📄 শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
পরিচয়, জন্ম ও প্রতিপালন:
শাইখুল ইসলাম ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহ্হাব ইবনে সুলায়মান ইবনে আলী ইবনে মুহাম্মাদ আত্ তামীমী (রহঃ)। হিজরী ১১১৫ সালে নজদ অঞ্চলের উয়াইনা শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। শৈশবকালে তিনি স্বীয় পিতার নিকট প্রতিপালিত হন। তার পিতা, চাচা এবং দাদা সহ পরিবারের অনেকেই বিজ্ঞ আলিম ছিলেন। সে হিসাবে তিনি একটি দ্বীনি পরিবেশে প্রতিপালিত হন। সে সময় শাইখের পরিবারের আলিমগণ শিক্ষকতা, ফাতাওয়া দান, বিচারকার্য পরিচালনা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন। এ সমস্ত বিষয় দ্বারা সম্মানিত শাইখ শৈশব কালেই বিশেষভাবে প্রভাবিত ছিলেন।
শাইখের তীক্ষ্ণ মেধা ও প্রাথমিক শিক্ষা:
তিনি উয়ায়নাতেই পিতা সহ স্বীয় পরিবারের আলিমদের থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। শিশুকালেই তার মধ্যে বিরল ও অনুপম মেধার নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়। তার স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর, বুঝশক্তি ছিল খুবই তীক্ষ্ণ এবং চিন্তাশক্তি ছিল খুবই গভীর। এ কারণেই তিনি অল্প বয়সেই ইলম অর্জনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। শৈশব কালেই তিনি সুদৃঢ় ঈমান ও দীন পালনের প্রতি বিশেষ যত্নবান ছিলেন। ছোট বেলাতেই তিনি তাফসীর, হাদীছ এবং বিজ্ঞ আলিমদের কিতাবগুলো ব্যাপক অধ্যয়ন করতেন। আল্লাহর কিতাব, রাসূলের সুন্নাত এবং সালফে ছলেহীনদের উক্তিসমূহ-ই ছিল শাইখের জ্ঞান অর্জনের মূল উৎস। দর্শন, সূফীবাদ, মানতেক (তর্ক যুক্তিবাদ্য) ইত্যাদির সংস্পর্শ থেকে শাইখ ছিলেন সম্পূর্ণ দূরে। কারণ তিনি যে পরিবার ও পরিবেশে প্রতিপালিত হন, তা ছিল বিকৃত শিক্ষা ব্যবস্থা, পাপাচার এবং কুসংস্কার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
শাইখের যুগে আরব উপদ্বীপের অবস্থা:
শাইখের যুগে নজদ ও তার আশপাশের অঞ্চলে ব্যাপক শিরক-বিদ‘আত ও কুসংস্কার ছড়িয়ে পড়ে। আইয়্যামে জাহেলিয়্যাতের সকল প্রকার শিরক যেন পুনরায় আরব উপদ্বীপে নতুন পোশাকে প্রবেশ করে। গাছ, পাথর, কবর এবং অলী-আওলিয়ার ইবাদত শুরু হয়। এ দৃশ্য দেখে তিনি মর্মাহত হন এবং অবস্থা পরিবর্তনের জন্য সুদৃঢ় পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
শাইখের চারিত্রিক গুণাবলী:
আমানতদারী, সত্যবাদিতা, মানুষের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ, দানশীলতা, ধৈর্যশীলতা, দূরদর্শিতা, দৃঢ়তা সহ তার মধ্যে আরো এসব চারিত্রিক উন্নত ও বিরল গুণাবলীর সমাহার ঘটে, যা তাকে নেতৃত্বের আসনে আসীন করেছিল। ইতিহাসে যে সব মহাপুরুষ স্বীয় কর্মের মাধ্যমে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন তাদের খুব অল্প সংখ্যক লোকের মধ্যেই এ সব চারিত্রিক গুণাবলী বিদ্যমান ছিল। শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি খুব বিনয়ী ছিলেন, ভিক্ষুক ও অভাবীদের প্রয়োজন পূরণে বিশেষ তৎপর ছিলেন।
তার বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে কঠোরতা, অজ্ঞতা এবং দীন পালনে দুর্বলতা ইত্যাদি যেসব অভিযোগ করে থাকে, কিন্তু শাইখ ছিলেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
উচ্চ শিক্ষা ও ভ্রমণ:
উয়ায়নার আলিমদের কাছ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করার পর তিনি উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য হিজায (মক্কা-মদীনা) ও শাম (সিরিয়া) ভ্রমণ করেন। যৌবনে পদার্পণ করে তিনি হাজ্জের উদ্দেশে মক্কায় গমন করেন। হাজ্জ শেষে মদীনায় গিয়ে তিনি শাইখ আব্দুল্লাহ ইবনে ইবরাহীম ইবনে সায়ফ নামক প্রখ্যাত আলিমের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ হায়াত সিন্ধির নিকট ইলমে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন। পরে তিনি ইরাকের বসরায় গমন করেন এবং সেখানকার শাইখ মাজমূয়ীর নিকট তাওহীদ ও অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে থাকেন। সেখানে থাকা অবস্থাতেই তিনি শিরক ও বিদ‘আত বিরোধী প্রকাশ্য আলোচনা শুরু করেন। ফলে বসরার বিক্ষুব্ধ বিদ‘আতীরা তাকে সেখান থেকে বের করে দেয়।
উয়াইনায় ফিরে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস এবং দাওয়াতী কাজে মনোনিবেশ:
ইরাক থেকে ফিরে এসে শাইখ নিজ জন্মস্থান উয়ায়নায় বসবাস করতে থাকেন। তখন উয়ায়নার শাসক ছিলেন উছমান ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মুআম্মার। তিনি উছমানের নিকট গেলেন। উছমান শাইখকে স্বাগত জানিয়ে বললেন, আপনি আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিতে থাকুন। আমরা আপনার সাথে থাকবো এবং আপনাকে সাহায্য করবো। উছমান আরো বেশ কিছু ভালো কথা শুনালেন, শাইখের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করলেন এবং তার দাওয়াতের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করলেন।
আমীর উছমানের আশ্বাস পেয়ে শাইখ মানুষকে আল্লাহর দীন শিক্ষা দান, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ করা সহ কল্যাণের দিকে আহবান করতে থাকলেন। শাইখের দাওয়াত উয়ায়নার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে পার্শ্ববর্তী সকল গ্রামের মানুষ শাইখের কাছে আসতে থাকলো এবং নিজেদের ভুল আক্বীদা বর্জন করে শাইখের দাওয়াত কবুল করতে লাগল।
ঐ সময় জুবাইলা নামক স্থানে যায়েদ ইবনে খাত্তাব নামে একটি মিনার ছিল। যায়েদ ইবনে খাত্তাব ছিলেন উমার (রাঃ) এর ভাই। তিনি মিথ্যুক নাবী মুসায়লামার বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে শাহাদাত বরণ করেন। পরবর্তীতে অজ্ঞাত পরিচয়ের লোকেরা তার কবরের উপর গম্বুজ তৈরী করে। কালক্রমে তা এক দেবতা মন্দিরে পরিণত হয়। এতে বিভিন্ন ধরণের মানত পেশ করা হতো এবং কা‘বা ঘরের ন্যায় তাওয়াফও করা হতো। সেখানে আরো অনেক কবর ছিল। আশপাশের গাছপালারও ইবাদত করা হতো।
একদা শাইখ আমীর উছমানকে বললেন, চলুন আমরা যায়েদ ইবনে খাত্তাবের কবরের উপর নির্মিত গম্বুজটি ভেঙ্গে ফেলি। কেননা এটি অন্যায়ভাবে এবং বিনা দলীলে নির্মাণ করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা এ কাজের প্রতি কখনই সন্তুষ্ট হবেন না। রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরের উপর কোন কিছু নির্মাণ করতে এবং কবরকে মাসজিদে পরিণত করতে নিষেধ করেছেন। এ গম্বুজটি মানুষকে গোমরাহ করছে, মানুষের আক্বীদা পরিবর্তন করছে এবং এর মাধ্যমে নানা রকম শিরক হচ্ছে। সুতরাং এটি ভেঙ্গে ফেলা আবশ্যক।
আমীর উছমান বললেন, এতে কোন অসুবিধা নেই। অতঃপর উছমান ইবনে মুআম্মার গম্বুজটি ভাঙ্গার জন্য ৬০০ সৈনিকের একটি বাহিনী নিয়ে বের হলেন। শাইখও তাদের সাথে ছিলেন।
উছমানের বাহিনী যখন জুবাইলিয়ার নিকটবর্তী হলো এবং জুবাইলিয়ার অধিবাসীরা জানতে পারলো যে, যায়েদ ইবনে খাত্তাবের মিনার ভাঙ্গার জন্য একদল লোক আগমন করেছে তখন তারা গম্বুজটি রক্ষা করার জন্য বের হলো। কিন্তু আমীর উছমান এবং তার সৈনিকদের দেখে ফিরে গেল। উছমানের সৈনিকরা গম্বুজটি গুড়িয়ে দিল। শাইখের প্রচেষ্টায় এ মিনারটি ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং তিনি নিজেও ভাঙ্গার কাজে অংশ নেন। আলহামদুলিল্লাহ। চিরতরে শিরকের একটি আস্তানা বিলুপ্ত হলো। এমনিভাবে শিরকের আরো অনেক আস্তানা আল্লাহ তা‘আলা সম্মানিত শাইখের মাধ্যমে বিলুপ্ত করলেন।
