📄 শিরকের প্রকারভেদ
১। শিরক [ الشرك ] : ঈমান ও তাওহীদ পরিপন্থী বিষয়।
কেবলমাত্র এক আল্লাহর উপাস্যে ঈমান আনা এবং সকল ইবাদতে তাঁকে একক হিসাবে গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব। অপর দিকে আল্লাহর নিকটে শির্ক হলো সবচেয়ে বড় অবাধ্যতা ও মারাত্মক পাপ যা আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ [النساء : ٤٨]
নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তাঁকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তার সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। সূরা আন নিসা ৪:৪৮। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ ﴾ [لقمان: ۱۳]
নিশ্চয় আল্লাহ্র সাথে শরীক করা মহা অন্যায়। সূরা লুকুমান ৩১:১৩।
রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সবচেয়ে বড় গুনাহের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,
أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ
সবচেয়ে বড় গুনাহ হলো, তুমি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।¹²
শিরক সকল ভালো আমল নষ্ট ও বাতিল করে দেয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَوْ أَشْرَكُوا حَبِطَ عَنْهُمْ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
যদি তারা শিরক করত, তবে তাদের কাজ কর্ম তাদের জন্যে ব্যর্থ হয়ে যেত। সূরা আল আন'আম ৬: ৮৮। শিরক তাতে নিমজ্জিত ব্যক্তিকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী করে দেয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارِ
নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ্ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন। এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই। সূরা আল্ মায়িদা ৫:৭২।
শিরকের প্রকারভেদ:
শিরক দু'প্রকার:
১) বড় শিরক (الشرك الأكبر)
২) ছোট শিরক (الشرك الأصغر)
নিম্নে উভয় প্রকার শিরকের আলোচনা পেশ করা হলো:
১। শিরকে আকবার বা বড় শিক: যে কোন আমল আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্য কারো জন্য করাই হলো শিরকে আকবার বা বড় শির্ক। অতএব, প্রত্যেক কথা ও কাজ যা আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করেন তা তার জন্য করাই হলো তাওহীদ (একত্ব) ও ঈমান। আর তিনি ভিন্ন অন্য কারও জন্য করাই হলো শির্ক ও কুফরী।
এ প্রকার শিরকের উদাহরণ: আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্যের নিকটে কোন রিযিকু বা সুস্থতা কামনা করা, তিনি ভিন্ন অন্যের উপর ভরসা রাখা, আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্যের জন্য সিজদাহ্ করা ইত্যাদী। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ [غافر : ٦٠]
এবং তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব। সূরা গাফির/মুমিন ৪০: ৬০ অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ﴾ [المائدة : ٢٣]
আর আল্লাহর উপর ভরসা কর যদি তোমরা বিশ্বাসী হও সূরা আল মায়িদা ৫:২৩।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
فَاسْجُدُوا لِلَّهِ وَاعْبُدُوا [النجم: ٦٢]
অতএব আল্লাহকে সিজদাহ্ কর এবং তার ইবাদত কর। সূরা আন্ নাজম ৫৩: ৬২।
দু'আ, ভরসা রাখা এবং সিজদাহ্ করা ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, যার আদেশ আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন। অতএব, যে ব্যক্তি এসকল ইবাদত আল্লাহর জন্য করবেন তিনি মুমিন ও তাওহীদপন্থী (আস্তিক), আর যে তা গাইরুল্লাহর জন্য করবে সে মুশরিক ও কাফির (নাস্তিক)।
২। শিরকে আসগার বা ছোট শিরক: শিরকে আসগার ঐ সকল কথা বা কাজ যা শিকে আকবারের (বড় শিরকের) কারণ এবং তাতে পতিত হওয়ার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। যেমন: কবরকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করা। তা কবরের নিকটে জ্বলাত আদায় করা অথবা কোন কবরের উপরে মসজিদ তৈরী করার মাধ্যমে হতে পারে। এ কাজ সম্পূর্ণ হারাম, তা যে করবে তার জন্য রয়েছে অভিশাপ ও আল্লাহর রহমাত থেকে বিতাড়িত হওয়ার ওয়াদা। রসূল জ্বলাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ
ইহুদী এবং নাসারাদের (খ্রিষ্টানদের) উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হউক, কারণ তারা তাদের নাবীদের কবরগুলোকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করেছে।¹³
অতএব, কবরকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করা হারাম ও নাজায়েয কাজ। এটা মৃত ব্যক্তির নিকটে চাওয়া ও প্রার্থনার পথ খুলে দেয়। আর মৃত ব্যক্তির নিকটে চাওয়া শিকে আকবার বা বড় শিরক।
টিকাঃ
১২. জ্বহীহ বুখারী হা/৪৪৭৭, জ্বহীহ মুসলিম হা/৮৬
১৩. ছহীহ বুখারী হা/৪৩৫, ছহীহ মুসলিম হা/৫৩১।
📄 আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর প্রতি বিশ্বাস
ক। এ প্রকার তাওহীদ হলো, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কিতাবে অথবা রাসূলের হাদীছে যে সকল নাম ও গুণাবলী নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন তা তার সাথে সামঞ্জস্য ও সঙ্গতি রেখে সত্যায়ন করা। আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে তার কোন সাদৃশ্য বা দৃষ্টান্ত নেই। তিনি বলেন,
فَاطِرُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ جَعَلَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا وَمِنَ الْأَنْعَامِ أَزْوَاجًا يَذْرَؤُكُمْ فِيهِ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ [الشورى : ۱۱]
তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের স্রষ্টা। তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্য যুগল সৃষ্টি করেছেন এবং চতুষ্পদ জন্তুদের মধ্য থেকে জোড়া সৃষ্টি করেছেন। এভাবে তিনি তোমাদের বংশ বিস্তার করেন। কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। তিনি সব শুনেন, সব দেখেন। সূরা আশ শুরা ৪২:১১।
অতএব, আল্লাহ তা'আলা তার সকল নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে স্বীয় কোন সৃষ্টিজীবের সাদৃশ্য হওয়া থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।
আল্লাহ তা'আলার নাম অনেক, তার মধ্যে রয়েছে: আর্ রহমান (পরম দয়ালু), আল বাসীর (সর্বদ্রষ্টা), আল আযীয (মহা পরাক্রমশালী) ইত্যাদি। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
তিনি নিতান্ত মেহেরবান ও দয়ালু। সূরা আল্ ফাতিহা ১: ৩। অন্য আয়াতে এসেছে,
وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
তিনি সব শুনেন, সব দেখেন। সূরা আশ-শুরা ৪২: ১১। তিনি বলেন,
وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় সূরা লুকুমান ৩১: ৯।
খ। আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর প্রতি ঈমান আনার উপকারীতা: আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর প্রতি ঈমান আনার কিছু উপকারীতা নিচে উল্লেখ করা হলো:
১। আল্লাহর পরিচয় জানা। যে ব্যক্তি আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর প্রতি ঈমান আনবে, আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে তার জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে। ফলে তার সম্পর্কে ঐ ব্যক্তির ঈমানের দৃঢ়তা ও স্রষ্টার ক্ষেত্রে তার তাওহীদ (একত্ব) বৃদ্ধি পাবে।
২। আল্লাহর সুন্দর নাম সমূহ দ্বারা তাঁর প্রশংসা করা। আর এটা উত্তম যিকিরের অন্যতম প্রকার। আল্লাহ তা'আলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا [الأহ্যাব : ৪১] হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর। সূরা আল্ আহ্যাব ৩৩: ৪১।
৩। আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর মাধ্যমে তাকে ডাকা ও প্রার্থনা করা। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا [الأعরাফ : ১৮০] আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই সে নাম ধরেই তাঁকে ডাক। সূরা আল আ'রাফ ৭:১৮০।
যেমন এমন বলা: হে, আল্লাহ্ নিশ্চয় আমি তোমার নিকটে প্রার্থনা করছি, তুমি রায্যাক্ব (রিযিকদাতা) সেহেতু তুমি আমাকে রিযিক দাও ইত্যাদি।
৪। দুনিয়াতে সৌভাগ্য ও সুন্দর জীবন। আর পরকালে জান্নাতের নিয়ামত অর্জন করা।
📄 আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার প্রভাব ও ফলাফল
[آثار الإيمان بالله تعالى]
দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের সুন্দর প্রভাব রয়েছে। কেননা দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণলাভ এবং অকল্যাণ প্রতিহত করা আল্লাহর প্রতি ঈমানেরই ফল। আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার কিছু প্রভাব নিচে উল্লেখ করা হলো:
১। আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের থেকে সকল প্রকার অপছন্দনীয় জিনিস প্রতিহত করেন। তাদেরকে কঠিন পরিস্থিতি হতে মুক্ত করেন এবং শত্রুদের চক্রান্ত হতে তাদেরকে হেফাযত করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ اللَّهَ يُدَافِعُ عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ خَوَّانٍ كَفُورٍ [الحج - ৩৮]
আল্লাহ্ মুমিনদের থেকে শত্রুদেরকে হটিয়ে দেবেন। আল্লাহ্ কোন বিশ্বাসঘাতক অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না। সূরা আল-হাজ্জ ২২:৩৮।
২। ঈমান আনা সুন্দর জীবন, সৌভাগ্য এবং আনন্দের কারণ। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ﴾ [النحل : ٩٧]
যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ঈমানদার, পুরুষ হোক কিংবা নারী আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের কারণে প্রাপ্য পুরষ্কার দিব যা তারা করত। সূরা আন্ নাহল ১৬: ৯৭।
৩। ঈমান কুসংস্কার থেকে আত্মাকে পবিত্র করে। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি সঠিকভাবে ঈমান আনে সে তার সকল বিষয়কে আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত করে।
আল্লাহই সমস্ত পৃথিবীর পালনকর্তা, তিনি ব্যতীত কোন সত্য মা'বুদ নেই, তাই সে ব্যক্তি কোন সৃষ্টিজীবকে ভয় করে না। কোন মানুষের সাথে তার অন্তরকে সম্পর্কিত রাখে না, ফলে ঐ ব্যক্তি কুসংস্কার ও সংশয় থেকে মুক্ত থাকে।
৪। ঈমানের অন্যতম প্রভাব হলো: সফলকাম ও কৃতকার্য হওয়া (الفوز), (والفلاح), প্রার্থিত বস্তু লাভকরা এবং অপছন্দনীয় বস্তু হতে মুক্ত থাকা।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿أُولَئِكَ عَلَى هُدًى مِنْ رَبِّهِمْ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ﴾ [البقرة : ٥]
তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথ প্রাপ্ত, আর তারাই যথার্থ সফলকাম। সূরা আল বাক্বারা ২: ৫।
৫। ঈমানের সবচেয়ে বড় প্রভাব হলো: (وأعظم آثار الإيمان):
✓ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন (الحصول على مرضاة الله تعالى),
✓ জান্নাতে প্রবেশ (ودخول الجنة),
✓ প্রতিদান স্থায়ী নিয়ামত (والفوز بالنعيم المقيم) এবং
✓ পরিপূর্ণ রহমত লাভের মাধ্যমে কৃতকার্য হওয়া (والرحمة الكاملة)।