📄 ১৫. ফেরেশতাদের প্রতি আল্লাহর অহি অবতীর্ণের ভীতি
আল্লাহ তা‘আলার বাণী,
حَتَّىٰ إِذَا فُزِّعَ عَن قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ ۖ قَالُوا الْحَقَّ ۖ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ
“যখন তাদের মন থেকে ভয়-ভীতি দূর হয়ে যায়, তখন তারা পরস্পর বলাবলি করে, তোমাদের প্রতিপালক কি বললেন? তারা বলে, তিনি সত্য বলেছেন এবং তিনিই সবার উচ্চে ও সর্বমহান। (সূরা সাবা: ২৩)
ছহীহ বুখারীতে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«إِذَا قَضَى اللَّهُ الْأَمْرَ فِي السَّمَاءِ ضَرَبَتِ الْمَلَائِكَةُ بِأَجْنِحَتِهَا خُضْعَانًا لِقَوْلِهِ، كَأَنَّهُ سِلْسِلَةٌ عَلَى صَفْوَانٍ، يَنْفُذُهُمْ ذَلِكَ {حَتَّى إِذَا فُزِّعَ عَنْ قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا الْحَقَّ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ}، فَيَسْمَعُهَا مُسْتَرِقُ السَّمْعِ، وَمُسْتَرِقُ السَّمْعِ هَكَذَا بَعْضُهُ فَوْقَ بَعْضٍ، (وَوَصَفَهُ سُفْيَانُ بِكَفِّهِ، فَحَرَّفَهَا وَبَدَّدَ بَيْنَ أَصَابِعِهِ)، فَيَسْمَعُ الْكَلِمَةَ فَيُلْقِيهَا إِلَى مَنْ تَحْتَهُ، ثُمَّ يُلْقِيهَا الْآخَرُ إِلَى مَنْ تَحْتَهُ، حَتَّى يُلْقِيَهَا عَلَى لِسَانِ السَّاحِرِ أَوِ الْكَاهِنِ، فَرُبَّمَا أَدْرَكَهُ الشِّهَابُ قَبْلَ أَنْ يُلْقِيَهَا، وَرُبَّمَا أَلْقَاهَا قَبْلَ أَنْ يُدْرِكَهُ، فَيَكْذِبُ مَعَهَا مِئَةَ كَذْبَةٍ، فَيُقَالُ: أَلَيْسَ قَدْ قَالَ لَنَا يَوْمَ كَذَا وَكَذَا كَذَا وَكَذَا؟ فَيُصَدَّقُ بِتِلْكَ الْكَلِمَةِ الَّتِي سُمِعَتْ مِنَ السَّمَاءِ»
“যখন আল্লাহ তা‘আলা আকাশে কোনো বিষয়ের ফায়ছালা করেন, তখন তার কথার সমর্থনে বিনয়াবনত হয়ে ফেরেশতারা তাদের ডানাগুলো নাড়াতে থাকে। ডানা নাড়ানোর আওয়াজ যেন ঠিক পাথরের উপর শিকল পতিত হওয়ার আওয়াজের মতই। তাদের অবস্থা এভাবেই চলতে থাকে। যখন তাদের অন্তর থেকে ভয়-ভীতি দূর হয়ে যায়, তখন তারা বলে, তোমাদের রব তোমাদেরকে কি বলেছেন? তারা জবাবে বলে, আল্লাহ হক্কথাই বলেছেন। বস্তুত তিনিই হচ্ছেন মহান ও শ্রেষ্ঠ। এমতাবস্থায় চুরি করে কথা শ্রবণকারীরা উক্ত কথা শুনে ফেলে। আর এসব চোর এভাবে উপর নিচ হয়ে অবস্থান করতে থাকে। এ হাদীছের বর্ণনাকারী সুফিয়ান বিন উয়াইনা চুরি করে কথা শ্রবণকারীদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে হাতের তালু দ্বারা এর ধরণ বর্ণনা করেছেন এবং হাতের আঙ্গুলসমূহ ফাঁক করে তাদের অবস্থা বুঝিয়েছেন। অতঃপর চুপিসারে শ্রবণকারী কথাগুলো শুনে তার নিচের চোরের কাছে পৌঁছে দেয়। অতঃপর সে তার নিচের চোরের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত এ কথা একজন যাদুকর কিংবা গণকের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। কোন কোন সময় গণক বা যাদুকরের কাছে উক্ত কথা পৌঁছানোর পূর্বেই শ্রবণকারীর উপর অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হয়। আবার কোন কোন সময় অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হওয়ার পূর্বেই সে কথা দুনিয়াতে পৌঁছে যায়। ঐ সত্য কথাটির সাথে একশ মিথ্যা যোগ করে। অতঃপর শত মিথ্যার সাথে মিশ্রিত সত্য কথাটি যখন বাস্তবে রূপ লাভ করে তখন বলা হয়, অমুক দিন কি গণক তোমাদেরকে এই কথা বলেনি? মূলত আকাশে শ্রুত একটি সত্য কথার কারণেই গণকের একশ মিথ্যা মিশ্রিত কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করা হয়।
নাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«إِذَا أَرَادَ اللَّهُ تَعَالَى أَنْ يُوحِيَ بِالْأَمْرِ، تَكَلَّمَ بِالْوَحْيِ أَخَذَتِ السَّمَاوَاتُ مِنْهُ رَجْفَةٌ، (أَوْ قَالَ: رِعْدَةٌ شَدِيدَةٌ)، خَوْفًا مِنَ اللَّهِ - عز وجل - فَإِذَا سَمِعَ ذَلِكَ أَهْلُ السَّمَاوَاتِ صَعِقُوا وَخَرُّوا لِلَّهِ سُجَّدًا، فَيَكُونُ أَوَّلَ مَنْ يَرْفَعُ رَأْسَهُ جِبْرِيلُ، فَيُكَلِّمُهُ اللَّهُ مِنْ وَحْيِهِ بِمَا أَرَادَ، ثُمَّ يَمُرُّ جِبْرِيلُ عَلَى الْمَلَائِكَةِ، كُلَّمَا مَرَّ بِسَمَاءٍ سَأَلَهُ مَلَائِكَتُهَا: مَاذَا قَالَ رَبُّنَا يَا جِبْرِيلُ؟ فَيَقُولُ جِبْرِيلُ: قَالَ الْحَقَّ، وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ، فَيَقُولُونَ كُلُّهُمْ مِثْلَ مَا قَالَ جِبْرِيلُ، فَيَنْتَهِي جِبْرِيلُ بِالْوَحْيِ إِلَى حَيْثُ أَمَرَهُ اللَّهُ - عز وجل -» رَوَاهُ ابْنُ أَبِي حَاتِمٍ
“আল্লাহ তা‘আলা যখন কোন বিষয়ে অহী করতে চান এবং অহীর মাধ্যমে কথা বলেন তখন আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের ভয়ে সমস্ত আকাশ মন্ডলী কেঁপে উঠে অথবা বিকট আওয়াজ হয়। আকাশের ফেরেশতাগণ এ বিকট আওয়াজ শুনে বেহুঁশ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় এবং সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে সর্বপ্রথম যিনি মাথা উঠান, তিনি হচ্ছেন জিবরীল আ.। তারপর আল্লাহ তা‘আলা যা ইচ্ছা করেন অহীর মাধ্যমে জিবরীলের সাথে সে ব্যাপারে কথা বলেন। এরপর জিবরীল অন্যান্য ফেরেশতাদের পাশ দিয়ে যেতে থাকেন। জিবরীল যতবারই কোনো আকাশ অতিক্রম করেন ততবারই উক্ত আকাশের ফেরেশতারা তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘হে জিবরীল! আমাদের রব কি বলেছেন? জিবরীল উত্তরে বলেন, ‘আল্লাহ হক কথাই বলেছেন, তিনিই সুউচ্চ ও সুমহান। এ কথা শুনে তারা সবাই জিবরীল যা বলেছেন, তাই বলে। তারপর আল্লাহ তা‘আলা জিবরীলকে যেখানে অহী নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন তিনি সে দিকে চলে যান”। ইবনে আবী হাতিম।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা সাবার ২৩ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) সূরা সাবার ২৩ নং আয়াতে এমন অকাট্য দলীল রয়েছে, যা সকল প্রকার শিরককে বাতিল করে দেয়। বিশেষ করে ছলেহীন তথা সৎ লোকদেরকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত শিরক সংঘটিত হয়ে থাকে, এখানে সেই শিরককে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। এটি সেই আয়াত, যাকে অন্তর থেকে শিরক বৃক্ষের ‘শিকড় কর্তনকারী’ বলে আখ্যায়িত করা হয়।
৩) ﴾قَالُوا الْحَقَّ ۖ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ﴿ -এর তাফসীরও জানা গেল।
৪) হক্ব সম্পর্কে ফেরেশতাদের জিজ্ঞাসার কারণ।
৫) ফেরেশতাদের জিজ্ঞাসার পর জিবরীল তাদের জবাব প্রদান করেন। তিনি বলেন: আল্লাহ তা‘আলা এই এই কথা বলেছেন।
৬) সিজদারত অবস্থা থেকে সর্বপ্রথম জিবরীল কর্তৃক মাথা উঠানো।
৭) সমস্ত আকাশবাসীর উদ্দেশ্যে জিবরীলই কথা বলেন। কারণ তাঁর কাছেই তারা কথা জিজ্ঞেস করে।
৮) আল্লাহর কালাম অবতীর্ণ হওয়ার শব্দ শুনে সকল আকাশবাসীই বেহুঁশ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।
৯) আল্লাহর কালামের প্রভাবে সমস্ত আকাশ প্রকম্পিত হওয়া।
১০) জিবরীলকে আল্লাহ তা‘আলা যেখানে বা যার নিকট ওহী নিয়ে যাওয়ার আদেশ করেন, তিনি সেখানেই নিয়ে যান।