ব্যভিচারের হদ (শাস্তি) কায়েম:
উয়ায়নাতে অবস্থানকালে এক মহিলা একদিন তার কাছে এসে স্বেচ্ছায় ও স্বজ্ঞানে ব্যভিচারের অপরাধ স্বীকার করে বিচার প্রার্থনা করে। মহিলাটির অবস্থা স্বাভাবিক কি না, তা জানার জন্য তিনি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন। যখন তিনি জানতে পারলেন, মহিলাটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং তার মাথায় কোন পাগলামী নেই, তখন মহিলাটিকে বললেন, সম্ভবত: জবরদস্তি করে তোমার সাথে এ অপকর্ম করা হয়েছে। সুতরাং তোমার বিচার প্রার্থনা করার দরকার নেই। অবশেষে মহিলাটি জোর দাবি জানালে এবং বার বার স্বীকার করতে থাকলে শায়েখের নির্দেশে লোকেরা পাথর মেরে মহিলাটিকে হত্যা করে।
উয়ায়নাতে উছমান ইবনে মুআম্মারের সহযোগিতায় ও সমর্থনে শাইখের সংস্কার আন্দোলন যখন পুরোদমে চলতে থাকে, তখন আহসার শাসক সুলায়মান ইবনে আব্দুল আযীযের কাছে এ খবর পৌঁছে গেল। শাইখের বিরোধীরা সুলায়মানকে জানিয়ে দিল যে, শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব নামে এক ব্যক্তি কবরের উপর নির্মিত গম্বুজগুলো ভেঙ্গে ফেলছে এবং ব্যভিচারের শাস্তিও কায়েম করছে। আহসার আমীর এতে রাগান্বিত হলো এবং সে উয়ায়নার আমীর উছমানকে এই মর্মে পত্র লিখলো যে, আপনি অবশ্যই এই লোকটিকে (শাইখকে) হত্যা করবেন। অন্যথায় আমরা আপনাকে খিরাজ (ট্যাক্স) দেয়া বন্ধ করে দিবো।
উল্লেখযোগ্য যে, আহসার এই গ্রাম্য অশিক্ষিত শাসক উছমানকে বিরাট অংকের ট্যাক্স প্রদান করতো। তাই উছমান পত্রের বিষয়টিকে খুব বড় মনে করলেন এবং এই আশঙ্কা করলেন যে, শাইখের দাওয়াতের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখলে আহসার খিরাজ বন্ধ হয়ে যাবে এবং তাদের পক্ষ হতে বিদ্রোহ ও যুদ্ধ ঘোষণারও ভয় রয়েছে।
তাই তিনি শাইখকে পত্রের বিষয় অবগত করলেন এবং বললেন: আহসার শাসকের পত্র মোতাবেক আমরা আপনাকে হত্যা করা সমীচীন মনে করছি না। আপনাকে সাহায্য ও সহযোগিতা করাও এখন থেকে আর সম্ভব হবে না। কারণ আমরা আহসার শাসক সুলায়মানকে খুব ভয় করছি। আমরা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেও সক্ষম নই। সুতরাং আপনি যদি আমাদের কল্যাণ ও আপনার নিজের কল্যাণ চান, তাহলে আমাদের নিকট থেকে চলে যান।
শাইখ তখন বললেন, আমি যে বিষয়ের দিকে দাওয়াত দিচ্ছি, তা তো আল্লাহর দীন। এটিই তো কালেমা তাইয়্যেবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ-এর দাবি। যে ব্যক্তি এই দীনকে মযবুতভাবে ধারণ করবে, একে সাহায্য করবে এবং দৃঢ়তার সাথে এ দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে সাহায্য করবেন এবং তার শত্রুদের উপর তাকে বিজয় দান করবেন।
সুতরাং আপনি যদি ধৈর্য ধারণ করেন এবং দীনের উপর অটল থাকেন এবং এ দাওয়াতের প্রতি সাহায্য ও সমর্থন অব্যাহত রাখেন, তাহলে আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহ আপনাকে অচিরেই বিজয় দান করবেন এবং এ গ্রাম্য যালেম শাসক ও তার বাহিনী থেকে আপনাকে রক্ষা করবেন। সে সাথে আল্লাহ আপনাকে তার অঞ্চল ও তার গোত্রের শাসনভার আপনার হাতেই সোপর্দ করবেন।
এতে উছমান বললেন, হে সম্মানিত শাইখ! তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই এবং তার বিরোধীতা করার মত ধৈর্যও আমাদের নেই।
দিরিয়ায় হিযরত এবং দিরিয়ার আমীর মুহাম্মাদ বিন সউদের সাথে সাক্ষাৎ:
পরিশেষে উছমান ইবনে মুআম্মারের অনুরোধে বাধ্য হয়ে শাইখ উয়ায়না থেকে বেরিয়ে পড়লেন। উয়ায়না ছেড়ে তিনি দিরিয়ায় হিযরত করলেন। বলা হয়ে থাকে যে, বের হওয়ার সময় শাইখ পায়ে হেঁটে বের হন। কারণ উছমান শাইখের জন্য কোন বাহনের ব্যবস্থা করেননি। তাই সকাল বেলা বের হয়ে সারাদিন পায়ে হেঁটে বিকাল বেলা দিরিয়ায় গিয়ে পৌঁছেন। দিরিয়ায় পৌঁছে তিনি একজন ভাল মানুষের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তার নাম মুহাম্মাদ ইবনে সুয়াইলিম আল উরায়নী। এই লোকটি শাইখকে একদিকে যেমন আশ্রয় দিলেন, অন্যদিকে আমীর মুহাম্মাদের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্তও হয়ে পড়লেন। কিন্তু শাইখ তাকে এই বলে শান্ত করলেন যে, আমি যেদিকে মানুষকে দাওয়াত দিচ্ছি, তা হচ্ছে আল্লাহর দীন। অচিরেই আল্লাহ তা‘আলা এ দীনকে বিজয়ী করবেন। যাই হোক আমীর মুহাম্মাদের কাছে শাইখের খবর পৌঁছে গেল।
ইতিহাসে বলা হয় যে, একদল ভাল লোক প্রথমে আমীরের স্ত্রীর কাছে গিয়ে শাইখের দাওয়াতের বিষয়টি বুঝিয়ে বললেন। আমীরের স্ত্রী ছিলেন একজন ভাল ও দীনদার মহিলা। তারা আমীরের স্ত্রীকে বললেন, আপনার স্বামী মুহাম্মাদকে বলুন, তিনি যেন শাইখের দাওয়াত কবুল করেন এবং তাকে সাহায্য ও সহযোগিতা করেন।
অতঃপর যখন আমীর মুহাম্মাদ বাড়ীতে আসলেন, তখন আমীরের স্ত্রী তাকে বললেন, আপনার অঞ্চলে বিরাট এক গনীমত আগমন করেছে। আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহ তা‘আলা নিজেই আপনার নিকট এ গনীমত পাঠিয়েছেন। আপনার এলাকায় এমন একজন লোক আগমন করেছেন, যিনি আল্লাহর দীনের দিকে মানুষকে আহবান করেন, আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাতের দিকে দাওয়াত দেন। কত সুন্দর এই গনীমত! সুতরাং আপনি দ্রুত তাকে কবুল করে নিন এবং তাকে সাহায্য করুন। খবরদার! আপনি কখনই এ থেকে পিছপা হবেন না।
আমীর মুহাম্মাদ তার স্ত্রীর এই মূল্যবান পরামর্শ গ্রহণ করলেন। অতঃপর তিনি ইতস্ততবোধ করছিলেন এ ভেবে যে তিনি নিজেই শাইখের কাছে যাবেন? না শাইখকে নিজের কাছে ডেকে আনবেন? এবারও তার স্ত্রী তাকে বুঝিয়ে দিলেন যে, শাইখকে আপনার কাছে ডেকে আনা ঠিক হবে না। বরং শাইখ যেখানে অবস্থান করছেন, আপনারই সেখানে যাওয়া উচিত। কেননা ইলম এবং দীনের দাইদের সম্মানকে সমুন্নত রাখার স্বার্থেই তা করা বাঞ্চনীয়। আমীর মুহাম্মাদ এবারও তার স্ত্রীর পরামর্শ কবুল করে নিলেন।
আমীর মুহাম্মাদ ইবনে সউদ তাকে সাদরে গ্রহণ করার জন্য মুহাম্মাদ ইবনে সুওয়াইলিমের বাড়ীতে গেলেন। সেখানে গিয়ে শাইখকে সালাম দিলেন এবং তার সাথে আলোচনা করলেন। পরিশেষে তিনি বললেন, হে শাইখ! আপনি সাহায্যের সুসংবাদ গ্রহণ করুন, নিরাপত্তার সুসংবাদ গ্রহণ করুন এবং সর্ব প্রকার সহযোগিতারও সুসংবাদ গ্রহণ করুন।
জবাবে শাইখও আমীরকে আল্লাহর সাহায্য, বিজয়, প্রতিষ্ঠা এবং শুভ পরিণামের সুসংবাদ প্রদান করলেন। শাইখ আরো বললেন, এটি হচ্ছে আল্লাহর দীন। যে ব্যক্তি আল্লাহর দীনকে সাহায্য করবে, আল্লাহও তাকে সাহায্য করবেন, শক্তিশালী করবেন। অচিরেই আপনি এর ফল দেখতে পাবেন।
অতঃপর আমীর মুহাম্মাদ বললেন: হে শাইখ! আমি আপনার হাতে আল্লাহ ও আল্লাহর দীনের উপর অটুট থাকার এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করার বাই‘আত করবো। তবে আমার আশঙ্কা হচ্ছে আমরা যখন আপনাকে সমর্থন করবো, আপনাকে সাহায্য করবো এবং আল্লাহ তা‘আলা যখন শত্রুদের উপর আপনাকে বিজয় দান করবেন, তখন আপনি আমাদের দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যান কি না। শাইখ জবাবে বললেন, এমনটি কখনই হবে না। আপনাদের রক্ত আমারই রক্ত, আপনাদের ধ্বংস আমারই ধ্বংস। আপনার শহর ছেড়ে আমি কখনই অন্যত্র চলে যাবো না।
