📄 সে বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 ৩. শিরক হতে ভয়-ভীতি সম্পর্কে
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ
“আল্লাহ তার সাথে শিরক করার গুনাহ মাফ করবেন না। শিরক ছাড়া (নিম্নস্তরের) অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দিবেন।” (সূরা আন নিসা: ৪৮)
ইবরাহীম খলীল আলাইহিম সালাম আল্লাহ তা‘আলার কাছে এ দু‘আ করেছিলেন,
وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَن نَّعْبُدَ الْأَصْنَامَ
“আমাকে এবং আমার সন্তানদের মূর্তিপূজা থেকে রক্ষা করো” (সূরা ইবরাহীম: ৩৫)
হাদীছে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
«أَخْوَفُ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ، فَسُئِلَ عَنْهُ، فَقَالَ: الرِّيَاءُ»
“আমি তোমাদের জন্য যে জিনিসের সবচেয়ে বেশী ভয় করি তা হচ্ছে শিরকে আসগর অর্থাৎ ছোট শিরক”। শিরকে আসগর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বললেন, ছোট শিরক হচ্ছে “রিয়া” অর্থাৎ মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করা। ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ نِدًّا دَخَلَ النَّارَ»
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অনুরূপ কাউকে আহবান করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে”।
ছহীহ মুসলিমে জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«مَنْ لَقِيَ اللَّهَ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَمَنْ لَقِيَهُ يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ»
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তার সাথে কাউকে শরীক করে মৃত্যুবরণ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে”।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) শিরককে ভয় করে চলতে হবে।
২) রিয়া শিরকের মধ্যে শামিল।
৩) রিয়া ছোট শিরকের অন্তর্ভূক্ত।
৪) সৎ লোকদের জন্য ভয়ের বস্তুসমূহের মধ্যে সর্বাধিক ভীতিপ্রদ বিষয় হচ্ছে শিরকে আসগর তথা ছোট শিরক।
৫) জান্নাত ও জাহান্নাম মানুষের একদম কাছাকাছি।
৬) জান্নাত ও জাহান্নাম নিকটবর্তী হওয়ার বিষয়টি একই হাদীছে বর্ণিত হয়েছে।
৭) আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে মৃত্যুবরণ করলে মৃত ব্যক্তি জান্নাতে যাবে। পক্ষান্তরে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক বানিয়ে মৃত্যুবরণ করলে মৃত ব্যক্তি যত বড় ইবাদতকারীই হোক না কেন, সে জাহান্নামে যাবে।
টিকাঃ
২৪. ছহীহ: মুসনাদে আহমাদ ৫/৪২৮-৪২৯, আছ-ছহীহা, হা/৯৫১।
২৫. ছহীহ বুখারী, হা/৪৪৯৭, ছহীহ মুসলিম হা/৯২।
২৬. ছহীহ মুসলিম, হা/৯৩।
📄 ৪. ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর সাক্ষ্যদানের প্রতি আহবান
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
قُلْ هَٰذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ ۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي ۖ وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ
“তুমি বলে দাও! এটিই আমার পথ। পূর্ণ প্রজ্ঞার সাথে আমি এবং আমার অনুসারীরা আল্লাহর দিকে আহবান জানাই। আল্লাহ পবিত্র। আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভূক্ত নই”। (সূরা ইউসূফ: ১০৮)
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মুআয (রাঃ) কে ইয়ামানে পাঠালেন, তখন তিনি বললেন,
«إِنَّكَ تَأْتِي قَوْمًا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ، فَلْيَكُنْ أَوَّلَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ شَهَادَةُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، (وَفِي رِوَايَةٍ: إِلَى أَنْ يُوَحِّدُوا اللَّهَ)، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوكَ لِذَلِكَ فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللَّهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِي كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوكَ لِذَلِكَ فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللَّهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ، فَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوكَ لِذَلِكَ فَإِيَّاكَ وَكَرَائِمَ أَمْوَالِهِمْ، وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ»