১১) শয়তানেরা চুরি করে আকাশের কথা শ্রবণ করার বিষয় উল্লেখিত হয়েছে।
১২) শয়তানদের একজন অন্যজনের উপর আরোহন করার ধরণ জানা গেল।
১৩) শয়তানদের উপর অগ্নিশিখা নিক্ষেপিত হয়।
১৪) কখনো কখনো আকাশের কথা যমীন পর্যন্ত নিয়ে আসার আগেই অগ্নিশিখা শয়তানকে জ্বালিয়ে দেয়। আবার কখনো অগ্নিশিখা তাকে ধরে ফেলার পূর্বেই শয়তান মানুষকে আকাশের কথা শুনাতে সক্ষম হয়।
১৫) কখনো কখনো গণকের কথা সত্য হয়।
১৬) গণক একটি কথা ঠিক বললেও তার সাথে শতটি মিথ্যা কথা বলে।
১৭) আকাশ থেকে একটি শ্রুত কথা সত্য হওয়ার কারণেই গণকের অন্যান্য মিথ্যা কথাকেও সত্য বলে বিশ্বাস করা হয়।
১৮) মনুষ্য প্রবৃত্তি দ্রুত বাতিল ও মিথ্যা কথা বিশ্বাস করে নেয়। গণকের একটি কথা সত্য হওয়ার কারণে বিনা বিচারে কিভাবে তারা একশটি মিথ্যা কথাকে গ্রহণ করে? সত্যিই ভাবার বিষয়!
১৯) সেই একটি সত্য কথাকে শয়তানদের একজন অন্যজনের কাছ থেকে শিখে নেয় এবং মুখস্থ করে রাখে। এরপর তারা এটির দ্বারা শত মিথ্যাকে সত্য বানানোর চেষ্টা করে।
২০) এই অধ্যায় থেকে আল্লাহর ছিফাত তথা গুণাবলী থাকার কথা জানা গেল। আশ‘আরী সম্প্রদায় আল্লাহর ছিফাত সাব্যস্ত করার বিরোধী।
২১) আল্লাহর ভয়েই আকাশ কেঁপে উঠে এবং ফেরেশতাগণ অচেতন হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।
২২) ফেরেশতারাও আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হয়।
টিকাঃ
৬৭. ছহীহ বুখারী হা/৪৮০০, অধ্যায়: আল্লাহর বাণী: যখন তাদের অন্তর থেকে ভয়-ভীতি দূর হয়।
৬৮. যঈফ: ইবনে খুযাইমা তাওহীদে ১/৩৪}$, ইবনে আবী আসিম সুন্নাতে হা/৫১৫, তাবারী এবং বায়হাকী। আল্লামা আলবানী হাদীছটিকে যঈফ বলেছেন। দেখুন: যিলালুল জান্নাত, (১/২৬৭)।
📄 ১৬. শাফা‘আত (সুপারিশ)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَأَنذِرْ بِهِ الَّذِينَ يَخَافُونَ أَن يُحْشَرُوا إِلَىٰ رَبِّهِمْ ۙ لَيْسَ لَهُم مِّن دُونِهِ وَلِيٌّ وَلَا شَفِيعٌ لَّعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ
“তুমি কুরআনের মাধ্যমে সে সব লোকদেরকে সতর্ক করো, যারা তাদের রবের সামনে উপস্থিত হওয়াকে ভয় করে। সেদিন তাদের অবস্থা এমন হবে যে, আল্লাহ ছাড়া তাদের কোনো সাহায্যকারী বন্ধু এবং কোন শাফা‘আতকারী থাকবে না, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে”। (সূরা আল আন‘আম: ৫১)
আল্লাহ তা‘আলা সূরা যুমারের ৪৪ নং আয়াতে ইরশাদ করেন,
قُل لِّلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعًا
“ বলো, সমস্ত শাফা‘আত কেবল আল্লাহরই এখতিয়ারভুক্ত”।
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِندَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ
“তার অনুমতি ব্যতীত তার দরবারে কে শাফা‘আত করতে পারে?” (সূরা আল বাকারা: ২৫৫)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
وَكَم مِّن مَّلَكٍ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِن بَعْدِ أَن يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَن يَشَاءُ وَيَرْضَىٰ
“আকাশমন্ডলে এমন অনেক ফেরেশতা রয়েছে, যাদের শাফা‘আত কোনো কাজেই আসবে না, তবে আল্লাহ নিজ ইচ্ছায় যাকে খুশী তার জন্য সুপারিশ করার অনুমতি দিলে সে কথা ভিন্ন।
ছহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«أَنَا أَوَّلُ شَافِعٍ، وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ»
“আমিই সর্বপ্রথম শাফা‘আতকারী এবং আমিই সর্বপ্রথম শাফা‘আত কবুলকৃত ব্যক্তি”।
ছহীহ মুসলিমে আরো বর্ণিত আছে যে,
«أَنَا أَوَّلُ النَّاسِ يَشْفَعُ فِي الْجَنَّةِ، وَأَنَا أَكْثَرُ الْأَنْبِيَاءِ تَبَعًا»
“জান্নাতে সর্বপ্রথম আমিই শাফা‘আতকারী, আর নবীদের মধ্যে আমার অনুসারীর সংখ্যাই হবে সর্বাধিক”।
«إِنَّ لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةً مُسْتَجَابَةً، فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ، وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا»
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক নবীর জন্য একটি বিশেষ দু’আ রয়েছে যা কবুল করা হবে। প্রত্যেক নবীই তাঁর দু’আ দুনিয়াতেই করে ফেলেছেন। কিন্তু আমি আমার দু’আ কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফা’আতের জন্য গোপন করে রেখেছি। সুতরাং আমার উম্মতের যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছু শরীক না করে মৃত্যুবরণ করবে ইনশাআল্লাহ সে তা লাভ করবে”।
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
يَوْمَئِذٍ لَّا تَنفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَٰنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا
“দয়াময় আল্লাহ যাকে অনুমতি দিবেন এবং যার কথায় তিনি সন্তুষ্ট হবেন সে ছাড়া কিয়ামতের দিন কারো সুপারিশ কোন কাজে আসবে না”। (সূরা ত্বহা: ১০৯)
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। আর তার ঠিকানা হলো জাহান্নাম। আর যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই”। (সূরা মায়িদাহ্: ৭২)
«مَنِ الَّذِي يُشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ»
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন:
“কে আছে এমন, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর দরবারে সুপারিশ করবে”? (সূরা আল-বাকারাহ: ২৫৫)
«مَا مِنْ شَفِيعٍ إِلَّا مِنْ بَعْدِ إِذْنِهِ»
“কোন শাফা‘আতকারী এমন নেই, যে তার অনুমতি ছাড়া শাফা‘আত করতে পারে (সূরা ইউনুস ১০:৩ )|
দ্বিতীয় শর্ত: যার জন্য সুপারিশ করা হবে তার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকা অপরিহার্য। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَىٰ
“তারা কেবল তাদের জন্যই সুপারিশ করবেন, যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট আছেন”। (সূরা আম্বীয়া ২১:২৮) এ দু’টি শর্ত সূরা নাজমের ২৬ নং আয়াতে একসাথে এসেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَكَم مِّن مَّلَكٍ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِن بَعْدِ أَن يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَن يَشَاءُ وَيَرْضَىٰ
“আসমানে অনেক ফেরেশতা আছে, যাদের সুপারিশও কোন কাজে আসবেনা। যতক্ষণ না আল্লাহ নিজ ইচ্ছায় যাকে খুশী তার জন্য সুপারিশ করার অনুমতি দান করেন”।
কবীরা গুনাহে লিপ্ত হয়ে যেসব মু’মিন মৃত্যুবরণ করবে তাদের কেউ জাহান্নামের হকদার হলে তাকে জাহান্নামে প্রবেশ না করানোর জন্য শাফা‘আতের ব্যাপারে মু‘তাযিলা সম্প্রদায় লোকেরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের বিরোধীতা করেছে। সেই সাথে যারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে, সেখান থেকে তাদের বের হওয়ার ব্যাপারেও শাফা‘আত হওয়াকে মু‘তাযিলারা অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ তারা শাফা‘আতের উপরোক্ত প্রকারসমূহ থেকে পঞ্চম ও ষষ্ঠ প্রকার শাফা‘আতকেও তারা অস্বীকার করেছে। তারা আল্লাহ তা‘আলার এই বাণী দ্বারা দলীল গ্রহণ করে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
