📄 তিন প্রকারের লোক
হাদীস নং ১৬১ - আসীর ইবনে জাবের হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, কুফায় অবস্থানকালে আমার একজন সঙ্গী আমাকে বলিলেন, তোমার কি একজন লোককে দেখিবার ইচ্ছা আছে? আমি বলিলাম, হ্যাঁ। সে বলিল, এই হইল তাহার রাস্তা, এবং আমার ধারণা তিনি এখনই আমাদের নিকট দিয়া অতিক্রম করিবেন। আমরা তাহার অপেক্ষায় বসিয়া রহিলাম।
ইত্যবসরে পুরাতন চাদর পরিহিত একব্যক্তি অতিক্রম করিলেন, লোকেরা তাহার পিছনে পিছনে চলিতেছিল এবং তিনি তাহাদের দিকে ঘুরিয়া কর্কশ ভাষা ব্যবহার করিতেছিলেন কিন্তু লোকেরা বিরক্ত হইতেছিল না। আমরাও লোকদের সহিত চলিলাম। তিনি কুফার মসজিদে প্রবেশ করিলেন আমরাও তাহার সহিত প্রবেশ করিলাম। তিনি এক কোণে একটি খুঁটির দিকে গিয়া দুই রাকাত নামায আদায় করিলেন, অতঃপর আমাদের দিকে ঘুরিয়া বসিলেন এবং বলিলেন, হে লোক সকল! আমার ও তোমাদের মাঝে এমন কি ঘটিয়াছে যে তোমরা প্রত্যেক গলিতেই আমার পিছু নাও। আমি একজন দুর্বল মানুষ, আমার প্রয়োজন থাকে অথচ তোমাদের কারণে আমি তা পূরণ করিতে পারিনা। এমন করিবে না, আল্লাহ তোমাদিগকে রহম করুন। আমার নিকটে কারো কোন প্রয়োজন থাকিলে এখানে বলিতে পার।
কিছুক্ষণ পর বলিলেন, এই মজলিসে তিন ধরনের লোক থাকে। (প্রথমত) ফক্বীহ মুমিন, (দ্বিতীয়ত) এমন মুমিন যে দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে নাই, (তৃতীয়ত) মুনাফিক। দুনিয়াতে এর একটি উদাহরণ রহিয়াছে, আর তাহা হইল বৃষ্টি। ইহা আসমান হইতে ভূমিতে বর্ষিত হয় এবং পত্রবহুল, পোক্তা, ফলবান বৃক্ষে পৌঁছে, ফলে উহার পত্র পল্লব আরো সজীব হয়, তাহার পরিপক্কতা বৃদ্ধি পায়, এবং উহার ফলসমূহ আরো সুস্বাদু হইয়া যায় এবং এই বৃষ্টির পানি পত্র বহুল এমন পোক্তা বৃক্ষেও পৌঁছিয়া থাকে যাহাতে ফল নাই ফলে উহার সেই গাছের পরিপক্কতা বৃদ্ধি পায়। তাহার পাতা পল্লব আরো সজীব হয় এবং উহাতে ফল আসে ফলে সে উপরোক্ত প্রকারের অর্ন্তভূক্ত হইয়া যায়। এবং এই পানি মৃত শুষ্ক বৃক্ষেও পৌঁছিয়া থাকে কিন্তু তাহা উহাকে ছিন্ন ভিন্ন করিয়া ভাসাইয়া লইয়া যায়। অতঃপর তিনি এই আয়াতটি তিলাওয়াত করিলেন,
(ওয়া নুনাযঝিলু মিনাল কুরআনি মা হুয়া শিফাউও ওয়া রাহমাতুল লিল মু’মিনিনা ওয়ালা ইয়াযিদুয যালিমিনা ইল্লা খাসারা)
[আমি অবতীর্ণ করি কুরআন, যাহা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত কিন্তু উহা যালিমদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে (বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৮২)]
এবং বলিলেন, ইয়া আল্লাহ! আমাকে এমন শাহাদাত নসীব করুন যাহার সুসংবাদ উহার কষ্টের চেয়ে এবং যাহার নিরাপত্তা উহার ভীতির চেয়ে অগ্রগামী হইবে, যাহার মধ্যে আপনি আমার জন্য জীবন ও রিযিকের ফয়সালা করিবেন অতঃপর তিনি নিশ্চুপ হইলেন। আসীর বলেন, আমার সঙ্গী আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, লোকটিকে কেমন দেখিলে? আমি বলিলাম আমার আগ্রহই বাড়িয়া চলিয়াছে এবং তিনি আমাদের জন্য এমন লোক নহেন যাহাকে পরিত্যাগ করিব। অনন্তর আমরা তাহার সহিত রহিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই অভিযানের জন্য একটি দল গঠন হইল। সেই চাদরওয়ালা ব্যক্তি উহার সহিত বাহির হইলেন আমরাও তাহার সহিত বাহির হইলাম। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর পর্যায়ক্রমে ভ্রমণ ও যাত্রাবিরতি হইতে লাগিল। অবশেষে দুশমনের নিকটে পৌঁছিলাম।
📄 হে আল্লাহর বাহিনী আরোহন কর