“তুমি এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে যাচ্ছ যারা আহলে কিতাব। সর্ব প্রথম যে জিনিসের দিকে তুমি তাদেরকে আহবান জানাবে তা হচ্ছে, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ”এর সাক্ষ্য দান করা”। অন্য বর্ণনায় আছে, তুমি তাদেরকে এককভাবে আল্লাহর ইবাদত করার আহবান জানাবে। এ বিষয়ে তারা যদি তোমার আনুগত্য করে তবে তাদেরকে জানিয়ে দিও যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত ছলাত ফরয করেছেন। এ ব্যাপারে তারা যদি তোমার কথা মেনে নেয় তবে তাদেরকে জানিয়ে দিও যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর যাকাত ফরয করেছেন, যা বিত্তশালীদের কাছ থেকে নিয়ে গরীবদেরকে দেয়া হবে। তারা যদি এ ব্যাপারে তোমার আনুগত্য করে তবে তাদের উৎকৃষ্ট মালের ব্যাপারে খুব সাবধান থাকবে। আর মযলুমের বদ দু‘আকে পরিহার করে চলবে। কেননা মযলুমের ফরিয়াদ এবং আল্লাহ তা‘আলার মাঝে কোনো পর্দা নেই”।
ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমে সাহল ইবনে সা‘দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বারের যুদ্ধের দিন বলেন,
«لَأُعْطِيَنَّ الرَّايَةَ غَدًا رَجُلًا يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ، وَيُحِبُّهُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ، يَفْتَحُ اللَّهُ عَلَى يَدَيْهِ»، فَبَاتَ النَّاسُ يَدُوكُونَ لَيْلَتَهُمْ أَيُّهُمْ يُعْطَاهَا، فَلَمَّا أَصْبَحُوا غَدَوْا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - كُلُّهُمْ يَرْجُو أَنْ يُعْطَاهَا، فَقَالَ: «أَيْنَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ؟» ، فَقِيلَ: هُوَ يَشْتَكِي عَيْنَيْهِ، فَأَرْسَلُوا إِلَيْهِ فَأُتِيَ بِهِ، فَبَصَقَ فِي عَيْنَيْهِ وَدَعَا لَهُ، فَبَرَأَ كَأَنْ لَمْ يَكُنْ بِهِ وَجَعٌ، فَأَعْطَاهُ الرَّايَةَ، فَقَالَ: «انْفُذْ عَلَى رِسْلِكَ حَتَّى تَنْزِلَ بِسَاحَتِهِمْ، ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ وَأَخْبِرْهُمْ بِمَا يَجِبُ عَلَيْهِمْ مِنْ حَقِّ اللَّهِ تَعَالَى فِيهِ، فَوَاللَّهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ»
“আগামীকাল এমন ব্যক্তিকে আমি ঝাণ্ডা প্রদান করব যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসে এবং আল্লাহ ও তার রাসূলও তাকে ভালবাসেন। তার হাতে আল্লাহ তা‘আলা বিজয় দান করবেন। কাকে ঝাণ্ডা প্রদান করা হবে এ উৎকণ্ঠা ও ব্যাকুলতার মধ্যে লোকজন রাত্রিযাপন করল। যখন সকাল হলো, তখন লোকজন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হল। তাদের প্রত্যেকেই আশা করছিল যে, ঝাণ্ডা তাকেই দেয়া হবে, তখন তিনি বললেন, আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) কোথায়? বলা হলো, তিনি চক্ষুর পীড়ায় আক্রান্ত। তাকে ডেকে পাঠানো হল। রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উভয় চোখে থুথু লাগিয়ে দিলেন এবং তার জন্য দু‘আ করলেন। এতে তিনি এমন সুস্থ হলেন যে, মনে হচ্ছিল, তার চোখে কোনো অসুখই ছিল না। অতঃপর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার হাতে ঝাণ্ডা প্রদান করলেন এবং বললেন: তুমি ধীরস্থিরতার সাথে অগ্রসর হও। তুমি যখন তাদের আঙ্গিনায় অবতরণ করবে, তখন তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করবে। অতঃপর তাদের উপর আল্লাহ তা‘আলার যে হক্ রয়েছে, সে সম্পর্কে তাদেরকে জানিয়ে দাও। আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তা‘আলা যদি তোমার মাধ্যমে একজন লোককেও হিদায়াত করেন তাহলে তোমার জন্য এটি হবে লাল উট অপেক্ষা উত্তম।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে অনুসরণকারীর নীতি ও পথ হচ্ছে আল্লাহর দিকে মানুষকে আহবান করা।
