📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: জ্ঞানানুযায়ী ফাতাওয়া প্রদান
১. সম্মানিত শাইখ (মা) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: যে সব শিক্ষার্থী সালাফে জ্বলিহীনের রীতি-পদ্ধতি ব্যতিরেকে কোন আলিম অথবা ইমামের আক্বীদা বিষয়ক পাঠ গ্রহণ করা প্রয়োজন মনে করে এ ক্ষেত্রে কি তাদের ওজর গ্রহণযোগ্য হবে কি?
এ প্রশ্নের জবাবে শাইখ বলেছেন, হক্ব পাওয়ার পরে এ অবস্থায় শিক্ষার্থীর জন্য কোন ওযর-আপত্তি গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা, হক্ব যেখানেই থাক তার অনুসরণ করা এবং হক্ব স্পষ্ট করার জন্য এ সম্পর্কে আলোচনা করা শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক। আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা যে, হকু সুস্পষ্ট। যার নিয়্যাত বিশুদ্ধ তার নিকট হক্ব স্পষ্ট এবং তার পন্থা উত্তম। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُدَّكِرٍ} [القمر: ١٧]
আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্য। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি? সূরা আল কুমার ৫৪:১৮
কতিপয় মানুষের এমন অনুসরণীয় সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ রয়েছে যারা তাদের (ভ্রান্ত) মতাদর্শ থেকে পিছ পা হয় না। যদিও তাদের স্মৃতিপটে এটা রেখাপাত করে যে, তাদের মতাদর্শ দুর্বল কিংবা বাতিল-পরিত্যাজ্য। আর হকু স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও পক্ষপাতিত্ব ও কু-প্রবৃত্তির অনুসরণই তাদের (ভ্রান্ত মতাদর্শের লোকদের) আনুগত্য করতে লোকেরা প্ররোচিত হয়।
২. সম্মানিত শাইখ (মা) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, পদস্খলনের শঙ্কায় আক্বীদা বিষয়ক বিশেষত ভাগ্য বিষয়ে পাঠ গ্রহণ করতে যারা আগ্রহী নয়, তাদের ব্যাপারে আপনার মত কি?।
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, এটিও অন্যান্য মাসআলার মত একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা যা দীন ও দুনিয়া সম্পর্কিত বিষয় তা জানা মানুষের জন্য আবশ্যক। এ বিষয়ে অজ্ঞতা সম্পর্কে মানুষের পর্যালোচনা করা উচিত এবং এ ব্যাপারে বিশ্লেষণ ও উপলব্ধির জন্য আল্লাহ তা'আলার সাহায্যে কামনা করা প্রয়োজন যাতে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। কেননা এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোন প্রকার সন্দেহ থাকা উচিত নয়। আর যেসব মাসআলায় দীন প্রশ্নবিদ্ধ হয় না এবং দীন বিমুখ হওয়ার শঙ্কা না থাকে তাহলে যতক্ষণ না তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা পাওয়া যায় (সাধারণ) মাসআলার আলোচনা স্থগিত করাতে কোন সমস্যা নেই। আর গুরুত্বপূর্ণ মাসআলার মধ্যে ভাগ্য সংক্রান্ত বিষয় অন্যতম। এ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করা বান্দার উপর আবশ্যক। যেন এ বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস অর্জন হয়। আর প্রকৃতপক্ষে এ বিষয়ে কোন প্রশ্ন নেই। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি কতিপয় মানুষের উপর আক্বীদা বিষয়ক অধ্যয়নকে গুরুত্ববহ করছেন। অথচ তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করত আক্বীদার বিষয়ের উপর অন্য কিছুকে প্রধান্য দেয়। কিন্তু কেন?
"لم" (কেন?) ও "كيف" (কিভাবে?) এ দু'টি প্রশ্নবোধক পদ ব্যবহার করে মানুষের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অর্থাৎ এরূপ আমল কেন করেছিলে? এটা ইখলাছ সম্পর্কিত প্রশ্ন। কিভাবে তা করেছিলে? এটা রসূল এর আনুগত্য বিষয়ক প্রশ্ন। আজকাল অধিকাংশ মানুষই "كيف"
(কিভাবে?) পদটির জবাব বিশ্লেষণে ব্যস্ত। অথচ "لم" (কেন?) পদটির জবাব বিশ্লেষণে তারা অনাগ্রহী। এ জন্য দেখা যায়, তাদের অধিকাংশই আমলের ইখলাছ (একনিষ্ঠতাকে) প্রধান্য দেয় না। তাই গুরুত্বহীন (অনর্থক) বিষয়ের আনুগত্যে তারা উৎসাহিত হয়। আজকাল অধিকাংশ মানুষই এর উপর গুরুত্বারোপ করে চলছে। আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আক্বীদা, ইখলাছ ও তাওহীদ বিষয়ক আমল-আলোচনা হতে তারা বিস্মৃত-অমনোযোগী।
তাই দেখা যায়, কতিপয় মানুষ দীনের অত্যন্ত সহজ কিছু বিষয় সম্পর্কে তারা প্রশ্ন করে। মূলত তাদের অন্তর দুনিয়ামুখী, আল্লাহর আনুগত্য হতে বিস্মৃত, ফলে পার্থিব ক্রয়-বিক্রয়, ভ্রমণ, বাসস্থান ও অন্ন-বস্ত্র নিয়ে তারা নিমগ্ন। তাই আজকাল কিছু মানুষ দুনিয়াপূজারী অথচ তারা এ ব্যাপারে বেখবর-বোধহীন। কখনো তারা আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে অথচ তারা বুঝে না। কেননা, তারা তীব্র ক্ষোভ বশতঃ তাওহীদ ও আক্বীদার বিষয়কে গুরুত্ব দেয় না। এ
অবস্থা শুধু সর্বসাধারণের মাঝেই বিদ্যমান নয়। বরং কতিপয় শিক্ষার্থীর মাঝেও তা চালু রয়েছে। এটাই হচ্ছে ভয়াবহ বিষয়। যেমন আমল ছাড়াই শুধু সম্পর্ক সুদৃঢ় করণের বিষয়টি ঝুকিপূর্ণ। বন্ধন দৃঢ় করণের বিষয়টি শরী'আত প্রণেতা নির্ধারণ করেছেন (আমলসহ)। যারা সম্পর্ক-সংহতি রক্ষা করে তাদের মাঝেও ভুল-ত্রুটি আছে।
কেননা, প্রচারের সময় শুনি ও কিতাবাদী পাঠ করে আমরা বুঝি যে, উদার বন্ধন হচ্ছে দীনি সংহতি রক্ষা এবং অনুরূপ কিছু করা। আক্বীদার ব্যাপারে প্রকৃতপক্ষে এ আশঙ্কা থেকে যায় যে, আক্বীদা সঠিক আছে এ দলীল পেশ করে কেউ কেউ কতিপয় হারামকে হালালকরণের পথে পা বাড়ায়। কিন্তু হালাল ও হারামের ব্যাপারে পর্যালোচনার দৃষ্টিভঙ্গি থাকা আবশ্যক; যাতে কেন? এবং কিভাবে? প্রশ্নের সঠিক জবাব পাওয়া যায়। সারকথা হচ্ছে তাওহীদ ও আক্বীদা বিষয়ক পাঠ গ্রহণ করা ব্যক্তির উপর আবশ্যক। যাতে প্রকৃত উপাস্য ও মা'বুদ সম্পর্কে দূরদৃষ্টি বজায় থাকে এবং আল্লাহর নাম, গুণাবলী, তার কর্ম সমূহ, তার ঐচ্ছিক বিধান, শারঈ বিষয়, তার হিকমত (প্রজ্ঞা), তার শরী'আত ও সৃষ্টির গোপন রহস্য সম্পর্কে প্রমাণ ভিত্তিক জ্ঞান লাভ হয়। ফলে ব্যক্তি যেমন নিজে পথভ্রষ্ট হবে না অথবা অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবে না। আর তাওহীদের জ্ঞান হচ্ছে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ। একারণে আলিমগণ এ জ্ঞানকে (الفقه الأكبر) আল-ফিকহুল আকবার নামকরণ করেছেন। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
من يرد الله به خيرا يفقهه في الدين".
আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে দীনের জ্ঞান দান করেন। ১৫১৪
জ্ঞানের মধ্যে তাওহীদ ও আক্বীদা বিষয়ক জ্ঞানই উত্তম। কিন্তু কিভাবে জ্ঞান অর্জন করবে এবং কোথা থেকে তা গ্রহণ করবে এ ব্যাপারেও শিক্ষার্থীর মনোযোগ দেয়া আবশ্যক। তাই শিক্ষার্থী যেন প্রথমেই সন্দেহ মুক্ত সঠিক বিষয়ে জ্ঞানার্জন করে। অতঃপর দ্বিতীয়ত (সঠিকতা নির্ণয়ে) সে যেন উদ্ভুত বিদ'আত ও সন্দেহ যুক্ত বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করে। যাতে সঠিক আক্বীদা গ্রহণের দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিষয়ের আলোচনায় সচ্ছতা পাওয়া যায়। আর জ্ঞানার্জনের উৎস যেন হয় কুরআন এবং সুন্নাহ অতঃপর ছাহাবীগণের কথা-কর্ম, অতঃপর তাবেঈ ইমাম ও তাদের অনুসারীদের কথা এবং সবশেষে ইলম ও আমানতের
দিক থেকে নির্ভরযোগ্য-বিশ্বস্ত বিদ্বানগণের কথা। আর বিশেষ করে আল্লাহর পূর্ণ রহমত বর্ষিত হোক ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ ও তার ছাত্র ইবনুল কাইয়্যিম জাওজী (রহঃ) এর উপর এবং সকল মুসলিম ও তাদের ইমামগণের উপর।
৩. কতিপয় শারঈ জ্ঞানের শিক্ষার্থী জ্ঞান ও সনদপত্র উভয়টি অর্জনের মাঝে জটিলতা সৃষ্টি করছে। এ অবস্থা থেকে শিক্ষার্থী কিভাবে মুক্ত হতে পারে? জবাবে সম্মানিত শাইখ বলেন, এ ব্যাপারে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়,
প্রথম: কেবল সনদপত্র অর্জন করাই যেন শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যে না হয়। বরং সৃষ্টির উপকারে কাজের মাধ্যম হিসেবে শিক্ষার্থী এ সনদপত্র গ্রহণ করতে পারে। কেননা, বর্তমান যুগে কাজ-কর্ম সনদপত্রের উপর নির্ভরশীল। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ এ সনদপত্র ছাড়া সৃষ্টির উপকার সাধন করতে সক্ষম নয়। এ জন্য এক্ষেত্রে নিয়্যাত যেন বিশুদ্ধ থাকে।
দ্বিতীয়: যেসব শিক্ষার্থী ইলম অর্জন করতে চায় কিন্তু প্রতিষ্ঠান ছাড়া যদি ইলম অর্জনের কোন উৎস-ক্ষেত্র না পাওয়া যায় তাহলে সেক্ষেত্রে ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে তারা প্রতিষ্ঠানেই ভর্তি হবে। তারপর সনদপত্র অর্জন হওয়ায় এটা তার উপর খারাপ প্রভাব ফেলবে না।
তৃতীয়: মানুষ যদি পার্থিব কাজ-কর্ম ও আখেরাতের আমলের সৌন্দর্যতা বজায় রাখতে চায় তাহলে সাধারণত এক্ষেত্রে তার কোন মাধ্যমের দরকার হয় না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا} [الطلاق: ٢ ، ٣] .
যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্যে উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তার জন্যে যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেনই। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন (সূরা আত-ত্বলাক্ব ৬৫:২,৩)।
এটাই হচ্ছে পার্থিব কাজে তাক্বওয়ার উৎস। যদি বলা হয়, যে তার আমলের মাধ্যমে দুনিয়া পেতে চায় কি হিসেবে তাকে মুখলিছ (একনিষ্ঠ) বলা হবে?
জবাব হচ্ছে সে তার ইবাদতে একনিষ্ঠতা বজায় রাখবে। আর সে কেবল দুনিয়া পাওয়ার ইচ্ছা করবে না। তাই লোক দেখানো ও প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে যেন ইবাদত করা না হয়। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যমে ইবাদতের প্রতিদান পাওয়াই যেন মূল উদ্দেশ্যে হয়। যে আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয় তা দ্বারা লৌকিকতা প্রদর্শনকারী ব্যক্তি মানুষের সান্নিধ্য ও তাদের প্রশংসা লাভ করতে চাইলে তা ইবাদত বলে গণ্য হবে না। মূলত এরূপ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটলে ইবাদতে ইখলাছ (একনিষ্ঠতা) বিনষ্ট হয়। ফলে তা শিরকের শ্রেণীভুক্ত হয়ে যায় এবং যে কেবল আখেরাতের ইচ্ছা করে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না।
ইবাদত সম্পর্কীয় কথা বলার উদ্দেশ্যে হলো কতিপয় মানুষকে সতর্ক করা যারা ইবাদতের উপকারীতা নিয়ে কথা বলে অথচ তা পার্থিব স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে তারা ব্যবহার করে। যেমন: তারা বলে, জ্বলাতে রয়েছে শরীর চর্চা ও একতার শিক্ষা। আর ছিয়ামে রয়েছে অতিরিক্ত পানাহার বর্জন এবং পর্যাক্রমে ফরয-ওয়াজীব পালনের উপকারীতা। তারা পার্থিব উপকারীতাকেই আসল বলে গণ্য করে। অথচ শুধু পার্থিব উপকারীতা ইবাদতে ইখলাছ (একনিষ্ঠতা) বিনষ্ট এবং আখেরাতের প্রতি অমনোযোগিতা সৃষ্টি করে। তাই আল্লাহ তা'আলা তার কিতাবে ছিয়াম পালনের তাৎপর্য বর্ণনা করেন। অর্থাৎ ছিয়াম হচ্ছে তাক্বওয়া অর্জনের মাধ্যম। তাই দীনি উপকারীতা লাভ করাই মুখ্য উদ্দেশ্যে। পার্থিব উপকারীতা মুখ্য নয়। আমরা যখন জনসাধারণের সাথে কথা বলবো, তখন তাদের সামনে দীনি বিষয় তুলে ধরবো এবং যারা কেবল বস্তুবাদী বিষয় ছাড়া অন্য কিছুতে পরিতুষ্ট হয় না তাদের সামনে দীন ও দুনিয়া উভয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো এবং সবক্ষেত্রেই আমরা দীনি আলোচনাকে অগ্রাধীকার দিবো।
৪. সম্মানিত শাইখ (রহ.) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, অনেক শিক্ষার্থী (আহলুল মা'আছি) পাপাচারীদের সাথে কিরূপ আচরণ করা হবে এ নিয়ে মতভেদ করে এ সম্পর্কে আপনার সঠিক মত কি?
জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা বলবো, কতিপয় শিক্ষার্থী যখন দেখে যে, চরিত্র, চিন্তা-ভাবনা ও আমলগতভাবে কারো পদস্খলন হয়েছে, সেক্ষেত্রে তাকে তারা অপছন্দ করে আর এটাই ঐ ব্যক্তির প্রতি বিরূপভাব ও তার মাঝে দুরত্ব সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থীরা তাদেরকে সংশোধনের চেষ্টা করেন না। তবে মাশা'আল্লাহ যেসব শিক্ষার্থীর অন্তর আল্লাহ তা'আলা আলোকিত করেছেন, তারা
চেষ্টা করে, কতিপয় শিক্ষার্থী মনে করে চরিত্রহীন ব্যক্তিকে ত্যাগ করা, তার মাঝে দুরত্ব বজায় রাখা, তাকে দূরভিত করা মহৎ কাজ। কিন্তু নিঃসন্দেহে এটা ভুল। তাই তাদেরকে উপদেশ দেয়া, তাদের প্রতি খেয়াল রাখা শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক। যেসব মানুষ অবহেলায় দিন কাটায়, তাদেরকে উপদেশ দেয়া হলে কেউ কেউ উপদেশ গ্রহণ করে। যারা দাঈ তথা দাওয়াতপন্থী জামা'আত ও মুবাল্লিগ বলে পরিচিত তাদের দাওয়াত অধিক ফলপ্রসূ। মানুষ তাদের দাওয়াতে অধিক প্রভাবিত হয়। অনেক ফাসিক সঠিক পথের সন্ধান পেয়ে আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্য করছে, অনেক কাফির তাদের হাতে ইসলাম গ্রহণ করে হেদায়াত লাভ করেছে। কেননা দাঈগণ উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে মানুষকে বিমোহিত করে। এ জন্য আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যে, আল্লাহ তা'আলা আমাদের যেসব ভাইকে জ্ঞান দান করেছেন তিনি যেন তাদেরকে ঐসকল দাঈর মত উত্তম চরিত্রের অধিকারী করেন।
যেন তারা বেশি বেশি মানুষের উপকার করতে পারে। যদি হক্বপন্থী দাঈ ও মুবাল্লিগগণের দাওয়াত দানের পদ্ধতি কেউ গ্রহণ করে তাহলে দাঈ ও মুবাল্লিগগণের সংস্পর্শে থাকার কারণে প্রভাবিত হয়ে তারাও সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হয়। ফলে দাঈগণের মর্যাদা কেউ অস্বীকার করে না। শাইখ আব্দুল আজিজ ইবনে বায হাফিযাহুল্লাহর কিতাবে দেখেছি, দাঈগণের সমালোচনা করে এমন একজন ব্যক্তি সম্পর্কে উল্লেখ করে তিনি বলেন,
أقلوا عليهم لا أبا لأبيكم من اللوم ... أو سدوا المكان الذي سدوا
সন্দেহ নেই যে, দাঈর দাওয়াতে মানুষের সাড়া দানে উত্তম চরিত্র বৃহৎ প্রভাব বিস্তার করে। অপর দিকে দেখা যায়, কিছু দাঈ মানুষের মাঝে শরী'আত বিরোধী কিছু দেখলে তারা শরী'আতের বিধি-নিষেধ পালনের উপর তাদেরকে গালি দেয়, তিরক্ষিত করে। যেমন: দাড়ি ছেড়ে দেয়া নিয়ে তাদেরকে গালি-গালাজ করতে দেখা যায়। অবশ্য দাড়ি রাখা শরী'আতের আমল। অনুরূপভাবে কোন কাজে ছাওয়াবের কমতি ও (অহংকার বশত) খালি পায়ে হাঁটার বিষয়কে কেন্দ্র করেও তারা গালি-গালাজ করে। কিন্তু কেন? এটাতো মানুষের সাথে সদাচরণ নয়। এমনটি যারা করে তারাতো উত্তম চরিত্রের দিকে মানুষকে দাওয়াত দেয় না। তারা মূলত অসদাচরণ ও কঠোরতার দিকেই দাওয়াত দেয়। আর তারা চায়, সবাই একবারেই সংশোধন হোক। এটাই ভুল পন্থা। একবারে কোন মানুষের সংশোধন হওয়া কখনোই সম্ভব নয়। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম কি মক্কায় তের বছর অবস্থান করে দাওয়াত দেননি? পরিশেষে ষড়যন্ত্র করে তাকে মক্কা থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ} [الأنفال: ٣٠] .
যখন কাফিররা তোমাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছিল, তোমাকে বন্দী করতে অথবা তোমাকে হত্যা করতে কিংবা তোমাকে বের করে দিতে (সূরা আনফাল ৮:৩০)।
يثبتوك অর্থাৎ তোমাকে আটক করতে অথবা হত্যা করতে কিংবা বের করে দিতে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ} [الأنفال: ٣٠]
তারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহও ষড়যন্ত্র করেন। আর আল্লাহ হচ্ছেন ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে উত্তম (সূরা আল আনফাল ৮:৩০)।
সুতরাং বুঝা গেল, শুধু একবার অথবা দু'বার দাওয়াত দিয়ে মানুষের চরিত্র সংশোধন করা সম্ভব নয়। বিশেষত এভাবে দাওয়াত দানের কোন মূল্যায়ন হবে না। তবে ধৈর্য, হৃদ্যতা, প্রজ্ঞা ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে দাওয়াত ফলপ্রসূ হয়। শীঘ্রই এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত আলোচনা করা।
সন্দেহ নেই যে, উত্তম কথায় পূর্ণপ্রভাব বিদ্যমান। কথিত আছে যে, আহলে হিসবাহর জনৈক ব্যক্তি এক কৃষকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল যার উট ছিল উৎফুল্ল। এটা ছিল মাগরিবের আযানের সময়। কৃষক তখন গান করছিল। যখন উটটি গান শুনতে পেল তখন সেটা পাগলের মত চলতে আরম্ভ করলো। কেননা, সে আনন্দচিত্তে অন্য কিছু থেকে অমনোযোগী হয়ে গান করছিল, সে আযান শুনছিল না। অতঃপর হিসবাহর লোকটি তার ব্যাপারে খুব কঠোর ভাষা ব্যবহার করত (রাগ করে বললো), কে উটের মালিক; শীঘ্রই আমি অব্যাহতভাবে গান গাইতে থাকবো। আমার লাঠির জোর আছে কিনা আমি দেখে নিবো। এ বলে তার প্রতি সে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলো। অতঃপর (আযানের সময় গান করার) বিষয়কে কেন্দ্র করে সে বিচারকের কাছে গিয়ে বললো, আমি কৃষকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, এমতাবস্থায় আমি শুনছিলাম যে, মাগরিবের আযানের সময় সে তার উটকে গান শুনাচ্ছিল, এ ব্যাপারে আমি তাকে উপদেশ দেই (গান করতে নিষেধ করি) কিন্তু সে তা গ্রহণ করেনি। অতঃপর পরের দিন বিচারক নিজে ঐ
সময়ে উটের মালিকের জায়গায় গেলেন। অতঃপর আযান হলে কৃষক এসে তাকে (হিসবার লোককে) বললো, হে ভাই! আযান হয়েছে। এখন তোমার জ্বলাত আদায় করতে যাওয়া উচিত। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى} [طه: ۱۳۲]
এবং তোমার পরিবার-পরিজনকে সালাত আদায়ে আদেশ দাও এবং নিজেও তার উপর অবিচল থাক। আমি তোমার কাছে কোন রিযক চাই না। আমিই তোমাকে রিযক দেই আর শুভ পরিণাম তো মুত্তাকীদের জন্য (সূরা ত্ব-হা ২০:১৩২)।
এরপর উটের মালিক جزاك الله خير বলে দু'আ করলো, অতঃপর সে উটের চাবুক রেখে উযূ করে তাদের সাথে জ্বলাতে অংশ গ্রহণ করলো। এখান থেকে কি বুঝা গেল? এখানে প্রথম কথা হচ্ছে, যদি তার থেকে দূরে থাকা হতো তাহলে অবশ্যই সে মন্দ পথ বেছে নিতো এবং কল্যাণকর কাজ ছেড়ে দিতো। দ্বিতীয়ত তার সাথে সদাচরণের কারণে সে পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করেছে। এ জন্য আমি বলবো, কতিপয় শিক্ষার্থীর আত্মসম্মান আছে কিন্তু তারা ভাল আচরণ করতে জানে না। মানুষের উচিত যে, সে তার জ্ঞান, দূরদর্শিতা এবং বড় মর্যাদাপূর্ণ প্রজ্ঞা ব্যবহার করে সদাচরণ করবে। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন সকলকে কল্যাণমূলক কাজের তাওফীক দান করেন। সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই।
৫. সম্মানিত শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, জ্ঞানের ধারকবাহক আলিমদেরকে গুরুত্ব দেয়া ব্যতীরেকে কতিপয় শিক্ষার্থী অন্য শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে তাদের কাছ থেকে পাঠ গ্রহণ করে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি?
জবাবে তিনি বলেন, আমি মনে করি, শিক্ষার্থীর উচিত, দক্ষ আলিমের কাছে জ্ঞানার্জন করা। কেননা, কতিপয় শিক্ষার্থী পাঠ দানে পারদর্শী এবং হাদীছ অথবা ফিক্বহ কিংবা আক্বীদার বিষয়ে তারা কোন মাসআলা পর্যালোচনা পূর্বক পূর্ণবিশ্লেষণ করতে পারে। তরুণ শ্রেণীর কেউ এ পর্যালোচনা শুনলে ঐ শিক্ষার্থীকে সে বড় আলিম মনে করে, যদিও ঐ শিক্ষার্থী এসব বিষয়ের সামান্যই বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও পরিমার্জন করতে সক্ষম। মূলত তার কাছে কোন জ্ঞান
নেই। একারণে প্রথম পর্যায়ের শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক হচ্ছে নির্ভরশীল আলিমদের জ্ঞান, আমানত ও দীন অনুযায়ী তাদের কাছে থেকে জ্ঞানার্জন করা।
৬. সম্মানিত শাইখ (রহিমাহুল্লাহ) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মন্তব্য করা হয় যে, শিক্ষার্থীর মাঝে সক্ষমতা কম এবং তাদের মাঝে দুর্বলতা রয়েছে। বিদ্যার্জনে অধিক সক্ষম হওয়ার প্রতি উৎসাহ প্রদানে কোন কোন মাধ্যম ও পন্থা রয়েছে?
জবাবে তিনি বলেন, শারঈ জ্ঞানের শিক্ষার্থীর মাঝে সাহসের দুর্বলতা একটি বড় সমস্যা। এ ব্যাপারে কয়েকটি বিষয় আবশ্যক।
প্রথম: বিদ্যার্জনে আল্লাহর প্রতি একনিষ্টতা বজায় রাখা। মানুষ যখন জ্ঞানার্জনে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা বজায় রাখবে এবং বুঝতে সক্ষম হবে যে, জ্ঞানার্জনে ছাওয়াব রয়েছে। অচিরেই সে তৃতীয় স্তরের মর্যাদায় উন্নিত হবে। কারণ তার সক্ষমতা তাকে উৎসাহী করে তুলবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصَّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيقًا} [النساء: ٦৯]
আর যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে তারা তাদের সাথে থাকবে, আল্লাহ যাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে। আর সাথী হিসেবে তারা হবে উত্তম (সূরা আন নিসা ৪:৬৯)।
দ্বিতীয়: এমন সহচর্য গ্রহণ করা আবশ্যক যারা তাদেরকে বিদ্যার্জনে উৎসাহ দিবে এবং আলোচনা ও পর্যালোচনায় তারা তাকে সহযোগিতা করবে। আর যতক্ষণ তারা বিদ্যার্জনে সহযোগিতা করবে সে তাদের সহচর্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে না।
তৃতীয়: নিজেকে ধৈর্যের জালে আবদ্ধ রাখতে হবে, যদিও অন্তর বিদ্যার্জন হতে বিমুখ হতে চায়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِي يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا} [الكهফ: ٢٨]
তুমি নিজকে ধৈর্যশীল রাখ তাদের সাথে, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের রবকে ডাকে, তার সন্তুষ্টির উদ্দেশে এবং দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে (সূরা আল কাহাফ ১৮:২৮)।
মোট কথা, শিক্ষার্থী যেন ধৈর্য ধারণ করে, তারা ধৈর্য ধারণের দিকে ফিরে আসলে তখনই তাদের জ্ঞানার্জন সার্থক হবে। আর বিদ্যার্জন না করা হলে সময় হবে দীর্ঘ। কিন্তু নিজেকে সাহায্যে করলে এরূপ হবে না। আর নাফসে আম্মারা তথা কু-প্রবৃত্তি খারাপ-গর্হিত কাজের দিকে ঠেলে দিয়ে মানুষকে অলস করে তুলে এবং বিদ্যার্জন না করার প্রতি উৎসাহ দেয়।
৭. সম্মানি শাইখ (রহিমাহুল্লাহ) এর নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কোন মাসআলা নিজের মতাদর্শের অনুকূলে হওয়া কিংবা না হওয়ার দিক থেকে যারা তাদের ভাইয়ের সাথে বন্ধুত্ব বজায় রাখে অথবা শত্রুতা করে এবং অনুরূপভাবে শিক্ষার্থীর মাঝেও হিংসা-বিদ্বেষ রয়েছে তাদের ব্যাপারে আপনার মত কি?
