📄 ১৪. অক্ষমকে আহবান করা শিরক
আল্লাহ তা‘আলার বাণী,
أَيُشْرِكُونَ مَا لَا يَخْلُقُ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ وَلَا يَسْتَطِيعُونَ لَهُمْ نَصْرًا وَلَا أَنفُسَهُمْ يَنصُرُونَ
“তারা কি আল্লাহর সাথে এমন সব বস্তুকে শরীক করে, যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না? বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট হয়। আর তারা না তাদেরকে কোন রকম সাহায্য করতে পারে, না নিজেদের সাহায্য করতে পারে”। (সূরা আ‘রাফ: ১৯১-১৯২)
আল্লাহ তা‘আলা নিম্নের বাণী দ্বারা আয়াতগুলোর সূচনা করেছেন,
ذَٰلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ ۚ وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِن قِطْمِيرٍ (١٣) إِن تَدْعُوهُمْ لَا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُونَ بِشِرْكِكُمْ ۚ وَلَا يُنَبِّئُكَ مِثْلُ خَبِيرٍ
“তিনিই আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক। রাজত্ব তাঁরই। তাঁর পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে ডাক, তারা খেজুরের আঁটির উপর যে পাতলা আবরণ থাকে তারও অধিকারী নয়। তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের সে ডাক শুনে না। শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেয় না। ক্বিয়ামতের দিন তারা তোমাদের শিরক অস্বীকার করবে। আর আল্লাহর ন্যায় তোমাকে কেউ অবহিত করতে পারবে না”। (সূরা ফাতির: ১৩-১৪)
ছহীহ মুসলিমে আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
شُجَّ النَّبِيُّ - صلى الله عليه وسلم - يَوْمَ أُحُدٍ، وَكُسِرَتْ رَبَاعِيَتُهُ، فَقَالَ: «كَيْفَ يُفْلِحُ قَوْمٌ شَجُّوا نَبِيَّهُمْ؟ » فَنَزَلَتْ: {لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ} [آل عمران: ١٢٨]
উহুদ যুদ্ধে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আঘাত প্রাপ্ত হলেন এবং তার সামনের দাঁত ভেঙ্গে গেল। তখন নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুঃখ করে বললেন: সে জাতি কেমন করে সাফল্য লাভ করবে, যারা তাদের নাবীকেই আহত করে। তখন {لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ} এই আয়াত নাযিল হল। যার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর এ ফায়ছালার ব্যাপারে তোমার কোন হাত নেই”।
ছহীহ বুখারীতে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত হয়েছে,
أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - يَقُولُ إِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوعِ فِي الرَّكْعَةِ الْآخِرَةِ مِنَ الْفَجْرِ: «اللَّهُمَّ الْعَنْ فُلَانًا وَفُلَانًا، بَعْدَمَا يَقُولُ سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ، رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ، فَأَنْزَلَ اللَّهُ: {لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ}، وَفِي رِوَايَةٍ: يَدْعُو عَلَى صَفْوَانَ بْنِ أُمَيَّةَ، وَسُهَيْلِ بْنِ عَمْرٍو، وَالْحَارِثِ بْنِ هِشَامٍ، فَنَزَلَتْ: {لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ}
তিনি নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে ফযরের ছালাতের শেষ রুকু হতে মাথা উঠিয়ে سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ، رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ বলার পর এ কথা বলতে শুনেছেন «اللَّهُمَّ الْعَنْ فُلَانًا وَفُلَانًا» “হে আল্লাহ! তুমি অমুক, অমুক ব্যক্তির উপর তোমার লা’নত নাযিল কর”। তখন এ আয়াত নাযিল হয়, {لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ} “এ বিষয়ে তোমার কোন এখতিয়ার নেই।” আরেক বর্ণনায় আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সাফওয়ান ইবনে উমাইয়্যা এবং সুহাইল বিন আমর এবং হারিছ বিন হিশামের উপর বদ দু‘আ করেন, তখন এ আয়াত {لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ} নাযিল হয়েছে।
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর যখন وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ নাযিল হল, তখন তিনি বললেন,
«يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ، أَوْ كَلِمَةً نَحْوَهَا، اشْتَرُوا أَنْفُسَكُمْ، لَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا، يَا عَبَّاسُ بْنَ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ، لَا أُغْنِي عَنْكَ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا، يَا صَفِيَّةُ عَمَّةَ رَسُولِ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - لَا أُغْنِي عَنْكِ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا، وَيَا فَاطِمَةُ بِنْتَ مُحَمَّدٍ، سَلِينِي مِنْ مَالِي مَا شِئْتِ، لَا أُغْنِي عَنْكِ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا»
“হে কুরাইশ বংশের লোকেরা! অথবা এরূপ অন্য কোনো কথা বলেন। তোমরা তোমাদের জীবনকে খরিদ করে নাও। আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার ব্যাপারে আমি তোমাদের কোনো উপকার করতে পারবো না। হে আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব! আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার ব্যাপারে আমি আপনার জন্য কোন উপকার করতে সক্ষম নই। হে আল্লাহর রাসূলের ফুফু সাফিয়্যাহ! আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার ব্যাপারে আমি আপনার কোন উপকার করতে সক্ষম নই। হে মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমা, আমার সম্পদ থেকে যা খুশী চাও। কিন্তু আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার ব্যাপারে তোমার কোনো উপকার করার ক্ষমতা আমার নেই”।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) এ অধ্যায়ে উল্লেখিত দু’টি আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) উহুদ যুদ্ধের কাহিনী জানা গেল।
