📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ২. যে ব্যক্তি তাওহীদের দাবি পূরণ করবে

📄 ২. যে ব্যক্তি তাওহীদের দাবি পূরণ করবে


আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً قَانِتًا لِّلَّهِ حَنِيفًا وَلَمْ يَكُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ
“নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিলেন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর হুকুম পালনকারী একটি উম্মাত এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না।” (সূরা আন নাহল: ১২০)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
وَالَّذِينَ هُم بِآيَاتِ رَبِّهِمْ يُؤْمِنُونَ وَالَّذِينَ هُم بِرَبِّهِمْ لَا يُشْرِكُونَ
নিশ্চয়ই যারা তাদের পালনকর্তার ভয়ে সন্ত্রস্ত, যারা তাদের পালনকর্তার আয়াতসমূহে বিশ্বাস স্থাপন করে, আর যারা তাদের রবের সাথে শিরক করে না- (তারাই দ্রুত কল্যাণ অর্জন করে এবং তারা তাতে অগ্রগামী) (সূরা মু’মিনূন: ৫৭-৫৯)

হুসাইন বিন আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
كُنْتُ عِنْدَ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، فَقَالَ: أَيُّكُمْ رَأَى الْكَوْكَبَ الَّذِي انْقَضَّ الْبَارِحَةَ؟، فَقُلْتُ: أَنَا، ثُمَّ قُلْتُ: أَمَا إِنِّي لَمْ أَكُنْ فِي صَلَاةٍ، وَلَٰكِنِّي لُدِغْتُ، قَالَ: فَمَا صَنَعْتَ؟، قُلْتُ: ارْتَقَيْتُ، قَالَ: فَمَا حَمَلَكَ عَلَىٰ ذَٰلِكَ؟ قُلْتُ: حَدِيثٌ حَدَّثَنَاهُ الشَّعْبِيُّ، قَالَ: وَمَا حَدَّثَكُمْ؟ قُلْتُ: حَدَّثَنَا عَنْ بُرَيْدَةَ بْنِ الْحُصَيْبِ أَنَّهُ قَالَ: لَا رُقْيَةَ إِلَّا مِنْ عَيْنٍ أَوْ حُمَةٍ، قَالَ: قَدْ أَحْسَنَ مَنِ انْتَهَىٰ إِلَىٰ مَا سَمِعَ، وَلَٰكِنْ حَدَّثَنَا ابْنُ عَبَّاسٍ - رضي الله عنهما -، عَنِ النَّبِيِّ - صلى الله عليه وسلم - أَنَّهُ قَالَ: «عُرِضَتْ عَلَيَّ الْأُمَمُ، فَرَأَيْتُ النَّبِيَّ وَمَعَهُ الرُّهَيْطُ، وَالنَّبِيَّ وَمَعَهُ الرَّجُلُ وَالرَّجُلَانِ، وَالنَّبِيَّ وَلَيْسَ مَعَهُ أَحَدٌ، إِذْ رُفِعَ لِي سَوَادٌ عَظِيمٌ، فَظَنَنْتُ أَنَّهُمْ أُمَّتِي، فَقِيلَ لِي: هَٰذَا مُوسَىٰ وَقَوْمُهُ، فَنَظَرْتُ فَإِذَا سَوَادٌ عَظِيمٌ، فَقِيلَ لِي: هَٰذِهِ أُمَّتُكَ، وَمَعَهُمْ سَبْعُونَ أَلْفًا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ بِغَيْرِ حِسَابٍ وَلَا عَذَابٍ»، ثمَّ نَهَضَ فَدَخَلَ مَنْزِلَهُ، فَخَاضَ النَّاسُ فِي أُولَٰئِكَ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ: فَلَعَلَّهُمُ الَّذِينَ صَحِبُوا رَسُولَ اللَّهِ؟، وَقَالَ بَعْضُهُمْ: فَلَعَلَّهُمُ الَّذِينَ وُلِدُوا فِي الْإِسْلَامِ فَلَمْ يُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا، وَذَكَرُوا أَشْيَاءَ، فَخَرَجَ عَلَيْهِمْ رَسُولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - فَأَخْبَرُوهُ، فَقَالَ: «هُمُ الَّذِينَ لَا يَسْتَرْقُونَ، وَلَا يَكْتَوُونَ، وَلَا يَتَطَيَّرُونَ، وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ»، فَقَامَ عُكَّاشَةُ بْنُ مِحْصَنٍ، فَقَالَ: ادْعُ اللَّهَ أَنْ يَجْعَلَنِي مِنْهُمْ، فَقَالَ: «أَنْتَ مِنْهُمْ» ، ثُمَّ قَامَ رَجُلٌ آخَرُ فَقَالَ: ادْعُ اللَّهَ أَنْ يَجْعَلَنِي مِنْهُمْ، فَقَالَ: «سَبَقَكَ بِهَا عُكَّاشَةُ»
