📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাসের স্তরসমূহ

📄 তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাসের স্তরসমূহ


খ। তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাসের স্তরসমূহ: তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাস চারটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে:
প্রথম: এ বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ তা'আলা সকল বিষয় সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত জানেন। আল্লাহ তা'আলা সকল সৃষ্টিজীব সম্পর্কে সৃষ্টির পূর্ব থেকেই অবগত আছেন। তিনি বান্দার সৃষ্টির পূর্বেই তাদের রিযিকু, জীবনের নির্ধারিত সময়, কথা-কাজ, তাদের চলা-ফেরা, গোপনীয় ও প্রকাশ্য সব বিষয়, কে জান্নাতী, কে জাহান্নামী তা অবগত আছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ ﴾ [الحشر : ٢٢] তিনিই আল্লাহ, তিনি ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নেই; তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যকে জানেন, তিনি পরম দয়ালু, অসীম দাতা [সূরা আল্ হাশ্র ৫৯: ২২]।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ يَتَنَزَّلُ الْأَمْرُ بَيْنَهُنَّ لِتَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ وَأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا আল্লাহ্ সপ্তাকাশ সৃষ্টি করেছেন এবং পৃথিবীও সেই পরিমাণে, এসবের মধ্যে তাঁর আদেশ অবতীর্ণ হয়, যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ্ সর্বশক্তিমান এবং সবকিছু তাঁর গোচরীভূত [সূরা আত ত্বলাক্ব ৬৫: ১২]।
দ্বিতীয়: এ বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহর পূর্ব জ্ঞানানুযায়ী পৃথিবীতে যা কিছু ঘটবে তা তিনি লওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ করেছেন। এর দলীল হলো মহান আল্লাহর বাণী: مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ [الحديد : ٢٢] পৃথিবীতে এবং ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর কোন বিপদ আসে না; কিন্তু তা জগত সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ [সূরা আল্ হাদীদ ৫৭:২২]।
রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
كَتَبَ اللَّهُ مَقَادِيرَ الْخَلَائِقِ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِخَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ قَالَ وَعَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ (صحيح مسلم -٢٦٥٣]
আসমান যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে আল্লাহ্ তা'আলা মাখলুকু বা সৃষ্টিজীবের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করেছেন। তখন আরশ পানির উপর ছিল। ৩৯
তৃতীয় বিষয়: আল্লাহর অনিবার্য (যা বাস্তবায়িত হবেই) ইচ্ছার প্রতি বিশ্বাস রাখা যা কেউ প্রতিরোধ করতে পারে না। আল্লাহর শক্তিকে কেউ অপারগ করতে সক্ষম নয়। সংঘটিত যাবতীয় ঘটনাসমূহ আল্লাহর শক্তি ও ইচ্ছানুযায়ী হয়। আল্লাহ তা'আলা যা চান তা সংঘটিত হয়, যা চান না তা সংঘটিত হয় না।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا [الإنسان : ٣٠]
আল্লাহ্র অভিপ্রায় ব্যতিরেকে তোমরা অন্য কোন অভিপ্রায় পোষণ করবে না। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময় [সূরা আদ-দাহ্র ৭৬: ৩০]।
আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেন,
وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ
আল্লাহ যা ইচ্ছা, তা করেন। [সূরা ইবরাহীম ১৪: ২৭]।
চতুর্থ বিষয়: আল্লাহ তা'আলা একাই সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন, তিনি ব্যতীত অন্য সব কিছু মাখলুকু বা সৃষ্ট। আল্লাহ তা'আলা সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ [الرعد : ١٦]
আল্লাহই প্রত্যেক বস্তুর স্রষ্টা এবং তিনি একক, পরাক্রমশালী [সূরা আর রা'দ ১৩:১৬]।
অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا﴾ [الفرقان : ٢]
তিনি প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করার পর তাকে শোধিত করেছেন পরিমিত ভাবে। [সূরা আল্ ফুরক্বান ২৫:২]।
এটা জানা আবশ্যক যে সৃষ্টিকুল সৃষ্টির আগে তাদের ভাগ্যের ভালো মন্দ জানা মহান আল্লাহর অসীম শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ। পৃথিবীর সবকিছু আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মেই চলছে। তার তা'আলা ইচ্ছা বাস্তবায়িত হবেই। বান্দার ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার আওতাধীন, তিনি তাদের জন্য যা চান তা হয়, আর যা চাননা তা হয় না। তেমনি জানা আবশ্যক তাক্বদীর মূলত বান্দার ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর গোপনীয় বিষয়, কোন নৈকট্যশীল ফেরেশতা বা প্রেরীত রসূল তা জানেন না।
মুমিন তার পালনকর্তাকে পরিপূর্ণ গুণে গুনান্বিত করে, তাই সে বিশ্বাস করে পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে তার একটা হিকমত আছে। যদি কোন বিষয়ে আল্লাহর হিকমত জানতে না পারে তবে সকল কিছু ব্যপ্তকারী আল্লাহর জ্ঞানের সামনে নিজের জ্ঞানের সল্পতা বুঝতে পারে। ফলে মহাজ্ঞানী সর্বজ্ঞ আল্লাহর উপর বাদানুবাদ করে না। আল্লাহ তা'আলা তার কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন না কিন্তু মানুষ নিজেদের কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।

