📄 নাবী ও রাসূলের পরিচয়
গ। নবী ও রসূলের পরিচয়:
নাবীর শাব্দিক অর্থ: নবী শব্দটি আরবী, যার অর্থ “সংবাদ দাতা”। আরবী নাবাউন শব্দ হতে এর উৎপত্তি। নাবাউন মানে সংবাদ। অতএব নবী হলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে বার্তাবাহক। অথবা নবী শব্দটি নাবওয়াতুন হতে এসেছে, আর নাবওয়াহ বলা হয় যমীনের উঁচু অংশকে। অতএব নবী হলেন সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান ব্যক্তি।
নবীর পারিভাষিক সংজ্ঞা: এমন এক স্বাধীন পুরুষ মানুষ যাকে আল্লাহ তা’আলা তাঁর ওয়াহী পৌঁছানোর জন্য চয়ণ করেছেন।
রসূল শব্দের আভিধানিক অর্থ: যিনি তাকে পাঠিয়েছেন তিনি তাঁর অনুগত।
রসূলের পারিভাষিক অর্থ: এমন স্বাধীন পুরুষ মানুষ, আল্লাহ তা’আলা যাকে শরী’আতের মাধ্যমে নবী করে বিরোধী সম্প্রদায়ের নিকটে তা প্রচারের আদেশ দিয়েছেন।
**নবী ও রসূলের মধ্যে পার্থক্য**
রসূল নবী থেকে খাস। অতএব প্রত্যেক রসূল নবী, কিন্তু প্রত্যেক নবী রসূল নন। রসূলকে নতুন শরী’আত দিয়ে আল্লাহ দ্রোহী অথবা যারা তাঁর দীন জানেনা তাদের নিকটে তা পৌঁছানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নবীকে পূর্বের শরী’আত মোতাবেক দাওয়াত দেওয়ার জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।
📄 রাসূলগণের গুণাবলী এবং নিদর্শনসমূহ
ঘ। রসূলগণের গুণাবলী এবং নিদর্শনসমূহ:
১। রসূলগণের গুণাবলী: তারা মানুষ, তাই মানুষের মত তাদেরও পানাহারের প্রয়োজন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
﴿وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ إِلَّا رِجَالًا نُوحِي إِلَيْهِمْ ﴾ [الأنبياء : ٧]
আপনার পূর্বে আমি মানুষই প্রেরণ করেছি, যাদের কাছে আমি ওহী পাঠাতাম। সূরা আল আম্বিয়া ২১:৭।
রসূলগণ অন্যান্য মানুষের মত অসুস্থ হন এবং তাদেরও মৃত্যু আসে। তাই রব এবং ইবাদতের দাবিদার হওয়ার ক্ষেত্রে রসূলগণের (আলাইহিমুস্ সালাম) কোন অধিকার নেই।
তবে তারা মানুষের বাহ্যিক সৃষ্টি এবং চরিত্রগত দিক দিয়ে পরিপূর্ণতার পর্যায়ে পৌঁছেছেন। বংশগত দিক থেকে তারা উত্তম মানুষ এবং সম্পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। তারা স্পষ্টভাষী যা তাদেরকে নবুয়ত ও রিসালাতের দায়িত্ব পালনে যোগ্য করে তোলে।
মানুষকে রসূল হিসাবে প্রেরণের হিকমত হলো যাতে মানুষেরা নিজেদের মধ্যে একজনকে নমুনা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। ফলে তারা সহজেই রসূল জ্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণ করতে সক্ষম হয়। (ফেরেশতাকে রসূল হিসাবে প্রেরণ করা হলে মানুষ তাকে দেখেই ভয় পেত, কেননা তাদের আকৃতি ভিন্ন, তখন বিরুদ্ধবাদীরা বলত মানুষকে কেন রসূল হিসাবে প্রেরণ করা হলো না? তাছাড়া ফেরেশতাকে রসূল হিসাবে প্রেরণ করলে আরও বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হতো)।
২। রসূলগণের অন্যতম গুণ হলো আল্লাহ তা'আলা (অন্য সকল মানুষ বাদ দিয়ে কেবল মাত্র) তাদের নিকটে ওহী পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ﴾ [الكهف : ۱۱۰] বলুন, আমিও তোমাদের মতই একজন মানুষ, আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের ইলাহই একমাত্র ইলাহ। সূরা আল কাহাফ ১৮:১১০।