জবাবে তিনি বলেন, এটা ঠিক যে, কতিপয় শিক্ষার্থী তাদের মাসআলা অনুকূলে হওয়া বা না হওয়ার দিক দিয়ে তারা বন্ধুত্ব ও শত্রুতা নির্ধারণ করে। দেখা যায়, তাদের কাছ কিছু মানুষ মাসআলা জেনে নেয়, কেননা, ঐ মাসআলা তাদের অনুকূলে হয়েছে ফলে তাদের সাথে বন্ধুত্ব হয়। আর কতিপয় মানুষ ঐ মাসআলার বিরোধিতা করে ফলে তাদের সাথে শত্রুতা সৃষ্টি হয়। আফ্রিকার অধিবাসী দু'দলের মাঝে মিনায় ঘটে যাওয়া একটি কাহিনী তোমাদের সামনে পেশ করবো; যারা একে অপরকে অভিশম্পাত করে এবং কাফির বলে আখ্যা দেয়। ঝগড়ারত অবস্থায় তাদেরকে আমাদের সামনে নিয়ে আসা হলো। আমরা বললাম, কি হয়েছে? প্রথম দল বললো, এ লোক জ্বলাতে দাঁড়িয়ে তার ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর হাত বেধেছে। এটাতো সুন্নাহ বিরোধী কুফরী কাজ। অপর দল বললো, এ লোক জ্বলাতে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা ব্যতীরেকেই তার দু'হাত উরুর উপর রেখেছে যা কুফরী বলে গণ্য। কেননা, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, من رغب عن سنتي فليس مني"
যে আমার সুন্নাহ থেকে বিমুখ হয় সে আমার উম্মত নয়। ১৫২।
এটা সুন্নাহ বিষয়ক মাসআলা, যা ওয়াজীব নয়, জ্বলাতের রুকন নয় এবং জ্বলাত বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য তা শর্তও নয়। তা জানা সত্ত্বেও এভাবে তারা একে অপরকে কাফির বলে আখ্যা দেয়। অনেক প্রচেষ্টা-পরিশ্রমের পর তারা আমাদের সামনে এক মত হয়েছে। আমাদের মত সম্পর্কে আল্লাহই ভাল জানেন। বর্তমানে দেখা যায়, কিছু ভাই ক্ষোপের সাথে তার অপর ভাইকে ঐসব নাস্তিকদের চেয়ে বেশি
মিথ্যাপ্রতিপন্ন করে যাদের কুফরী স্পষ্ট। তারা নাস্তিকদের চেয়ে তাদের সাথে বেশি শত্রুতা পোষণ করে, তাদের কথায় নিন্দা জ্ঞাপন করে যার কোন মূলই নেই, বাস্তবতা নেই। কিন্তু এর মাধ্যমে হিংসা ও বাড়াবাড়িই করা হয়। নিঃসন্দেহে হিংসা ইয়াহূদীদের চরিত্র। হিংসুক আল্লাহর নিকৃষ্ট বান্দার মধ্যে গণ্য। হিংসুক তার হিংসা থেকে উপকার লাভ করতে পারে না। এটা কেবল বিষন্নতা ও দুঃখ বৃদ্ধি করে। তাই অন্যের কল্যাণ কামনা কর; তোমার কল্যাণ হবে। জেনে রেখো, আল্লাহ যাকে চান তাকেই তিনি অনুগ্রহ করেন। তুমি যদি বিদ্বেষ পোষণ করো তবুও আল্লাহর অনুগ্রহ ঠেকাতে পারবে না। অন্যের উপর অনুগ্রহ না হোক এ মন্দ কামনাই কখনো তোমার উপর আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতিবন্ধক হয় এবং অন্যের প্রতি তোমার অপছন্দনীয়তা থাকার কারণে তার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষণ হয়।
এ কারণে হিংসুক বিদ্যার্জনে শিক্ষার্থীর নিয়্যাত ও একনিষ্ঠতায় সন্দেহের সৃষ্টি করে। হিংসুক মানুষের কাছে মর্যাদা পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীর সাথে হিংসা করে। শিক্ষার্থীর জ্ঞানের কথায় মানুষ তার কাছে আসে এজন্য হিংসুক তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, যাতে দুনিয়ায় তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। সত্যই যদি সে আখিরাত কামনা করতো, প্রকৃত পক্ষে ইলম অর্জন করতে চাইতো, তাহলে অবশ্যই সে ঐ জ্ঞানী লোকের কাছে জেনে নিতো যার কাছে মানুষ জ্ঞানের কথা জেনে নেয়। এরূপ করলে সেও তার মতো হতো। জ্ঞানের কথা জেনে শিক্ষার্থীর উপকৃত হওয়া উচিত। অপরদিকে যদি জ্ঞানী লোকের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা হয়, তার নিন্দাজ্ঞাপন ও দোষ-ত্রুটি তুলে ধরা হয় যা তার মাঝে নেই; তাহলে এটা নিঃসন্দেহে বাড়াবাড়ি, শত্রুতা ও নিকৃষ্ট স্বভাব বলে গণ্য হবে।
৮. সম্মানিত শাইখ (রহিমাহুল্লাহ) এর নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, বাগদাদের খতিব ইলম অর্জনের ব্যাপারে একটি বিষয় তুলে ধরেন, তা হচ্ছে কেবল আলিম অথবা শাইখদের কারো থেকে ইলম অর্জন করা আবশ্যক এ সম্পর্কে আপনার মত কি?
জবাবে তিনি বলেন, এটা ভাল যে, মানুষ বিশস্ত শাইখদের কাউকে কেন্দ্র করে ইলম অর্জন করবে। বিশেষত প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য। প্রাথমিক পর্যায়ের নীচের স্তরের শিক্ষার্থী বিভিন্ন মানুষের কাছে ইলম অর্জন করতে গিয়ে তারা হয় দোদুল্যমান। কারণ মানুষ বিশেষত বর্তমান যুগে কোন বিষয়ে একটি সিন্ধান্ত মেনে নিতে চায় না। কয়েক যুগ আগেও মানুষ তাদের দেশের আলিমদের নিকট থেকে সর্বদা সন্তুষ্ট চিত্তে চূড়ান্ত পর্যায়ের ফাতওয়া গ্রহণ
করতো। কারণ ঐ সকল আলিমের ফাতওয়া ও ব্যাখ্যা ছিল একই ধরনের। অবহিত করণ ও উত্তম পন্থা ব্যতীরেকে কেউ কারো বিরুদ্ধে মতভেদে লিপ্ত হতো না। কিন্তু এখন কেউ একটি অথবা দু'টি হাদীছ মুখস্থ করে বলে আমি অমুক ইমামের অনুসারী ই। ইমাম আহমদ (রহঃ) মানুষ ছিলেন, আমরাও মানুষ। এ অজুহাতে মাসআলায় ভিন্নতা সৃষ্টি হয়। প্রত্যেকেই কখনো কখনো নিজের মত ফাতওয়া দিতে শুরু করে, ফলে ফাতওয়া হয় গোলকধাধা। আমি এ ধরনের গোলযোগপূর্ণ ফাতওয়া লিপিবদ্ধ করতে গুরুত্বারোপ করেছি কিন্তু যার অনুসরণ করা হয় তার গোপনীয়তা প্রকাশের আশঙ্কা করছি। তাই সতর্কতামূলক এ বর্ণনা ছেড়ে দিয়েছি। আলিমদের কেউ এমন বিষয়ের বর্ণনা করেছেন যা সঠিক বিষয়ের সাথে সম্পর্কহীন।
আমি বলবো, শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় প্রথমত একজন আলিমের শরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যাতে শিক্ষার্থী দোদুল্যমান অবস্থার মুখোমুখী না হয়। এ জন্য মুগনি, শারহুল মুহায্যাব এবং যেসব কিতাবে অনেক মতামত উল্লেখ আছে আমাদের শাইখগণ ছাত্র অবস্থায় ঐ সব কিতাব পাঠ না করার পরামর্শ দেন। আমাদের কতিপয় শাইখ উল্লেখ করেন যে, শাইখ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান (রহঃ) শাইখদের মধ্যে বড় মাপের নজদী মুফতি। তারা উল্লেখ করেন যে, তিনিই আর রাওযুল মুরব্বি অধ্যয়নে ছিলেন নিবেদিত-মনোযোগী। তিনি তা পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি এর সারকথা পুনরায় উল্লেখ করেন। তাৎপর্য, বক্তব্য, ইশারা এবং ইবারতকে (মূল রচনা) তিনি গ্রহণ করেন। যা অনেক কল্যাণকর। মানুষ বিস্তারিত জানতে চাইলে তার উচিত হবে, আলিমদের কথা নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা। যাতে জ্ঞানগত ও সামঞ্জস্য বিধানের উপকারীতা লাভ হয়। এ ক্ষেত্রে জ্ঞানার্জনের প্রথম পর্যায়ে কোন একজন শাইখের শরণাপন্ন হওয়ার জন্য আমি শিক্ষার্থীকে পরামর্শ দিবো; যাতে ঐ শিক্ষার্থী (মাসআলা-মাসায়েলের ব্যাপারে) সীমা অতিক্রম না করে।
৯. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষার্থী যদি এমন হাদীছ বর্ণনা করার ইচ্ছা করে যা ইবনে হদীর কিতাবুল মুহরর অথবা বুলুগুল মারাম হতে অতিরিক্ত। এ ধরনের বর্ণনা পদ্ধতিতে কোন উপকার আছে কি?
শাইখ জবাবে বলেন, এ পদ্ধতি অনুসরণে কোন ফায়েদা নেই। এটা একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি মাত্র। মূলত ব্যাপক পরিসরে প্রচলিত প্রসিদ্ধ কিতাবাদী অধ্যয়ন করা উত্তম।
১০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইবনে হাদীর কিতাবুল মুহারার কি বুলুগুল মারামের চেয়ে উত্তম নয় কি?
শাইখ জবাবে বলেন, بلوغ المرام কিতাবটি প্রচলিত। এ কিতাবের সংকলক একজন ব্যাখ্যাকার। আর অন্য কিছুর চেয়ে প্রচলিত কোন বিষয়ে মানুষের মনোযোগ বেশি হওয়াই যেন অত্যাবশ্যক। কেননা, অনেকেই ছেড়ে দেয়া-বর্জিত কোন বিষয়ের মাধ্যমে উপকৃত হয় না। যেমন জ্ঞাতব্য যে, বুলুগুল মারাম কিতাবটি হতে মানুষ উপকৃত হয়। আমাদের আলিম ও শাইখগণ এ কিতাবটি পাঠ করেন।
১১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইবনে ওয়াজির উল্লেখ করেন যে, ছাহাবী আবু বকর, উমার ও উছমান (রাঃ) তারা সকলে কুরআন সংরক্ষণ করেননি। অনুরূপভাবে ইমামগণ হতে বর্ণিত আছে যে, উছমান ইবনু আবি শাইবা (রহঃ) কুরআন সংরক্ষণ করেননি। কতিপয় শিক্ষার্থী বলে, আল্লাহর কিতাব সম্পূর্ণ মুখস্থ না করলে চলবে ঐ বিষয়েই তারা পরামর্শ দেয়, এটা কি ঠিক?
জবাবে শাইখ বলেন, আমি মনে করি, আবু বকর, উমার, উছমান ও আলী (রাঃ) এ সকল মর্যাদাবান ছাহাবী আল্লাহর কিতাব সংরক্ষণ করেননি এ কথাটি অপ্রচলিত। জেনে রাখতে হবে যে, আবূ বকর, উছমান (রাঃ) এর যুগে কুরআন একত্রিত করা হয়েছে। তারা কুরআন একত্রিত করেছেন অথচ তারাই কুরআন সংরক্ষণ করেননি? এ কথাটি খুবই অপ্রচলিত। কিন্তু এ কথাটি যার মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে প্রথমত তার সনদ সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করতে হবে। যদি সনদ জ্বহীহ প্রমাণিত হয়, তাহলে আমরা বলবো, সমালোচনা করে এ কথা যারা বলে যে, ঐ সকল ছাহাবী কুরআন সংরক্ষণ করেননি তারা মূলত কিছুই জানে না। ছাহাবীগণ কুরআন সংরক্ষণ করেননি এ কথাটি অত্যন্ত অপ্রচলিত-দূর্বোধ্য। আর কুরআন (সম্পূর্ণ) মুখস্থ করা হতে কাউকে বিরত থাকা বলা উচিত নয়।
১২. আমি সম্মানিত শাইখের নিকট শারঈ বিভিন্ন ইলম অর্জনের সঠিক মানহাজ-পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা আশা করছি, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন, আপনাকে ক্ষমা করুন। জবাবে শাইখ বলেন, শারঈ জ্ঞান কয়েক প্রকার: তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে,
ক. علم التفسير : শিক্ষার্থীর উচিত আল্লাহর কিতাব সংরক্ষণে ছাহাবীদের অনুসরণ পূর্বক তাফসীরের জ্ঞান লাভ করা। এ ক্ষেত্রে তারা কমপক্ষে দশটি আয়াত না শিখা পর্যন্ত সীমা অতিক্রম করবে না। তাই আয়াত সম্পর্কে জ্ঞান ও আমল উভয়টি থাকা বাঞ্ছনীয়। যাতে কুরআনের শব্দাবলী সংরক্ষণে অর্থের সম্পর্ক (যথার্থতা) ঠিক থাকে। তাই মানুষ মনোযোগ সহকারে কুরআন তিলাওয়াত করলে তা হয় যথাযথ তিলাওয়াত।
খ. علم السنة: শুরুতেই জ্বহীহ হাদীছের জ্ঞানার্জন করবে। আর ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রঃ) যে হাদীছের ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন তা অধিক বিশুদ্ধ। তবে সুন্নাহর জ্ঞানার্জন দু'ভাবে হয়।
প্রথম পর্যায় মানুষ শারঈ বিধি-বিধান জানার ইচ্ছা করে হোক তা আক্বাঈদ ও তাওহীদের জ্ঞান। অথবা দ্বিতীয় পর্যায় আমলগত বিধি-বিধান জানার ইচ্ছা করে। এ বিষয়ে জ্ঞানার্জনের জন্য রচিত কিতাবাদী অধ্যয়ন করেই ঐ জ্ঞান সংরক্ষণ করা উচিত। যেমন, বুলুগুল মারাম , উমদাতুল আহকাম , শাইখ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব রচিত كتاب التوحيد এবং অনুরূপ অন্যান্য কিতাব। মূল কিতাবাদী পর্যালোচনা ও পাঠ করার মাধ্যমেই অবশিষ্ট থাকবে। এভাবেই তা সংরক্ষিত হবে এবং পঠন হতে থাকবে হবে। আর এতে চিন্তা-গবেষণাও হবে বেশি। কেননা, এখানে দু'টি বিষয়ে উপকারীতা লাভ হয়।
প্রথম: উছুলের দিকে প্রত্যাবর্তন।
দ্বিতীয়: রাবীদের নাম বারবার স্বরণ হওয়া। হাদীছ পঠনের মধ্যে দিয়ে রাবীগণের নাম বারবার স্বরণ হওয়ায় হাদীছ পাঠকারী বুখারীতে বর্ণিত হাদীছের সনদ এড়িয়ে যেতে পারবে না। তথা বুখারীতে বর্ণিত হাদীছের সনদ বুঝতে সে সক্ষম হবে। এভাবেই ঐ পাঠকারীর হাদীছ পঠনগত উপকারীতা লাভ হয়।
গ. علم العقائد এ বিষয়ের অনেক কিতাব রয়েছে। আমি মনে করি, বর্তমানে এ কিতাবাদী পঠনে অনেক সময় ব্যয় হয়। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম জাওজী (রঃ) ও আমাদের আলিমদের মধ্যে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব এবং (তার সমপর্যায়) পরবর্তী আলিমগণ এ সম্পর্কে যে সার-সংক্ষেপ কিতাব রচনা করেছেন তা পঠনের মাঝেই উপকার নিহিত আছে।
ঘ. علم الفقه সন্দেহ নেই যে, মানুষের উচিত কোন একটি মাযহাবকে কেন্দ্র করে তার উছুল ও কায়েদা সমূহ সংরক্ষণ করা। কিন্তু এ অর্থ নয় যে, এ মাযহাবের ইমাম যা বলেছেন তা মেনে নেয়া আমাদের জন্য আবশ্যক।
নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলেছেন তা মেনে নেয়াই আমাদের জন্য আবশ্যক। কিন্তু এর উপর ভিত্তি করেই ফিক্বহের উৎপত্তি হয়।
অন্য মাযহাবের জ্বহীহ দলীল পাওয়া গেলে তা গ্রহণ করতে হবে। এর উপর ভিত্তি করেই ইমামগণ যেমন ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইমাম নববী (র.) এবং অন্যান্য আলিম মাযহাবের অনুসরণ করতেন। এভাবেই ফিক্বহের মূল ভিত্তি গঠিত হয়। কেননা, আমি মনে করি, শারঈ বিধি-বিধান সম্পর্কে আলিমগণের রচিত কিতাব অধ্যয়ন ব্যতীরেকে যারা হাদীছ গ্রহণ করেন, তাদের মাঝে থাকে সিদ্ধান্তহীনতা যদিও তারা হাদীছের জ্ঞানে অধিকতর যোগ্য-শক্তিশালী। কিন্তু ফিক্বহ না বুঝার কারণে থেকে যায় সিন্ধান্তহীনতা। কেননা, ফক্বীহগণের কথা থেকে তারা রয়েছে বিচ্ছিন্ন-দূরতম অবস্থানে।
তাদের মাসআলায় দুর্বোধ্যতা লক্ষ্য করা যায়। ঐ মাসআলা ইজমা বিরোধী কিনা তা নিশ্চিত নয় অথবা এ ধারণা নিশ্চিত হতে পারে যে, তা ইজমা বিরোধী। একারণে মানুষের উচিত হবে ফক্বীহগণের রচিত কিতাবাদীর সাথে সম্পর্ক রেখে মাসআলা গ্রহণ করা। এর অর্থ এটা নয় যে, আবশ্যক মনে করে কোন মাযহাবের ইমামকে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মত নির্ধারণ করত তার কথা ও কর্মকে গ্রহণ করতে হবে। বরং এর মাধ্যমে দলীল গ্রহণ করতে হবে এবং এটা কায়েদা-পন্থা বলে গণ্য হবে। কোন মাযহাবে সঠিক কথা পাওয়া গেলে তা গ্রহণ করা আবশ্যক; এতে কোন আপত্তি নেই। ইমাম আহমাদ (রহঃ) এর মাযহাবের অধিকাংশ কথাই সঠিক। তার মাযহাবকে নির্দিষ্ট কোন বলে মনেই হবে না। মাযহাবের কোন বিষয়ে দু'টি বর্ণনা আছে এমন কিতাব তিনি অনুসরণ করতেন। দেখা যায়, দলীলের সাথে ইমাম আহমাদ (রহঃ) কথার সঙ্গতি থাকলেই তিনি তা মাযহাব মনে করতেন। তিনি কোন বিষয় বিস্তারিত অনুসন্ধান করতেন এবং হক্ব যেখানেই থাক তার দিকে তিনি অগ্রগামী হতেন। আমি মনে করি, মানুষ (শিক্ষার ক্ষেত্রে) কোন একটি মাযহাবকে কেন্দ্র করবে যা সে পছন্দ করে। আর আমাদের জানা মতে, সুন্নাহর অনুসরণের দিক থেকে ইমাম আহমাদ (রহঃ) এর মাযহাবই উত্তম। আর অন্যান্য মাযহাব সুন্নাতের অধিক নিকটবর্তী। এ বিষয়ে বলা হয়েছে। দেখা যায়, ইমাম আহমাদ (রহঃ) এর মাযহাব (কুরআন-সুন্নাহর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়ায়) তা উপযোগী। চিন্তা-গবেষণা ও
অধ্যয়ন করে ফক্বীহ হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর মানহাজ-পদ্ধতি প্রসঙ্গে তার মাযহাবে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও নিহিত আছে। অর্থাৎ শারঈ বিধান, তার প্রভাব-ফলাফল ও তাৎপর্য সম্পর্কে বুঝা যাবে। আর যা জানা আছে তার মাধ্যমে সাধ্য অনুযায়ী সমতা বিধান করা সম্ভব হবে। এ মর্মে আল্লাহ ত'আলা বলেন, {لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا} [البقرة: ٢٨٦] .
আল্লাহ তা'আলা কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না (সূরা আল-বাক্বারা ২:২৮৬)।
এখানে সক্ষমতা বজায় রেখে সামঞ্জস্য বিধানের উপর উৎসাহিত করা হয়েছে। আমি শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যে "التطبيق" )সমতা বিধান) বিষয়টি সর্বদাই পুনরাবৃত্তি করি হোক তা ইবাদত অথবা চরিত্র কিংবা আদান-প্রদান সম্পর্কিত। হে শিক্ষার্থী! তুমি সমন্বয় সাধন করতে শিখো যাতে বুঝা যায়, তোমার জানা বিষয়ে তুমি আমলকারী শিক্ষার্থী।
আমরা একটা উদাহরণ পেশ করবো, যখন তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে তখন তাকে সালাম দেয়া শরী'আত সম্মত হবে কি?
জবাব হচ্ছে, হ্যাঁ, শরী'আত সম্মত। কিন্তু আমি অনেককে দেখি যে, যখন কেউ তার ভাইয়ের পাশ দিয়ে যায়, মনে যেন সে একটা খুঁটির পাশ দিয়ে যাচ্ছে; সে তাকে সালাম দেয় না। অথচ এটা মারাত্মক ভুল। জনসাধারণের ব্যাপারে এধরনের সমালোচনা করা গেলে ছাত্রদের ক্ষেত্রে কেন করা যাবে না? السلام عليكم কথাটি বলতে ছাত্রদের অসুবিধা কি? অনেকেই ছাত্রদের কাছে আসে, তাদেরকে সালাম দিলে দশগুণ বেশি প্রতিদান পাওয়া যায়। দুনিয়ার সকল ভাল কাজের জন্য দশগুণ বেশি প্রতিদান পাওয়া যায়। যদি মানুষকে উৎসাহমূলক বলা হয়, যে কেউ তার ভাইয়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাকে সালাম দিলে সালাম প্রদানকারী ব্যক্তিকে কয়েক রিয়াল দেয়া হবে। তাহলে অবশ্যই দেখা যাবে, সালাম প্রদানকারীকে সালাম দেয়ার জন্য (রিয়াল পাওয়ার উদ্দেশ্যে) মানুষ বাজারে তাকে খুজছে। কিন্তু আমরা দশগুণ প্রতিদান পাওয়ার ক্ষেত্রে শৈথিল্যতা দেখাই-অবহেলা করি। আল্লাহই প্রকৃত সাহায্যেকারী।
অন্যান্য উপকারীতা: মানুষের মাঝে ভালোবাসা ও হৃদ্যতা সৃষ্টি হওয়া। ভালোবাসা ও হৃদ্যতা বজায় রাখা, তা সুদৃঢ় করা ও অব্যাহত রাখার ব্যাপারে অনেক দলীল রয়েছে। আর ভালোবাসা ও হৃদ্যতা বিরোধী বিষয় থেকে বিরত
থাকতে হবে। ভালোবাসা ও হৃদ্যতা বিরোধী অনেক বিষয় আছে। যেমন: ক্রয়- বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কারো দরদামে দরকষাকষি করা। কোন মুসলিমের বিবাহ প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব দেয়া। অনুরূপ অন্যান্য বিষয়। এ ধরনের প্রত্যেক শত্রুতা ও বিদ্বেষকে দমন করে ভালোবাসা ও হৃদ্যতা বজায় রাখতে হবে। এখানেই রয়েছে ঈমানের বাস্তবতা। এ প্রসঙ্গে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
" والله لا تدخلوا الجنة حتى تؤمنوا ولا تؤمنوا حتى تحابوا".
আল্লাহর শপথ! তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা ঈমান করো এবং পরস্পরকে ভালোবাসো। ১৫৩
জ্ঞাতব্য যে, আমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছতে ভালোবাসে, তার ঐ সম্মান ঈমান বাস্তবায়নের মধ্যে নিহিত। কেননা, আমাদের শারীরিক আমল খুবই কম এবং দুর্বল। জ্বলাত আদায় করলে তা অতিত হয়ে যায়, অনুরূপ ছিয়াম পালন ও দান-ছাদাক্বাও গত হয়। অথচ আমরা এসব ইবাদত থেকে অন্য কিছু অর্জন করি। এসব আমল সম্পর্কে আল্লাহই অধিক জানেন। আমাদের এসব আমলের দিক থেকে আমরা দুর্বল। আমাদের ঈমান শক্তিশালী করা দরকার। আর সালাম প্রদানের মাধ্যমে ঈমান শক্তিশালী হয়। কেননা, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"লা تدخلوا الجنة حتى تؤمنوا ولا تؤمنوا حتى تحابوا أفلا أخبركم بشيء إذ فعلتموه تحاببتم يعني حصل لكم الإيمان أفشوا السلام بينكم"
আল্লাহর শপথ! তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা ঈমান করো এবং পরস্পরকে ভালোবাসো। আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয় সম্পর্কে সংবাদ দিবো না যখন তোমরা তা করবে তোমাদের পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ তোমাদের ঈমান অর্জন হবে। তোমরা বেশি বেশি সালাম প্রদানে অভ্যস্ত হও। [৫৪]
আমরা যা জানলাম তা একটি মাত্র বিষয়। কিন্তু এ বিষয়ে আমরা অনেক কিছুই লঙ্ঘন করি। এ জন্য আমি বলি, আমরা যা জেনেছি তা সমন্বয় সাধনের জন্য আল্লাহ তা'আলার কাছে এ কামনা করছি তিনি যেন আমাকে এবং তোমাদের সকলকে এ ব্যাপারে সাহায্যে করেন। কেননা, আমরা জানি অনেক কিছু আমল করি কম। হে আমার শিক্ষার্থী ভাইগণ! ইলম অর্জন, তদানুযায়ী আমল এবং এর মাঝে সমন্বয় সাধন সবই তোমাদের উর আবশ্যক। ইলম হচ্ছে দলীল-প্রমাণ স্বরূপ। যখন ইলম অনুযায়ী আমল করবে তখন তা বৃদ্ধি পাবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَالَّذِينَ اهْتَدَوْا زَادَهُمْ هُدًى وَآتَاهُمْ تَقْواهُمْ} [محمد: ۱۷] .
