📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 রাসূলগণের প্রতি ঈমান

📄 রাসূলগণের প্রতি ঈমান


ক। রিসালাতের প্রয়োজনীয়তা: রিসালাত মানুষের জন্য একান্ত আবশ্যক। সকল বিষয়ের চেয়ে রিসালাতের প্রয়োজনীয়তা বেশী। রিসালাত হলো পৃথিবীর আত্মা, আলো এবং জীবন। অতএব, আত্মা, জীবন এবং আলো না থাকলে পৃথিবীতে কি কল্যাণ থাকতে পারে?
রিসালাতের সূর্য ব্যতীত দুনিয়া অন্ধকার। রসূলগণের মাধ্যম ব্যতীত উভয় জাগতিক কল্যাণ ও মুক্তিলাভ এবং ভালো-মন্দের পার্থ্যক্য করার কোন উপায় নেই। আল্লাহ তা'আলা রিসালাতকে রুহ বা আত্মা হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। আর আত্মা না থাকলে জীবনও থাকবে না।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَكِنْ جَعَلْنَاهُ نُورًا تَهْدِي بِهِ مَنْ نَشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا [سورة الشورى - ٥٢]
এমনিভাবে আমি আপনার কাছে এক ফেরেশতা প্রেরণ করেছি আমার আদেশক্রমে। আপনি জানতেন না, কিতাব কি এবং ঈমান কি? কিন্তু আমি একে করেছি নূর, যাদ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করি। সূরা আশ শুরা ৪২: ৫২।
রসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অন্যতম রুকন বা স্তম্ভ। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ﴾ [البقرة : ٢٨٥]
রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে তার কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলিমগণও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহ্র প্রতি, তার ফেরেশতাদের প্রতি, তার গ্রন্থসমূহের প্রতি এবং তার রসূলগণের প্রতি। তারা বলে আমরা তার রসূলগণের মাঝে কোন তারতম্য করি না। সূরা আল বাক্বারা ২:২৮৫।
কোন পার্থক্য ব্যতীত সকল নবী ও রসূলগণের উপর ঈমান আনা আবশ্যক তা অত্র আয়াত দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। তাই আমরা ইয়াহুদী খ্রিষ্টানদের মত কতক রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন এবং কতক রসূলকে অস্বীকার করি না। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈমান সম্পর্কে বলেছেন,
أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ (صحیح مسلم-۸)
ঈমান হলো, তুমি আল্লাহ, তার ফেরেস্তাগণ, কিতাবসমূহ, রসূলগণ, ক্বিয়ামত দিবস এবং তাক্বদীরের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে। ১৯
বর্তমানে আধুনিক ও উন্নত নামধারী রাষ্ট্রগুলো যে অশান্তি, দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা ও বিশৃঙ্খলার সম্মুখীন হচ্ছে তা মূলত রিসালাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণেই।

টিকাঃ
১৯. জ্বহীহ মুসলিম হা/৮।

📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনার অর্থ

📄 রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনার অর্থ


খ। রসূলগণের প্রতি ঈমান আনার অর্থ: এ দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক উম্মতে তাদের মধ্য থেকেই একজন করে রসূল প্রেরণ করেছেন। যিনি তাদেরকে এক-অদ্বিতীয় লা-শারীক আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আহ্বান করেন। রসূলগণ (আলাইহিমুস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম) সকলেই সত্যবাদী ও সত্যায়িত। আল্লাহভীরু, বিশ্বস্ত, সঠিক পথ প্রদর্শণকারী এবং হেদায়াত প্রাপ্ত। আল্লাহ তা'আলা যে দায়িত্ব দিয়ে তাদেরকে প্রেরণ করেছিলেন তা তাঁরা পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। কোন কিছু গোপন, পরিবর্তন এবং নিজেদের পক্ষ থেকে তাতে কম-বেশী করেননি। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
فَهَلْ عَلَى الرُّسُلِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ﴾ [النحل: ٣٥]
রসূলের দায়িত্ব তো শুধুমাত্র সুস্পষ্ট বাণী পৌঁছিয়ে দেয়া। সূরা আন্ নাহল ১৬: ৩৫।
সকল নাবীগণ স্পষ্ট সত্যের উপর ছিলেন এবং সকলের দাওয়াত ছিল আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসের প্রতি। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَ لَقَدْ بَعَثْنَا فِیْ كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُوْلًا اَنِ اعْبُدُوا اللّٰهَ وَ اجْتَنِبُوا الطَّاغُوْتَ আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে নিরাপদ থাক। সূরা আন্ নাহল ১৬:৩৬।
তবে হালাল-হারামের শাখা প্রশাখায় নাবীগণের (আলাইহিমুস্ জ্বলাতু ওয়াস্ সালাম) শরী'আতে কিছুটা ভিন্নতা ছিল। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا (المائدة - ٤٨ )
আমি তোমাদের প্রত্যেককে একটি আইন ও পথ দিয়েছি। সূরা আল্ মায়িদা ৫:৪৮।

