারীতে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, উম্মে সালামা (রাঃ) হাবাশায় যে গীর্জাটি দেখতে পেয়েছিলেন এবং তাতে তিনি যে সব প্রতিকৃতি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তা রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর কাছে উল্লেখ করলে তিনি বললেন,
«أُولَٰئِكَ قَوْمٌ إِذَا مَاتَ فِيهِمُ الْعَبْدُ الصَّالِحُ أَوِ الرَّجُلُ الصَّالِحُ بَنَوْا عَلَىٰ قَبْرِهِ مَسْجِدًا وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ، أُولَٰئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
“তারা এমন লোক, তাদের মধ্যে যখন কোন নেককার ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করত, তখন তারা তার কবরের উপর মাসজিদ তৈরী করত এবং মাসজিদে ঐগুলো স্থাপন করত। এরাই হচ্ছে ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক নিকৃষ্ট লোক। তারা দু’টি ফিতনাকে একত্র করেছে। একটি হচ্ছে কবর পূজার ফিতনা। অপরটি হচ্ছে প্রতিকৃতি পূজার ফিতনা।
ছহীহ বুখারী ও মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) থেকে আরো একটি হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, যখন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মৃত্যু ঘনিয়ে আসল, তখন তিনি নিজের মুখমন্ডলকে স্বীয় চাদর দিয়ে ঢেকে ফেলতেন। আবার অস্বস্তিবোধ করলে তা চেহারা থেকে সরিয়ে ফেলতেন। এমন অবস্থায়ই তিনি বললেন,
«لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْيَهُودِ وَالنَّصَارَىٰ اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ»، يُحَذِّرُ مَا صَنَعُوا، لَوْلَا ذَلِكَ أُبْرِزَ قَبْرُهُ، غَيْرَ أَنَّهُ خَشِيَ أَنْ يُتَّخَذَ مَسْجِدًا»
“ইয়াহূদী-খ্রীস্টানদের প্রতি আল্লাহর লা’নত। তারা তাদের নাবীদের কবরগুলোকে মাসজিদে পরিণত করেছে। ইয়াহূদী-খ্রীস্টানদের শিরকী কাজ থেকে মু’মিনদেরকে সতর্ক করাই ছিল এ কথার উদ্দেশ্য।
আয়েশা (রাঃ) বলেন: কবরকে ইবাদত খানায় পরিণত করার আশঙ্কা না থাকলে তার কবরকে উঁচু স্থানে ও উন্মুক্ত রাখা হত। কিন্তু তিনি আশঙ্কা করলেন যে, তার কবরকে মাসজিদে পরিণত করা হতে পারে”।
জুনদুব ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে তার ইন্তেকালের পূর্বে এ কথা বলতে শুনেছি,
«إِنِّي أَبْرَأُ إِلَى اللَّهِ أَنْ يَكُونَ لِي مِنْكُمْ خَلِيلٌ، فَإِنَّ اللَّهَ قَدِ اتَّخَذَنِي خَلِيلًا كَمَا اتَّخَذَ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا، وَلَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا مِنْ أُمَّتِي خَلِيلًا لَاتَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيلًا، أَلَا وَإِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا يَتَّخِذُونَ قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ، أَلَا فَلَا تَتَّخِذُوا الْقُبُورَ مَسَاجِدَ، فَإِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ»
“তোমাদের মধ্য থেকে কাউকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করা থেকে আমি আল্লাহর কাছে দায় মুক্তি ঘোষণা করছি। কেননা আল্লাহ তা‘আলা আমাকে খলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন। যেমনি তিনি ইবরাহীম (আঃ) কে খলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন। আর আমি যদি আমার উম্মত হতে কাউকে খলীল হিসাবে গ্রহণ করতাম, তাহলে অবশ্যই আবু বকরকে খলীল হিসাবে গ্রহণ করতাম। সাবধান, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো তাদের নাবীদের কবরকে মাসজিদে পরিণত করেছে। সাবধান, তোমরা কবরগুলোকে মাসজিদে পরিণত করো না। আমি তোমাদেরকে এ কাজ করতে নিষেধ করছি”।
রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জীবনের শেষ মুহূর্তেও কবরকে মাসজিদে পরিণত করতে নিষেধ করেছেন। আর এ কাজ যারা করেছে তাদেরকে তিনি লা’নত করেছেন। কবরের পাশে মাসজিদ নির্মিত না হলেও সেখানে যারা ছালাত পড়বে, তারা রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর লা’নত প্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে। কবরকে ইবাদত খানায় পরিণত করার আশঙ্কা না থাকলে তার কবরকে উন্মুক্ত রাখা হত, -আয়েশা (রাঃ) এ বাণী দ্বারা এ কথাই বুঝানো হয়েছে। ছাহাবায়ে কেরাম নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবরের পাশে মাসজিদ বানানোর মত লোক ছিলেন না। যে স্থানকে ছালাত পড়ার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা হয়েছে সে স্থানকেই মাসজিদ হিসাবে গণ্য করা হয়। বরং এমন প্রত্যেক স্থানকেই মাসজিদ বলা হয়, যেখানে ছালাত আদায় করা হয়। যেমন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