فَمَا تَنفَعُهُمْ شَفَاعَةُ الشَّافِعِينَ
“সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কাজে আসবে না (সূরা মুদ্দাসসির ৭৪:৪৮)|
তাদের কথার জবাব হলো, আয়াতটি কাফিরদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। সুপারিশকারীদের সুপারিশ কাফিরদের কোন কাজে আসবে না। তবে মু’মিনদের ব্যাপারে কথা হচ্ছে কতিপয় শর্তসাপেক্ষে সুপারিশ তাদের উপকার করবে। মোটকথা শাফা‘আতের ব্যাপারে লোকেরা তিনভাগে বিভক্ত:
(১) এক শ্রেণীর লোক শাফা‘আতকে সাব্যস্ত করতে গিয়ে সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ি করেছে। নাসারা, মুশরিক, সীমালঙ্ঘনকারী সূফী এবং কবর পূজারীরা এই শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত। এরা যাদেরকে তা’যীম করে, আল্লাহ তা‘আলার নিকট তাদের শাফা‘আতকে দুনিয়ার রাজা বাদশাহদের নিকট পরিচিত শাফা‘আতের মতই মনে করে থাকে। সুতরাং তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের কাছে শাফা‘আত প্রার্থনা করেছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন যে, মুশরিকদের জন্য সুপারিশকারীদের সুপারিশ কাজে আসবে না।
(২) মু‘তাযিলা ও খারিজীরা শাফা‘আতকে একদম অস্বীকার করেও সীমালঙ্ঘন করেছে। তারা কবীরা গুনাহকারীর জন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং অন্যদের শাফা‘আতকে অস্বীকার করেছে।
(৩) আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের লোকেরা কুরআনের আয়াত এবং নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত শাফা‘আতকে সাব্যস্ত করে। সুতরাং তারা শর্তসাপেক্ষে শাফা‘আতকে সাব্যস্ত করে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِ اللَّهِ ۖ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ
“বলো, তোমরা তোমাদের সেসব মা‘বূদদেরকে ডেকে দেখো, যাদেরকে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত নিজেদের মা‘বূদ মনে করেছ, তারা না আকাশের, না যমীনের এক অনু পরিমাণ জিনিসের মালিক”। (সূরা সাবা: ২২)
আবুল আব্বাস ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন: মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া যার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছে, তার সবই আল্লাহ তা‘আলা অস্বীকার করেছেন। আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য রাজত্ব অথবা আল্লাহর ক্ষমতায় গাইরুল্লাহর অংশীদারিত্ব অথবা আল্লাহর জন্য কোনো সাহায্যকারী হওয়ার বিষয়কে তিনি অস্বীকার করেছেন। বাকী থাকল শুধু শাফা‘আতের বিষয়টি। এ ব্যাপারে কথা এই যে, “আল্লাহ তা‘আলা যাকে শাফা‘আত করার অনুমতি দিবেন, তার শাফা‘আত ছাড়া অন্য কারো শাফা‘আত কোনো কাজে আসবে না”। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন, وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَىٰ “তিনি যার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হবেন, কেবল তার পক্ষেই তারা শাফাআত করবে”। (সূরা আম্বীয়া: ২৮)
মুশরিকরা যে শাফা‘আতের আশা করে, ক্বিয়ামতের দিন তার কোন অস্তিত্বই থাকবে না। কুরআনে কারীমও এধরনের শাফা‘আতকে অস্বীকার করেছে।
নাবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়েছেন, “তিনি আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবেন। অতঃপর তার রবের উদ্দেশে তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়বেন এবং আল্লাহর প্রশংসায় মগ্ন হবেন। প্রথমেই তিনি শাফা‘আত বা সুপারিশ করা শুরু করবেন না। অতঃপর তাকে বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! তোমার মাথা উঠাও। তুমি তোমার কথা বলতে থাক, তোমার কথা শ্রবণ করা হবে। তুমি চাইতে থাক, তোমাকে দেয়া হবে। তুমি সুপারিশ করতে থাক, তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।”
আবু হুরায়রা (রাঃ) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন আপনার শাফা‘আত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি কে? তিনি জবাবে বললেন, যে ব্যক্তি খালেস দিলে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে, সে আমার শাফাআত পাওয়ার সর্বাধিক হকদার হবে।
এ হাদীছে উল্লেখিত শাফা‘আত আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিপ্রাপ্ত এবং নেককার মুখলিস বান্দাদের জন্য নির্দিষ্ট। আল্লাহর সাথে যে ব্যক্তি কাউকে শরীক করবে, তার ভাগ্যে এ শাফা‘আত জুটবে না।
এ আলোচনার তাৎপর্য এই যে, আল্লাহ তা‘আলা মুখলিস বান্দাগণের প্রতি অনুগ্রহ করবেন এবং শাফা‘আতের জন্য অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রার্থনায় তাদেরকে ক্ষমা করবেন। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, শাফা‘আতকারীকে সম্মানিত করা এবং তাকে মাকামে মাহমূদ তথা প্রশংসিত স্থান দান করা।
কুরআনে কারীম যে শাফা‘আতকে অস্বীকার করেছে, তাতে শিরক বিদ্যমান রয়েছে। এ জন্যই আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি সাপেক্ষে শাফা‘আত এর স্বীকৃতির কথা কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় এসেছে। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন যে, শাফা‘আত একমাত্র তাওহীদপন্থী নিষ্ঠাবানদের জন্যই নির্দিষ্ট।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয় গুলো জানা যায়:
১) এই অধ্যায়ে বর্ণিত আয়াতসমূহের তাফসীর জানা গেল।
২) কুরআনে যে শাফা‘আতকে অস্বীকার করা হয়েছে তার প্রকৃতি ও গুণাগুণ জানা গেল।
৩) আর যে প্রকার শাফা‘আতকে কুরআন স্বীকৃতি দিয়েছে তার গুণাগুণ জানা গেল।
৪) সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শাফা‘আতের উল্লেখ। আর তা হচ্ছে মাকামে মাহমূদ।
৫) ক্বিয়ামতের দিন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা করবেন তার বর্ণনা। অর্থাৎ তিনি প্রথমেই শাফা‘আতের কথা বলবেন না; বরং তিনি সিজদায় পড়ে যাবেন। তাকে অনুমতি প্রদান করা হলেই তিনি শাফা‘আত করতে পারবেন।
৬) শাফা‘আতের মাধ্যমে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তিকে জানা গেল।
৭) আল্লাহর সাথে শিরককারীর জন্য কোনো শাফা‘আত গৃহীত হবে না।
৮) শাফা‘আতের স্বরূপ জানা গেল।
টিকাঃ
৬৯. শারহুল আক্বীদা আল-ওয়াসেত্বীয়া হতে: অনুসন্ধানের পর মোট আট প্রকার শাফা‘আতের কথা জানা যায়। এগুলোর মধ্য হতে কতিপয় শাফা‘আত নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে খাছ-নির্দিষ্ট এবং আরো কিছু শাফা‘আতের কথা জানা যায়, যা তার জন্য এবং অন্যদের জন্যও সাব্যস্ত।
১) الشفاعة العظمى শাফা‘আতে উযমা: وهي المقام المحمود এ শাফা‘আত হবে মাকামে মাহমূদে। হাশরের মাঠে লোকদের দীর্ঘ অবস্থানের পর এবং আদম থেকে শুরু করে ঈসা (আঃ) পর্যন্ত সবার কাছে সুপারিশের জন্য গমন করার পর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তা‘আলার নিকট বান্দাদের মাঝে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার আবেদন করবেন। সকল নাবীই যখন আল্লাহর নিকট সুপারিশ করতে অপারগতা প্রকাশ করবেন, তখন নাবী মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রভুর অনুমতি নিয়ে শাফা‘আত করবেন।
