📄 ফেরেশতাগণের প্রতি ঈমান
ক। ফেরেস্তাগণের প্রতি ঈমান আনার অর্থ: ফেরেস্তাগণের অস্তিত্ব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা। তারাও আল্লাহর এক প্রকার সৃষ্টি, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে যা আদেশ করেন অবাধ্য না হয়ে তারা তা সাথে সাথে পালন করেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
بَلْ عِبَادٌ مُكْرَمُونَ (٢٦) لَا يَسْبِقُونَهُ بِالْقَوْلِ وَهُمْ بِأَمْرِهِ يَعْمَلُونَ (۲۷) [الأنبياء]
বরং ফেরেস্তাগণ তো আল্লাহর সম্মানিত বান্দা। তারা আগে বেড়ে কথা বলতে পারেন না এবং তারা তার আদেশেই কাজ করেন। সূরা আম্বিয়া ২১:২৬-২৭।
ফেরেস্তাগণের প্রতি ঈমান চারটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে:
১। ফেরেস্তাগণ আছেন এ বিশ্বাস রাখা (الإيمان بوجودهم) |
২। আমরা যে সকল ফেরেস্তার নাম জানি যেমন জিবরীল আলাইহিস সালাম তাদের প্রতি বিশ্বাস রাখা। যাদের নাম জানিনা তাদের প্রতি সংক্ষিপ্তাকারে ঈমান রাখা। অর্থাৎ নাম নাজানা ফেরেস্তাগণের অস্তিত্বে সংক্ষেপে বিশ্বাস রাখতে হবে।
৩। ফেরেস্তাগণের যে গুণসমূহ আমরা জানি তা বিশ্বাস করা।
৪। আমাদের জানামতে আল্লাহর আদেশে তারা যে সকল কাজ করেন তার প্রতি বিশ্বাস রাখা।
যেমন: আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষনা করা, ক্লান্তি ও অবসাদ ছাড়া দিন রাত্রি তার ইবাদত করা। ফেরেস্তাগণের প্রতি ঈমান আনয়ন ঈমানের অন্যতম রুকন বা স্তম্ভ। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلِّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ
রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে তার কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলিমরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তার ফেরেশতাদের প্রতি, তার গ্রন্থসমূহের প্রতি। সূরা আল বাক্বারা ২:২৮৫।
📄 ফেরেশতাগণের গুণাবলী
রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈমান সম্পর্কে বলেছেন, أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ
ঈমান হলো: আল্লাহ, তার ফেরেস্তাগণ, কিতাবসমূহ, রসূলগণ, ক্বিয়ামত দিবস এবং ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস রাখা। ১৪
খ। ফেরেশতাগণের গুণাবলী:
১। সৃষ্টিগত গুণের মধ্যে রয়েছে যা আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উল্লেখ করেছেন: তারা নূর তথা আলোর তৈরী। রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, خُلِقَتْ الْمَلَائِكَةُ مِنْ نُورٍ
ফেরেস্তাগণকে নূর বা আলো থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ১৫
২। আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি ফেরেস্তাগণকে বিভিন্ন সংখ্যক পাখা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, الْحَمْدُ لِلَّهِ فَاطِرِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ جَاعِلِ الْمَلَائِكَةِ رُسُلًا أُولِي أَجْنِحَةٍ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ يَزِيدُ فِي الْخَلْقِ مَا يَشَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (فاطر : (১)
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা এবং ফেরেশতাগণকে করেছেন বার্তাবাহক-তারা দুই দুই, তিন তিন ও চার চার পাখাবিশিষ্ট। তিনি সৃষ্টি মধ্যে যা ইচছা যোগ করেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সক্ষম। সূরা আল ফাত্বির ৩৫:১।
৩। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরীল আলাইহিস সালামকে ছয়শত পাখাসহ দেখেছেন। ১৬
৪। আল্লাহর শক্তিতে ফেরেস্তাগণ কখনও মানুষের রূপে পরিবর্তিত হয়ে থাকেন। যেমন, মারইয়াম এর নিকটে আল্লাহ তা'আলা জিবরীল আলাইহিস সালামকে মানুষের আকৃতিতে প্রেরণ করেছিলেন।