অতঃপর আমীর মুহাম্মাদ শাইখকে সাহায্য করার বাই‘আত করলেন এবং শাইখও অঙ্গীকার করলেন যে, তিনি আমীরের দেশেই থাকবেন এবং আমীরের সহযোগী হিসাবেই কাজ করবেন ও আল্লাহর দীনের বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবেন। এভাবেই ঐতিহাসিক বাই‘আত সম্পন্ন হলো।
শাইখের দাওয়াতের নতুন যুগ:
এভাবে শাইখের দাওয়াত এক নতুন যুগে প্রবেশ করল। দিরিয়ার আমীরের সর্বপ্রকার সাহায্য-সহযোগিতা করার অঙ্গীকার পেয়ে শাইখ নতুন গতিতে নির্ভয়ে দাওয়াতী কাজ শুরু করলেন। প্রত্যেক অঞ্চল থেকে দলে দলে লোকেরা দিরিয়ায় আসতে লাগল। শাইখ সম্মান ও ইজ্জতের সাথে এখানে বসবাস করতে লাগলেন এবং তাফসীর, হাদীছ, আক্বীদা, ফিক্বহসহ দীনের বিভিন্ন বিষয়ে দারস দানে মশগুল হলেন। নিয়মিত দারস দানের পাশাপাশি সমর্থক ও সাথীদেরকে নিয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে শিরকের আস্তানা গুড়িয়ে দিতে থাকেন এবং যেসব মাজারে মানত স্বরূপ তোহফা পেশ করা হতো তা একের পর এক উচ্ছেদ করতে থাকেন।
শাইখ যখন দিরিয়ায় আসলেন তখন জানতে পারলেন যে, সেখানে এমন একটি খেজুর গাছ রয়েছে, যাকে الفحل ফাহল বা ফাহ্হাল বলা হতো। এই খেজুর গাছের ব্যাপারে তাদের ধারণা ছিল, কোন মহিলার বিয়ে হতে দেরী হলে কিংবা তাকে বিয়ের জন্য কেউ প্রস্তাব না দিলে সে এ খেজুর গাছটিকে জড়িয়ে ধরতো এবং বলতো: يا فحل الفحول أريد زوجا قبل الحول ‘হে সকল ষাঁড়ের সেরা ষাঁড়! বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই তোমার কাছে একজন স্বামী চাই। তাদের ধারণা ছিল, এভাবে এই গাছকে জড়িয়ে ধরলে অবিবাহিত মহিলাদের দ্রুত বিবাহ সম্পন্ন হতো এবং বিয়ে হয়ে গেলে তারা এই গাছকেই বিয়ে হওয়ার কারণ মনে করতো। তাদের মূর্খতা এতদূর গিয়ে পৌঁছেছিল যে, কোন মহিলা গাছটিকে জড়িয়ে ধরার পর যখন তার বিয়ের প্রস্তাব আসতো, তখন তারা বলতো, তোমাকে এ গাছটি সাহায্য করেছে। অতঃপর শাইখের আদেশে গাছটিকে কেটে ফেলা হয়। আল্লাহ তা‘আলা শিরকের এ মাধ্যমটিকে চিরতরে মিটিয়ে দিলেন।
এভাবেই আল্লাহ তা‘আলা শাইখের দাওয়াতকে দিরিয়াতে সফলতা দান করেন। পরবর্তীতে সমগ্র আরব উপদ্বীপ এবং পার্শ্ববর্তী আরব দেশসমূহ এবং সারা বিশ্বে এ দাওয়াত ছড়িয়ে পড়ে।
আল্লাহ তা‘আলা তার অন্তরকে তাওহীদের জ্ঞান অর্জন ও তা বাস্তবায়নের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। সে সাথে যেসব বিষয় তাওহীদের বিপরীত এবং যা মানুষের তাওহীদকে নষ্ট করে দেয় সেসব বিষয় সম্পর্কেও শাইখ গভীর পারদর্শিতা অর্জন করেন।
শাইখ তাওহীদের দাওয়াতকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং নাবী-রাসূলদের দাওয়াতের মূল বিষয় তথা তাওহীদে উলূহিয়্যাতের দাওয়াত শুরু করেন এবং শিরক ও বিদ‘আতের প্রতিবাদ করেন। তাওহীদের দাওয়াত দেয়ার পাশাপাশি তার একাধিক ইলমী মজলিস ছিল। প্রতিদিন তিনি তাওহীদ, তাফসীর, ফিক্বহ এবং অন্যান্য বিষয়ে একাধিক দারস প্রদান করতেন। আল্লাহ তা‘আলা তার দাওয়াতের মধ্যে বরকত দান করলেন। ফলে আরব উপদ্বীপের লোকেরা তার দাওয়াত কবুল করে শিরক, বিদ‘আত ও কুসংস্কারের অন্ধকার পরিহার করে তাওহীদের আলোর দিকে ফিরে আসলো। তার বরকতময় দাওয়াত অল্প সময়ের মধ্যেই আরব উপদ্বীপের সীমানা পেরিয়ে ইরাক, মিশর, সিরিয়া, মরক্কো, ভারতবর্ষসহ পৃথিবীর সকল অঞ্চলেই পৌঁছে যায়। ফলে তিনি ১২শ শতকের মুজাদ্দিদ উপাধিতে ভূষিত হন।
সে সময়ের দিরিয়ার শাসক সম্প্রদায়ও শাইখের দাওয়াতকে কবুল করে নেন এবং সাহায্য করেন। এতে শাইখের দাওয়াত নতুন গতি পেয়ে দ্রুত প্রসারিত হতে থাকে। বর্তমানে সৌদী আরবসহ সারা বিশ্বে তাওহীদের যে দাওয়াত চলছে, তা শাইখের দাওয়াতের ফল ও ধারা হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে। আল্লাহ যেন এ দাওয়াতকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত চালু রাখেন। আমীন।
শাইখের দাওয়াতের মূলনীতি:
পরিশুদ্ধ ইসলামী মানহাজ এবং দীনের সঠিক মূলনীতির উপর শাইখের দাওয়াত প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই দাওয়াতের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল, ইবাদতকে একমাত্র আল্লাহর জন্য খালেস করা, আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে যে সমস্ত মূলনীতির ভিত্তিতে শাইখের দাওয়াতী কর্মতৎপরতা পরিচালিত হতো, নিম্নে তা থেকে কয়েকটি মূলনীতি উল্লেখ করা হলো:
১) মানুষের অন্তরে তাওহীদের শিক্ষা বদ্ধমূল করা এবং শিরক ও বিদ‘আতের মূলোৎপাটন করা:
মুসলিমদের অন্তরে এ মূলনীতিকে সুদৃঢ় করার জন্যই তিনি প্রয়োজন পূরণের আশায় কবর যিয়ারত করা, কবরবাসীর কাছে দু‘আ করা, কিছু চাওয়া, রোগমুক্তি ও বিপদাপদ থেকে উদ্ধার লাভের আশায় তাবীজ ঝুলানো, গাছ ও পাথর থেকে বরকত গ্রহণ করা, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের সন্তুষ্টির জন্য পশু যবেহ করা, আল্লাহ ব্যতীত অন্যের জন্য মানত করা, আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে আশ্রয় চাওয়া, কবর পূজা করা, আল্লাহ ও বান্দার মাঝে উসীলা নির্ধারণ করা এবং রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং অন্যান্য অলী-আওলিয়ার কাছে শাফা‘আত চাওয়া সহ যাবতীয় শিরক বর্জন করার উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন।
২) ছলাত কায়েম করা, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের নিষেধ, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা সহ দীনের অন্যান্য নিদর্শন এবং আচার অনুষ্ঠানগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
৩) সমাজে ন্যায় বিচার ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা এবং আল্লাহর নির্ধারিত দণ্ডবিধি কায়েম করা।
৪) তাওহীদ, সুন্নাত, ঐক্য, সংহতি, সম্ভ্রম রক্ষা, নিরাপত্তা এবং ন্যায় বিচারকে মূলভিত্তি করে একটি ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
যে সমস্ত অঞ্চলে শাইখের দাওয়াত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আরব উপদ্বীপের যে এলাকাগুলো এ দাওয়াতের দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত হয়েছে, সেখানে উপরোক্ত মূলনীতিগুলোর সবই বাস্তবায়িত হয়েছে। এ সংস্কার আন্দোলনের পতাকাবাহী সৌদী আরবের প্রতিটি স্তরেই এর প্রভাব সুস্পষ্টরূপে পরিলক্ষিত হয়েছে। এ দাওয়াত যেখানেই প্রবেশ করেছে, সেখানেই তাওহীদ, ঈমান, সুন্নাত, নিরাপত্তা ও শান্তি প্রবেশ করেছে। ফলে আল্লাহ তা‘আলার ওয়াদা ও অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا ۚ يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ۚ وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
“তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ্ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করবেন। যেমন তিনি প্রতিষ্ঠা দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের সে দীনকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই ফাসিক” (সূরা আন নূর ২৪:৫৫)।
وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ (٤٠) الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ ۗ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ
“যারা আল্লাহ্কে সাহায্য করে, আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পরাক্রমশালী শক্তিধর। তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শক্তি-সামর্থ্য দান করলে তারা ছলাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে। আর সমস্ত বিষয়ের পরিণাম আল্লাহ্র হাতে” (সূরা আল হাজ্জ ২২:৪০-৪১)।
শাইখের বিরোধীতা ও তার উপর মিথ্যাচার:
সত্যের অনুসারী এবং সত্যের পথে যারা আহবান করেন, তারা কোন যুগেই বাতিলপন্থীদের হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা ও তাদের আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি। যেমন রেহাই পাননি আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ বান্দা নাবী-রাসূলগণ। আমাদের সম্মানিত শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহ্হাব (রহঃ) যখন সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন এবং সাহসিকতা ও বলিষ্ঠতার সাথে শিরক, বিদ‘আত ও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সামাজিক কুসংস্কারের প্রতিবাদ শুরু করেন, তখন বিদ‘আতী আলিমগণ তার ঘোর বিরোধীতা শুরু করে। তার বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ উত্থাপন করে। এমনকি এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী লোক সমসাময়িক শাসকদের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করতেও দ্বিধাবোধ করেনি। তাকে একাধিকবার হত্যা করারও ষড়যন্ত্র করা হয়। কিন্তু বিরোধীদের সকল ষড়যন্ত্রই ব্যর্থ হয়। আল্লাহর ইচ্ছা অতঃপর শাইখের সৎসাহস ও নিরলস কর্ম তৎপরতার মুকাবেলায় বিরোধীদের সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয় এবং আল্লাহর দীন ও তাওহীদের দাওয়াতই বিজয় লাভ করে।
বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতই বাংলাদেশসহ ভারত বর্ষে যে সমস্ত আলিম ও দাঈ ছহীহ আক্বীদা ও আমলের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছেন, অতীতের ন্যায় তারাও বিরোধীদের নানা রকম অপবাদ ও অভিযোগের সম্মুখীন হচ্ছেন। এ বরকতময় দাওয়াত থেকে মানুষকে দূরে রাখার জন্য এক শ্রেণীর লোক ছহীহ আক্বীদার অনুসারীদেরকে ওয়াহাবী এবং নির্ভেজাল তাওহীদের দাওয়াতকে ওয়াহাবী আন্দোলন বলে গালি দেয়াসহ নানা অপবাদ দিয়ে যাচ্ছে। এত কিছুর পরও আল্লাহ তা‘আলার অশেষ মেহেরবাণীতে এবং দীনের মুখলিস আলিম ও দাঈদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে সারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ন্যায় বাংলাদেশসহ ভারত বর্ষের প্রত্যেক অঞ্চলেই এই দাওয়াতের প্রভাব দিন দিন বেড়েই চলেছে। আগামী দিনগুলোতে ব্যাপক হারে এ দাওয়াতের সাথে আমাদের দেশের লোকেরা সম্পৃক্ত হবে, আমাদের সামনে এ লক্ষণ অতি সুস্পষ্ট।
শাইখের বিরুদ্ধে কতিপয় অভিযোগ ও তার জবাব:
বিদ‘আতীদের পক্ষ হতে শাইখের বিরুদ্ধে সে সময় অনেকগুলো অভিযোগ পেশ করা হতো। সম্ভবত: বর্তমান কালেও তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগগুলো ছাড়া অন্য কোন অভিযোগ খুঁজে পাওয়া যাবে না। শাইখের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো নিম্নরূপ:
১) শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব অলী-আওলিয়াদের কবরে মানত পেশ করা ও কবরকে সম্মান করা এবং কবরের উদ্দেশে সফর করা বন্ধ করে দিয়েছেন।
২) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে পশু যবেহ করা হারাম করেছেন।
৩) আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া, শাফা‘আত চাওয়া এবং অলী-আওলিয়াদের উসীলা ধরাকে হারাম ঘোষণা করেছেন।
৪) শাইখ নিজ মতের বিরোধীদের সাথে যুদ্ধ করেছেন এবং অন্যায়ভাবে তাদেরকে হত্যা করেছেন। এমনি আরো অনেক অভিযোগ শাইখের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়ে থাকে।
আসলে এগুলো কোন অভিযোগের আওতায় পড়ে না। এগুলো এমন বিষয়, যা কুরআন ও হাদীছের সুস্পষ্ট দলীল দ্বারাই হারাম করা হয়েছে। তার পূর্বে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া এবং তার ছাত্র ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) এ ধরণের শিরক-বিদ‘আতের জোরালো প্রতিবাদ করেছেন। ইসলামের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে যার সামান্য জ্ঞান রয়েছে সেও বুঝতে সক্ষম হবে যে, উপরোক্ত বিষয়গুলোর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। দীনের সঠিক শিক্ষা না থাকার কারণে, তাওহীদের আলো নিভে যাওয়ার সুযোগে এবং সর্বত্র মূর্খতা ও পাপাচার ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে মুসলিম সমাজে উক্ত কুসংস্কারগুলোও ঢুকে পড়েছিল। উক্ত কাজগুলো ইসলামী শরী‘আতের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে এবং তাওহীদের সরাসরি বিরোধী হওয়ার কারণে শাইখ মুসলিমদেরকে সঠিক দীনের দিকে ফিরে আসার আহবান জানিয়েছেন। এটি শুধু তার একার দায়িত্ব ছিল না; বরং সকল আলিমেরই এ দায়িত্ব ছিল। তাই শাইখের দাওয়াত ছিল সম্পূর্ণ তাওহীদ ও সুন্নাহ ভিত্তিক। এটি ছিল একটি সংস্কার আন্দোলন।
তার বিরুদ্ধে ওয়াহাবী মাযহাব নামে পঞ্চম মাযহাব তৈরীরও অভিযোগ পেশ করা হয়ে থাকে। এই অভিযোগটিও ভিত্তিহীন। শাইখ কোন মাযহাব তৈরী করেননি; বরং মুসলিমদেরকে কুরআন ও সুন্নাহর দিকে আহবান জানিয়েছেন। তা ছাড়া তার কিতাবাদী পড়লে বুঝা যায় দীনের শাখা ও ফিক্বহী মাসায়েলের ক্ষেত্রে হাম্বালী মাযহাবের প্রতি তার ঝোঁক ছিল। তবে তিনি মাযহাবী গোঁড়ামির সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে ছিলেন।
শাইখের বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ করা হয় যে, তিনি বিরোধীদেরকে হত্যা করেছেন। এই অভিযোগটিও সঠিক নয়। কারণ যারা তার বিরুদ্ধে তথা তাওহীদের দাওয়াতের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছে, তিনি কেবল তাদের বিরুদ্ধেই জিহাদ করেছেন। তার জিহাদ ছিল শারঈ জিহাদ। সুতরাং যারা সত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসে নিহত হয়েছে, তাদেরকে তিনি অন্যায়ভাবে হত্যা করেছেন-এ অভিযোগ সঠিক নয়।
অনেকে তাকে হাদীছে বর্ণিত ‘নজদ’ এর ফিতনা বলে আখ্যায়িত করে থাকে। রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: হে আল্লাহ! তুমি আমাদের শাম এবং ইয়ামানে বরকত দান করো। সকলেই তখন বলল: আর আমাদের নজদে? তিনি বললেন, ওখান থেকে শয়তানের শিং উদিত হবে (বুখারী ও মুসলিম)।
হাদীছের ভাষ্য জগতের বিরল প্রতিভা হাফেয ইবনে হাজার আসকালানীসহ অন্যান্য আলিমগণ বলেন: হাদীছে উল্লেখিত নজদ হল ইরাকের নজদ শহর। আর ইরাকেই সকল বড় বড় ফিতনা দেখা দিয়েছে। আলী এবং হুসাইন (রাঃ) এর যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ইরাক শান্ত হয়নি। সেখানকার ফিতনার কারণেই আলী (রাঃ) কূফায় এবং হোসাইন (রাঃ) কারবালায় শাহাদাত বরণ করেন। হেজাহের নজদে কোন ফিতনাই দেখা যায়নি। যেমনটি ইরাকে দেখা দিয়েছে। সুতরাং হেজাহের নজদ থেকে শাইখের যে তাওহীদী দাওয়াত প্রকাশিত হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, তা ছিল নাবী-রাসূলদেরই দাওয়াত। সুতরাং সুস্পষ্ট বিদ‘আতী আর অন্ধ ছাড়া কেউ এই দাওয়াতকে নজদের ফিতনা বলতে পারে না।
