📄 সে স্থানে আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু যবেহ করা শরী‘আত সম্মত নয়
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
لَا تَقُمْ فِيهِ أَبَدًا ۚ لَّمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَىٰ مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَن تَقُومَ فِيهِ ۚ فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَن يَتَطَهَّرُوا ۚ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ
“তুমি কখনো সেখানে দাঁড়াবে না, তবে যে মাসজিদের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে তাকওয়ার উপর প্রথম দিন থেকেই, সেটিই তোমার দাঁড়াবার যোগ্য স্থান। সেখানে রয়েছে এমন লোক, যারা পবিত্রতা অর্জন করাকে ভালবাসে। আর আল্লাহ পবিত্র লোকদের ভালবাসেন”।
ছাবিত বিন যাহ্হাক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:
نَذَرَ رَجُلٌ أَنْ يَنْحَرَ إِبِلًا بِبُوَانَةَ، فَسَأَلَهُ النَّبِيُّ - صلى الله عليه وسلم - فَقَالَ: «هَلْ كَانَ فِيهَا وَثَنٌ مِنْ أَوْثَانِ الْجَاهِلِيَّةِ يُعْبَدُ؟ » قَالُوا: لَا، قَالَ: «فَهَلْ كَانَ فِيهَا عِيدٌ مِنْ أَعْيَادِهِمْ؟ » قَالُوا: لَا، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ؟ : «أَوْفِ بِنَذْرِكَ، فَإِنَّهُ لَا وَفَاءَ لِنَذْرٍ فِي مَعْصِيَةِ اللَّهِ، وَلَا فِيمَا لَا يَمْلِكُ ابْنُ آدَمَ»
এক ব্যক্তি নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যামানায় বুওয়ানা নামক স্থানে একটি উট কুরবানী করার মানত করল। তখন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, সেই স্থানে এমন কোনো মূর্তি ছিল কি, জাহেলী যুগে যার পূজা করা হতো? ছাহাবায়ে কেরাম বললেন, ‘না’। তিনি বললেন, সেই স্থানে কি তাদের কোন উৎসব বা মেলা অনুষ্ঠিত হতো? তারা বললেন, ‘না’ অর্থাৎ এমন কিছু হতো না তখন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তাহলে তুমি তোমার মানত পূর্ণ করো। তিনি আরো বলেন, আল্লাহর নাফরমানী মূলক কাজে মানত পূর্ণ করা যাবে না। আদম সন্তান যা করতে সক্ষম নয় তেমন মানতও পূরণ করা আবশ্যক নয়”।
এ অধ্যায় থেকে যে সব বিষয় জানা যায় তা নিম্নরূপ:
শিরোণামের সাথে সূরা তাওবার ১০৭ নং আয়াতের সামঞ্জস্য এভাবে করা হয়েছে যে, যে সমস্ত স্থান আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যের উদ্দেশে পশু যবেহ করার জন্য এবং অন্যান্য শিরকী কাজ-কর্মের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, সে সমস্ত স্থানে আল্লাহর জন্য পশু যবেহ করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। তেমনি মুনাফিকদের যিরার মাসজিদটি যেহেতু আল্লাহর নাফরমানী এবং কুফরীর আড্ডা হিসাবে প্রস্তুত করা হয়েছে, তাই সেটি আল্লাহর গযবের স্থানে পরিণত হয়েছে। সুতরাং তাতে ছালাত পড়া বৈধ নয়। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নাবীকে সেখানে ছালাত পড়তে নিষেধ করেছেন। যদিও আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নাবীকে নির্দিষ্ট একটি স্থানে (যিরার মাসজিদে) প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার হুকুম আম তথা ব্যাপক। সে হিসাবে যে সমস্ত স্থান যেমন মাযার, দূর্গা ইত্যাদি যিরার মাসজিদের মত পাপ কাজের জন্য প্রস্তুত করা হবে, সেগুলোর হুকুম যিরার মাসজিদের অনুরূপ। কেননা পাপকাজ সেই স্থানকে অপবিত্র বানিয়ে ফেলেছে এবং তাতে আল্লাহর ইবাদত করা হতেও বারণ করা হয়েছে।