“একবার আমি সাঈদ বিন জুবাইরের কাছে উপস্থিত ছিলাম। তিনি বললেন, গতকাল রাত্রে যে নক্ষত্রটি ছিটকে পড়েছে তা তোমাদের মধ্য হতে কে দেখতে পেয়েছ? তখন বললাম, আমি। তবে আমি ছালাত পড়ছিলাম না। তারপর বললাম, আমি বিষাক্ত প্রাণী কর্তৃক দংশিত হয়েছিলাম। তিনি বললেন: তখন তুমি কি চিকিৎসা করেছ? বললাম ঝাড় ফুঁক করেছি। তিনি বললেন, কিসে তোমাকে এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে? অর্থাৎ তুমি কেন এ কাজ করলে? বললাম: ‘একটি হাদীছ’ (আমাকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেছে) যা শা‘বী আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন। তিনি বললেন, তিনি তোমাদেরকে কি বর্ণনা করেছেন? বললাম ‘তিনি বুরাইদা বিন আল হুসাইব থেকে আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, বদ নযর এবং বিষাক্ত পোকার (কামড় ব্যতীত অন্য কোন রোগে ঝাড়-ফুঁক নেই)। তিনি বললেন, ‘সে ব্যক্তিই উত্তম কাজ করেছে, যে শ্রুত কথা অনুযায়ী আমল করাকেই যথেষ্ট মনে করেছে’। কিন্তু ইবনে আব্বাস (রাঃ) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “আমার সম্মুখে সমস্ত জাতিকে উপস্থাপন করা হল। তখন এমন নাবীকে দেখতে পেলাম, যার সাথে অল্প সংখ্যক লোক রয়েছে। এমন নাবীকেও দেখতে পেলাম, যার সাথে মাত্র একজন বা দু’জন লোক রয়েছে। আবার এমন নাবীকেও দেখতে পেলাম যার সাথে কোন লোকই নেই। ঠিক এমন সময় আমার সামনে এক বিরাট জনগোষ্ঠী পেশ করা হল। তখন আমি ভাবলাম: এরা আমার উম্মত। কিন্তু আমাকে বলা হল, এরা হচ্ছে মূসা আ. এবং তার উম্মত। এরপর আরো একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর দিকে আমি তাকালাম। তখন আমাকে বলা হল, এরা আপনার উম্মত। এদের মধ্যে সত্তর হাজার লোক রয়েছে, যারা বিনা হিসাবে এবং বিনা আযাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এ কথা বলে তিনি উঠে বাড়ীর অভ্যন্তরে চলে গেলেন। এরপর লোকেরা ঐ সব ভাগ্যবান লোকদের ব্যাপারে বিতর্ক শুরু করে দিল। কেউ বলল: তারা বোধ হয় রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্য লাভকারী ব্যক্তিগণ। আবার কেউ বলল: তারা বোধ হয় সেই সব লোক, যারা ইসলামী পরিবেশে তথা মুসলিম মাতা-পিতার ঘরে জন্মগ্রহণ করেছে, আর আল্লাহর সাথে তারা কাউকে শরীক করেনি। তারা এ ধরনের আরো অনেক কথা বলাবলি করল। অতঃপর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মধ্যে উপস্থিত হলে বিষয়টি তাকে জানানো হল। তখন তিনি বললেন, “তারা হচ্ছে ঐ সব লোক যারা ঝাড়-ফুঁক করে না। পাখি উড়িয়ে ভাগ্যের ভাল-মন্দ যাচাই করে না। শরীরে ছেঁকা বা দাগ দেয় না। আর তাদের রবের উপর তারা ভরসা করে”। এ কথা শুনে উক্কাশা বিন মিহসান দাঁড়িয়ে বলল, আপনি আমার জন্য দু‘আ করুন যেন আল্লাহ তা‘আলা আমাকে ঐ সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের দলভুক্ত করে নেন। তিনি বললেন: “তুমি তাদের দলভুক্ত”। অতঃপর অন্য একজন লোক দাঁড়িয়ে বলল: আল্লাহর কাছে আমার জন্যও দু‘আ করুন যেন তিনি আমাকেও তাদের অন্তর্ভূক্ত করে নেন। তিনি বললেন: “তোমার পূর্বেই উক্কাশা সে সুযোগ নিয়ে গেছে”।