যারা হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছে আল্লাহ তাদের হেদায়াত প্রাপ্তি আরো বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে তাদের তাক্বওয়া প্রদান করেন (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৭)।
বুঝা গেল, তোমরা ইলম অনুযায়ী আমল করলে তোমাদের আলো ও দলীল বৃদ্ধি পাবে। এ মর্মে আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَتَّقُوا اللهَ يَجْعَلْ لَكُمْ فُرْقَانًا ويُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ} [الأنفال: ٢٩] .
হে মুমিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তাহলে তিনি তোমাদের জন্য ফুরকান প্রদান করবেন, তোমাদের থেকে তোমাদের পাপসমূহ দূর করবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল (সূরা আল-আনফাল ৮:২৯)। তিনি আরো বলেন,
{يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَآمِنُوا بِرَسُولِهِ يُؤْتِكُمْ كَفْلَيْنِ مِنْ رَحْمَتِهِ وَيَجْعَلْ لَكُمْ نُورًا تَمْشُونَ بِهِ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ} [الحديد: ۲۸] .
হে মুমিনগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন, তিনি স্বীয় রহমতে তোমাদেরকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন, আর তোমাদেরকে নূর দেবেন যার সাহায্যে তোমরা চলতে পারবে এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু (সূরা আল-হাদীদ ৫৭:২৮)।
এ আয়াতের অনেক অর্থ রয়েছে। তোমাদের উচিত হবে যে, ইবাদত, চরিত্র ও আদান-প্রদান সব কিছুতেই সমতা বজায় রাখা। যাতে তোমরা প্রকৃত শিক্ষার্থী হিসাবে গণ্য হও। আল্লাহর কাছে সাহায্যে কামনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে সঠিক কথা-কর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রেখে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা দান করেন। তিনিই সর্বশ্রোতা ও সাড়াদানকারী। সকল প্রশংসা বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।
১৩. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কখন শিক্ষার্থীরা ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর মাযহাবের অনুসারী হবে? জবাবে তিনি বলেন, ইমাম আহমাদ (রহঃ) ও অন্যান্য ইমামগণের মাযহাব দু'শ্রেণীতে বিভক্ত।
(ক) ব্যক্তি কেন্দ্রীক মাযহাব (খ) পরিভাষাগত মাযহাব।
বর্ণনা সমূহের মধ্যে (নির্দিষ্ট করে) কোন একটি বর্ণনা গ্রহণ করলে তুমি হবে ব্যক্তি কেন্দ্রীক মাযহাবের অনুসারী। আর পরিভাষাগত মাযহাবের সাথে ব্যক্তি কেন্দ্রীক মাযহাবের বৈপরীত্য থাকায় তা গ্রহণ করলে ব্যক্তি কেন্দ্রীক মাযহাবের উপর তুমি অটল থাকতে পারবে না। ইমাম আহমাদ (রহঃ) তার ব্যক্তি কেন্দ্রীক মাযহাব থেকে প্রত্যাবর্তন করে কখনো পরিভাষাগত মাযহাবকে নির্ধারণ করতেন। ব্যক্তি কেন্দ্রীক মাযহাবের কথা বলতেন না। তবে মাযহাবের সঠিক বিষয় অনুসরণে প্রত্যেকের জন্য যে পদ্ধতি রয়েছে মানুষ ঐ পদ্ধতি অনুসরণ করে চলবে।
১৪. প্রশ্ন হচ্ছে, প্রাথমিক শিক্ষার্থীর জন্য আপনার দিক-নির্দেশনা কি? তারা নির্দিষ্ট কোন মাযহাবের অনুসরণ করবে নাকি মাযহাব থেকে বের হবে?
জবাবে তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, {فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} [الأنبياء: ٧]
তোমার পূর্বে আমি পুরুষই পাঠিয়েছিলাম, যাদের প্রতি আমি ওহী পাঠাতাম। সুতরাং তোমরা জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর যদি তোমরা না জান (সূরা আম্বিয়া ২১:৭)।
কথা হলো, প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা বুঝবে না যে, কিভাবে দলীল বের করতে হয়। তাই এ ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী মৃত কোন ইমামের অনুসরণ করা অথবা বর্তমানে জীবিত কোন আলিমের নিকট জেনে নেয়া ছাড়া তার কোন পন্থা নেই। এটাই তার জন্য।
উত্তম। কিন্তু তার নিকট যখন ছুহীহ হাদীছ বিরোধী কথার বর্ণনা স্পষ্ট হবে তখন হাদীছকেই গ্রহণ করা ওয়াজীব-আবশ্যক।
১৫. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আলিমদের নিকট থেকে অর্জিত যে সব শিক্ষার্থীর আক্বীদা ও ফিক্বহী বিধান সম্পর্কিত জ্ঞানের ভিত্তি রয়েছে তারা কি মাসজিদে দাওয়াত দানের ভূমিকা পালন করতে পারবে নাকি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন না হওয়া পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করবে?
জবাবে শাইখ বলেন, আমি মনে করি, অনুমতি ছাড়া যে সব বিষয়ে শিক্ষার্থীর কথা বলা-আলোচনা করা নিষেধ, তারা ঐ বিষয়ে বক্তব্য দিবে না। কেননা, কোন বিষয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ওয়ালিউল আমর-নির্দেশ দাতার আনুগত্য করা ওয়াজীব-আবশ্যক। আর জেনে রাখতে হবে যে, ছোট প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের যদি কথা বলা-আলোচনা করার সুযোগ দেয়া হয় তাহলে তারা এমন বিষয়ে বক্তব্য দিবে যা তারা নিজেরা জানে না। এতে মানুষের মাঝে বিশৃঙ্খলা এবং জটিলতার সৃষ্টি হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শারীরিক আমল সম্পর্কিত আক্বীদা বিষয়ক অতিরিক্ত কথা বলা হয়। তাই অনুমতি ছাড়া কোন বিষয়ে কথা বলা নিষেধ। তবে কেউ আলোচনার যোগ্য হলে তার জন্য কথা বলা সম্পূর্ণ নিষেধ নয়। এমনকি আমরা এক্ষেত্রে বলি যে, ঐ যোগ্য ব্যক্তির জন্য নির্দেশদাতার আনুগত্যর দরকার নেই। কেননা, অযোগ্য ব্যক্তির মাধ্যমে শরী'আত প্রচারণা নিষেধ। কিন্তু শরী'আতের প্রচারকারী যোগ্য কিনা তা বুঝার জন্যই এখানে منع নিষেধ শব্দটি শর্তযুক্ত করা হয়েছে। যেমন এখন তোমরা জানো যে, যারা স্বীকৃত প্রাপ্ত আলিম জেনে-বুঝে প্রত্যেকেই তাদের কাছে জানার জন্য এগিয়ে যায়। আর যে বিষয়ে নির্দেশদাতার অনুমতি ছাড়া কথা বলা নিষেধ ঐ বিষয়ে কথা বৈধ নয়। অর্থাৎ মাসজিদে অথবা জনসমাবেশে কথা বলা ঠিক নয়। তবে শিক্ষার্থীদের পরস্পরের মাঝে কোন ঘরে অথবা কামরায় আলোচনা হলে তাতে কোন সমস্যা নেই। আর কেউ তাতে বাধা সৃষ্টি করবে না।
১৬. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইলম অর্জনের পদ্ধতি সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। যে ইলম অর্জন করতে চায় সে কোন পদ্ধতি অবলম্বন করে শুরু করবে? কোন এক মূল রচনা মুখস্থ করবে? ঐ সব শিক্ষার্থীর ব্যাপারে আপনার দিক-নির্দেশনা কি?
জবাবে শাইখ বলেন, প্রথমে ঐ সব শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যে দিক-নির্দেশনা দানের পূর্বে কোন আলিমের নিকট থেকে আমি ইলম অর্জনের পরামর্শ দিবো। কেননা, আলিমের কাছ থেকে ইলম অর্জনে বৃহৎ দু'টি উপকার লাভ হয়।
প্রথম: ইলম অর্জনের দিক থেকে আলিমই অধিক নিকটবর্তী। কেননা, তার নিকট রয়েছে পর্যবেক্ষণের জ্ঞান এবং বুঝানোর যোগ্যতা। শিক্ষার্থীকে পূর্ণতার সাথে সহজে তিনি শিক্ষা দান করে থাকেন।
দ্বিতীয়: শিক্ষার্থীর ইলম অর্জনে আলিম সঠিকতার অধিক নিকটবর্তী। অর্থাৎ আলিম ছাড়াই যে ইলম অর্জন করে, সে মূলত গোলকধাঁধার মধ্যেই থাকে এবং সঠিক বিষয় হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। এটা এজন্য হয় যে, সে অভিজ্ঞ আলিমের নিকট শিক্ষা অর্জন করেনি। ঐ আলিম ইলম অর্জনের পদ্ধতি সম্পর্কে তাকে দিক-নির্দেশনা দিতে পারতেন যা সে পছন্দ করে।
আমি মনে করি, ইলম অর্জনে একজন শাইখের স্বরণাপন্ন হওয়ার ব্যাপারে মানুষের উৎসাহিত হওয়া উচিত। কেননা, কেউ তার শাইখের স্বরণাপন্ন হলে তার জন্য যা কিছু সামঞ্জস্যপূর্ণ ঐ ব্যাপারে তিনি (শাইখ) দিক-নির্দেশনা দান করবেন। আর এ জবাবে সার্বজনীনতার দিক থেকে আমরা বলবো:
প্রথমত: সব কিছুর পূর্বে আল্লাহর কিতাব মুখস্থ করা দরকার। কেননা, এটাই ছাহাবীগণের রীতি। তারা দশটি আয়াতও এড়িয়ে যেতে না যতক্ষণ না তা জানতেন। আর আয়াতের জ্ঞানার্জন করত তদানুযায়ী আমল করতেন। আর আল্লাহর কালামই হচ্ছে অধিকতর মর্যাদাবান।
দ্বিতীয়: সংক্ষিপ্ত হাদীছের মতন-মূল ইবারত গ্রহণ করবে যা প্রমাণ স্বরূপ সংরক্ষিত থাকবে। যেমন: উমদাতুল আহকাম (عمدة الأحكام), বুলুগুল মারাম (بلوغ المرام), ইমাম নববীর আরবাঈন (الأربعين النووية) এবং অনুরূপ হাদীছ গ্রন্থাবলী।
তৃতীয়: বিধান সম্পর্কিত ফিক্বহের মূল ইবারত মুখস্থ করবে। আর "زاد المستقنع في اختصار المقنع" কিতাবটি মতন-মূল রচনা গ্রহণের দিক থেকে উত্তম বলেই জানি। কেননা, মানছুর ইবনে ইউনূস আল-বহুতী কিতাবটির ব্যাখ্যা করেন। তারপর অনেকেই কিতাবটির এ ব্যাখ্যা ও মূল-ইবারতের অনেক টিকা-টিপ্পনী যোগ করেছেন।
চতুর্থ: ইলমুন নাহু। তোমরা কি জানো নাহু কি? খুব কম সংখ্যক ছাত্রই তা জানে। তুমি এমন ছাত্রকে দেখবে যে, সে কুল্লিয়া তথা উচ্চ স্তরের লেখাপড়া শেষ করেছে অথচ ইলমে নাহুর কিছুই সে জানে না। এ প্রসঙ্গে কবির ছন্দ উল্লেখ করে উদাহরণ পেশ করা হলো:
لا بارك الله في النحو ولا أهله ... إذا كان منسوبا إلى نفطويه أحرقه الله بنصف اسمه ... وجعل الباقي صراخا عليه
জবাব হচ্ছে, কবি এখানে নাহু শাস্ত্র শিক্ষার অক্ষমতা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু আমি বলবো, ইলমে নাহুর অধ্যায় কঠিন অর্থাৎ ইলমে নাহু শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে তা কঠিনই মনে হবে। কিন্তু শিক্ষার্থী ইলমে নাহুর অধ্যায় পড়তে থাকলে তার জন্য এর সব নিয়ম-কানুনই সহজ হয়ে যাবে। নাহু শাস্ত্রের প্রাথমিক শিক্ষার্থী যারা নাহু শিক্ষায় আগ্রহী, আমি তাদেরকে সম্বোধন করে বলবো যে, তারা যেন শব্দের শেষে ইরাব প্রদানের অনুশীলন করে। আর নাহু শাস্ত্রের মধ্যে النحو الأجرومية কিতাবটিই উত্তম। এটি একটি সংক্ষিপ্ত মূল কিতাব। আমি প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে এ কিতাবটি পড়ার পরামর্শ দিবো। এসব উছুলের উপর ভিত্তি করেই শিক্ষার্থীরা জ্ঞানার্জন করবে।
পঞ্চম: ইলমে তাওহীদ সম্পর্কিত কিতাব। এ বিষয়ে অনেক কিতাব আছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো: শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব (রহঃ) রচিত 'কিতাবুত তাওহীদ' (كتاب التوحيد)। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহঃ) রচিত 'আল আক্বীদা আল ওয়াসিত্বীয়া' (العقيدة الواسطية)। এ কিতাবটি বহুল পরিচিত। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্যই।
শিক্ষার্থীর প্রতি আমার ব্যাপক উপদেশ হলো আল্লাহভীতি অর্জন, তার আনুগত্য উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা, উত্তম চরিত্র গঠন, শিক্ষাদান ও দিক-নির্দেশনার মাধ্যমে সৃষ্টির প্রতি ইহসান, সকল প্রকার মাধ্যম অবলম্বনে ইলম প্রচারে উৎসাহ প্রদান হোক তা সাংবাদিকতা অথবা কোন ক্ষেত্র অথবা কিতাব রচনা অথবা কোন বার্তা-লিখনী অথবা প্রচার মাধ্যম প্রভৃতির মাঝে যেন শিক্ষার্থীর ইলমের ছাপ-নিদর্শন থেকে যায়। শিক্ষার্থীর প্রতি আমার আরো উপদেশ হচ্ছে, সে যেন কোন বিষয়ে ফায়ছালা প্রদানে ত্বরান্বিত না হয়। কেননা, কতিপয় প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে দেখা যায়, ফাতাওয়া প্রদান ও বিধি-বিধান সম্পর্কিত বিষয়ে (সিদ্ধান্ত গ্রহণে) তাড়াহুড়া করে। অথচ তারা ব্যতিরেকে অনেক বড় বড় আলিমও ভুল করে।
থাকে। এমনকি শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে কতিপয় লোক বলে, আমরা একজন প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীকে তর্কের খাতিরে একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছি যে, এটাতো ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের কথা। প্রতিউত্তরে সে বলে, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল কে? ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল একজন মানুষ আমরাও মানুষ। সুবহানাল্লাহ! এটা ঠিক আছে যে, তিনি মানুষ আর ঐ শিক্ষার্থীও মানুষ। উভয়ে পুরুষ হওয়ার দিক থেকে সমান। কিন্তু বিদ্যা-বুদ্ধির দিক থেকে উভয়ের মাঝে রয়েছে বিশাল ব্যাবধান। ইলমের সম্পর্ক ছাড়া কোন মানুষ বড় হিসাবে গণ্য হয় না। আমি বলবো, বিনয়-নম্রতার সাথে শিক্ষার্থীর শিষ্টাচারিতা অর্জন করা দরকার এবং নিজেকে নিয়ে আশ্চার্য না হওয়াই উচিত। আর নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে জানা থাকা প্রয়োজন।
প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীর জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আলিমদের কথা নিয়ে বেশি পর্যালোচনা না করা। কেননা, তাদের কথা নিয়ে বেশি পর্যালোচনা করলে এবং ইবনে কুদামার কিতাব ' المغني في الفقه ' ইমাম নববীর কিতাব والمجموع এবং মতভেদ উল্লেখ আছে এমন বড় বড় কিতাব অধ্যয়ন করলে প্রাথমিক শিক্ষার্থী বিতর্কে লিপ্ত হয়ে বিনষ্ট হবে। শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক পর্যায়ে সংক্ষিপ্ত ইবারত জানতে হবে। যাতে সে উদ্দেশ্যে পৌঁছতে পারে। গাছে উঠে তার ডাল পালায় ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা করা ভুল।
১৭. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, সংক্ষিপ্তভাবে ইলম অর্জনের পদ্ধতি কি? আল্লাহ তা'আলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
তার জবাবে ইলম অর্জনের সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি নিম্নে তুলে ধরা হলো:
১. আল্লাহর কিতাব মুখস্থ করণে তুমি আগ্রহী হবে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট চিন্তা করে ও বুঝে মুখস্থ করবে। এ কিরা'আতের উপকারীতা যখন তোমার জন্য কাজে আসবে তখন তুমি এর গভীরে প্রবেশ করবে।
২. রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জ্বহীহ সুন্নাহ হতে যা সহজ মনে হয় তা মুখস্থ করণে উৎসাহী হবে। আর একারণে বিধি-বিধানের মৌলিক বিষয়গুলো মুখস্থ করতে হবে।
৩. কোন বিষয়কে কেন্দ্রীভূত করে ঐ বিষয়ের উপর অটল থেকে তা অর্জন করবে। কিতাবের যেখানে সেখানে এলোমেলো পাঠ করবে না। এতে সময় অপচয় হবে এবং অন্তর হবে অস্থির।
৪. প্রথমে ছোট কিতাব পড়া আরম্ভ করবে এবং ভালভাবে চিন্তা করে বুঝে নিবে। তারপর এর চেয়ে উচ্চ স্তরের কিতাব পাঠ করবে। এভাবেই অল্প অল্প করে জ্ঞানার্জন হতে থাকবে এমনকি জ্ঞানার্জনে গভীরে প্রবেশ করবে। ফলে আত্মা প্রশান্তি লাভ করবে।
৫. মাসআলা সমূহের উছুল ও নিয়ম কানুন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হবে। তোমার সামনে পেশ করা হয় এমন প্রত্যেক বিষয় নিয়ে তুমি চিন্তা করবে। কেননা, বলা হয়ে থাকে, যে উছুল হতে বঞ্চিত হলো সে মূলত নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা থেকেই বঞ্চিত হলো।
৬. তোমার শাইখ অথবা ইলম ও দীনের দিক থেকে তুমি যাকে বিশস্ত ও নিকটতম মনে করো তার সাথে মাসআলা নিয়ে পর্যালোনা করবে।
১৮. শাইখ (জ) এর কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমানে ইংরেজী ভাষা শিক্ষার হুকুম কি?
জবাবে তিনি বলেন, প্রয়োজন মনে হলে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দানের মাধ্যম হিসাবে এ ভাষা শিক্ষা করা আবশ্যক। আর প্রয়োজনীয়তা না থাকলে এ ভাষা শিক্ষা করে সময় নষ্ট করার দরকার নেই। আর এর চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকাই ভাল। আর লোকেরা তাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে ইংরেজী ভাষা শিক্ষা করে থাকে। নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়েদ ইবনে ছাবিত (3) কে ইয়াহূদীদের ভাষা শিক্ষার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সুতরাং প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে দাওয়াতের মাধ্যম হিসাবে ইংরেজী ভাষা শিক্ষা করতে হবে। নচেৎ তা শিক্ষা করে সময় নষ্ট করবে না।
১৯. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, এমন শিক্ষণীয় চলচ্চিত্র যেখানে নারীরা যুক্ত আছে এবং বিশেষতঃ ইংরেজী ভাষা শিক্ষার চলচ্চিত্র দেখার ব্যাপারে হুকুম কি?
জবাবে শাইখ বলেন, আমি মনে করি, শিক্ষণীয় চলচ্চিত্র দেখা বৈধ। এতে সমস্যা নেই। কেননা, কল্যাণ লাভের উদ্দেশেই তা দেখা হয়। এখানে যদি নারীরা যুক্ত থাকে এবং দর্শক পুরুষ হয় আর ঐ সব পুরুষ তাদেরকে দেখে তাহলে এটা হারাম। এরূপ না হলে তা বৈধ। তবে সর্বাবস্থায় আমি তা অপছন্দ করি। কেননা, এটা দেখার কারণে ফিতনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর এ চলচ্চিত্রের অনুষ্ঠানে নারীরা কথা বললে শিক্ষার্থীর সামনে একটা পর্দা দিতে হবে যাতে নারীর চেহারা প্রকাশ না পায়। এ অবস্থা তখনই গ্রহণযোগ্য হবে যখন
প্রশিক্ষণের জন্য পুরুষ লোক পাওয়া যাবে না এবং নারীদের কথা শুনা জরুরী হয়। আর পুরুষ লোক পাওয়া গেলে নারীদের প্রয়োজন হবে না।
২০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কতিপয় সৎ যুবকদের নিকট তাক্বলীদ না করার কথাটি বেশি প্রচলিত। ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) এর কতিপয় কথার উপর তারা বেশি নির্ভর করে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি?
জবাবে তিনি বলেন, মূলত এ বিষয়ে আমি গুরুত্বারোপ করি যে, মানুষ তাক্বলীদকে ভিত্তি হিসাবে নির্ধারণ করবে না। কেননা, মুক্বাল্লিদ কখনো ভুল করে। এসত্ত্বেও আমি মনে করি না যে, পূর্ববর্তী আলিমদের কথা থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। আমরা বিচ্ছিন্ন হবো না আর প্রত্যেক মাযহাব থেকেই সঠিক বিষয় গ্রহণ করবো। কেননা, যারা তাক্বলীদকে অস্বীকার করে এমন ভাইদের দেখতে পাই তারা কখনো ভ্রষ্টতার পথ বেছে নেয় আর তারা এমন কথা বলে যা পূর্ববর্তী আলিমদের কেউ বলেননি। কিন্তু যখন তাকুলিদের প্রয়োজন দেখা দিবে তখন তা আবশ্যক। যেমন: আল্লাহ তা'আলা বলেন,
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
যদি তোমরা না জানো তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৭)।
আয়াতটির মাধ্যমে বুঝা যায়, আমরা কোন কিছু না জানলে ঐ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা আল্লাহ আমাদের জন্য ওয়াজিব করে দিয়েছেন। আর জানার উদ্দেশে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করার বিষয়টি তাদের কথার উপর নির্ভর করা অন্তর্ভুক্ত করে। নচেৎ জিজ্ঞেস করা উপকারহীন বলে গণ্য হবে।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহঃ) বলেন, তাক্বলীদ হচ্ছে মৃত জন্তুর ন্যায়। অপারগ অবস্থায় যা খেতে পারো। নচেৎ তা তোমার জন্য হারাম।
মানুষের অবস্থা যদি এমন হয় যে, সে দলীল ভিত্তিক কিতাবাদী পাঠ করতে সক্ষম নয় তখন তাক্বলীদ করা তার জন্য অসুবিধা নেই। কিন্তু সে এমন ব্যক্তির তাক্বলীদ করবে যে ইলম ও আমানতের দিক থেকে হক্বের অধিক নিকটবর্তী। অপর দিকে যদি সে আল্লাহর কিতাব ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ হতে বিধান সাব্যস্ত করতে সক্ষম হয়, সে ক্ষেত্রে তার জন্য তাক্বলীদ দরকার নেই।
২১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, বিষয় ভিত্তিক বিদ্যা যেমন: চিকিৎসা শাস্ত্র, ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি শিক্ষা অর্জনের প্রয়োজন হলে মানুষ এসব বিষয় ভিত্তিক বিদ্যার্জন করবে নাকি শারঈ বিদ্যা?
জবাবে শাইখ বলেন, সন্দেহ নেই যে, শারঈ বিদ্যার্জনই আসল। আর শারঈ বিদ্যার্জন ছাড়া যথাযথভাবে আল্লাহর ইবাদত করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। যেমন: আল্লাহ তা'আলা বলেন,
قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةِ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي
বল, এটাই আমার পথ, আল্লাহর পথে মানুষকে আহবান করি সজ্ঞানে আমি এবং আমার অনুসারীগণও (সূরা ইউসূফ ১২:১০৮)।
সুতরাং বুঝা যায়, শারঈ বিদ্যার্জনই আবশ্যক যার মাধ্যমে ব্যক্তির জীবন দুনিয়া ও আখিরাতে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর শারঈ ইলমের ভিত্তি ছাড়া কোন বিষয়ে দাওয়াত দানে প্রতিষ্ঠিত থাকা সম্ভব নয়। আর এ প্রাসঙ্গিকতার দিক থেকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দানের পূর্বে শারঈ জ্ঞানার্জনের প্রতি ভাইদেরকে উৎসাহিত করা আমি গুরুত্বারোপ করি। এ অর্থ নয় যে, তাদেরকে গভীর জ্ঞানার্জন করতে হবে। কিন্তু কোন বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান না থাকলে ঐ ব্যাপারে তারা কথা বলবে না। কেননা, কোন অজ্ঞাত বিষয়ে কথা বললে তারা আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
বল, আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর উাপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না (সূরা আল-আ'রাফ ৭:৩৩)।
শারঈ জ্ঞান দু'প্রকার:
(ক) ফরয: দীন ও পার্থিব প্রয়োজনীয় বিষয়ে জ্ঞানার্জন করা আবশ্যক।
(খ) ফরযে কেফায়াহ: এখানে শারঈ বিদ্যা এবং শারঈ নয় এমন অন্যান্য বিদ্যা যা মানুষের প্রয়োজন উভয়ের মাঝে সমতা রক্ষা করা সম্ভব। অনুরূপভাবে শারঈ নয় এমন অন্যান্য বিদ্যা তিন প্রকার:
১. ক্ষতিকর বিদ্যা যা শিক্ষা করা হারাম এবং এ বিদ্যার্জনে নিয়োজিত থাকা মানুষের জন্য বৈধ নয় যতক্ষণ তার কুফল থাকবে।
২. উপকারী বিদ্যা, যাতে উপকার নিহিত আছে তা অর্জন করবে।
৩. এমন বিদ্যা যা না জানলে ক্ষতি হবে না এবং তার মাধ্যমে উপকারও লাভ হবে না। এ সব বিদ্যার্জনে সময় নষ্ট করা শিক্ষার্থীর জন্য উচিত নয়। যেমন: ইলমে মানতেক বা তর্ক শাস্ত্র।
২২. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, অধিকাংশ যুবক প্রভাবিত হয়ে সাংস্কৃতিক পুস্তকাদী পাঠ করার প্রতি গুরুত্বারোপ করে এবং উছুলের কিতাবাদী পাঠে গুরুত্ব দেয় না এ ব্যাপারে আপনার উপদেশ কি?
শাইখ (রহঃ) জবাবে বলেন, প্রথমত আমার নিজের জন্য উপদেশ এবং শিক্ষার্থী ভাইদের প্রতি উপদেশ হচ্ছে যে, তারা সালাফদের কিতাবাদী পাঠে মনোযোগী হবে। কেননা, তাদের কিতাবে অনেক কল্যাণ ও জ্ঞান আছে এবং তাদের কিতাব পঠনে অনেক বরকত নিহিত আছে যা জ্ঞাত।
২৩. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা অনেক মানুষকে দেখি যে, কতিপয় শারঈ জ্ঞান তাদের রয়েছে যেমন: দাড়ি মুণ্ডন করা, ধুমপান করা হারাম হওয়ার জ্ঞান অথচ এ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তারা আমল করে না। এর কারণ কি? এ প্রকাশ্য মারাত্মক অপরাধের কি প্রতিকার রয়েছে?