১) সূরা আত তাওবার ১০৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যা জানা গেল। যে সমস্ত স্থানে পাপ কাজ হয়, সেখানে আল্লাহর ইবাদতের জন্য দাঁড়ানো যাবে না।
২) যে যমীনে শিরক এবং অন্যান্য পাপের কাজ করা হয় সে যমীনে পাপ কাজের প্রভাব পড়তে পারে। তেমনি যে যমীনে আল্লাহর আনুগত্যের কাজ করা হয় তাতেও ভাল কাজের প্রভাব পড়ে।
৩) দুর্বোধ্যতা দূর করার জন্য কঠিন বিষয়কে সুস্পষ্ট ও সহজ বিষয়ের দিকে নিয়ে যাওয়া উচিত।
৪) প্রয়োজন বোধে মুফতী বিস্তারিত বিবরণ প্রশ্নকারীর কাছে চাইতে পারেন।
৫) মানতের মাধ্যমে কোনো স্থানকে খাস করা কোন দোষের বিষয় নয়, যদি তাতে শরী‘আতের কোনো বাধা না থাকে।
৬) জাহেলী যুগের মূর্তি থাকলে তা দূর করার পরও সেখানে মানত করতে নিষেধ করা হয়েছে।
৭) কোনো স্থানে জাহেলী যুগের কোনো উৎসব বা মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকলে, তা বন্ধ করার পরও সেখানে মুসলমানদের মানত করা নিষিদ্ধ।
৮) এসব স্থানের মানত পূরণ করা জায়েয নয়। কেননা এটা পাপ কাজের মানত।
৯) মুশরিকদের উৎসব বা মেলার সাদৃশ্য করা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। যদিও তাদের অনুসরণ করার উদ্দেশ্য না থাকে।
১০) পাপের কাজে কোনো মানত করা যাবে না।
১১) যে জিনিস আদম সন্তানের মালিকানাধীন নয়, তা মানত করা সঠিক নয়।
টিকাঃ
৫৫. বিপ্লবী সংস্কারক মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব (রহঃ) এর তাওহীদী আন্দোলনের পূর্বে নজদ এবং অন্যান্য অঞ্চলের লোকেরা যে সমস্ত শিরকী কাজ-কর্মে লিপ্ত ছিল লেখক এখানে ঐ সমস্ত শিরকী কাজ-কর্মের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। নজদের লোকেরা তখন তাদের রোগীদের আরোগ্য লাভের জন্য জ্বিনের জন্য পশু যবেহ করত। জ্বিনদের জন্য পশু যবেহ করার জন্য তারা তাদের ঘরের মধ্যে নির্দিষ্ট একটি স্থান নির্ধারণ করে রাখত। শাইখের দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা শিরকের মূলোৎপাটন করেছেন। দ্বীনের এই যুগশ্রেষ্ঠ দাঈ এককভাবে আল্লাহর ইবাদাতের প্রতি যেই দাওয়াত দিয়েছেন, সেই দাওয়াতের বরকতে আরব ভূখন্ড থেকে শিরক, বিদ‘আত ও আকীদার বিভ্রান্তির অবসান ঘটেছে। এ জন্য আমরা আল্লাহর প্রশংসা করছি এবং তার কাছেই কৃতজ্ঞতা পেশ করছি।
৫৬. যে মাসজিদ প্রথম দিন থেকে তাকওয়ার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল সেই মাসজিদটিতে ইবাদাতের জন্য দাঁড়ানোই তোমার পক্ষে অধিকতর সমীচীন। সেখানে এমন লোক আছে যারা পাক-পবিত্র থাকা পছন্দ করে এবং আল্লাহ তা‘আলা পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে ভালবাসেন। এটি হচ্ছে কুবা মাসজিদ। নাবী ﷺ মক্কা হতে হিজরত করে মদীনায় পদার্পণ করেই তাকওয়ার ভিত্তির উপর এই মাসজিদটি নির্মাণ করেছেন।