২) ইখলাসের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা। কেননা অনেক লোক হকের পথে মানুষকে আহবান জানালেও মূলত তারা নিজের নফস বা স্বার্থের দিকেই আহবান জানায়।
৩) তাওহীদের দাওয়াতের জন্য জ্ঞান ও প্রজ্ঞা থাকা অপরিহার্য।
৪) উত্তম তাওহীদের প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার প্রতি গাল-মন্দ আরোপ করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র থাকা।
৫) আল্লাহ তা‘আলার প্রতি গাল-মন্দ আরোপ করা নিকৃষ্ট শিরকের অন্তর্ভূক্ত।
৬) তাওহীদই হচ্ছে সর্বপ্রথম ফরয।
৭) সর্বাগ্রে এমন কি ছালাতেরও পূর্বে তাওহীদের প্রতি আহবান করতে হবে।
৮) আল্লাহর একত্বের ঘোষণা করার অর্থ হচ্ছে, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর সাক্ষ্য প্রদান করা। অর্থাৎ “আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত সত্য কোন ইলাহ নেই” এ ঘোষণা দেয়া।
৯) একজন মানুষ আহলে কিতাবের অন্তর্ভূক্ত হওয়া সত্ত্বেও সে তাওহীদ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতে পারে কিংবা তাওহীদের জ্ঞান থাকলেও সে অনুযায়ী আমল নাও করতে পারে।
১০) শিক্ষা দানের প্রতি পর্যায়ক্রমে গুরুত্বারোপ করা।
১১) সর্বপ্রথম অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দিয়ে দাওয়াতী কাজ শুরু করা জরুরী।
১২) যাকাত প্রদানের খাত সম্পর্কে জানা গেল।
১৩) শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রের সংশয় ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব উন্মোচন করা বা নিরসন করা।
১৪) যাকাত আদায়ের সময় বেছে বেছে উৎকৃষ্ট মাল নেয়ার প্রতি নিষেধাজ্ঞা।
১৫) মযলুমের বদ দু‘আ থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।
১৬) মজলুমের বদ দু‘আ এবং আল্লাহ তা‘আলার মধ্যে কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকার সংবাদ।
১৭) সাইয়্যিদুল মুরসালীন মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং বড় বড় সৎ লোকদের উপর যেসব দুঃখ-কষ্ট এবং কঠিন বিপদাপদ আপতিত হয়েছে, তা তাওহীদেরই প্রমাণ পেশ করে।
১৮) “আমি আগামীকাল এমন একজনের হাতে পতাকা প্রদান করবো যার হাতে আল্লাহ বিজয় দান করবেন।” রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এ উক্তি নবুওয়াতের অন্যতম একটি নিদর্শন।
১৯) আলী (রাঃ) এর চোখে থুথু প্রদানের মাধ্যমে চোখ ভালো হয়ে যাওয়াও নবুওয়াতের একটি নিদর্শন।
টিকাঃ
২৭. ছহীহ বুখারী হা/১৩৯৫, ১৪৫৮, ৪৩৪৭১, ছহীহ মুসলিম হা/১৯।
২৮. ছহীহ বুখারী হা/২৯৪২, ৩৭০১, মুসলিম হা/২৪০৬।
📄 ৫. তাওহীদ এবং লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর সাক্ষ্য দানের ব্যাখ্যা
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
أُولَٰئِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحْذُورًا
“এ সব লোকেরা যাদেরকে ডাকে তারা নিজেরাই তাদের রবের নৈকট্য লাভের আশায় উসীলা অনুসন্ধান করে, তাদের মধ্য হতে কে সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী? তারা তার রহমতের আশা করে এবং তার শাস্তিকে ভয় করে। নিশ্চয়ই তোমার পালনকর্তার শাস্তি ভয়াবহ”। (সূরা আল ইসরা: ৫৭)
আল্লাহ তা‘আলার বাণী,
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ إِنَّنِي بَرَاءٌ مِّمَّا تَعْبُدُونَ إِلَّا الَّذِي فَطَرَنِي فَإِنَّهُ سَيَهْدِينِ وَجَعَلَهَا كَلِمَةً بَاقِيَةً فِي عَقِبِهِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
“সে সময়ের কথা স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম তার পিতা ও গোত্রের লোকদেরকে বলেছিলেন, তোমরা যার ইবাদত কর তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমার সম্পর্ক কেবল তারই সাথেই, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। এ কালিমাটিকে তিনি অক্ষয় বাণীরূপে তার সন্তানদের মধ্যে রেখে গেছেন, যাতে তারা এর দিকেই ফিরে আসে”। (সূরা যুখরুফ: ২৬-২৮)