শাইখের দাওয়াতের ফলাফল:
শাইখের বরকতময় দাওয়াতের ফলে আরব উপদ্বীপসহ পৃথিবীর বহু অঞ্চল থেকে শিরক-বিদ‘আত ও দীনের নামে নানা কুসংস্কার উচ্ছেদ হয়। যেখানেই এ দাওয়াত প্রবেশ করেছে, সেখানেই তাওহীদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং হক্বপন্থীগণ সম্মানিত হয়েছেন। হাজীগণ সারা বিশ্ব হতে মক্কা ও মদীনায় আগমন করে শাইখের দাওয়াত পেয়ে নিজ নিজ দেশে ফিরে গিয়ে তাওহীদের দাওয়াত প্রচার করতে থাকেন। বাদশাহ আব্দুল আযীযের যুগে সুবিশাল সৌদী আরব তাওহীদের এ দাওয়াতের উপরই প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ এ দাওয়াতের ফল ভোগ করছেন সৌদী রাজ পরিবার ও তার জনগণসহ মুসলিম বিশ্বের বহু সংখ্যক জ্ঞানী, গুণী বিপুল সংখ্যক জনসাধারণ। বিশ্বের যেখানেই কুরআন, সুন্নাহ এবং ছহীহ আক্বীদার দাওয়াত ও শিরক-বিদ‘আতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলছে, তা শাইখের এই বরকতময় দাওয়াতেরই ফসল। হে আল্লাহ! তুমি ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাওহীদের এ দাওয়াতকে সমুন্নত রাখুন। আমীন।
শাইখের ছাত্রগণ:
তার নিকট থেকে অগনিত লোক তাওহীদ ও দীনের অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছেন। তাদের মধ্যে:
১) শাইখের চার ছেলে হাসান, আব্দুল্লাহ, আলী এবং ইবরাহীম। তাদের প্রত্যেকেই ইসলামী শরী‘আতের বিভিন্ন বিষয়ে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।
২) তার নাতি শাইখ আব্দুর রহমান ইবনে হাসান।
৩) শাইখ আহমাদ ইবনে নাসের ইবনে উছমান এবং আরো অনেকেই।
শাইখের ইলমী খেদমত:
শাইখের রয়েছে ছোট বড় অনেকগুলো সুপ্রসিদ্ধ কিতাব। তার মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও আলোচিত হচ্ছে এই ‘কিতাবুত তাওহীদ’। শাইখের আরো যে সমস্ত গ্রন্থ রয়েছে, তার মধ্যে:
(১) কাশফুশ শুবুহাত
(২) আল উসূলুস ছালাছাহ ওয়া আদিল্লাতুহা
(৩) উসূলুল ঈমান
(৪) তাফসীরুল ফাতিহা
(৫) মাসাইলুল জাহিলিয়্যাহ
(৬) মুখতাসার যাদুল মা‘আদ
(৭) মুখতাসার সীরাতুর রাসূল (ﷺ) প্রভৃতি।
শাইখের মৃত্যু:
হিজরী ১২০৬ সালের যুল-কাদ মাসের শেষ তারিখে ৯২ বছর বয়সে শাইখ দিরিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। হে আল্লাহ! তুমি শাইখকে তোমার প্রশস্ত রহমত দ্বারা আচ্ছাদিত করে নাও। আমাদেরসহ তাকে নাবী, সিদ্দীকীন, শুহাদা এবং ছলেহীনদের সাথে জান্নাতুল ফিরদাউসে স্থান দাও। আমীন
📄 ১. তাওহীদের মর্যাদা এবং তাওহীদ যে সমস্ত গুনাহ মিটিয়ে দেয়
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ أُولَٰئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ
“যারা ঈমান এনেছে এবং ঈমানকে যুলুমের সাথে মিশ্রিত করেনি, তাদের জন্যই রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত” (সূরা আল আন‘আম:
উবাদা ইবনে সামেত (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«مَنْ شَهِدَ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، وَأَنَّ عِيسَىٰ عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ، وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَىٰ مَرْيَمَ، وَرُوحٌ مِنْهُ، وَالْجَنَّةَ حَقٌّ، وَالنَّارَ حَقٌّ، أَدْخَلَهُ اللَّهُ الْجَنَّةَ عَلَىٰ مَا كَانَ مِنَ الْعَمَلِ»
“যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য প্রদান করল যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন ইলাহ নেই, তিনি একক, তার কোন শরীক নেই এবং মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল। আরও সাক্ষ্য দিল যে, ঈসা আ. আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, ঈসা আ. এমন এক কালিমা যা তিনি মরিয়ম আ. এর প্রতি প্রেরণ করেছেন এবং তিনি তাঁরই পক্ষ থেকে প্রেরিত রূহ বা আত্মা। জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা জান্নাত দান করবেন। তার আমল যাই হোক না কেন”।
ইমাম বুখারী ও মুসলিম ইতবান (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«فَإِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَى النَّارِ مَنْ قَالَ: لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ، يَبْتَغِي بِذَٰلِكَ وَجْهَ اللَّهِ»
আল্লাহ তা‘আলা এমন ব্যক্তির উপর জাহান্নামের আগুন হারাম করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছেন।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি ইরশাদ করেন,
«قَالَ مُوسَى: يَا رَبِّ، عَلِّمْنِي شَيْئًا أَذْكُرُكَ وَأَدْعُوكَ بِهِ، قَالَ: قُلْ يَا مُوسَى: لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ، قَالَ: يَا رَبِّ، كُلُّ عِبَادِكَ يَقُولُونَ هَٰذَا، قَالَ: يَا مُوسَى، لَوْ أَنَّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعَ وَعَامِرَهُنَّ غَيْرِي، وَالْأَرَضِينَ السَّبْعَ فِي كِفَّةٍ، وَلَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ فِي كِفَّةٍ، مَالَتْ بِهِنَّ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ»
মূসা (আঃ) বললেন: “হে আমার রব, আমাকে এমন জিনিস শিক্ষা দিন যা দ্বারা আমি আপনাকে স্মরণ করব এবং আপনাকে ডাকব। আল্লাহ বললেন, ‘হে মূসা! তুমি لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ বল। মূসা আ. বললেন: “আপনার সব বান্দাই তো এটা বলে।” তিনি বললেন: “হে মূসা! আমি ব্যতীত সপ্তাকাশে যা কিছু আছে তা আর সাত তবক যমীন যদি এক পাল্লায় থাকে এবং আরেক পাল্লায় যদি শুধু لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ থাকে, তাহলে لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ -এর পাল্লাই বেশী ভারী হবে”।
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:
سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - يَقُولُ: «قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: يَا ابْنَ آدَمَ، لَوْ أَتَيْتَنِي بِقُرَابِ الْأَرْضِ خَطَايَا، ثُمَّ لَقِيتَنِي لَا تُشْرِكُ بِي شَيْئًا لَأَتَيْتُكَ بِقُرَابِهَا مَغْفِرَةً»
আমি রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন: আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
“হে বনী আদম! তুমি যদি যমীন পরিপূর্ণ গুনাহ নিয়ে আমার কাছে আগমন কর এবং আমার সাথে অন্য কিছুকে শরীক না করে মিলিত হও, তাহলে যমীন পরিপূর্ণ ক্ষমাসহ আমি তোমার সাথে সাক্ষাৎ করবো।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) আল্লাহ্ তা‘আলার অসীম করুণা।
২) আল্লাহর নিকট তাওহীদের অপরিসীম ছাওয়াব।
৩) অপরিসীম ছাওয়াব দেয়ার সাথে সাথে তাওহীদ দ্বারা পাপসমূহও মোচন হয়।
৪) সূরা আন‘আমের ৮২ নং আয়াতের তাফসীর জানা গেল। অর্থাৎ সেখানে যে যুলুমের বর্ণনা এসেছে, তা দ্বারা সাধারণ যুলুম উদ্দেশ্য নয়; বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে শিরক।
৫) উবাদা বিন সামেতের হাদীছে বর্ণিত পাঁচটি বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দেয়া জরুরী।