তাবূক যুদ্ধে বের হওয়ার পূর্বে মুনাফেকরা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার জন্য বাহ্যিকভাবে মাসজিদে যিরার নির্মাণ করল। নাবী ﷺ যখন তাবূক যুদ্ধে বের হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন, তখন মুনাফেকদের একটি দল তাঁর কাছে প্রস্তাব করল: হে আল্লাহর রাসূল! বৃষ্টি ও শীতের রাতে আমাদের দুর্বল ও বৃদ্ধদের পক্ষে আপনার মাসজিদে এসে ছালাত আদায় করা কষ্টকর। তাই আমরা তাদের জন্য আমাদের মহল্লায় একটি মাসজিদ নির্মাণ করেছি। আপনি গিয়ে সেখানে ছালাত পড়ে মাসজিদটি উদ্বোধন করে দিলেই সেটির বৈধতা প্রমাণিত হয়ে যাবে। নাবী ﷺ তখন বললেন: আমি এখন তাবূক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত আছি। আল্লাহর ইচ্ছায় যখন ফেরত আসব, তখন যাবো। এভাবে মূলত তাদের সাথে একটা মৌখিক অঙ্গীকার হয়ে গেল।
তাবূকের পথে রওয়ানা হওয়ার পর এ মুনাফিকরা উক্ত মাসজিদে নিজেদের জোট গড়ে তুলতে এবং ষড়যন্ত্র পাকাতে লাগলো।
এমনকি তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, রোমানদের হাতে মুসলমানদের মূলোৎপাটনের সাথে সাথেই আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মাথায় রাজ মুকুট পরিয়ে দেবে। কিন্তু তাবূকে যা ঘটলো তাতে তাদের সে আশার গুড়ে বালি পড়লো। ফেরার পথে নাবী ﷺ যখন মদীনার নিকটবর্তী "যী আওয়ান" নামক স্থানে পৌঁছলেন এবং মদীনায় প্রবেশ করতে মাত্র একদিনের রাস্তা কিংবা তার চেয়েও কম রাস্তা বাকী থাকল, তখন মাসজিদটির আসল খবরসহ ওহী আগমন করল। আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর নাবীকে মাসজিদটি নির্মাণের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানিয়ে দিলেন। তিনি তখনই কয়েকজন লোককে মদীনায় পাঠিয়ে দিলেন। তাদেরকে দায়িত্ব দিলেন, তিনি মদীনায় ফেরত আসার আগেই যেন তারা যিরার মাসজিদটি ভেঙ্গে ধুলিস্যাৎ করে দেন।
📄 ১১. আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে মানত করা শিরক
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
يُوفُونَ بِالنَّذْرِ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَ شَرُّهُ مُسْتَطِيرًا
“তারা মানত পূর্ণ করে এবং সেদিনকে ভয় করে, যেদিনর অনিষ্ট হবে সুদূর প্রসারী”। (সূরা আদ দাহার: ৭)
আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেছেন:
وَمَا أَنفَقْتُم مِّن نَّفَقَةٍ أَوْ نَذَرْتُم مِّن نَّذْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُهُ
“ যা কিছু তোমরা খরচ কর আর যা কিছু মানত কর নিশ্চয়ই আল্লাহ তা জানেন” (সূরা আল বাকারা: ২৭০)
ছহীহ বুখারীতে আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«مَنْ نَذَرَ أَنْ يُطِيعَ اللَّهَ فَلْيُطِعْهُ، وَمَنْ نَذَرَ أَنْ يَعْصِيَهُ فَلَا يَعْصِهِ»
“যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের কাজে মানত করে, সে যেন তা পূরণ করার মাধ্যমে তার আনুগত্য করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানিমূলক কাজে মানত করে সে যেন তার নাফরমানী না (মানত যেন পূরণ না করে) করে।”
ছহীহ বুখারী হা/৬৬৯৬।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) নেক কাজের মানত পূরণ করা ওয়াজিব।
২) মানত যেহেতু আল্লাহর ইবাদত হিসাবে প্রমাণিত, তাই আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে মানত করা শিরক।
৩) আল্লাহর নাফরমানিমূলক কাজে মানত পূরণ করা জায়েয নয়।
টিকাঃ