جُعِلَتْ لِيَ الْأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا
“পৃথিবীর সব স্থানকেই আমার জন্য মাসজিদ বানিয়ে দেয়া হয়েছে এবং পবিত্র করে দেয়া হয়েছে”।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে ‘মারফূ’ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
«إِنَّ مِنْ شِرَارِ النَّاسِ مَنْ تُدْرِكُهُمُ السَّاعَةُ وَهُمْ أَحْيَاءٌ، وَالَّذِينَ يَتَّخِذُونَ الْقُبُورَ مَسَاجِدَ»
“জীবন্ত অবস্থায় যাদের উপর দিয়ে ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে, আর যারা কবরকে মাসজিদে পরিণত করে, তারাই হচ্ছে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নে বর্ণিত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) যে ব্যক্তি কোনো সৎ লোকের কবরের পাশে আল্লাহর ইবাদত করার জন্য মাসজিদ বানায়, তার ব্যাপারে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কঠোর হুঁশিয়ারী রয়েছে। যদিও ইবাদতকারীর নিয়্যাত বিশুদ্ধ হয়।
২) মূর্তি বানানোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং এ ব্যাপারে কঠোর হুমকি এসেছে।
৩) কবরকে মাসজিদ বানানো থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করার মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। প্রথমে তিনি সুস্পষ্ট করে বিষয়টি বর্ণনা করেছেন। অতঃপর মৃত্যুর পাঁচদিন পূর্বে তিনি তা বারবার বলেছেন। অতঃপর যখন তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হল তখন তিনি পূর্বের বর্ণনাকে যথেষ্ট মনে করেননি। বরং অত্যন্ত কঠোর ভাষায় আবারও সতর্ক করেছেন।
৪) নিজ কবরের অস্তিত্ব লাভের পূর্বেই তার কবরের পাশে এসব কাজ অর্থাৎ কবর পূজা থেকে নিষেধ করেছেন।
৫) নাবীদের কবর পূজা করা বা কবরকে ইবাদতখানায় পরিণত করা ইয়াহূদী-খ্রীস্টানদের রীতি।
৬) এ জাতীয় কাজ যারা করে তাদের উপর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর অভিসম্পাত।
৭) নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর সতর্ক করার উদ্দেশ্য হচ্ছে তার কবরকে মাসজিদ বানানো থেকে আমাদেরকে সাবধান করে দেয়া।
৮) তার কবরকে উন্মুক্ত না রাখার কারণ এ হাদীছে সুস্পষ্ট।
৯) এই অধ্যায়ে কবরকে মাসজিদ বানানোর মর্মার্থ ব্যক্ত করা হয়েছে।
১০) যারা কবরকে মাসজিদে পরিণত করে এবং যাদের উপর ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে, -এ দু’ধরনের লোকের কথা একই সাথে উল্লেখ করেছেন। অতঃপর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিরক সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই এমন কিছু বিষয়ের বর্ণনা করেছেন, যা মানুষকে শিরকের দিকে নিয়ে যায়। সেই সাথে তিনি শিরকের শেষ পরিণামও বর্ণনা করেছেন।
১১) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ইন্তেকালের পাঁচ দিন পূর্বে স্বীয় খুতবায় কবরের উপর মাসজিদ বানাতে নিষেধ করেছেন। এখানে বিদ‘আতী লোকদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট দু’টি দলের প্রতিবাদ রয়েছে। কিছু সংখ্যক জ্ঞানী ব্যক্তি এ বিদ‘আতীদেরকে মুসলমানের ৭২ দলের বাইরে বলে মনে করেন। এসব বিদ‘আতী হচ্ছে রাফেযী ও জাহমীয়া। এই রাফেযী দলের কারণেই শিরক এবং কবর পূজা শুরু হয়েছে। সর্বপ্রথম কবরের উপর তারাই মাসজিদ নির্মাণ করেছে।
১২) এই অধ্যায়ে বর্ণিত হাদীছ থেকে জানা গেল যে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরও মৃত্যু যন্ত্রণা হয়েছিল।
১৩) নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে আল্লাহ তা‘আলা খলীল বানিয়ে সম্মানিত করেছেন।
১৪) খুল্লাতের স্তর মুহাব্বত ও ভালবাসার স্তরের চেয়েও অধিক ঊর্ধ্বে।
১৫) সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, ছাহাবীদের মধ্যে আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ।
১৬) এ হাদীছে আবুবকর (রাঃ) এর খিলাফতের প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে।
টিকাঃ
৮৬. ছহীহ: বুখারী হা/৪৩৫, মুসলিম হা/৫৩১ অধ্যায়: কবরের উপর মাসজিদ নির্মাণ করা নিষেধ।
৮৭. ছহীহ মুসলিম হা/৫৩২, অধ্যায়: কবরের উপর মাসজিদ নির্মাণ করা নিষেধ।
৮৮. ছহীহ বুখারী হা/৪৩৮, মুসলিম হা/৫৩১। অধ্যায়: পৃথিবীর সব স্থানকেই আমার জন্য মাসজিদ বানিয়ে দেয়া হয়েছে।
৮৯. হাসান: মুসনাদে আহমাদ ১/৪০৫। ইবনে খুযাইমা হা/৭৮৯, মুসনাদে শাফেয়ী হা/৫২৮।
৯০. অর্থাৎ তাদের বিদ‘আত এতই মারাত্মক ও ক্ষতিকর, যার কারণে তারা মুসলমানের অন্যান্য গোমরাহ ফিরকার অন্তর্ভূক্ত হওয়ারও উপযুক্ত নয়। তাই কোন কোন আলিম তাদেরকে নিরেট কাফিরদের অন্তর্ভূক্ত করেছেন। অনেকে বইও লিখেছেন- কবর পূজারীরা কাফির।
📄 সেখানে ঐ সৎ লোকের উদ্দেশ্যে ইবাদতকারীর ব্যাপারে কী বিধান আসতে পারে?
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।