৬) উবাদা বিন সামেত এবং ইতবানের হাদীছকে একত্র করলে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র অর্থ সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে এবং ধোঁকায় নিপতিত লোকদের ভুল সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়বে।
৭) ইতবান (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীছে উল্লেখিত শর্তের ব্যাপারে সতর্কীকরণ। অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কালেমাটি পাঠ করবে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এটি পাঠ করবে, সে অবশ্যই আমল করবে এবং তা কেবল আল্লাহর জন্যই করবে।
৮) ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র ফযীলতের ব্যাপারে নাবীগণকেও সতর্ক করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
৯) সমগ্র সৃষ্টির তুলনায় এ কালিমার পাল্লা ভারী হওয়ার ব্যাপারে অবগতকরণ। যদিও এ কালেমার অনেক পাঠকের পাল্লা ইখলাসের সাথে পাঠ না করার কারণে হালকা হয়ে যাবে।
১০) সপ্তাকাশের মত সপ্ত যমীন বিদ্যমান থাকার প্রমাণ পাওয়া গেল।
১১) যমীনের মত আকাশেও বসবাসকারী রয়েছে।
১২) আল্লাহর ছিফাত বা গুণাবলীকে সাব্যস্ত করা জরুরী। আশ‘আরী সম্প্রদায়ের লোকেরা এগুলোকে অস্বীকার বা এগুলোর অপব্যাখ্যা করে থাকে।
১৩) আপনি যখন ছাহাবী আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীছটি বুঝতে সক্ষম হবেন তখন জানতে পারবেন যে, ইতবান (রাঃ) এর হাদীছে বর্ণিত রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী:
فَإِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَى النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَبْتَغِي بِذَلِكَ وَجْهَ اللَّهِ
“আল্লাহ তা‘আলা এমন ব্যক্তির উপর জাহান্নামের আগুন হারাম করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলেছে”। এর মর্মার্থ হচ্ছে শিরক বর্জন করা। শুধু মুখে বলা এর উদ্দেশ্য নয়।
১৪) আল্লাহর নাবী ঈসা (আঃ) এবং মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উভয়ই আল্লাহর বান্দা এবং রাসূল হওয়ার বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করা।
১৫) “কালিমাতুল্লাহ” বলে ঈসা আ. কে খাস করার বিষয়টি জানা গেল। এ দ্বারা বিশেষ মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
১৬) ঈসা আ. আল্লাহর পক্ষ থেকে রূহ হওয়া সম্পর্কে অবগত হওয়া গেল।
১৭) জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি ঈমান আনার মর্যাদা।
১৮) তাওহীদপন্থী লোকেরা জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমল যাই হোক না কেন।
১৯) এ কথা জানা গেল যে, ক্বিয়ামতের দিন মীযান (দাঁড়িপাল্লা) স্থাপন করা হবে। মীযানের দুটি পাল্লাও থাকবে।
২০) আরও জানা গেল যে, আল্লাহর অনেক ছিফাত রয়েছে। তার মধ্যে আল্লাহর চেহারা তার অন্যতম একটি ছিফাত।
টিকাঃ
১০. আল্লাহ এবং তার রাসূলই অধিক জানেন -এ কথা রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবদ্দশায় বলা বৈধ ছিল। এখন শুধু আমরা বলবো, আল্লাহই ভাল জানেন। রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মৃত্যুর পর সালাফদেরকে এ কথা বলতে শুনা যেত না যে, الله ورسوله أعلم (আল্লাহ এবং তার রাসূলই সর্বাধিক অবগত রয়েছেন)।
১১. এখানে যুলুম দ্বারা বড় শিরক উদ্দেশ্য। মারফূ‘ সূত্রে আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ এবং অন্যান্য ছাহাবীদের হাদীছে বর্ণিত হয়েছে যে, উপরোক্ত আয়াতটি নাযিল হলে ছাহাবীগণ বলতে লাগলেন: আমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে নিজের নফসের উপর যুলুম করেনি? নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন: তোমরা এই আয়াতে যুলুম দ্বারা যা বুঝছো, তা সঠিক নয়। এখানে যুলুম দ্বারা শিরক উদ্দেশ্য। তোমরা কি আল্লাহর প্রিয় বান্দা লুকমান আ. এর কথা শুননি? তিনি তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন:
يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ ۖ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
“হে প্রিয় বৎস! আল্লাহ্র সাথে শরীক করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্র সাথে শরীক করা মহা যুলুম” (সূরা লুকমান: ১৩)।
১২. শাহাদাতু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহর শর্তাবলী নিম্নরূপ:
(১) স্বীকারোক্তিসহ আন্তরিক ও বাহ্যিকভাবে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রিসালাতকে বিশ্বাস করা।
(২) প্রকাশ্যে এ কালিমাটুকু মুখে উচ্চারণ করা।
(৩) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনুগত্য করা। তিনি যে সত্য নিয়ে এসেছেন সে অনুযায়ী আমল করা। যে সকল বাতিল থেকে নিষেধ করেছেন তা হতে দূরে থাকা। (সূরা আল হাশর ৫৯:৭, সূরা আন নিসা ৪:৫৯)
(৪) তিনি অতীত ও ভবিষ্যতের যে সকল অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ দিয়েছেন তা সত্যায়ন করা।
(৫) নিজের জীবন, ধন-সম্পদ, সন্তানাদি, পিতা-মাতা এবং সকল মানুষ থেকেও রাসূলকে বেশী ভালবাসা। (ছহীহ বুখারী হা/১৪, ১৫)।
১৩. এখানে কালিমার অর্থ হচ্ছে তাঁর বাণী كُنْ হয়ে যাও। আল্লাহ্ তা‘আলা ঈসা আ. কে তাঁর কালিমা كُنْ দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।
১৪. ছহীহ বুখারী হা/৩৪৩৫, মুসলিম হা/২৮। সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা জান্নাত দান করবেন। তার আমল যাই হোক না কেন। অর্থাৎ তাঁর ইখলাস তথা একনিষ্ঠতার সাথে উপরোক্ত বিষয়গুলোর ঘোষণা দেয়ার কারণে, সত্য বিষয়গুলোর সত্যায়ন করার কারণে, নাবী-রাসূলদের প্রতি এবং তাদেরকে যেই নবুওয়াত ও রিসালাত দেয়া হয়েছে, তার প্রতি ঈমান আনয়নের কারণে, খ্রীস্টান ও ইয়াহূদীরা ঈসা আ. এর ব্যাপারে যেই বাড়াবাড়ি ও দুর্ব্যবহার করেছে তার প্রতিবাদ ও বিরোধীতা করার কারণে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সে ঈসা আ. এর ব্যাপারে আরও দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করেছে যে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতিও ঈমান আনয়ন করেছে। যার আমল ও অবস্থা এ রকম হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যদিও সৎকর্ম সম্পাদনে তার ত্রুটি রয়েছে এবং তার বেশ কিছু গুনাহও রয়েছে। এই সৎআমলটি অর্থাৎ নির্ভেজাল তাওহীদের ঘোষণা অন্যান্য সকল গুনাহ-এর তুলনায় ভারী হয়ে যাবে।
যে ব্যক্তি লা-ইলাহা পাঠ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, অনেক লোকই এই হাদীছটি বুঝতে ভুল করেছে। তারা মনে করে শুধু যবান দিয়ে এ বাক্যটি উচ্চারণ করাই জান্নাতে যাওয়ার জন্য এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যথেষ্ট। মূলত বিষয়টি এরূপ নয়। যারা এরূপ মনে করে, তারা বিভ্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত। তারা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’-এর সঠিক মর্মার্থ বুঝতে পারেনি। না বুঝার কারণ হল, তারা এ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করেনি। এ পবিত্র বাক্যটির সঠিক অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ ব্যতীত সকল মা‘বুদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং সকল প্রকার ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই খাস (নির্ধারণ) করা। ইবাদতগুলো এমন পদ্ধতিতে করা, যাতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। এটিই লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্-এর হক্। যে ব্যক্তি এ হক্ আদায় করবে না, কিংবা এর কিছু অংশ আদায় করবে, অতঃপর আল্লাহর সাথে অন্যান্য অলী আওলীয়া ও সৎ লোকদের কাছে দু‘আ করবে এবং তাদের জন্য নযর-মানত পেশ করবে, সে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’এর শর্ত ভঙ্গকারী হিসাবে গণ্য হবে। সে এটি পাঠ করার দাবি করলেও তাতে কোন লাভ হবে না।