জবাবে তিনি বলেন, এর কারণ হলো: কু-প্রবৃত্তির অনুসরণ করা। যা সে হারাম মনে করে তা থেকে বিরত থাকতে আল্লাহভীতি অর্জনের জন্য উদ্বুদ্ধ করে এমন দীনি সংযোমশীলতা এ শ্রেণীর মানুষের মাঝে নেই।
আরো কারণ হচ্ছে, বান্দার অন্তরে শয়তান এ ধরনের পাপাচারিতার কুমন্ত্রনা দেয়। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন,
إياكم ومحقرات الذنوب، فإنما مثل ذلك كمثل قوم نزلوا أرضاً فأتى هذا بعود وهذا بعود وهذا بعود ثم إذا جمعوا حطبا كثيرا وأضرموا ناراً كثيراً"
তোমরা ছোট গুনাহ থেকেও বিরত থাকো। কেননা, এ ধরনের গুনাহের উদাহরণ হলো ঐ সম্প্রদায়ের মত যারা কোন এক এলাকায় প্রবেশ করে, অতঃপর তারা এর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে অতঃপর অনেক কাঠ সংগ্রহ করার পর বিশাল অগ্নিকুন্ড প্রজ্জলিত করে।
অনুরূপভাবে মানুষ যে সব গুনাহকে তুচ্ছ মনে তাতে সর্বদা লিপ্ত থাকার কারণে তা কাবীরাহ গুনাহে পরিণত হয়। এজন্য আলিমগণ বলেন, ছোট গুনাহে সদা লিপ্ত থাকলে তা কাবীরাহ গুনাহে পরিণত হয়। আর কাবীরাহ গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলে তা মিটে যায়। এজন্য আমি এ শ্রেণীর লোকদের বলি, তোমাদের নিজেদের ব্যাপারে ভেবে দেখা উচিত। আরো কারণ হলো, সৎকাজের আদেশ কমে যাওয়া এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ না করা। আমাদের প্রত্যেকে কোন অন্যায় কাজ দেখলে সে অন্যায়কারীকে সুপথ দেখাবে এবং তাকে বর্ণনা করে বুঝাবে যে, এটা রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দিক-নির্দেশনার বিপরীত কর্ম। কেননা, অচিরেই বিবেককে এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে এবং বিবেকের পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
২৪. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহর দিকে দাওয়াত দানের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ও আলিমের করণীয় কি?
জবাবে শাইখ বলেন, আল্লাহর দিকে দাওয়াত দান ওয়াজিব। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
{ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ} [النحل: ١٢٥]
তুমি তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান কর এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর (সূরা আন-নাহাল ১৬:১২৫)।
আল্লাহ তা'আলা দাওয়াতের তিনটি পর্যায় নির্ধারণ করেছেন। তা হচ্ছে, ক. হিকমত-প্রজ্ঞাসহ দাওয়াত দান খ. উপদেশের মাধ্যমে দাওয়াত দান ও গ. উত্তম পন্থায় তর্কের মাধ্যমে দাওয়াত দান।
যাকে দাওয়াত দেয়া হবে হয়তো তার জ্ঞান নেই, তর্ক-বিতর্ক ও বিরোধীতার করার সক্ষমতাও নেই। এ শ্রেণীর মানুষদেরকে হিকমত-প্রজ্ঞা সহ
দাওয়াত দিতে হবে। হজ্বের বর্ণনাই হলো প্রজ্ঞা। আর এক্ষেত্রে যদি হক্ব বর্ণনায় প্রজ্ঞা অবলম্বন করাই সহজ মনে হয় এবং কোন হকু কেউ বর্জন করে এবং হকু গ্রহণ হতে বিরত থাকে তাহলে তাকে হক্ব গ্রহণের প্রতি উৎসাহ দিতে হবে অথবা ভীতি প্রদর্শন করতে হবে। অবস্থা অনুপাতে উভয়টি প্রযোজ্য হবে। আর যে হকুকে বর্জন করে এবং হক্ব বর্জনে তর্ক করে তার সাথে উত্তম পন্থায় তর্ক-বিতর্ক করতে হবে এবং তাকে সন্তুষ্ট করতে হবে।
যে লোক তার প্রভূর ব্যাপারে ঝগড়া করেছিল তার সাথে ইবরাহীম (আঃ) এর তর্ক-বিতর্কের দিকে লক্ষ্য কর। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِي حَاجَ إِبْرَاهِيمَ فِي رَبِّهِ أَنْ آتَاهُ اللهُ الْمُلْكَ إِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّيَ الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ قَالَ أَنَا أُحْيِي وَأُمِيتُ قَالَ إِبْرَاهِيمُ فَإِنَّ اللَّهَ يَأْتِي بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ فَبُهِتَ الَّذِي كَفَرَ وَاللهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالمين} [البقرة: ٢٥٨]
তুমি কি সে ব্যক্তিকে দেখনি, যে ইব্রাহীমের সাথে তার রবের ব্যাপারে বিতর্ক করেছে যে, আল্লাহ তাকে রাজত্ব দিয়েছেন? যখন ইব্রাহীম বলল, আমার রব তিনিই যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। সে বলল, আমিই জীবন দান করি এবং মৃত্যু ঘটাই। ইব্রাহীম বলল, নিশ্চয় আল্লাহ পূর্বদিক থেকে সূর্য আনেন। অতএব, তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে আন। ফলে কাফির ব্যক্তি হতভম্ব হয়ে গেল। আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হেদায়াত দেন না (সূরা আল-বাক্বারা ২:২৫৮)।
এটা কেমন ব্যাপার! মৃত্যুদন্ডের উপযুক্ত এক লোককে হত্যা করার জন্য ফিরআউনের কাছে নিয়ে আসা হলো অতঃপর সে তাকে হত্যা না করে ছেড়ে দিলো। ফিরআউনের ধারণা অনুযায়ী এটাই হলো ঐ লোকের জন্য জীবন ফিরিয়ে দেয়ার অবস্থা। অন্যদিকে অপর এক লোক মৃত্যুদন্ডের উপযুক্ত নয় অথচ সে তাকে হত্যা করলো। তার ধারণা মতে, এটাই হলো ঐ লোকের দান। এখানে এ কথা বলে তর্ক করা সম্ভব যে, মৃত্যুদন্ডের উপযুক্ত লোকটিকে তোমার কাছে নিয়ে আসা হলে তাকে হত্যা না করে তুমি তাকে জীবন দান করোনি। কেননা, পূর্ব হতেই ঐ লোক জীবিত ছিল। কিন্তু হত্যা না করার কারণে সে বেঁচে আছে। অনুরূপভাবে বলা যায়, যে লোক মৃত্যুদন্ডের উপযুক্ত নয় তাকে হত্যা করার কারণে সে মৃত্যু বরণ করে নাই। বরং ঐ লোকের মৃত্যুর কারণ সৃষ্টি হয়েছিল মাত্র। এজন্য নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাজ্জালের ঘটনায় উল্লেখ করেন যে, তার কাছে এক যুবককে নিয়ে আসা হবে। অতঃপর যুবক
সাক্ষ্য দিবে যে, এ হলো দাজ্জাল যার সম্পর্কে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন। অতঃপর দাজ্জাল তাকে হত্যা করে দ্বিখন্ডিত করবে। অতঃপর সে দ্বিখন্ডের মাঝে অবস্থান করে ঐ মৃত যুবককে ডাকবে। অতঃপর ঐ যুবক আলোকময় অবস্থায় হাস্যেজ্জল চেহারায় সাক্ষ্য দিবে যে, তুই সেই দাজ্জাল যার সম্পর্কে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের খবর দিয়েছেন। অতঃপর সে তাকে হত্যা করার জন্য এগিয়ে যাবে কিন্তু তাকে হত্যা করতে সক্ষম হবে না। এটাই প্রমাণিত হয় যে, সবকিছুর চাবিকাঠি আল্লাহর হাতে। কারো সাথে অযথা তর্ক করা সম্ভব কিন্তু ইবরাহীম (আঃ) দলীল-প্রমাণ পেশ করতে চেয়েছিলেন যার জন্য কোন তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়ার প্রয়োজন হবে না। ইবরাহীম (আঃ) এর ভাষায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَإِنَّ اللَّهَ يَأْتِي بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ
ইব্রাহীম বলল, নিশ্চয় আল্লাহ পূর্বদিক থেকে সূর্য আনেন। অতএব, তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে আন (সূরা আল-বাক্বারা ২:২৫৮)।
অতঃপর জবাব দান থেকে তারা বিরত থাকলো। আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَبُهِتَ الَّذِي كَفَرَ} [البقرة: ٢٥٨] কাফির ব্যক্তি হতভম্ব হয়ে গেল (সূরা আল-বাক্বারা ২:২৫৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ} [النحل: ١٢٥]
তোমরা উত্তম পন্থায় তর্ক করো (সূরা আন-নাহাল ১৬:১২৫)।
অর্থাৎ তর্কের নিয়ম অনুসরণ ও শ্রোতাকে তুষ্ট করণে উত্তম পন্থা অবলম্বন করা। আর সক্ষমতা অনুসারে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়া আমাদের উপর ওয়াজিব। কিন্তু আল্লাহর দিকে দাওয়াত দান ফরযে কিফায়াহ বলে গণ্য। অর্থাৎ কিছু সংখ্যক মানুষ দাওয়াত দানের জন্য প্রস্তুত থাকলে অবশিষ্টদের জন্য তা যথেষ্ট হবে।
যখন দাওয়াত দান হতে লোকজনকে বিমুখ দেখবে এবং এমন কেউ নেই যে, দাওয়াত দিবে তখন এটা 'ফরযে আইন' বলে গণ্য হবে। কেননা, আলিমগণ বলেন, দাঈ ছাড়া দাওয়াত দানে আর কোন লোক না থাকলে সেক্ষেত্রে তা হবে ফরযে আইন।
২৫. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, মু'তাযিলা, জাহমিয়াহ ও খারেজী দল বিদ্যমান নেই তাহলে তাদের সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জেনে লাভ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, এ যুগে বিদ'আতী দল সম্পর্কে জানার উপকারীতা হচ্ছে, এসব দল যা কিছু গ্রহণ করেছে তা পাওয়া গেলে আমরা প্রত্যাখ্যান করবো। তারা কার্যতঃ বিদ্যামান। যেমন কোন প্রশ্নকারী বলেন, বর্তমানে তাদের কোন অস্তিত্বই নেই, তাদের ইলমের উপর ভিত্তি করতে হবে কেন। কিন্তু আমাদের সকলের নিকট এটা জ্ঞাতব্য যে, মানুষ মনে করে, এসব দলের অস্তিত্ব এখনও বিদ্যমান। বিদ'আত প্রচারে তাদের তৎপরতা রয়েছে। একারণে তাদের মতামত আমাদের জেনে রাখা দরকার। যাতে তাদের মিথ্যা ও হক্ব বুঝতে পারি এবং তারা যে সব বিষয়ে তর্ক করে তা প্রত্যাখ্যান করতে পারি।
২৬. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা শিক্ষার্থীরা অনেক আয়াত মুখস্থ করি, কিন্তু অনেক আয়াত ভুলে যাই। এমতাবস্থায় মুখস্থ করার পর ভুলে যাওয়ার কারণে কি শান্তি ধার্য করা হবে?
জবাবে শাইখ বলেন, কুরআন ভুলে যাওয়ার দু'টি কারণ আছে: প্রথম: স্বভাবগত কারণ।
দ্বিতীয়: কুরআন থেকে বিমুখ হওয়া এবং ভ্রুক্ষেপ না করা।
প্রথম কারণে কোন গুনাহ হবে না এবং শান্তি ধার্য হবে না। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন জ্বলাতের ইমামতি করতেন তখন আয়াত ভুলে যেতেন। জ্বলাত শেষে উবাই ইবনে কা'ব ভুলে যাওয়া আয়াত তাকে স্বরণ করিয়ে দিতেন। অতঃপর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতেন, هلا" كنت ذكرتنيها তুমি তা আমাকে কেন স্বরণ করিয়ে দিলে না?[৫৫] তিনি রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে পাঠ করতে শুনতেন:
يرحم الله فلانا فقد ذكرني آية كنت أنسيتها".
আল্লাহ তা'আলা অমুককে দয়া করুন, সে আমাকে আয়াত স্বরণ করিয়ে দিয়েছে যা আমি ভুলে গেছি।[৫৬]
এটা প্রমাণিত হয় যে, স্বভাবগত কারণে মানুষ ভুলে যেতে পারে এতে তিরস্কারের কিছু নেই। অপরদিকে কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া ও ভ্রক্ষেপ না করার কারণে গুনাহ হবে। কতিপয় মানুষকে শয়তান আয়ত্বাধীন করে নেয় এবং এভাবে কুমন্ত্রণা দেয় যে, কুরআন মুখস্থ করো না, তা ভুলে যাবে। এতে গুনাহ হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا ﴾ [النساء: 76]
তোমরা লড়াই কর শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে। নিশ্চয় শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল। (সূরা আন-নিসা ৪:৭৬)।
কতিপয় মানুষ উদাহরণ স্বরূপ আল্লাহ তা’আলার নিম্নোক্ত বাণীর মাধ্যমে দলীল পেশ করেন, আল্লাহ তা’আলা বলেন,
لَا تَسْأَلُوا عَنْ أَشْيَاءَ إِنْ تُبْدَ لَكُمْ تَسُؤْكُمْ ﴾ [المائدة: 101]
হে মুমিনগণ, এমন বিষয়াবলী সম্পর্কে প্রশ্ন করো না যা তোমাদের কাছে প্রকাশ করা হলে তা তোমাদেরকে পীড়া দেবে। (সূরা আল-মায়েদা ৫:১০১)।
অতঃপর উক্ত আয়াতকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন করা, জেনে নেয়া ও শিক্ষা অর্জন অহেতুক কারণে তারা ছেড়ে দেয়। অথচ এ প্রেক্ষাপট ওহী নাযিল হওয়া ও শরী’আত প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। কতিপয় মানুষ এমন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতো যে ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা আয়াত নাযিল করেননি। অতঃপর তাদের সামনে ঐ জিজ্ঞাসিত বিষয় স্পষ্ট করা হতো। কোন বিষয় গ্রহণ করা অথবা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে মুসলিমদের উপর কঠোরতা আরোপ করা হতো। কিন্তু এখন বিধি-বিধানের কোন পরিবর্তন নেই। এতে কোন অপূর্ণতাও নেই। সুতরাং এখন জানার উদ্দেশ্যে দ্বীন সম্পর্কে প্রশ্ন করা ওয়াজিব।
২৯. শায়েখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, যে বিষয়ে মানুষ কিছু জানে এবং অপরকে ঐ বিষয় পালনের আদেশ দেয় অথচ সে নিজে আমল করে না। হোক তা ফরজ অথবা নফল। যে বিষয়ে সে আমল করে না তা পালনে অন্যকে আদেশ দেয়া কি তার জন্য বৈধ হবে? আর আদিষ্ট ব্যক্তির জন্য তা পালন করা ওয়াজিব নাকি আমল ছাড়াই তার জন্য বৈধ? অতঃপর দলীল প্রমান উপস্থাপন করা বৈধ? অতঃপর দলীল অনুসরণের জন্য সে কি আমলই করবে না যে ব্যাপারে সে আদেশ দিয়েছে?
জবাবে শায়েখ বলেন, এখানে দুইটি বিষয়।
প্রথম: যিনি কল্যাণের দিকে আহবান করেন অথচ তিনি নিজে আমল করেন না।
তার ব্যাপারে আমরা আল্লাহ তা'আলার নিম্নের বাণী পেশ করবো। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَم تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ } { كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تفعلون} [الصف: ٢، ٣]
হে ঈমানদারগণ! তোমরা তা কেন বল, যা তোমরা কর না?! তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর নিকট বড়ই ক্রোধের বিষয় (সূরা আছ-ছাফ ৬১:২,৩)।
আমি আশ্চর্য হই, ঐ লোক কেমন! যে হজ্বের প্রতি ঈমান আনে, সে বিশ্বাস রাখে আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে তার নৈকট্য লাভ হয়, সে আল্লাহর বান্দা এ বিষয়েও তার বিশ্বাস আছে অথচ সে আমল করে না। এটাই তার আশ্চর্যের বিষয়। এটা তার নির্বোধ হওয়ার প্রমাণ বহন করে। একারণে সে তিরস্কার ও নিন্দার পাত্র হবে। এ জন্য আল্লাহ তা'আলা বলেন, {لَمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ}
সুতরাং আমি এ শ্রেণীর লোককে বলবো, যা তুমি জানো এবং যার দিকে তুমি আহবান করো তদানুযায়ী আমল ছেড়ে দেয়ার কারণে তুমি পাপাচারী। যদি তুমি নিজেকে দিয়ে আমল শুরু করতে তাহলে সেটা হতো বিবেক ও প্রজ্ঞার কাজ। অপরদিকে ঐ আদেশদাতার বিরোধীতা করা আদিষ্ট ব্যক্তির জন্য শুদ্ধ নয়, যদি সে কল্যাণকর কোন কাজের আদেশ দেয় তাহলে সেটা গ্রহণ করা তার জন্য ওয়াজিব। আর যারাই হকু বলবেন তাদের কাছ তা গ্রহণ করা ওয়াজিব। বিদ্যার কারণে তাকে অবজ্ঞা করবে না।
২৮. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কিভাবে তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করবো যারা বলে যে, মুখস্থ করণের উপর প্রভাব ফেলে এমন কোন কর্মব্যস্ততা পূর্ববর্তী আলিমদের ছিল না। যেমন বর্তমানে এ যুগের আলিমদের কর্মব্যস্ততা রয়েছে। তাদের মধ্যে কতিপয় এমন ছিল যারা কোন ব্যস্ততা ছাড়াই কেবল ইলম অর্জন, তা আয়ত্ব করণ ও ইলমের মজলিশে যোগদানের জন্যই বের হতো। কিন্তু এখন পার্থিব ব্যস্ততার মধ্যে দিয়েই সময় অতিবাহিত হয়। আর মানুষ এ ব্যস্ততা থেকে বিরত থাকতে কি সক্ষম নয়?
জবাবে শাইখ বলেন, আমি শিক্ষার্থীকে বলবো, ইলম অর্জনের জন্যই যখন নিজেকে তুমি নিয়োজিত করবে তাহলে প্রকৃতপক্ষে তুমি শিক্ষার্থী হিসাবেই গণ্য হও। আর এটা বিশ্বাস করো যে, নির্মাতা যখন প্রসাদ নির্মাণে নিজেকে নিয়োজিত করে তখন সে অন্যকাজে মনোযোগ দেয় না। বরং যা সে নিজে নির্মাণ করবে তার দিকেই গুরুত্বারোপ করে। আর সে মনে করে, এটা করাই তার জন্য ভাল। অনুরূপ তুমি ইলম অর্জনে নিয়োজিত থাকলে সেটাই তোমার জন্য কল্যাণকর। আর তুমি কেবল ইলম অর্জনের পথ বেছে নেয়ার ইচ্ছা করবে, অন্যদিকে মনোযোগ দিবে না। আমার ধারণা মতে, ঈমান, ইখলাছ (একনিষ্ঠতা) ও সৎ নিয়্যাতের উপর কেউ অবিচল থাকলে আল্লাহ তা'আলা তাকে সাহায্যে করেন এবং তাকে এসব পার্থিব ব্যস্ততায় নিয়োজিত রাখেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا}
যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন (সূরা আত্ব-ত্বালাক্ব ৬৫:৪)। তিনি আরো বলেন,
{وَمَن يَتَّقِ اللهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ}
যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্যে উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না (সূরা আত্ব-ত্বালাক্ব ৬৫:২-৩)।
সুতরাং ইলম অর্জনে সৎ নিয়্যাত আবশ্যব; তাহলেই এটা সহজ-সাধ্য হবে।
২৯. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, যারা শারঈ ইলম অর্জন করতে চায় অথচ তারা আলিমের নিকট ইলম অর্জন থেকে দূরে থাকে। কারণ তাদের কাছে উছুল ও সংক্ষিপ্ত কিতাবাদী রয়েছে। তাদের ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, আমি শিক্ষার্থীকে উপদেশ দিবো যে, তারা যেন ইলম অর্জনে অবিচল থাকে এবং আল্লাহ তা'আলার সাহায্য কামনা করে। অতঃপর তারা যেন বিদ্বানগণের শরণাপন্ন হয়। কেননা, নিজে নিজে কতিপয় কিতাব পাঠ করলে তাতে অনেক মতভেদ পরিলক্ষিত হবে। তাই সরাসরি আলিমের নিকট হতে ইলম অর্জনে কম সময় ব্যয় হয়। অবশ্য আমি এটা বলতে চাচ্ছি না যে, যারা বলে, আলিম অথবা শাইখ ছাড়া ইলম অর্জন সম্ভব নয়। এ কথাটি ঠিক
নয়। বাস্তবে তা মিথ্যাই বটে। কিন্তু শাইখের নিকট পাঠ গ্রহণের ফলে শিক্ষার্থীর ইলম অর্জনের রাস্তা আলোকিত হয় এবং কম সময়ে তা অর্জন হয়।
৩০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আমি একজন শিক্ষার্থী আর আমার পরিবারে পারিপার্শ্বিক বস্তুগত অনেক কাজ আছে। আমার পিতা আমাকে বলে, ইলম অর্জনের চেয়ে পরিবারের জন্য কাজ করা অনেক উত্তম। এমতাবস্থায় আমি কি ইলম অর্জন ছেড়ে দিবো? এক্ষেত্রে পরিবারের জন্য আমার কাজ করা উত্তম নাকি উত্তম নয়?
জবাবে শাইখ বলেন, নিঃসন্দেহে ইলম অর্জন উত্তম। জরুরী অবস্থা ছাড়া এমনটা করা ঠিক নয়। তবে উভয় ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখাও সম্ভব। বিশেষতঃ আর্থিক সংকট দূরিকরণে ভূমিকা পালন করা যেতে পারে। আল-হামদুল্লিাহ আল্লাহ তা'আলা অনেক মানুষকে সচ্ছলতা দান করেছেন। পরিবারের প্রয়োজন পূরণে তোমার এগিয়ে আসা সম্ভব। তুমি এমন মেয়েকে বিয়ে করতে পারো যার নিকট কিছু সম্পদ রয়েছে। তাহলে তুমি ইলম অর্জনে অবিচল থাকতে পারবে।
৩১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমার বইয়ের পাঠসমূহ পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় রচিত যা শরী'আতের সাথে সাংঘর্ষিক। আমি জেনে এ চিন্তাধারার পাঠ গ্রহণের মনস্থ করেছি। আমার সনদ প্রাপ্তির পর এ ধরনের লেখাপড়ার মধ্যে মুসলিম উম্মতের জন্য কোন উপকার নিহিত আছে কি? এ ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, আমি বলবো যে, নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের ইসলাম বিরোধী পাঠ গ্রহণের পর মানুষ তার জ্ঞান-বুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে তা প্রত্যাখ্যান করবে। এজন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআ'য ( )-কে ইয়ামানে পাঠানোর সময় বলেছিলেন,
"إنك ستأتي قوماً من أهل الكتاب" শীঘ্রই তুমি আহলে কিতাবের এক সম্প্রদায়ের কাছে যাচ্ছো। ১৫৭[
অতঃপর নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআ'য ( )-কে ইয়ামানবাসীর অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করলেন। যাতে তাদেরকে দাওয়াত দানের জন্য তিনি প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেন। এমনিভাবে যেসকল আলিম এ ধরনের পাঠ গ্রহণ
করেছেন; যেমন: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহঃ) বিভিন্ন বিষয় ও দার্শনিক চিন্তাধারার লেখা পড়া করেন। অতঃপর তিনি এর মাধ্যমে এ বিষয়ের প্রতি অনুরাগীদেরকে প্রত্যাখ্যান করতে সক্ষম হন। তুমিও যদি এ পাশ্চাত্য চিন্তাধারার বিষয়কে প্রতিহত করার জন্য তা শিখতে থাকো, সক্ষমতা ও সুরক্ষার মাধ্যমে এ বিষয়সমূহ প্রত্যাখ্যান করার উপর তোমার এমন দৃঢ়তা থাকতে হবে যাতে তুমি এ চিন্তাধারায় প্রভাবিত না হও। তা এভাবে হবে যে, তোমাকে শারঈ গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং তোমাকে হতে হবে ইবাদতকারী ও আল্লাহভীরু। তাহলেই আমি আশা করবো, ইনশাল্লাহ এটা তোমার জন্য হবে কল্যাণকর এবং তা মুসলিমদের উপকারে আসবে। অপরদিকে তুমি যদি এ বিষয়ের কোনটিতে সম্পৃক্ত হও যা গ্রহণীয় নয় অথবা তোমার নিকট দলীল-প্রমাণ না থাকে তাহলে তুমি এ পথ অনুসরণ করবে না। এরূপই তুমি যদি বুঝতে পারো, তোমার দৃঢ় বিশ্বাস নেই এবং তা প্রতিহত করণে তোমার শক্ত অবস্থানও নেই তাহলে ইঙ্গিতে বলবো, এ বিষয়সমূহ ছেড়ে দেয়া তোমার উপর আবশ্যক। কেননা, এ অবস্থায় তা মারাত্মক বলে গণ্য হবে। আর শঙ্কার সাথে বিপদে পা বাড়ানো কোন মানুষের উচিত নয়।
৩২. শাইখের নিকট আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আমি একজন ছাত্র। আমি ভাল ছাত্র হিসাবে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পছন্দ করি। এটা আমার ভাল নিয়্যাত। সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে যাওয়ায় খুশি হওয়া এবং নিম্ন অবস্থানে থাকায় দুঃখিত হওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইখলাছ (একনিষ্ঠতার) কোন প্রভাব আছে কি?