৩) ছালাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন এর “দু‘আয় কুনূত” পাঠ করা এবং ছাহাবায়ে কেরামের আমীন বলার কথা জানা গেল।
৪) যাদের উপর বদ দু‘আ করা হয়েছে তারা ছিল কাফির।
৫) মক্কার কাফিররা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে এমন আচরণ করেছিল, যা অতীতের অধিকাংশ কাফিররাই তাদের নাবীদের সাথে করেনি। যেমন তারা তাদের নাবীকে আঘাত করেছিল, তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল এবং একই বংশের লোক হওয়া সত্ত্বেও তারা উহুদ যুদ্ধের শহীদদেরকে বিকলাঙ্গ করেছিল অর্থাৎ হাত-পা, নাক-কান ইত্যাদি কেটে ফেলেছিল।
৬) উপরোক্ত মুছীবত আপতিত হওয়ার পর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর আল্লাহর বাণী: ﴾لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ﴿ “এ বিষয়ে তোমার কিছুই করার নেই”, -এই আয়াতাংশটি নাযিল হয়।
৭) অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা এই বাণী নাযিল করলেন: ﴾أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ﴿ অথবা ইচ্ছা করলে তিনি তাদেরকে তাওবা করার তাওফীক দিবেন, ফলে তারা তাওবা করবে অথবা তাদেরকে শাস্তি দিবেন। এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর অনুগ্রহ করলেন। তারা তাওবা করল। আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করলেন, আর তারাও আল্লাহর উপর ঈমান আনল।
৮) বালা-মুছীবতের সময় দু‘আ-কুনূত পড়া।
৯) যাদের উপর বদ দু‘আ করা হয়, ছালাতে মধ্যে তাদের নাম এবং তাদের পিতার নাম উল্লেখ করে বদ দু‘আ করা বৈধ।
১০) “কুনূতে নাযেলায়” নির্দিষ্ট করে লা’নত করা।
১১) নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর যখন
﴾وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ﴿
অর্থাৎ তোমার নিকট আত্মীয়দেরকে সতর্ক করো- এ আয়াত নাযিল হল, তখন তিনি তার আত্মীয় স্বজনদের মধ্য হতে একজন একজন করে ডেকে সতর্ক করেছেন।
১২) তাওহীদের দাওয়াত প্রচারের ক্ষেত্রে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। এতে তাকে পাগল বলা হয়েছে। এমনি বর্তমানেও কেউ যদি তাওহীদের দাওয়াত দেয়, তার সাথেও একই আচরণ করা হবে।
১৩) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দূরবর্তী এবং নিকটাত্মীয়-স্বজনদের ব্যাপারে বলেছেন,
لَا أُغْنِي عَنْكَ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا
টিকাঃ
৬২. যাদেরকে আহবান করা হচ্ছে, তারা নিজেরাই যেহেতু নিজেদের সাহায্য করতে পারে না, তাই অন্যদেরকে সাহায্য করার প্রশ্নই আসে না। সুতরাং প্রমাণিত হল যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্যদের কাছে মুশরিকদের সাহায্য কামনা করা সম্পূর্ণ বাতিল। যাদেরকে মুশরিকরা সাহায্যের জন্য আহবান করছে, তারা তো আল্লাহর বান্দা ও অনুগত গোলাম, তিনি তাদেরকে তাঁর ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। আর বান্দা কখনই মা‘বূদ হতে পারে না।
যাদেরকে আল্লাহর শরীক মনে করা হচ্ছে, তারা নিজেরাই নিজেদের কল্যাণ ও সাহায্য করতে সক্ষম নয়। সুতরাং অন্যদেরকে তারা সাহায্য করতে পারবে! কিভাবে এ আশা করা যেতে পারে?
৬৩. ছহীহ মুসলিম হা/১৭৯১।
৬৪. ছহীহ বুখারী হা/ ৪০৬৯, মুসলিম হা/১৭৯১।
৬৫. ছহীহ বুখারী হা/২৭৫৩, মুসলিম হা/২০৬।
৬৬. নির্দিষ্টভাবে কারো উপর লা’নত করতে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা করতে নিষেধ করেছেন। ক্বওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ, শাইখ ছালিহ আল উছাইমীন।
📄 ১৫. ফেরেশতাদের প্রতি আল্লাহর অহি অবতীর্ণের ভীতি
আল্লাহ তা‘আলার বাণী,
حَتَّىٰ إِذَا فُزِّعَ عَن قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ ۖ قَالُوا الْحَقَّ ۖ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ
“যখন তাদের মন থেকে ভয়-ভীতি দূর হয়ে যায়, তখন তারা পরস্পর বলাবলি করে, তোমাদের প্রতিপালক কি বললেন? তারা বলে, তিনি সত্য বলেছেন এবং তিনিই সবার উচ্চে ও সর্বমহান। (সূরা সাবা: ২৩)
ছহীহ বুখারীতে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«إِذَا قَضَى اللَّهُ الْأَمْرَ فِي السَّمَاءِ ضَرَبَتِ الْمَلَائِكَةُ بِأَجْنِحَتِهَا خُضْعَانًا لِقَوْلِهِ، كَأَنَّهُ سِلْسِلَةٌ عَلَى صَفْوَانٍ، يَنْفُذُهُمْ ذَلِكَ {حَتَّى إِذَا فُزِّعَ عَنْ قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا الْحَقَّ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ}، فَيَسْمَعُهَا مُسْتَرِقُ السَّمْعِ، وَمُسْتَرِقُ السَّمْعِ هَكَذَا بَعْضُهُ فَوْقَ بَعْضٍ، (وَوَصَفَهُ سُفْيَانُ بِكَفِّهِ، فَحَرَّفَهَا وَبَدَّدَ بَيْنَ أَصَابِعِهِ)، فَيَسْمَعُ الْكَلِمَةَ فَيُلْقِيهَا إِلَى مَنْ تَحْتَهُ، ثُمَّ يُلْقِيهَا الْآخَرُ إِلَى مَنْ تَحْتَهُ، حَتَّى يُلْقِيَهَا عَلَى لِسَانِ السَّاحِرِ أَوِ الْكَاهِنِ، فَرُبَّمَا أَدْرَكَهُ الشِّهَابُ قَبْلَ أَنْ يُلْقِيَهَا، وَرُبَّمَا أَلْقَاهَا قَبْلَ أَنْ يُدْرِكَهُ، فَيَكْذِبُ مَعَهَا مِئَةَ كَذْبَةٍ، فَيُقَالُ: أَلَيْسَ قَدْ قَالَ لَنَا يَوْمَ كَذَا وَكَذَا كَذَا وَكَذَا؟ فَيُصَدَّقُ بِتِلْكَ الْكَلِمَةِ الَّتِي سُمِعَتْ مِنَ السَّمَاءِ»