এমনিভাবে আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম ও লুত্ব আলাইহিমাস্ সালামের নিকটে ফেরেস্তাগণকে মানুষের আকৃতিতে প্রেরণ করেছিলেন।
৫। ফেরেস্তাগণ অদৃশ্য জগত (তাদেরকে দেখা যায় না)। তাঁরাও আল্লাহর সৃষ্টি এবং তার ইবাদত করেন। পালনকর্তা বা মা'বুদ হওয়ার কোন যোগ্যতা তাদের মাঝে নেই। বরং তারাই আল্লাহর বান্দা এবং সর্বদা আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্যে রত রয়েছেন। যেমন-
আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ﴾ [التحريم: ٦] তারা (ফেরেস্তাগণ) আল্লাহযা আদেশ করেন, তা অমান্য করেন না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করেন। সূরা আত তাহরীম ৬৬:৬।
টিকাঃ
১৪. জ্বহীহ্ মুসলিম হা/৮
১৫. ছহীহ মুসলিম হা/২৯৯৬।
১৬. ছহীহ বুখারী হা/৪৮৫৭ ও ছুহীহ মুসলিম হা/১৭৪।
📄 ফেরেশতাগণের প্রকার ও কাজ
গ। ফেরেস্তাগণের প্রকার ও কাজ: এ পৃথিবীতে ফেরেস্তাগণ (আল্লাহর আদেশে) বিভিন্ন কাজ আঞ্জাম দিচ্ছেন। তারা বিভিন্ন প্রকার এবং প্রত্যেক প্রকারের আলাদা আলাদা কাজ রয়েছে। তাদের অন্যতম হলেন:
১। জিব্রীল আলাইহিস সালাম আল্লাহর পক্ষ হতে তার রসূলগণের নিকটে ওহী নিয়ে আসার দায়িত্ব প্রাপ্ত।
২। বৃষ্টি ও তা পরিচালনার দায়িত্বশীল ফেরেশতা হলেন মীকাঈল আলাইহিস সালাম।
৩। সিঙ্গায় ফুৎকারের দায়িত্ব প্রাপ্ত ফেরেস্তা হলেন ইসরাফীল আলাইহিস সালাম।
৪। আত্মসমূহ কবজের দায়িত্বশীল ফেরেশতা হলেন মালাকুল মাওত ও তাঁর সহযোগী বৃন্দ।
৫। বান্দার ভালো মন্দ আমলের হেফাযতে নিয়োজিত ফেরেস্তাগণ। তারা হলেন কিরামান কাতিবীন (সম্মানীত লেখকদ্বয়)।
৬। মুক্বীম, সফর, নিদ্রা অনিদ্রা এবং সর্বাবস্থায় বান্দাদের হিফাযতে নিয়োজিত ফেরেশতাগণ। তারা হলেন, পর্যবেক্ষণকারীগণ।
৭। আরো রয়েছেন: জান্নাত জাহান্নামের প্রহরীগণ, ভ্রাম্যমান ফেরেস্তাগণ: তারা কল্যাণ ও ইলমের মজলিসের অনুসন্ধানে নিয়োজিত, পাহাড়ের দায়িত্বশীল ফেরেশতাগণ, একদল ফেরেস্তা রয়েছেন যারা সর্বদা সারিবদ্ধভাবে আল্লাহর ইবাদতে ব্যস্ত রয়েছেন, এতে তারা কোন সময় ক্লান্ত হন না। আল্লাহ তা'আলার সৈন্য সংখ্যা তিনি ব্যতীত কেউ জানে না।
📄 ফেরেশতাগণের প্রতি ঈমান আনার প্রভাব
ঘ। ফেরেস্তাগণের প্রতি ঈমান আনার প্রভাব (آثار الإيمان بالملائكة):
মু'মিনের জীবনে ফেরেস্তাগণের প্রতি ঈমান আনার বড় প্রভাব রয়েছে। তার মধ্যে নিম্নে কিছু উল্লেখ করা হলো:
১। আল্লাহর বড়ত্ব, শক্তি এবং পরিপূর্ণ ক্ষমতা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা। কেননা, সৃষ্টির বড়ত্ব স্রষ্টার বড়ত্বের উপর প্রমাণ বহন করে। ফলে মু'মিন আল্লাহকে আরো বেশী সম্মান ও মর্যাদা দান করে। কারণ আল্লাহ তা'আলা আলো থেকে বহু সংখ্যক পাখা বিশিষ্ট ফেরেস্তাগণকে সৃষ্টি করেছেন।
২। আল্লাহর আনুগত্যে অটল থাকা, যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে ফেরেস্তাগণ তার সকল আমল লিপিবদ্ধ করেন সে অবশ্যই আল্লাহকে ভয় করবে, ফলে সে প্রকাশ্য বা গোপনে আল্লাহর অবাধ্য হবে না।
৩। আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্য্য ধারণ করা। মু’মিন ব্যক্তি যখন এ বিশ্বাস রাখবে যে বিশাল পৃথিবীতে হাজারও ফেরেস্তা তার সাথে আল্লাহর আনুগত্য করছে তখন সে প্রফুল্লতা এবং আত্মতৃপ্তি অনুভব করবে।
৪। আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক আদম সন্তানকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার দরুন তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। কেননা, তিনি এমন কিছু ফেরেস্তা নিযুক্ত করেছেন যারা তাদের হেফাযতে সদা প্রস্তুত রয়েছেন।
৫। যখন কেউ মালাকুল মাওতের কথা স্মরণ করবে তখন সতর্ক হবে যে, এই দুনিয়া ধ্বংসশীল, চিরস্থায়ী নয়। ফলে সে ঈমান ও সৎকর্মের মাধ্যমে পরকালের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করবে।