আল্লাহ তা‘আলা অন্য আয়াতে বলেন,
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ
“তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগিগণকে নিজেদের রব বানিয়ে নিয়েছে” (সূরা আত তাওবা: ৩১)
ছহীহ মুসলিমে বর্ণিত রয়েছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَكَفَرَ بِمَا يُعْبَدُ مِنْ دُونِ اللَّهِ، حَرُمَ مَالُهُ وَدَمُهُ، وَحِسَابُهُ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ»
“যে ব্যক্তি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে, আর আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য যেসব বস্তুর ইবাদত করা হয় তাকে অস্বীকার করবে, তার জান-মাল মুসলিমদের নিকট সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে এবং তার অন্তরে লুকায়িত বিষয়ের হিসাব আল্লাহর উপরই ন্যস্ত হবে”। [ছহীহ মুসলিম, হা/২৩, অধ্যায়: লা-ইলাহা পাঠ না করা পর্যন্ত লোকদের সাথে জিহাদ করার আদেশ।]
পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে এ অধ্যায়ের শিরোনামের ব্যাখ্যা রয়েছে।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
এ অধ্যায়ে সর্বাধিক বড় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে তাওহীদ এবং শাহাদাতের ব্যাখ্যা। কয়েকটি সুস্পষ্ট বিষয়ের মাধ্যমে এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে।
(ক) তাতে রয়েছে সূরা বানী ইসরাঈলের আয়াত। এতে সেসব মুশরিকদের সমুচিত জওয়াব দেয়া হয়েছে যারা নেক বান্দাদেরকে ডাকে। আর এটা যে ‘শিরকে আকবার’ -বড় শিরক এ কথার বর্ণনাও এখানে রয়েছে।
(খ) তাতে রয়েছে সূরা আত তাওবার ঐ আয়াত যাতে বলা হয়েছে যে, ইয়াহূদী-খ্রীস্টানরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের আলেম ও দরবেশ ব্যক্তিদেরকে রব হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছে। আরো বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়নি। এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, অন্যায় কাজে আলেম ও দরবেশদের আনুগত্য করা যাবে না এবং বিপদে পড়ে তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া যাবে না।
(গ) কাফেরদেরকে লক্ষ্য করে ইবরাহীম খলীল (আঃ) বলেছেন,
إِنَّنِي بَرَاءٌ مِّمَّا تَعْبُدُونَ (٢٦) إِلَّا الَّذِي فَطَرَنِي فَإِنَّهُ سَيَهْدِينِ
“তোমরা যার ইবাদত কর তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আর আমার সম্পর্ক হচ্ছে কেবল তারই সাথে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি আমাকে অচিরেই সৎপথ দেখাবেন। এর দ্বারা তিনি তার রবকে যাবতীয় বাতিল মা‘বূদ থেকে আলাদা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম আ. এর জবানীতে বর্ণনা করেছেন যে বাতিল মা‘বূদ থেকে পবিত্র থাকা আর প্রকৃত মা‘বূদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করাই হচ্ছে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র ব্যাখ্যা। তাই আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
وَجَعَلَهَا كَلِمَةً بَاقِيَةً فِي عَقِبِهِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
“আর ইবরাহীম এ কথাটি পরবর্তীতে তার সন্তানের মধ্যে অমর বাণী হিসাবে রেখে গেছেন, যেন তারা এদিকেই ফিরে আসে”।
(ঘ) সূরা আল বাকারায় আল্লাহ তা‘আলা কাফেরদের সম্পর্কে বলেছেন:
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ
তারা কখনো জাহান্নাম থেকে বের হতে পারবে না।” আল্লাহ তা‘আলা উল্লেখ করেছেন যে, মুশরিকরা তাদের শরীকদেরকে আল্লাহকে ভালবাসার মতই ভালবাসে। এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, তারা আল্লাহকে ভালবাসে, কিন্তু এ ভালবাসা তাদেরকে ইসলামে দাখিল করেনি। তাহলে আল্লাহর শরীককে যে ব্যক্তি আল্লাহর চেয়েও বেশী ভালবাসে সে কিভাবে মুসলিম হতে পারে? আর যে ব্যক্তি শুধুমাত্র শরীককেই ভালবাসে এবং আল্লাহর প্রতি যার কোন ভালবাসা নেই, তার অবস্থা কেমন হবে?