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) তাওহীদের ব্যাপারে মানুষের বিভিন্ন স্তর থাকার কথা জানা গেল।
২) নাবী ইবরাহীম (আঃ) মুশরিক ছিলেন না বলে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা।
৩) তাওহীদের দাবি পূর্ণ করার তাৎপর্য কি, তা জানা গেল।
৪) বড় বড় আউলীয়ায়ে কেরাম শিরক থেকে মুক্ত ছিলেন বলে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জবানে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা।
৫) ঝাড়-ফুঁক থেকে বিরত থাকা এবং ছেঁকা গ্রহণ পরিত্যাগ করা তাওহীদপন্থী হওয়ার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
৬) আল্লাহর উপর ভরসাই বান্দার মধ্যে উল্লেখিত গুণাবলী ও স্বভাবসমূহের সমাবেশ ঘটায়।
৭) বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশকারী সৌভাগ্যবান লোকেরা কোন আমল ব্যতীত উক্ত মর্যাদা লাভ করতে পারেনি, এটা জানার ব্যাপারে ছাহাবায়ে কেরামের জ্ঞানের গভীরতা।
৮) মঙ্গল ও কল্যাণের প্রতি তাদের অপরিসীম আগ্রহ।
৯) সংখ্যা ও গুণাবলীর দিক থেকে উম্মাতে মুহাম্মাদীর ফযীলত সম্পর্কে জানা গেল।
১০) নাবী মূসা (আঃ) এর উম্মাতের মর্যাদা।
১১) সব উম্মাতকে তাদের নাবীসহ রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সম্মুখে উপস্থিত করা হবে।
১২) প্রত্যেক উম্মাতই নিজ নিজ নাবীর সাথে পৃথকভাবে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে।
১৩) খুব অল্প সংখ্যক লোকই নাবীগণের আহবানে সাড়া দিয়েছিল।
১৪) যে নাবীর দাওয়াত কেউ গ্রহণ করেনি তিনি একাই হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবেন।
১৫) এ জ্ঞানের শিক্ষা হচ্ছে, সংখ্যাধিক্যের দ্বারা ধোঁকা না খাওয়া আবার সংখ্যাল্পতার কারণে অবহেলা না করা।
১৬) বদ-নযর লাগা এবং বিষাক্ত কীটের বিষের চিকিৎসার জন্য ঝাড়-ফুঁকের অনুমতি পাওয়া গেল।
১৭) সালফে ছলেহীনের জ্ঞানের গভীরতা সম্পর্কে জানা গেল। قد أحسن من انتهى إلى ما سمع “সেই ব্যক্তি ভাল কাজ করেছে, যে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যা শুনেছে তাই আমল করেছে” -এ কথাই তার প্রমাণ। তাই প্রথম হাদীছ দ্বিতীয় হাদীছের বিরোধী নয়।
১৮) মানুষের মধ্যে যে গুণ নেই তার প্রশংসা থেকে সালফে ছলেহীনগণ বিরত থাকতেন।
১৯) أنت منهم “তুমি তাদের অন্তর্ভূক্ত” -উক্কাশার ব্যাপারে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই কথা তার নবুওয়াতেরই প্রমাণ বহন করে।
২০) উক্কাশা (রাঃ) এর মর্যাদা ও ফযীলত।
২১) কোন কথা সরাসরি না বলে হিকমত ও কৌশল অবলম্বন করা।
২২) ইঙ্গিতের মাধ্যমে কথা বলা জায়েয।
২৩) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উত্তম চরিত্রের বর্ণনা।