এখান থেকে বুঝা যায় আল্লাহ তা'আলা সকল মানুষের মাঝ থেকে তাদেরকে চয়ণ করেছেন। অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿اللَّهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ﴾ [الأنعام: ١٢٤] আল্লাহ্ এ বিষয়ে সুপরিজ্ঞাত যে, কোথায় স্বীয় পয়গাম প্রেরণ করতে হবে। সূরা আল আনআ'ম ৬:১২৪।
রসূলগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে যা প্রচার করেন সে ব্যাপারে তারা নিষ্পাপ। তাই তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাবলীগে এবং তিনি যা দিয়ে তাদেরকে প্রেরণ করেছেন তা বাস্তবায়নে ভুল করেন না।
৩। রসূলদের অন্যতম গুণ হলো সত্যবাদীতা, তাই রসূলগণ তাদের কথা ও কাজে সত্যবাদী। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
هَذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمَنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُونَ﴾ [يس : ৫২]
রহমান আল্লাহ তো এরই ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং রসূলগণ সত্য বলেছিলেন। সূরা ইয়াসীন ৩৬:৫২।
৪। রসূলগণের আরেকটি গুণ হলো ধৈর্য্য ধারণ করা। তারা সুসংবাদদাতা এবং ভয় প্রদর্শনকারী। মানুষদেরকে আল্লাহর দীনের পথে আহ্বান করেন। একাজ আঞ্জাম দিতে গিয়ে তাদের উপর অনেক কষ্ট, নির্যাতন নেমে এসেছে। এতদসত্ত্বেও তারা ধৈর্য্য ধারণ করত আল্লাহর কালিমাকে উঁচু করার জন্য কাজ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ [الأحقاف : ৩৫]
অতএব, আপনি ছুবুর করুন, যেমন উচ্চ সাহসী রসূলগণ সবুর করেছেন। সূরা আল আহক্বাফ ৪৬:৩৫।
📄 রাসূলগণের আলামত বা নিদর্শন
রসূলগণের আলামত বা নিদর্শনসমূহ: আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে অকাট্য প্রমাণ এবং স্পষ্ট মু'জিযা (মানুষের সাধ্যাতীত বিষয়) দিয়ে শক্তিশালী করেছেন। যা তাদের সত্যতা এবং তাদের নবুয়ত ও রিসালাতের বিশুদ্ধতার উপর প্রমাণ বহন করে। সঙ্গত কারণেই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রসূলগণের সত্যতা এবং দৃঢ়তা প্রমাণে তাদের হাতে মানুষের সাধ্যাতীত বিষয়সমূহ সংঘটিত করেছেন।
রসূলগণের আলামত ও মু'জিযার পরিচয়: তা হলো মানুষের সাধ্যাতীত অলৌকিক বিষয়াবলী যা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নাবী ও রসূলগণের হাতে প্রকাশ করেছেন। (অনুরূপ মু'জিযা মানুষ ঘটাতে অপারগ)।
এ সকল মু'জিযা ও নিদর্শনের উদাহরণ: ঈসা আলাইহিস সালাম কর্তৃক তার কুওম বা জাতি তাদের বাড়িতে কি খাবে ও কি গুদামজাত করবে তার সংবাদ দেওয়া, মূসা আলাইহিস সালাম এর লাঠি সাপে রূপান্তরিত হওয়া এবং আমাদের মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্য চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়া ইত্যাদী।
📄 রাসূল পাঠানোর উদ্দেশ্য
ঙ। রসূল পাঠানোর উদ্দেশ্য:
১। রসূল পাঠানোর উদ্দেশ্য হলো মানুষ যাতে তাদের একমাত্র সত্য মা'বুদকে চিনতে পারে এবং রসূলগণ তাদেরকে এক-অদ্বিতীয় লা-শারীক আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আহ্বান করেন। তারা পৃথিবীতে আল্লাহর দীন (ইসলাম) প্রতিষ্ঠা করত তাতে ফাটল সৃষ্টি হতে নিষেধ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ ﴾ [الشورى : ١٣]
