📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমান

📄 আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমান


আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার অর্থ: আল্লাহর অস্তিত্বকে নিশ্চিত ও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা। প্রভুত্ব, ইবাদত এবং নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্বকে স্বীকার করা। আল্লাহর প্রতি ঈমান চারটি বিষয়কে শামিল করে:

১। আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্বে নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করা [الإيمان بوجود الله سبحانه وتعالى] |
২। আল্লাহর তা'আলার প্রভুত্বে বিশ্বাস স্থাপন করা [الإيمان بربوبية الله تعالى] |
৩। আল্লাহ তা'আলাইই একমাত্র সত্য ইলাহ্ ও ইবাদতের যোগ্য এ বিশ্বাস রাখা [الإيمان بألوهية الله تعالى] |
৪। আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর উপর বিশ্বাস রাখা [الإيمان بأسماء الله وصفاته] |

এ চারটি বিষয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশা আল্লাহ।

১। আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস স্থাপন করা [الإيمان بوجود الله تعالى]
ক। আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস স্থাপন করা মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। অধিকাংশ মানুষ আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী। সামান্য সংখ্যক নাস্তিক ব্যতীত কেউ এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেনি। প্রত্যেক সৃষ্টি জীবই পূর্ব তা'লীম ছাড়াই তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে ঈমানের উপর সৃষ্ট। যেমন আমরা আহ্বানকারীদের আহ্বানে সাড়া দেওয়া এবং প্রার্থনাকারীদের প্রার্থীত বস্তু প্রাপ্তির কথা শুনি ও দেখে থাকি, যা আল্লাহর অস্তিত্বের উপর স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَإِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ﴾ [الأنفال: ٩]
তোমরা যখন ফরিয়াদ করতে আরম্ভ করেছিলে স্বীয় পালনকর্তার নিকট। তখন তিনি তোমাদের ফরিয়াদের মঞ্জুরী দান করলেন [সূরা আল আনফাল ৮: ৯]।
খ। প্রত্যেকেই জানে কোন কিছু সংঘটিত হলে তার সম্পাদনকারী বা সংঘটক থাকা আবশ্যক। অসংখ্য সৃষ্টিজীব এবং প্রতিনিয়ত আমরা দুনিয়াতে যা দেখছি তারও একজন স্রষ্টা দরকার যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন। তিনিই হলেন আল্লাহ তা'আলা। কেননা স্রষ্টা বিহীন সৃষ্টি আসতে পারেনা। তেমনি এটাও অসম্ভব যে কেউ নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করবে, কেননা কোন বস্তু নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ﴾ [الطور : ٣٥]
তারা কি আপনা-আপনিই সৃজিত হয়ে গেছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা? সূরা আত্ তূর ৫2: ৩৫।
আয়াতের অর্থ: তারা স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্ট হয়নি, আর তারা নিজেরাও নিজেদেরকে সৃষ্টি করেনি, তাহলে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে তাদের স্রষ্টা হলেন আল্লাহ তা'আলা।
গ। আসমান, যমীন, চন্দ্র, সূর্য, তারকা এবং গাছ-পালাসহ সুশৃঙ্খল এ দুনিয়া নিশ্চিতরূপে প্রমাণ করে যে এই পৃথিবীর একজন একক স্রষ্টা রয়েছেন। আর তিনিই হলেন মহান রব্বুল আলামীন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿صُنْعَ اللَّهِ الَّذِي أَتْقَنَ كُلَّ شَيْءٍ﴾ [النمل : ৮৮]
এটা আল্লাহর কারিগরী, যিনি সবকিছুকে করেছেন সুসংহত। সূরা আন্ নামল ২৭:৮৮।
তারকা ও নক্ষত্র সমূহ নির্দিষ্ট নিয়মে চলা-ফেরা করছে, নিজ কক্ষ পথ থেকে বিচ্যুত হয় না। প্রত্যেকটি নক্ষত্র নির্দিষ্ট কক্ষপথে চলে এবং তা কখনও অতিক্রম করে না।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿لَا الشَّمْسُ يَنْبَغِي لَهَا أَنْ تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِ وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ﴾ [يس : ٤٠]
সূর্য নাগাল পেতে পারে না চন্দ্রের এবং রাত্রি অগ্রে চলে না দিনের, প্রত্যেকেই আপন আপন কক্ষপথে সন্তরণ করে। সূরা ইয়াসীন ৩৬:৪০।

📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 আল্লাহ তা‘আলার প্রভুত্বে বিশ্বাস

📄 আল্লাহ তা‘আলার প্রভুত্বে বিশ্বাস


ক। আল্লাহর প্রভুত্বে বিশ্বাসের অর্থ: এ কথা স্বীকার করা যে আল্লাহ তা'আলা সব কিছুর পালনকর্তা, মালিক, সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, তিনি জীবন ও মৃত্যু দেন, উপকার ও ক্ষতি পৌঁছান, সব কিছুই তার, তার হাতে সকল কল্যাণ, তিনি সব কিছু করতে পারেন। এ সকল ক্ষেত্রে তার কোন শরীক বা অংশীদার নেই।
আল্লাহর প্রভুত্বে বিশ্বাস হলো: দৃঢ় এ বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ্ তা'আলাই একমাত্র রব বা প্রতিপালক, তার কোন শরীক নেই এবং আল্লাহর কাজে তাকে একক হিসেবে বিশ্বাস করা। যেমন: এ আক্বীদাহ পোষণ করা যে এ পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা হলেন একমাত্র আল্লাহ তা'আলা।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ ﴾ [الزمر : ٦٢] আল্লাহ্ সবকিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সবকিছুর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সূরা আয যুমার ৩৯:৬২।
তিনিই সকল সৃষ্টিজীবের রিযিকদাতা। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا﴾ [هود: ٦] আর পৃথিবীতে কোন বিচরণশীল নেই, যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর উপর নেই (পৃথিবীর সকল জীবের রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহর উপর)। সূরা হুদ ১১:৬।
আল্লাহ তা'আলা সব কিছুর মালিক। তিনি বলেন, ﴿لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا فِيهِنَّ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ﴾ [المائدة : ١٢٠] নভোমন্ডল, ভূ-মণ্ডল এবং এতদুভয়ে অবস্থিত সবকিছুর আধিপত্য আল্লাহরই। তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। সূরা আল মায়িদা ৫:১২০।
খ। আল্লাহ তা'আলা এককভাবে সকল সৃষ্টিজীবের পালনকর্তা। তিনি বলেন: ﴿الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ﴾
যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা। সূরা আল ফাতিহা ১: ২।
রব্বুল আলামীনের অর্থ: আল্লাহ তা'আলা সকল সৃষ্টিজীবের সৃষ্টিকর্তা, মালিক, কল্যাণকারী। বিভিন্ন নিয়ামত ও অনুগ্রহের দ্বারা তিনি তাদেরকে লালন পালন করেন।
গ। আল্লাহ তা'আলা সকল সৃষ্টিজীবকে তার প্রভুত্বের বিশ্বাস দিয়েই সৃষ্টি করেছেন, এমনকি রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যামানার আরবীয় মুশরিকদেরকেও। আল্লাহ তা'আলা বলেন, قُلْ مَنْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ * سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَتْقُونَ قُلْ مَنْ بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيْهِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ * سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ فَأَنَّى تُسْحَرُونَ﴾ [المؤمنون : ٨٦-٨٩]
বলুন, সপ্তাকাশ ও মহা-আরশের মালিক কে? অবশ্যই তারা বলবে, আল্লাহ্ তা'আলা। বলুন, তবুও কি তোমরা ভয় করবে না? বলুন, তোমাদের জানা থাকলে বল, কার হাতে সব বস্তুর কর্তৃত্ব, যিনি রক্ষা করেন এবং যার কবল থেকে কেউ রক্ষা করতে পারে না? অবশ্যই তারা বলবে: আল্লাহর। বলুন, তাহলে কোথা থেকে তোমাদেরকে জাদু করা হচ্ছে? সূরা আল মুমিনূন ২৩: ৮৬-৮৯।
আল্লাহ তা'আলার প্রভুত্বে বিশ্বাস করলেই কেউ মুসলিম হয়ে যায় না। বরং অবশ্যই তাকে আল্লাহর উলুহিয়্যাতে (ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্বে) বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। কেননা, আল্লাহর প্রভুত্বে বিশ্বাস স্থাপনের পরও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কার কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করেছেন।
ঘ। আসমান-যমীন, গ্রহ-উপগ্রহ, তারকা, গাছ-পালা এবং মানুষ ও জ্বিনসহ সারা বিশ্ব মহান আল্লাহর অনুগত ও অধীনে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَهُ أَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُجْرَعُونَ﴾ [آل عمران ۸۳] আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, তারই অনুগত হবে এবং তার দিকেই ফিরে যাবে। সূরা আলি ইমরান ৩:৮৩।
অতএব, কোন সৃষ্টি জীবই আল্লাহর শক্তি ও নির্ধারিত তাক্বদীর হতে বের হতে পারবে না। কেননা, আল্লাহ তা'আলাই হলেন তাদের মালিক, তিনি নিজের হিকমত অনুযায়ী যেভাবে ইচ্ছা তাদেরকে পরিচালনা করেন। তিনি সকল জীবের সৃষ্টিকর্তা।
আল্লাহ্ ব্যতীত সবকিছু তার তৈরী, দরীদ্র এবং তাদের সৃষ্টিকর্তা মহান রব্বুল আলামীনের নিকটে মুখাপেক্ষী।
ঙ। যখন এটা নিশ্চিত হলো যে আল্লাহ্ তা'আলাই সবকিছুর মালিক তখন জানা গেল, আল্লাহ তা'আলা ছাড়া কোন সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা নেই। একমাত্র আল্লাহই সারা বিশ্বের পরিচালনাকারী। অতএব, আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত একটা পিপিলিকাও নড়ে না।
তাই আমাদের জন্য ওয়াজিব হলো আমরা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক রাখব, বিপদাপদে তার নিকটেই প্রার্থনা করব, তার উপর ভরসা রাখবো। কেননা, আল্লাহ তা'আলা হলেন আমাদের সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা এবং মালিক।

📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 আল্লাহ তা‘আলার উলুহিয়্যার প্রতি বিশ্বাস

📄 আল্লাহ তা‘আলার উলুহিয়্যার প্রতি বিশ্বাস


(আল্লাহই একমাত্র সত্য ইলাহ ও ইবাদতের যোগ্য এ বিশ্বাস রাখা)

ক। ইলাহ (মা'বুদ) হিসেবে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের অর্থ: এ দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে কেবল মাত্র আল্লাহ তা'আলা প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল প্রকার ইবাদতের হক্বদার এবং যোগ্য। যেমন, দু'আ, ভয়, ভরসা, সহযোগীতা প্রার্থনা করা, ছালাত, যাকাত, সিয়াম ইত্যাদী। নিশ্চিতভাবে বান্দার জানা উচিত আল্লাহ্ তা'আলাই হলেন প্রকৃত মা'বুদ বা ইবাদতের যোগ্য, তার কোন শরীক নেই। অতএব, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মা'বুদ-উপাস্য নেই।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَإِلهَكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ [البقرة : ١٦٣] আর তোমাদের মা'বুদ তো এক-ই মা'বুদ, তিনি ছাড়া আর কোন সত্য মা'বুদ নেই, তিনি করুণাময় ও মহান দয়ালু। সূরা আল বাক্বারা ২:১৬৩।
আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিয়েছেন উপাস্য এবং মা'বুদ হলেন একজন। অতএব, আল্লাহ্ ব্যতীত কাউকে ইলাহ্ হিসেবে গ্রহণ করা এবং তিনি ব্যতীত কারও ইবাদত করা জায়েয নয়।

