📄 ৭. ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ-কবচ
ছহীহ বুখারী ও মুসলিমে আবু বশীর আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
«أَنَّهُ كَانَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - فِي بَعْضِ أَسْفَارِهِ، فَأَرْسَلَ رَسُولًا أَنْ لَا يَبْقَيَنَّ فِي رَقَبَةِ بَعِيرٍ قِلَادَةٌ مِنْ وَتَرٍ، أَوْ قِلَادَةٌ إِلَّا قُطِعَتْ»
“কোন এক সফরে তিনি রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে ছিলেন। তখন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন সংবাদ বাহক পাঠিয়ে তাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, কোন উটের গলায় যেন কোন ধনুকের রশির মালা বা হাড় বাঁধা না থাকে, আর থাকলে যেন কেটে ফেলা হয়”।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, “আমি রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,
«إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ»
“ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ-কবচ ও যাদু-টোনা করা শিরক”।
আব্দুল্লাহ ইবনে উকাইম থেকে মারফূ‘ হাদীছে বর্ণিত আছে,
«مَنْ تَعَلَّقَ شَيْئًا وُكِلَ إِلَيْهِ»
“যে ব্যক্তি কোন জিনিস লটকায়, সে উক্ত জিনিসের দিকেই সমর্পিত হয়”। অর্থাৎ এর কুফল তার উপরই বর্তায়।
التمائم) তাবিজ-কবচ) হচ্ছে এমন জিনিস, যা চোখ লাগা বা কু-দৃষ্টি লাগা থেকে বাঁচার জন্য সন্তানদের গায়ে ঝুলানো হয়। ঝুলন্ত জিনিসটি যদি কুরআনের অংশ হয়, তাহলে সালফে ছলেহীনের কেউ কেউ এর অনুমতি দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ অনুমতি দেননি বরং এটাকে শরী‘আত কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয় বলে গণ্য করেছেন। ইবনে মাসউদ (রাঃ) এ অভিমতের পক্ষে রয়েছেন।
التولة) যাদু-টোনা) বা ঝাড়-ফুঁক কে عزائم) আযায়েগ) নামেও অভিহিত করা হয়। যে সব ঝাড়-ফুঁক শিরকমুক্ত, তা দলীলের মাধ্যমে খাস করা হয়েছে। তাই রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চোখের কু-দৃষ্টি লাগা এবং সাপ বিচ্ছুর বিষ দূর করার জন্য ঝাড়-ফুঁক করার অনুমতি দিয়েছেন।
ঈমান-আক্বীদাহ্ নষ্টকারী ও তাতে ত্রুটি নিয়ে আসে এমন বিষয়াবলী থেকে স্বীয় আক্বীদাহ্ ও বিশ্বাসকে হিফাযত করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয। তাই মুসলিম ব্যক্তি নাজায়েজ কোন ঔষধ গ্রহণ করবে না। অপসংস্কৃতিতে বিশ্বাসী, ভেল্কিবাজ গণকদের নিকট রোগ ব্যাধির চিকিৎসার জন্য যাবে না। কারণ, তারা তার হৃদয় ও আক্বীদাহকে রোগাগ্রস্ত করে দিবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে আল্লাহ্ তার জন্য যথেষ্ট হবেন।
কোন প্রকার শারীরিক ব্যাধি ছাড়াই অনেকে নিজের গায়ে এ সকল জিনিস ঝুলিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বদ নযর ও হিংসার ক্ষতির ভয় তাদের অন্তরে কাজ করে। অনেকে আবার এগুলো নিজের গাড়ী, বাহন, বাড়ীর দরজা অথবা দোকানে ঝুলিয়ে রাখে। এ সবই দুর্বল আক্বীদা (বিশ্বাস) ও আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা না করার পরিণাম। নিশ্চয় দুর্বল আক্বীদাহ্ বা বিশ্বাসই প্রকৃত রোগ বা ব্যাধি। তাওহীদ (আল্লাহর একত্ব) ও সঠিক আক্বীদা জানার মাধ্যমে এব্যাধির চিকিৎসা করা ফরয।
টিকাঃ
৩৫. ছহীহ বুখারী হা/৩০০৫, মুসলিম হা/২১১৫। ইমাম মালেক (রহঃ) বলেছেন: বদ নযর ও তার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য মালা বা পশুর গলায় ঘন্টা লাগানো নিষেধ। কিন্তু শুধু সৌন্দর্যের জন্য হলে কোন অসুবিধা নেই।
৩৬. ছহীহ: আবু দাউদ হা/৩৮৮৩। ইমাম আলবানী (রহঃ) হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন, দেখুন: সিলসিলায়ে ছহীহা, হা/৩৩১।
৩৭. হাসান: তিরমিযী হা/২০৭২, অধ্যায়: কোন কিছু ঝুলানোর ব্যাপারে যা বর্ণিত হয়েছে।
৩৮. আক্বীদাতুত তাওহীদ। তাবিজ-কবচ দু’প্রকার:
প্রথম প্রকার তাবিজ-কবচ: যা কুরআন দ্বারা করা হয়। এর পদ্ধতি হলো: একটি কাগজে কুরআনের কোন আয়াত বা আল্লাহর নাম ও গুণাবলী লিখে রোগ মুক্তির আশায় গলায় ঝুলানো হয়। এ প্রকার তাবিজের ক্ষেত্রে আলিমগণ দু’টি মত পোষণ করেছেন।
প্রথম মত: এ প্রকার তাবিজ ঝুলানো জায়েয। আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমর ইবনে আস্ (রাঃ) এ মত পোষণ করেছেন। আয়িশা (রাঃ) থেকে যা বর্ণিত হয়েছে তার বাহ্যিকভাবও এ মতের পক্ষেই। আবু জাফর আল্ বাক্বির এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল (রহঃ) তার এক বর্ণনায় এমনই মত দিয়েছেন। আর যে সকল হাদীছে তাবিজ কবচ ব্যবহারে নিষেধ করা হয়েছে তা শিরক সম্বলিত বলে তারা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ তাদের নিকটে শিরক সম্বলিত তাবিজ ব্যবহার করা জায়েয নয়। যে তাবিজে শিরক নেই তা ব্যবহারে কোন অসুবিধা নেই এই হলো তাদের সিদ্ধান্ত।
দ্বিতীয় মত: তাবিজ-কবচ ব্যবহার করা নাজায়েজ। এ সিদ্ধান্ত হলো: আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ ও ইবনে আব্বাস, হুযাইফাহ, উব্বাহ্ ইবনে আমির, ইবনে উব্বাইম (রাঃ), তাবেঈগণের একটি দল তাদের মধ্যে রয়েছেন: আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদের সহচরবৃন্দ, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল (রহঃ) তার এক বর্ণনা মতে, (তার অনেক অনুসারী এ মতকে পছন্দ করেছেন) এবং পরবর্তী উলামাগণের। তারা আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীছ দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছেন।
রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ (مسند أحمد٣٦١٥:)
ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ-কবচ এবং যাদু-টোনা ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে শিরক। ছহীহ: ইবনে মাজাহ হা/৩৫৩০, আবু দাউদ হা/৩৮৮৩, মুসনাদে আহমাদ হা/৩৬১৫।
তিনটি কারণে দ্বিতীয় মতটি সঠিক ও বিশুদ্ধ:
১| তাবিজ-কবচ নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত হাদীছটি ব্যাপক। আর এ ব্যাপকতাকে খাস করে এর বিপরীতে কোন হাদীছ বর্ণিত হয়নি।
২| অবৈধ তাবিজ-কবচ চালু হওয়ার পথ বন্ধ করতে দ্বিতীয় মতটি বড় সহায়ক।
৩| কুরআন দ্বারা তাবিজ-কবচ করা হলে যে ব্যক্তি তা ঝুলায় সে পেশাব-পায়খানাসহ অন্যান্য নাপাক স্থানে তা বহন করার ফলে কুরআনের অবমাননা করে। অথচ কুরআনের অবমাননা করা হারাম।
দ্বিতীয় প্রকার তাবিজ-কবচ: কুরআন ছাড়া অন্য কিছু মানুষের কোন অঙ্গে ঝুলানো। যেমন: দানা জাতীয় পুঁতি বা তাবিজ, হাড়, কড়ি, সুতা, জুতা, লোহার কাঁটা, শয়তান-জ্বিনদের নামসমূহ এবং বিভিন্ন তন্ত্র-মন্ত্র। এরূপ তাবিজ-কবচ সম্পূর্ণ হারাম ও শিরক। কারণ, এ ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহ তা‘আলা তার নাম ও গুণাবলী এবং আয়াত ব্যতীত অন্যের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। এ প্রসঙ্গে হাদীছে বর্ণিত হয়েছে:
قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ تَعَلَّقَ شَيْئًا وُكِلَ إِلَيْهِ (سنن الترمذى: ٢٠٧٢)
রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি কোন কিছু (তাবিজ-কবচ ইত্যাদি) লটকায় তাকে ঐ বস্তুর দিকে সোপর্দ করে দেয়া হয়। হাসান: সুনানে তিরমিযী ২০৭২।
অর্থাৎ সে যা লটকায় আল্লাহ্ তাকে সে বস্তুর নিকটে সোপর্দ করে দেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক রক্ষা করত: তার নিকটে আশ্রয় নিয়ে নিজের সকল বিষয় তার দিকে সোপর্দ করে আল্লাহ্ তা‘আলাই তার জন্য যথেষ্ট হবেন। সকল দূরবর্তী বিষয়কে তার কাছে করে দিবেন এবং কঠিন কাজকে তার জন্য সহজ সাধ্য করে দিবেন।
অপর দিকে যে ব্যক্তি আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোন মাখলূক্ব, তাবিজ-কবচ, ঔষধ ও কবরের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করবে বা যোগাযোগ করবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে ঐ বস্তুর দিকে সোপর্দ করে দিবেন যা তার থেকে কোন কিছুকে বাধা দিতে পারবে না। ওটা তার কোন অপকার বা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না। ফলে এ ব্যক্তি তার আক্বীদাহ্ নষ্ট করত: স্বীয় রব্বের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করবে এবং আল্লাহ তা‘আলা তাকে লাঞ্ছিত করবেন।
৩৯. আক্বীদাতুত তাওহীদ। ঝাড়-ফুঁক দু’প্রকার:
প্রথম প্রকার: শিরকমুক্ত ঝাড়-ফুঁক।
যেমন: রোগীর উপর কুরআনের কিছু আয়াত পাঠ করা অথবা আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর দ্বারা আল্লাহর নিকটে রোগ মুক্তি চাওয়া। এ প্রকার ঝাড়-ফুঁক জায়েয। কারণ রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে ঝাড়-ফুঁক করেছেন, এর আদেশ দিয়েছেন এবং একে জায়েয বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আওফ ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
كُنَّا نَرْقِي فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ تَرَىٰ فِي ذَٰلِكَ فَقَالَ: «اعْرِضُوا عَلَيَّ رُقَاكُمْ، لَا بَأْسَ بِالرُّقَىٰ مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ»
জাহিলিয়াত যুগে আমরা ঝাড়-ফুঁক করতাম। আমরা বললাম: হে আল্লাহর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি? রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তোমাদের ঝাড়-ফুঁকগুলো আমার সামনে পেশ করো। যে ঝাড়-ফুঁকে শিরক নেই তা করতে কোন অসুবিধা নেই। ছহীহ মুসলিম হা/২২০০, ছহীহ: আবু দাউদ হা/৩৮৮৬।
ইমাম সুয়ূত্বী রহি বলেন: তিনটি শর্তের ভিত্তিতে ঝাড়-ফুঁক জায়েয বলে উলামাগণ (রহঃ) ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন। শর্তগুলো হলো:
ক| ঝাড়-ফুঁক যেন আল্লাহর বাণী অথবা তার নাম ও গুণাবলী দ্বারা হয়।
খ| আরবী ভাষায় এবং এমন শব্দে হতে হবে যার অর্থ বুঝা যায় এবং
গ| এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, ঝাড়-ফুঁকের নিজস্ব কোন প্রভাব নেই। বরং আরোগ্য আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। ফাতহুল মাযীদ ১৩৫ পৃষ্ঠা।
ঝাড়-ফুঁকের পদ্ধতি:
কুরআনের আয়াত অথবা দু‘আ পড়ে রোগীকে ফুঁক দিতে হবে। অথবা দু‘আ পড়ে পানিতে ফুঁক দিয়ে তা রোগীকে পান করানো। যেমন, ছাবিত ইবনে ক্বায়স এর হাদীছে এসেছে:
ثم أَخَذَ تُرَابًا مِنْ بَطْحَانَ فَجَعَلَهُ فِي قَدَحٍ ثُمَّ نَفَثَ عَلَيْهِ بِمَاءٍ وَصَبَّهُ عَلَيْهِ (سنن أبى داود٣٨٨٥:)
অতঃপর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুতহান নামক স্থানের কিছু মাটি নিয়ে একটা পাত্রে রেখে তাতে পানি মিশিয়ে ফুঁক দিলেন এবং তা ছাবিত এর শরীরের উপর ঢেলে দিলেন। যঈফ: আবু দাউদ হা/৩৮৮৫।
দ্বিতীয় প্রকার ঝাড়-ফুঁক: শিরকযুক্ত ঝাড়ফুঁক। এ প্রকার ঝাড়-ফুঁকে গাইরুল্লাহর (আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যের) সহযোগিতা নেয়া হয়। গাইরুল্লাহর নিকটে প্রার্থনা, ফরিয়াদ ও আশ্রয় চাওয়া হয়। যেমন: জ্বিন, ফেরেশতা, নাবীগণ আলাইহিমুস ছালাতু अस्সালাম এবং সৎ ব্যক্তিগণের নাম দ্বারা ঝাড়-ফুঁক করা। উল্লিখিত বিষয়গুলোতে গাইরুল্লাহকে আহবান করা হয় বিধায় তা শিরকে আকবার বা বড় শিরক। দ্বিতীয় প্রকার ঝাড়-ফুঁক অনেক সময় অনারবী ভাষা অথবা এমন শব্দাবলী দ্বারা করা হয় যার অর্থ বুঝা যায় না। এ প্রকার ঝাড়-ফুঁকে অজান্তে শিরক বা কুফরী প্রবেশের ভয় রয়েছে বিধায় তা নিষিদ্ধ।
৪০. এটা এমন কিছু যাদু-মন্ত্র বা তাবিজ-কবচ যা স্বামীর হৃদয়ে স্ত্রীর এবং স্ত্রীর হৃদয়ে স্বামীর ভালবাসা সৃষ্টির উদ্দেশে তৈরী ও ব্যবহার করা হয়।
📄 যে ব্যক্তি গাছ পাথর ইত্যাদি দ্বারা বরকত হাসিল করতে চায়
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
أَفَرَأَيْتُمُ اللَّاتَ وَالْعُزَّىٰ وَمَنَاةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَىٰ
“তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও উয্যা সম্পর্কে এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে?” (সূরা আন নাজম: ১৯-২০)
আবু ওয়াকিদ আল-লাইছী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - إِلَى حُنَيْنٍ وَنَحْنُ حُدَثَاءُ عَهْدٍ بِكُفْرٍ، وَلِلْمُشْرِكِينَ سِدْرَةٌ يَعْكُفُونَ عِنْدَهَا وَيَنُوطُونَ بِهَا أَسْلِحَتَهُمْ يُقَالُ لَهَا: ذَاتُ أَنْوَاطٍ، فَمَرَرْنَا بِسِدْرَةٍ، فَقُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، اجْعَلْ لَنَا ذَاتَ أَنْوَاطٍ كَمَا لَهُمْ ذَاتُ أَنْوَاطٍ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ؟ : «اللَّهُ أَكْبَرُ، إِنَّهَا السُّنَنُ، قُلْتُمْ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ كَمَا قَالَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ لِمُوسَىٰ: {اجْعَل لَّنَا إِلَٰهًا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ ۚ قَالَ إِنَّكُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُونَ} لَتَرْكَبُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ»
“আমরা রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে হুনাইন যুদ্ধের উদ্দেশে বের হলাম, আমরা তখন সবেমাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছি। এক স্থানে মুশরিকদের একটি কুলগাছ ছিল। যার চারিপাশে তারা বসতো এবং তাদের সমরাস্ত্র সে গাছে ঝুলিয়ে রাখত। গাছটিকে তারা ذَاتُ أَنْوَاطٍ ‘যাতু আনওয়াত’ বা বরকতময় গাছ বলত। আমরা একদিন একটি কুলগাছের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন আমরা রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের যেমন “যাতু আনওয়াত” বা বরকত ওয়ালা গাছ আছে আমাদের জন্যও অনুরূপ “যাতু আনওয়াত” গাছ নির্ধারণ করে দিন। তখন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আল্লাহু আকবার! এটি পূর্ববর্তী লোকদের রীতি-নীতি ছাড়া আর কিছুই নয়। যার হাতে আমার জীবন তার নামে শপথ! তোমরা এমন কথাই বলেছ, যা বনী ইসরাঈলের লোকেরা মূসা (আঃ) কে বলেছিল। তারা বলেছিল, “হে মূসা! মুশরিকদের যেমন মা‘বূদ আছে আমাদের জন্য তেমন মা‘বূদ বানিয়ে দাও। মূসা আ. তখন বললেন: তোমরা মূর্খ লোকদের মত কথা বলছ। ঐ সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের রীতি নীতিই অবলম্বন করছো”।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) সূরা নাজমের আয়াত أفرايتم اللات والعزى -এর তাফসীর জানা গেল।