তিনি তোমাদের জন্যে দীনের ক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারিত করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না। সূরা আশ্ শুরা ৪২:১৩।
২। আল্লাহ্ রসূল প্রেরণ করেছেন সুসংবাদ ও ভয় প্রদর্শনের জন্য। তিনি বলেন:
﴿وَمَا نُرْسِلُ الْمُرْسَلِينَ إِلَّا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ﴾ [الكهف : ٥٦]
আমি রসূলগণকে সুসংবাদ দাতা ও ভয় প্রদর্শন কারীরূপেই প্রেরণ করি। সূরা আল কাহাফ ১৮:৫৬।
রসূলগণের (আলাইহিমুস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম) সুসংবাদ দেওয়া ও ভয় প্রদর্শন করা উভয় জাগতিক। অনুগতদেরকে তারা দুনিয়াতে সুন্দর জীবনের সুসংবাদ দেন। আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা,
﴿مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً﴾ [النحل: ٩٧]
যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ঈমানদার, পুরুষ হোক কিংবা নারী আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব সূরা আন্ নাহল ১৬:৯৭।
৩। রসূলগণ অনুগতদের দুনিয়ার শান্তি এবং ধ্বংসের ভয় প্রদর্শন করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿فَإِنْ أَعْرَضُوا فَقُلْ أَنْذَرْتُكُمْ صَاعِقَةً مِثْلَ صَاعِقَةِ عَادٍ وَثَمُودَ﴾
অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলুন: আমি তোমাদেরকে সতর্ক করলাম এক কঠোর আযাব সম্পর্কে আদ ও সামুদের আযাবের মত। সূরা (ফুসিলাত) হা-মীম আস-সাজদা ৪১:১৩।
৪। রসূলগণ অনুগতদেরকে পরকালীন জান্নাত ও তার নিয়ামতের সুসংবাদ দেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ [النساء : ١٣]
যে কেউ আল্লাহ ও রাসূলের আদেশমত চলে, তিনি তাকে জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন। যেগুলোর তলদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনী প্রবাহিত হবে। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এ হল বিরাট সাফল্য। সূরা আন্ নিসা ৪:১৩।
৫। রসূলগণ পাপী ও অবাধ্যদেরকে পরকালে শাস্তির ভয় প্রদর্শন করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُ يُدْخِلْهُ نَارًا خَالِدًا فِيهَا وَلَهُ عَذَابٌ مُهِينٌ [النساء : ١٤]
যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূলের অবাধ্যতা করে এবং তাঁর সীমা অতিক্রম করে তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সে সেখানে চিরকাল থাকবে। তার জন্যে রয়েছে অপমানজনক শান্তি। সূরা আন্ নিসা ৪:১৪।
৬। সঠিক ও উন্নত চরিত্র এবং বিশুদ্ধ ইবাদতের উত্তম আদর্শ-নমুনা স্থাপনের জন্যেও আল্লাহ তা'আলা রসূলগণকে প্রেরণ করেছেন।
যেমন আল্লাহ তা'আলা আমাদের প্রিয় নাবী মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ক্ষেত্রে বলেছেন,
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا [الأحزاب : ۲۱]
যারা আল্লাহ্ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে। সূরা আল আহ্যাব ৩৩:২১।