📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান

📄 আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান


ক। আসমানী কিতাবসমূহে বিশ্বাসের অর্থ: এ দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহর কিছু কিতাব রয়েছে, যা তিনি বান্দাদের হেদায়েতের জন্য তার রসূলগণের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন। এ কিতাবগুলো আল্লাহর বাণী যা তিনি নিজে যেভাবে তার জন্য শোভাপায় সেভাবে বলেছেন। এ সকল কিতাবে বিশ্ব মানবতার জন্য উভয় জাগতিক সত্য, আলো এবং পথ নির্দেশনা রয়েছে।
আসমানী কিতাবসমূহে বিশ্বাস তিনটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে:
১। এ বিশ্বাস রাখা যে আসমানী কিতাবসমূহ আল্লাহর পক্ষ থেকেই অবতীর্ণ ( الإيمان بأن نزولها من عند الله حقا ) ।
২। আল্লাহ তা'আলা তার যে সকল কিতাবের নাম আমাদেরকে জানিয়েছেন তা বিশ্বাস করা। যেমন,
ক। আল্ কুরআন যা আল্লাহ তা'আলা আমাদের নাবী মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি অবতীর্ণ করেছেন।
খ। তাওরাত যা মূসা আলাইহিস সালাম এর উপর নাযিল করা হয়েছে
গ। ইন্জীল যা ঈসা আলাইহিস সালাম এর উপর এবং
ঘ। যাবুর যা দাউদ আলাইহিস সালাম এর প্রতি নাযিল করা হয়েছে।
৩। এ সকল কিতাবের সংবাদগুলোকে সত্যায়ন করা। যেমন: কুরআনের সংবাদসমূহ। আসমানী কিতাব সমূহের প্রতি বিশ্বাস ঈমানের অন্যতম রোকন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنْزَلَ مِنْ قَبْلُ وَمَنْ يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا [النساء : ١٣٦]
হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন কর এবং বিশ্বাস স্থাপন কর তার রসূলগণও তার কিতাবসমূহের উপর, যা তিনি নাযিল করেছেন স্বীয় রসূলগণের উপর এবং সেসমস্ত কিতাবের উপর যেগুলো নাযিল করা হয়েছিল ইতিপূর্বে। যে আল্লাহর উপর, তার ফেরেশতাদের উপর, তার কিতাব সমূহের উপর এবং রসূলগণের উপর ও কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাস করবে না, সে পথভ্রষ্ট হয়ে বহু দূরে গিয়ে পড়বে। সূরা আন নিসা ৪:১৩৬।
অত্র আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তার নিজের, তদীয় রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, প্রিয় নবী মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর নাযিলকৃত কিতাব তথা কুরআনুল কারীম এবং কুরআনের পূর্বে নাযিলকৃত আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান আনার আদেশ দিয়েছেন।
রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও ঈমান সম্পর্কে বলেছেন,
أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ (সহীহ মুসলিম-৮)
ঈমান হলো, তুমি আল্লাহ, তার ফেরেস্তাগণ, কিতাবসমূহ, রসূলগণ, শেষ দিবস এবং ভাগ্যের ভালোমন্দের প্রতি বিশ্বাস রাখবে। ১৭