৫৭. শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন: মানত যেহেতু একটি ইবাদত; তাই মূর্তি, চন্দ্র, সূর্য, কবর-মাযার এবং অনুরূপ বস্তুর জন্য তা করা শিরক। তিনি আরো বলেন: যে ব্যক্তি কোনো কবর বা মাযারকে আলোকিত করার জন্য বাতি মানত করল এবং মুশরিকদের ন্যায় বলল যে অমুক কবর বা মাযার মানত কবুল করে, সকল উম্মাতের ঐক্যমতে তার এই মানত পাপ কাজের মানতের অন্তর্ভূক্ত। এই মানত পূর্ণ করা জায়েয নয়। এমনি যে ব্যক্তি কবর ও মাযারের খাদেমদের জন্য কিংবা তাতে অবস্থানকারীদের জন্য টাকা-পয়সা মানত করল, সেও অন্যায় ও পাপের কাজ করল। কেননা কবর ও মাযারের খাদেমদের মধ্যে এবং লাত, মানাত ও উয্যার খাদেমদের মধ্যে এক বিরাট সাদৃশ্য রয়েছে।
📄 ১২. আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে আশ্রয় চাওয়া শিরক
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِّنَ الْإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ مِّنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا
“মানুষের মধ্য থেকে কিছু লোক কতিপয় জ্বিনের কাছে আশ্রয় চাচ্ছিল। এর ফলে তারা জ্বিনদের অহমিকা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল।” (সূরা আল জ্বিন: ৬)
খাওলা বিনতে হাকীম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - يَقُولُ: «مَنْ نَزَلَ مَنْزِلًا فَقَالَ: أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ، لَمْ يَضُرَّهُ شَيْءٌ حَتَّى يَرْحَلَ مِنْ مَنْزِلِهِ ذَلِكَ» رَوَاهُ مُسْلِمٌ
আমি রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে এ কথা বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোনো মঞ্জিলে যাত্রা বিরতি করে এ দু‘আ পাঠ করবে:
«أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ
“আমি আল্লাহ তা‘আলার পূর্ণাঙ্গ কালামের মাধ্যমে তার সৃষ্টির সকল অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় চাই। তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত সে ঐ মঞ্জিল ত্যাগ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোন কিছুই তার ক্ষতি করতে পারবে না।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা জ্বিনের ৬ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল।
২) আল্লাহ ব্যতীত অন্যের আশ্রয় চাওয়া শিরকের মধ্যে গণ্য।
৩) এ অধ্যায়ে বর্ণিত হাদীছের মাধ্যমে আলিমগণ এ বিষয়ের উপর দলীল পেশ করেছেন যে, কালিমাতুল্লাহ (আল্লাহর কালাম) মাখলূকের তথা সৃষ্টির অন্তর্ভূক্ত নয়। বরং আল্লাহর কালাম আল্লাহর সিফাতের মধ্যে শামিল। তাই আলিমগণ বলেছেন: ‘মাখলূকের কাছে আশ্রয় চাওয়া শিরক।
৪) সংক্ষিপ্ত হলেও উক্ত দু‘আর ফযীলত অর্থাৎ
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ
পাঠ করার আরো অনেক ফযীলত রয়েছে।
৫) কোন বস্তু দ্বারা পার্থিব উপকার হাসিল করা এবং কোন অনিষ্ট থেকে বেঁচে যাওয়া এ কথা প্রমাণ করে না যে, তা শিরকের অন্তর্ভূক্ত নয়।
টিকাঃ
৫৮. তবে সৃষ্টির নিকট ঐ সব বিপদে আশ্রয় কামনা করা জায়েয আছে, যে বিষয়ের উপর সে ক্ষমতাবান। এ ধরনের আশ্রয় গ্রহণ করা শিরক নয়। এ কথার দলীল হচ্ছে, নাবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিতনার কথা উল্লেখ পূর্বক বললেন: সুতরাং যে ব্যক্তি তা হতে আশ্রয় স্থল পাবে সে যেন তার আশ্রয় গ্রহণ করে। (বুখারী ও মুসলিম) যদি আমার নিকট কোন ডাকাত উপস্থিত হয় এবং আমি এমন কোন ব্যক্তির আশ্রয় গ্রহণ করি যে আমাকে তাদের হাত থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম তবে এতে কোনই দোষ নেই।