খ। আল্লাহর উলুহিয়্যাতে বিশ্বাস: তা হলো এ কথা স্বীকার করা যে আল্লাহ তা'আলা একমাত্র সত্য মা'বুদ, তার কোন শরীক নেই। ইলাহ্ শব্দের অর্থ মা'লুহ অর্থাৎ ভালোবাসা ও সম্মান সহকারে যার ইবাদত করা হয়। অতএব, উলুহিয়্যাহ্হলো, সকল প্রকার ইবাদতে আল্লাহর একত্ব। তাই আমরা আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যকে ডাকি না, তিনি ব্যতীত কাউকে ভয় করি না।
আমরা কেবল তার উপরই ভরসা করি, তাকেই সিজদাহ করি, তার নিকটেই নত হই। সঙ্গত কারণেই আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত কেউ ইবাদতের যোগ্য নয়। এ কথারই প্রমাণ মেলে আল্লাহ তা'আলার বাণী:
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ سورة الفاتحة - ٥
আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি। সূরা আল ফাতিহা ১:৫।

গ। উলুহিয়‍্যাহ্ বা ইবাদতে আল্লাহর একত্ব বিশ্বাসের গুরুত্ব: নিম্নোক্ত বিষয়গুলো থেকে আল্লাহর উলুহিয়‍্যাতের গুরুত্ব বুঝা যায়:
(১) মানুষ এবং জ্বিন সৃষ্টির একমাত্র উদ্দেশ্য হলো এক অদ্বিতীয়, লাশারীক আল্লাহর ইবাদত করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ﴾ [الذاريات : ٥٦]
আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জ্বিন জাতিকে সৃষ্টি করেছি। সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৬।
(২) রসূলগণ (আলাইহিমুস্ সালাম) এবং আসমানি কিতাবসমূহ প্রেরণের উদ্দেশ্য হলো এ কথার স্বীকৃতি দেওয়া যে আল্লাহ তা'আলাই একমাত্র সত্য মা'বুদ। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ [النحل : ٣٦]
আমি প্রত্যেক উম্মাতের মধ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং ত্বগুত থেকে নিরাপদ থাক সূরা আন্ নাহল ১৬:৩৬।
(৩) প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সর্বপ্রথম আল্লাহ তা'আলার উলুহিয়্যাতে বিশ্বাস স্থাপন করা ফরয। যেমন: আল্লাহর রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মুয়ায বিন জাবাল () কে ইয়েমেনে পাঠান তখন তাকে যে ওসিয়ত করেন তা হলো,
إِنَّكَ تَقْدَمُ عَلَى قَوْمٍ أَهْلِ كِتَابٍ فَلْيَكُنْ أَوَّلَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ عِبَادَةُ اللَّهِ
তুমি এমন জাতির নিকটে যাচ্ছ যারা আহলে কিতাব। অতএব, তাদেরকে সর্বপ্রথম আল্লাহর ইবাদতের প্রতি দাওয়াত দিবে। অর্থাৎ সকল প্রকার ইবাদতে আল্লাহর একত্বের প্রতি আহ্বান করবে।⁸

**লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ এর অর্থ**

ঘ। (لا إله إلا الله) লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর অর্থ: জীবনের প্রথম ও শেষে এই মর্যাদাপূর্ণ বাক্য বা কালিমাটি পাঠ ও বিশ্বাস করা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব। যে ব্যক্তি এ কালিমার উপর (বিশ্বাস সহকারে) মৃত্যুবরণ করবে তিনি জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। নাবী কারীম জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ - أخرجه مسلم
আল্লাহ্ ছাড়া সত্য কোন মা'বুদ নেই, একথা জানা ও বিশ্বাস করা অবস্থায় যে ব্যক্তি ইন্তেকাল করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।⁹
উপরক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ (আল্লাহ্ ছাড়া সত্য কোন মা'বুদ নেই) এর জ্ঞানার্জন করা সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ফরয।
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ (لا إله الا الله) এর অর্থ: এক আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মা'বুদ নেই। এখানে আল্লাহ ছাড়া সকলের থেকে উলুহিয়‍্যাহ্ বা ইবাদতের যোগ্যতাকে অস্বীকার করা হয়েছে। অপর দিকে সকল প্রকার ইবাদতকে একমাত্র লা-শারীক আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
ইলাহ শব্দের অর্থ: মা'বুদ বা যার ইবাদত করা হয়। অতএব, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করল, সে তাকে ইলাহ্ বা মা'বুদ হিসাবে গ্রহণ করল। এক অদ্বিতীয় আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত করা হয় তারা বাতিল। আল্লাহ তায়া'লাই একমাত্র ইলাহ। অন্তরসমূহ ভালোবাসা, সম্মান, বিনয়, নম্রতা, ভয়-ভরসা এবং দু'আর মাধ্যমে আল্লাহরই ইবাদত করবে।
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ এর অর্থ বাস্তবায়ন ব্যতীত কোন অন্তর খুশী, সুখী ও সৌভাগ্যশীল হতে পারে না। কেননা, কেবলমাত্র এক আল্লাহর ইবাদতেই রয়েছে পূর্ণ সুখ, শান্তি, নিয়ামত এবং সুন্দর জীবন।

**লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর রুকন বা ভিত্তিসমূহ**
6 / اركان لا إله الا الله লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর ভিত্তিসমূহ:
এ মর্যাদাপূর্ণ কালিমাটির দু'টি রুকন বা ভিত্তি রয়েছে, তা হলো: না বোধক এবং হাঁ বোধক (النفي والإثبات)।
প্রথম রুকন: (১) লা-ইলাহা
আর এটা হলো আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদতকে অস্বীকার করা, শির্ককে বাতিল হিসাবে বিশ্বাস করা এবং অত্যাবশ্যকভাবে আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত যাদের ইবাদত করা হয় তা কুফরী বলে জানা।
দ্বিতীয় রুকন: )إلَّا الله( ইল্লাল্লাহ্
এটা হলো সকল প্রকার ইবাদত এক আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা এবং তা কেবলমাত্র আল্লাহর নিমিত্তেই সম্পাদন করা। এর দলীল হলো আল্লাহর বাণী: فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنْ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى [البقرة : ٢٥٦]

টিকাঃ
৮. ছহীহ বুখারী হা/১৪৫৮ ও ছহীহ মুসলিম হা/১৯।
৯. জ্বহীহ মুসলিম হা/২৬।

📘 কিতাবুল ঈমান > 📄 লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর শর্তাবলী

📄 লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর শর্তাবলী


যারা গোমরাহকারী ত্বগুতদেরকে মানবে না এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল। সূরা আল বাক্বারা ২:২৫৬।
এখানে আল্লাহর বাণী: فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ (যারা গোমরাহকারী ত্বগুতদেরকে মানবে না) হলো প্রথম রুকন লা-ইলাহার অর্থ। وَيُؤْمِنْ بِاللهِ (আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে) দ্বিতীয় রুকনের তথা ইল্লাল্লাহর অর্থ।

**লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর শর্তাবলী**

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর সাতটি শর্ত রয়েছে যা একসাথে পাওয়া আবশ্যক। একসাথে সাতটি শর্ত পাওয়া না গেলে তা পাঠকারীর কোন উপকারে আসবে না। শর্তগুলো নিম্নরূপ:

১। আল ইলম (العلم): لَا إلهَ إِلَّا اللهُ (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্) এর অর্থ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা। আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إلهَ إِلَّا اللهُ (سورة محمد (۱۹) জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত (সত্য) কোন উপাস্য নেই। সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৯

২। আল ইয়াকীন-দৃঢ় বিশ্বাস (اليقين): এ কালিমা যে সকল বিষয়ের উপর প্রমাণ বহন করে তাতে দৃঢ় বিশ্বাসী হওয়া। যদি তাতে সন্দিহান ও দোদুল্যমান হয় তবে এ কালিমা তার উপকারে আসবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا
তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ্ ও তার রসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না। সূরা আল্ হুজরাত ৪৯:১৫।