হাদীস নং ১৬২ - আসীর ইবনে জাবের হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, অতঃপর একজন আহ্বানকারী আহ্বান করিল, হে আল্লাহর বাহিনী! আরোহণ কর এবং সুসংবাদ গ্রহণ কর! তিনি বলেন, ইহা শুনিয়া তিনি চাদর হেঁচড়াইয়া আসিলেন। অতঃপর লোকেরা তাহাদের মোকাবেলায় সারিবদ্ধ হইয়া গেল। তিনি বলেন, চাদরওয়ালা তাহার তরবারী কোষমুক্ত করিলেন এবং তরবারীর খাপ ভাঙ্গিয়া দূরে নিক্ষেপ করিলেন অতঃপর বলিতে লাগিলেন, কামনা কর! কামনা কর!! সকল প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করুক অতঃপর জান্নাতের দর্শন লাভ না করিয়া আর ফিরিবে না।
হে লোকসকল! কামনা কর! কামনা কর!! তিনি ইহা বলিতে লাগিলেন এবং অগ্রসর হইতে লাগিলেন। লোকেরাও তাহার সাথে আগুয়ান হইল। তিনি ইহা বলিতে বলিতে চলিতেছেন হঠাৎ একটি তীর আসিয়া তাহার হৃদপিণ্ডে বিদ্ধ হইল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেই স্থানেই নিহত হইয়া গেলেন যেন বহুকাল পূর্বে মৃত্যুবরণ করিয়াছেন। হাম্মাদ তাহার বর্ণনায় বলিয়াছেন, অতঃপর আমরা তাহাকে মাটি দ্বারা ঢাকিয়া দিলাম।
📄 নিঃসন্দেহে ইহা জান্নাত
হাদীস নং ১৬৩ - আনাস (রাযিঃ) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ ইয়ামামার যুদ্ধের দিন খালেদ বিন ওয়ালিদ লোকদের নিয়া অগ্রসর হইলেন। তাহারা একটি নদীর নিকটে উপস্থিত হইলে খাটো দ্রব্যসমূহ তাহাদের কোমরে গুঁজিয়া নদী পার হইয়া গেলেন। অতঃপর কিছু সময় পর্যন্ত লড়াই হইল, মুসলমানগণ পিঁছু হটিলেন। তখন খালেদ বিন ওয়ালিদ কিছু সময় মাথা নিচু করিয়া ভূমির দিকে তাকাইয়া রহিলেন, আমি তাহার ও বারা এর মধ্যখানে বিদ্যমান ছিলাম অতঃপর তিনি মাথা উঠাইয়া কিছু সময় আসমানের দিকে তাকাইয়া রহিলেন। তাহার অভ্যাস ছিল কোন বিষয় তাহাকে পেরেশান করিলে তিনি কিছু সময় ভূমির দিকে তাকাইয়া থাকিতেন অতঃপর কিছু সময় আসমানের দিকে তাকাইয়া থাকিতেন। এর পর তাহার নিকটে তাহার কর্তব্য কর্ম স্থির হইত।
কেহ বলিলেনঃ বারা ভরসা করিয়া বসিয়া আছেন...... তিনি বলিলেন, ভাই! খোদার কসম আমি দেখিতেছি। যখন খালেদ আসমানের দিকে মাথা তুলিলেন এবং তাহার কর্তব্য কর্ম স্থির হইল। তিনি বলিলেন, বৎস থাম, সে বলিল, এখন? তিনি বলিলেন, হ্যাঁ এখন, তখন বারা তাহার মাদী ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করিলেন অতঃপর আল্লাহতায়ালার হামদ ও ছানা করিলেন এবং বলিলেন, হে লোক সকল! খোদার কসম নিঃসন্দেহে ইহা জান্নাত। আমার পক্ষে মদীনায় ফিরিয়া যাইবার কোন পথ নাই অতঃপর কিছুক্ষণ পর্যন্ত তাহাদিগকে উদ্বুদ্ধ করিলেন অতঃপর তিনি ঘোড়া ছুটাইলেন। আমি যেন এখনও উহাকে লেজ মুচড়িয়া ধাবিত করিতে দেখিতেছি। অতঃপর তাহার বাহিনী লইয়া তাহাদের উপর হামলা করিলেন এবং আল্লাহতায়ালা মুশরিকদিগকে পরাজিত করিলেন।
📄 মর্দে মুজাহিদ
হাদীস নং ১৬৪ - আনাস ইবনে মালেক হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন মদীনার দেয়ালে একটি ভগ্নস্থান ছিল। ইয়ামামার মুহাক্কাম সেই স্থানে পা রাখিয়া গাহিতে আরম্ভ করিল- সে ছিল বিশাল বপু- সে বলিতেছিলঃ আমি ইয়ামামার মুহাক্কাম, আমি অবতরণস্থলকে ঢাকিয়া ফেলি। আমি এই, আমি সেই। ইতিমধ্যে বারা তাহার নিকটে আসিলেন। তাহার মেরুদন্ডে ব্যথা ছিল। সে আঘাত করার সুযোগ পাইয়া বারাকে আঘাত করিল। তিনি ঢাল দ্বারা তাহা প্রতিহত করিলেন। বারা তাহাকে আঘাত করিলেন এবং তাহার পা কাটিয়া ফেলিলেন অতঃপর তাহাকে হত্যা করিলেন। মুহাক্কামের সহিত একটি চওড়া তরবারী ছিল। বারা তাহার তরবারী ফেলিয়া মুহাক্কামের চওড়া তরবারীটি নিলেন এবং উহা দ্বারা লড়াই করিলেন। এক পর্যায়ে উহা ভাঙ্গিয়া গেলে তিনি বলিলেন, তোর যাহা অবশিষ্ট রহিয়াছে আল্লাহ উহার মন্দ করুন, অতঃপর উহা ফেলিয়া দিলেন এবং তাহার তরবারীর নিকটে আসিয়া উহা লইলেন।