(ঙ) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী:
«مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَكَفَرَ بِمَا يُعْبَدُ مِنْ دُونِ اللَّهِ، حَرُمَ مَالُهُ وَدَمُهُ، وَحِسَابُهُ عَلَى اللَّهِ»
“যে ব্যক্তি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর আল্লাহ ব্যতীত যার ইবাদত করা হয়, তাকে অস্বীকার করবে, তার জান-মাল হারাম।”
অর্থাৎ তার জান ও মাল মুসলমানের কাছে নিরাপদ। এ বাণী হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যা। কারণ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর মৌখিক উচ্চারণ, এর অর্থ জানা এবং এর স্বীকৃতি প্রদান করাই যথেষ্ট নয়। এমনকি আল্লাহকে ডাকলেও জান-মালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত উক্ত কালেমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র সাথে গাইরুল্লাহর ইবাদতকে অস্বীকার করার বিষয়টি যুক্ত না করবে। এতে যদি কোনো প্রকার সন্দেহ, সংশয় কিংবা দ্বিধা-সংকোচ পরিলক্ষিত হয়, তাহলে জান-মালের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
কতইনা বিরাট এ মাসআলাটি! কতইনা সুস্পষ্ট বর্ণনা এটি! এটা প্রতিপক্ষের দলীলকে সম্পূর্ণরূপে রদ করে দিয়েছে।
টিকাঃ
২৯. এখানে আহবার দ্বারা আলেম উদ্দেশ্য এবং ‘রুহবান’ দ্বারা আবেদ তথা ইবাদতকারী উদ্দেশ্য। রাসূল ﷺ আ’দী বিন হাতিমের জন্য এই আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন। আ’দী বিন হাতিম যখন মুসলিম হয়ে রাসূল ﷺ এর কাছে আগমন করলেন, তখন তিনি আ’দীকে কুরআনের এই আয়াতটি পাঠ করে শুনালেন। আ’দী বিন হাতিম বলেন: আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! তারা তো তাদের ইবাদত করেনা। রাসূল ﷺ বললেন: হ্যাঁ, তারা তাদের ইবাদতই করে। কেননা আহলে কিতাবদের আলেমেরা যখন তাদের জন্য কোনো হালাল বস্তুকে হারাম করে এবং হারামকে হালাল করে, তখন তারা তাতে আলেমদের অনুসরণ করে। আর এটিই হচ্ছে তাদের ইবাদাতের নামান্তর। তিরমিযী, মুসনাদে আহমাদ।
৩০. যে ব্যক্তি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ পাঠ করবে এবং সেই সাথে আল্লাহ্ ছাড়া অন্যান্য যে সমস্ত বস্তুর ইবাদত করা হয়, সেগুলোর ইবাদতকে অস্বীকার করবে, তার জান ও মাল মুসলিমদের নিকট নিরাপদ হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ইহা পাঠ করবে, কিন্তু আল্লাহ্ ছাড়া অন্যান্য মা‘বুদের ইবাদত অস্বীকার করবেনা, তার জান ও মাল নিরাপদ হবে না। কেননা সে শিরককে প্রত্যাখ্যান করেনি এবং ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ যা অস্বীকার করেছে, তাকে সে অস্বীকার করেনি।
অন্তরের হিসাব আল্লাহ্ তা‘আলাই নিবেন। সে যদি সত্যবাদী হয়ে থাকে, তাহলে বদলা স্বরূপ আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে জান্নাতুন নাঈম প্রদান করবেন। আর যদি মুনাফেক হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন। তবে দুনিয়াতে তার প্রকাশ্য অবস্থার উপর ভিত্তি করেই বিধান প্রয়োগ হবে।