২) ছাহাবীগণ যে বিষয়টি প্রার্থনা করেছিলেন, তার প্রকৃত অবস্থা জানা গেল।
৩) আরো জানা গেল যে ছাহাবায়ে কেরামগণ শিরক করেননি।
৪) ছাহাবীগণ এই জন্য যাতু আনওয়াত বা বরকত ওয়ালা গাছ প্রার্থনা করেননি যে, তারা এর ইবাদত করবেন। বরং তারা এর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চেয়েছিলেন এ কথা ভেবে যে, আল্লাহ তা পছন্দ করেন।
৫) ছাহাবায়ে কেরামগণই যদি এ ব্যাপারে অজ্ঞ থাকেন, তাহলে অন্য লোকেরা তো এ ব্যাপারে আরো বেশী অজ্ঞ থাকবে।
৬) ছাহাবায়ে কেরামের জন্য যে অধিক ছাওয়াব দান ও গুনাহ মাফের ওয়াদা রয়েছে, অন্যদের ব্যাপারে তা নেই।
৭) শিরকের ব্যাপারে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাহাবায়ে কেরামের অজ্ঞতার ওযর গ্রহণ করেননি। বরং তাদের কথার শক্ত জবাব এ কথার মাধ্যমে দিয়েছেন:
اللَّهُ أَكْبَرُ، إِنَّهَا السُّنَنُ، لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ»
“আল্লাহু আকবার! নিশ্চয়ই এটা পূর্ববর্তী লোকদের নীতি। তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের নীতি অনুসরণ করছো।” উপরোক্ত তিনটি কথা দ্বারা বিষয়টি অধিক গুরুত্ব লাভ করেছে।
৮) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এখানে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ছাহাবায়ে কেরামের দাবি মূলত মূসা আলাইহিস সালামকে এর কাছে বনী ইসরাঈলের লোকদের দাবির মতই ছিল। বনী ইসরাঈলের লোকেরা মূসা (আঃ) কে বলেছিল: আমাদের জন্য একটি মা‘বূদ বানিয়ে দাও।
৯) তাদের দাবি মুতাবেক বরকত গ্রহণের জন্য মা‘বূদ নির্ধারণ না করে দেয়া “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র মর্মার্থের অন্তর্ভূক্ত। এ বিষয়টি অতিসূক্ষ্ম হওয়ার কারণে কতক ছাহাবীর নিকট তা অস্পষ্ট ছিল।
১০) বিনা প্রয়োজনে শপথ করা রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পবিত্র অভ্যাসের অন্তর্ভূক্ত ছিল না। তিনি বিশেষ প্রয়োজনে শপথ করতেন। এখানে তিনি ছাহাবীদের একটি আবেদনের জবাব দিতে গিয়ে শপথ করেছেন।
১১) শিরকের মধ্যে ‘আকবার-বড়’ ও ‘আসগর-ছোট’ রয়েছে। হুনাইনের পথে ছাহাবীগণ যে দাবি করেছিলেন, তা ছিল শিরকে আসগরের পর্যায়ভুক্ত। এ জন্যই তারা তাদের সেই কথার কারণে মুরতাদ হয়ে যাননি।
১২) “আমরা কুফরী যমানার খুব কাছাকাছি ছিলাম” অর্থাৎ আমরা সবেমাত্র মুসলমান হয়েছিলাম, এ কথা দ্বারা বুঝা যায় যে অন্যান্য ছাহাবায়ে কেরাম এ ব্যাপারে অজ্ঞ ছিলেন না।
১৩) আশ্চর্যের ব্যাপার হলো যারা ‘আল্লাহু আকবার’ বলা পছন্দ করে না, এটা তাদের বিরুদ্ধে একটি দলীল।
১৪) শিরক ও পাপাচারের পথ বন্ধ করার গুরুত্ব জানা গেল।
১৫) জাহেলী যুগের লোকদের অনুসরণ ও সাদৃশ্য করা নিষেধ।
১৬) শিক্ষাদানের সময় প্রয়োজন বোধে রাগ করা জায়েয।
১৭) إِنَّهَا السـنن “এটা পূর্ববর্তী লোকদের নীতি” এ বাণী একটা সাধারণ নীতি।
১৮) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সংবাদ দিয়েছেন, বাস্তবে তাই ঘটেছে। এটা নবুওয়াতের অন্যতম নিদর্শন।
১৯) কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা‘আলা ইয়াহূদী ও খ্রীস্টানদের চরিত্র সম্পর্কে যেসব দোষ-ত্রুটির কথা বলেছেন, তা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করার জন্যই বলেছেন।
২০) ছাহাবীদের কাছে এই কথা সুসাব্যস্ত ছিল যে, আল্লাহ ও তার রাসূলের নির্দেশের উপর ভিত্তি করেই ইবাদত করতে হবে। এখানে ঐ সমস্ত প্রশ্নের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা কবরের মধ্যে করা হবে। কবরে জিজ্ঞেস করা হবে,
(ক) তোমার প্রভু কে? এটি একটি সুস্পষ্ট প্রশ্ন।
(খ) তোমার নাবী কে? এই প্রশ্নগুলো ঐসব গায়েবের অন্তর্ভূক্ত, যা আল্লাহ তা‘আলা তার নাবীকে জানিয়েছেন। কেননা কবরে কি প্রশ্ন করা হবে এ কথা নাবী ছাড়া কেউ বলতে পারে না।
(গ) তোমার দীন কি ছিল? এ কথা তাদের إجعـل لنـا آلهـة আমাদের জন্যও ইলাহ ঠিক করে দিন। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন করা হবে। অর্থাৎ তোমার দীন তো শিরক করার নির্দেশ দেয়নি তাহলে তোমাকে কোন দীন শিরকের নির্দেশ দিল?
২১) মুশরিকদের রীতি-নীতির মত আহলে কিতাবের অর্থাৎ আসমানী কিতাব প্রাপ্তদের রীতি-নীতিও দোষনীয়।
২২) বাতিল আক্বীদাহ্ ছেড়ে দেয়ার পরও পূর্বে বাতিল ‘আক্বীদাহ’র কিছু ছাপ (কিছু শিরক-বিদ‘আত) বাতিল পরিত্যাগকারীর অন্তরে থেকে যাওয়া অবাস্তব নয়। ونحـن حـداثء عهـد بكفـر আমরা কুফরী যুগের খুব নিকটবর্তী ছিলাম বা নতুন মুসলমান ছিলাম, ছাহাবীদের এ কথার দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয়।
টিকাঃ
৪৪. التبرك অর্থ হলো বরকত অন্বেষণ করা, বরকত কামনা করা এবং উপরোক্ত জিনিসগুলোতে বরক আছে বলে বিশ্বাস করা। উপরোক্ত জিনিসগুলো থেকে বরকত অন্বেষণ করা বড় শিরক। কেননা এর মাধ্যমে বরকত হাসিলের জন্য আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য জিনিসের উপর ভরসা করা হয়ে থাকে। মূর্তিপূজকরা উপরোক্ত জিনিসগুলো থেকে বরকত অন্বেষণ করতো। সৎ লোকদের কবর থেকে বরকত হাসিল করাও বড় শিরক। যেমন লাত নামক মূর্তি থেকে বরকত লাভ করা, গাছ ও পাথর থেকে বরকত হাসিল করা এবং উয্যা ও মানাত নামক মূর্তি থেকে বরকত লাভ করা।
৪৫. লাত, মানাত এবং উয্যা এই তিনটি ছিল জাহেলী যুগের আরবদের সর্বাধিক বৃহৎ মূর্তি। লাত ছিল তায়েফের ছাকীফ এবং তার পার্শ্ববর্তী লোকদের মা‘বূদ, উয্যা ছিল কুরাইশ ও বনী কেননার লোকদের এবং মানাত ছিল বনী হেলালের লোকদের। ইবনে হিশাম বলেন: মানাত ছিল হুযাইল এবং খুযাআ গোত্রের।
৪৬. এখানে নাবী ﷺ ঐ সমস্ত পথ ও রীতিনীতির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, যা মানব জাতির জন্য আল্লাহর নির্ধারিত দীনের পরিপন্থী।
৪৭. অর্থাৎ তোমরা ইয়াহূদী ও খ্রীস্টানদের অনুসরণ করবে। এ ব্যাপারে নাবী ﷺ যে সংবাদ দিয়েছেন, এই উম্মাতের মধ্যে বাস্তবেও তাই হয়েছে। এই উম্মাতের লোকেরা ইয়াহূদী ও খ্রীস্টানদের আচার-আচরণ ও সভ্যতাকে নিজেদের পথ বানিয়েছে।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ حَذْوَ الْقُذَّةِ بِالْقُذَّةِ، حَتَّىٰ لَوْ دَخَلُوا جُحْرَ ضَبٍّ لَدَخَلْتُمُوهُ. قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ؟ قَالَ: «فَمَنْ؟»
“তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতের পদে পদে অনুসরণ করবে। এমনকি তারা যদি দব্ব (সান্ডা) এর গর্তে প্রবেশ করে থাকে, তোমরাও সেখানে প্রবেশ করবে। ছাহাবীগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! পূর্ববর্তী উম্মাত দ্বারা আপনি কি ইয়াহূদ ও নাসারা বুঝাচ্ছেন? তিনি বললেন: তবে আর কারা? ছহীহ: বুখারী হা/৭৩২০, ৩৪৫৬, মুসলিম হা/২৬৬৯।