“যখন আল্লাহ তা‘আলা আকাশে কোনো বিষয়ের ফায়ছালা করেন, তখন তার কথার সমর্থনে বিনয়াবনত হয়ে ফেরেশতারা তাদের ডানাগুলো নাড়াতে থাকে। ডানা নাড়ানোর আওয়াজ যেন ঠিক পাথরের উপর শিকল পতিত হওয়ার আওয়াজের মতই। তাদের অবস্থা এভাবেই চলতে থাকে। যখন তাদের অন্তর থেকে ভয়-ভীতি দূর হয়ে যায়, তখন তারা বলে, তোমাদের রব তোমাদেরকে কি বলেছেন? তারা জবাবে বলে, আল্লাহ হক্কথাই বলেছেন। বস্তুত তিনিই হচ্ছেন মহান ও শ্রেষ্ঠ। এমতাবস্থায় চুরি করে কথা শ্রবণকারীরা উক্ত কথা শুনে ফেলে। আর এসব চোর এভাবে উপর নিচ হয়ে অবস্থান করতে থাকে। এ হাদীছের বর্ণনাকারী সুফিয়ান বিন উয়াইনা চুরি করে কথা শ্রবণকারীদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে হাতের তালু দ্বারা এর ধরণ বর্ণনা করেছেন এবং হাতের আঙ্গুলসমূহ ফাঁক করে তাদের অবস্থা বুঝিয়েছেন। অতঃপর চুপিসারে শ্রবণকারী কথাগুলো শুনে তার নিচের চোরের কাছে পৌঁছে দেয়। অতঃপর সে তার নিচের চোরের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত এ কথা একজন যাদুকর কিংবা গণকের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। কোন কোন সময় গণক বা যাদুকরের কাছে উক্ত কথা পৌঁছানোর পূর্বেই শ্রবণকারীর উপর অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হয়। আবার কোন কোন সময় অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হওয়ার পূর্বেই সে কথা দুনিয়াতে পৌঁছে যায়। ঐ সত্য কথাটির সাথে একশ মিথ্যা যোগ করে। অতঃপর শত মিথ্যার সাথে মিশ্রিত সত্য কথাটি যখন বাস্তবে রূপ লাভ করে তখন বলা হয়, অমুক দিন কি গণক তোমাদেরকে এই কথা বলেনি? মূলত আকাশে শ্রুত একটি সত্য কথার কারণেই গণকের একশ মিথ্যা মিশ্রিত কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করা হয়।
নাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«إِذَا أَرَادَ اللَّهُ تَعَالَى أَنْ يُوحِيَ بِالْأَمْرِ، تَكَلَّمَ بِالْوَحْيِ أَخَذَتِ السَّمَاوَاتُ مِنْهُ رَجْفَةٌ، (أَوْ قَالَ: رِعْدَةٌ شَدِيدَةٌ)، خَوْفًا مِنَ اللَّهِ - عز وجل - فَإِذَا سَمِعَ ذَلِكَ أَهْلُ السَّمَاوَاتِ صَعِقُوا وَخَرُّوا لِلَّهِ سُجَّدًا، فَيَكُونُ أَوَّلَ مَنْ يَرْفَعُ رَأْسَهُ جِبْرِيلُ، فَيُكَلِّمُهُ اللَّهُ مِنْ وَحْيِهِ بِمَا أَرَادَ، ثُمَّ يَمُرُّ جِبْرِيلُ عَلَى الْمَلَائِكَةِ، كُلَّمَا مَرَّ بِسَمَاءٍ سَأَلَهُ مَلَائِكَتُهَا: مَاذَا قَالَ رَبُّنَا يَا جِبْرِيلُ؟ فَيَقُولُ جِبْرِيلُ: قَالَ الْحَقَّ، وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ، فَيَقُولُونَ كُلُّهُمْ مِثْلَ مَا قَالَ جِبْرِيلُ، فَيَنْتَهِي جِبْرِيلُ بِالْوَحْيِ إِلَى حَيْثُ أَمَرَهُ اللَّهُ - عز وجل -» رَوَاهُ ابْنُ أَبِي حَاتِمٍ
“আল্লাহ তা‘আলা যখন কোন বিষয়ে অহী করতে চান এবং অহীর মাধ্যমে কথা বলেন তখন আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের ভয়ে সমস্ত আকাশ মন্ডলী কেঁপে উঠে অথবা বিকট আওয়াজ হয়। আকাশের ফেরেশতাগণ এ বিকট আওয়াজ শুনে বেহুঁশ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় এবং সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে সর্বপ্রথম যিনি মাথা উঠান, তিনি হচ্ছেন জিবরীল আ.। তারপর আল্লাহ তা‘আলা যা ইচ্ছা করেন অহীর মাধ্যমে জিবরীলের সাথে সে ব্যাপারে কথা বলেন। এরপর জিবরীল অন্যান্য ফেরেশতাদের পাশ দিয়ে যেতে থাকেন। জিবরীল যতবারই কোনো আকাশ অতিক্রম করেন ততবারই উক্ত আকাশের ফেরেশতারা তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘হে জিবরীল! আমাদের রব কি বলেছেন? জিবরীল উত্তরে বলেন, ‘আল্লাহ হক কথাই বলেছেন, তিনিই সুউচ্চ ও সুমহান। এ কথা শুনে তারা সবাই জিবরীল যা বলেছেন, তাই বলে। তারপর আল্লাহ তা‘আলা জিবরীলকে যেখানে অহী নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন তিনি সে দিকে চলে যান”। ইবনে আবী হাতিম।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা সাবার ২৩ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) সূরা সাবার ২৩ নং আয়াতে এমন অকাট্য দলীল রয়েছে, যা সকল প্রকার শিরককে বাতিল করে দেয়। বিশেষ করে ছলেহীন তথা সৎ লোকদেরকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত শিরক সংঘটিত হয়ে থাকে, এখানে সেই শিরককে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। এটি সেই আয়াত, যাকে অন্তর থেকে শিরক বৃক্ষের ‘শিকড় কর্তনকারী’ বলে আখ্যায়িত করা হয়।
৩) ﴾قَالُوا الْحَقَّ ۖ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ﴿ -এর তাফসীরও জানা গেল।
৪) হক্ব সম্পর্কে ফেরেশতাদের জিজ্ঞাসার কারণ।
৫) ফেরেশতাদের জিজ্ঞাসার পর জিবরীল তাদের জবাব প্রদান করেন। তিনি বলেন: আল্লাহ তা‘আলা এই এই কথা বলেছেন।
৬) সিজদারত অবস্থা থেকে সর্বপ্রথম জিবরীল কর্তৃক মাথা উঠানো।
৭) সমস্ত আকাশবাসীর উদ্দেশ্যে জিবরীলই কথা বলেন। কারণ তাঁর কাছেই তারা কথা জিজ্ঞেস করে।
৮) আল্লাহর কালাম অবতীর্ণ হওয়ার শব্দ শুনে সকল আকাশবাসীই বেহুঁশ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।
৯) আল্লাহর কালামের প্রভাবে সমস্ত আকাশ প্রকম্পিত হওয়া।
১০) জিবরীলকে আল্লাহ তা‘আলা যেখানে বা যার নিকট ওহী নিয়ে যাওয়ার আদেশ করেন, তিনি সেখানেই নিয়ে যান।