৫৯. ছহীহ: মুসলিম হা/২৭০৮, ইবনে মাজাহ হা/৩৫৪৭, তিরমিযী হা/৩৪৩৭, আবু দাউদ হা/৩৮৯৮, অধ্যায়: কিভাবে ঝাড়-ফুঁক করতে হবে। ইমাম আলবানী (রহঃ) হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন। দেখুন: শাইখের তাহকীকসহ মিশকাতুল মাসাবীহ, হা/২৪২২।
📄 ১৩. আল্লাহ ব্যতীত অন্যের কাছে ফরিয়াদ করা অথবা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নিকট দু‘আ করা শিরক
আল্লাহ তা‘আলা সূরা ইউনুসের ১০৬ ও ১০৭ নং আয়াতে বলেন:
وَلَا تَدْعُ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ ۖ فَإِن فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِّنَ الظَّالِمِينَ وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ ۖ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ ۚ يُصِيبُ بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ ۚ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
“আল্লাহ ছাড়া এমন কোন মা‘বূদকে ডেকো না, যে তোমার কোন উপকার করতে পারবে না এবং ক্ষতিও করতে পারবে না। যদি এমন কর, তাহলে নিশ্চয়ই তুমি যালিমদের অন্তর্ভূক্ত হবে। আর আল্লাহ যদি তোমাকে কোন বিপদে ফেলেন, তাহলে একমাত্র তিনি ব্যতীত অন্য কেউ তা থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। আর তিনি যদি তোমার প্রতি কোন অনুগ্রহ করতে চান, তাহলে কেউ তার অনুগ্রহকে প্রতিহত করতে পারে না। স্বীয় বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে চান, তাকেই তিনি স্বীয় অনুগ্রহ দান করেন; তিনিই ক্ষমাশীল, দয়ালু”। (সূরা ইউনুস: ১০৬ -১০৭)
আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেছেন:
فَابْتَغُوا عِندَ اللَّهِ الرِّزْقَ وَاعْبُدُوهُ وَاشْكُرُوا لَهُ
“অতএব আল্লাহর কাছে রিযিক চাও এবং তাঁরই ইবাদত করো”। (সূরা আনকাবূত: ১৭)
আল্লাহ তা‘আলা অন্য এক আয়াতে ইরশাদ করেন,
وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّن يَدْعُو مِن دُونِ اللَّهِ مَن لَّا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَىٰ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَن دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ وَإِذَا حُشِرَ النَّاسُ كَانُوا لَهُمْ أَعْدَاءً وَكَانُوا بِعِبَادَتِهِمْ كَافِرِينَ
“তার চেয়ে অধিক ভ্রান্ত আর কে হতে পারে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ছাড়া এমন কাউকে ডাকে, যে ক্বিয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিবে না। তারা তো তাদের দু‘আ সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেखबर। যখন মানুষকে হাশরে একত্রিত করা হবে, তখন তারা তাদের শত্রুতে পরিণত হবে এবং তাদের ইবাদত অস্বীকার করবে”। (সূরা আহকাফ: ৫-৬)
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ ۗ أَإِلَٰهٌ مَّعَ اللَّهِ ۚ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ أَمَّن يَهْدِيكُمْ فِي ظُلُمَاتِ الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَن يُرْسِلُ الرِّيَاحَ بُشْرًا بَيْنَ يَدَيْ رَحْمَتِهِ ۗ أَإِلَٰهٌ مَّعَ اللَّهِ ۚ تَعَالَى اللَّهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ
বলো তো কে অসহায়ের ডাকে সাড়া দেন যখন সে ডাকে এবং কষ্ট দূরীভূত করেন ও তোমাদেরকে পৃথিবীতে পূর্ববর্তীদের স্থলাভিষিক্ত করেন? সুতরাং আল্লাহ্র সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই উপদেশ গ্রহণ কর। বল তো কে তোমাদেরকে জলে ও স্থলে অন্ধকারে পথ দেখান এবং যিনি তার অনুগ্রহের পূর্বে সুসংবাদবাহী বাতাস প্রেরণ করেন? অতএব, আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? তারা যাকে শরীক করে, আল্লাহ্ তার অনেক ঊর্ধ্বে। (সূরা আন নামল: ৬২)
ইমাম তাবরানী বর্ণনা করেন,
«أَنَّهُ كَانَ فِي زَمَنِ النَّبِيِّ - صلى الله عليه وسلم - مُنَافِقٌ يُؤْذِي الْمُؤْمِنِينَ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ: قُومُوا بِنَا نَسْتَغِيثُ بِرَسُولِ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - مِنْ هَذَا الْمُنَافِقِ، فَقَالَ النَّبِيُّ؟ : «إِنَّهُ لَا يُسْتَغَاثُ بِي، وَإِنَّمَا يُسْتَغَاثُ بِاللَّهِ»
নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে এমন একজন মুনাফিক ছিল, যে মু’মিনদেরকে কষ্ট দিত। তখন ছাহাবীদের কেউ কেউ বলতে লাগলেন, চল! আমরা এ মুনাফিকের কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আশ্রয় চাই। নাবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন,
«إِنَّهُ لَا يُسْتَغَاثُ بِي، وَإِنَّمَا يُسْتَغَاثُ بِاللَّهِ»
“আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা যাবে না। একমাত্র আল্লাহর কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে হবে”।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) প্রথমে দু‘আ উল্লেখ করার পর ইস্তেগাছা (ফরিয়াদ) উল্লেখ করা عام কে (সাধারণ বস্তুকে) خاص এর (নির্দিষ্ট বস্তুর) পূর্বে উল্লেখ করার অন্তর্ভূক্ত।
২) وَلَا تَدْعُ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ “আল্লাহ ছাড়া এমন কোন মা‘বূদকে ডেকো না, যে তোমার কোন উপকার করতে পারবে না এবং ক্ষতিও করতে পারবে না” -আল্লাহর এ বাণীর তাফসীর জানা গেল।
৩) আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে ফরিয়াদ করা বা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে ডাকা ‘শিরকে আকবার বা বড় শিরক।’
৪) সব চেয়ে নেককার বান্দাও যদি আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দু‘আ কিংবা ফরিয়াদ করে, তাহলে সে যালিমদের অন্তর্ভূক্ত হবে।
৫) এর পরবর্তী আয়াত অর্থাৎ وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ Gi তাফসীর জানা গেল।
৬) আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দু‘আ করা কুফরী কাজ হওয়ার সাথে সাথে দুনিয়াতে এর কোন উপকারিতা নেই। অর্থাৎ কুফরী কাজে কোন সময় দুনিয়াতে কিছু বৈষয়িক উপকারিতা পাওয়া যায়, কিন্তু গাইরুল্লাহর কাছে দু‘আ করার মধ্যে দুনিয়ার উপকারও নেই।
৭) ৩য় আয়াত অর্থাৎ فَابْتَغُوا عِندَ اللَّهِ الرِّزْقَ وَاعْبُدُوهُ -এর তাফসীরও জানা গেল।
৮) আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছে রিযিক চাওয়া উচিত নয়। যেমনিভাবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে জান্নাত চাওয়া উচিত নয়।
