📄 আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.)
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ) ইসলামের ঐসব মহাপুরুষদের অন্যতম ছিলেন যাদের মধ্যে অসংখ্য গুণাবলীর বর্ণাঢ্য সমাবেশ ঘটেছিল। অসাধারণ মেধা, অতলান্ত জ্ঞান, সীমাহীন খোদাভীতির পাশাপাশি উন্নতরুচি, শানিত ব্যক্তিত্ব, প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও অসাধারণ বীরত্ব এই মহাপুরুষকে সমসাময়িক ব্যক্তিবর্গের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন করেছিল। উমারী বলেন, ইসলামী বিশ্বের খলীফা হওয়ার জন্য তারচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি আমি আমার যুগে আর কাউকে দেখিনি।
জন্ম ও শৈশব
ইমাম 'আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহঃ) ১১৮ হিজরী মতান্তরে ১১৯ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা তুর্কী বংশোদ্ভূত ছিলেন। বাল্যকালেই তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। তাঁর পিতা ছিলেন একজন বিদ্যানুরাগী ব্যক্তি। সন্তানের মধ্যে বিদ্যান্বেষণের আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য তিনি অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন।
ইলম অন্বেষণ
তিনি প্রথমত তার নিজ শহর "মারও”¹ এর শাইখগণের নিকট থেকে ইলম অর্জন করেন। অতঃপর ১৪১ হিজরীতে ইলম অন্বেষণের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ আরম্ভ করেন। তিনি মক্কা, মদীনা, শাম, মিসর, ইয়ামান, কুফা, বসরা, জাযীরা প্রভৃতি এলাকা ভ্রমণ করেন। 'আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহঃ) বলেন, আমি চার হাজার শাইখ থেকে ইলম অর্জন করেছি। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন, 'আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারকের যুগে তাঁর চেয়ে অধিক ইলম অন্বেষণকারী আর কেউ ছিল না।
হাদীস শাস্ত্রেঃ
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ) উম্মতে মুহাম্মদীর শ্রেষ্ঠতম মুহাদ্দিসগণের অন্যতম ছিলেন। ইমাম বুখারী (রহঃ) এর উস্তাদ ইমাম আলী ইবনে মাদীনী (রহঃ) বলেন, ইলম দুই ব্যক্তি পর্যন্ত গিয়ে সমাপ্ত হয়েছে। একজন হলেন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, দ্বিতীয় জন ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন। সুফিয়ান সাওরী (রহঃ) বলতেন, আমার ইচ্ছা হয় আমার পূর্ণ জীবনের পরিবর্তে ইবনুল মুবারকের জীবনের একটি বছর আমি লাভ করি কিন্তু আমার পক্ষে এক বছরের জন্য তারমতো হওয়াতো দূরের কথা, তিনদিনের জন্যও তাঁর মত হওয়া সম্ভব নয়। অসাধারণ স্মরণশক্তির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি কিতাব থেকে হাদীস বর্ণনা করতেন যাতে ভুল ত্রুটি না হয়।
ফিকহ শাস্ত্রেঃ
ইবরাহীম বিন শাম্মাস বলেন, আমি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফকীহ আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহঃ) কে দেখেছি। ইমাম মালিক (রহঃ) তাকে দেখে নিজের স্থান থেকে সরে বসতেন এবং বলতেন, 'ইনি হলেন খুরাসানের ফক্বীহ আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক।' আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ) বলতেন, "আমি ফিক্হ ইমাম আবু হানীফা থেকে অর্জন করেছি। তোমরা বলোনা, আবু হানীফার মত। কেননা তাতো হাদীসেরই তাফসীর ও তার ব্যাখ্যা।"