জবাবে শাইখ বলেন, ইনশাল্লাহ জ্ঞাতব্য যে, এখানে ইখলাছের প্রভাব নেই। কেননা, এটা স্বভাবগত বিষয়। কারণ মানুষ ভাল কিছুর মাধ্যমে খুশি হয় এবং মন্দের দ্বারা দুঃখিত হয়। আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেন, যা মানুষের জন্য যথাযথ নয় তা খারাপ এমন বিষয়ে দুঃখিত হওয়াই আবশ্যক। অনুরূপভাবে ভাল বিষয়ে খুশি হওয়া আবশ্যক। তাই এ বিষয়ে তোমার ইখলাছে প্রভাব ফেলবে না যদি তোমার নিয়্যাত ভাল হয় যেমনটা তুমি বলছো। অপরদিকে কেবল সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছা ও সনদপত্র অর্জন কেন্দ্রীক চিন্তা-ভাবনায় লিপ্ত থাকো তাহলে এটি হবে অন্য বিষয়। উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, একদা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ছাহাবীদেরকে প্রশ্ন করলেন, গাছ-গাছালির মধ্যে এমন একটি গাছ রয়েছে যার সাথে মুমিনের তুলনা করা যায়। ছাহাবীগণ জঙ্গলের বিভিন্ন গাছ-গাছালির নাম ধারণা করতে লাগলো। ইবনে উমার বলেন,
আমার ধারণা হলো সেটি হবে খেজুর গাছ। কিন্তু আমি ছোট মানুষ হওয়ায় তা বলতে পছন্দ করিনি। [৫৮]
উমার ( তার পুত্রকে বলেন, আমি আশা করছিলাম যে, তুমিই উত্তরটা বলে দিবে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, মানুষের আনন্দ তার সফলতার সাথে জড়িত। এরূপ আনন্দের বিষয় সামনে আসলে তা প্রকাশ করাতে অসুবিধা নেই।
৩৩. শাইখের কাছে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ইংরেজী ভাষা শিক্ষা অর্জন করে বিশেষত আল্লাহর দিকে দাওয়াত দানে তা ব্যবহার সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
জবাবে শাইখ বলেন, আমরা মনে করি, ইংরেজী ভাষা শিক্ষা নিঃসন্দেহে একটি মাধ্যম। ভাল উদ্দেশ্যে এ ভাষাকে মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করা মন্দ নয়। আর উদ্দেশ্যে মন্দ হলে তা প্রয়োগ করাও মন্দ বটে। তবে সাধারণত আরবী ভাষার পরিবর্তে এটাকে গ্রহণ করা হতে বিরত থাকা আবশ্যক। তা ব্যবহার করা সাধারণত বৈধ নয়। আমরা শুনে থাকি যে, কতিপয় নির্বোধ আরবী ভাষার পরিবর্তে ইংরেজী ভাষা প্রয়োগ করে। কতিপয় অনুরাগী নির্বোধ রয়েছে যাদেরকে আমি অন্যের পাপের কারণ মনে করি, তারা তাদের সন্তানদেরকে অমুসলিমের কাছে শিক্ষা অর্জন করতে পাঠায়। ঐ অমুসলিম তাদেরকে বিদায়ী শুভেচ্ছা দেয় শিক্ষা দেয় বাই বাই বলে। এরূপ অন্যন্য শব্দাবলী শিখায়। আরবী ভাষা হলো কুরআনের ভাষা। অন্য ভাষার সাথে এ মর্যাদাপূর্ণ ভাষার পরিবর্তন নিষিদ্ধ। সালাফদের বিশুদ্ধ মত হলো এ ভাষার সাথে অনারবী ভাষার পরিবর্তন নিষিদ্ধ। তবে ইংরেজী ভাষা দাওয়াতের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। নিঃসন্দেহে কখনো কখনো তা প্রয়োগ করা আবশ্যক। আমি এ ভাষা জানি না। আমি মনে করি, যদি তা শিখতাম তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই এর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারতাম।
আমার অন্তরে যা আছে তার পূর্ণ অনুবাদ সম্ভব নয়। জেদ্দা বিমান বন্দর মসজিদে 'তাওঈয়াহ ইসলামিয়া' লোকদের সাথে ঘটে যাওয়া একটা কাহিনী তোমাদের সামনে বর্ণনা করছি, ফজরের জ্বলাত আদায়ের পর التيجاني মাযহাব সম্পর্কে আলোচনায় লিপ্ত হই। এটি মূলত বাতিল-মিথ্যা মাযহাব। এ মাযহাব পন্থীরা ইসলাম অস্বীকার করে। এ মাযহাব সম্পর্কে যা জানি তা বলতে আরম্ভ করলাম।
ইতিমধ্যে আমার কাছে এক লোক এসে বললো, الهوسا নামক ভাষা অনুবাদের জন্য আমি আপনার অনুমতি চাই। আমি বললাম, অসুবিধা নেই অনুবাদ করুন। আরেক লোক দ্রুত প্রবেশ করে বললো, এ লোক যিনি আপনার পক্ষ থেকে অনুবাদ করবেন তিনি التيجانية ভাষার প্রশংসা করেন। আমি এ কথা শুনে অবাক হলাম এবং পাঠ করলাম: إنا لله وإنا إليه راجعون যদি আমি এ ভাষা জানতাম, তাহলে আমি তাদের প্রতারণার মুখোমুখী হতাম না। মোদ্দা কথা হলো তুমি যার সাথে কথা বলবে যোগাযোগ রক্ষায় তার ভাষা জানা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ} [إبراهيم: ٤] .
আমি প্রত্যেক রসূলকে তার কওমের ভাষাতেই পাঠিয়েছি, যাতে সে তাদের নিকট বর্ণনা দেয় (সূরা ইবরাহীম ১৪:৪)।
৩৪. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আমি নির্দিষ্ট বিষয় রসায়নের ছাত্র। আমি বিভিন্ন বিষয় ও পাঠ সমূহ পর্যালোচনা করি, এ ক্ষেত্রে এমন বিষয় উদ্ভূত হয় যার মাধ্যমে আমি নিজে উপকৃত হই এবং অন্যের উপকার সাধনে যে কোন ক্ষেত্রে জ্ঞান চর্চার সাথে কর্মরত থাকতে পারি হোক তা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অথবা শিল্প- কারখানা এ অবস্থায় শারঈ জ্ঞান চর্চা থেকে আমার বঞ্চিত হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। এমতাবস্থায় আমি উভয়ের মাঝে কিভাবে সমতা বজায় রাখবো?
জবাবে শাইখ বলেন, আমি মনে করি, উভয় ইলম চর্চার মাঝে সমন্বয়সাধন এভাবে হওয়া সম্ভব যে, তুমি শারঈ জ্ঞান চর্চাকেই কেন্দ্রীভূত করবে। এটাই হবে তোমার নিকট মৌলিক বিষয়। আর অন্যান্য বিষয়ের জ্ঞান চর্চা অতিরিক্ত হিসাবে গণ্য হবে। অতঃপর তোমার ও জাতির কল্যাণের উদ্দেশ্যে এ দ্বিতীয় স্তরের জ্ঞান চর্চায় তুমি মনোনিবেশ করতে পারো। যেমন এ জ্ঞান চর্চায় তুমি আল্লাহ তা'আলার পূর্ণ হিকমত-প্রজ্ঞা প্রমাণ করবে। আর সব কিছুর কারণ সমূহের মাঝে তুমি বন্ধন খুঁজতে থাকবে। আর এমন বিষয়ে পৌঁছবে যা আমরা জানি না। আর এ বিষয়ে আমাদের জ্ঞান নেই। আমি বলবো, শারঈ জ্ঞান চর্চায় অটল থাকো এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান চর্চায় মনোনিবেশ করতে পারো। সর্বপরি শারঈ জ্ঞান চর্চাকে কেন্দ্রীভূত করবে।
৩৫. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি কুরআনের কোন তাফসীর অধ্যয়নের পরামর্শ দিবেন? মানুষ কুরআন মুখস্থ করার পর তা ভুলে যায় এ কারণে কি শাস্তি
ধার্য হবে? মানুষ কিভাবে মুখস্থ করবে এবং যা মুখস্থ করেছে তা সংরক্ষণ করবে কিভাবে?
জবাবে শাইখ বলেন, কুরআনের বিভিন্ন জ্ঞান রয়েছে। আর প্রত্যেক মুফাস্সির এ জ্ঞানের মাধ্যমে কুরআনের তাফসীর করে একটা পক্ষ অবলম্বন করেছেন। আর বিভিন্ন দিক থেকে তাফসীর করার কারণে সব তাফসীর একই রকম হওয়া সম্ভব নয়।
التفسير الأثري অর্থাৎ ছাহাবী ও তাবেঈনগণ যে তাফসীর করেছেন ঐ তাফসীর কেন্দ্র করে কতিপয় আলিম তাফসীর করেন। যেমন: তাফসীর ইবনে জারির ও তাফসীর ইবনে কাছির।
আবার কেউ চিন্তাধারার আলোকে তাফসীর করেন। যেমন: যামাখশারীর তাফসীর। আমি মনে করি, প্রথমত আয়াতের তাফসীর নিজে বুঝতে হবে। অর্থাৎ পুনরাবৃত্তি করে নিজে বুঝতে হবে যে, এটাই আয়াতের অর্থ। অতঃপর আলিমগণ ঐ আয়াতের ব্যাপারে যা লিখেছেন তা পর্যালোচনা করতে হবে। কেননা, এটা তাফসীরের ক্ষেত্রে দৃঢ়তার উপকারে আসবে।
রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে স্পষ্ট আরবী ভাষার লোকদের মাঝে প্রেরণ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
{بلسان عربي مبين} সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়। (সূরা আশ শুয়ারা ২৬:১৯৫)
আর ছাহাবীদের তাফসীরের দিকে প্রত্যাবর্তন করা আবশ্যক। কেননা, তারা মানুষের মধ্যে হতে কুরআনের অর্থ বেশি বুঝতেন। এরপর তাবেঈ মুফাস্সিরগণের লিখিত তাফসীর অধ্যয়ন করতে হবে। বিভিন্ন তাফসীর রচিত হওয়া সত্ত্বেও কেউ আল্লাহ তা'আলার কালামের দোষ-ত্রুটি বের করতে পারেনি। এটা মনে করা হয় যে, মানুষ আয়াতের তাফসীর বারবার অধ্যয়ন করবে। অতঃপর মুফাস্সিরগণের কথা পর্যালোচনা করবে। তাতে কুরআনের অনুকূলে কথা পাওয়া গেলে সেটাই হবে সম্ভবপর কুরআনের তাফসীর এবং তা গ্রহণ করা মানুষের জন্য সহজ বলে গণ্য হবে। অপরদিকে কুরআনের বিপরীত কিছু পাওয়া গেলে সেক্ষেত্রে সঠিক তাফসীরের দিকে প্রত্যাবর্তন করবে।
আর ব্যক্তি বিশেষে কুরআন মুখস্থ করার পদ্ধতিও ভিন্ন হয়ে থাকে। কিছু মানুষ একটা একটা মুখস্থ করে। তা এভাবে যে, প্রথমে একটি আয়াত মুখস্থ করে পাঠ করে। দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার ঐ আয়াত পুনরাবৃত্তি করে মুখস্থ করতে থাকে। অতঃপর অন্য আয়াত মুখস্থ করে এভাবে অষ্টমাংশ অথবা চতুর্থাংশ এবং এরূপই বাকি অংশ পরিপূর্ণভাবে মুখস্থ করে। আবার কেউ এক অষ্টমাংশ সম্পূর্ণ মুখস্থ করে পুনরাবৃত্তি করতে থাকে এভাবে তা মুখস্থ হয়। মুখস্থ করার ব্যাপারে কোন নিয়ম কানুন বর্ণনা করা আমাদের জন্য সম্ভব নয়। আমরা মানুষকে বলবো, কুরআনের যতটুকু মুখস্থ করা তোমার জন্য উপযোগী তা তুমি কাজে লাগাও। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তোমার নিকট জ্ঞান থাকতে হবে। যখন যা মুখস্থ করার ইচ্ছা করবে সে দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে পারবে। আমি মনে করি, মানুষ যা কিছু মুখস্থ করবে তা সকাল সকাল পাঠ করবে, জ্ঞানার্জনে এটা করাই উত্তম। কেননা, দিনের প্রথমভাগে যা কিছু মুখস্থ করা হয় তা অনেক কাজে আসে। এটা আমি নিজেও করি। এটা ভালভাবে মুখস্থ করণের উপযোগী সময়।
মুখস্থ করে ভুলে যাওয়ার কারণে শান্তি ধার্য হওয়া:
ইমাম আহমদ (রা) বলেন, কোন আয়াত মুখস্থ করার পর তা ভুলে যাওয়ার ব্যাপারে কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। এ কথা দ্বারা ঐসব লোক উদ্দেশ্যে যারা কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এমনকি তা বর্জন করে। অপরদিকে স্বভাবগত অথবা অন্যান্য কারণে যারা কুরআন ভুলে যায় কুরআন মুখস্থ করণে মনোনিবেশ করা তাদের উপর ওয়াজিব। এ ধরনের ভুলে যাওয়ায় তাদের গুনাহ হবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{লَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا} [البقرة: ٢٨٦] .
আল্লাহ কোন ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না (সূরা আল-বাক্বারা ২:২৮৬)।
নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত, ছাহাবীদের নিয়ে জ্বলাত আদায়কালে তিনি আয়াত ভুলে গেলেন, জ্বলাত শেষে এক ছাহাবী তা স্বরণ করিয়ে দেন। অতঃপর তিনি বললেন,
هلا كنت ذكرتني بها"
ঐ আয়াত কেন তুমি আমাকে স্বরণ করিয়ে দাওনি।
অবহেলা হেতু ও মুখ ফিরিয়ে নেয়ার কারণে যারা ভুলে যায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত ও পাপী। পক্ষান্তরে কোন সঙ্গত কারণে যারা ভুলে যায় তাতে মনোনিবেশ করা তাদের জন্য ওয়াজিব। এরূপ স্বভাবগত ভুলে যাওয়ায় কোন পাপ হবে না।
৩৬. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ফিকহুস সুন্নাহ কিতাব সম্পর্কে আপনার মত কি?
জবাবে শাইখ বলেন, নিঃসন্দেহে তা উত্তম কিতাব। কেননা, এতে দলীল সম্মত অনেক মাসআলা রয়েছে। তবে তা ত্রুটিমুক্ত নয়। যেমন ইবনে রজব (রহঃ) القواعد الفقهية কিতাবের ভূমিকায় বলেন, আল্লাহ তা'আলা কেবল তার কিতাব সংরক্ষণ করেছেন অন্য কিতাব নয়। তবে লেখকের কিতাবে অনেক বেশি সঠিক বিষয় উল্লেখ থাকার কারণে তার সামান্য ভুল-ত্রুটি ক্ষমার যোগ্য। নিঃসন্দেহে কিতাবটি উপকারী। আমি মনে করি না যে, জ্বহীহ ও দ্বঈফ পার্থক্য করণে শিক্ষার্থী ছাড়া অন্য কেউ এ কিতাবটি সংগ্রহ করবে। কেননা, এ কিতাবে অনেক দ্বঈফ মাসআলা আছে। যেমন: জ্বলাতুত তাসবিহ আদায় মোবাহ হওয়ার ব্যাপারে কথা আছে। জ্বলাতুত তাসবিহ সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন, এ সম্পর্কে বর্ণিত হাদীছ মিথ্যা। তিনি আরো বলেন, ইমামদের কেউ এটাকে বৈধ বলেননি। ইমাম আহমদ (রহঃ) কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, হাদীছটি মুনকার। এ কিতাবে উল্লেখিত বিপরীত বিষয় মিলিয়ে দেখা তাদের জন্য আবশ্যক যারা শিক্ষার্থী নয়। কেবল এ কিতাবের উপর তারা নির্ভর করবে না।
৩৭. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমানে পরীক্ষামূলক কিছু জ্ঞান বিদ্যা হিসাবে চালু আছে। এমনকি মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানে علمى ও أدبي নামে বিদ্যা চালু আছে। এ ধরনের প্রকার কি সঠিক? প্রতিষ্ঠানে এধরনের জ্ঞান শিক্ষা করা ছাত্রদের ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত। এটা কি ভবিষ্যতে তাদের উপর কোন প্রভাব ফেলবে?
জবাবে শাইখ বলেন, علمي ও أدبي নামকরণ পরিভাষাগত বিষয়। আর পরিভাষায় কোন সমস্যা নেই। কেননা, তারা মনে করে, বিষয় ভিত্তিক জ্ঞান বস্তুগত, জীব, উদ্ভিদ এবং অনুরূপ বিদ্যার সাথে সম্পৃক্ত। তবে আমাদের এটা বুঝা আবশ্যক যে, এসব ঐ বিদ্যা নয় যা অর্জনে উৎসাহ দেয়া এবং ছাত্রদের প্রশংসা করা যেতে পারে। মূলত যে জ্ঞান অর্জনকারীদের আল্লাহ তা'আলা প্রশংসা করেছেন সেটাই হলো বিদ্যা। প্রশংসামূলক এ জ্ঞান অর্জনকারীরাই
আল্লাহভীরু। আর সেটাই মূলত শারঈ জ্ঞান। আর এটা ব্যতিত অন্যান্য জ্ঞান উপকারী হয়ে থাকলে তা অর্জন করা যেতে পারে। তবে উপকার সাধনই এ জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে হতে হবে। পক্ষান্তরে এটা ক্ষতিকর হলে তা অর্জন থেকে বিরত থাকাই ভাল। আর যদি উপকার ও ক্ষতি কোনটিই না থাকে তাহলে এ জ্ঞানার্জনে সময় নষ্ট করা মানুষের জন্য উচিত হবে না।
৩৮. শাইখের কাছে আমার প্রশ্ন হলো, শারঈ জ্ঞান ব্যতিত অন্যান্য জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত থাকা অথবা কর্মে ব্যস্ত থাকা কিংবা অন্য কোন বিষয়ে মগ্ন থাকায় ইলম অর্জন করতে না পারা কারো জন্য কৈফিয়ত হিসাবে গণ্য হবে কি?
জবাবে তিনি বলেন, শারঈ জ্ঞানার্জন ফরযে কিফায়াহ। যথেষ্ঠ সংখ্যক মানুষ এ জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত থাকলে অবশিষ্টদের ক্ষেত্রে তা যথাযথ। আর যে জ্ঞান ফরযে আইন তা অর্জন করা মানুষের জন্য আবশ্যক। যেমন আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করতে চাইলে ইবাদতের পদ্ধতি সম্পর্কে জানা আবশ্যক। ইবাদত পালনের সাথে পরিবারের প্রয়োজন পূরণ অথবা আবশ্যকীয় বিভিন্ন ব্যয়ভার বহনে কর্মে ব্যস্ত থাকায় আপত্তি নেই বলে মনে করি। তবে সাধ্যানুযায়ী শারঈ জ্ঞানার্জন করা উচিত।
৩৯. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, {إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ } এ আয়াতে العلماء দ্বারা উদ্দেশ্যে কি?
জবাবে শাইখ বলেন, আল্লাহভীতি অর্জনে যাদের জ্ঞান আছে এখানে আলিম দ্বারা তারাই উদ্দেশ্যে। কেবল বস্তুগত জ্ঞান যেমন: জ্যোতির্বিদ্যা এবং অনুরূপ অন্যান্য বিষয় অথবা বিস্ময়কর বিজ্ঞান সংক্রান্ত জ্ঞান যারা অর্জন করেছে তারা উদ্দেশ্যে নয়। অবশ্য বাস্তবে বিজ্ঞান সংক্রান্ত জ্ঞান আমরা অস্বীকার করি না। শেষ যুগে কুরআনে বিজ্ঞানের অনেক তথ্য প্রকাশ পেয়েছে আমরা তা অস্বীকার করি না। কিছু মানুষ বিস্ময়কর বিজ্ঞান সম্পর্কে বাড়াবাড়ি মূলক কথা বলে। এমনকি আমরা দেখেছি, মানুষ কুরআনকে গণিতের কিতাব হিসাবে নির্ধারণ করে যা ভুল। আমরা বলবো, বিস্ময়কর বিজ্ঞান সাব্যস্ত করণে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। কেননা, চিন্তাধারার আলোকে বিজ্ঞান সাব্যস্ত হয় এবং চিন্তাধারায় ভিন্নতা থাকতে পারে। এসব চিন্তা-গবেষণার ক্ষেত্রে কুরআনকে প্রমাণ স্বরূপ পেশ করা হলে স্পষ্ট বর্ণনার পর ঐ চিন্তা-গবেষণার দৃষ্টিভঙ্গি ভুল প্রমাণিত হবে। অর্থাৎ কুরআনের অর্থ ভুল মনে হবে (নাউযুবিল্লাহ)। ফলে তা মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি হবে। হে ভাই সকল! তোমরা কুরআনের ঐ বর্ণনায় মনোযোগ দাও যা ইবাদত ও আচার-ব্যবহারে মানুষের উপকারে আসবে। এজন্য কুরআনে সূক্ষ্ম ও
গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে। যেমন: পানাহার, উঠাবসা ও প্রবেশ করা প্রভৃতির বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু বস্তুগত জ্ঞান কি সব কিছুর নিয়ম-কানুনে কাজে আসবে? এ জন্য আমি মনে করি, বিজ্ঞান সংক্রান্ত বিষয়ে নিয়োজিত থাকার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোনিবেশ করা দরকার। আর ইবাদত বাস্তবায়ন করাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কারণেই কুরআন নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُون} [الذاريات: ٥٦] .
আমি জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার 'ইবাদত করবে (সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৬)।
বস্তুবাদী জ্ঞানীরা যে বিষয়ে উপনিত হয় সে ব্যাপারে আমাদেরকে ভেবে দেখতে হবে। যদি তারা হিদায়াতের জ্ঞান পেয়ে থাকে, আল্লাহকে ভয় করে এবং ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তারা আল্লাহভীরু মুসলিম আলিম হিসাবেই গণ্য হবে। আর যদি কুফরীর উপরই অবিচল থাকে এবং বলে যে, এ পৃথিবী সৃষ্ট। প্রথমে ঈমানের কথা থেকে বের হয়ে যাওয়ার কারণে এ কথা তাদের কোন কাজে আসবে না। কারণ প্রত্যেকেই জানে যে, পৃথিবী সৃষ্ট। এখানে তিনটি কথা আছে পৃথিবী নিজেই সৃষ্ট অথবা হঠাৎ করে তার অস্তিত্ব হয়েছে অথবা স্রষ্টা তা সৃষ্টি করেছেন। আর তিনিই হলেন আল্লাহ তা'আলা। সুতরাং এমনিতেই পৃথিবী সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব। কেননা, কোন জিনিস নিজে নিজে সৃষ্টি হতে পারে না। কারণ পূর্বে কোন বস্তুর অস্তিত্ব ছিল না। তাহলে কিভাবে কোন বস্তু নিজে নিজে সৃষ্টি হবে? আর হঠাৎ করে পৃথিবী সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব। কারণ প্রত্যেক সৃষ্টির জন্য একজন স্রষ্টা আবশ্যক।
৪০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে গণিতশাস্ত্র শিক্ষা দেয়া কি বৈধ? এতে কি কোন প্রতিদান আছে নাকি নেই?
জবাবে শাইখ বলেন, মুসলিমদের পারিপার্শ্বিক জীবনে গণিতশাস্ত্র উপকারে আসলে এবং কেউ এর মাধ্যমে মানুষের উপকারের নিয়্যাত করলে তার নিয়্যাত অনুযায়ী তাকে প্রতিদান দেয়া হবে। কিন্তু এটা শারঈ জ্ঞানের মত নয়। এটা মুবাহ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত মাধ্যম হতে পারে। কেননা, শরীয়তে মুবাহ বিষয়ের নিয়ম ব্যাপকতর। কোন বৈধ বস্তু বা বিষয় কখনো হারাম, কখনো মাকরূহ আবার কখনো মুসতাহাব এবং ওয়াজিব বলে গণ্য হয়।
উদাহরণ স্বরূপ বলবো, ব্যবসার মৌলিকত্ব হচ্ছে তা হালাল। কিন্তু তা কখনো মাকরূহ হয়ে থাকে। কেউ তার জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য তোমার কাছ থেকে
খাদ্যপানীয় ক্রয় করতে চাইলে এ ক্ষেত্রে বিক্রয়ের হুকুম কি? এক্ষেত্রে তা ওয়াজিব। আর কেউ মদ তৈরীর জন্য তোমার কাছ থেকে আঙ্গুর ক্রয় করতে চাইলে এ ক্ষেত্রে তা বিক্রয় হারাম। আবার কেউ উযূর জন্য পানি ক্রয় করতে চাইলে তা বিক্রি করা ওয়াজিব। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে আমি বলবো, যখন কোন বৈধ বিষয় শরী'আত সম্মত কোন কাজের মাধ্যম হয় তখন তা শরী'আত সম্মত বলেই গণ্য হয়। আর হারাম কাজের মাধ্যম হলে তা হারাম বলেই গণ্য হয়।
৪১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কতিপয় ছাত্র চিকিৎসক হতে চায় এবং অন্যান্য জ্ঞান অর্জন করতে ইচ্ছুক। কিন্তু এখানে অন্যান্য বিষয় যুক্ত হওয়ার প্রতিবন্ধকতা আছে এবং শিক্ষার উদ্দেশ্যে বহিঃদেশে ভ্রমণের বৈধতা আছে কি? ঐ সব ছাত্রদের ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, চিকিৎসা বিদ্যা শিক্ষার জন্য ঐ সব যুবকদের আমার পরামর্শ রইলো। কেননা, আমাদের দেশে চিকিৎসকের প্রবল চাহিদা আছে।
কতিপয় শর্তসাপেক্ষে কাফিরদের রাষ্ট্রে ভ্রমণ করা বৈধ মনে করি, আর তা হলো প্রথম: মানুষ যে জ্ঞান অর্জন করবে তার মাধ্যমে সন্দেহ নিরসন করতে হবে। কেননা, কাফিররা চায় মুসলিমদের সন্তানদের মাঝে সন্দেহ প্রবেশ করুক। এভাবে তাদের দীন থেকে কাফিররা তাদেরকে বিচ্যুত করে।
দ্বিতীয়: দীনের জ্ঞান ও আমলের মাধ্যমে কু-প্রবৃত্তিকে দমন করতে হবে, দুর্বল কোন দীনের প্রতি ধাবিত হওয়া যাবে না। নচেৎ কু-প্রবৃত্তি জয় লাভ করবে আর এটা ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিবে।
তৃতীয়: যে বিষয়ে পড়তে ইচ্ছুক ঐ নির্দিষ্ট বিষয় ইসলামী রাষ্ট্রে না থাকলে কাফির রাষ্ট্রে ভ্রমণের প্রয়োজন হতে পারে।
এ তিনটি শর্ত বাস্তবায়ন হলেই ভ্রমণ করা যেতে পারে। এর কোন একটি ভঙ্গ হলে ভ্রমণ করবে না। কেননা, অন্য সব কিছুর চেয়ে দীনের সংরক্ষণই গুরুত্বপূর্ণ।
৪২. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আরবী ভাষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তা শিক্ষা করা হতে অনেক শিক্ষার্থী মুখ ফিরিয়ে নেয়। এরূপ হওয়ার কারণ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, হ্যাঁ, আরবী ভাষা বুঝা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হোক তা قواعد الإعراب তথা শব্দের শেষে ই’রাব (কারক চিহ্ন) প্রদানের নিয়ম-পদ্ধতি অথবা قواعد البلاغة (অলংকার শাস্ত্রীয় নিয়ম)। সবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আল-হামদুলিল্লাহ আমরা মূলত আরব জাতি। তাই قواعد اللغة العربية ব্যতিত অন্য কিছু শিক্ষা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব। কিন্তু মানুষের উচিত হবে আরবী ভাষার নিয়ম-পদ্ধতি পরিপূর্ণভাবে শিক্ষা করা। তাই আরবী ভাষার সব নিয়ম-কানুন শিক্ষা করার প্রতি আমি শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করবো।
৪৩. শাইখের কাছে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, কোনটি উত্তম কাজ: আল্লাহর দিকে দাওয়াতের জন্য বের হওয়া নাকি ইলম অর্জন করা?
শাইখের জবাব হচ্ছে, ইলম অর্জনের জন্য বের হওয়াই উত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আর ইলম অর্জন অবস্থায় দাওয়াত দেয়া শিক্ষার্থীর জন্য সম্ভব। আর ইলম ছাড়া আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়াও সম্ভব নয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন, {قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَة} [يوسف: ١٠٨] বল, এটা আমার পথ, আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও (সূরা ইউসূফ ১২:১০৮)।
সুতরাং বলি, কিভাবে ইলম ছাড়া দাওয়াত দেয়া সম্ভব? তাই ইলম ব্যতিত কেউ কখনোই দাওয়াত দিতে পারে না। আর যারা ইলম ছাড়া দাওয়াত দেয় তারা সফলতা লাভ করতে পারে না।
৪৪. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, ইলমের আপদ হচ্ছে ভুলে যাওয়া; এমন কোন বিষয় বা পদ্ধতি আছে কি যা অনুসরণে ইলম সংরক্ষিত হয়?