টিকাঃ
১৭. সহীহ্ মুসলিম হা/৮।

📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 কুরআনুল কারীমের বিশেষত্ব

📄 কুরআনুল কারীমের বিশেষত্ব


নিশ্চয় আল কুরআনুল কারীম আল্লাহর বাণী যা আমাদের প্রিয় নাবী ও আদর্শ মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর নাযিল করা হয়েছে। সঙ্গত কারণেই মুমিনগণ এ কিতাবকে সম্মান করত তার বিধানাবলী গ্রহণ, তা তেলাওয়াত এবং কুরআন নিয়ে চিন্তা গবেষণার সর্বাত্বক চেষ্টা করে।
কুরআনের মহত্ব বর্ণনার জন্য এটাই যথেষ্ট যে তা দুনিয়াতে আমাদের পথ নির্দেশক এবং পরকালে আমাদের নাজাতের কারণ।
কুরআনুল কারীমের অনেক বিশেষত্ব রয়েছে যা কুরআনকে অন্যান্য আসমানী কিতাব থেকে মর্যাদাবান করে তোলে।
কুরআনের কিছু বিশেষত্ব নিম্নে তুলে ধরা হলো:
১। কুরআনুল কারীম স্রষ্টার সকল বিধানের সারসংক্ষেপকে শামিল করে এবং পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহে এক আল্লাহর ইবাদতের যে আদেশ দেওয়া হয়েছে তাকে সত্যায়ণ ও দৃঢ় করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنَّا عَلَيْهِ ﴾ [المائدة : ٤٨]
আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি সত্যগ্রন্থ, যা পূর্ববতী গ্রন্থ সমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয় বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী। সূরা আল মায়িদা ৫:৪৮।
مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ এর অর্থ: কুরআনুল কারীম পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহে বিশুদ্ধ যা রয়েছে তা সত্যায়ন করে।
وَمُهَيْمِنَّا عَلَيْهِ এর অর্থ: কুরআন পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব সমূহের রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং সাক্ষ্যদাতা।
সকল মানুষের জন্য কুরআনকে মজবুতভাবে ধারণ করা ওয়াজিব। সকল সৃষ্টিজীবের উপর কুরআনের আনুগত্য এবং তদনুযায়ী আমল করা আবশ্যক। কিন্তু পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবগুলো নির্দিষ্ট কওম বা জাতির জন্য ছিল।
আল্লাহ তা'আলা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে উদ্দেশ্য করে বলেন,
وَأُوحِيَ إِلَيَّ هَذَا الْقُرْآنُ لِأُنْذِرَكُمْ بِهِ وَمَنْ بَلَغَ [الأنعام : ١٩]
(আপনি বলুন) আমার প্রতি এ কুরআন অবর্তীর্ণ হয়েছে, যাতে আমি তোমাদেরকে এবং যাদের কাছে এ কুরআন পৌঁছে সবাইকে ভীতি প্রদর্শন করি। সূরা আল আনআম ৬: ১৯।
২। পবিত্র কুরআনের হিফাযতের দায়িত্ব আল্লাহ তা'আলা নিজেই নিয়েছেন। তাই পরিবর্তনকারীর হাত এর প্রতি প্রসারিত হয়নি এবং হবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ [الحجر: ٩]
আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক। সূরা আল্ হিজর ১৫: ৯।

📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 কুরআনের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য

📄 কুরআনের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য


গ। যখন আমরা কুরআনের বিশেষত্ব ও একক বৈশিষ্ট্য জানতে পারলাম তখন জানা দরকার কুরআনের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য কি?
কুরআনের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য
১। পবিত্র কুরআনুল কারীমকে ভালোবাসা ও সম্মান করা আমাদের উপর ওয়াজিব। কেননা, এটা মহান রব্বুল 'আলামীনের বাণী। সঙ্গত কারণেই তা সর্বাধিক সত্য এবং উত্তম কথা।
২। কুরআন মাজীদ পড়া, এর আয়াত ও সূরাসমূহ নিয়ে গবেষণা করা, কুরআনের নসিহত, সংবাদসমূহ এবং ঘটনাবলী নিয়ে চিন্তা করা আমাদের একান্ত কর্তব্য।
৩। কুরআনের হুকুম-আহকাম, আদেশ-নিষেধ এবং শিষ্টাচারগুলোর অনুসরণ ও আনুগত্য করা আমাদের জন্য ওয়াজিব। উম্মুল মুমিনীন আ'য়িশা (রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে বলেছিলেন:
كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ
রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চরিত্র ছিল আল্ কুরআন। ১৮ হাদীছের অর্থ: রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন কুরআনের বিধিবিধান ও শরী'আতের বাস্তবরূপ। তিনি কুরআনের দিক নির্দেশনাকে পরিপূর্ণরূপে অনুসরণ করেছেন। আর এ জন্যই রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনুগত্য করা আমাদের জন্য আবশ্যক। কেননা, তিনিই হলেন আমাদের প্রত্যেকের জন্য অনুসরণীয় নমুনা। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا [الأحزاب : ۲۱]