১১) শয়তানেরা চুরি করে আকাশের কথা শ্রবণ করার বিষয় উল্লেখিত হয়েছে।
১২) শয়তানদের একজন অন্যজনের উপর আরোহন করার ধরণ জানা গেল।
১৩) শয়তানদের উপর অগ্নিশিখা নিক্ষেপিত হয়।
১৪) কখনো কখনো আকাশের কথা যমীন পর্যন্ত নিয়ে আসার আগেই অগ্নিশিখা শয়তানকে জ্বালিয়ে দেয়। আবার কখনো অগ্নিশিখা তাকে ধরে ফেলার পূর্বেই শয়তান মানুষকে আকাশের কথা শুনাতে সক্ষম হয়।
১৫) কখনো কখনো গণকের কথা সত্য হয়।
১৬) গণক একটি কথা ঠিক বললেও তার সাথে শতটি মিথ্যা কথা বলে।
১৭) আকাশ থেকে একটি শ্রুত কথা সত্য হওয়ার কারণেই গণকের অন্যান্য মিথ্যা কথাকেও সত্য বলে বিশ্বাস করা হয়।
১৮) মনুষ্য প্রবৃত্তি দ্রুত বাতিল ও মিথ্যা কথা বিশ্বাস করে নেয়। গণকের একটি কথা সত্য হওয়ার কারণে বিনা বিচারে কিভাবে তারা একশটি মিথ্যা কথাকে গ্রহণ করে? সত্যিই ভাবার বিষয়!
১৯) সেই একটি সত্য কথাকে শয়তানদের একজন অন্যজনের কাছ থেকে শিখে নেয় এবং মুখস্থ করে রাখে। এরপর তারা এটির দ্বারা শত মিথ্যাকে সত্য বানানোর চেষ্টা করে।
২০) এই অধ্যায় থেকে আল্লাহর ছিফাত তথা গুণাবলী থাকার কথা জানা গেল। আশ‘আরী সম্প্রদায় আল্লাহর ছিফাত সাব্যস্ত করার বিরোধী।
২১) আল্লাহর ভয়েই আকাশ কেঁপে উঠে এবং ফেরেশতাগণ অচেতন হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।
২২) ফেরেশতারাও আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হয়।
টিকাঃ
৬৭. ছহীহ বুখারী হা/৪৮০০, অধ্যায়: আল্লাহর বাণী: যখন তাদের অন্তর থেকে ভয়-ভীতি দূর হয়।
৬৮. যঈফ: ইবনে খুযাইমা তাওহীদে ১/৩৪}$, ইবনে আবী আসিম সুন্নাতে হা/৫১৫, তাবারী এবং বায়হাকী। আল্লামা আলবানী হাদীছটিকে যঈফ বলেছেন। দেখুন: যিলালুল জান্নাত, (১/২৬৭)।
📄 ১৬. শাফা‘আত (সুপারিশ)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَأَنذِرْ بِهِ الَّذِينَ يَخَافُونَ أَن يُحْشَرُوا إِلَىٰ رَبِّهِمْ ۙ لَيْسَ لَهُم مِّن دُونِهِ وَلِيٌّ وَلَا شَفِيعٌ لَّعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ
“তুমি কুরআনের মাধ্যমে সে সব লোকদেরকে সতর্ক করো, যারা তাদের রবের সামনে উপস্থিত হওয়াকে ভয় করে। সেদিন তাদের অবস্থা এমন হবে যে, আল্লাহ ছাড়া তাদের কোনো সাহায্যকারী বন্ধু এবং কোন শাফা‘আতকারী থাকবে না, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে”। (সূরা আল আন‘আম: ৫১)
আল্লাহ তা‘আলা সূরা যুমারের ৪৪ নং আয়াতে ইরশাদ করেন,
قُل لِّلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعًا
“ বলো, সমস্ত শাফা‘আত কেবল আল্লাহরই এখতিয়ারভুক্ত”।
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِندَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ
“তার অনুমতি ব্যতীত তার দরবারে কে শাফা‘আত করতে পারে?” (সূরা আল বাকারা: ২৫৫)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
وَكَم مِّن مَّلَكٍ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِن بَعْدِ أَن يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَن يَشَاءُ وَيَرْضَىٰ
“আকাশমন্ডলে এমন অনেক ফেরেশতা রয়েছে, যাদের শাফা‘আত কোনো কাজেই আসবে না, তবে আল্লাহ নিজ ইচ্ছায় যাকে খুশী তার জন্য সুপারিশ করার অনুমতি দিলে সে কথা ভিন্ন।
ছহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«أَنَا أَوَّلُ شَافِعٍ، وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ»
“আমিই সর্বপ্রথম শাফা‘আতকারী এবং আমিই সর্বপ্রথম শাফা‘আত কবুলকৃত ব্যক্তি”।
ছহীহ মুসলিমে আরো বর্ণিত আছে যে,
«أَنَا أَوَّلُ النَّاسِ يَشْفَعُ فِي الْجَنَّةِ، وَأَنَا أَكْثَرُ الْأَنْبِيَاءِ تَبَعًا»
“জান্নাতে সর্বপ্রথম আমিই শাফা‘আতকারী, আর নবীদের মধ্যে আমার অনুসারীর সংখ্যাই হবে সর্বাধিক”।
«إِنَّ لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةً مُسْتَجَابَةً، فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ، وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا»
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক নবীর জন্য একটি বিশেষ দু’আ রয়েছে যা কবুল করা হবে। প্রত্যেক নবীই তাঁর দু’আ দুনিয়াতেই করে ফেলেছেন। কিন্তু আমি আমার দু’আ কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফা’আতের জন্য গোপন করে রেখেছি। সুতরাং আমার উম্মতের যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছু শরীক না করে মৃত্যুবরণ করবে ইনশাআল্লাহ সে তা লাভ করবে”।
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
يَوْمَئِذٍ لَّا تَنفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَٰنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا
“দয়াময় আল্লাহ যাকে অনুমতি দিবেন এবং যার কথায় তিনি সন্তুষ্ট হবেন সে ছাড়া কিয়ামতের দিন কারো সুপারিশ কোন কাজে আসবে না”। (সূরা ত্বহা: ১০৯)
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। আর তার ঠিকানা হলো জাহান্নাম। আর যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই”। (সূরা মায়িদাহ্: ৭২)
«مَنِ الَّذِي يُشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ»
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন:
“কে আছে এমন, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর দরবারে সুপারিশ করবে”? (সূরা আল-বাকারাহ: ২৫৫)
«مَا مِنْ شَفِيعٍ إِلَّا مِنْ بَعْدِ إِذْنِهِ»
“কোন শাফা‘আতকারী এমন নেই, যে তার অনুমতি ছাড়া শাফা‘আত করতে পারে (সূরা ইউনুস ১০:৩ )|