৪৮. শিরকের ব্যাপারে অজ্ঞতার ওযর তথা না জেনে না বুঝে কেউ শিরকে লিপ্ত হলে অজ্ঞতার ওযর গ্রহণ করা হবে কি না? এ ব্যাপারে আলেমদের মতভেদ রয়েছে। গ্রন্থকারের বিশ্লেষণ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, শিরকের ব্যাপারে অজ্ঞতার কোন ওযর গ্রহণযোগ্য হবে না। অপরপক্ষে সুবিখ্যাত আলেমে দীন মুহাম্মাদ ইবনে ছলেহ আল উছাইমীনসহ অন্যান্য আলিমের মতে অন্যান্য পাপ কাজের মতই শিরকের ব্যাপারে অজ্ঞতার ওযর গ্রহণ করা হবে। অর্থাৎ না জেনে না বুঝে কেউ শিরকে লিপ্ত হলে সে ক্ষমা পাওয়ার উপযুক্ত। তারা এই অধ্যায়ে বর্ণিত হাদীছকেই দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন। এখানে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের অজ্ঞতার ওযর গ্রহণ করেছেন এবং তাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি যদি তাদের ওযর গ্রহণ না করতেন, তাহলে তিনি তাদেরকে শাস্তি দিতেন এবং মুরতাদ হিসাবে সাব্যস্ত করে তাওবা করার নির্দেশ দিতেন ও কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করে নতুনভাবে ইসলামে প্রবেশের হুকুম করতেন।
তবে বিনা শর্তে এ বিশ্লেষণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যে সমাজে তাওহীদের শিক্ষা বিদ্যমান এবং যাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছেছে, তারা যদি শিরক করে, তাহলে তাদের কোন রক্ষা নেই। তাদের অজ্ঞতার ওযর গ্রহণযোগ্য হবে না। আর এ হাদীছে সে সমস্ত ছাহাবীর কথা বলা হয়েছে, তারা ছিলেন নব মুসলিম। তাই সম্ভবত: তাদের অজ্ঞতার ওযর গ্রহণ করা হয়েছে। তা ছাড়া তারা কেবল বরকত ওয়ালা গাছ নির্ধারণ করার আবেদন করেছিলেন। তা থেকে বরকত গ্রহণ করেছেন- এমনটি প্রমাণিত নয়।
📄 ৯. আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে পশু যবেহ করার বিধান
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ ۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ
“তুমি বলো, আমার ছালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ, সবই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের উদ্দেশে নিবেদিত। তার কোন শরীক নেই। আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম আনুগত্যশীল”। (সূরা আন‘আম: ১৬২-১৬৩)
আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেছেন:
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
“তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে ছালাত পড়ো এবং কুরবানী করো”। (সূরা কাওছার: ২)
আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চারটি বিষয়ে আমাকে অবহিত করেছেন:
«لَعَنَ اللَّهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللَّهِ، لَعَنَ اللَّهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَيْهِ، لَعَنَ اللَّهُ مَنْ آوَى مُحْدِثًا، لَعَنَ اللَّهُ مَنْ غَيَّرَ مَنَارَ الْأَرْضِ»
“যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু যবেহ করে তার উপর আল্লাহর লা’নত। যে ব্যক্তি নিজ পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেয় তার উপর আল্লাহর লা’নত। যে ব্যক্তি কোনো বিদ‘আতীকে আশ্রয় দেয় তার উপর আল্লাহর লা’নত। যে ব্যক্তি যমীনের সীমানা পরিবর্তন করে, তার উপর আল্লাহর লা’নত”।
তারিক ইবনে শিহাব (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীছে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«دَخَلَ الْجَنَّةَ رَجُلٌ فِي ذُبَابٍ، وَدَخَلَ النَّارَ رَجُلٌ فِي ذُبَابٍ» ، قَالُوا: وَكَيْفَ ذَلِكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «مَرَّ رَجُلَانِ عَلَى قَوْمٍ لَهُمْ صَنَمٌ لَا يَجُوزُهُ أَحَدٌ حَتَّى يُقَرِّبَ لَهُ شَيْئًا، فَقَالُوا لِأَحَدِهِمَا: قَرِّبْ، قَالَ: لَيْسَ عِنْدِي شَيْءٌ أُقَرِّبُ، قَالُوا لَهُ: قَرِّبْ وَلَوْ ذُبَابًا، فَقَرَّبَ ذُبَابًا، فَخَلَّوْا سَبِيلَهُ، فَدَخَلَ النَّارَ، وَقَالُوا لِلْآخَرِ: قَرِّبْ، فَقَالَ: مَا كُنْتُ لِأُقَرِّبَ لِأَحَدٍ شَيْئًا دُونَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، فَضَرَبُوا عُنُقَهُ، فَدَخَلَ الْجَنَّةَ»
“এক ব্যক্তি একটি মাছির কারণে জান্নাতে প্রবেশ করেছে। আর এক ব্যক্তি একটি মাছির কারণে জাহান্নামে গিয়েছে। ছাহাবায়ে কেরাম বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, এমনটি কিভাবে হলো? তিনি বললেন: দু’জন লোক এমন একটি গোত্রের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল, যাদের একটি মূর্তি ছিল। উক্ত মূর্তির জন্য কোন কিছু উৎসর্গ না করে কেউ সে স্থান অতিক্রম করতো না। উক্ত কওমের লোকেরা দু’জনের একজনকে বললো, ‘মূর্তির জন্য তুমি কিছু নযরানা পেশ করো’। সে বললো, ‘নযরানা দেয়ার মত আমার কাছে কিছুই নেই। তারা বলল, ‘অন্তত: একটি মাছি হলেও নযরানা স্বরূপ দিয়ে যাও’। অতঃপর সে একটা মাছি মূর্তিকে উপহার দিল। তারা লোকটির পথ ছেড়ে দিল। এর ফলে সে জাহান্নামে গেল। অপর ব্যক্তিকে তারা বললো, “মূর্তিকে তুমিও কিছু নযরানা দিয়ে যাও। সে বলল: ‘একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নৈকট্য লাভের জন্য আমি কাউকে কোন নযরানা দেই না। এর ফলে তারা তার গর্দান উড়িয়ে দিল। এতে সে জান্নাতে প্রবেশ করল”।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়
১) قل إن صلاتي ونسكي -এর তাফসীর জানা গেল।
২) فصل لربك وانحر -এর তাফসীরও জানা গেল।
৩) অত্র অধ্যায়ে বর্ণিত হাদীছের শুরুতেই গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে পশু যবেহকারীর উপর লা’নত বর্ষণ করা হয়েছে।
৪) যে ব্যক্তি নিজ পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেয়, তার উপর আল্লাহর লা’নত। এর মধ্যে এ কথাও নিহিত আছে যে, তুমি কোন ব্যক্তির পিতা মাতাকে অভিশাপ দিলে সেও তোমার পিতা-মাতাকে অভিশাপ দিবে।
৫) যে ব্যক্তি কোন বিদ‘আতীকে অথবা অপরাধীকে আশ্রয় দেয়, তার উপর আল্লাহর লা’নত। বিদ‘আতী হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে দীনের মধ্যে এমন কোন নতুন বিষয় আবিষ্কার কিংবা এমন কোন অপরাধ করে, যাতে আল্লাহর কোন নির্ধারিত শাস্তি ওয়াজিব হয়ে যায়। এর ফলে সে এমন ব্যক্তির আশ্রয় চায়, যে তাকে উক্ত অপরাধের শাস্তি হতে রেহাই দিতে পারে।
৬) যে ব্যক্তি যমীনের সীমানা নির্ধারণের চিহ্ন (খুঁটি বা অন্য কোনো আলামত) পরিবর্তন করে, তার উপর আল্লাহর লা’নত। এটা এমন আলামত বা নিশানা, যা তোমার এবং তোমার প্রতিবেশীর যমীনের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে। এটা পরিবর্তনের অর্থ হচ্ছে, তার নির্ধারিত স্থান থেকে সীমানা এগিয়ে আনা অথবা পিছনে নিয়ে যাওয়া।