২) شفاعته ـ صلى الله عليه وسلم ـ في دخول أهل الجنة بعد الفراغ من الحساب জান্নাতী জান্নাতে প্রবেশ করানোর শাফা‘আত: হিসাবের পর জান্নাতীদেরকে দ্রুত জান্নাতে প্রবেশের অনুমতির জন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নিকট শাফা‘আত করবেন।
৩) شـفاعته ـ صـلى الله عليـه وسـلم ـ في عمـه أبي طالـب নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চাচা আবু তালেবের জন্য শাফা‘আত: নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্বিয়ামতের দিন তার চাচা আবু তালেবের শাস্তি হালকা করার জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবেন। এ শাফা‘আত তার সাথেই খাস। কেননা আল্লাহ তা‘আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, কাফিরদের জন্য সুপারিশকারীদের সুপারিশ কোন কাজে আসবে না। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন যে, তার শাফা‘আত কেবল তাওহীদপন্থীদের জন্যই নির্দিষ্ট। সুতরাং তার কাফির চাচা আবু তালেবের জন্য যেই শাফা‘আত তিনি করবেন, তা কেবল তার সাথেই এবং আবু তালেবের জন্যই খাস। উপরের তিন প্রকার শাফা‘আত কেবল আমাদের নাবী মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্যই নির্দিষ্ট।
৪) شـفاعته فـيمن اسـتحق النـار مـن عصـاة الموحـدين أن لا يـدخلها তাওহীদপন্থী’দের মধ্য হতে যাদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যাবে, তাদেরকে তথায় না পাঠানোর শাফা‘আত: যেসব গুনাহগারদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যাবে, তাদেরকে জাহান্নামে না পাঠানোর জন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্বিয়ামতের দিন সুপারিশ করবেন।
৫) شفاعته ـ صلى الله عليه وسلم ـ فيمن دخل النار مـن عصـاة الموحـدين أن يخـرج منهـا তাওহীদপন্থী মু’মিনদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার সুপারিশ: জাহান্নামে প্রবেশকারী তাওহীদপন্থী একদল পাপী লোককে তা থেকে বের করার জন্য তিনি শাফা‘আত করবেন।
৬) شفاعته ـ صلى الله عليه وسلم ـ في رفع درجات بعض أهل الجنة জান্নাতীদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য সুপারিশ: জান্নাতবাসী কিছু লোকের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাফা‘আত করবেন।
৭) شـفاعته ـ صـلى الله عليـه وسـلم ـ فـيمن اسـتوت حسـناهتم وسـيئاهتم যাদের গুনাহ এবং নেকীর পাল্লা সমান সমান হবে, তাদের জন্য সুপারিশ: ক্বিয়ামতের দিন যাদের গুনাহর পাল্লা এবং নেকীর পাল্লা সমান সমান হবে, তাদের জন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাফা‘আত করবেন যে, তাদেরকে যেন জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়। আলেমদের এক মত অনুযায়ী তারা হলেন আরাফবাসী।
৮) شـفاعته ـ صـلى الله عليـه وسـلم ـ في دخـول بعـض المـؤمنين الجنـة بـلا حسـاب ولا عـذاب বিনা হিসাবে এবং বিনা আযাবে এক শ্রেণীর লোককে জান্নাতে প্রবেশ করানোর শাফা‘আত: যেমন উক্কাশা ইবনে মিহসানের ব্যাপারে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফা‘আত। উক্কাশা যখন শুনলেন, এই উম্মাতের সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে ও বিনা আযাবে জান্নাতে যাবে, তখন তিনি আবেদন করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা‘আলার নিকট আমার জন্য দু‘আ করুন, তিনি যেন আমাকে সেই সত্তর হাজারের অন্তর্ভূক্ত করেন। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন উক্কাশার জন্য উক্ত সত্তর হাজারের অন্তর্ভূক্ত করে নেয়ার দু‘আ করলেন। ছহীহ মুসলিম হা/২২০, ছহীহ বুখারী হা/৫৭৫২।
এ শেষোক্ত পাঁচ প্রকারের শাফা‘আত করার মধ্যে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে আরো অনেকেই শরীক থাকবে। যেমন অন্যান্য নাবীগণ, ফেরেশতাগণ, সিদ্দীকগণ এবং শহীদগণ।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের লোকেরা উপরোক্ত সকল প্রকার শাফা‘আতেই বিশ্বাস করে। কেননা ছহীহ সূত্রে বর্ণিত অনেক দলীল দ্বারা তা প্রমাণিত। তবে দু’টি শর্ত ছাড়া শাফা‘আত হবে না।
৭০. ছহীহ বুখারী হা/৭৫১০, ছহীহ মুসলিম ১৯৩, কিতাবুল ঈমান।
৭১. ছহীহ বুখারী হা/৯৯।
📄 ১৭. হিদায়াত দানকারী একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা
আল্লাহ তা‘আলার বাণী,
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ
“তুমি যাকে পছন্দ করো, তাকে হিদায়াত করতে পারবে না।
ছহীহ বুখারীতে ইবনুল মুসাইয়্যিব (রহঃ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
«لَمَّا حَضَرَتْ أَبَا طَالِبٍ الْوَفَاةُ، جَاءَهُ رَسُولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - وَعِنْدَهُ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَبِي أُمَيَّةَ وَأَبُو جَهْلٍ، فَقَالَ لَهُ: يَا عَمِّ، قُلْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، كَلِمَةً أُحَاجُّ لَكَ بِهَا عِنْدَ اللَّهِ»، فَقَالَا لَهُ: أَتَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ؟ فَأَعَادَ عَلَيْهِ النَّبِيُّ؟ ، فَأَعَادَا، فَكَانَ آخِرَ مَا قَالَ: هُوَ عَلَى مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ، وَأَبَى أَنْ يَقُولَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، فَقَالَ النَّبِيُّ؟ : «لَأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ، مَا لَمْ أُنْهَ عَنْكَ»، فَأَنْزَلَ اللَّهُ - عز وجل -: {مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ} الْآيَةَ، وَأَنْزَلَ اللَّهُ فِي أَبِي طَالِبٍ: {إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ}
“যখন আবু তালিবের মৃত্যু উপস্থিত হল তখন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে আসলেন। আব্দুল্লাহ বিন আবি উমাইয়্যাহ এবং আবু জাহেল আবু তালিবের পাশেই উপস্থিত ছিল। রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, ‘চাচা, আপনি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলুন। এটি এমন একটি কালিমা, আপনি যদি তা পাঠ করেন, তাহলে এর দ্বারা আমি আল্লাহর কাছে আপনার জন্য বিতর্ক করবো, তখন তারা দু’জন তাকে বলল: তুমি আব্দুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করবে? নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কালিমা পড়ার কথা আরেকবার বললেন। তারা দু’জনও আবু তালিবের উদ্দেশে পূর্বোক্ত কথা আরেকবার বলল। আবু তালিবের সর্বশেষ অবস্থা ছিল, সে আব্দুল মুত্তালিবের ধর্মের উপরই অটল ছিল এবং ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলতে অস্বীকার করেছিল। তখন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আপনার ব্যাপারে যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে নিষেধ না করা হবে ততক্ষণ আমি আপনার জন্য মাগফিরাত কামনা করতে থাকবো। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াত নাযিল করেন:
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ
“মুশরিকদের জন্য মাগফিরাত কামনা করা নাবী এবং মু’মিনদের জন্য শোভনীয় নয়।” (সূরা আত তাওবা: ১১৩) আল্লাহ তা‘আলা আবু তালিবের ব্যাপারে এই আয়াত নাযিল করেন,
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ
“তুমি যাকে পছন্দ করো, তাকে হিদায়াত করতে পারবে না। কিন্তু আল্লাহ যাকে চান তাকে হিদায়াত করেন।” (সূরা আল-কাসাস: ৫৬)
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয় গুলো জানা যায়:
১) أنك لا تهدى من أحببت “তুমি যাকে পছন্দ করো, তাকে হিদায়াত করতে পারবে না”। এ আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) সূরা তাওবার ১১৩ নং আয়াত অর্থাৎ
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَىٰ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّnَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ
“নাবী ও মু’মিনদের উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য মাগফেরাত কামনা করবে, যদিও তারা নিকটাত্মীয় হয়, এ কথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামী”-এর তাফসীরও জানা গেল।
৩) একটি বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা জানা গেল। আর সেটি হচ্ছে, قل لا إلـه إلا الله “আপনি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলুন” রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর কথার ব্যাখ্যা। এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা এক শ্রেণীর তথা কথিত জ্ঞানের দাবিদারদের বিপরীত। তারা দাবি করে থাকে যে, অর্থ না বুঝেই এবং ইখলাস ব্যতীত শুধু যবান দিয়ে এটি পাঠ করলেই নাজাত পাওয়া যাবে। তাদের দাবি সম্পূর্ণ অবাস্তব।
৪) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুপথ যাত্রী আবু তালিবের ঘরে প্রবেশ করে যখন বললেন, চাচা, আপনি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলুন, এ কথার দ্বারা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর কি উদ্দেশ্য ছিল তা আবু জাহেল এবং তার সঙ্গীরা ভাল করেই বুঝতে পেরেছিল। আল্লাহ তা‘আলা ঐ ব্যক্তির অমঙ্গল করুন! যে ইসলামের মূলনীতি কালেমা তায়্যেবার অর্থ সম্পর্কে আবু জাহেলের চেয়েও অধিক অজ্ঞ।
৫) আপন চাচার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তীব্র আকাঙ্খা ও প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন।
৬) যারা আব্দুল মুত্তালিব এবং তার পূর্বসূরীদেরকে মুসলিম হওয়ার দাবি করে, এখানে তাদের দাবি খন্ডন করা হয়েছে।
৭) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় চাচা আবু তালিবের জন্য মাগফিরাত চাইলেও তার গুনাহ মাফ হয়নি, বরং তার মাগফিরাত চাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
৮) মানুষের উপর খারাপ বন্ধুদের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে থাকে।
৯) পূর্বপুরুষ এবং সৎ লোকদের প্রতি মাত্রতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শনের কারণেই মানুষ গোমরাহ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১০) আবু জাহেল কর্তৃক পূর্ব পুরুষদের প্রতি অন্ধ ভক্তির যুক্তি প্রদর্শনের কারণে বাতিল পন্থীদের অন্তরে সংশয়ের সৃষ্টি হয়।
১১) সর্বশেষ আমলের শুভাशुभ পরিণতির প্রত্যক্ষ প্রমাণ। কেননা আবু তালিব যদি শেষ মুহূর্তেও কালিমা পড়ত তাহলে তার বিরাট উপকার হত।
১২) এ বিষয়টিতে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত যে, গোমরাহীতে নিমজ্জিত লোকদের অন্তরে বাপ-দাদাদের رسم-রেওয়াজের প্রতি চরম ভক্তি ও ভালবাসা রয়েছে। কেননা আবু তালিবের ঘটনায় যা বর্ণিত হয়েছে, তা হলো রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ঈমান আনার কথা বারবার বলার পরও কাফির মুশরিকরা তাদের পূর্ব পুরুষদের মিল্লাতের অনুসরণকেই যুক্তি হিসাবে পেশ করেছে। তাদের অন্তরে বাপ-দাদাদের ধর্মের প্রতি সম্মান থাকার কারণে এবং সেটি তাদের নিকট সুস্পষ্ট হওয়ার কারণেই তারা মাত্র একটি দলীলকে যথেষ্ট বলে মনে করেছে।
টিকাঃ
৭২. এখানে বুঝানো হয়েছে, কেউ কাউকে সুপারিশ এর মাধ্যমে উপকার করতে সক্ষম নয় এবং আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তিদানের ক্ষমতা রাখে না। তেমনি কেউ কাউকে হিদায়াত দানেরও ক্ষমতা রাখে না, যতক্ষণ না আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি হয়। রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে হিদায়াতের মালিক নন বলে ঘোষণা করা হয়েছে, তা হচ্ছে হিদায়াতের তাওফীক দেয়া। আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কেউ এ প্রকার হিদায়াতের মালিক নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَن تُؤْمِنَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ
“আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউই ঈমান আনতে পারে না”। (সূরা ইউনুস: ১০০)
নূহ (আঃ) তার পুত্রকে হিদায়াত করতে পারেননি, স্ত্রীকেও সৎ পথে আনতে পারেননি। ইবরাহীম খলীল (আঃ) তার পিতাকে দীনের পথে আনয়ন করার চেষ্টা করেও সফল হননি। লূত (আঃ) এর ক্ষেত্রেও একই কথা। তার স্ত্রীকে সৎপথে আনতে পারেননি। আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম ও ইসহাক (আঃ) এর ব্যাপারে বলেন,
وَبَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَىٰ إِسْحَاقَ ۚ وَمِن ذُرِّيَّتِهِمَا مُحْسِنٌ وَظَالِمٌ لِّنَفْسِهِ مُبِينٌ
“তাকে (ইবরাহীমকে) এবং ইসহাককে আমি বরকত দান করেছি। তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক সৎকর্মী এবং কতক নিজেদের উপর স্পষ্ট যুলুমকারী। (সূরা সাফফাত: ১১৩)
আর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে প্রকার হিদায়াত করতে সক্ষম বলে কুরআন সাক্ষ্য দিয়েছে, তা হচ্ছে হিদায়াতের পথ দেখানো। তিনি এবং সকল নাবী-রাসূলই মানুষকে হিদায়াতের পথ দেখিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা সূরা শূরার ৫২ নং আয়াতে বলেন,
وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
“নিশ্চয় আপনি সরল পথপ্রদর্শন করেন”।
৭৩. এখানে সম্মানিত লেখক ঐ সমস্ত অজ্ঞ মুসলিমদেরকে বুঝিয়েছেন, যারা নিজেদেরকে মুসলিম বলে দাবি করে, কিন্তু ইসলামের মূল বাণী তথা কালিমা তায়্যেবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর অর্থ বুঝে না। অর্থ না বুঝার কারণে তারা এর মর্মার্থের বিপরীত কর্মকাণ্ডে যেমন পীর, কবর ও মাযার পূজায় লিপ্ত হয়।
📄 ১৮. সৎ লোকদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করাই বনী আদমের কুফরীতে লিপ্ত হওয়ার এবং তাদের সঠিক দ্বীন বর্জন করার কারণ
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ
“হে আহলে কিতাব, তোমরা তোমাদের দীনের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করো না”। (সূরা আন নিসা: ১৭১)