**রসূলগণের প্রতি ঈমান চারটি বিষয়কে শামিল করে**

প্রথম: এ বিশ্বাস রাখা যে তাদের সকলের রিসালাত মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত এবং সত্য। অতএব, কেউ কোন একজন রাসূলের (আলাইহিমুস্ সালাম) রিসালাতকে অস্বীকার করলে সে যেন সকল নবীর রিসালাতকে অস্বীকার করলো।
দ্বিতীয়: আল্লাহ্ যে সকল নাবীর নাম উল্লেখ করেছেন তাদের প্রতি ঈমান আনা। যেমন: মুহাম্মাদ, ইব্রাহীম, মূসা, ঈসা এবং নূহ্ আলাইহিমুস্ সালাম। আর যে সকল নবীর নাম আমরা জানিনা তাদের প্রতি সংক্ষিপ্ত বা মৌলিক ভাবে ঈমান আনতে হবে।
তৃতীয়: রসূলগণের বিশুদ্ধ সংবাদগুলোকে সত্যায়ণ করা।
চতুর্থ: আমাদের নিকটে যে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণ করা হয়েছে তার শরী'আত মোতাবেক আমল করা। তিনি হলেন, সর্বোত্তম এবং শেষ নবী ও রাসুল মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 নাবী ও রাসূলের পরিচয়

📄 নাবী ও রাসূলের পরিচয়


গ। নবী ও রসূলের পরিচয়:
নাবীর শাব্দিক অর্থ: নবী শব্দটি আরবী, যার অর্থ “সংবাদ দাতা”। আরবী নাবাউন শব্দ হতে এর উৎপত্তি। নাবাউন মানে সংবাদ। অতএব নবী হলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে বার্তাবাহক। অথবা নবী শব্দটি নাবওয়াতুন হতে এসেছে, আর নাবওয়াহ বলা হয় যমীনের উঁচু অংশকে। অতএব নবী হলেন সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান ব্যক্তি।
নবীর পারিভাষিক সংজ্ঞা: এমন এক স্বাধীন পুরুষ মানুষ যাকে আল্লাহ তা’আলা তাঁর ওয়াহী পৌঁছানোর জন্য চয়ণ করেছেন।
রসূল শব্দের আভিধানিক অর্থ: যিনি তাকে পাঠিয়েছেন তিনি তাঁর অনুগত।
রসূলের পারিভাষিক অর্থ: এমন স্বাধীন পুরুষ মানুষ, আল্লাহ তা’আলা যাকে শরী’আতের মাধ্যমে নবী করে বিরোধী সম্প্রদায়ের নিকটে তা প্রচারের আদেশ দিয়েছেন।

**নবী ও রসূলের মধ্যে পার্থক্য**

রসূল নবী থেকে খাস। অতএব প্রত্যেক রসূল নবী, কিন্তু প্রত্যেক নবী রসূল নন। রসূলকে নতুন শরী’আত দিয়ে আল্লাহ দ্রোহী অথবা যারা তাঁর দীন জানেনা তাদের নিকটে তা পৌঁছানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নবীকে পূর্বের শরী’আত মোতাবেক দাওয়াত দেওয়ার জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।

📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 রাসূলগণের গুণাবলী এবং নিদর্শনসমূহ