৭) নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর লা’নত এবং সাধারণভাবে পাপীদের উপর লা’নতের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
৮) এ অধ্যায়ে বর্ণিত বিরাট ঘটনাটি মাছির ঘটনা হিসাবে পরিচিত।
৯) মূর্তির (মাজারের বা দূর্গার) উদ্দেশ্যে একটি মাছি নযরানা হিসাবে পেশ করার কারণে লোকটি জাহান্নামে প্রবেশ করল। অথচ মূর্তির সন্তুষ্টি কিংবা নৈকট্য অর্জনের ইচ্ছা ছিল না। মূর্তি বা মাজারের খাদেমদের অনিষ্ট হতে বাঁচার উদ্দেশ্যেই সে মাছিটি নযরানা হিসাবে মূর্তিকে দিয়ে শিরকী কাজটি করেছিল।
১০) এ অধ্যায়ে বর্ণিত মাছির ঘটনা থেকে জানা গেল যে, মু’মিনের অন্তরে শিরক ও শিরকের ভয়াবহ পরিণামের কথা সদা জাগ্রত থাকে। এখান থেকে আরো জানা গেল যে, নিহত ব্যক্তি তাদের দাবির কাছে নতি স্বীকার না করে নিহত হয়ে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। অথচ তারা তার কাছে কেবলমাত্র বাহ্যিক আমল ছাড়া আর কিছুই দাবি করেনি।
১১) মাছির কারণে যে ব্যক্তি জাহান্নামে গিয়েছে সে ছিল একজন মুসলিম। সে যদি কাফের হত তাহলে এ কথা বলা হত না যে, دخل النـار فى ذابب “একটি মাছির কারণে সে জাহান্নামে প্রবেশ করেছে”। অর্থাৎ মূর্তির উদ্দেশ্যে মাছি পেশ করার পূর্বে সে জান্নাতে যাওয়ার যোগ্য ছিল।
১২) এতে ঐ ছহীহ হাদীছের পক্ষে সমর্থন পাওয়া যায়, যাতে বলা হয়েছে الجنـة اقـرب إلى أحـدكم مـن شـراك نعلـه والنـار مثـل ذلـك, “তোমাদের কারো জুতার ফিতার চেয়েও জান্নাত অধিক নিকটবর্তী। জাহান্নামও তদ্রূপ নিকটবর্তী।”
১৩) এটা জেনে নেয়া প্রয়োজন যে, অন্তরের আমলই মূল উদ্দেশ্য। এমনকি মূর্তি পূজারীদের কাছেও এ কথা স্বীকৃত।
টিকাঃ
৪৯. হাফেয ইবনে কাছীর (রহঃ) বলেন: উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা নাবী ﷺ কে আদেশ দিচ্ছেন, যেসব মুশরিক আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যের ইবাদত করে এবং আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যের নামে পশু যবাই করে, তিনি যেন তাদেরকে জানিয়ে দেন যে, তিনি কেবল আল্লাহর জন্যই ইখলাসের সাথে স্বীয় ছালাত আদায় ও কুরবানী করেন। অপর পক্ষে মুশরিকরা মূর্তি পূজা করে, মূর্তির জন্য যবেহ করে। সুতরাং আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর নাবীকে মুশরিকদের বিপরীত করার আদেশ দিয়েছেন এবং মুশরিকদের শিরক ও বিভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সাথে আরো আদেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন খাঁটি নিয়্যাতে এবং ইখলাসের সাথে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করেন।
৫০. তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেয়ার পর পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত হচ্ছে ইসলামের সর্ববৃহৎ ফরয ইবাদত।
আমার বেঁচে থাকা ও আমার মৃত্যু বরণ করা আল্লাহর জন্যই। অর্থাৎ জীবিত থাকা কালে আমি যেই সৎ আমল করি এবং যেই ঈমান ও আমল নিয়ে আমি মৃত্যু বরণ করবো, তার সবই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের জন্য। খালেসভাবে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই সম্পাদন করি। তাতে তাঁর কোনো শরীক নেই। আমাকে এই আদেশই করা হয়েছে। আর আমিই হচ্ছি সর্বপ্রথম মুসলিম। অর্থাৎ এই উম্মাতের সর্বপ্রথম মুসলিম হলাম আমি। এটিই হচ্ছে মুফাসসিরীনে কেরামদের কথা।
মোটকথা, উপরের আয়াতটি প্রমাণ করে যে, বান্দার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল কথা ও কাজের কোনো অংশই আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা বৈধ নয়। সে যেই হোক না কেন। সুতরাং যে ব্যক্তি ইবাদাতের কোন অংশ আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের জন্য নির্ধারণ করল, সে আল্লাহ্ তা‘আলা কর্তৃক নিষিদ্ধ শিরকেই লিপ্ত হল। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন:
وَأَنْ أَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا وَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُشْرِكِينَ
“তুমি একনিষ্ঠ হয়ে নিজেকে ঠিকভাবে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখো এবং কখনো মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত হয়ো না। (সূরা ইউনুস: ১০৫)
সম্পূর্ণ কুরআনেই ইবাদাতের ‡ক্ষেত্রে এই তাওহীদকে সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং তাতে তাওহীদের পূর্ণ বিবরণ ‡পশ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়; শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করা হয়েছে এবং শিরকের সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
৫১. ছহীহ মুসলিম হা/১৯৭৮, অধ্যায়: আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য পশু যবেহ করা হারাম। গাইরুল্লাহর নামে (আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে) যবেহ দুইভাগে বিভক্ত:
প্রথম প্রকার: নৈকট্যলাভ ও সম্মানের জন্য গাইরুল্লাহর নামে যবেহ করা। এটা শিরকে আকবার (বড় শিরক), যা মিল্লাত (ইসলাম) থেকে মানুষকে বের করে দেয়।
দ্বিতীয় প্রকার: আনন্দ ও আপ্যায়নের কারণে গাইরুল্লাহর নামে যবেহ করা। এটা যা মানুষকে মিল্লাত (ইসলাম) থেকে বের করে দেয় না। বরং এটা প্রচলিত রীতির অন্তর্ভূক্ত, যা কখনো কখনো কাঙ্খিত বিষয়ও বটে। এ ব্যাপারে মূলকথা হচ্ছে তা বৈধ। যদি সুলতান দেশে প্রবেশ করে, তখন আমরা তাদের জন্য যবেহ করি। যদি তাতে নৈকট্য (সওয়াব) লাভ বা সম্মানের জন্য হয়ে থাকে, তবে তা শিরকে আকবার বা বড় শিরক। কিন্তু যদি আপ্যায়ন বা আতিথেয়তার জন্য করা হয়ে থাকে, এরপর রান্না করা হয় এবং খাওয়া হয় তবে তা হবে আপ্যায়নের মধ্যে বিবেচিত। আর এটি শিরক নয়। [আল ক্বওলুল মুফীদ ১/২১৪]|
৫২. যে ব্যক্তি মূর্তির জন্য একটি মাছি কুরবানী করেছিল, তার পরিণতি যদি এমন হয়ে থাকে, তাহলে যে ব্যক্তি উট, গরু এবং ছাগল মোটা তাজা বানায় এবং ‡সগুলোকে আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যান্য বস্তু যেমন মৃত অথবা অনুপস্থিত অলী-আওলিয়া, কিংবা তাগূত, মাযার, গাছ, পাথর অথবা অনুরূপ বস্তুর ইবাদত করে এবং তার জন্য পশু যবেহ করে, তার পরিণতি কেমন হবে? অবশ্যই আরো অধিক ভয়াবহ হবে।
উম্মাতে মুহাম্মাদীর আখিরী যামানায় মুসলিম পরিচয় ধারণকারী অনেক মুশরিক রয়েছে, যারা তাদের বাতিল মা‘বূদদের জন্য যবেহ করাকে ঈদুল আযহার দিন কুরবানীর চেয়ে অধিক উত্তম মনে করে। তাদের কেউ কেউ ঈদুল আযহায় কুরবানী যবেহ করার পরিবর্তে অলী আওলিয়ার মাযার ও দরগায় পশু যবেহ করাকে যথেষ্ট মনে করে। তারা আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যান্য যে সব বস্তুর ইবাদত করে ঐ সকল বস্তুর প্রতি তাদের প্রবল আগ্রহ থাকার কারণে, ‡সগুলোকে অত্যাধিক সম্মান করার কারণে এবং তাদের কাছ থেকে কল্যাণ কামনার কারণেই তারা এরূপ করে থাকে। শুধু তাই নয়, এর চেয়ে অধিক ভয়াবহ শিরকও বর্তমানে ছড়িয়ে পড়েছে।