টিকাঃ
১৮. তাওহীদের বাস্তবায়ন (তাওহীদের দাবি পূরণ করা): তাওহীদকে শিরক হতে মুক্ত রাখা। তিনটি বিষয় ছাড়া এটি অর্জন সম্ভব নয়।
১| العلم) ইলম) সুতরাং ইলম অর্জন ব্যতীত কিছুই সম্ভব নয়।
২| الاعتقاد) আক্বীদা-বিশ্বাস) যখন তুমি ইলম অর্জন করলে, কিন্তু বিশ্বাস না করে বরং অহংকার করলে, তাহলে তাওহীদ বাস্তবায়ন হল না।
৩| الانقياد) বশ্যতা স্বীকার করা-আনুগত্য) যখন তুমি ইলম অর্জন করলে, বিশ্বাস স্থাপন করলে কিন্তু বশ্যতা স্বীকার (এককভাবে আল্লাহর ইবাদত করা এবং তার শরী‘আতের কাছে আত্মসমর্পণ করা) করলে না, তাহলে তাওহীদ বাস্তবায়ন হবে না।
১৯. ইবনে কাছীর (রহঃ) বলেন: আল্লাহ্ তা‘আলা এখানে তাঁর একনিষ্ঠ বান্দাদের ইমাম ও রাসূল ইবরাহীম খলীল আ. এর প্রশংসা করছেন। আল্লাহ্ তা‘আলা বলছেন, তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না, ইয়াহূদী, খ্রীস্টান-নাসারা এবং অগ্নিপূজকদেরও অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না। এখানে উম্মত বলতে এমন নেতা উদ্দেশ্য যার অনুসরণ করা হয়। আয়াতে বর্ণিত قانـت অর্থ হচ্ছে বিনয়ী এবং অনুগত। হানীফ অর্থ শিরক বর্জন করে তাওহীদের দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। এ জন্যই আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন: وَلَمْ يَكُ مِنَ الْمُشـ ِركينَ “তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না”। প্রখ্যাত মুফাসসির মুজাহিদ (রহঃ) বলেন: ইবরাহীম একটি উম্মত ছিলেন- এ কথার অর্থ হচ্ছে, সে সময় তিনি একাই ছিলেন মু’মিন এবং অন্যান্য সকল মানুষই ছিল কাফের-মুশরিক।
২০. ইবনে কাছীর (রহঃ) বলেন: নেক ও সৎ আমল করার পরও তারা আল্লাহর ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত ও আতঙ্কের মধ্যে থাকে এবং আল্লাহর শাস্তির ভয়ে ভীত থাকে। হাসান বসরী (রহঃ) বলেন: মু’মিন হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে নেক আমল করার সাথে সাথে আল্লাহ্কে ভয় করে। আর মুনাফিক হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে পাপ কাজ করে এবং নির্ভয়ে থাকে।
২১. এটি ছিল ইসলামের প্রথম দিকে। পরবর্তীতে অন্যান্য বিষয়েও ঝাড়-ফুঁক করার অনুমতি দেয়া হয়, যদি তা কুরআনের আয়াত, ছহীহ হাদীছ এবং শিরকযুক্ত দু‘আ দ্বারা করা হয়। আল্লাহই ভাল জানেন।
২২. অর্থাৎ যেই জাতির কাছে তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছিল, তাদের মধ্য হতে একজনও ঈমান আনয়ন করেনি।
২৩. ছহীহ বুখারী হা/৫৭০৫, ৬৫৪১, মুসলিম, হা/২২০ অধ্যায়: এ উম্মাতের একদল মুসলিমের বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ।

📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 সে বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে

📄 সে বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ৩. শিরক হতে ভয়-ভীতি সম্পর্কে

📄 ৩. শিরক হতে ভয়-ভীতি সম্পর্কে


আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ
“আল্লাহ তার সাথে শিরক করার গুনাহ মাফ করবেন না। শিরক ছাড়া (নিম্নস্তরের) অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দিবেন।” (সূরা আন নিসা: ৪৮)

ইবরাহীম খলীল আলাইহিম সালাম আল্লাহ তা‘আলার কাছে এ দু‘আ করেছিলেন,
وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَن نَّعْبُدَ الْأَصْنَامَ
“আমাকে এবং আমার সন্তানদের মূর্তিপূজা থেকে রক্ষা করো” (সূরা ইবরাহীম: ৩৫)

হাদীছে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
«أَخْوَفُ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ، فَسُئِلَ عَنْهُ، فَقَالَ: الرِّيَاءُ»
“আমি তোমাদের জন্য যে জিনিসের সবচেয়ে বেশী ভয় করি তা হচ্ছে শিরকে আসগর অর্থাৎ ছোট শিরক”। শিরকে আসগর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বললেন, ছোট শিরক হচ্ছে “রিয়া” অর্থাৎ মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করা। ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ نِدًّا دَخَلَ النَّارَ»
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অনুরূপ কাউকে আহবান করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে”।

ছহীহ মুসলিমে জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«مَنْ لَقِيَ اللَّهَ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَمَنْ لَقِيَهُ يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ»
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তার সাথে কাউকে শরীক করে মৃত্যুবরণ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে”।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) শিরককে ভয় করে চলতে হবে।
২) রিয়া শিরকের মধ্যে শামিল।
৩) রিয়া ছোট শিরকের অন্তর্ভূক্ত।
৪) সৎ লোকদের জন্য ভয়ের বস্তুসমূহের মধ্যে সর্বাধিক ভীতিপ্রদ বিষয় হচ্ছে শিরকে আসগর তথা ছোট শিরক।
৫) জান্নাত ও জাহান্নাম মানুষের একদম কাছাকাছি।
৬) জান্নাত ও জাহান্নাম নিকটবর্তী হওয়ার বিষয়টি একই হাদীছে বর্ণিত হয়েছে।
৭) আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে মৃত্যুবরণ করলে মৃত ব্যক্তি জান্নাতে যাবে। পক্ষান্তরে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক বানিয়ে মৃত্যুবরণ করলে মৃত ব্যক্তি যত বড় ইবাদতকারীই হোক না কেন, সে জাহান্নামে যাবে।

টিকাঃ
২৪. ছহীহ: মুসনাদে আহমাদ ৫/৪২৮-৪২৯, আছ-ছহীহা, হা/৯৫১।
২৫. ছহীহ বুখারী, হা/৪৪৯৭, ছহীহ মুসলিম হা/৯২।
২৬. ছহীহ মুসলিম, হা/৯৩।

📘 কিতাবুত তাওহীদ > 📄 ৪. ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর সাক্ষ্যদানের প্রতি আহবান

📄 ৪. ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর সাক্ষ্যদানের প্রতি আহবান


আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
قُلْ هَٰذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ ۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي ۖ وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ
“তুমি বলে দাও! এটিই আমার পথ। পূর্ণ প্রজ্ঞার সাথে আমি এবং আমার অনুসারীরা আল্লাহর দিকে আহবান জানাই। আল্লাহ পবিত্র। আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভূক্ত নই”। (সূরা ইউসূফ: ১০৮)