টিকাঃ
১৮. ছহীহ: মুসনাদে আহমাদ হা/২৪৬০১, ছহীহ মুসলিম হা/৭৪৬।

📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের বিকৃতি হওয়া

📄 পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের বিকৃতি হওয়া


ঘ। পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের বিকৃতি হওয়া: আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে কুরআনে সংবাদ দিয়েছেন যে আসমানী কিতাব প্রাপ্ত ইয়াহূদী-খ্রিষ্টানরা তাদের কিতাবগুলোকে পরিবর্তন করেছে। ফলে পরবর্তীতে আল্লাহর নাযিলকৃত আকৃতিতে আর ফিরে আসেনি।
ইয়াহুদীরা তাওরাতকে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করত তার বিধিবিধান নিয়ে খেল-তামাশায় লিপ্ত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, مِنَ الَّذِينَ هَادُوا يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ [النساء : ٤٦]
কোন কোন ইয়াহূদী তাওরাতের শব্দাবলীকে তার লক্ষ্য থেকে মোড় ঘুড়িয়ে নেয় (এবং মনগড়া অর্থ করে) সূরা আন নিসা ৪:৪৬। এমনিভাবে খ্রিষ্টানেরা তাদের প্রতি অবতীর্ণ আসমানী কিতাব ইন্জীলের বিকৃতি করত তার বিধিবিধানকে পরিবর্তন করেছে। আল্লাহ তা'আলা খ্রিষ্টানদের সম্পর্কে বলেছেন, وَإِنَّ مِنْهُمْ لَفَرِيقًا يَلْوُونَ أَلْسِنَتَهُمْ بِالْكِتَابِ لِتَحْسَبُوهُ مِنَ الْكِتَابِ وَمَا هُوَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَقُولُونَ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَمَا هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَيَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ [آل عمران : ۷۸]
আর তাদের মধ্যে একদল রয়েছে, যারা বিকৃত উচ্চারণে মুখ বাঁকিয়ে কিতাব পাঠ করে। যাতে তোমরা মনে কর যে, তারা কিতাব থেকেই পাঠ করছে। অথচ তারা যা আবৃত্তি করছে তা আদৌ কিতাব নয়। এবং তারা বলে যে, এসব কথা আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত। অথচ এসব আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত নয়। তারা বলে যে, এটি আল্লাহর কথা অথচ এসব আল্লাহর কথা নয়। আর তারা জেনে শুনে আল্লাহরই প্রতি মিথ্যারোপ করে। সূরা আলি ইমরান ৩:৭৮।
অতএব, বর্তমান বাজারে ইয়াহূদী-খ্রিষ্টানদের নিকটে যে তাওরাত ও ইন্জীল পাওয়া যায় তা মূসা এবং ঈসা আলাইহিমাস্ সালামের উপর নাযিলকৃত তাওরাত ও ইনজীল নয়।
বর্তমানে আহলে কিতাবদের (ইয়াহূদী-খ্রিষ্টান) নিকটে বিদ্যমান তাওরাত ও ইন্জীল বিকৃত আক্বীদাহ (বিশ্বাস), বাতিল সংবাদাদি এবং মিথ্যা ঘটনাবলীতে পরিপূর্ণ।
তাই কুরআন ও সহীহ হাদীছ এ কিতাবদ্বয়ের যা কিছু সত্যায়ন করেছে আমরা তা সত্যায়ন করি। আর কুরআন ও সুন্নাহ্ যা মিথ্যা বলে প্রমাণ করেছে তাকে মিথ্যা হিসাবে জানি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00