📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 মীযান বা দাঁড়ি পাল্লা ও পুলছিরাত

📄 মীযান বা দাঁড়ি পাল্লা ও পুলছিরাত


ছ। মীযান বা দাঁড়ি পাল্লা ও পুলছিরাত: আমরা ক্বিয়ামতের ময়দানে মীযান বা দাঁড়ি পাল্লায় বিশ্বাস করি। আল্লাহ তা'আলাবলেন,
وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِمَا وَكَفَى بِنَا حَاسِبِينَ [الأنبياء : ٤٧]
আমি ক্বিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারও প্রতি জুলুম হবে না। যদি কোন আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহণের জন্যে আমিই যথেষ্ট [সূরা আল্ আম্বিয়া ২১: ৪৭]।
রসূলছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীছ প্রমাণ করে, যে দাঁড়ি পাল্লায় আমল ওজন করা হবে তার দু'টি পাল্লা থাকবে যা অনুভব করা এবং দেখা যাবে। হিসাব শেষ হওয়ার পরে আমলসমূহ ওজন করা হবে। কেননা হিসাব হবে বান্দা কর্তৃক নিজ আমলের স্বীকারোক্তির জন্য আর ওজন হবে তার পরিমাণ প্রকাশের জন্য যাতে সে অনুযায়ী প্রত্যেককে প্রতিদান দেওয়া হয়।
আমরা পুলছিরাতে বিশ্বাস করি, আর তা হলো জান্নাতে যাওয়ার পথে জাহান্নামের উপর স্থাপিত ব্রীজ। প্রত্যেক মানুষ নিজ আমল অনুযায়ী এই ব্রীজের উপর দিয়ে অতিক্রম করবে। মানুষের মধ্যে কেউ চোখের পলকে তা অতিক্রম করবে, কেউ বিদ্যুৎ গতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার মত, কেউ উটের আরোহীর মত, কেউ স্বাভাবিক গতিতে, কেউ হেঁটে, কেউ নিতম্বের উপর ভরকরে তা অতিক্রম করবে। আবার পুলছিরাতের বাঁকা আঁকড়া (বাঁকা পেরেক তথা হুঁক) কাউকে আঁকড়ে ধরবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
উল্লেখ‍্য পুলছিরাতের উপর লোহার বাঁকা আঁকড়া থাকবে যাতে মানুষেরা নিজেদের আমল অনুযায়ী বিদ্ধ হবে, আর যারা পুলছিরাত পার হতে সক্ষম হবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। জানা আবশ্যক যে ব‍্যক্তি আল্লাহর সোজা পথ দীন ইসলামের উপর এ দুনিয়ায় অবিচল থাকবে সে ব‍্যক্তি পরকালে অনায়াসে পুলছিরাত পার হতে সক্ষম হবে। আর যারা এ দুনিয়াতে সরল পথ হতে বিচ্যুত হবে তারা পরকালে পুলসিরাত পার হতে পারবে না। ক্বিয়ামতের দিন পুলছিরাতের নিকটে মুনাফিকুরা মুমিনদের থেকে পৃথক হয়ে যাবে, মুনাফিকুরা পিছনে পড়ে যাবে, মুমিনগণ আগে যাবে এবং উভয়ের মাঝে একটা প্রাচীরের মাধ্যমে বাধার সৃষ্টি করা হবে ফলে মুনাফিকুরা মুমিনদের নিকট পৌঁছতে পারবে না।

📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 জান্নাত ও জাহান্নাম

📄 জান্নাত ও জাহান্নাম


জ। জান্নাত ও জাহান্নাম: আল্লাহ্ কর্তৃক মুমিনদের জন্য প্রস্তুত রাখা জান্নাত এবং কাফিরদের জন্য প্রস্তুত রাখা জাহান্নামে আমরা বিশ্বাসী। অতএব, জান্নাত জাহান্নাম উভয়টি সত‍্য তাতে কোন সন্দেহ নেই। জাহান্নাম আল্লাহর শত্রুদের এবং জান্নাত তার বন্ধুদের বাসস্থান।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا وَلَنْ تَفْعَلُوا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ * وَبَشِّرِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ كُلَّمَا رُزِقُوا مِنْهَا مِنْ ثَمَرَةٍ رِزْقًا قَالُوا هَذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِنْ قَبْلُ وَأُتُوا بِهِ مُتَشَابِنَا وَهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ وَهُمْ فِيهَا خَالِدُونَ [البقرة: ٢٤-٢٥]
আর যদি তা না পারো-অবশ্য তা তোমরা কখনও পারবে না, তাহলে সে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা কর, যার জ্বালানী হবে মানুষ ও
পাথর। যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফিরদের জন্য। আর হে নাবী, যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজসমূহ করেছে, আপনি তাদেরকে এমন বেহেস্তের সুসংবাদ দিন, যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহমান থাকবে। যখনই তারা খাবার হিসেবে কোন ফল প্রাপ্ত হবে, তখনই তারা বলবে, এতো অবিকল সে ফলই যা আমরা ইতিপূর্বেও লাভ করেছিলাম। বস্তুত তাদেরকে একই প্রকৃতির ফল প্রদান করা হবে। আর সেখানে তাদের জন্য শুদ্ধচারিনী রমণীকূল থাকবে। সেখানে তারা অনন্তকাল অবস্থান করবে [সূরা আল্ বাক্বারা ২:২৪-২৫]।
পবিত্র কুরআনের অনেক স্থানে জান্নাত জাহান্নাম এবং শান্তি ও শাস্তির আলোচনা এসেছে। যখনি জান্নাতের আলোচনা এসেছে তার সাথে জাহান্নামের আলোচনা করা হয়েছে, এর বিপরীতটিও হয়েছে। কখনও জান্নাতের আগ্রহ দেখিয়ে সে পথে আহ্বান করা হয়েছে, কখনও জাহান্নামের প্রতি অনিহা প্রকাশ করে তা থেকে সতর্ক করা হয়েছে। কখনও আল্লাহ্ তাঁর বন্ধুদের জন্য জান্নাতে কি নিয়ামত প্রস্তুত রেখেছেন সে সংবাদ দিয়েছেন। অপর দিকে তাঁর শত্রুদের জন্য জাহান্নামে যে যন্ত্রণাদায়ক কঠিন শাস্তি জমা করে রেখেছেন তার সংবাদ দিয়েছেন। আমরা দৃঢ় বিশ্বাস করি যে জান্নাত জাহান্নাম সৃষ্ট ও বর্তমানে তা বিদ্যমান। আল্লাহ তা'আলা জান্নাত সম্পর্কে বলেন,
﴿وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ ﴾ [ آل عمران : ۱۳۳]
তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও যমীন, যা তৈরী করা হয়েছে মুত্তাক্বীনদের জন্য [সূরা আলি ইমরান ৩:১৩৩]। জাহান্নাম সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿اتَّقُوا النَّارَ الَّتِي وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَareتُ أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ﴾ [البقرة : ٢٤]
তাহলে সেই জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা কর, যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর। যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফিরদের জন্য [সূরা আল্ বাক্বারা ২:২৪]।
রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِذَا مَاتَ أَحَدُكُمْ فَإِنَّهُ يُعْرَضُ عَلَيْهِ مَقْعَدُهُ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ فَإِنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ فَمِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ وَإِنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ فَمِنْ أَهْلِ النَّارِ (صحيح البخاري - ٣٢٤٠]
যখন তোমাদের কেউ মৃত্যু বরণ করে তখন সকাল সন্ধ্যায় তার সামনে নিজ বাসস্থান পেশ করা হয়। যদি ঐ ব্যক্তি জান্নাতী হয় তবে জান্নাতীদের বাসস্থান। আর জাহান্নামী হলে জাহান্নামীদের বাসস্থান সকাল সন্ধ্যায় তার নিকটে পেশ করা হয়। ৩৫
জান্নাত-জাহান্নাম সৃষ্ট ও বর্তমানে বিদ্যমানতার পক্ষে কুরআন হাদীছের অনেক দলীল রয়েছে। তাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আত ঐকমত্য হয়েছেন যে জান্নাত-জাহান্নাম সৃষ্ট এবং বর্তমানে প্রস্তুতকৃত। আমরা বিশ্বাস করি জান্নাত-জাহান্নাম পূরাতন, নষ্ট এবং ধ্বংস হবে না। কুরআন হাদীছের দলীল তার প্রমাণ বহন করে।
আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের ব্যাপারে বলেন, مَثَلُ الْجَنَّةِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ أُكُلُهَا دَائِمٌ وَظِلُّهَا تِلْكَ عُقْبَيَ الَّذِينَ اتَّقَوْا وَعُقْبَيَ الْكَافِرِينَ النَّارُ [الرعد : ٣٥]
পরহেযগারদের জন্যে প্রতিশ্রুত জান্নাতের অবস্থা এই যে, তার নিম্নে নির্ঝরণীসমূহ প্রবাহিত হয়। তার ফলসমূহ চিরস্থায়ী এবং ছায়াও। এটা তাদের প্রতিদান, যারা সাবধান হয়েছে এবং কাফিরদের প্রতিফল অগ্নি [সূরা আর রা'দ ১৩: ৩৫]।
রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ يَنْعَمُ لَا يَبْأَسُ لَا تَبْلَى ثِيَابُهُ وَلَا يَفْنَى شَبَابُهُ (صحيح مسلم - ٢٨٣٦)
যে জান্নাতে প্রবেশ করবে সে নিয়ামতে থাকবে, দূঃখ কষ্ট নিরাশা তাকে স্পর্শ করবে না। তাদের কাপড় পূরাতন হবে না এবং তার যৌবন নষ্ট হবে না। ৩৬
অপর বর্ণনাতে পাওয়া যায় তারা জান্নাতে চিরস্থায়ী হবে এবং মৃত্যু বরণ করবে না। জাহান্নামের স্থায়ী হওয়া ও ধ্বংস না হওয়ার দলীল হলো মহান আল্লাহর বাণী, يُرِيدُونَ أَن يَخْرُجُوا مِنَ النَّارِ وَمَا هُم بِخَارِجِينَ مِنْهَا وَلَهُمْ عَذَابٌ مُّقِيمٌ المائدة: ٣٧
তারা (জাহান্নামীরা) জাহান্নামের আগুন থেকে বের হয়ে আসতে চাইবে কিন্তু তা থেকে বের হতে পারবে না। তারা চিরস্থায়ী শাস্তি ভোগ করবে [সূরা আল্ মায়িদা ৫: ৩৭]।
অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَالَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ نَارُ جَهَنَّمَ لَا يُقْضَى عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمْ مِنْ عَذَابِهَا كَذَلِكَ نَجْزِي كُلَّ كَفُورٍ [فاطر : ٣৬]
আর যারা কাফির হয়েছে, তাদের জন্যে রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদেরকে মৃত্যুর আদেশও দেয়া হবে না যে, তারা মরে যাবে এবং তাদের থেকে তার শাস্তিও লাঘব করা হবে না। আমি প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে এভাবেই শাস্তি দিয়ে থাকি [সূরা আল্ ফাতির ৩৫:৩৬]।
হে আল্লাহ তা'আলা আমরা তোমার সন্তুষ্টি ও জান্নাত এবং এ দু'য়ের নিকটবর্তীকারী কথা ও কাজ প্রার্থনা করছি। আপনার রাগ ও জাহান্নাম এবং এ দু'য়ের নিকটবর্তীকারী কথা ও কাজ হতে আপনার নিকটে আশ্রয় চাচ্ছি। আমীন।

টিকাঃ
৩৫. ছহীহ বুখারী হা/৩২৪০।
৩৬. জ্বহীহ মুসলিম হা/২৮৩৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00