৫৩. ছহীহ মওকূফ: মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ১০/৯৯, হা/৩৩৭০৯, বায়হাকী শুআবুল ঈমান ৫/৪৮৫, আহমাদ ২/৭৫। হাদীছের এ অংশ থেকে জানা যাচ্ছে যে, ঈমানদারদের অন্তরে শিরকের ভয়াবহতা অত্যন্ত বড় ও বিপদজনক বলে অনুভূত হয় এবং তারা শিরককে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে।
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ ۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ
“তুমি বলো, আমার ছালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ, সবই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের উদ্দেশে নিবেদিত। তার কোন শরীক নেই। আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম আনুগত্যশীল”।
আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেছেন:
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
“তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে ছালাত পড়ো এবং কুরবানী করো”।
আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চারটি বিষয়ে আমাকে অবহিত করেছেন:
«لَعَنَ اللَّهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللَّهِ، لَعَنَ اللَّهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَيْهِ، لَعَنَ اللَّهُ مَنْ آوَى مُحْدِثًا، لَعَنَ اللَّهُ مَنْ غَيَّرَ مَنَارَ الْأَرْضِ»
“যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু যবেহ করে তার উপর আল্লাহর লা’নত। যে ব্যক্তি নিজ পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেয় তার উপর আল্লাহর লা’নত। যে ব্যক্তি কোনো বিদ‘আতীকে আশ্রয় দেয় তার উপর আল্লাহর লা’নত। যে ব্যক্তি যমীনের সীমানা পরিবর্তন করে, তার উপর আল্লাহর লা’নত”।
তারিক ইবনে শিহাব (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীছে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«دَخَلَ الْجَنَّةَ رَجُلٌ فِي ذُبَابٍ، وَدَخَلَ النَّارَ رَجُلٌ فِي ذُبَابٍ» ، قَالُوا: وَكَيْفَ ذَلِكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «مَرَّ رَجُلَانِ عَلَى قَوْمٍ لَهُمْ صَنَمٌ لَا يَجُوزُهُ أَحَدٌ حَتَّى يُقَرِّبَ لَهُ شَيْئًا، فَقَالُوا لِأَحَدِهِمَا: قَرِّبْ، قَالَ: لَيْسَ عِنْدِي شَيْءٌ أُقَرِّبُ، قَالُوا لَهُ: قَرِّبْ وَلَوْ ذُبَابًا، فَقَرَّبَ ذُبَابًا، فَخَلَّوْا سَبِيلَهُ، فَدَخَلَ النَّارَ، وَقَالُوا لِلْآخَرِ: قَرِّبْ، فَقَالَ: مَا كُنْتُ لِأُقَرِّبَ لِأَحَدٍ شَيْئًا دُونَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، فَضَرَبُوا عُنُقَهُ، فَدَخَلَ الْجَنَّةَ»
“এক ব্যক্তি একটি মাছির কারণে জান্নাতে প্রবেশ করেছে। আর এক ব্যক্তি একটি মাছির কারণে জাহান্নামে গিয়েছে। ছাহাবায়ে কেরাম বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, এমনটি কিভাবে হলো? তিনি বললেন: দু’জন লোক এমন একটি গোত্রের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল, যাদের একটি মূর্তি ছিল। উক্ত মূর্তির জন্য কোন কিছু উৎসর্গ না করে কেউ সে স্থান অতিক্রম করতো না। উক্ত কওমের লোকেরা দু’জনের একজনকে বললো, ‘মূর্তির জন্য তুমি কিছু নযরানা পেশ করো’। সে বললো, ‘নযরানা দেয়ার মত আমার কাছে কিছুই নেই। তারা বলল, ‘অন্তত: একটি মাছি হলেও নযরানা স্বরূপ দিয়ে যাও’। অতঃপর সে একটা মাছি মূর্তিকে উপহার দিল। তারা লোকটির পথ ছেড়ে দিল। এর ফলে সে জাহান্নামে গেল। অপর ব্যক্তিকে তারা বললো, “মূর্তিকে তুমিও কিছু নযরানা দিয়ে যাও। সে বলল: ‘একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নৈকট্য লাভের জন্য আমি কাউকে কোন নযরানা দেই না। এর ফলে তারা তার গর্দান উড়িয়ে দিল। এতে সে জান্নাতে প্রবেশ করল”।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়
১) قل إن صلاتي ونسكي -এর তাফসীর জানা গেল।
২) فصل لربك وانحر -এর তাফসীরও জানা গেল।
৩) অত্র অধ্যায়ে বর্ণিত হাদীছের শুরুতেই গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে পশু যবেহকারীর উপর লা’নত বর্ষণ করা হয়েছে।
৪) যে ব্যক্তি নিজ পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেয়, তার উপর আল্লাহর লা’নত। এর মধ্যে এ কথাও নিহিত আছে যে, তুমি কোন ব্যক্তির পিতা মাতাকে অভিশাপ দিলে সেও তোমার পিতা-মাতাকে অভিশাপ দিবে।
৫) যে ব্যক্তি কোন বিদ‘আতীকে অথবা অপরাধীকে আশ্রয় দেয়, তার উপর আল্লাহর লা’নত। বিদ‘আতী হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে দীনের মধ্যে এমন কোন নতুন বিষয় আবিষ্কার কিংবা এমন কোন অপরাধ করে, যাতে আল্লাহর কোন নির্ধারিত শাস্তি ওয়াজিব হয়ে যায়। এর ফলে সে এমন ব্যক্তির আশ্রয় চায়, যে তাকে উক্ত অপরাধের শাস্তি হতে রেহাই দিতে পারে।
৬) যে ব্যক্তি যমীনের সীমানা নির্ধারণের চিহ্ন (খুঁটি বা অন্য কোনো আলামত) পরিবর্তন করে, তার উপর আল্লাহর লা’নত। এটা এমন আলামত বা নিশানা, যা তোমার এবং তোমার প্রতিবেশীর যমীনের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে। এটা পরিবর্তনের অর্থ হচ্ছে, তার নির্ধারিত স্থান থেকে সীমানা এগিয়ে আনা অথবা পিছনে নিয়ে যাওয়া।
৭) নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর লা’নত এবং সাধারণভাবে পাপীদের উপর লা’নতের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
৮) এ অধ্যায়ে বর্ণিত বিরাট ঘটনাটি মাছির ঘটনা হিসাবে পরিচিত।
৯) মূর্তির (মাজারের বা দূর্গার) উদ্দেশ্যে একটি মাছি নযরানা হিসাবে পেশ করার কারণে লোকটি জাহান্নামে প্রবেশ করল। অথচ মূর্তির সন্তুষ্টি কিংবা নৈকট্য অর্জনের ইচ্ছা ছিল না। মূর্তি বা মাজারের খাদেমদের অনিষ্ট হতে বাঁচার উদ্দেশ্যেই সে মাছিটি নযরানা হিসাবে মূর্তিকে দিয়ে শিরকী কাজটি করেছিল।
১০) এ অধ্যায়ে বর্ণিত মাছির ঘটনা থেকে জানা গেল যে, মু’মিনের অন্তরে শিরক ও শিরকের ভয়াবহ পরিণামের কথা সদা জাগ্রত থাকে। এখান থেকে আরো জানা গেল যে, নিহত ব্যক্তি তাদের দাবির কাছে নতি স্বীকার না করে নিহত হয়ে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। অথচ তারা তার কাছে কেবলমাত্র বাহ্যিক আমল ছাড়া আর কিছুই দাবি করেনি।
১১) মাছির কারণে যে ব্যক্তি জাহান্নামে গিয়েছে সে ছিল একজন মুসলিম। সে যদি কাফের হত তাহলে এ কথা বলা হত না যে, دخل النـار فى ذابب “একটি মাছির কারণে সে জাহান্নামে প্রবেশ করেছে”। অর্থাৎ মূর্তির উদ্দেশ্যে মাছি পেশ করার পূর্বে সে জান্নাতে যাওয়ার যোগ্য ছিল।
১২) এতে ঐ ছহীহ হাদীছের পক্ষে সমর্থন পাওয়া যায়, যাতে বলা হয়েছে الجنـة اقـرب إلى أحـدكم مـن شـراك نعلـه والنـار مثـل ذلـك, “তোমাদের কারো জুতার ফিতার চেয়েও জান্নাত অধিক নিকটবর্তী। জাহান্নামও তদ্রূপ নিকটবর্তী।”
১৩) এটা জেনে নেয়া প্রয়োজন যে, অন্তরের আমলই মূল উদ্দেশ্য। এমনকি মূর্তি পূজারীদের কাছেও এ কথা স্বীকৃত।
টিকাঃ