৩। আল কুবুল-গ্রহণ করা (القبول): এ কালিমা একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার যে সকল ইবাদত করা এবং তিনি ব্যতীত অন্যের ইবাদত পরিত্যাগ করার প্রমাণ বহন করে তা গ্রহণ করা। কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি এ কালিমা পাঠ করত
এক আল্লাহর ইবাদত গ্রহণ না করে, তাহলে সে ঐ সকল লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
﴿إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ (٣٥) وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُو آلِهِتِنَا لِشَاعِرٍ مَجْنُونٍ (٣٦)﴾ [الصافات]
তাদের যখন বলা হত, আল্লাহ্ ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নেই, তখন তারা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করত এবং বলত, আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের উপাস্যদেরকে পরিত্যাগ করব। সূরা আস্ সাফ্ফাত ৩৭:৩৫-৩৬।

৪। আল ইনকিয়াদ-বশ্যতা স্বীকার করা (الإنقياد): এ কালিমা যে সকল বিষয়ের উপর প্রমাণ বহন করে তা স্বীকার করা: আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَمَنْ يُسْلِمْ وَجْهَهُ إِلَى اللَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى وَإِلَى اللَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ﴾ [لقمان : ٢٢]
যে ব্যক্তি সৎকর্মপরায়ণ হয়ে স্বীয় মুখমণ্ডলকে আল্লাহ্ অভিমুখী করে, সে এক মজবুত হাতল ধারণ করে, সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর দিকে। সূরা লুকুমান ৩১:২২।
يُسْلِمْ وَجْهَهُ এর অর্থ: স্বীকার করা ও বিনয়ী হওয়া।
الْعُرْوَةِ الْوُثْقَى হলো: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ যার অর্থ: আল্লাহ্ ছাড়া সত্য কোন মা'বুদ নেই।

৫। আস সিদক্ব-সত্যবাদীতা (الصدق): তা হলো এ কালিমা সত্যিকার অর্থে অন্তর থেকে পাঠ করা। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
﴿مَا مِنْ عَبْدٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ إِلَّا حَرَّمَهُ اللَّهُ عَلَى النَّارِ﴾
যে ব্যক্তিই সত্যিকার অর্থে অন্তর থেকে সাক্ষ্য দিবে আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মা'বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রসূল, আল্লাহ্ তাকে জাহান্নামের উপর হারাম করে দিবেন।¹⁰

৬। আল ইখলাস-খাঁটি একনিষ্ঠতা (الإخلاص): তা হলো আমলকে সকল প্রকার শিরক থেকে মুক্ত করা। ফলে মুখলেস ব্যক্তি এ কালিমা পাঠের মাধ্যমে দুনিয়ার কোন লোভ লালসা করবে না। রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ اللَّهَ قَدْ حَرَّمَ عَلَى النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَبْتَغِي بِذَلِكَ وَجْهَ اللَّهِ
নিশ্চয় যে ব্যক্তি কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ পাঠ করে আল্লাহ্ তা'আলা তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দেন।¹¹

৭। আল মাহাব্বা- ভালোবাসা (المحبة): এ কালিমা ও যে সকল বিষয়ের উপর তা প্রমাণ বহন করে এবং এর প্রতি আমলকারীগণের প্রতি ভালোবাসা থাকা। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لله [البقرة : ١٦٥]
আর কোন লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালোবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালোবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশী। সূরা আল বাকারা ২:১৬৫।
অতএব, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ পাঠকারী মুমিনগণ আল্লাহকে খালেসভাবে ভালোবাসেন। আর মুশরিকরা আল্লাহর সাথে তিনি ব্যতীত অন্য মা'বুদদেরকেও ভালোবাসে। আর এটা (আল্লাহর সাথে অন্য মা'বুদকে ভালোবাসা) লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ এর পরিপন্থী ও তা ভঙ্গকারী বিষয়।

টিকাঃ
১০. ছহীহ বুখারী হা/১২৮ ও ছহীহ মুসলিম হা/৩২।
১১. সহীহ বুখারী ৪২৫, ১১৮৬ ও সহীহ মুসলিম ৩৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00