টিকাঃ
৩৯. ছহীহ্ মুসলিম হা/২৬৫৩

📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 আল্লাহর আদেশকৃত কাজে ভাগ্যের দোহাই দেয়া

📄 আল্লাহর আদেশকৃত কাজে ভাগ্যের দোহাই দেয়া


গ। আল্লাহর আদেশকৃত কাজ ত্যাগে ভাগ্যের দোহাই দেয়া: আমরা তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের যে গুণাবলী বর্ণনা করেছি তা বান্দার ইচ্ছা ও সামর্থ্যের আওতাধীন কাজে তার চাহিদার পরিপন্থি নয়। কেননা, শরী'আত ও বাস্তবতায় তা প্রমাণিত বিষয়। শরী'আতের দলীল, আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছার ব্যাপারে বলেন:
ذَلِكَ الْيَوْمُ الْحَقُّ فَمَنْ شَاءَ اتَّخَذَ إِلَى رَبِّهِ مَآبًا [النبأ : ٣٩]
এই দিবস সত্য। অতঃপর যার ইচ্ছা, সে তার পালনকর্তার কাছে ঠিকানা তৈরী করুক [সূরা আন-নাবা ৭৮: ৩৯]।
শক্তি বা সামর্থ্যের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
لا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ
আল্লাহ্ কোন ব্যক্তির উপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত কিছু আরোপ করেন না। সে ভালো যা করেছে সে তার সওয়াব পাবে এবং স্বীয় মন্দ কৃতকর্মের জন্য নিজেই নিগ্রহ ভোগ করবে [সূরা আল-বাক্বারা ২: ২৮৬]।
বাস্তবতার দলীল হলো: প্রত্যেক ব্যক্তিই জানে যে তার নিজস্ব একটা ইচ্ছা ও শক্তি আছে যার মাধ্যমে সে কোন কাজ করে বা ছেড়ে দেয়। স্বেচ্ছায় (যেমন হাঁটা বা চলা-ফেরা করা) এবং অনিচ্ছায় যা হয় (যেমন, কাঁপা বা শিহরিত হয়ে উঠা) সে তার মাঝে পার্থ্যক্য করতে পারে। তবে বান্দার ইচ্ছা ও শক্তি আল্লাহর ইচ্ছা ও শক্তির আওতাধীন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَا تَشَاؤُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيماً حَكِيماً [الإنسان - ٣٠]
আল্লাহর অভিপ্রায় ব্যতিরেকে তোমরা অন্য কোন অভিপ্রায় পোষণ করবে না। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময় [সূরা আল-ইনসান (দাহ্র) ৭৬:৩০)।
তাছাড়া সারা বিশ্বের মালিকানা আল্লাহর হাতে সেহেতু তাঁর রাজত্বে তাঁর ইচ্ছা ও জ্ঞান ব্যতীত কোন কিছুই হয় না। আল্লাহর আদিষ্ট কাজ পরিত্যাগ বা নিষেধকৃত কাজ করার ক্ষেত্রে তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাস দিয়ে বান্দার দলীল পেশের কোন সুযোগ নাই। অতএব, যে ব্যক্তি খারাপ কাজ করে ভাগ্যের দোহায় দেয় তার এ দলীল কয়েকভাবে বাতিল বলে গণ্য। প্রথমত: রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ كُتِبَ مَقْعَدُهُ مِنْ النَّارِ وَمَقْعَدُهُ مِنْ الْجَنَّةِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَلَا نَتَّكِلُ عَلَى كِتَابِنَا وَنَدَعُ الْعَمَلَ قَالَ اعْمَلُوا فَكُلُّ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ
জান্নাত ও জাহান্নামে তোমাদের সকলের স্থান লিখা আছে। সাহাবাগণ বললেন: হে আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমরা কি আমাদের ঐ লিখার উপর ভরসা করে আমল করা ছেড়ে দিব না? তিনি বললেন: তোমরা আমল কর, কেননা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য সে কাজই সহজ করে দেওয়া হবে যে জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ৪০ দ্বিতীয়ত: আল্লাহ্ বান্দাকে আদেশ ও নিষেধ করেছেন, আর সে যা পালন করতে সক্ষম তারই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
তোমাদের সাধ্যানুযায়ী তোমরা আল্লাহকে ভয় কর [সূরা আত্-তাগাবুন ৬৪:১৬]। যদি বান্দাকে কোন কাজ করতে বাধ্য করা হতো তবে তার সাধ্যের বাইরে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হতো যা করা ছাড়া তার কোন উপায় থাকতো না। অথচ এমনটি সম্পূর্ণ বাতিল। এ জন্যই জ্ঞানের স্বল্পতা, ভুল বা জোর পূর্বক বান্দার মাধ্যমে কোন অপরাধ হলে তার কোন গুণাহ হবে না। কেননা তার ওজর রয়েছে। তৃতীয়ত: আল্লাহর লিখিত তাক্বদীর বা ভাগ্য গোপনীয় বিষয় বাস্তবায়ীত না হওয়া পর্যন্ত তা জানা যায় না। বান্দা কোন কাজ করার পূর্বেই ইচ্ছা করে থাকে অতএব, বান্দা কর্তৃক কোন কাজের ইচ্ছা করা আল্লাহর লিখিত ভাগ্য লিপির উপর ভিত্তি করে নয়। এমতাবস্থায় তাক্বদীরের মাধ্যমে বান্দার দলীল পেশ করা বাতিল বলে গণ্য। কেননা কোন ব্যক্তি যা জানে না তা ঐ ব্যক্তির জন্য দলীল হতে পারে না।
অবাধ্য ব্যক্তি প্রতিবাদ করে যদি বলে, এ পাপ আমার ভাগ্যে লিখা ছিল। তাকে বলা হবে: তুমি পাপ করার পূর্বে আল্লাহর ইল্ম সম্পর্কে কে তোমাকে অবহিত করল? যেহেতু তুমি (আল্লাহর ইলম) জানো না এবং তোমাকে ইচ্ছা ও শক্তি দেওয়া হয়েছে, তোমার সামনে ভালোমন্দ উভয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে, এমতাবস্থায় তুমিই পাপের পছন্দকারী বা ইচ্ছাকারী। তুমি পাপকে সওয়াবের কাজের উপর প্রাধান্য দিয়েছো, অতএব, তোমাকেই তোমার পাপের শান্তি ভোগ করতে হবে।
চতুর্থত: ওয়াজিব কাজ পরিত্যাগ করে বা পাপ কাজে লিপ্ত হয়ে তাক্বদীরের অজুহাত দানকারী ব্যক্তির উপর কেউ আক্রমন করে তার সম্পদ হরণ করে, অথবা তার ইজ্জত হানী করে তাক্বদীরের দোহায় দিয়ে যদি বলে আমাকে দোষারোপ করিও না।
কেননা তোমার উপর আমার আক্রমন তাক্বদীরের অন্তর্ভূক্ত তবে ঐ ব্যক্তি তা গ্রহণ করবে না। আশ্চর্যের ব্যাপার কিভাবে অন্য কেউ তার উপর আক্রমন করলে তাক্বদীরের দলীল সে গ্রহণ করছে না, অথচ আল্লাহর অবাধ্যতা ও তার উপর বাড়াবাড়ির ব্যাপারে নিজের ক্ষেত্রে সেই তাক্বদীরেরই দলীল দিচ্ছে!