৪৯. হাফেয ইবনে কাছীর (রহঃ) বলেন: উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা নাবী ﷺ কে আদেশ দিচ্ছেন, যেসব মুশরিক আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যের ইবাদত করে এবং আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যের নামে পশু যবাই করে, তিনি যেন তাদেরকে জানিয়ে দেন যে, তিনি কেবল আল্লাহর জন্যই ইখলাসের সাথে স্বীয় ছালাত আদায় ও কুরবানী করেন। অপর পক্ষে মুশরিকরা মূর্তি পূজা করে, মূর্তির জন্য যবেহ করে। সুতরাং আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর নাবীকে মুশরিকদের বিপরীত করার আদেশ দিয়েছেন এবং মুশরিকদের শিরক ও বিভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সাথে আরো আদেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন খাঁটি নিয়্যাতে এবং ইখলাসের সাথে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করেন।
৫০. তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেয়ার পর পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত হচ্ছে ইসলামের সর্ববৃহৎ ফরয ইবাদত।
আমার বেঁচে থাকা ও আমার মৃত্যু বরণ করা আল্লাহর জন্যই। অর্থাৎ জীবিত থাকা কালে আমি যেই সৎ আমল করি এবং যেই ঈমান ও আমল নিয়ে আমি মৃত্যু বরণ করবো, তার সবই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের জন্য। খালেসভাবে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই সম্পাদন করি। তাতে তাঁর কোনো শরীক নেই। আমাকে এই আদেশই করা হয়েছে। আর আমিই হচ্ছি সর্বপ্রথম মুসলিম। অর্থাৎ এই উম্মাতের সর্বপ্রথম মুসলিম হলাম আমি। এটিই হচ্ছে মুফাসসিরীনে কেরামদের কথা।
মোটকথা, উপরের আয়াতটি প্রমাণ করে যে, বান্দার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল কথা ও কাজের কোনো অংশই আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা বৈধ নয়। সে যেই হোক না কেন। সুতরাং যে ব্যক্তি ইবাদাতের কোন অংশ আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের জন্য নির্ধারণ করল, সে আল্লাহ্ তা‘আলা কর্তৃক নিষিদ্ধ শিরকেই লিপ্ত হল। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন:
وَأَنْ أَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا وَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُشْرِكِينَ
“তুমি একনিষ্ঠ হয়ে নিজেকে ঠিকভাবে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখো এবং কখনো মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত হয়ো না। (সূরা ইউনুস: ১০৫)
সম্পূর্ণ কুরআনেই ইবাদাতের ‡ক্ষেত্রে এই তাওহীদকে সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং তাতে তাওহীদের পূর্ণ বিবরণ ‡পশ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়; শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করা হয়েছে এবং শিরকের সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
৫১. ছহীহ মুসলিম হা/১৯৭৮, অধ্যায়: আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য পশু যবেহ করা হারাম। গাইরুল্লাহর নামে (আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে) যবেহ দুইভাগে বিভক্ত:
প্রথম প্রকার: নৈকট্যলাভ ও সম্মানের জন্য গাইরুল্লাহর নামে যবেহ করা। এটা শিরকে আকবার (বড় শিরক), যা মিল্লাত (ইসলাম) থেকে মানুষকে বের করে দেয়।
দ্বিতীয় প্রকার: আনন্দ ও আপ্যায়নের কারণে গাইরুল্লাহর নামে যবেহ করা। এটা যা মানুষকে মিল্লাত (ইসলাম) থেকে বের করে দেয় না। বরং এটা প্রচলিত রীতির অন্তর্ভূক্ত, যা কখনো কখনো কাঙ্খিত বিষয়ও বটে। এ ব্যাপারে মূলকথা হচ্ছে তা বৈধ। যদি সুলতান দেশে প্রবেশ করে, তখন আমরা তাদের জন্য যবেহ করি। যদি তাতে নৈকট্য (সওয়াব) লাভ বা সম্মানের জন্য হয়ে থাকে, তবে তা শিরকে আকবার বা বড় শিরক। কিন্তু যদি আপ্যায়ন বা আতিথেয়তার জন্য করা হয়ে থাকে, এরপর রান্না করা হয় এবং খাওয়া হয় তবে তা হবে আপ্যায়নের মধ্যে বিবেচিত। আর এটি শিরক নয়। [আল ক্বওলুল মুফীদ ১/২১৪]|
৫২. যে ব্যক্তি মূর্তির জন্য একটি মাছি কুরবানী করেছিল, তার পরিণতি যদি এমন হয়ে থাকে, তাহলে যে ব্যক্তি উট, গরু এবং ছাগল মোটা তাজা বানায় এবং ‡সগুলোকে আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যান্য বস্তু যেমন মৃত অথবা অনুপস্থিত অলী-আওলিয়া, কিংবা তাগূত, মাযার, গাছ, পাথর অথবা অনুরূপ বস্তুর ইবাদত করে এবং তার জন্য পশু যবেহ করে, তার পরিণতি কেমন হবে? অবশ্যই আরো অধিক ভয়াবহ হবে।
উম্মাতে মুহাম্মাদীর আখিরী যামানায় মুসলিম পরিচয় ধারণকারী অনেক মুশরিক রয়েছে, যারা তাদের বাতিল মা‘বূদদের জন্য যবেহ করাকে ঈদুল আযহার দিন কুরবানীর চেয়ে অধিক উত্তম মনে করে। তাদের কেউ কেউ ঈদুল আযহায় কুরবানী যবেহ করার পরিবর্তে অলী আওলিয়ার মাযার ও দরগায় পশু যবেহ করাকে যথেষ্ট মনে করে। তারা আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যান্য যে সব বস্তুর ইবাদত করে ঐ সকল বস্তুর প্রতি তাদের প্রবল আগ্রহ থাকার কারণে, ‡সগুলোকে অত্যাধিক সম্মান করার কারণে এবং তাদের কাছ থেকে কল্যাণ কামনার কারণেই তারা এরূপ করে থাকে। শুধু তাই নয়, এর চেয়ে অধিক ভয়াবহ শিরকও বর্তমানে ছড়িয়ে পড়েছে।
৫৩. ছহীহ মওকূফ: মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ১০/৯৯, হা/৩৩৭০৯, বায়হাকী শুআবুল ঈমান ৫/৪৮৫, আহমাদ ২/৭৫। হাদীছের এ অংশ থেকে জানা যাচ্ছে যে, ঈমানদারদের অন্তরে শিরকের ভয়াবহতা অত্যন্ত বড় ও বিপদজনক বলে অনুভূত হয় এবং তারা শিরককে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে।
📄 ১০. যে স্থানে গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু যবেহ করা হয়
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
لَا تَقُمْ فِيهِ أَبَدًا ۚ لَّمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَىٰ مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَن تَقُومَ فِيهِ ۚ فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَن يَتَطَهَّرُوا ۚ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ
“তুমি কখনো সেখানে দাঁড়াবে না, তবে যে মাসজিদের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে তাকওয়ার উপর প্রথম দিন থেকেই, সেটিই তোমার দাঁড়াবার যোগ্য স্থান। সেখানে রয়েছে এমন লোক, যারা পবিত্রতা অর্জন করাকে ভালবাসে। আর আল্লাহ পবিত্র লোকদের ভালবাসেন”। (সূরা আত তাওবা: ১০৮)
ছাবিত বিন যাহ্হাক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:
نَذَرَ رَجُلٌ أَنْ يَنْحَرَ إِبِلًا بِبُوَانَةَ، فَسَأَلَهُ النَّبِيُّ - صلى الله عليه وسلم - فَقَالَ: «هَلْ كَانَ فِيهَا وَثَنٌ مِنْ أَوْثَانِ الْجَاهِلِيَّةِ يُعْبَدُ؟ » قَالُوا: لَا، قَالَ: «فَهَلْ كَانَ فِيهَا عِيدٌ مِنْ أَعْيَادِهِمْ؟ » قَالُوا: لَا، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ؟ : «أَوْفِ بِنَذْرِكَ، فَإِنَّهُ لَا وَفَاءَ لِنَذْرٍ فِي مَعْصِيَةِ اللَّهِ، وَلَا فِيمَا لَا يَمْلِكُ ابْنُ آدَمَ»