ছহীহ বুখারীতে ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا
“কাফিররা বলল: ‘তোমরা নিজেদের মা‘বূদগুলোকে পরিত্যাগ করো না। বিশেষ করে ‘ওয়াদ’, ‘সুআ’, ‘ইয়াগূছ’ ‘ইয়াঊক’ এবং ‘নসর’কে কখনো পরিত্যাগ করো না। (সূরা নূহ: ২৩) -এর ব্যাখ্যায় বলেন, এগুলো হচ্ছে নূহ আ. -এর গোত্রের কতিপয় সৎ ব্যক্তির নাম। তারা যখন মৃত্যুবরণ করল, তখন শয়তান তাদের কওমকে বুঝিয়ে বলল, যেসব জায়গায় তাদের মজলিস বসত সেসব জায়গাতে তাদের মূর্তি স্থাপন করো এবং তাদের সম্মানার্থে তাদের নামেই মূর্তিগুলোর নামকরণ করো। তখন তারা তাই করল। তাদের জীবদ্দশায় মূর্তিগুলোর পূজা করা হয়নি ঠিকই; কিন্তু মূর্তি স্থাপনকারীরা যখন মৃত্যুবরণ করল এবং পরবর্তীতে আগমনকারী লোকেরা মূর্তি স্থাপনের ইতিহাস ভুলে গেল, তখনই মূর্তিগুলোর ইবাদত শুরু হল।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন, একাধিক আলেম বলেছেন, ‘যখন সৎ ব্যক্তিগণ মৃত্যুবরণ করলেন, তখন তাদের গোত্রের লোকেরা তাদের কবরের উপর অবস্থান করা শুরু করল। এরপর তারা তাদের প্রতিকৃতি তৈরী করল। এভাবে বহুদিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর তারা তাদের ইবাদতে লেগে গেল।
উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
«لَا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، إِنَّمَا أَنَا عَبْدٌ، فَقُولُوا: عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ»
“তোমরা আমার মাত্রতিরিক্ত প্রশংসা করো না। যেমন প্রশংসা করেছিল খ্রীস্টানরা মারইয়াম তনয় ঈসা আ. এর। আমি আল্লাহ তা‘আলার বান্দা মাত্র। তাই তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা এবং তাঁরই রাসূল বলবে”।
রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো ইরশাদ করেছেন,
«إِيَّاكُمْ وَالْغُلُوَّ، فَإِنَّمَا أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ الْغُلُوُّ»
“তোমরা দীনের ব্যাপারে غلو) লূ) তথা বাড়াবাড়ি ও সীমা অতিক্রম করা থেকে সাবধান থাকো। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো দীনের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করার ফলেই ধ্বংস হয়েছে”।
ছহীহ মুসলিমে (হা/২৬৭০) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত এক হাদীছে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
هَلَكَ الْمُتَنَطِّعُونَ ثَلَاثًا
“দীনের ব্যাপারে সীমা লংঘনকারীরা ধ্বংস হয়েছে।” এ কথা তিনি তিনবার বলেছেন।
উদাহরণসহ নিম্নে আলোচনা করা হলো :
১. আক্বীদার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা বলতে যা বুঝায় : কালামপন্থীরা (ধর্মতাত্ত্বিক) আল্লাহর গুণাবলী প্রমাণ করতে বড় বড় কথা বলে। আল্লাহর গুণাবলী প্রমাণ করতে তারা বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং গভীর চিন্তা-ভাবনা করে। এভাবে তারা নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হয়। অবশেষে তাদের এ গভীর চিন্তা-চেতনা তাদেরকে দু’টি বিষয়ের কোন একটির দিকে পৌঁছিয়ে দেয়, তা হচ্ছে:
১. التمثيل) সাদৃশ্য স্থাপন করা)
২. التعطيل সিফাত-গুণহীন মনে করা। কেননা তারা আল্লাহর সৃষ্টির সাথে তার সাদৃশ্য স্থাপন করে বলে, এটাই হচ্ছে আল্লাহর সিফাত-গুণাবলী প্রমাণ করার অর্থ। এভাবে তারা আল্লাহর সিফাত প্রমাণ করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করে এমনকি আল্লাহ নিজের জন্য যা কিছু প্রত্যাখ্যান করেছেন তারা তা সাব্যস্ত করে। অথবা তারা আল্লাহকে গুণহীন মনে করে বলে যে, এটাই হলো সৃষ্টির সাদৃশ্য হওয়া থেকে তাকে পবিত্র মনে করার অর্থ।
তারা ধারণা করে যে, আল্লাহর সিফাত-গুণ সাব্যস্ত করলে তার সাথে (সৃষ্টির) সাদৃশ্য স্থাপন করা হয়। তাই আল্লাহ যেসব গুণাবলী নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন তারা তা প্রত্যাখ্যান করে।
তবে মধ্যমপন্থী উম্মত এ ব্যাপারে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। আল্লাহর গুণাবলী সাব্যস্তকরণ, তা প্রত্যাখ্যান করা এবং তাকে পবিত্র মনে করার ব্যাপারে তারা গভীর চিন্তা-ভাবনায় মগ্ন থাকে না। বরং শব্দগত বাহ্যিক অর্থই তারা গ্রহণ করে বলে এসব ব্যাপারে অতিরিক্ত কোন কিছু চিন্তা করা আমাদের জন্য শোভনীয় নয়। ফলে তারা পথভ্রষ্ট হয় না। বরং তারা সঠিক পথে অবিচল থাকে।
পারসিক ও রোমক এবং অন্যান্যরা দ্বীন ইসলামে প্রবেশ করে এসব বিষয়ে গভীর চিন্তা ভাবনা, তর্ক-বিতর্ক এবং প্রতিযোগিতা করতে শুরু করে যা শেষ হচ্ছে না। অবশেষে তারা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। আমরা আল্লাহর নিকট এ থেকে নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি। উম্মতের পরবর্তীগণ (نص (নছ-মূল বিধানের উপর ভিত্তি করে এমন সববিষয় উদ্ভাবন করেছে, যা ছাহাবীগণ উদ্ভাবন করেননি। অথচ তারা ছিলেন মধ্যমপন্থী উম্মত।
২. ইবাদতের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করার অর্থ : ইবাদতের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা বলতে কঠোরতা আরোপ করা।
যেমন ইবাদতের কোন অংশ ছুটে যাওয়াকে কুফরী ও ইসলাম থেকে বহিষ্কার মনে করা। এরূপ খারেযী ও মু‘তাযিলা সম্প্রদায় বাড়াবাড়ি করত: বলে, যে ব্যক্তি কাবীরাহ গুনাহ হতে কোন একটি গুনাহ করে, সে ইসলাম হতে বের হয়ে যায়, তাকে হত্যা করা ও তার সম্পদ হরণ বৈধ। আর নেতার বিরোধীতা করা ও রক্তপাত ঘটানোকেও তারা বৈধ মনে করে।
এরূপই মু‘তাযিলা সম্প্রদায় বলে, যে ব্যক্তি কাবীরাহ গুনাহ করে সে ঈমান ও কুফরী উভয়ের মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকে। আর এটাই কঠোরতা যা মানুষকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে।
অপরদিকে এরূপ কঠোরতাকে মুরজিয়ারা সহজভাবে গ্রহণ করে বলে, মানুষ হত্যা, যিনা ব্যভিচার, চুরি, মদ্যপান এ জাতীয় কাবীরাহ গুনাহ মানুষকে ঈমানহীন করে না। এসবের দ্বারা ঈমানের কোন অংশের কমতিও হয় না। ঈমানের জন্য কেবল স্বীকৃতিই যথেষ্ট। আর কাবীরাহ গুনাহকারীর ঈমান জিবরাঈল আলাইহিস সালাম ও রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মতই। কেননা, ঈমানগত বিষয়ে মানুষের মাঝে কোন তারতম্য নেই (সকলের ঈমান সমান)। এমনকি তারা বলে, ইবলীসও মু’মিন কারণ সে আল্লাহকে স্বীকার করে। যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ তা‘আলা তাকে (ইবলীসকে) কাফের আখ্যা দিয়েছেন? তখন জবাবে তারা বলে, তার স্বীকারোক্তি সত্য নয় বরং সে মিথ্যাবাদী। আজকাল ঐসব (মুরজিয়ারা) বাস্তবে অনেক মানুষকে সংশোধন করতে চায়। আর এসব ব্যাপারে সহজ করাকে উৎকৃষ্ট মনে করে।
অপরদিকে প্রথম দল (খারেযী ও মু‘তাযিলা সম্প্রদায়) এসব ব্যাপারে কঠোরতা আরোপ করাকেই উৎকৃষ্ট মনে করে।
আর আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মত হচ্ছে ঈমান বৃদ্ধি পায় ও কমে। পাপাচারীর ঈমান তার পাপ অনুযায়ী কমে। ঈমান থেকে সে বহিষ্কার হবে না। যতক্ষণ না কুফরীর ব্যাপারে স্পষ্ট দলীল প্রমাণ না পাওয়া যায়।
৩. المعاملات) লেনদেনের) ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করার অর্থ:
কোন বিষয়ের সবকিছু হারাম মনে করে কঠোরতা আরোপ করা এমনকি যদিও তা কোন কিছুর माध्यम হয়ে থাকে। মানুষের জাগতিক জীবনে আবশ্যকীয় প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন কিছু করা জায়েয নয়।
যারা সূফীবাদী তারাই এ পন্থা গ্রহণ করেছে। যেমন তারা বলে, যে ব্যক্তি দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকে সে পরকাল কামনা করে না। আরো বলে, তোমার জরুরী প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন কিছু ক্রয় করা জায়েয নয়। এধরনের আরো অনেক কথা তারা বলে।
এ কঠোরতা অবলম্বনকারীর বিপরীতে শিথিলপন্থীরা বলে, সকল কিছু হালাল হওয়ার কারণে সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক দিক শক্তিশালী হয়। এমনকি সূদ খাওয়া ও প্রতারণা করাকেও তারা বৈধ মনে করে। নাউযুবিল্লাহ। তারাই শিথিলতাকে উৎকৃষ্ট মনে করে ব্যবসায়ী পণ্যের দাম ও গুণাগুণ বর্ণনার ক্ষেত্রে এসব লোককে মিথ্যা বলতে দেখা যায়। সব ক্ষেত্রেই (দুনিয়াবী স্বার্থে) দু’এক টাকা উপার্জনের জন্য তারা মিথ্যা কথা বলে থাকে। নিঃসন্দেহে এটাই হচ্ছে শিথিলতাকে উৎকৃষ্ট মনে করা।
আর এক্ষেত্রে মধ্যপন্থা হচ্ছে দলীল-প্রমাণ ও যুক্তি সাপেক্ষে সবধরনের লেনদেন ক্রয়-বিক্রয় বৈধ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আল্লাহ তা‘আলা ব্যবসাকে বৈধ করেছেন এবং সূদকে হারাম করেছেন। (সূরা আল-বাক্বারা ২:২৭৫)।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়
১) যে ব্যক্তি এ অধ্যায়সহ পরবর্তী দু’টি অধ্যায় বুঝতে সক্ষম হবে, ইসলামের সঠিক শিক্ষা সম্পর্কে মানুষ কতটুকু অজ্ঞ, তার কাছে তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। সে সাথে আল্লাহ তা‘আলার কুদরত এবং মানুষের অন্তর পরিবর্তন হওয়ার ক্ষেত্রে এমন আশ্চর্যজনক বস্তু দেখতে পাবে, যা মানুষের বিবেককে হার মানায়।
২) এ কথা জানা গেল যে, সৎ ব্যক্তিদেরকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কারণেই পৃথিবীতে সর্বপ্রথম শিরকের উৎপত্তি হয়েছে।
৩) যে বিষয়ের মাধ্যমে নাবীগণের দ্বীনে সর্বপ্রথম পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল, তাও জানা গেল। এর কারণ সম্পর্কে জ্ঞান লাভের সাথে সাথে এ কথাও জেনে নেয়া যে, আল্লাহ তা‘আলাই নাবীদেরকে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য পাঠিয়েছেন।
৪) ‘শরী‘আতে ইলাহী’ এবং অপরিবর্তিত স্বভাব’ ‘বিদ‘আতকে’ প্রত্যাখ্যান করা সত্ত্বেও লোকদের মধ্যে বিদ‘আতকেই কবুল করে নেয়ার প্রবণতা রয়েছে।
৫) উপরোক্ত সকল গোমরাহীর কারণ হচ্ছে, হকের সাথে বাতিলের সংমিশ্রণ। সৎ লোকদেরকে মাত্রতিরিক্ত ভালবাসার মাধ্যমেই এর সূচনা হয়। অতঃপর কতিপয় আহলে ইলম তথা জ্ঞানী ও দীনদার ব্যক্তি সৎ নিয়্যাতে কিছু কাজ করেন। পরবর্তীতে লোকেরা মনে করে উক্ত কাজে আলেম ও সৎ লোকদের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। অর্থাৎ প্রথমে সৎ লোকদের মূর্তি ও ছবি এ নিয়্যাতে বানানো হয় যে, তাদের ছবি দেখলে আল্লাহর ইবাদতে আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু পরবর্তীতে আগমনকারী লোকেরা মনে করে তাদের পূর্ব পুরুষগণ এ মূর্তিগুলোর উসীলা দিয়ে আল্লাহর ইবাদত করত অথবা মনে করত এরাই মা‘বূদ কিংবা আল্লাহর শরীক কিংবা আল্লাহর দরবারে সুপারিশকারী। সুতরাং এরা মানুষের ইবাদত পাওয়ার হকদার।
৬) সূরা নূহের ২৩ নং আয়াতের তাফসীর।
৭) মানুষের প্রকৃত অবস্থা এই যে, তাদের অন্তর হকের প্রতি খুব কমই আগ্রহী থাকে এবং তারা দিন দিন হক থেকে পিছিয়ে যায়। সে তুলনায় বাতিলের প্রতি তাদের অন্তর ক্রমান্বয়ে বেশী অগ্রসর হয়।
৮) এ অধ্যায়ে সালফে ছলেহীন থেকে বর্ণিত উক্তির দলীল পাওয়া যায়। তা হচ্ছে বিদ‘আত কুফরীর কারণ।
৯) বিদ‘আতের পরিণতি কত ভয়াবহ, -শয়তান ভাল করেই তা জানে। যদিও বিদ‘আতকারীর নিয়্যাত ভাল হয়। এ জন্যই শয়তান আমলকারীকে বিদ‘আতের দিকে নিয়ে যায়
১০) “দীনের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করা নিষেধ” এ সাধারণ নীতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা এবং সীমা লংঘনের পরিণতি সম্পর্কে ভালভাবে জ্ঞান লাভ করা জরুরী।
১১) সৎ কাজের নিয়্যাতে কবরের পাশে অবস্থান করার ক্ষতি সম্পর্কে অবগত হওয়া গেল।
১২) মূর্তি বানানো বা স্থাপনের নিষেধাজ্ঞা এবং তা অপসারণের হিকমত সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা।
১৩) শিরক কাকে বলে তা বুঝতে হলে নূহ আ. এর জাতির সৎ লোকদের ঘটনা জানা জরুরী। এ ঘটনা জানার অপরিসীম গুরুত্ব থাকার পরও লোকেরা এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ বে-खबर।
১৪) সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, বিদ‘আতীরা তাফসীর ও হাদীছের কিতাবগুলোতে ঐ ঘটনা পড়ছে এবং তার অর্থও ভালভাবে বুঝতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাদের অন্তরের উপর পর্দা ঢেলে দেয়ার কারণে তারা বিশ্বাস করে যে, নূহ আ. এর কওমের লোকদের কাজই ছিল শ্রেষ্ঠ ইবাদত। তারা আরো বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ ও তার রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিষেধ করেছিলেন সেটা ছিল, কেবল এমন কুফরী, যার ফলে জান-মাল বৈধ হয়ে যায়। অর্থাৎ তাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া যায়।
১৫) এটা সুস্পষ্ট যে, ‘নূহ’ আ. এর জাতির লোকেরা তাদের কাজ দ্বারা সুপারিশ ছাড়া আর কিছুই চায়নি।
১৬) তো ছাওয়াবের কাজ মনে করে করা হয়। তাই এতে পাপের অনুভূতি থাকে না। তাই তাওবারও প্রয়োজন অনুভূত হয় না।
১৭) তাদের ভুল ধারণা এটাই ছিল, যেসব পন্ডিত সৎ লোকদের ছবি বা মূর্তি তৈরী করেছিল, তারাও শাফা‘আত লাভের আশা পোষণ করত।
১৮) নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্পষ্ট ভাষায় দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। তার নিম্নোক্ত বাণীর মধ্যে এই কথার প্রমাণ মিলে। তিনি বলেছেন: “তোমরা আমার মাত্রতিরিক্ত প্রশংসা করো না যেমন খ্রীস্টানরা মারইয়াম তনয়ের মাত্রতিরিক্ত প্রশংসা করত।” সে নাবীর প্রতি আল্লাহর পক্ষ হতে দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক, যিনি সুস্পষ্ট করে সত্যের দাওয়াত মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছেন।
১৯) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপদেশ দিয়েছেন যে, দীনের ব্যাপারে সীমা লংঘনকারীদের ধ্বংস অনিবার্য।
২০) ‘নূহ’ (আঃ) -এর জাতির ঘটনার মধ্যে এ কথা সুস্পষ্ট যে, ইলমে দীন উঠে যাওয়ার পূর্বে এবং জ্ঞানীদের মৃত্যুবরণ করার পূর্বে সৎ লোকদের ছবি বা মূর্তিগুলোর পূজার সূচনা হয়নি। এর দ্বারা ইলমে দীন থাকার মর্যাদা আর না থাকার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জানা গেল।
২১) আরো জানা গেল যে, আলিমগণের মৃত্যুবরণের মাধ্যমেই ইলমে দীন উঠে যায়।
২২) কবরের পাশে আল্লাহর ইবাদত করার ব্যাপারে যেখানে কঠোর শাস্তির ঘোষণা রয়েছে, সেখানে ঐ সৎ লোকের উদ্দেশে ইবাদতকারীর ব্যাপারে কী বিধান আসতে পারে?