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মুআয (রাঃ) কে ইয়ামানে পাঠালেন, তখন তিনি বললেন,
«إِنَّكَ تَأْتِي قَوْمًا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ، فَلْيَكُنْ أَوَّلَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ شَهَادَةُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، (وَفِي رِوَايَةٍ: إِلَى أَنْ يُوَحِّدُوا اللَّهَ)، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوكَ لِذَلِكَ فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللَّهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِي كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوكَ لِذَلِكَ فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللَّهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ، فَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوكَ لِذَلِكَ فَإِيَّاكَ وَكَرَائِمَ أَمْوَالِهِمْ، وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ»
“তুমি এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে যাচ্ছ যারা আহলে কিতাব। সর্ব প্রথম যে জিনিসের দিকে তুমি তাদেরকে আহবান জানাবে তা হচ্ছে, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ”এর সাক্ষ্য দান করা”। অন্য বর্ণনায় আছে, তুমি তাদেরকে এককভাবে আল্লাহর ইবাদত করার আহবান জানাবে। এ বিষয়ে তারা যদি তোমার আনুগত্য করে তবে তাদেরকে জানিয়ে দিও যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত ছলাত ফরয করেছেন। এ ব্যাপারে তারা যদি তোমার কথা মেনে নেয় তবে তাদেরকে জানিয়ে দিও যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর যাকাত ফরয করেছেন, যা বিত্তশালীদের কাছ থেকে নিয়ে গরীবদেরকে দেয়া হবে। তারা যদি এ ব্যাপারে তোমার আনুগত্য করে তবে তাদের উৎকৃষ্ট মালের ব্যাপারে খুব সাবধান থাকবে। আর মযলুমের বদ দু‘আকে পরিহার করে চলবে। কেননা মযলুমের ফরিয়াদ এবং আল্লাহ তা‘আলার মাঝে কোনো পর্দা নেই”।

ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমে সাহল ইবনে সা‘দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বারের যুদ্ধের দিন বলেন,
«لَأُعْطِيَنَّ الرَّايَةَ غَدًا رَجُلًا يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ، وَيُحِبُّهُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ، يَفْتَحُ اللَّهُ عَلَى يَدَيْهِ»، فَبَاتَ النَّاسُ يَدُوكُونَ لَيْلَتَهُمْ أَيُّهُمْ يُعْطَاهَا، فَلَمَّا أَصْبَحُوا غَدَوْا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - كُلُّهُمْ يَرْجُو أَنْ يُعْطَاهَا، فَقَالَ: «أَيْنَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ؟» ، فَقِيلَ: هُوَ يَشْتَكِي عَيْنَيْهِ، فَأَرْسَلُوا إِلَيْهِ فَأُتِيَ بِهِ، فَبَصَقَ فِي عَيْنَيْهِ وَدَعَا لَهُ، فَبَرَأَ كَأَنْ لَمْ يَكُنْ بِهِ وَجَعٌ، فَأَعْطَاهُ الرَّايَةَ، فَقَالَ: «انْفُذْ عَلَى رِسْلِكَ حَتَّى تَنْزِلَ بِسَاحَتِهِمْ، ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ وَأَخْبِرْهُمْ بِمَا يَجِبُ عَلَيْهِمْ مِنْ حَقِّ اللَّهِ تَعَالَى فِيهِ، فَوَاللَّهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ»
“আগামীকাল এমন ব্যক্তিকে আমি ঝাণ্ডা প্রদান করব যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসে এবং আল্লাহ ও তার রাসূলও তাকে ভালবাসেন। তার হাতে আল্লাহ তা‘আলা বিজয় দান করবেন। কাকে ঝাণ্ডা প্রদান করা হবে এ উৎকণ্ঠা ও ব্যাকুলতার মধ্যে লোকজন রাত্রিযাপন করল। যখন সকাল হলো, তখন লোকজন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হল। তাদের প্রত্যেকেই আশা করছিল যে, ঝাণ্ডা তাকেই দেয়া হবে, তখন তিনি বললেন, আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) কোথায়? বলা হলো, তিনি চক্ষুর পীড়ায় আক্রান্ত। তাকে ডেকে পাঠানো হল। রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উভয় চোখে থুথু লাগিয়ে দিলেন এবং তার জন্য দু‘আ করলেন। এতে তিনি এমন সুস্থ হলেন যে, মনে হচ্ছিল, তার চোখে কোনো অসুখই ছিল না। অতঃপর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার হাতে ঝাণ্ডা প্রদান করলেন এবং বললেন: তুমি ধীরস্থিরতার সাথে অগ্রসর হও। তুমি যখন তাদের আঙ্গিনায় অবতরণ করবে, তখন তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করবে। অতঃপর তাদের উপর আল্লাহ তা‘আলার যে হক্ রয়েছে, সে সম্পর্কে তাদেরকে জানিয়ে দাও। আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তা‘আলা যদি তোমার মাধ্যমে একজন লোককেও হিদায়াত করেন তাহলে তোমার জন্য এটি হবে লাল উট অপেক্ষা উত্তম।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে অনুসরণকারীর নীতি ও পথ হচ্ছে আল্লাহর দিকে মানুষকে আহবান করা।
২) ইখলাসের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা। কেননা অনেক লোক হকের পথে মানুষকে আহবান জানালেও মূলত তারা নিজের নফস বা স্বার্থের দিকেই আহবান জানায়।
৩) তাওহীদের দাওয়াতের জন্য জ্ঞান ও প্রজ্ঞা থাকা অপরিহার্য।
৪) উত্তম তাওহীদের প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার প্রতি গাল-মন্দ আরোপ করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র থাকা।
৫) আল্লাহ তা‘আলার প্রতি গাল-মন্দ আরোপ করা নিকৃষ্ট শিরকের অন্তর্ভূক্ত।
৬) তাওহীদই হচ্ছে সর্বপ্রথম ফরয।
৭) সর্বাগ্রে এমন কি ছালাতেরও পূর্বে তাওহীদের প্রতি আহবান করতে হবে।
৮) আল্লাহর একত্বের ঘোষণা করার অর্থ হচ্ছে, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর সাক্ষ্য প্রদান করা। অর্থাৎ “আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত সত্য কোন ইলাহ নেই” এ ঘোষণা দেয়া।
৯) একজন মানুষ আহলে কিতাবের অন্তর্ভূক্ত হওয়া সত্ত্বেও সে তাওহীদ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতে পারে কিংবা তাওহীদের জ্ঞান থাকলেও সে অনুযায়ী আমল নাও করতে পারে।
১০) শিক্ষা দানের প্রতি পর্যায়ক্রমে গুরুত্বারোপ করা।
১১) সর্বপ্রথম অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দিয়ে দাওয়াতী কাজ শুরু করা জরুরী।
১২) যাকাত প্রদানের খাত সম্পর্কে জানা গেল।
১৩) শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রের সংশয় ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব উন্মোচন করা বা নিরসন করা।
১৪) যাকাত আদায়ের সময় বেছে বেছে উৎকৃষ্ট মাল নেয়ার প্রতি নিষেধাজ্ঞা।
১৫) মযলুমের বদ দু‘আ থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।
১৬) মজলুমের বদ দু‘আ এবং আল্লাহ তা‘আলার মধ্যে কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকার সংবাদ।
১৭) সাইয়্যিদুল মুরসালীন মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং বড় বড় সৎ লোকদের উপর যেসব দুঃখ-কষ্ট এবং কঠিন বিপদাপদ আপতিত হয়েছে, তা তাওহীদেরই প্রমাণ পেশ করে।
১৮) “আমি আগামীকাল এমন একজনের হাতে পতাকা প্রদান করবো যার হাতে আল্লাহ বিজয় দান করবেন।” রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এ উক্তি নবুওয়াতের অন্যতম একটি নিদর্শন।
১৯) আলী (রাঃ) এর চোখে থুথু প্রদানের মাধ্যমে চোখ ভালো হয়ে যাওয়াও নবুওয়াতের একটি নিদর্শন।

টিকাঃ
২৭. ছহীহ বুখারী হা/১৩৯৫, ১৪৫৮, ৪৩৪৭১, ছহীহ মুসলিম হা/১৯।
২৮. ছহীহ বুখারী হা/২৯৪২, ৩৭০১, মুসলিম হা/২৪০৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00