📄 রাসূলগণের গুণাবলী এবং নিদর্শনসমূহ


ঘ। রসূলগণের গুণাবলী এবং নিদর্শনসমূহ:
১। রসূলগণের গুণাবলী: তারা মানুষ, তাই মানুষের মত তাদেরও পানাহারের প্রয়োজন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
﴿وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ إِلَّا رِجَالًا نُوحِي إِلَيْهِمْ ﴾ [الأنبياء : ٧]
আপনার পূর্বে আমি মানুষই প্রেরণ করেছি, যাদের কাছে আমি ওহী পাঠাতাম। সূরা আল আম্বিয়া ২১:৭।
রসূলগণ অন্যান্য মানুষের মত অসুস্থ হন এবং তাদেরও মৃত্যু আসে। তাই রব এবং ইবাদতের দাবিদার হওয়ার ক্ষেত্রে রসূলগণের (আলাইহিমুস্ সালাম) কোন অধিকার নেই।
তবে তারা মানুষের বাহ্যিক সৃষ্টি এবং চরিত্রগত দিক দিয়ে পরিপূর্ণতার পর্যায়ে পৌঁছেছেন। বংশগত দিক থেকে তারা উত্তম মানুষ এবং সম্পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। তারা স্পষ্টভাষী যা তাদেরকে নবুয়ত ও রিসালাতের দায়িত্ব পালনে যোগ্য করে তোলে।
মানুষকে রসূল হিসাবে প্রেরণের হিকমত হলো যাতে মানুষেরা নিজেদের মধ্যে একজনকে নমুনা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। ফলে তারা সহজেই রসূল জ্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণ করতে সক্ষম হয়। (ফেরেশতাকে রসূল হিসাবে প্রেরণ করা হলে মানুষ তাকে দেখেই ভয় পেত, কেননা তাদের আকৃতি ভিন্ন, তখন বিরুদ্ধবাদীরা বলত মানুষকে কেন রসূল হিসাবে প্রেরণ করা হলো না? তাছাড়া ফেরেশতাকে রসূল হিসাবে প্রেরণ করলে আরও বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হতো)।
২। রসূলগণের অন্যতম গুণ হলো আল্লাহ তা'আলা (অন্য সকল মানুষ বাদ দিয়ে কেবল মাত্র) তাদের নিকটে ওহী পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ﴾ [الكهف : ۱۱۰] বলুন, আমিও তোমাদের মতই একজন মানুষ, আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের ইলাহই একমাত্র ইলাহ। সূরা আল কাহাফ ১৮:১১০।
এখান থেকে বুঝা যায় আল্লাহ তা'আলা সকল মানুষের মাঝ থেকে তাদেরকে চয়ণ করেছেন। অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿اللَّهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ﴾ [الأنعام: ١٢٤] আল্লাহ্ এ বিষয়ে সুপরিজ্ঞাত যে, কোথায় স্বীয় পয়গাম প্রেরণ করতে হবে। সূরা আল আনআ'ম ৬:১২৪।
রসূলগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে যা প্রচার করেন সে ব্যাপারে তারা নিষ্পাপ। তাই তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাবলীগে এবং তিনি যা দিয়ে তাদেরকে প্রেরণ করেছেন তা বাস্তবায়নে ভুল করেন না।
৩। রসূলদের অন্যতম গুণ হলো সত্যবাদীতা, তাই রসূলগণ তাদের কথা ও কাজে সত্যবাদী। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
هَذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمَنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُونَ﴾ [يس : ৫২]
রহমান আল্লাহ তো এরই ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং রসূলগণ সত্য বলেছিলেন। সূরা ইয়াসীন ৩৬:৫২।
৪। রসূলগণের আরেকটি গুণ হলো ধৈর্য্য ধারণ করা। তারা সুসংবাদদাতা এবং ভয় প্রদর্শনকারী। মানুষদেরকে আল্লাহর দীনের পথে আহ্বান করেন। একাজ আঞ্জাম দিতে গিয়ে তাদের উপর অনেক কষ্ট, নির্যাতন নেমে এসেছে। এতদসত্ত্বেও তারা ধৈর্য্য ধারণ করত আল্লাহর কালিমাকে উঁচু করার জন্য কাজ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ [الأحقاف : ৩৫]
অতএব, আপনি ছুবুর করুন, যেমন উচ্চ সাহসী রসূলগণ সবুর করেছেন। সূরা আল আহক্বাফ ৪৬:৩৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00