ইল্ম ও আহলে ইলমের পৃষ্ঠপোষকতাঃ
তিনি কল্যাণের সকল পথে মুক্ত হস্তে ব্যয় করতেন। প্রতি বছর ফকীর মিসকীনদেরকে একলক্ষ দিরহাম দান করতেন। যে কোন ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত হয়ে তার নিকটে আসত তিনি তার ঋণ পরিশোধ করে দিতেন। হজ্জে যাবার সময় বহু মানুষকে সঙ্গে নিতেন এবং তাদের পূর্ণ খরচ নিজেই বহন করতেন।
তাকওয়া ও পরহেযগারীঃ
নুয়াইম বিন হাম্মাদ (রহঃ) বলেন, 'আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহঃ) যখন "কিতাবুর রিক্বাকু" পড়তেন তখন জার জার হয়ে কাঁদতেন। অন্যের সম্পদের ব্যাপারে এত সচেতন ছিলেন যে, শামে অবস্থান কালীন সময়ে কারো কাছ থেকে একটি কলম নিয়েছিলেন কিন্তু তা ফেরত দিতে ভুলে যান। তিনি শুধু সেই কলমটি ফেরত দেওয়ার জন্য পুনরায় শামে ফিরে গিয়েছিলেন।
জিহাদের ময়দানে আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ)
জীবনের বিপুল সময় তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী এলাকাসমূহে কাফিরদের সাথে জিহাদ করে কাটিয়েছেন। জিহাদের ময়দানে তিনি ছিলেন একজন পরীক্ষিত বীর সেনানী। এক ময়দানে তিনি দ্বৈতযুদ্ধে একের পর এক ছয়জন রোমান বীরকে হত্যা করেন। তিনি বিখ্যাত আবেদ হযরত ফুযাইল বিন ইয়াজ (রহঃ) কে এক চিঠিতে লিখেছিলেনঃ "আল্লাহর বাহিনীর পথের ধূলা ও জাহান্নামের লকলকে আগুন কখনো ব্যক্তির নাসারন্দ্রে একত্রিত হবে না। আল্লাহর কিতাব আমাদের মাঝে সত্যকথা বলে, আল্লাহর পথের শহীদ কখনো মৃত নয়।"
ইন্তেকালঃ
শামের সীমান্তবর্তী শহর "হীত”¹ নগরীতে ১৮১ হিজরীর ১০ই রমাযান শেষরাতে এই মহামনীষী মহান রাব্বুল 'আলামীনের সান্নিধ্যে চলে যান। "হীত” নগরীতেই তাঁকে দাফন করা হয়।
তথ্যসূত্র: ১- আত তারীখুল কাবীর ৫/২১২ ২- আল জারহু ওয়াত তা'দীল ৫/১৭৯-১৮১ ৩- তারিখু বাগদাদ ১০/১৫২-১৬৯ ৪-তাহযীবুল কামাল ১০/৪৬৬-৪৭৮ ৫- তাহযীবুত তাহযীব ৫/৩৮২-৩৮৭ ৬- তাযকিরাতুল হুফফায ১/২৭৪-২৭৯ ৭- সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ৮/৩৭৮-৪২১ ৮- আল ইন্তিকা ফী ফাযাইলিল আইম্মাতিছ ছালাছাতিল ফুক্বাহা। পৃঃ ২০৬-২০৭ ৯- মানাক্বিবু আবী হানীফা লিলমুয়াফফাক্ব ২/৫১,৫৩ ১০- মুকাদ্দিমাতু কিতাবিল জিহাদ
টিকাঃ
১. তৎকালীন খোরাসানের প্রসিদ্ধ শহরসমূহের অন্যতম। আল্লামা ইয়াকৃত হামভী (রহঃ) বলেন, আমি ৬১৬ হিজরীতে "মারও” ছেড়ে আসি। যদি এসব এলাকায় তাতারীদের আক্রমণ না হত তবে আমি মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করতাম কেননা সেখানকার অধিবাসীগন অত্যন্ত নম্র ও ভদ্র এবং সেখানে মৌলিক ও উন্নত রচনাবলীর প্রাচুর্য রয়েছে। আমি যখন সেখান থেকে আসি তখন সেখানে দশটি ওয়াকফকৃত লাইব্রেরী ছিল যার মত সমৃদ্ধ ও উন্নত লাইব্রেরী আমি পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখিনাই। আমি আমার এই কিতাব ও অন্যান্য কিতাবের অধিকাংশ তথ্যাবলী এসব লাইব্রেরী থেকে আহরণ করেছি। (মুজামুল বুলদান, ৫/১৩২-১৩৪) শহরটি বর্তমান তুর্কমেনিস্তানের অর্ন্তগত।
১. ফোরাত নদীর তীরে অবস্থিত একটি শহর। ঐতিহাসিকগণ বলেন, এই শহরের প্রতিষ্ঠাতার নামেই শহরটির নামকরণ করা হয়। (মু'জামুল বুলদান, ৫/৪৮২-৪৮৩) শহরটি বর্তমান ইরাকের অন্তর্গত।
📄 আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল
হাদীস নং ১- হেলাল ইবনে আবু মায়মুনাহ হইতে বর্ণিত, তিনি আতা বিন ইয়াসার হইতে তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাযিঃ) হইতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমরা পরস্পর আলোচনা করিতেছিলাম, আমাদের মধ্য হইতে কে উপস্থিত হইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করিবে যে, আল্লাহ তায়ালার নিকটে কোন আমলটি সর্বাধিক প্রিয়? কিন্তু আমাদের কেহ তাহা জিজ্ঞাসা করিবার সাহস করিলেন না।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের প্রত্যেককে ডাকাইয়া একত্রিত করিলেন। আমরা একে অপরের প্রতি ইঙ্গিত করিতে লাগিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সামনে (নিম্নোক্ত আয়াত সমূহ) তেলাওয়াত করিলেন।
১। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে সমস্তই আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
২। হে মু'মিনগণ! তোমরা যাহা করনা তাহা তোমরা কেন বল?
৩। তোমরা যাহা করনা তোমাদের তাহা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক।
৪। যাহারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে সারিবদ্ধ ভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত, আল্লাহ তাহাদিগকে ভালো বাসেন..... সুরার শেষ পর্যন্ত। বর্নণাকারী বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে সালামও আমাদের সামনে সূরাটি শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত তেলাওয়াত করিলেন। হেলাল বলেন আতা ইবনে ইয়াসার (যিনি আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম হইতে বর্নণা করিয়াছেন) আমাদের সামনে সূরাটি শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত তেলাওয়াত করিলেন।
📄 সর্বোত্তম আমল
হাদীস নং ২- আবু ছালেহ বলিয়াছেন, তাঁহারা আলোচনা করিলেন, যদি আমরা জানিতাম কোন আমলটি সর্বোত্তম বা আল্লাহ তায়ালার নিকটে অধিক পছন্দনীয়! তখন অবতীর্ণ হইল,
"হে মু'মিনগণ! আমি কি তোমাদিগকে এমন এক ব্যবসার সন্ধান দিব? যাহা তোমাদিগকে রক্ষা করিবে মর্মন্তুদ শাস্তি হইতে, উহা এই যে তোমরা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলে বিশ্বাস স্থাপন করিবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করিবে।"
তাহারা ইহাকে কষ্টের ব্যাপার মনে করিলেন। তখন অবতীর্ণ হইল,
হে মু'মিনগণ! তোমরা যাহা করনা তাহা তোমরা কেন বল? তোমরা যাহা করনা তোমাদের তাহা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক। নিশ্চয়ই আল্লাহ ঐ সকল লোকদিগকে ভালোবাসেন যাহারা তাঁহার পথে সারিবদ্ধ হইয়া সুদৃঢ় প্রাচীরের ন্যায় লড়াই করে।
📄 মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহর পথে আবদ্ধ থাকিবো
হাদীস নং ৩ - মুজাহিদ বলিয়াছেন, আল্লাহ তায়ালার বানী- আনসারদের একটি দলের ব্যাপারে অবতীর্ণ হইয়াছে। তাঁহাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ছিলেন। তাঁহারা এক মজলিসে আলোচনা করিতেছিলেন, আমরা যদি জানিতাম কোন আমলটি আল্লাহ তায়ালার নিকটে সর্বাধিক প্রিয় তবে আমরা মৃত্যু পর্যন্ত তাহা করিয়া যাইতাম। যখন তাহাদের ব্যাপারে উপরোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হইল তখন আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা বলিলেন, আমি মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহর পথে আবদ্ধ থাকিব। অবশেষে তিনি শহীদ হইলেন।