জবাবে শাইখ বলেন, জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ পথ খুঁজে পায়। আল্লাহ তা’আলা বলেন, {وَالَّذِينَ اهْتَدُوا زَادَهُمْ هُدًى وَآতَاهُمْ تَقْوَاهُمْ} [محمد: ۱۷] যারা হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছে আল্লাহ তাদের হেদায়াত প্রাপ্তি আরো বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে তাদের তাকওয়া প্রদান করেন (সূরা মুহাম্মদ ৪৭:১৭)।
ইলম অর্জনের চিন্তা-ভাবনা নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। বারবার মুখস্থ ও পর্যালোচনা করতে থাকবে। যে কোন আমলের ক্ষেত্রে হুকুম ও দলীল বের করে তা সম্পন্ন করবে। কেবল অবসরে ইলম অর্জন করবে না। এ কারণে আলিমগণ বলেন, তোমাকে অল্প জ্ঞান দান করা হলে তুমি এর সবটুকুই দান করো। আর তোমাকে কিছুই দেয়া না হলে তুমি অল্প দান করো। সুতরাং রাত-দিন সব সময় তুমি ইলম অর্জনে নিয়োজিত থাকো। তুমি যা জানো তা পর্যালোচনা করে আমল করো এবং সমতা বজায় রাখো। এভাবেই ইলম স্থায়ী হয়।
৪৫. শাইখের নিকট আমার প্রশ্ন হচ্ছে, যে সব শিক্ষার্থী ইলম অর্জনে অবহেলা করে এবং ইলম অর্জনে চেষ্টা-সাধনায় রত না থাকায় তাদের উপর এর কু-প্রভাব রয়েছে কি? এ ব্যাপারে আপনার দিক-নির্দেশনা কি?
জবাবে শাইখ বলেন, ছাত্রদের উচিত হবে ইলম অর্জনে সর্বাধিক চেষ্টা বজায় রাখা। যাতে তারা দৃঢ়তার সাথে ইলম অর্জনে সক্ষম হয়। জ্ঞানার্জনের গভীরে পৌঁছতে পারে। তা এভাবে সম্ভব যে, তারা অল্প অল্প করে জ্ঞানার্জনে চেষ্টা করবে। ফলে জ্ঞানার্জন তাদের জন্য সহজ হবে এবং গভীরতর জ্ঞানার্জনে সক্ষম হবে আর ইলম অর্জনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে। হে শিক্ষার্থীরা! তোমরা ইলম অর্জনে অবহেলা করলে এবং অমনোযোগী হলে সময় তোমাদের জন্য অপেক্ষা করবে না। চর্চা না করায় পঠনে জটিলতা সৃষ্টি হবে। এরূপ হলে ইলম অর্জনের চিন্তা-ভাবনায় তোমরা হবে অক্ষম। ফলে অনুশোচনা তোমাদের কোন কাজেই আসবে না।
৪৬. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, যারা শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত তাদের জন্য আপনার দিক-নির্দেশনা কি যার দ্বারা তারা উপকৃত হতে পারে?
জবাবে শাইখ বলেন, আমরা বলবো, শিক্ষা দানের সাথে সম্পৃক্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শিক্ষকরা ছাত্রদের এমন জ্ঞান দান করেন যা তাদের অন্তরে স্থায়ী হয়। ছাত্রদের সামনে আসার পূর্বে এবং তাদের প্রশ্ন ও পর্যালোচনা ছাড়া কোন শিক্ষকই কর্তব্যবোধ বুঝে উঠবে না। জ্ঞান ও তত্ত্ববধানের দিক থেকে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষকই ছাত্রদের নিকট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জ্ঞানের দিক শক্তিশালী হলে একজন শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তার দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে শক্তিশালী বলা সঙ্গত নয়। কেননা, শিক্ষকের পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকলে ছাত্রদের প্রশ্নের উত্তর দানে জটিলতার সৃষ্টি হবে। যদি উত্তর ভুল হয় তাহলে ছাত্ররা পরবর্তীতে তার উপর নির্ভর করবে না। শিক্ষক যদি ছাত্রদের প্রশ্ন উপেক্ষা করেন তাহলে কখনোই তারা ঐ শিক্ষকের সাথে সিদ্ধান্তে একমত হবে না।
এজন্য শিক্ষকের উচিত প্রস্তুত থাকা, উদ্বেগ গ্রহণ করা, দায়িত্ব বুঝে নেয়া এবং ধৈর্যশীল হওয়া। শিক্ষক ছাত্রের প্রশ্নের মুখোমুখী হলে তিনি যদি গভীর জ্ঞানী হন তাহলে সহজেই উত্তর দিতে সক্ষম হবেন। নচেৎ হিতে বিপরীত হবে।
৪৭. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, কোন শিক্ষার্থী আল্লাহর রাস্তায় ইলম অর্জনের জন্য তার সঙ্গীদের সাথে বের হতে চায়। কিন্তু বের হওয়ার মাঝে তার প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে তার পরিবার, পিতা-মাতা ইত্যাদি। এক্ষেত্রে ইলম অর্জনের জন্য বের হওয়ার হুকুম কি?
জবাবে শাইখ বলেন, যদি তাদের নিকট অবস্থান করাই ঐ শিক্ষার্থীর জন্য আবশ্যক হয় তাহলে থেকে যাওয়াই উত্তম। অবশ্য তাদের সাথে অবস্থান করেও ইলম অর্জন সম্ভব। কেননা, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের চেয়ে পিতা-মাতার খেদমত অগ্রগণ্য। আর জ্ঞানার্জন জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। পিতা-মাতা সন্তানের অভিমুখী হলে তাদের খেদমতই হবে অগ্রগণ্য। আর এমনটা না হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইলম অর্জনের জন্য সন্তানের বের হওয়াতে অসুবিধা নেই। পিতা-মাতার দিকে খেয়াল রাখা ও সাথে থাকা হচ্ছে তাদের হক্ব। এটা যেন সন্তান ভুলে না যায়। আর শারঈ জ্ঞানার্জনে পিতা-মাতার অনিহা থাকলে সেক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য নেই। এ জ্ঞানার্জনের জন্য বের হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অনুমতির প্রয়োজন নেই। কেননা, শারঈ জ্ঞানার্জনে তাদের অনিহা আছে।
৪৮. শাইখের নিকট প্রশ্ন হলো, আলিম ছাড়াই শুধু কিতাব পড়ে ইলম অর্জন বৈধ কি? বিশেষত যখন আলিমদের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ইলম অর্জন কঠিন হয়ে যায়। আর যখন কেউ বলে যে, কিতাবই যার শাইখ হয় সে সঠিকতায় পৌঁছতে বেশি ভুল করে। এ ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, নিঃসন্দেহে আলিমদের শরণাপন্ন হয়ে এবং কিতাবাদী পাঠ করে উভয় পন্থায় ইলম অর্জন করবে। কেননা, আলিমের কিতাবই যেন স্বয়ং আলিম। আলিম তার কিতাব হতেই তোমাকে পাঠদান করবে। যদি সরাসরি আলিমের নিকট ইলম অর্জনে প্রতিবন্ধকতা থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে কিতাব হতেই ইলম অর্জন করবে। তবে কিতাব পাঠ করে ইলম অর্জনের চেয়ে সরাসরি আলিমের কাছ থেকে ইলম অর্জনের পন্থাই উত্তম। কেননা, কিতাব পাঠ করত যারা ইলম অর্জন করে তাদেরকে বেশি পরিশ্রম করতে হয় এবং অত্যাধিক চেষ্টা-সাধনায় নিয়োজিত থাকতে হয়। এ সত্ত্বেও কিছু বিষয় তাদের নিকট অস্পষ্ট থেকে যায়। যেমন আলিমগণ ও রক্ষণশীল পন্ডিতেরা শরী'আতের নিয়ম- পদ্ধতি সুবিন্যস্ত করেন। তাই সম্ভবপর আলিমগণের দিকে প্রত্যাবর্তন করাই
শিক্ষার্থীর জন্য আবশ্যক। অপরদিকে যারা প্রমাণ স্বরূপ বলে যে, কিতাব পাঠ করে ইলম অর্জন করলে বেশি ভুল হয়, তাদের একথা সঠিক নয়। আবার অগ্রহণযোগ্যও নয়। কেননা, যারা কেবল কিতাব হতে ইলম অর্জন করে তারা সন্দেহ মূলক বেশি ভুল দেখতে পায়। তবে যারা বিশস্ততা, আমানাত ও ইলমের দিক হতে প্রসিদ্ধ বলে গণ্য তাদের কিতাব পাঠ করত ইলম অর্জন করলে ভুল বেশি হওয়ার সম্ভবনা নেই। বরং তারা যা বলেছেন তার অধিকাংশই সঠিক বলে বিবেচিত।
৪৯. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, জ্ঞানগত নতুন চিন্তাধারার আলোকে কুরআনের তাফসীর করা বৈধ হবে কি?
জবাবে শাইখ বলেন, জ্ঞানগত চিন্তাধারার আলোকে তাফসীর করা মারাত্মক অন্যায়। এ চিন্তাধারায় তাফসীর করলে এর বিপরীত মতবাদ সৃষ্টি হবে। সুতরাং এ অবস্থায় ইসলামের শত্রুদের চোখে কুরআন অশুদ্ধ বলে গণ্য হবে। অপরদিকে মুসলিমদের দৃষ্টিতে এ তাফসীরের ব্যাপারে তাদের কথা হলো, কল্পনা প্রসূত যারা কুরআনের তাফসীর করেন তাদের তাফসীর ভুল বলে গণ্য। ইসলামের শত্রুরা এর মাধ্যমে গোলযোগ সৃষ্টির ইচ্ছা করে। এজন্য এধরনের জ্ঞানগত তাফসীরের ব্যাপারে চুড়ান্ত পর্যায়ে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। যাতে অপব্যাখ্যারোধ করতে পারি। তাফসীরের আলোকে বাস্তবে কোন বিষয় সাব্যস্ত হলেও এটা বলার প্রয়োজন নেই যে, কুরআনের মাধ্যমে তা সাব্যস্ত হয়েছে। মূলত আল্লাহর ইবাদত, চরিত্রগঠন ও চিন্তা-গবেষণার জন্যই কুরআন নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لَيَدبروا آياته وليتذكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ} [ص: ٢٩]
আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে (সূরা দ্বাদ ৩৮:২৯)।
অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের মাধ্যমে তাফসীর করা হলে তা তাফসীর হিসাবে গণ্য হবে না। এটা হবে কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্যের বিপরীতে গুরুতর মারাত্মক ভুল। এ ব্যাপারে কুরআনে দৃষ্টান্ত রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِن استطعتُم أَنْ تَنفُذُوا مِنْ أَقْطَارِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ فَانْفُذُوا لَا تنفذون إلا بِسُلْطَان} [الرحمن: ٣٣]
হে জিন ও মানবজাতি, যদি তোমরা আসমানসমূহ ও যমীনের সীমানা থেকে বের হতে পারো, তাহলে বের হও। কিন্তু তোমরা তো (আল্লাহর দেয়া) শাক্তি ছাড়া বের হতে পারবে না (সূরা আর-রহমান ৫৫:৩৩)।
মানুষ যখন চাঁদের মাটিতে পা রাখলো তখন কতিপয় মুফাস্সির এ আয়াতের তাফসীর করে যে, যা কিছু ঘটে সে ব্যাপারেই আয়াতটি নাযিল হয়েছে। তারা বলে, এখানে السلطان শব্দ দ্বারা ইলম-জ্ঞান উদ্দেশ্যে। আর মানুষ তাদের জ্ঞান ব্যবহার করে পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে এবং মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অতিক্রম করেছে। এটা ভুল ব্যাখ্যা। এভাবে কুরআনের তাফসীর করা বৈধ নয়। এভাবে তাফসীর করা হলে প্রেক্ষাপট তৈরি হবে যে, আল্লাহ তা'আলা এটাই ইচ্ছা করেছেন। এ অবস্থায় বিপরীত তাফসীর বৃহত্তর স্বীকৃতি হিসাবে গণ্য হলে এ ব্যাপারে জবাবদিহী করতে হবে। মূলত আয়াতটি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে দেখা যাবে তা বাতিল-পরিত্যাজ্য তাফসীর। কেননা, আয়াতটি মানুষের অবস্থাদী ও তাদের কর্মের শেষ পরণতি সম্পর্কে নাযিল হয়। যেমন সূরা আর-রহমানের নিম্নের আয়াতের মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَإِن وَيَبْقَى وَجْهُ رَبُّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ} [الرحمن: ٢٦ - ٢٨] .
যমীনের উপর যা কিছু রয়েছে, সবই ধ্বংশশীল। আর থেকে যাবে শুধু মহামহিম ও মহানুভব তোমার রবের চেহারা। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের রবের কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে? (সূরা আর-রহমান ৫৫:২৬, ২৭,২৮)।
আমরা ঐ সকল মানুষের কাছে জানতে চাই তারা কি আকাশ রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে যেতে পারবে? এর জবাব হচ্ছে, পারবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {إِن استطعتُم أَنْ تَنفُذُوا مِنْ أَقْطَارِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ} [الرحمن: ٣৩] .
যদি তোমরা আসমানসমূহ ও যমীনের সীমানা থেকে বের হতে পারো, তাহলে বের হও (সূরা আর-রহমান ৫৫:৩৩)।
দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের প্রতি অগ্নিশিখা ও কালো ধোঁয়া (বাধা স্বরূপ) প্রেরণ করা হয়েছে কি?
জবাব হচ্ছে, প্রেরণ করা হয়নি। কেননা, ঐসব মুফাস্সির যে তাফসীর করে তা সঠিক নয়। আমরা বলবো, তারা যে বিষয়ে উপনিত হয়েছে তা কেবল তাদের
অভিজ্ঞতার আলোকেই সম্ভব হয়েছে যা অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। কুরআনের ভাব উদ্ঘাটনের জন্য আমরা যে বিকৃত অর্থ গ্রহণ করছি তা সঠিক নয়, বৈধ নয়।
৫০. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষের কথার উপর নির্ভর করা ছাত্রদের জন্য ভুল যা ক্ষতিকর। কোন মতামত গ্রহণ অথবা নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণ ব্যতীতই কি তারা পাঠ বুঝবে? বিধি-বিধান সম্পর্কিত সমস্যা সৃষ্টি হবে কিনা?
জবাবে শাইখ বলেন, মানুষ যদি নির্দিষ্ট মাযহাবকে এ উদ্দেশ্যে গ্রহণ করে যে, তার নিজের অথবা অন্য কোন মাযহাবে সঠিক বিষয় থাকলে সে তার মুখাপেক্ষী নয়। অবস্থা এমন হলে মাযহাবের অনুসরণ করা বৈধ হবে না। আমি এটা সমর্থন করি না। তবে উপকৃত হওয়ার প্রত্যাশায় মানুষ কোন নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসরণ করতে চাইলে ঐ মাযহাবের নিয়ম-পদ্ধতি ও রীতি কুরআন-সুন্নাহর সাথে মিলাতে হবে। এক্ষেত্রে যদি অন্য মাযহাবের অগ্রাধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তাহলে ঐ মাযহাবের সঠিক বিষয় গ্রহণ করবে। এতে অসুবিধা নেই। মুহাক্কিক আলিম যেমন: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) এবং অন্যান্যরা এ নীতিই অবলম্বন করেছেন। তাদেরও নির্দিষ্ট মাযহাব ছিল। কিন্তু সঠিক দলীল স্পষ্ট হলে তারা ঐ দলীল-প্রমাণের বিরোধীতায় লিপ্ত হননি, বরং তা গ্রহণ করেছেন।
৫১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, "كل أمر ذي بال لم يبدأ ببسم الله" অর্থাৎ যে কাজে বিসমিল্লাহ বলা হয়নি তা অসম্পূর্ণ। ৫৯। এটা কি জ্বহীহ হাদীছ? আলিমগণের কিতাবে এটা বেশি বেশি উল্লেখ হতে দেখা যায়। কারণ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, এ হাদীছের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে আলিমগণের মতামত আছে। কতিপয় বিদ্বান এটাকে জ্বহীহ ও নির্ভরযোগ্য বলেছেন। যেমন: ইমাম নববী। আর কতিপয় আলিম বলেছেন, এটা দ্বঈফ। তবে হাদীছটি গ্রহণের ব্যাপারে আলিমগণ একমত। এজন্য তাদের কিতাবে হাদীছটি উল্লেখ করেছেন। আর প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে বিসমিল্লাহ পাঠ করা অথবা শুরুতে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করা উচিত।
৫২. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে ইশার পর মানুষকে প্রশিক্ষণে লিপ্ত রাখা, দিক-নির্দেশনা দান করা এবং উপদেশ দেয়ায় কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের
জ্বলাত আদায় সম্ভব হয় না অথবা তাদেরকে থেকে বিচ্ছিন্ন হলে তাহাজ্জুদ আদায় পূর্ণ হয়, এ দু'টির মধ্যে কোনটি উত্তম?
জবাবে শাইখ বলেন, রাতের নফল ইবাদত বন্দেগীর চেয়ে ইলম অর্জনে লিপ্ত থাকা উত্তম। ইলম অর্জন সম্পর্কে ইমাম আহমদ (রহঃ) বলেন, "لا يعدله شيء لمن صحت نيته"
ইলম অর্জনের জন্য যে সঠিক নিয়্যাত করেছে কোন কিছুই তার সমপরিমাণ হবে না।
তার শিষ্যরা জিজ্ঞেস করলো, কিভাবে তা হয়? তিনি বলেন, শিক্ষার্থী নিজের এবং অন্যের অজ্ঞতা দূর করার জন্য নিয়্যাত করে। নিজে শিখা অথবা অন্যকে শিক্ষা দেয়ার কাজে মানুষ রাতের প্রথমাংশে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইলম অর্জনে লিপ্ত থাকে তাহলে ইলম অর্জনের এ রাতই তাদের জন্য উত্তম। রাত জেগে ইবাদত করা ও ইলম অর্জনে প্রতিযোগিতা হলে এক্ষেত্রে শারঈ জ্ঞান অর্জন করাই উত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে। এজন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু হুরাইরাহ (রাঃ)-কে তার ঘুমানোর আগে বিতর জ্বলাত আদায়ের নির্দেশ দেন। আলিমগণ বলেন, এর কারণ হলো, আবু হুরাইরাহ (রাঃ) রাতের প্রথমাংশে হাদীছ মুখস্থ করতেন এবং শেষাংশে ঘুমাতেন। অতঃপর নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ঘুমানোর আগে বিতর জ্বলাত আদায়ের নির্দেশ দেন।[৬০]
৫৩. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, যে সকল শিক্ষক বিশেষত দীনি ক্ষেত্রে ভুল করেন, তাদের ব্যাপারে আমার করণীয় কি? সঠিক জবাব পেতে আমি কি তার উপর নির্ভর করতে পারি?
জবাবে শাইখ বলেন, এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিছু শিক্ষক রয়েছেন যাদের দ্বারা ভুল সংঘটিত হলে তারা ঐ ভুলকে কারো জন্য ভুল হিসাবে গণ্য করতে চান না। এটা ঠিক নয়। মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। ভুল হওয়ার পর সতর্ক হলে তা আল্লাহর নিআ'মত হিসাবেই গণ্য। যাতে কেউ ঐ ভুলের কারণে প্রতারিত না হয়। ছাত্রদের বিচক্ষণতা বজায় রাখা উচিত। সকল শিক্ষার্থীর সামনে যেন কোন শিক্ষার্থী ঐ ভুলকারী শিক্ষককে প্রত্যাখ্যান না করে। তাহলে এটা হবে শিষ্টাচার বিরোধী কাজ। পাঠদান শেষে ঘটে যাওয়া ভুল সম্পর্কে শিক্ষককে অবগত করা।
যেতে পারে। শিক্ষক ভুল বুঝতে পারলে পাঠদানের সময় সরাসরি তিনি ছাত্রদের সামনে তা ব্যক্ত করবেন। আর যদি তিনি ভুল না বুঝেন তাহলে পাঠদানের সময় ছাত্ররা তা স্বরণ করিয়ে দিবে। তা এভাবে যে, ছাত্র বলবে, হে শিক্ষক! আপনি এটা এটা বলেছেন অথচ এটা ঠিক নয়।
৫৪. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, ক্লাশে অথবা বাইরে অমুসলিম শিক্ষককে সালাম দেয়া বৈধ হবে কি?
জবাবে শাইখ বলেন, নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূত্রে বর্ণিত হাদীছে তিনি বলেন,
"লা تبدءوا اليهود والنصارى بالسلام " তোমরা ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের আগে বাড়িয়ে সালাম করো না।[৬১] রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পাশ দিয়ে ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানরা অতিক্রম করার সময় বলতো السام عليكم السلام অর্থ হলো তোমার মৃত্যু হোক। তাদের প্রতিউত্তরে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে وعليكم বলতে শিক্ষা দিলেন। অর্থাৎ তোমাদের উপরও।[৬২] সুতরাং তোমরা আগ বাড়িয়ে সালাম দিও না। যখন অমুসলিম আগ বাড়িয়ে সালাম দিবে তখন وعليكم বলে তোমরা উত্তর দিবে। ইবনুল কাইয়্যিম (في أحكام أهل الذمة ) আহলু যিম্মার বিধি-বিধান সংক্রান্ত পরিচ্ছেদে উল্লেখ করেন যে, আমরা যদি বুঝতে পারি যে, কাফিররা السلام عليكم বলেছে, তাহলে আমরা وعليكم السلام বলে জবাব দিবো।
৫৫. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, মুসলিমদের উপকার সাধনে আমার সামনে অনেক জ্ঞানগত অনুষদ আছে, আমি ঐ সব অনুষদের কোনটিতে ভর্তি হবো নাকি শারঈ কোন অনুষদে ভর্তি হবো?
জবাবে শাইখ বলেন, আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ে দীনি অনুষদে ভর্তি হওয়াই উত্তম। তবে অন্যান্য অনুষদে অল্প সংখ্যক ছাত্র ভর্তি হতে পারে। বিশেষত
যাদের দীনি বিষয় অধ্যয়নের উৎসাহ রয়েছে তাদের জন্য শারঈ অনুষদে ভতি হওয়াই উত্তম।
৫৬. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ফাতওয়া হতে আলিমদের ক্ষ্যান্ত হওয়ার কারণ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, ফাতওয়া দানে সক্ষম এমন আলিম ফাতওয়া থেকে বিরত থাকে অথচ তার ফাতওয়া প্রদানের উপর জ্ঞান রয়েছে। ঐ আলিমের নিকট দলীলের বৈপরীত্যে পরিলক্ষিত হওয়ার কারণে তিনি বিরত থাকতে পারেন। কখনো ঐ আলিমের এ ধারণা হতে পারে যে, কোন মুফতির ফাতওয়ায় প্রতারণা রয়েছে। কেননা, এমন কতিপয় মুফতি আছে যারা হক্বের উদ্দেশ্যে ফাতওয়া প্রদান করে না। এসব মুফতি ফাতওয়া নিয়ে ছলনা করতে চায়। তাই এ বিষয়টি দু'একজন করে সব ফাতওয়া দানকারী হক্বপন্থী আলিমের দৃষ্টিগোচর হয়। ফলে তারা ফাতওয়া থেকে বিরত থাকে অথবা প্রশ্নকারীর জবাব দান থেকে মুখফিরিয়ে নেয় অথবা তার এটা প্রবল ধারণা রয়েছে যে, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি যাচাইয়ের জন্য মুফতি ফাতওয়া নিয়ে ছলনা করতে পারে। অথবা সে কতিপয় মানুষের কথাকে দৃষ্টান্ত হিসাবে পেশ করতে চায়। এটাই সবচেয়ে মারাত্মক। ঐ প্রতারক মুফতি এ ছলনাময় পন্থা অবলম্বন করে বলে, অমুক অমুক আলিম এটা এটা বলেছেন। একারণে হয়তো হক্বপন্থী আলিম ফাতওয়া থেকে বিরত থাকেন।
৫৭. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, কিছু মানুষ ইলম ছাড়াই ফাতওয়া প্রদান করে তাদের ব্যাপারে হুকুম কি?
জবাবে শাইখ বলেন, এ ধরনের কাজ মারাত্মক ক্ষতিকর ও মহা অন্যায়। ইলম ছাড়া কথা বলার কারণে আল্লাহর সাথে শিরক স্থাপন করা হয় এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ} [الأعراف:
[৩৩
বল, আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর উপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না (সূরা আল-আরাফ ৭:৩৩)।
আয়াতের ভাষ্যে আল্লাহ তা'আলার সত্তা, তার গুণাবলী, তার কর্মসমূহ ও শারঈ বিষয়াদী অন্তর্ভুক্ত। শারঈ কোন বিষয় নিশ্চিত না জানা পর্যন্ত ঐ ব্যাপারে ফাতওয়া প্রদান করা কারো জন্য বৈধ নয়। আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাহর নছে (মূলপাঠে) যা বুঝানো হয়েছে তা দক্ষতা ও মেধা দ্বারা সঠিকভাবে বুঝা সম্ভব হলে ফাতওয়া দেয়া যেতে পারে। আর মুফতি হচ্ছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষণাকারী ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পক্ষ থেকে প্রচারকারী মাত্র। মুফতি যদি এমন কোন কথা বলেন যা তিনি জানেন না অথবা দলীল নিয়ে চিন্তা-ভাবনা, ইজতেহাদ ও গবেষণার পর যে ব্যাপারে তার প্রবল ধারণা নেই ঐ বিষয়ে কথা বললে তা আল্লাহ ও তার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিরোধী হবে এবং তা জ্ঞানহীন কথা হিসাবেই গণ্য হবে। এভাবে বলার কারণে শাস্তি ধার্য হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِالْحَقِّ لَمَّا جَاءَهُ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى للكافرين} [العنكبوت: ٦٨] .