টিকাঃ
৭৪. কওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ: আল্লাহ তা‘আলা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন কেননা, বাড়াবাড়ির কারণে বিভিন্ন রকম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ:
১. যাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয়েছে তা প্রশংসনীয় হলে তার মর্যাদা উন্নত হবে। আর নিন্দনীয় হলে মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে।
২. যাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয়, তার ইবাদত করার প্রতি মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়, যা সীমালঙ্ঘনকারীদের মাধ্যমে ঘটে।
৩. এ বাড়াবাড়ি আল্লাহকে সম্মান প্রদর্শনে বাধা দান করে। কেননা, মানুষ হক-সত্য অথবা বাতিল-মিথ্যার সাথে নিয়োজিত হয়। তাই সৃষ্টির অতিশয় প্রশংসা ও সম্মান নিয়ে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হলে মানুষ এর সাথেই সম্পৃক্ত থাকে এবং আল্লাহ যা ওয়াজিব করেছেন তা ভুলে যায়।
৪. উপস্থিত ব্যক্তিকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হলে ঐ ব্যক্তি অহংবোধে মেতে উঠে এবং নিজেকে সম্মানিত মনে করে বিস্ময় প্রকাশ করে। আর প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করা হলে তা ব্যক্তির জন্য ক্ষতিকর। ফলে অতিশয় প্রশংসা ও অধিক নিন্দায় শত্রুতা, বিদ্বেষ, সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি অনিবার্য হয়।
৭৫. ছহীহ বুখারী হা/৪৯২০।
৭৬. ছহীহ বুখারী হা/৩৪৪৩।
৭৭. ছহীহ: ইবনে মাজাহ হা/৩০২৯।
৭৮. কওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ: এ হাদীছে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উম্মতকে সীমালঙ্ঘন করা হতে সাবধান করেছেন এবং তিনি প্রমাণ পেশ করেছেন যে, বাড়াবাড়ি করা ধ্বংসের কারণ। কেননা তা শরী‘আত বিরোধী ( مخالف (বিষয়। আর পূর্ববর্তী উম্মতগণ এ কারণেই ধ্বংস হয়েছে। সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা হতে জানা গেল বাড়াবাড়ি দু’টি কারণে হারাম :
প্রথম : (বাড়াবাড়ি সম্পর্কে) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সতর্কীকরণ। কোন বিষয়ে সতর্ক করা তা নিষিদ্ধ বুঝায়।
দ্বিতীয় : সীমালঙ্ঘন জাতির ধ্বংসের কারণ। যেমন পূর্ববর্তী উম্মতগণ এ কারণে ধ্বংস হয়েছে। আর যার কারণে মানুষ ধ্বংস হয় তা হারাম।
ইবাদত করার দিক থেকে মানুষের শ্রেণী বিভাগ:
ইবাদতের দিক থেকে মানুষ দু’শ্রেণীতে বিভক্ত। আরো একটি শ্রেণী হচ্ছে মধ্যমপন্থী।
(ক) তাদের মাঝে কতিপয় চরম সীমালঙ্ঘনকারী।
(খ) কতিপয় শিথিলপন্থী। এবং কতক রয়েছে মধ্যমপন্থী।
আর উভয়ের মাঝে মধ্যপন্থা হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন। যারা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে তারা এটা বাদ দিয়ে কোন দিকেই ধাবিত হয় না। তাই মধ্যম পন্থাই ওয়াজিব। সুতরাং দ্বীনের ব্যাপারে কঠোরতা, অতিরঞ্জন, শিথিলতা প্রদর্শন এবং মনোযোগী না হওয়া জায়েয নয়। বরং উভয় অবস্থায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে।
আর সীমালঙ্ঘনের রয়েছে বিভিন্ন প্রকার। তন্মধ্যে কয়েকটি হলো :
১. আক্বীদায় সীমালঙ্ঘন করা।
২. ইবাদতে সীমালঙ্ঘন করা।
৩. লেনদেনে সীমালঙ্ঘন করা।
৭৯. কওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ: পৃথিবীতে সংঘটিত প্রথম শিরকের পরিচয় ও সংগঠনের কারণ: তা হলো, নূহ আলাইহিস সালাম এর সম্প্রদায় যে সবমূর্তি পূজা করতো, তা ছিল নেককারলোকদের মূর্তি। তাদেরকে নিয়ে বাড়াবাড়ি সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের ইবাদত করতো। তাই সৎলোকদের নিয়ে বাড়াবাড়ির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়।
৮০. কওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ: সর্বপ্রথম যার মাধ্যমে নাবীগণের দ্বীনের পরিবর্তন ঘটে তা হচ্ছে শিরক। আর সৎলোকদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করাই ছিল এর মূল কারণ।
৮১. উপরোক্ত সকল গোমরাহীর কারণ হচ্ছে হকের সাথে বাতিলের সংমিশ্রণ, আর লেখক এখানে উল্লেখ করতে চান, যে, হকের সাথে বাতিলের সংমিশ্রণ হয়ে থাকে দু’টি কারণে :
প্রথম কারণ : নেকলোকদের প্রতি (মাত্রতিরিক্ত) ভালবাসা। এ জন্য নেক লোকদের প্রতি ভালবাসার নিদর্শন স্বরূপ মানুষ তাদের প্রতিমূর্তি তৈরী করে। আর বুযুর্গদের সাথে সাক্ষাৎ লাভ করতে উৎসাহী হয়।
দ্বিতীয় কারণ : কতিপয় জ্ঞানী ধার্মিক ঐ অতিরিক্ত ভালবাসার মাধ্যমে কল্যাণ লাভের ইচ্ছা করে। আর মানুষ ঐসব নেকলোকদের ইবাদতে আগ্রহী হয়। কিন্তু তাদের পর তারা মূলত অকল্যাণই করে এ আলোচনা হতে বুঝতে হবে যে, যারা দ্বীনকে বিদ‘আতের মাধ্যমে শক্তিশালী করতে চায়, তার উপকারের চেয়ে মারাত্মক ক্ষতি সাধন হয়। উদাহরণ স্বরূপ যারা রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করে, তার জন্মদিন পালন করত এর মাধ্যমে কল্যাণের ইচ্ছা করে। এ বিদ‘আতী কর্মের মাধ্যমে তারা কল্যাণ লাভের ইচ্ছা করলেও উপকারের চেয়ে মারাত্মক ক্ষতি সাধন হয়। কেননা, তা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শরী‘আতহীন কর্মে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। অতঃপর বছরের অবশিষ্ট দিন গুলোতে (বিদ‘আতীদের মাঝে) শরী‘আতহীন শৈথিল্যতা দেখা যায়। এজন্য যারা এসব বিদ‘আতী কর্মের মাধ্যমে সীমালঙ্ঘন করে, তারা স্পষ্ট শরী‘আত সম্মত কাজে শৈথিল্যতা প্রদর্শন করে থাকে। তারা অন্যদের (ধার্মিকদের) মত উদ্যমী নয়।
৮২. তা ছাড়া ইবলীস অন্যান্য পাপের চেয়ে বিদ‘আতকেই বেশী পছন্দ করে। কারণ পাপ থেকে তাওবা করা সহজ হলেও বিদ‘আত থেকে তাওবা করা সহজ নয়। কারণ বিদ‘আত তো ছাওয়াবের কাজ মনে করে করা হয়। তাই এতে পাপের অনুভূতি থাকে না। তাই তাওবারও প্রয়োজন অনুভূত হয় না।
৮৩. কবরকে আঁকড়ে ধরার ক্ষতি হচ্ছে, তা কবরপূজার দিকে ধাবিত করে। এ বিষয়ে একটি উদাহরণ হলো : কোন সৎলোকের কবরের নিকটে কুরআন তিলাওয়াত কিংবা দান-ছদাক্বাহ করে যদি কেউ এ বিশ্বাস পোষণ করে যে, এসবের কারণেই কারো মঙ্গল হয় তাহলে এটা বিদ‘আত বলে গণ্য হবে। যা কখনো কখনো বিদ‘আতীকে কবরপূজার দিকে আকৃষ্ট করে।