এক ব্যক্তি নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যামানায় বুওয়ানা নামক স্থানে একটি উট কুরবানী করার মানত করল। তখন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, সেই স্থানে এমন কোনো মূর্তি ছিল কি, জাহেলী যুগে যার পূজা করা হতো? ছাহাবায়ে কেরাম বললেন, ‘না’। তিনি বললেন, সেই স্থানে কি তাদের কোন উৎসব বা মেলা অনুষ্ঠিত হতো? তারা বললেন, ‘না’ অর্থাৎ এমন কিছু হতো না তখন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তাহলে তুমি তোমার মানত পূর্ণ করো। তিনি আরো বলেন, আল্লাহর নাফরমানী মূলক কাজে মানত পূর্ণ করা যাবে না। আদম সন্তান যা করতে সক্ষম নয় তেমন মানতও পূরণ করা আবশ্যক নয়”। [ছহীহ: সুনানে আবু দাউদ হা/৩৩১৩|]
এ অধ্যায় থেকে যে সব বিষয় জানা যায় তা নিম্নরূপ:
শিরোণামের সাথে সূরা তাওবার ১০৭ নং আয়াতের সামঞ্জস্য এভাবে করা হয়েছে যে, যে সমস্ত স্থান আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যের উদ্দেশে পশু যবেহ করার জন্য এবং অন্যান্য শিরকী কাজ-কর্মের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, সে সমস্ত স্থানে আল্লাহর জন্য পশু যবেহ করা ‡থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। তেমনি মুনাফিকদের যিরার মাসজিদটি যেহেতু আল্লাহর নাফরমানী এবং কুফরীর আড্ডা হিসাবে প্রস্তুত করা হয়েছে, তাই সেটি আল্লাহর গযবের স্থানে পরিণত হয়েছে। সুতরাং তাতে ছালাত পড়া বৈধ নয়। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নাবীকে সেখানে ছালাত পড়তে নিষেধ করেছেন। যদিও আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নাবীকে নির্দিষ্ট একটি স্থানে (যিরার মাসজিদে) প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার হুকুম আম তথা ব্যাপক। সে হিসাবে যে সমস্ত স্থান যেমন মাযার, দূর্গা ইত্যাদি যিরার মাসজিদের মত পাপ কাজের জন্য প্রস্তুত করা হবে, সেগুলোর হুকুম যিরার মাসজিদের অনুরূপ। কেননা পাপকাজ সেই স্থানকে অপবিত্র বানিয়ে ফেলেছে এবং তাতে আল্লাহর ইবাদত করা হতেও বারণ করা হয়েছে।
১) সূরা আত তাওবার ১০৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যা জানা গেল। যে সমস্ত স্থানে পাপ কাজ হয়, সেখানে আল্লাহর ইবাদতের জন্য দাঁড়ানো যাবে না।
২) যে যমীনে শিরক এবং অন্যান্য পাপের কাজ করা হয় সে যমীনে পাপ কাজের প্রভাব পড়তে পারে। তেমনি যে যমীনে আল্লাহর আনুগত্যের কাজ করা হয় তাতেও ভাল কাজের প্রভাব পড়ে।
৩) দুর্বোধ্যতা দূর করার জন্য কঠিন বিষয়কে সুস্পষ্ট ও সহজ বিষয়ের দিকে নিয়ে যাওয়া উচিত।
৪) প্রয়োজন বোধে মুফতী বিস্তারিত বিবরণ প্রশ্নকারীর কাছে চাইতে পারেন।
৫) মানতের মাধ্যমে কোনো স্থানকে খাস করা কোন দোষের বিষয় নয়, যদি তাতে শরী‘আতের কোনো বাধা না থাকে।
৬) জাহেলী যুগের মূর্তি থাকলে তা দূর করার পরও সেখানে মানত করতে নিষেধ করা হয়েছে।
৭) কোনো স্থানে জাহেলী যুগের কোনো উৎসব বা মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকলে, তা বন্ধ করার পরও সেখানে মুসলমানদের মানত করা নিষিদ্ধ।
৮) এসব স্থানের মানত পূরণ করা জায়েয নয়। কেননা এটা পাপ কাজের মানত।
৯) মুশরিকদের উৎসব বা মেলার সাদৃশ্য করা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। যদিও তাদের অনুসরণ করার উদ্দেশ্য না থাকে।
১০) পাপের কাজে কোনো মানত করা যাবে না।
১১) যে জিনিস আদম সন্তানের মালিকানাধীন নয়, তা মানত করা সঠিক নয়।
টিকাঃ
৫৫. বিপ্লবী সংস্কারক মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব (রহঃ) এর তাওহীদী আন্দোলনের পূর্বে নজদ এবং অন্যান্য অঞ্চলের লোকেরা যে সমস্ত শিরকী কাজ-কর্মে লিপ্ত ছিল লেখক এখানে ঐ সমস্ত শিরকী কাজ-কর্মের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। নজদের লোকেরা তখন তাদের রোগীদের আরোগ্য লাভের জন্য জ্বিনের জন্য পশু যবেহ করত। জ্বিনদের জন্য পশু যবেহ করার জন্য তারা তাদের ঘরের মধ্যে নির্দিষ্ট একটি স্থান নির্ধারণ করে রাখত। শাইখের দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা শিরকের মূলোৎপাটন করেছেন। দ্বীনের এই যুগশ্রেষ্ঠ দাঈ এককভাবে আল্লাহর ইবাদাতের প্রতি যেই দাওয়াত দিয়েছেন, সেই দাওয়াতের বরকতে আরব ভূখন্ড থেকে শিরক, বিদ‘আত ও আকীদার বিভ্রান্তির অবসান ঘটেছে। এ জন্য আমরা আল্লাহর প্রশংসা করছি এবং তার কাছেই কৃতজ্ঞতা পেশ করছি।
৫৬. যে মসজিদ প্রথম দিন থেকে তাকওয়ার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল সেই মাসজিদটিতে ইবাদাতের জন্য দাঁড়ানোই তোমার পক্ষে অধিকতর সমীচীন। ‡সেখানে এমন ‡লোক আছে যারা পাক-পবিত্র থাকা পছন্দ করে এবং আল্লাহ তা‘আলা পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে ভালবাসেন। এটি হচ্ছে কুবা মাসজিদ। নাবী ﷺ মক্কা হতে হিজরত করে মদীনায় পদার্পণ করেই তাকওয়ার ভিত্তির উপর এই মাসজিদটি নির্মাণ করেছেন।
তাবূক যুদ্ধে ‡বর হওয়ার পূর্বে মুনাফেকরা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার জন্য বাহ্যিকভাবে মাসজিদে যিরার নির্মাণ করল। নাবী ﷺ যখন তাবূক যুদ্ধে বের হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন, তখন মুনাফেকদের একটি দল তাঁর কাছে প্রস্তাব করল: হে আল্লাহর রাসূল! বৃষ্টি ও শীতের রাতে আমাদের দুর্বল ও বৃদ্ধদের পক্ষে আপনার মাসজিদে এসে ছালাত আদায় করা কষ্টকর। তাই আমরা তাদের জন্য আমাদের মহল্লায় একটি মাসজিদ নির্মাণ করেছি। আপনি গিয়ে সেখানে ছালাত পড়ে মাসজিদটি উদ্বোধন করে দিলেই সেটির বৈধতা প্রমাণিত হয়ে যাবে। নাবী ﷺ তখন বললেন: আমি এখন তাবূক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত আছি। আল্লাহর ইচ্ছায় যখন ফেরত আসব, তখন যাবো। এভাবে মূলত তাদের সাথে একটা মৌখিক অঙ্গীকার হয়ে গেল।
তাবূকের পথে রওয়ানা হওয়ার পর এ মুনাফিকরা উক্ত মাসজিদে নিজেদের ‡জোট গড়ে তুলতে এবং ষড়যন্ত্র পাকাতে লাগলো।
এমনকি তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, ‡রোমানদের হাতে মুসলমানদের মূলোৎপাটনের সাথে সাথেই আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মাথায় রাজ মুকুট পরিয়ে ‡দবে। কিন্তু তাবূকে যা ঘটলো তাতে তাদের ‡স আশার গুড়ে বালি পড়লো। ‡ফরার পথে নাবী ﷺ যখন মদীনার নিকটবর্তী "যী আওয়ান" নামক স্থানে ‡পৌঁছলেন এবং মদীনায় প্রবেশ করতে মাত্র একদিনের রাস্তা কিংবা তার চেয়েও কম রাস্তা বাকী থাকল, তখন মাসজিদটির আসল খবরসহ ওহী আগমন করল। আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর নাবীকে মাসজিদটি নির্মাণের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানিয়ে দিলেন। তিনি তখনই কয়েকজন ‡লোককে মদীনায় পাঠিয়ে দিলেন। তাদেরকে দায়িত্ব দিলেন, তিনি মদীনায় ‡ফেরত আসার আগেই ‡যেন তারা যিরার মাসজিদটি ‡ভেঙ্গে ধুলিস্যাৎ করে ‡দেন।