আর সে ব্যক্তির চেয়ে যালিম আর কে, যে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে অথবা তার নিকট সত্য আসার পর তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে? জাহান্নামের মধ্যেই কি কাফিরদের আবাস নয়? (সূরা আল আনকাবুত ২৯:৬৮)
৫৮. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, কুরআন হিফয করার কোন দু'আ আছে কি? আর কুরআন হিফয করার পদ্ধতি কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, একটি হাদীছ ছাড়া কুরআন হিফয করার কোন দু'আ আমার জানা নেই। নাবী দ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি আলী ইবনে আবি তালেব (রাঃ) কে দু'আ শিখিয়ে দেন। [৬৩] হাদীছটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে কথা রয়েছে। ইবনে কাছির (রহঃ) বলেন, হাদীছটি স্পষ্ট গরিব এবং মুনকারও বটে। ইমাম যাহাবী (রহঃ) বলেন, হাদীছটি منکر شاذ (মুনকার শায)। তবে হিফয করার পদ্ধতি হচ্ছে মানুষ হিফয অব্যাহত রাখবে। এক্ষেত্রে দু'টি পদ্ধতি আছে।
প্রথমত: যথাসম্ভব একটি অথবা দু'তিনটি করে আয়াত মুখস্থ করবে। দ্বিতীয়ত: একটি করে পৃষ্ঠা মুখস্থ করা যেতে পারে।
মানুষ বিভিন্নভাবে কুরআন মুখস্থ করে। কতিপয় মানুষ একটি করে পৃষ্ঠা মুখস্থ করা উত্তম মনে করে যতক্ষণ মুখস্থ না হয় তা পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। আবার কেউ একটি করে আয়াত মুখস্থ করে তা বারবার পড়তে থাকে অতঃপর তা মুখস্থ হলে অন্য আয়াত মুখস্থ করতে থাকে। এভাবেই মুখস্থ পূর্ণ হতে থাকে। প্রথম অথবা দ্বিতীয় পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত হবে। ভালভাবে মুখস্থ না হওয়া পর্যন্ত অন্য আয়াত বা পৃষ্ঠা মুখস্থ করবে না। প্রতিদিন সকালে নির্দিষ্ট অংশ মুখস্থ করার জন্য প্রস্তুতি নেয়া উচিত। ঐ নির্দিষ্ট অংশ মুখস্থ হলেই নতুন পাঠ মুখস্থ আরম্ভ করবে।
৫৯. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আমি শারঈ জ্ঞানার্জন করতে ইচ্ছুক। আমি তা শুরু করতে চাই কিন্তু কিভাবে তা শুরু করবো এ ব্যাপারে আমাকে আপনি কি উপদেশ দিবেন?
জবাবে শাইখ বলেন, শিক্ষার্থীর জন্য উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে: (১) আল্লাহর কিতাব বুঝার জন্য নির্ভরযোগ্য তাফসীর অধ্যয়ন শুরু করবে। যেমন: তাফসীর ইবনে কাছির ও তাফসীরে বাগাভি। (২) অতঃপর নির্ভরযোগ্য জ্বহীহ হাদীছ অধ্যয়ন করবে। যেমন: বুলুগুল মারাম, মুনতাক্বি এবং আবশ্যকীয় জ্বহীহ হাদীছের মূল কিতাবসমূহ। যেমন: ছুহীহ বুখারী, জ্বহীহ মুসলিম। (৩) সঠিক আক্বীদার কিতাবসমূহও অধ্যয়ন করবে। যেমন: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) রচিত আক্বীদা আল-ওয়াসেত্বীয়া। (৪) অতঃপর ফিক্বহের সংক্ষিপ্ত কিতাবসমূহ অধ্যয়ন করবে যাতে কুরআন-সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী মাযহাবের মাসআলাসমূহ বুঝা যায়। এরপর গভীর জ্ঞানার্জনের জন্য বিস্তারিত ব্যাখ্যামূলক কিতাব অধ্যয়ন করবে যাতে ইলম বৃদ্ধি পায়।
৬০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আমল পরিত্যাগ করে ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে বের হওয়া কারো জন্য বৈধ হবে কি যাতে সে তার পিতা-ভাই পরিবারের জন্য মর্যাদার কারণ হয়?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, নিঃসন্দেহে আমলের চেয়ে ইলম অর্জন করা উত্তম। বরং এটা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে ইসলামী সমাজে বিদ'আত প্রকাশ পেয়েছে, তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে এবং দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
যারা ইলম ছাড়া ফাতওয়া দেয় তাদের মাঝে রয়েছে অনেক অজ্ঞতা। আর অনেক মানুষ বিতর্কে লিপ্ত হচ্ছে। নিচের তিনটি বিষয়ে নবীন শিক্ষার্থীদেরকে উৎসুক হতে বাধ্য করা হচ্ছে।
প্রথমত: নিকৃষ্ট বিদ'আত প্রকাশ পাওয়া।
দ্বিতীয়ত: ইলম ছাড়াই কতিপয় মানুষের ফাতওয়া প্রদান করা।
তৃতীয়ত: কখনো আলিমদের নিকট স্পষ্ট এমন বিভিন্ন মাসআলা নিয়ে বেশি বেশি তর্কে লিপ্ত হওয়া। আর যে বিষয়ে তর্ক করা হয় ঐ ব্যাপারে ইলম ছাড়াই ফাতওয়া দেয়া।
এ প্রেক্ষিতে আমাদেরকে এমন আলিমের শরণাপন্ন হতে হবে যাদের রয়েছে পর্যবেক্ষণের যথার্থ গভীর জ্ঞান এবং আল্লাহর দীন সম্পর্কে সুক্ষ্ম বুঝ। আর রয়েছে আল্লাহর বান্দাদেরকে দিক-নির্দেশনা দানে হিকমত-প্রজ্ঞা। কেননা, বর্তমানে অনেকেই কোন মাসআলা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে চলেছে। অথচ মস্তিষ্ক প্রসূত চিন্তাধারার জ্ঞান মানুষের সংশোধন ও প্রশিক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইলম ছাড়া এভাবে ফাতওয়া দেয়া মারাত্মক অনিষ্ট সাধনের মাধ্যম বলে গণ্য হয় যার অনিষ্টতার সীমারেখা আল্লাহ ব্যতিত কারো জানা নেই। শিক্ষার জন্য ছাহাবীগণ কখনো এমন বিষয় পালন করতে বাধ্য হতেন যা নছ দ্বারা আবশ্যকতা বুঝায় না। উমার ইবনে খাত্তাব (রা.) তিন তালাক্ব সম্পন্ন করা আবশ্যক করেন। রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে, আবু বকর (রা.) এর শাসনামলে ও উমার (রা.) এর খিলাফতকালে প্রথম দু'বছর পর্যন্ত তিন তালাক্ব এক তালাক্ব হিসাবে সাব্যস্ত হতো। কিন্তু একই বৈঠকে তিন তালাক্ব দেয়া হারাম। কেননা, এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার সীমারেখা অতিক্রম করা হয়। উমার (রা.) বলেন, আমি লোকদের দেখেছি যে, তারা একটি বিষয়ে অতি ব্যস্ততা দেখিয়েছে যাতে তাদের ধৈর্যের (ও সুযোগ গ্রহণের) অবকাশ ছিল। এখন যদি বিষয়টি তাদের জন্য কার্যকর সাব্যস্ত করে দেই (তবে তা-ই কল্যাণকর হবে)। সুতরাং তিনি তাদের জন্য বাস্তবায়ন ও কার্যকর সাব্যস্ত করলেন। [৬৪]
রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে, আবূ বকর (রা.) এর শাসনামলে ও উমার (রা.) এর খিলাফতকালে প্রথম দু'বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তিন
তালাকুকে তিন তালাক্ব হিসাবেই তিনি সাব্যস্ত করেন; এক তালাকু নয়। তিনি মানুষের জন্য পৃথকভাবে তিন তালাক্ব আবশ্যক করে দেন। প্রথম দু'যুগে এক তালাকের পর মানুষ যদি তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চাইতো তাহলে বিশুদ্ধ পন্থায় ফিরিয়ে নিতে পারতো। কিন্তু তিনি মনে করলেন যে, তিন তালাক্ব সম্পন্ন করাই ভাল এবং স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতেও তিনি মানুষকে নিষেধ করেন। নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে কাপড়ের এক পার্শ্বে খেজুরের ডাল দ্বারা চল্লিশ বেত্রাঘাত করে অথবা জুতা পিটিয়ে মদপানকারীকে শান্তি দেয়া হতো। আবূ বকর ও উমার ( এর যুগেও এরূপ করা হতো। মদপান বৃদ্ধি পেলে তিনি ছাহাবীদেরকে সমবেত করে তাদের কাছে পরামর্শ চান। আব্দুর রহমান ইবনে আওফ ( বলেন, সর্বনিম্ন শাস্তি হওয়া উচিত আশি বেত্রাঘাত। অতঃপর তিনি মদপানের শান্তি আশি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করেন।[৬৫] আসলে এসবই হলো মানুষকে সংশোধন করার বিধান। সুতরাং কোন মুসলিম অথবা মুফতি অথবা আলিমের উচিত হবে মানুষের অবস্থাদী নিরীক্ষণ করা এবং তাদের জন্য কল্যাণকর বিষয় ভেবে দেখা।
৬১. শাইখের কাছে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা কি দলীল নিয়ে পর্যালোচনা করত ইলম অর্জন করবে নাকি ইমামদের কোন মাযহাবের অনুসরণ করবে? এ ব্যাপারে আপনার মত কি?
জবাবে শাইখ (বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা ইলম অর্জনে যথাসম্ভব দলীল নিয়ে আলোচনা করতে পারে। এখানে দলীল খুঁজে পাওয়াই উদ্দেশ্য। ফলত দলীল অনুসন্ধানের উপর শিক্ষার্থীর অনুশীলন বজায় থাকবে এবং দলীল উপস্থাপনের পদ্ধতিও তারা জানবে। আর এভাবে তারা দেখে-শুনে দলীলসহ আল্লাহর দিকে অগ্রগামী হবে। বাধ্যগত অবস্থা ব্যতিরেকে কারো জন্য তাক্বলীদ করা বৈধ নয়। অবস্থা যদি এমন হয় যে, পর্যালোচনার পরও কোন সিন্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব হলো না। তাৎক্ষণিক নতুন কোন বিষয় জানার প্রয়োজনবোধ হলো কিন্তু চাহিদা শেষ হওয়ার আগে দলীলসহ হুকুম জানা সম্ভব হলো না; তাহলে এমতাবস্থায় তাক্বলীদ করা যেতে পারে, তবে দলীল স্পষ্ট হলে সে দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে। আর মুফতিদের মাঝে মতভেদ হলে কখনো বলা হবে, এটা উত্তম, এটা সহজ। এসব উক্তি আল্লাহ তা'আলার বাণীর সাথে সামঞ্জস্যতা রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ} [البقرة: ١٨٥]
আল্লাহ তোমাদের সহজ চান এবং কঠিন চান না (সূরা আল-বাক্বারা ২:১৮৫)।
আবার কখনো বলা হবে, এটা কঠিন হিসাবেই নেয়া হবে। কেননা, সন্দেহ ছাড়াই এতে সতর্কতা রয়েছে। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, "من اتقى الشبهات فقد استبرأ لدينه وعرضه".
যে সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকে সে মূলত তার দীন ও মান-ইজ্জতকেই রক্ষা করে। [৬৬]
সুতরাং প্রবল ধারণায় কোন বিষয় সঠিকতার অধিক নিকটবর্তী হলে ঐ বিষয়টি সম্পর্কে অধিক জানা ও সতর্ক থাকার কারণে তা গ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রগণ্যতা বজায় থাকবে।
৬২. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কোন কোন কিতাব অধ্যয়নের পরামর্শ দিবেন? আমরা আপনার নিকট শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে দিক নির্দেশনা কামনা করছি।
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, কিতাবসমূহের মধ্যে যা অধ্যয়ন করা উত্তম তা হচ্ছে নির্ভরযোগ্য তাফসীরের কিতাবসমূহ যেমন : تفسير ابن کثیر তাফসীরে ইবনে কাসীর ও শাইখ আব্দুর রহমান সা'দী (রঃ) এর কিতাব। আর হাদীছের কিতাবের মধ্যে উত্তম হলো: ফাতহুল বারী শারহু জ্বহীহ বুখারী, ছুবুলুস সালাম শারহু বুলুগুল মারাম, নাইলুল আওত্বার, রিয়াযুছ জ্বালেহীন ইত্যাদি।
উপকারী ইলম অর্জন, সৎ আমল করা ও উত্তম চরিত্র গঠনের জন্য আমরা শিক্ষার্থীদেরকে উপদেশ দিবো। আর দীন ও দুনিয়া উভয় ক্ষেত্রে যা কিছু উত্তম ও কল্যাণকর তা অর্জনে সময় ব্যয় করবে। নিজেদেরকে ভাল কাজে নিয়োজিত রাখবে। যে সব ক্ষেত্রে পার্থিব ও পরকালিন স্বার্থকতা ও সৌভাগ্য নিহিত আছে তাতে ধৈর্য ধারণ করবে।
৬৩. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, বয়স্কদের মধ্যে যারা ইলম অর্জন শুরু করতে চায় তাদের ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি? কোন শাইখের শরণাপন্ন
হওয়া ও সাক্ষাত করা তাদের পক্ষে সম্ভব না হলে এক্ষেত্রে শাইখ ছাড়া ইলম অর্জন তাদের কোন কাজে আসবে কি?
জবাবে শাইখ বলেন, যারা ইলম অর্জনের দিকে অগ্রসর হয় তাদেরকে যেন আল্লাহ তা'আলা সাহায্য করেন, আমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট এ প্রার্থনাই করি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইলম অর্জন কঠিন কাজ; তা অর্জনে কঠোর চেষ্টা-সাধনার প্রয়োজন হয়। কেননা, আমরা জানি যে, যাদের বয়স বেশি সাধারণত তাদের শারীরিক কাঠামো বর্ধিত হয় কিন্তু তাদের বুঝ শক্তি তুলনা মূলক কমে যায়। ইলম অর্জনে ইচ্ছুক এ বয়স্ক ব্যক্তি এমন একজন আলিম নির্বাচন করবেন যিনি ইলমের দিক থেকে বিশ্বস্ত। যাতে তিনি ঐ আলিমের নিকট ইলম অর্জন করতে পারেন। কেননা, শাইখদের শরণাপন্ন হয়ে ইলম অর্জন অধিকতর সফল ও সহজ হয়। আর এভাবেই তিনি অধিক সফল হবেন। শাইখ হচ্ছেন জ্ঞানগত দিক থেকে সুপরিসর। বিশেষত ইলমুন নাহু, তাফসীর, হাদীছ, ফিক্বহসহ অন্যান্য বিষয়ের উপকারী জ্ঞান যার রয়েছে বিশটা কিতাব অধ্যয়নের চেয়ে ঐ শাইখের নিকট সহজে ইলম অর্জন করা যায় এবং এতে কম সময় ব্যয় হয়। আর এভাবে অধিক নিরাপদে ইলম অর্জন করা যায়। কখনো এমন হয় যে, শিক্ষার্থী যে কিতাবের উপর নির্ভর করে ঐ কিতাবের লেখকের মতাদর্শ দলীল-প্রমাণ অথবা বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে সালাফদের রীতি-পদ্ধতি বিরোধী হয়। সুতরাং ইলম অর্জনে ইচ্ছুক এ বয়স্ক ব্যক্তির জন্য আমাদের পরামর্শ থাকবে যে, তিনি কোন একজন বিশ্বস্ত শাইখের শরণাপন্ন হয়ে তার নিকট থেকে ইলম অর্জন করবেন। এটাই তার জন্য অধিকতর সফলতা বয়ে আনবে। এতে সে নিরাশ হবে না। আর সে একথাও বলবে না, 'আমিতো বৃদ্ধ হয়ে গেছি' আমি ইলম অর্জন থেকে বঞ্চিত।
একটা ঘটনা স্বরণ হলো, জৈনক লোক যুহর জ্বলাতের পর মসজিদে প্রবেশ করে বসে পড়ে। এরপর একজন লোক তাকে বলে, তুমি দু'রাকাআ'ত জ্বলাত আদায় করে বসো। অতঃপর সে দু'রাকাআ'ত জ্বলাত আদায় করে বসে। আবার আছর জ্বলাতের পর একদিন সে মসজিদে প্রবেশ করে দু'রাকাআ'ত জ্বলাত আদায়ের জন্য তাকবির দেয়। অতঃপর লোকটি বলে, তুমি জ্বলাত আদায় করো না; এটা নিষিদ্ধ সময়। তোমার জন্য ইলম অর্জন করা আবশ্যক। এ কথা শুনে সে ইলম অর্জন শুরু করে। এমনকি সে ইমাম হয়ে যায়। জ্বলাত আদায় করা বা না করার এ অজ্ঞতা ছিল তার ইলম না থাকার কারণে। আল্লাহ তা'আলা শিক্ষার্থীর উত্তম নিয়্যাতের কারণে তার উপর অনুগ্রহ করেন। ফলে শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত জ্ঞানার্জন করতে সক্ষম হয়।
৬৪. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইলম অর্জনে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য কোন কোন বই অধ্যয়নের পরামর্শ দিবেন? বিশেষ করে আক্বীদা বিষয়ক বই পঠন সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, আক্বীদা বিষয়ক কিতাবসমূহের মধ্যে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহঃ) রচিত আল-আক্বীদা আল ওয়াসেত্বিয়া (العقيدة الواسطية) বইটি উত্তম। বইটি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআ'তের আক্বীদা বিষয়ক সংক্ষিপ্ত সার নির্যাস হিসাবেই সুপরিচিত। বইটি ব্যাখ্যার প্রয়োজন।[৬৭] প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা ঐ ব্যাখ্যা বুঝার প্রয়োজবোধ করবে। আক্বীদা সংক্রান্ত আরেকটি সুবিন্যস্ত কিতাব হলো کتاب عقيدة السفارييني এ কিতাবে এমন কিছু কথা আছে যা প্রকাশ্যে সালাফদের রীতি বিরোধী।
وليس ربنا بجوهر ولا عرض ... ولا جسم تعالى في العلى
অর্থাৎ আমাদের রব বস্তু নন, তাকে প্রদর্শন করা যায় না......আর তিনি উচ্চে দেহধারী নন।
এসবই সালাফদের রীতি বিরোধী কথা। কোন শিক্ষার্থী বিচক্ষণ শাইখের নিকট আক্বীদা বিষয়ক পাঠ গ্রহণ করলে সালাফদের মানহায-রীতি বিরোধী কথা তার নিকট স্পষ্ট হবে যা ঐ শিক্ষার্থীর জন্য উপকারী।
আর শিক্ষার্থী ছোট হলে 'উমদাতুল আহকাম' (عمدة الأحكام) মুখস্থ করবে, যা বুখারী ও মুসলিমের সংক্ষিপ্ত সংকলন। এক্ষেত্রে হাদীছের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে পর্যালোচনা ও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হবে না।
আর পরিভাষাগত জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বিরচিত نخبة الفكر গ্রন্থের তিন-চারটি পৃষ্ঠা মুখস্থ করবে যা স্মৃতিপটে স্থায়ী হওয়ায় উপণিত বয়সে এর উপকারীতা লাভ করবে।
আর তাফসীরের ক্ষেত্রে 'তাফসীর ইবনে কাছির' (تفسیر ابن کثیر) অত্যন্ত উপকারী গ্রন্থ এবং আব্দুর রহমান নাছির আস-সা'দী এর তাফসীর ( وتفسير الشيخ
(عبد الرحمن بن ناصر السعدي) গ্রন্থটিও সহজ ও নির্ভরযোগ্য। শিক্ষার্থীরা এ দু'টি কিতাব অধ্যয়ন শুরু করবে তারপর ক্রমান্বয়ে অন্যান্য ব্যাখ্যামূলক কিতাব পাঠ করবে।
ফিক্বহের কিতাবসমূহের মধ্যে زاد المستقنع গ্রন্থটি ভাল। যা সংক্ষিপ্ত ও বরকত পূর্ণ। আব্দুর রহমান আস-সা'দী এটির মূলপাঠ মুখস্থ করার পরামর্শ দেন।
নাহু শাস্ত্রে الأجرومية নামক গ্রন্থটি ভাল। এ সংক্ষিপ্ত কিতাবটি শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করবে। এরপর নাহুর সার সংক্ষেপ ألفية ابن مالك গ্রন্থটি পাঠ করবে যা শিক্ষার্থীদের জন্য উপকারী। আর সীরাত গ্রন্থের মধ্যে ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রহঃ) বিরচিত زاد المعاد গ্রন্থটি ভাল। বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ গ্রহণের অনেক বিধান সাব্যস্ত করণসহ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবনের যাবতীয় অবস্থা গ্রন্থটিতে তুলে ধরা হয়েছে। আর উছুল ফিক্বহের ক্ষেত্রে বলবো, বিষয়টি কঠিন। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য الأصول من علم الأصول নামক সংক্ষিপ্ত কিতাব রচিত হয়েছে।
ফারায়িযের ক্ষেত্রে البرهانية নামক কিতাবটি সংক্ষিপ্ত ও উপকারী যা সব ফারায়িয গ্রন্থের পরিপূরক। গ্রন্থটির লেখক মুহাম্মাদ আল-বুরহানী (রহঃ)।
৬৫. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, যে শিক্ষার্থী কোন কিছু পাঠ করে অথবা শিখে কিন্তু ভুলে যায় তার ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মানুষ যা কিছু শিখে তদানুযায়ী আমল করা দরকার। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَالَّذِينَ اهْتَدَوْا زَادَهُمْ هُدًى وَآتَاهُمْ تَقْوَاهُمْ}
যারা হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছে আল্লাহ তাদের হেদায়াত প্রাপ্তি আরো বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে তাদের তাকওয়া প্রদান করেন (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৭)। তিনি আরো বলেন,
{وَيَزِيدُ اللَّهُ الَّذِينَ اهْتَدَوْا هُدًى}
যারা সঠিক পথে চলে আল্লাহ তাদের হিদায়াত বৃদ্ধি করেন (সূরা মারইয়াম ১৯:৭৬)।
মানুষ তার ইলম অনুযায়ী আমল করলে আল্লাহ তা'আলা তার ইলম ও বুঝ শক্তি বৃদ্ধি করে দেন। }زادهم هدی{ এ আয়াতাংশের সাধারণ অর্থ থেকে এটা বুঝা যায়।
ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন, আমার মুখস্থ শক্তির দুর্বলতা সম্পর্কে আমি আমার শিক্ষকের নিকট অভিযোগ পেশ করলাম। তিনি আমাকে গুনাহ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন এবং তিনি বলেন, ইলম হচ্ছে নুর-আলো; আল্লাহ তা'আলা কোন পাপী তার আলো দান করেন না। যে বিদ্যার দ্বারা কুফরী হয় তা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা, মানুষ নানাবিধ অনর্থক চিন্তায় মগ্ন থেকে আনন্দবোধ করে ফলে তার ইলম অর্জনের সক্ষমতা দুর্বল হয়। মুখস্থ শক্তি অটুট রাখার আরো পদ্ধতি হলো যে, হক্ব জানার উদ্দেশ্যে সহপাঠীদের সাথে বেশি বেশি আলোচনা করতে হবে। পরস্পরকে পরাভূত করার উদ্দেশ্যে যেন আলোচনা না হয়। এভাবে হকু জানার একনিষ্ঠতা বজায় থাকলে নিঃসন্দেহে মুখস্থ শক্তি অটুট থাকবে ইনশাল্লাহ।
৬৬. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ফাতাওয়ার ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা যায় এমনকি অযোগ্য ছোটরাও ফাতাওয়া দেয়। এ সম্পর্কে আপনার পরামর্শ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, ফাতাওয়া প্রদান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গণ্য হওয়ায় এ সম্পর্কে জবাবদিহীতার কারণে এবং ইলম ছাড়াই ফাতওয়া দানের আশঙ্কায় সালাফ আলিমগণ কোন বিষয়ে ফাতাওয়া নিয়ে পর্যালোচনা করতেন। কেননা, মুফতি হচ্ছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ প্রচারক এবং শরী'আতকে স্পষ্টকারী। এ হিসাবে তিনি যদি না জেনেই কোন কিছু বলেন, হয়তো তা শিরক বলে গণ্য হতে পারে। তারা আল্লাহর তা'আলার নিম্নোক্তবাণী মনোযোগসহ শুনতেন- বুঝতেন। আল্লাহ বলেন,
{قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِالله مَا لَمْ يُنَزِّلْ به سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهُ مَا لَا تَعْلَمُونَ} [الأعراف: [۳۳
বল, আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর উপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না (সূরা আল-আরাফ ৭:৩৩)।
ইলম ছাড়া কথা বলার কারণে তার সাথে কোন কিছু অংশীদার স্থাপন হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا} [الإسراء: ٣٦] .