দ্বিতীয় শর্ত: যার জন্য সুপারিশ করা হবে তার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকা অপরিহার্য। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَىٰ
“তারা কেবল তাদের জন্যই সুপারিশ করবেন, যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট আছেন”। (সূরা আম্বীয়া ২১:২৮) এ দু’টি শর্ত সূরা নাজমের ২৬ নং আয়াতে একসাথে এসেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَكَم مِّن مَّلَكٍ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِن بَعْدِ أَن يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَن يَشَاءُ وَيَرْضَىٰ
“আসমানে অনেক ফেরেশতা আছে, যাদের সুপারিশও কোন কাজে আসবেনা। যতক্ষণ না আল্লাহ নিজ ইচ্ছায় যাকে খুশী তার জন্য সুপারিশ করার অনুমতি দান করেন”।
কবীরা গুনাহে লিপ্ত হয়ে যেসব মু’মিন মৃত্যুবরণ করবে তাদের কেউ জাহান্নামের হকদার হলে তাকে জাহান্নামে প্রবেশ না করানোর জন্য শাফা‘আতের ব্যাপারে মু‘তাযিলা সম্প্রদায় লোকেরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের বিরোধীতা করেছে। সেই সাথে যারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে, সেখান থেকে তাদের বের হওয়ার ব্যাপারেও শাফা‘আত হওয়াকে মু‘তাযিলারা অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ তারা শাফা‘আতের উপরোক্ত প্রকারসমূহ থেকে পঞ্চম ও ষষ্ঠ প্রকার শাফা‘আতকেও তারা অস্বীকার করেছে। তারা আল্লাহ তা‘আলার এই বাণী দ্বারা দলীল গ্রহণ করে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
فَمَا تَنفَعُهُمْ شَفَاعَةُ الشَّافِعِينَ
“সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কাজে আসবে না (সূরা মুদ্দাসসির ৭৪:৪৮)|
তাদের কথার জবাব হলো, আয়াতটি কাফিরদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। সুপারিশকারীদের সুপারিশ কাফিরদের কোন কাজে আসবে না। তবে মু’মিনদের ব্যাপারে কথা হচ্ছে কতিপয় শর্তসাপেক্ষে সুপারিশ তাদের উপকার করবে। মোটকথা শাফা‘আতের ব্যাপারে লোকেরা তিনভাগে বিভক্ত:
(১) এক শ্রেণীর লোক শাফা‘আতকে সাব্যস্ত করতে গিয়ে সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ি করেছে। নাসারা, মুশরিক, সীমালঙ্ঘনকারী সূফী এবং কবর পূজারীরা এই শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত। এরা যাদেরকে তা’যীম করে, আল্লাহ তা‘আলার নিকট তাদের শাফা‘আতকে দুনিয়ার রাজা বাদশাহদের নিকট পরিচিত শাফা‘আতের মতই মনে করে থাকে। সুতরাং তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের কাছে শাফা‘আত প্রার্থনা করেছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন যে, মুশরিকদের জন্য সুপারিশকারীদের সুপারিশ কাজে আসবে না।
(২) মু‘তাযিলা ও খারিজীরা শাফা‘আতকে একদম অস্বীকার করেও সীমালঙ্ঘন করেছে। তারা কবীরা গুনাহকারীর জন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং অন্যদের শাফা‘আতকে অস্বীকার করেছে।
(৩) আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের লোকেরা কুরআনের আয়াত এবং নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত শাফা‘আতকে সাব্যস্ত করে। সুতরাং তারা শর্তসাপেক্ষে শাফা‘আতকে সাব্যস্ত করে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِ اللَّهِ ۖ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ
“বলো, তোমরা তোমাদের সেসব মা‘বূদদেরকে ডেকে দেখো, যাদেরকে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত নিজেদের মা‘বূদ মনে করেছ, তারা না আকাশের, না যমীনের এক অনু পরিমাণ জিনিসের মালিক”। (সূরা সাবা: ২২)
আবুল আব্বাস ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন: মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া যার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছে, তার সবই আল্লাহ তা‘আলা অস্বীকার করেছেন। আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য রাজত্ব অথবা আল্লাহর ক্ষমতায় গাইরুল্লাহর অংশীদারিত্ব অথবা আল্লাহর জন্য কোনো সাহায্যকারী হওয়ার বিষয়কে তিনি অস্বীকার করেছেন। বাকী থাকল শুধু শাফা‘আতের বিষয়টি। এ ব্যাপারে কথা এই যে, “আল্লাহ তা‘আলা যাকে শাফা‘আত করার অনুমতি দিবেন, তার শাফা‘আত ছাড়া অন্য কারো শাফা‘আত কোনো কাজে আসবে না”। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন, وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَىٰ “তিনি যার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হবেন, কেবল তার পক্ষেই তারা শাফাআত করবে”। (সূরা আম্বীয়া: ২৮)
মুশরিকরা যে শাফা‘আতের আশা করে, ক্বিয়ামতের দিন তার কোন অস্তিত্বই থাকবে না। কুরআনে কারীমও এধরনের শাফা‘আতকে অস্বীকার করেছে।
নাবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়েছেন, “তিনি আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবেন। অতঃপর তার রবের উদ্দেশে তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়বেন এবং আল্লাহর প্রশংসায় মগ্ন হবেন। প্রথমেই তিনি শাফা‘আত বা সুপারিশ করা শুরু করবেন না। অতঃপর তাকে বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! তোমার মাথা উঠাও। তুমি তোমার কথা বলতে থাক, তোমার কথা শ্রবণ করা হবে। তুমি চাইতে থাক, তোমাকে দেয়া হবে। তুমি সুপারিশ করতে থাক, তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।”