৯) ৪র্থ আয়াত وَمَنْ أَضَلُّ Gi তাফসীর জানা গেল।
১০) যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দু‘আ করে, তার চেয়ে অধিক বড় পথভ্রষ্ট আর কেউ নেই।
১১) আল্লাহ ব্যতীত যার কাছে দু‘আ করা হয়, সে দু‘আকারীর দু‘আ সম্পর্কে কোন খবরই রাখে না।
১২) مدعو মা‘দূ’ অর্থাৎ যাকে ডাকা হয় কিংবা যার কাছে দু‘আ করা হয়, সে দু‘আকারীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে থাকে এবং দু‘আকারীর জন্য শত্রুতে পরিণত হয়।
১৩) আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দু‘আ করা তার ইবাদত করার নামান্তর।
১৪) مدعو অর্থাৎ যাকে আহবান করা হয় কিংবা যার কাছে দু‘আ করা হয়, ক্বিয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তি তার জন্য সম্পাদিত ইবাদতকে অস্বীকার করবে।
১৫) আর এই বিষয়গুলো অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দু‘আ করা দু‘আকারীর পথভ্রষ্ট হওয়ার সর্বাধিক বড় কারণ।
১৬) পঞ্চম আয়াত أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ এর তাফসীর জানা গেল।
১৭) বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, মূর্তি পূজারীরাও একথা স্বীকার করে যে, বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির ডাকে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ সাড়া দিতে পারে না। এ কারণেই তারা যখন কঠিন মুছীবতে পতিত হয় তখন ইখলাস বা আন্তরিকতার সাথে আল্লাহকেই ডাকে।
১৮) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাওহীদের সংরক্ষণ এবং আল্লাহ তা‘আলার সাথে আদব-কায়দা রক্ষা করে চলার বিষয়টি জানা গেল।
টিকাঃ
৬০. সৃষ্টির নিকট এমন বিষয়ে ফরিয়াদ করা এবং সাহায্য প্রার্থনা করা শিরক, যে বিষয়ে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ করার ক্ষমতা রাখে না। আর তা এজন্য যে, যার নিকট সাহায্য প্রার্থনা ও ফরিয়াদ করা হয়েছে সে সম্ভবত মৃত্যুবরণ করেছে অথবা অনুপস্থিত রয়েছে। যেমন কেউ মৃত ব্যক্তির নিকট ফরিয়াদ করে এই উদ্দেশে যে, সে তার বিপদ দূর করবে অথবা অনুপস্থিত ব্যক্তিকে ডাকে যাতে করে সে তাকে আরোগ্য দান করে। অথবা যে বিষয়ে অপরের কাছে সাহায্য প্রার্থনা ও ফরিয়াদ করা হয়েছে সে বিষয়ে মূলত আল্লাহ ব্যতীত অপর কেউ কোনো ক্ষমতা রাখে না। যেমন কেউ যদি উপস্থিত জীবিত ব্যক্তির নিকট বৃষ্টি বর্ষণের জন্য ফরিয়াদ করে। এগুলো সবই বড় শিরকের অন্তর্ভূক্ত। তবে মাখলূকের নিকটে এমন বিষয়ে সাহায্য तलब এবং ফরিয়াদ করা বৈধ, যা করার ক্ষমতা সে রাখে। যেমন কোন ব্যক্তি স্বীয় সাথীদের সাহায্য গ্রহণ করল কিংবা যুদ্ধ ইত্যাদি ক্ষেত্রে শত্রুদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সাথীদের কাছে ফরিয়াদ করল এবং তাদের নিকট আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা করল। এ সব বিষয় শিরক নয়। কারণ এ সকল ক্ষেত্রে মানুষ পরস্পর সাহায্য-সহযোগীতা করার ক্ষমতা রাখে।
৬১. ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল (রহঃ) স্বীয় মুসনাদে ৫/৩১৭ এবং ইমাম তাবরানী (রহঃ) আল-মু’জামুল কবীরে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। সনদে ইবনে লাহীয়া থাকার কারণে মুহাদ্দিছগণ হাদীছটিকে যঈফ বলেছেন, তবে অর্থ ছহীহ। দেখুন: গায়াতুল মুরীদ, ড. আব্দুর রহমান ইবনে আব্দুল আযীয আল-আক্বল।