১৫. ছহীহ বুখারী হা/৪২৫, ৫৪০১, মুসলিম হা/৩৩। এটি বুখারী ও মুসলিমের একটি দীর্ঘ হাদীছের অংশ। লেখক তা থেকে শুধু ঐটুকুই বর্ণনা করেছেন, যা এই অধ্যায়ের জন্য প্রযোজ্য। কালেমায়ে তাইয়্যেবার এটিই প্রকৃত অর্থ। এই পবিত্র বাক্যটি ইবাদতের মধ্যে ইখলাসের দাবি জানায় এবং শিরককে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সিদক (সত্যনিষ্ঠা) এবং ইখলাস (একনিষ্ঠতা) এই দু’টি বিষয় এমন, যার একটি অন্যটির সাথে জড়িত। এ দু’টির একটিকে অন্যটি ছাড়া কল্পনাও করা যায় না। বান্দা যদি ইবাদতের মধ্যে একনিষ্ঠ না হয়, তাহলে সে মুশরিক হিসাবে গণ্য হবে। আর যদি সত্যবাদী না হয়, তাহলে মুনাফিক হিসাবে গণ্য হবে। মুখলিস হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে কালেমায়ে তাওহীদ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’কে যবান দিয়ে পাঠ করার সাথে সাথে খালেসভাবে কেবল আল্লাহর ইবাদত করে।
আলিমগণ এ কালিমার ৪টি শর্ত উল্লেখ করেছেন। যথা:
১| العلم আল ইলম (জ্ঞান)
২| اليقين আল ইয়াক্বীন (দৃঢ় বিশ্বাস)
৩| الإخلاص আল ইখলাছ (একনিষ্ঠতা বা আন্তরিকতা)
৪| الصدق আছ ছিদ্ক্ব (সত্যায়ন)
৫| المحبة আল মাহাব্বা (ভালবাসা)
৬| الانقياد আল ইনক্বিয়াদ (বশ্যতা স্বীকার করা বা মেনে নেয়া বা রাযী থাকা)
৭| القبول আল ক্ববূল (গ্রহণ করা)
৮| الكفر আল কুফরু (অস্বীকার করা)| [গায়াতুল মুরীদ]
১৬. যঈফ: ইবনে হিব্বান ও হাকিম। ইমাম আলবানী (রহঃ) হাদীছটিকে যঈফ বলেছেন। দেখুন: ছহীহ তারগীব ওয়াত্ তারহীব, হা/১৫২৯।
১৭. হাসান: তিরমিযী হা//৩৫৪০, অধ্যায়: গুনাহ করার পর বান্দার জন্য আল্লাহর ক্ষমা। ইমাম আলবানী (রহঃ) হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন। দেখুন: সিলসিলায়ে ছহীহা, হা/১২৭।
📄 ২. যে ব্যক্তি তাওহীদের দাবি পূরণ করবে
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً قَانِتًا لِّلَّهِ حَنِيفًا وَلَمْ يَكُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ
“নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিলেন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর হুকুম পালনকারী একটি উম্মাত এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না।” (সূরা আন নাহল: ১২০)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
وَالَّذِينَ هُم بِآيَاتِ رَبِّهِمْ يُؤْمِنُونَ وَالَّذِينَ هُم بِرَبِّهِمْ لَا يُشْرِكُونَ
নিশ্চয়ই যারা তাদের পালনকর্তার ভয়ে সন্ত্রস্ত, যারা তাদের পালনকর্তার আয়াতসমূহে বিশ্বাস স্থাপন করে, আর যারা তাদের রবের সাথে শিরক করে না- (তারাই দ্রুত কল্যাণ অর্জন করে এবং তারা তাতে অগ্রগামী) (সূরা মু’মিনূন: ৫৭-৫৯)
হুসাইন বিন আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
كُنْتُ عِنْدَ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، فَقَالَ: أَيُّكُمْ رَأَى الْكَوْكَبَ الَّذِي انْقَضَّ الْبَارِحَةَ؟، فَقُلْتُ: أَنَا، ثُمَّ قُلْتُ: أَمَا إِنِّي لَمْ أَكُنْ فِي صَلَاةٍ، وَلَٰكِنِّي لُدِغْتُ، قَالَ: فَمَا صَنَعْتَ؟، قُلْتُ: ارْتَقَيْتُ، قَالَ: فَمَا حَمَلَكَ عَلَىٰ ذَٰلِكَ؟ قُلْتُ: حَدِيثٌ حَدَّثَنَاهُ الشَّعْبِيُّ، قَالَ: وَمَا حَدَّثَكُمْ؟ قُلْتُ: حَدَّثَنَا عَنْ بُرَيْدَةَ بْنِ الْحُصَيْبِ أَنَّهُ قَالَ: لَا رُقْيَةَ إِلَّا مِنْ عَيْنٍ أَوْ حُمَةٍ، قَالَ: قَدْ أَحْسَنَ مَنِ انْتَهَىٰ إِلَىٰ مَا سَمِعَ، وَلَٰكِنْ حَدَّثَنَا ابْنُ عَبَّاسٍ - رضي الله عنهما -، عَنِ النَّبِيِّ - صلى الله عليه وسلم - أَنَّهُ قَالَ: «عُرِضَتْ عَلَيَّ الْأُمَمُ، فَرَأَيْتُ النَّبِيَّ وَمَعَهُ الرُّهَيْطُ، وَالنَّبِيَّ وَمَعَهُ الرَّجُلُ وَالرَّجُلَانِ، وَالنَّبِيَّ وَلَيْسَ مَعَهُ أَحَدٌ، إِذْ رُفِعَ لِي سَوَادٌ عَظِيمٌ، فَظَنَنْتُ أَنَّهُمْ أُمَّتِي، فَقِيلَ لِي: هَٰذَا مُوسَىٰ وَقَوْمُهُ، فَنَظَرْتُ فَإِذَا سَوَادٌ عَظِيمٌ، فَقِيلَ لِي: هَٰذِهِ أُمَّتُكَ، وَمَعَهُمْ سَبْعُونَ أَلْفًا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ بِغَيْرِ حِسَابٍ وَلَا عَذَابٍ»، ثمَّ نَهَضَ فَدَخَلَ مَنْزِلَهُ، فَخَاضَ النَّاسُ فِي أُولَٰئِكَ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ: فَلَعَلَّهُمُ الَّذِينَ صَحِبُوا رَسُولَ اللَّهِ؟، وَقَالَ بَعْضُهُمْ: فَلَعَلَّهُمُ الَّذِينَ وُلِدُوا فِي الْإِسْلَامِ فَلَمْ يُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا، وَذَكَرُوا أَشْيَاءَ، فَخَرَجَ عَلَيْهِمْ رَسُولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - فَأَخْبَرُوهُ، فَقَالَ: «هُمُ الَّذِينَ لَا يَسْتَرْقُونَ، وَلَا يَكْتَوُونَ، وَلَا يَتَطَيَّرُونَ، وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ»، فَقَامَ عُكَّاشَةُ بْنُ مِحْصَنٍ، فَقَالَ: ادْعُ اللَّهَ أَنْ يَجْعَلَنِي مِنْهُمْ، فَقَالَ: «أَنْتَ مِنْهُمْ» ، ثُمَّ قَامَ رَجُلٌ آخَرُ فَقَالَ: ادْعُ اللَّهَ أَنْ يَجْعَلَنِي مِنْهُمْ، فَقَالَ: «سَبَقَكَ بِهَا عُكَّاشَةُ»
“একবার আমি সাঈদ বিন জুবাইরের কাছে উপস্থিত ছিলাম। তিনি বললেন, গতকাল রাত্রে যে নক্ষত্রটি ছিটকে পড়েছে তা তোমাদের মধ্য হতে কে দেখতে পেয়েছ? তখন বললাম, আমি। তবে আমি ছালাত পড়ছিলাম না। তারপর বললাম, আমি বিষাক্ত প্রাণী কর্তৃক দংশিত হয়েছিলাম। তিনি বললেন: তখন তুমি কি চিকিৎসা করেছ? বললাম ঝাড় ফুঁক করেছি। তিনি বললেন, কিসে তোমাকে এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে? অর্থাৎ তুমি কেন এ কাজ করলে? বললাম: ‘একটি হাদীছ’ (আমাকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেছে) যা শা‘বী আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন। তিনি বললেন, তিনি তোমাদেরকে কি বর্ণনা করেছেন? বললাম ‘তিনি বুরাইদা বিন আল হুসাইব থেকে আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, বদ নযর এবং বিষাক্ত পোকার (কামড় ব্যতীত অন্য কোন রোগে ঝাড়-ফুঁক নেই)। তিনি বললেন, ‘সে ব্যক্তিই উত্তম কাজ করেছে, যে শ্রুত কথা অনুযায়ী আমল করাকেই যথেষ্ট মনে করেছে’। কিন্তু ইবনে আব্বাস (রাঃ) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “আমার সম্মুখে সমস্ত জাতিকে উপস্থাপন করা হল। তখন এমন নাবীকে দেখতে পেলাম, যার সাথে অল্প সংখ্যক লোক রয়েছে। এমন নাবীকেও দেখতে পেলাম, যার সাথে মাত্র একজন বা দু’জন লোক রয়েছে। আবার এমন নাবীকেও দেখতে