টিকাঃ
৪০. ছহীহ বুখারী হা/৪৯৪৯।

📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাসের প্রভাব

📄 তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাসের প্রভাব


ঘ। তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাসের প্রভাব: আক্বীদাহ বা বিশ্বাস হওয়া সত্ত্বেও তাক্বদীরের প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব। এটা ঈমানের অন্যতম রুকন তথা স্তম্ভ, যে ব্যক্তি তা অস্বীকার করবে সে কাফির বলে গণ্য হবে। মানুষের জীবনে তাক্বদীরের প্রতি ঈমান আনার বেশ কিছু প্রভাব রয়েছে।
নিচে কিছু প্রভাব উল্লেখ করা হলো:
১। তাক্বদীর অন্যতম মূখ্য কারণ যা ব্যক্তিকে দুনিয়াবী জীবনে পূর্ণোদ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টিজনক কাজ করার প্রতি আহ্বান করে। তাক্বদীরের প্রতি ঈমান মু'মিনের কাজ করা ও বড় কর্মসমূহে বিশ্বাস ও দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে যাওয়ার পথে শক্তিশালী উৎসাহদানকারী বিষয়। মুমিনদেরকে আল্লাহর উপর ভরসা করার সাথে সাথে উপকরণ গ্রহণের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
আর তারা এ বিশ্বাসেরও আদিষ্ট হয়েছেন যে আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত উপকরণ বা মাধ্যম কোন ফল দিতে পারে না। কেননা, আল্লাহই উপকরণ ও ফলা-ফল সৃষ্টি করেছেন।
রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ وَفِي كُلِّ خَيْرٌ احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ وَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَلَا تَعْجَزْ وَإِنْ أَصَابَكَ شَيْءٌ فَلَا تَقُلْ لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ كَانَ كَذَا وَكَذَا وَلَكِنْ قُلْ قَدَرُ اللَّهِ وَمَا شَاءَ فَعَلَ فَإِنَّ لَوْ تَفْتَحُ عَمَلَ الشَّيْطَانِ (صحيح مسلم - ٢٦٦٤]
শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর নিকটে দুর্বল মুমিন থেকে ভালো এবং প্রিয়। প্রত্যেকের মাঝেই কল্যাণ রয়েছে, তোমারা উপকারী বিষয়ে আগ্রহ পোষণ কর। আল্লাহর নিকটে সাহায্য প্রার্থনা কর, কখনো দুর্বল হবে না বা নিজেকে দুর্বল মনে করবে না। তোমার কোন কিছু হলে (যেমন বিপদ বা উদ্দিষ্ট বস্তু না পাওয়া) এ কথা বলিওনা যে আমি যদি এমন করতাম তবে এমন হতো। তবে বলো আল্লাহ এটাই নির্ধারণ করেছিলেন এবং তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন, কেননা লাও বা যদি শব্দটি শয়তানের কর্ম খুলে দেয়। ৪১
জিহাদের মাধ্যমে মুসলিমগণ যখন কোন স্থানের প্রেক্ষাপট পরিবর্তন করতে চেয়েছেন, তখন তারা জিহাদের সকল উপকরণ অবলম্বন করেছেন, অতঃপর আল্লাহর উপর ভরসা করেছেন। তারা এমনটি বলেননি যে আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের বিজয় এবং কাফিরদের পরাজয় লিখে রেখেছেন। তাই আমাদের প্রস্তুতি, জিহাদ, ধৈর্য্য এবং যুদ্ধের ময়দানে যাবার প্রয়োজন নেই (এমন কথা তারা বলেননি)। বরং এসব কিছুই তারা করেছেন ফলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সহযোগীতা করত বিজয়ী করেছেন এবং তাদের মাধ্যমে ইসলামকে মর্যাদা দিয়েছেন।
২। তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাসের মাধ্যমে মানুষ তার নিজের ক্বদর বা মর্যাদার পরিধি জানতে পারবে। ফলে সে কখনো অহংকার, অহমিকা ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করবে না। কেননা সে তার ভাগ্য ও ভবিষ্যতে কি হবে তা জানতে অপারগ। সুতরাং মানুষ তার অপারগতা এবং আল্লাহর নিকটে সার্বক্ষণিক স্বীয় প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করাই আবশ্যক।