আবু হুরায়রা (রাঃ) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন আপনার শাফা‘আত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি কে? তিনি জবাবে বললেন, যে ব্যক্তি খালেস দিলে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে, সে আমার শাফাআত পাওয়ার সর্বাধিক হকদার হবে।
এ হাদীছে উল্লেখিত শাফা‘আত আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিপ্রাপ্ত এবং নেককার মুখলিস বান্দাদের জন্য নির্দিষ্ট। আল্লাহর সাথে যে ব্যক্তি কাউকে শরীক করবে, তার ভাগ্যে এ শাফা‘আত জুটবে না।
এ আলোচনার তাৎপর্য এই যে, আল্লাহ তা‘আলা মুখলিস বান্দাগণের প্রতি অনুগ্রহ করবেন এবং শাফা‘আতের জন্য অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রার্থনায় তাদেরকে ক্ষমা করবেন। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, শাফা‘আতকারীকে সম্মানিত করা এবং তাকে মাকামে মাহমূদ তথা প্রশংসিত স্থান দান করা।
কুরআনে কারীম যে শাফা‘আতকে অস্বীকার করেছে, তাতে শিরক বিদ্যমান রয়েছে। এ জন্যই আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি সাপেক্ষে শাফা‘আত এর স্বীকৃতির কথা কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় এসেছে। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন যে, শাফা‘আত একমাত্র তাওহীদপন্থী নিষ্ঠাবানদের জন্যই নির্দিষ্ট।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয় গুলো জানা যায়:
১) এই অধ্যায়ে বর্ণিত আয়াতসমূহের তাফসীর জানা গেল।
২) কুরআনে যে শাফা‘আতকে অস্বীকার করা হয়েছে তার প্রকৃতি ও গুণাগুণ জানা গেল।
৩) আর যে প্রকার শাফা‘আতকে কুরআন স্বীকৃতি দিয়েছে তার গুণাগুণ জানা গেল।
৪) সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শাফা‘আতের উল্লেখ। আর তা হচ্ছে মাকামে মাহমূদ।
৫) ক্বিয়ামতের দিন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা করবেন তার বর্ণনা। অর্থাৎ তিনি প্রথমেই শাফা‘আতের কথা বলবেন না; বরং তিনি সিজদায় পড়ে যাবেন। তাকে অনুমতি প্রদান করা হলেই তিনি শাফা‘আত করতে পারবেন।
৬) শাফা‘আতের মাধ্যমে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তিকে জানা গেল।
৭) আল্লাহর সাথে শিরককারীর জন্য কোনো শাফা‘আত গৃহীত হবে না।
৮) শাফা‘আতের স্বরূপ জানা গেল।
টিকাঃ
৬৯. শারহুল আক্বীদা আল-ওয়াসেত্বীয়া হতে: অনুসন্ধানের পর মোট আট প্রকার শাফা‘আতের কথা জানা যায়। এগুলোর মধ্য হতে কতিপয় শাফা‘আত নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে খাছ-নির্দিষ্ট এবং আরো কিছু শাফা‘আতের কথা জানা যায়, যা তার জন্য এবং অন্যদের জন্যও সাব্যস্ত।
১) الشفاعة العظمى শাফা‘আতে উযমা: وهي المقام المحمود এ শাফা‘আত হবে মাকামে মাহমূদে। হাশরের মাঠে লোকদের দীর্ঘ অবস্থানের পর এবং আদম থেকে শুরু করে ঈসা (আঃ) পর্যন্ত সবার কাছে সুপারিশের জন্য গমন করার পর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তা‘আলার নিকট বান্দাদের মাঝে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার আবেদন করবেন। সকল নাবীই যখন আল্লাহর নিকট সুপারিশ করতে অপারগতা প্রকাশ করবেন, তখন নাবী মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রভুর অনুমতি নিয়ে শাফা‘আত করবেন।
২) شفاعته ـ صلى الله عليه وسلم ـ في دخول أهل الجنة بعد الفراغ من الحساب জান্নাতী জান্নাতে প্রবেশ করানোর শাফা‘আত: হিসাবের পর জান্নাতীদেরকে দ্রুত জান্নাতে প্রবেশের অনুমতির জন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নিকট শাফা‘আত করবেন।
৩) شـفاعته ـ صـلى الله عليـه وسـلم ـ في عمـه أبي طالـب নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চাচা আবু তালেবের জন্য শাফা‘আত: নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্বিয়ামতের দিন তার চাচা আবু তালেবের শাস্তি হালকা করার জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবেন। এ শাফা‘আত তার সাথেই খাস। কেননা আল্লাহ তা‘আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, কাফিরদের জন্য সুপারিশকারীদের সুপারিশ কোন কাজে আসবে না। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন যে, তার শাফা‘আত কেবল তাওহীদপন্থীদের জন্যই নির্দিষ্ট। সুতরাং তার কাফির চাচা আবু তালেবের জন্য যেই শাফা‘আত তিনি করবেন, তা কেবল তার সাথেই এবং আবু তালেবের জন্যই খাস। উপরের তিন প্রকার শাফা‘আত কেবল আমাদের নাবী মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্যই নির্দিষ্ট।
৪) شـفاعته فـيمن اسـتحق النـار مـن عصـاة الموحـدين أن لا يـدخلها তাওহীদপন্থী’দের মধ্য হতে যাদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যাবে, তাদেরকে তথায় না পাঠানোর শাফা‘আত: যেসব গুনাহগারদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যাবে, তাদেরকে জাহান্নামে না পাঠানোর জন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্বিয়ামতের দিন সুপারিশ করবেন।
৫) شفاعته ـ صلى الله عليه وسلم ـ فيمن دخل النار مـن عصـاة الموحـدين أن يخـرج منهـا তাওহীদপন্থী মু’মিনদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার সুপারিশ: জাহান্নামে প্রবেশকারী তাওহীদপন্থী একদল পাপী লোককে তা থেকে বের করার জন্য তিনি শাফা‘আত করবেন।
৬) شفاعته ـ صلى الله عليه وسلم ـ في رفع درجات بعض أهل الجنة জান্নাতীদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য সুপারিশ: জান্নাতবাসী কিছু লোকের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাফা‘আত করবেন।