পেলাম যার সাথে কোন লোকই নেই। ঠিক এমন সময় আমার সামনে এক বিরাট জনগোষ্ঠী পেশ করা হল। তখন আমি ভাবলাম: এরা আমার উম্মত। কিন্তু আমাকে বলা হল, এরা হচ্ছে মূসা আ. এবং তার উম্মত। এরপর আরো একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর দিকে আমি তাকালাম। তখন আমাকে বলা হল, এরা আপনার উম্মত। এদের মধ্যে সত্তর হাজার লোক রয়েছে, যারা বিনা হিসাবে এবং বিনা আযাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এ কথা বলে তিনি উঠে বাড়ীর অভ্যন্তরে চলে গেলেন। এরপর লোকেরা ঐ সব ভাগ্যবান লোকদের ব্যাপারে বিতর্ক শুরু করে দিল। কেউ বলল: তারা বোধ হয় রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্য লাভকারী ব্যক্তিগণ। আবার কেউ বলল: তারা বোধ হয় সেই সব লোক, যারা ইসলামী পরিবেশে তথা মুসলিম মাতা-পিতার ঘরে জন্মগ্রহণ করেছে, আর আল্লাহর সাথে তারা কাউকে শরীক করেনি। তারা এ ধরনের আরো অনেক কথা বলাবলি করল। অতঃপর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মধ্যে উপস্থিত হলে বিষয়টি তাকে জানানো হল। তখন তিনি বললেন, “তারা হচ্ছে ঐ সব লোক যারা ঝাড়-ফুঁক করে না। পাখি উড়িয়ে ভাগ্যের ভাল-মন্দ যাচাই করে না। শরীরে ছেঁকা বা দাগ দেয় না। আর তাদের রবের উপর তারা ভরসা করে”। এ কথা শুনে উক্কাশা বিন মিহসান দাঁড়িয়ে বলল, আপনি আমার জন্য দু‘আ করুন যেন আল্লাহ তা‘আলা আমাকে ঐ সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের দলভুক্ত করে নেন। তিনি বললেন: “তুমি তাদের দলভুক্ত”। অতঃপর অন্য একজন লোক দাঁড়িয়ে বলল: আল্লাহর কাছে আমার জন্যও দু‘আ করুন যেন তিনি আমাকেও তাদের অন্তর্ভূক্ত করে নেন। তিনি বললেন: “তোমার পূর্বেই উক্কাশা সে সুযোগ নিয়ে গেছে”।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১) তাওহীদের ব্যাপারে মানুষের বিভিন্ন স্তর থাকার কথা জানা গেল।
২) নাবী ইবরাহীম (আঃ) মুশরিক ছিলেন না বলে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা।
৩) তাওহীদের দাবি পূর্ণ করার তাৎপর্য কি, তা জানা গেল।
৪) বড় বড় আউলীয়ায়ে কেরাম শিরক থেকে মুক্ত ছিলেন বলে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জবানে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা।
৫) ঝাড়-ফুঁক থেকে বিরত থাকা এবং ছেঁকা গ্রহণ পরিত্যাগ করা তাওহীদপন্থী হওয়ার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
৬) আল্লাহর উপর ভরসাই বান্দার মধ্যে উল্লেখিত গুণাবলী ও স্বভাবসমূহের সমাবেশ ঘটায়।
৭) বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশকারী সৌভাগ্যবান লোকেরা কোন আমল ব্যতীত উক্ত মর্যাদা লাভ করতে পারেনি, এটা জানার ব্যাপারে ছাহাবায়ে কেরামের জ্ঞানের গভীরতা।
৮) মঙ্গল ও কল্যাণের প্রতি তাদের অপরিসীম আগ্রহ।
৯) সংখ্যা ও গুণাবলীর দিক থেকে উম্মাতে মুহাম্মাদীর ফযীলত সম্পর্কে জানা গেল।
১০) নাবী মূসা (আঃ) এর উম্মাতের মর্যাদা।
১১) সব উম্মাতকে তাদের নাবীসহ রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সম্মুখে উপস্থিত করা হবে।
১২) প্রত্যেক উম্মাতই নিজ নিজ নাবীর সাথে পৃথকভাবে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে।
১৩) খুব অল্প সংখ্যক লোকই নাবীগণের আহবানে সাড়া দিয়েছিল।
১৪) যে নাবীর দাওয়াত কেউ গ্রহণ করেনি তিনি একাই হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবেন।
১৫) এ জ্ঞানের শিক্ষা হচ্ছে, সংখ্যাধিক্যের দ্বারা ধোঁকা না খাওয়া আবার সংখ্যাল্পতার কারণে অবহেলা না করা।
১৬) বদ-নযর লাগা এবং বিষাক্ত কীটের বিষের চিকিৎসার জন্য ঝাড়-ফুঁকের অনুমতি পাওয়া গেল।
১৭) সালফে ছলেহীনের জ্ঞানের গভীরতা সম্পর্কে জানা গেল। قد أحسن من انتهى إلى ما سمع “সেই ব্যক্তি ভাল কাজ করেছে, যে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যা শুনেছে তাই আমল করেছে” -এ কথাই তার প্রমাণ। তাই প্রথম হাদীছ দ্বিতীয় হাদীছের বিরোধী নয়।
১৮) মানুষের মধ্যে যে গুণ নেই তার প্রশংসা থেকে সালফে ছলেহীনগণ বিরত থাকতেন।
১৯) أنت منهم “তুমি তাদের অন্তর্ভূক্ত” -উক্কাশার ব্যাপারে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই কথা তার নবুওয়াতেরই প্রমাণ বহন করে।
২০) উক্কাশা (রাঃ) এর মর্যাদা ও ফযীলত।
২১) কোন কথা সরাসরি না বলে হিকমত ও কৌশল অবলম্বন করা।
২২) ইঙ্গিতের মাধ্যমে কথা বলা জায়েয।
২৩) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উত্তম চরিত্রের বর্ণনা।
টিকাঃ
১৮. তাওহীদের বাস্তবায়ন (তাওহীদের দাবি পূরণ করা): তাওহীদকে শিরক হতে মুক্ত রাখা। তিনটি বিষয় ছাড়া এটি অর্জন সম্ভব নয়।
১| العلم) ইলম) সুতরাং ইলম অর্জন ব্যতীত কিছুই সম্ভব নয়।
২| الاعتقاد) আক্বীদা-বিশ্বাস) যখন তুমি ইলম অর্জন করলে, কিন্তু বিশ্বাস না করে বরং অহংকার করলে, তাহলে তাওহীদ বাস্তবায়ন হল না।
৩| الانقياد) বশ্যতা স্বীকার করা-আনুগত্য) যখন তুমি ইলম অর্জন করলে, বিশ্বাস স্থাপন করলে কিন্তু বশ্যতা স্বীকার (এককভাবে আল্লাহর ইবাদত করা এবং তার শরী‘আতের কাছে আত্মসমর্পণ করা) করলে না, তাহলে তাওহীদ বাস্তবায়ন হবে না।
১৯. ইবনে কাছীর (রহঃ) বলেন: আল্লাহ্ তা‘আলা এখানে তাঁর একনিষ্ঠ বান্দাদের ইমাম ও রাসূল ইবরাহীম খলীল আ. এর প্রশংসা করছেন। আল্লাহ্ তা‘আলা বলছেন, তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না, ইয়াহূদী, খ্রীস্টান-নাসারা এবং অগ্নিপূজকদেরও অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না। এখানে উম্মত বলতে এমন নেতা উদ্দেশ্য যার অনুসরণ করা হয়। আয়াতে বর্ণিত قانـت অর্থ হচ্ছে বিনয়ী এবং অনুগত। হানীফ অর্থ শিরক বর্জন করে তাওহীদের দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। এ জন্যই আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন: وَلَمْ يَكُ مِنَ الْمُشـ ِركينَ “তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না”। প্রখ্যাত মুফাসসির মুজাহিদ (রহঃ) বলেন: ইবরাহীম একটি উম্মত ছিলেন- এ কথার অর্থ হচ্ছে, সে সময় তিনি একাই ছিলেন মু’মিন এবং অন্যান্য সকল মানুষই ছিল কাফের-মুশরিক।
২০. ইবনে কাছীর (রহঃ) বলেন: নেক ও সৎ আমল করার পরও তারা আল্লাহর ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত ও আতঙ্কের মধ্যে থাকে এবং আল্লাহর শাস্তির ভয়ে ভীত থাকে। হাসান বসরী (রহঃ) বলেন: মু’মিন হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে নেক আমল করার সাথে সাথে আল্লাহ্কে ভয় করে। আর মুনাফিক হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে পাপ কাজ করে এবং নির্ভয়ে থাকে।
২১. এটি ছিল ইসলামের প্রথম দিকে। পরবর্তীতে অন্যান্য বিষয়েও ঝাড়-ফুঁক করার অনুমতি দেয়া হয়, যদি তা কুরআনের আয়াত, ছহীহ হাদীছ এবং শিরকযুক্ত দু‘আ দ্বারা করা হয়। আল্লাহই ভাল জানেন।
২২. অর্থাৎ যেই জাতির কাছে তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছিল, তাদের মধ্য হতে একজনও ঈমান আনয়ন করেনি।
২৩. ছহীহ বুখারী হা/৫৭০৫, ৬৫৪১, মুসলিম, হা/২২০ অধ্যায়: এ উম্মাতের একদল মুসলিমের বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ।
📄 সে বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।