মানুষ যখন কল্যাণে থাকে তখন অহঙ্কার ও দাম্ভিকতা করে ঐ কল্যাণ নিয়ে ধোকায় থাকে। যখন তার অকল্যাণ হয় তখন সে অস্থির ও চিন্তিত হয়ে উঠে। তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাসই ভালো অবস্থায় মানুষকে অহঙ্কার, দাম্ভিকতা এবং খারাপ অবস্থায় চিন্তা থেকে মুক্ত রাখতে পারে। তখন সে বিশ্বাস করে যা সংঘটিত হয়েছে তা ভাগ্যের লিখনের কারণেই হয়েছে, যা আল্লাহ তা'আলা ঐ কর্ম সম্পাদন হওয়ার পূর্বেই জানেন। পূর্ববর্তী কোন এক মনিষী বলেন,
من لم يؤمن بالقدر لم يتهن بعيشه
যে ব্যক্তি তাক্বদীরে বিশ্বাস করে না সে তার জীবন নিয়ে শান্তি পায় না।
৩। তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাস সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা যা মুমিনদের মাঝে হিংসা বিদ্বেষের সৃষ্টি করে তা নির্মূল করে। যেমন: হিংসা বিদ্বেষের মতো নোংরা অভ্যাস। আল্লাহ কাউকে যে নিয়ামত দিয়েছেন মুমিন সে ব্যাপারে মানুষের প্রতি বিদ্বেষ রাখে না। কেননা, আল্লাহই তাদেরকে রিযিক দিয়েছেন এবং ঐ সকল নিয়ামত তাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। সে জানে যখন সে অন্যের হিংসা করবে তখন সে তাক্বদীরের উপরই আপত্তি ও প্রতিবাদ করল।
৪। তাক্বদীরে বিশ্বাস কঠিনতার মুক্বাবিলায় অন্তরে সাহস যোগায়, অঙ্গিকারকে শক্তিশালী করে। ফলে মুমিন জিহাদের ময়দানে দৃঢ় থাকে এবং মৃত্যুকে ভয় করে না, কেননা, সে দৃঢ় বিশ্বাস করে মানুষের মৃত্যুর সময় নির্ধারিত যা সামান্য আগে পরে হয় না।
যখন মুমিনদের অন্তরে এ বিশ্বাস গেঁথে গিয়েছিল তখন তারা জিহাদে ও তা চালিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল। তাই শত্রুর শক্তি ও সংখ্যা যাই হোক না কেন মুজাহিদগণ জিহাদের ময়দানে দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। কেননা, তারা নিশ্চিত বিশ্বাস করতেন যে মানুষের ভাগ্যে যা লিখা আছে তাই ঘটবেই।
৫। তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাস মু'মিনের অন্তরে ঈমানের বিভিন্ন বাস্তবতার চারা রোপন করে। তাই সে সব সময় আল্লাহর নিকটে সাহায্য প্রার্থনা, তাঁর উপর ভরসা এবং তাওয়াক্কুল করে। সাথে সাথে এজন্য উপকরণ অবলম্বন করে। মুমিন সব সময় আল্লাহর নিকটে ঈমানের উপর অটল থাকার জন্য সহযোগীতা চাই, সে নিজেও দানশীল হয় এবং অন্য মানুষকে দান-দয়া করতে ভালোবাসে। তাই তো দেখা যায় সে অন্যের প্রতি সদয় হয়ে তাদের প্রতি কল্যাণের হাত বাড়িয়ে দেয়।
৬। তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাসের প্রভাব হলো আল্লাহর পথে আহ্বানকারী নির্দিধায় দাওয়াতী কাজ চালিয়ে যায়। অত্যাচারী ও কাফিরদেরকে প্রকাশ্যে দাওয়াত দেয়। আল্লাহর পথে কাজ করতে কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করে না।
৭। মানুষের সামনে ঈমানের বাস্তবতা ও চাহিদা তুলে ধরেন। তেমনি তিনি মানুষের সামনে কুফরি ও নিফাক্বী বা কপটতার আসল রূপ বর্ণনা করত তা থেকে মানুষদেরকে সতর্ক করেন। বাতিল ও তার নকল বা মিথ্যার দিক উম্মোচন করেন। অত্যাচারীদের সামনে সত্য কথা (ইসলামের দাওয়াত) বলেন। কারণ, মুমিন এসকল কিছু করেন দৃঢ় ঈমান, আল্লাহর উপর আস্থা ও ভরসা রেখে, এ পথে যে কষ্ট হবে তাতে তিনি ধৈর্য্য ধারণ করেন।
কারণ তিনি দৃঢ় বিশ্বাসী যে মৃত্যু ও রিযিক একমাত্র আল্লাহর হাতে। বান্দার শক্তি ও সহযোগী যতই বেশী হোক না কেন তারা ঐ সবের সামান্য কিছুর মালিকানা রাখে না।
আল্লাহ তা'আলা আমাদের নবী মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর পরিবার, সকল সাথী এবং কিয়ামত পর্যন্ত সঠিকভাবে তাদের অনুসরণকারীদের উপর সলাত ও সালাম বর্ষণ করুন। আমীন।

টিকাঃ
৪১. ছহীহ্ মুসলিম হা/২৬৬৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00