৭) شـفاعته ـ صـلى الله عليـه وسـلم ـ فـيمن اسـتوت حسـناهتم وسـيئاهتم যাদের গুনাহ এবং নেকীর পাল্লা সমান সমান হবে, তাদের জন্য সুপারিশ: ক্বিয়ামতের দিন যাদের গুনাহর পাল্লা এবং নেকীর পাল্লা সমান সমান হবে, তাদের জন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাফা‘আত করবেন যে, তাদেরকে যেন জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়। আলেমদের এক মত অনুযায়ী তারা হলেন আরাফবাসী।
৮) شـفاعته ـ صـلى الله عليـه وسـلم ـ في دخـول بعـض المـؤمنين الجنـة بـلا حسـاب ولا عـذاب বিনা হিসাবে এবং বিনা আযাবে এক শ্রেণীর লোককে জান্নাতে প্রবেশ করানোর শাফা‘আত: যেমন উক্কাশা ইবনে মিহসানের ব্যাপারে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফা‘আত। উক্কাশা যখন শুনলেন, এই উম্মাতের সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে ও বিনা আযাবে জান্নাতে যাবে, তখন তিনি আবেদন করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা‘আলার নিকট আমার জন্য দু‘আ করুন, তিনি যেন আমাকে সেই সত্তর হাজারের অন্তর্ভূক্ত করেন। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন উক্কাশার জন্য উক্ত সত্তর হাজারের অন্তর্ভূক্ত করে নেয়ার দু‘আ করলেন। ছহীহ মুসলিম হা/২২০, ছহীহ বুখারী হা/৫৭৫২।
এ শেষোক্ত পাঁচ প্রকারের শাফা‘আত করার মধ্যে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে আরো অনেকেই শরীক থাকবে। যেমন অন্যান্য নাবীগণ, ফেরেশতাগণ, সিদ্দীকগণ এবং শহীদগণ।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের লোকেরা উপরোক্ত সকল প্রকার শাফা‘আতেই বিশ্বাস করে। কেননা ছহীহ সূত্রে বর্ণিত অনেক দলীল দ্বারা তা প্রমাণিত। তবে দু’টি শর্ত ছাড়া শাফা‘আত হবে না।
৭০. ছহীহ বুখারী হা/৭৫১০, ছহীহ মুসলিম ১৯৩, কিতাবুল ঈমান।
৭১. ছহীহ বুখারী হা/৯৯।
📄 ১৭. হিদায়াত দানকারী একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা
আল্লাহ তা‘আলার বাণী,
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ
“তুমি যাকে পছন্দ করো, তাকে হিদায়াত করতে পারবে না।
ছহীহ বুখারীতে ইবনুল মুসাইয়্যিব (রহঃ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
«لَمَّا حَضَرَتْ أَبَا طَالِبٍ الْوَفَاةُ، جَاءَهُ رَسُولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - وَعِنْدَهُ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَبِي أُمَيَّةَ وَأَبُو جَهْلٍ، فَقَالَ لَهُ: يَا عَمِّ، قُلْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، كَلِمَةً أُحَاجُّ لَكَ بِهَا عِنْدَ اللَّهِ»، فَقَالَا لَهُ: أَتَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ؟ فَأَعَادَ عَلَيْهِ النَّبِيُّ؟ ، فَأَعَادَا، فَكَانَ آخِرَ مَا قَالَ: هُوَ عَلَى مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ، وَأَبَى أَنْ يَقُولَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، فَقَالَ النَّبِيُّ؟ : «لَأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ، مَا لَمْ أُنْهَ عَنْكَ»، فَأَنْزَلَ اللَّهُ - عز وجل -: {مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ} الْآيَةَ، وَأَنْزَلَ اللَّهُ فِي أَبِي طَالِبٍ: {إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ}
“যখন আবু তালিবের মৃত্যু উপস্থিত হল তখন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে আসলেন। আব্দুল্লাহ বিন আবি উমাইয়্যাহ এবং আবু জাহেল আবু তালিবের পাশেই উপস্থিত ছিল। রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, ‘চাচা, আপনি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলুন। এটি এমন একটি কালিমা, আপনি যদি তা পাঠ করেন, তাহলে এর দ্বারা আমি আল্লাহর কাছে আপনার জন্য বিতর্ক করবো, তখন তারা দু’জন তাকে বলল: তুমি আব্দুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করবে? নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কালিমা পড়ার কথা আরেকবার বললেন। তারা দু’জনও আবু তালিবের উদ্দেশে পূর্বোক্ত কথা আরেকবার বলল। আবু তালিবের সর্বশেষ অবস্থা ছিল, সে আব্দুল মুত্তালিবের ধর্মের উপরই অটল ছিল এবং ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলতে অস্বীকার করেছিল। তখন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আপনার ব্যাপারে যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে নিষেধ না করা হবে ততক্ষণ আমি আপনার জন্য মাগফিরাত কামনা করতে থাকবো। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াত নাযিল করেন:
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ
“মুশরিকদের জন্য মাগফিরাত কামনা করা নাবী এবং মু’মিনদের জন্য শোভনীয় নয়।” (সূরা আত তাওবা: ১১৩) আল্লাহ তা‘আলা আবু তালিবের ব্যাপারে এই আয়াত নাযিল করেন,
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ
“তুমি যাকে পছন্দ করো, তাকে হিদায়াত করতে পারবে না। কিন্তু আল্লাহ যাকে চান তাকে হিদায়াত করেন।” (সূরা আল-কাসাস: ৫৬)
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয় গুলো জানা যায়:
১) أنك لا تهدى من أحببت “তুমি যাকে পছন্দ করো, তাকে হিদায়াত করতে পারবে না”। এ আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) সূরা তাওবার ১১৩ নং আয়াত অর্থাৎ
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَىٰ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّnَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ
“নাবী ও মু’মিনদের উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য মাগফেরাত কামনা করবে, যদিও তারা নিকটাত্মীয় হয়, এ কথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামী”-এর তাফসীরও জানা গেল।
৩) একটি বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা জানা গেল। আর সেটি হচ্ছে, قل لا إلـه إلا الله “আপনি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলুন” রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর কথার ব্যাখ্যা। এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা এক শ্রেণীর তথা কথিত জ্ঞানের দাবিদারদের বিপরীত। তারা দাবি করে থাকে যে, অর্থ না বুঝেই এবং ইখলাস ব্যতীত শুধু যবান দিয়ে এটি পাঠ করলেই নাজাত পাওয়া যাবে। তাদের দাবি সম্পূর্ণ অবাস্তব।
৪) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুপথ যাত্রী আবু তালিবের ঘরে প্রবেশ করে যখন বললেন, চাচা, আপনি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলুন, এ কথার দ্বারা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর কি উদ্দেশ্য ছিল তা আবু জাহেল এবং তার সঙ্গীরা ভাল করেই বুঝতে পেরেছিল। আল্লাহ তা‘আলা ঐ ব্যক্তির অমঙ্গল করুন! যে ইসলামের মূলনীতি কালেমা তায়্যেবার অর্থ সম্পর্কে আবু জাহেলের চেয়েও অধিক অজ্ঞ।
৫) আপন চাচার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তীব্র আকাঙ্খা ও প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন।
৬) যারা আব্দুল মুত্তালিব এবং তার পূর্বসূরীদেরকে মুসলিম হওয়ার দাবি করে, এখানে তাদের দাবি খন্ডন করা হয়েছে।
৭) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় চাচা আবু তালিবের জন্য মাগফিরাত চাইলেও তার গুনাহ মাফ হয়নি, বরং তার মাগফিরাত চাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
৮) মানুষের উপর খারাপ বন্ধুদের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে থাকে।
৯) পূর্বপুরুষ এবং সৎ লোকদের প্রতি মাত্রতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শনের কারণেই মানুষ গোমরাহ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১০) আবু জাহেল কর্তৃক পূর্ব পুরুষদের প্রতি অন্ধ ভক্তির যুক্তি প্রদর্শনের কারণে বাতিল পন্থীদের অন্তরে সংশয়ের সৃষ্টি হয়।
১১) সর্বশেষ আমলের শুভাशुभ পরিণতির প্রত্যক্ষ প্রমাণ। কেননা আবু তালিব যদি শেষ মুহূর্তেও কালিমা পড়ত তাহলে তার বিরাট উপকার হত।
১২) এ বিষয়টিতে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত যে, গোমরাহীতে নিমজ্জিত লোকদের অন্তরে বাপ-দাদাদের رسم-রেওয়াজের প্রতি চরম ভক্তি ও ভালবাসা রয়েছে। কেননা আবু তালিবের ঘটনায় যা বর্ণিত হয়েছে, তা হলো রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ঈমান আনার কথা বারবার বলার পরও কাফির মুশরিকরা তাদের পূর্ব পুরুষদের মিল্লাতের অনুসরণকেই যুক্তি হিসাবে পেশ করেছে। তাদের অন্তরে বাপ-দাদাদের ধর্মের প্রতি সম্মান থাকার কারণে এবং সেটি তাদের নিকট সুস্পষ্ট হওয়ার কারণেই তারা মাত্র একটি দলীলকে যথেষ্ট বলে মনে করেছে।
টিকাঃ
৭২. এখানে বুঝানো হয়েছে, কেউ কাউকে সুপারিশ এর মাধ্যমে উপকার করতে সক্ষম নয় এবং আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তিদানের ক্ষমতা রাখে না। তেমনি কেউ কাউকে হিদায়াত দানেরও ক্ষমতা রাখে না, যতক্ষণ না আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি হয়। রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে হিদায়াতের মালিক নন বলে ঘোষণা করা হয়েছে, তা হচ্ছে হিদায়াতের তাওফীক দেয়া। আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কেউ এ প্রকার হিদায়াতের মালিক নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَن تُؤْمِنَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ
“আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউই ঈমান আনতে পারে না”। (সূরা ইউনুস: ১০০)
নূহ (আঃ) তার পুত্রকে হিদায়াত করতে পারেননি, স্ত্রীকেও সৎ পথে আনতে পারেননি। ইবরাহীম খলীল (আঃ) তার পিতাকে দীনের পথে আনয়ন করার চেষ্টা করেও সফল হননি। লূত (আঃ) এর ক্ষেত্রেও একই কথা। তার স্ত্রীকে সৎপথে আনতে পারেননি। আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম ও ইসহাক (আঃ) এর ব্যাপারে বলেন,
وَبَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَىٰ إِسْحَاقَ ۚ وَمِن ذُرِّيَّتِهِمَا مُحْسِنٌ وَظَالِمٌ لِّنَفْسِهِ مُبِينٌ
“তাকে (ইবরাহীমকে) এবং ইসহাককে আমি বরকত দান করেছি। তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক সৎকর্মী এবং কতক নিজেদের উপর স্পষ্ট যুলুমকারী। (সূরা সাফফাত: ১১৩)
আর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে প্রকার হিদায়াত করতে সক্ষম বলে কুরআন সাক্ষ্য দিয়েছে, তা হচ্ছে হিদায়াতের পথ দেখানো। তিনি এবং সকল নাবী-রাসূলই মানুষকে হিদায়াতের পথ দেখিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা সূরা শূরার ৫২ নং আয়াতে বলেন,
وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
“নিশ্চয় আপনি সরল পথপ্রদর্শন করেন”।
৭৩. এখানে সম্মানিত লেখক ঐ সমস্ত অজ্ঞ মুসলিমদেরকে বুঝিয়েছেন, যারা নিজেদেরকে মুসলিম বলে দাবি করে, কিন্তু ইসলামের মূল বাণী তথা কালিমা তায়্যেবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর অর্থ বুঝে না। অর্থ না বুঝার কারণে তারা এর মর্মার্থের বিপরীত কর্মকাণ্ডে যেমন পীর, কবর ও মাযার পূজায় লিপ্ত হয়।