যে বিষয় তোমার জানা নাই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তকরণ এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৩৬)।
ফাতওয়া প্রদানে মানুষের ত্বরান্বিত করা উচিত নয়। বরং ভেবে দেখবে, গভীরভাবে চিন্তা ও পর্যবেক্ষণ করবে। সমাধানে অপারগ হলে তার চেয়ে যে অধিক জানে তার নিকট থেকে জেনে নিবে। যাতে আল্লাহ তা'আলার বিরূদ্ধে ইলম ছাড়াই কথা বলা থেকে বিরত থাকতে পারে। আল্লাহ তা'আলা তার একনিষ্ঠ নিয়্যাত সম্পর্কে জানেন। তিনি চাইলে তাকে সংশোধন করবেন। ফলে সে সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছতে সক্ষম হবে যা সে চায়। আল্লাহ তা'আলা যাকে চান তাওফীক দান করেন এবং তাকে মর্যাদাবান করে দেন। আর যে ইলম ছাড়াই ফাতওয়া দেয় সে জাহিলের চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট। কারণ জাহিলতো শুধু বলে, আমি জানি না। জাহিল নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে জানে এবং সত্যকে সে আবশ্যক মনে করে। অপর দিকে যে নিজেকে সকল আলিমের চেয়ে অধিক জ্ঞাত মনে করে সে কখনো নিজে পথভ্রষ্ট হয় এবং অন্যকে পথভ্রষ্ট করে। আর জেনে-বুঝে সে মাসআলায় ভুল করে। এমনটা করা ছোট শিক্ষার্থীর জন্য গুরুতর অন্যায় ও মারাত্মক ক্ষতিকর।
৬৭. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কতিপয় ফিক্বহী মতভেদকে কিছু মতভেদের উপর প্রধান্য দেয়া শিক্ষার্থীর জন্য বৈধ হবে কি? অতঃপর সে ঐ প্রধান্য পাওয়া মতভেদ গ্রহণ করা আবশ্যক মনে করে। অগ্রগণ্য মতভেদ সম্পর্কে জেনে কিছু ক্ষেত্রে এ মতভেদকে সে গ্রহণ করবে কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, শিক্ষার্থীর নিকট কোন বিষয়ের হুকুম যদি পূর্ণরূপে স্পষ্ট না হয় এবং ঐ ক্ষেত্রে সন্দেহ থাকে তাহলে সতর্কতার সাথে অগ্রগণ্য মতকে গ্রহণ করবে। এছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করা আবশ্যক মনে করবে না। কেননা, হারাম অথবা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে তার নিকট এমন কোন সুস্পষ্ট দলীল নেই যা সে আল্লাহর কাছে যুক্তি হিসাবে পেশ করবে যা শরীয়তে সাব্যস্ত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কিছু বিষয়ে মুজতাহিদ সিন্ধান্ত নিতে দ্বিধাবোধ করেন। অতঃপর তিনি ঐ ব্যাপারে নিজে সমন্বয় সাধন করতে পছন্দ করেন। আর দুর্বোধ্য বিষয়ের সমাধানে তিনি ধৈর্য ধারণ করেন। কিন্তু তার এ আশঙ্কাও হয় যে, আল্লাহর বান্দা হয়তো ঐ বিষয়টাকে গ্রহণ করা আবশ্যক মনে করবে। এ জন্য আমরা বলবো, অগ্রগণ্য মত গ্রহণ করায় কোন বাধা নেই। কিন্তু চিন্তা-ভাবনার পুনরাবৃত্তি ছেড়ে দিবে না যতক্ষণ না বিষয়টি স্পষ্ট হয় এবং মানুষ দলীলের চাহিদা অনুসারে তা গ্রহণ করা আবশ্যক মনে করে। আর দলীল অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বিষয়টি সংক্ষিপ্ত হবে না বরং শরী'আত বর্ণনায় তা সংক্ষেপ হতে পারে। আর অগ্রগণ্য মত স্পষ্ট হলেই তার উপর আমল করা বৈধ নচেৎ বৈধ নয়।
৬৮. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইলম অনুযায়ী আমল করে ক্ষ্যান্ত থাকার ব্যাপারে মন্তব্য করা হয়, এ ব্যাপারে আপনার উপদেশ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, শরী'আতের কোন বিষয় সঠিক জেনে তা প্রচার করা আবশ্যক। কেননা, মানুষ যা জানে তা আমলের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা ওয়াজিব। এমনটা হলে আল্লাহ তা'আলা তার জন্য কুরআনের আলো বৃদ্ধি করে দিবেন। ফলে আমলের মাধ্যমে তার জ্ঞানের আলো বৃদ্ধি পেতে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَإِذَا مَا أُنْزِلَتْ سُورَةٌ فَمِنْهُمْ مَنْ يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذه إِيمَانًا فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا فَزَادَتْهُمْ إيمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ} [التوبة: ١٢٤]
যখনই কোন সূরা নাযিল করা হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, এটি তোমাদের কার ঈমান বৃদ্ধি করল? অতএব যারা মুমিন, নিশ্চয় তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং তারা আনন্দিত হয় (সূরা আত-তাওবাহ ৯:১২৪)।
{وَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ فَزَادَتْهُمْ رِجْسًا إِلَى رِجْسِهِمْ وَمَاتُوا وَهُمْ كَافِرُونَ} [التوبة: ١٢٥]
যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, এটি তাদের অপবিত্রতার সাথে অপবিত্রতা বৃদ্ধি করে এবং তারা কাফির মৃত্যুবরণ করে কাফির অবস্থায় (সূরা আত-তাওবাহ ৯:১২৫)।
বলা হয়ে থাকে, আমলের মাধ্যমে ইলম সংরক্ষিত হয় নচেৎ তা চলে যায়। সালাফে জ্বলিহীনরা কোন মাসআলা জানার পর তদানুযায়ী আমল করতেন। আর তাদের অনেকেই যা কিছু জানতেন দ্রুততার সাথে প্রকাশ্যে তা পালন করতেন। ছাহাবীগণ যা কিছু শিখতেন তা পালন করার ব্যাপারে তাদের মাঝে প্রতিযোগিতা হতো। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদেরকে ঈদের দিন ছাদাক্বাহ করা জন্য উৎসাহ দিতেন। দানের উদ্দেশ্যে তাদের কানের অলংঙ্কার তারা বিলাল (রাঃ) এর কাপড়ে জমা করতেন। বাড়ীতে পৌঁছার পর তাদেরকে বলতে শুনা যায়নি যে, 'আমরা ছাদাক্বাহ করেছি' বরং তারা বলতেন, আমরা প্রতিযোগিতা করেছি।
অনুরূপভাবে পুরুষ লোকের জন্য স্বর্ণের আংটি ব্যবহার হারাম জানার পর যে লোক তা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট পেশ করতেন সেটা আর ফেরত নিতেন না। এমনকি ঐ লোককে বলা হতো, তুমি তোমার আংটি নিয়ে নাও, তা দ্বারা উপকৃত হও। জবাবে সে বলতো, আল্লাহর শপথ! আমি আংটি ফেরত নিবো না যা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট পেশ করা হয়েছে। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বলতেন,
اخرجوا إلى بني قريظة: "لا يصلين أحد منكم العصر إلا في بني قريظة"
তোমরা বনী কুরাইযার উদ্দেশ্যে বের হও। বনী কুরাইযার এলাকায় পৌঁছা ব্যতিত কেউ যেন আছরের জ্বলাত আদায় না করে। [৬৮]
তারা বনী কুরাইযার উদ্দেশ্যে বের হয়ে এলাকার নিকটতম অবস্থানে পৌঁছলে রাস্তায় জ্বলাতের সময় হলে জ্বলাতের সময় শেষ হওয়ার আশঙ্কায় তাদের কেউ কেউ জ্বলাত আদায় করে নিল। তাদের কতিপয় লোক নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিম্নোক্ত বাণীর কারণে জ্বলাত দেরিতে আদায় করলো। নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"لا يصلين أحد العصر إلا في بني قريظة".
বনী কুরাইযার এলাকায় পৌঁছা ব্যতিত কেউ যেন আছরের জ্বলাত আদায় না করে।
সুতরাং হে শিক্ষার্থী ভাইয়েরা তোমরা লক্ষ্য করো ছাহাবীদের প্রতি যারা রসূল জ্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণের পর তা দ্রুত পালন করার জন্য এগিয়ে আসতেন। ইবাদত পালনে বর্তমানে যা কিছু ঘটে তা সামঞ্জস্য বিধান করলে প্রশ্ন জাগে বর্তমানে আমরা কি এ নির্দেশের উপর বহাল আছি? আমি বিশ্বাস করি যে, অনেকেই এ নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হয়। আমাদের অধিকাংশরই জানা আছে যে, জ্বলাত ইসলামের একটি স্তম্ভ যা পরিত্যাগের কারণে ব্যক্তি কাফির হয়ে যায়। আমরা এটাও জানি, জামাআ'তের সাথে জ্বলাত আদায় ফরযে আইনের অন্তর্ভুক্ত এবং তা আবশ্যক। আর অধিকাংশ নিষিদ্ধ বিষয়ও অনেকের জানা আছে। এরপরও দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা ঐ সব নিষিদ্ধ বিষয় হতে বিরত থাকে না। অনুরূপভাবে যারা ওয়াজিব পালন ছেড়ে দেয় তারা কোন ভ্রুক্ষেপই করে না। এটাই হলো পূর্ববর্তী ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মাঝে পার্থক্য।
৬৯. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইলম অর্জনের সঠিক পন্থা কি? শরী'আত বিষয়ক কিতাবের মূলপাঠ আয়ত্ব করবে নাকি তা বুঝে নিবে? এ ব্যাপারে স্পষ্ট ব্যাখ্যা জানতে চাই।
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, শিক্ষার্থীর উচিত যথাসাধ্য অল্প করে শিক্ষা অর্জন শুরু করা। উছুল শাস্ত্র, কাওয়ায়েদ ও রীতি-পদ্ধতি বিষয়ক সংক্ষিপ্ত কিতাব এবং অনুরূপ বিষয়ের মূলপাঠ অধ্যয়ন করতে হবে। কেননা, সংক্ষিপ্ত কিতাবাদী অধ্যয়নের মধ্যে দিয়ে ব্যাখ্যামূলক কিতাব পঠনের উপযোগীতা তৈরি হয়। এ কারণে উছুল শাস্ত্র ও কাওয়ায়েদ জানতে হয়। যে শিক্ষার্থী উছুল শাস্ত্র জানে না, সে মূলত (মৌলিক শিক্ষা থেকে) বঞ্চিত।
অনেক শিক্ষার্থীকে দেখা যায় যে, বিভিন্ন মাসআলা মুখস্থ করে কিন্তু তাদের কোন উছুলের জ্ঞান নেই। মুখস্থ নেই এমন বিরল কোন মাসআলা তারা দেখলে তা বুঝতে সক্ষম হয় না। কিন্তু আইন শাস্ত্র ও উছুল জানা থাকলে আংশিক মাসআলার উপর হুকুম নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়। এ কারণে আমি আমাদের ভাইদেরকে আইন শাস্ত্র, উছুল ও কাওয়ায়েদ শিক্ষা অর্জনের প্রতি উৎসাহিত করবো। এতে বৃহৎ উপকার লাভ হবে। এ বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে, আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি যে, উছুল সম্পর্কে জ্ঞান লাভ এবং সংক্ষিপ্ত পাঠ আয়ত্ব করা উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিছু মানুষ ষড়যন্ত্র মূলক আমাদেরকে বলে, মুখস্থ
করাতে কোন উপকারীতা নেই বরং অর্থ জেনে রাখাই মূল বিষয়। কিন্তু তাদের এ ধরনের চিন্তা-চেতনা আমরা দূর করেছি। আল্লাহ তা'আলা যা চেয়েছেন নাহু শাস্ত্র, উছুল ফিক্বহ ও তাওহীদের পাঠ আমরা মুখস্থ করেছি। মুখস্থ বিদ্যাকে অবহেলা করা যাবে না। এটাই মৌলিক বিষয়। হয়তো তোমাদের মধ্যে কেউ ইবারত উল্লেখ পূর্বক পাঠ করে। কিন্তু শিক্ষার্থীর জন্য পাঠ মুখস্থ করাই গুরুত্বপূর্ণ যদিও তাতে কিছু জটিলতা রয়েছে। আমরা তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, যেন তোমরা সালাফে জ্বলিহীনের পথ খুঁজে পাও। তিনি যেন আমাদেরকে হেদায়াত প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। তিনিই দাতা, দয়াময়।
৭০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে বের হওয়াকে কেন্দ্র করে যে সব শিক্ষার্থী দাওয়াত দান ছেড়ে দেয় তাদের ব্যাপারে আপনার মতামত কি? ইলম অর্জন ও দাওয়াত দান উভয়ের মাঝে তারা সমন্বয় সাধন করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রবল ধারণা রয়েছে যে, দাওয়াত দানে ব্যস্ত থাকলে ইলম অর্জন ছুটে যাবে। তারা মনে করে, ইলম অর্জনেই লিপ্ত থাকতে হবে এমনকি আংশিক ইলম অর্জন হলে দাওয়াত দান ও প্রশিক্ষণের কাজে যোগদান করতে পারবে এ ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দান একটি সুউচ্চ মর্যাদাপূর্ণ মহৎ কাজ। কেননা, এটা নাবী রসূলদের কর্ম। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ}
তার চেয়ে কার কথা উত্তম? যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, অবশ্যই 'আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত (সূরা হা-মিম-সাজদাহ ৪১:৩৩)।
আল্লাহ তা'আলা নাবী মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নিম্নের বাণী প্রচার করতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন,
{قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةِ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ}
বল, এটা আমার পথ, আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই (সূরা ইউসূফ ১২:১০৮)।
এখানে জ্ঞাতব্য যে, ইলম ছাড়া দাওয়াত দান সম্ভব নয়। যেহেতু আয়াতে বলা হয়েছে }على بصيرة{। তাই না জেনে ব্যক্তি কিভাবে দাওয়াত দিবে? আর যারা ইলম-বিদ্যা ছাড়া আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয় তারা আল্লাহর বিরূদ্ধে এমন কথা বলে যা তারা জানে না। কাজেই দাওয়াত দানের জন্য জ্ঞান অর্জনই প্রথম স্তর। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইলম অর্জন ও দাওয়াত দানের মাঝে সমতা বজায় রাখতে হবে। যদি সমন্বয় সাধন সম্ভব না হয় তাহলে ইলম অর্জনেই লিপ্ত থাকবে। কেননা, ইলম অর্জনকে কেন্দ্রীভূত করে দাওয়াত দেয়া হয়। 'কিতাবুল ইলম' পর্বের দশম অধ্যায়ে ইমাম বুখারী (রহ.) বলেন, باب العلم قبل القول والعمل। এ অধ্যায়ের অনূকুলে আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত বাণী দলীল হিসাবে তিনি পেশ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلِّبَكُمْ ومثواكم}
জেনে রাখ, নিঃসন্দেহে আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য ইলাহ নেই। তুমি ক্ষমা প্রার্থনা কর তোমার এবং মুমিন নারী-পুরুষদের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্যে। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং নিবাস সম্পর্কে অবগত রয়েছেন (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৯)।
ইমাম বুখারী (রহ.) প্রথমে ইলম অর্জনের কথা বলেন। আর যারা মনে করে যে, ইলম অর্জন ও দাওয়াত দানের মাঝে সমতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। তাদের এ ধারণা ভুল। ইলম অর্জন ও দাওয়াত দান উভয়ই সম্ভব। শিক্ষার্থী ইলম অর্জন অবস্থায় তার পরিবারবর্গ, প্রতিবেশী, নিজ এলাকা ও দেশবাসীকে দাওয়াত দিবে। বর্তমানে জরুরী হলো সম্ভবপর গভীর জ্ঞানার্জন করা যার ভিত্তি হচ্ছে শারঈ উছুল। আর বস্তুগত জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ কিছু বিষয় বুঝতে পারে যা সে শিখে। উছুল ছাড়াই সে তা সাধারণভাবে শিখে, যার কোন ভিত্তি নেই। এ ইলম হচ্ছে খুবই সীমিত। এ ইলমের মাধ্যমে উপযুক্ত সময়ে মানুষ হক্বের প্রতিবন্ধকতা ও বাতিলপন্থীদের তর্ক-বিতর্ক দূর করতে পারে না। এজন্য মুসলিম যুবক শ্রেণীর প্রতি আমার উপদেশ হচ্ছে তারা যেন আল্লাহর দিকে দাওয়াত দানে প্রতিষ্ঠিত।
থেকে ইলম অর্জনে যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালায়। কোন প্রতিবন্ধকতাই যেন ইলম অর্জন থেকে তাদেরকে বিরত না রাখে। কেননা, ইলম অর্জন করা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের নামান্তর। এজন্য আলিমগণ বলেন: ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে কেউ বেরিয়ে গেলে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ হিসাবে তাকে যাকাত দেয়া যেতে পারে। এটা ইবাদতে লিপ্ত থাকার বিপরীত বিষয়। কেননা, ইবাদতকারীকে যাকাত দেয়া যায় না। যেহেতু তিনি অর্থ উপার্জনে সক্ষম।
৭১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইলমুত তাজভীদ শিক্ষা আবশ্যকতার ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি? আর "الصلاة، الزكاة" ইত্যাদি শব্দের শেষে : বর্ণে ওয়াক্ফ করা জ্বহীহ?
জবাবে শাইখ (রহ.) বলেন, ইলমুত তাজভীদের হুকুমসমূহ জানা আমি ওয়াজিব মনে করি না। এটা ক্বিরাত তথা পঠনরীতির সৌন্দর্যতার অন্তর্ভুক্ত। আর সৌন্দর্যতা আবশ্যকতার অন্তর্ভুক্ত নয়। জ্বহীহ বুখারীতে উল্লেখ আছে আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ক্বিরাআত কেমন ছিল? তার কিরাআত ছিল দীর্ঘ। অতঃপর তিনি পাঠ করতেন,
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ তিনি বিসমিল্লাহ টেনে পড়তেন। الرَّحْمَنِ ও الرَّحِيمِ শব্দেও টেনে পড়তেন। এখানে টেনে পড়া স্বভাবগত ব্যাপার; এর উপর নির্ভর করার দরকার নেই। দলীলের মাধ্যমে বুঝা যায়, তা স্বভাবগত বিষয়। যদি বলা হতো, তাজভীদের কিতাব সমূহে তাজভীদের বিস্তারিত হুকুমসমূহ জানা ওয়াজিব। তাহলে অবশ্যই তা আবশ্যক মনে করার কারণে অধিকাংশ মুসলিমের পাপ হতো। আমরা এক্ষেত্রে বলবো, যারা অধিকতর ভাষার বিশুদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করতে চায়, তারা বিদ্বানদের কিতাবে লিখিত ইলমুত তাজভীদের হুকুম-নিয়মাবলী মেনে চলবে। এটা শিক্ষার্থীর প্রশিক্ষণেও প্রযোজ্য হতে পারে। যাতে সকলের জানা থাকে যে, কোন কথা ওয়াজিব হওয়ার জন্য দলীল প্রয়োজন যা পালনের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট এমন বিষয় হতে দায়িত্বমুক্ত থাকা যায় যা বান্দার উপর আবশ্যক হওয়ার ব্যাপারে দলীল নেই। আব্দুর রহমান ইবনে সা'দী (রহ.) বলেন, তাজভীদের নিয়মাবলী বিস্তারিত (ব্যাকরণগত) নিয়ম কানুনের মতই যা ওয়াজিব নয়। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) এর কথা থেকে জানতে
পেরেছি। ইবনে কাসিম (রাহিমাহুল্লাহ) এর মাজমূ'আহ ফাতওয়ার ১৬ তম খন্ড ৫০ পৃষ্ঠায় তাজভীদের হুকুম সম্পর্কে তিনি বলেন, এমন বিষয়ে উৎসাহিত হওয়ার দরকার নেই যা কুরআনের প্রকৃত জ্ঞান থেকে অধিকাংশ মানুষকে নিবৃত রাখে। হরফসমূহের মাখরাজ, কণ্ঠস্থ করণ, উচ্চারণে জোড় প্রদান, আকৃষ্ট করণ, দীর্ঘ, সংক্ষিপ্ত ও মধ্যম পন্থায় টেনে পড়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে ওয়াসওসা রয়েছে যা আল্লাহ তা'আলার কথার উদ্দেশ্যে বুঝা থেকে অন্তরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। যেমন {اَنذَرْتَهُم}
আয়াতাংশের উচ্চারণ এবং "عليهم" শব্দের 'মিম' বর্ণ পেশ পড়া এবং তা 'ওয়াও' বর্ণের সাথে মিলিয়ে পড়া, 'হা' বর্ণে যের অথবা পেশ পড়া অনুরূপ অন্যান্য নিয়মে বিভিন্ন শব্দ পড়া। অনুরূপভাবে কেবল সুর করে সুন্দর আওয়াজে পড়ার উদ্দেশ্যে তাজভীদ শিখলে কুরআনের মর্মার্থ বুঝার অন্তরায় সৃষ্টি হবে। আর "الصلاة ، الزكاة ইত্যাদি শব্দের ':' বর্ণে ওয়াক্ফ করা হয় বলে যা শুনো তা সঠিক নয়। বরং বর্ণে ওয়াক্ত করা হয়।
৭২. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, صلى الله عليه وسلم বাক্যেটির সংক্ষিপ্তরূপ প্রকাশ করণে কিছু মানুষ বন্ধনী ব্যবহার করে "ص" বর্ণ লিখে থাকে। এরূপ সংক্ষিপ্তভাবে লেখা সঠিক বলে গণ্য হবে কি?
জবাবে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, কোন হাদীছ লেখার ব্যাপারে আলিমগণ যে পরিভাষা ব্যবহার করেছেন তা অনুরূপভাবে লিখে প্রকাশ করা শিষ্টাচারিতার অন্তর্ভুক্ত। صلى الله عليه وسلم বাক্যেটির সংক্ষিপ্তরূপ "ص" বর্ণ ব্যবহার করে প্রকাশ করা ঠিক নয়। অনুরূপভাবে "صلعم" লেখাও দরূদ বলে গণ্য হবে না। নিঃসন্দেহে এরূপ সংক্ষিপ্ত বর্ণ প্রতীক ব্যবহারের কারণে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর দরূদ পাঠের ছাওয়াব থেকে ঐ ব্যবহারকারী বঞ্চিত হবে। আর পূর্ণ দরূদ যে লিখবে অতঃপর যে তা পাঠ করবে ঐ প্রথম লেখকের জন্য ছাওয়াব লাভ হবে। আর প্রকাশ থাকে যে, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
"أن من صلى عليه صلى الله عليه وسلم مرة واحدة صلى الله عليه بها عشراً".
যে ব্যক্তি নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর একবার দরূদ পাঠ করবে আল্লাহ তা'আলা তার উপর দশবার দয়া বর্ষণ করবেন।[৬৯] সুতরাং ত্বরান্বিত হয়ে এরূপ প্রতীকি বর্ণ লিখে ছাওয়াব ও প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হওয়া মুমিনের জন্য উচিত নয়।
৭৩. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কোন সমাবেশে শারঈ প্রশ্ন উত্থাপন করা হলে জনসাধারণ অধিকাংশ সময় ইলম ছাড়াই ঐ মাসআলায় ফাতওয়া দানে প্রতিযোগিতা শুরু করে দেয়। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি? এ অবস্থা আল্লাহ ও তার রসূলের সামনে আগ বাড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে গণ্য হবে কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, জেনে রাখতে হবে যে, আল্লাহর দীনের ব্যাপারে ইলম ছাড়া কথা বলা কারো জন্য বৈধ নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেন, {قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ} [الأعراف: ৩৩]
বল, আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর উপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না (সূরা আল-আরাফ ৭:৩৩)।
ইলম ছাড়া আল্লাহর বিরূদ্ধে কোন কিছু বলার ব্যাপারে মানুষের ভীত-সন্ত্রস্ত থাকা ওয়াজিব-আবশ্যক। এটা পার্থিব বিষয় নয় যে, তাতে বিবেক খাঁটিয়ে কিছু বলার সুযোগ আছে। আর দুনিয়াবী কোন বিষয় হলেও তাতে যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করা ও ভেবে দেখা উচিত। মানুষকে কোন বিষয়ে যে জবাব দান করা হয় তা জবাব প্রাপ্তদের মাঝে হুকুমের মতই গণ্য হয়। আর ঐ জবাবটিই হয়তো শেষ ফায়ছালা হিসাবে বিবেচিত হয়। দেখা যায়, অধিকাংশ মানুষ শারঈ মাসআলার শরণাপন্ন হওয়া ব্যতিরেকে নিজের রায় তথা সিন্ধান্ত অনুসারে কথা বলে। বিভিন্ন রায়-সিন্ধান্ত গ্রহণের চেয়ে সঠিক বিষয়ের সন্ধানে একটু বিলম্ব হলেও মানুষের নিকট ঐ সঠিক পন্থা স্পষ্ট হয় যার উপর সে বহাল ছিল না। এজন্য সকলের প্রতি আমার উপদেশ থাকবে যে, চূড়ান্ত ফায়ছালা খুঁজে পেতে একটু বিলম্ব
করবে। বিভিন্ন রায়-সিন্ধান্তের মাঝে যেন তা ফায়ছালা হিসাবে গণ্য হয়। নানা রকম রায়-সিন্ধান্তে এটাও স্পষ্ট হবে যা শুনার পূর্বে প্রকাশ পায়নি। এটা পার্থিব বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত। অপরদিকে কিতাব-সুন্নাহ অথবা বিদ্বানগণের কথা জেনে-বুঝে তার উপর আমল করা ব্যতিরেকে কারো জন্য দীনি ব্যাপারে কথা বলা কখনোই বৈধ নয়।
৭৪. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, بدائع الزهور নামক কিতাব সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
জবাবে শাইখ (স) বলেন, এ কিতাবে এমন কিছু বিষয় আমি দেখেছি যা ছুহীহ নয়। আমি মনে করি না যে, মানুষ এ কিতাবের প্রতি মনোযোগী হবে। এ কিতাবে মুনকার বিষয় নিহিত থাকায় তা অনুসরণযোগ্য নয়।
৭৫. تنبيه الغافلين নামক কিতাব সম্পর্কে কি বলবেন?
জবাবে শাইখ (স) বলেন, এটি একটি উপদেশ মূলক বই। এতে অধিকাংশ উপদেশ দ্বঈফ-দুর্বল হিসাবে গণ্য। বইটিতে বানোয়াট উপদেশ ও কাহিনী রয়েছে যা জ্বহীহ নয়। অন্তর বিগলিত করণ এবং অশ্রু ঝড়ানোই এ কিতাবের লেখকের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এটা সঠিক পন্থা নয়। কেননা, আল্লাহর কিতাব ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ নির্ধারিত উপদেশই যথেষ্ট। ছুহীহ নয় এমন বিষয়ের মাধ্যমে উপদেশ দেয়া উচিত হবে না হোক তা রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অথবা সৎলোক সম্পর্কিত কোন বিষয়। এমন বিষয়ের মাধ্যমে উপদেশ দেয়া হলে মানুষ কথা-কর্মে ভুল পথ অনুসরণ করবে। তবে কিতাবটিতে কিছু বিষয় আছে যাতে অসুবিধা নেই। এ সত্ত্বেও আমি কিতাবটি পড়ার জন্য উপদেশ দিবো না। যে লেখকের কিতাবে ইলমের কথা ও বুঝ আছে, যাতে রয়েছে জ্বহীহ, দ্বঈফ ও মাওদুউ-জালের মাঝে পার্থক্য কেবল ঐ কিতাবই পাঠ করবে।
৭৬. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামে আলিমগণের গুরুত্ব ও অবস্থান কি?
জবাবে শাইখ (স) বলেন, ইসলামে আলimগণের বড় মর্যাদা রয়েছে। কেননা, তারাই নাবীগণের উত্তরাধিকারী। এজন্য ইলম শিক্ষা দেয়া এবং আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়া তাদের উপর ওয়াজিব যা অন্যের উপর ওয়াজিব নয়। আকাশে তারকার অবস্থান যেমন পৃথিবীতে তাদের অবস্থান তেমনই। পথভ্রষ্টদেরকে তারা
পথ দেখান। তাদের নিকট হক্বের বর্ণনা করেন এবং মন্দ কর্ম সম্পর্কে তারা সতর্ক করেন। পৃথিবীতে আলিমগণ হলেন বৃষ্টির মত যা বর্ষণ হওয়ায় অনূর্বর ভূমি আল্লাহর হুকুমে সবুজ হয়। আলিমদের ইলম, আমল, চরিত্র ও শিষ্টাচার সবই থাকা ওয়াজিব। কেননা, তারা জাতির জন্য আদর্শ। আর চরিত্র ও শিষ্টাচারের দিক থেকে তারাই উপযুক্ত ও উত্তম।
৭৭. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কিছু মানুষ মনে করে, মুসলিমদের আলিমগণের ভূমিকা শারঈ বিধি-বিধানের মধ্যেই সীমিত। অন্যান্য জ্ঞান যেমন: রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের কোন ভূমিকা নেই এ ধরনের বিশ্বাস সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, আমরা মনে করি, আলিমদের অবস্থা সম্পর্কে তাদের এ বিশ্বাসের ভিত্তি হচ্ছে অজ্ঞতা। সন্দেহ নেই যে, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং শারঈ জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত এমন প্রয়োজনীয় সব ধরনের জ্ঞানে শারঈ আলিমদের ভূমিকা রয়েছে। আলিমদের সম্পর্কে অহেতুক যা কিছু বলা হচ্ছে তা জানতে চাইলে মুহাম্মাদ রশিদ রেজা সম্পর্কে জানতে হবে। তাফসীরসহ তার বিভিন্ন বিষয়ের কিতাব রয়েছে। তার পূর্ববর্তী শারঈ জ্ঞান সম্পন্ন আলিমদের দিকে খেয়াল করো যারা ছিলেন সবচেয়ে বেশি মর্যাদা সম্পন্ন। দেখা যায়, শারঈ জ্ঞান ও অন্যান্য বিষয়ে তাদের বলিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। তাদের ভিত্তি মূলক কায়েদা-কানুনের জ্ঞান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যা শিক্ষার্থী প্রথমেই অর্জন করা শুরু করে। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, "من يرد الله به خيرا يفقهه في الدين".
আল্লাহ তা'আলা যার কল্যাণ চান তাকে দীনের বুঝ দান করেন। [১৭০]
৭৮. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, দীনের ব্যাপারে মতভেদ কখন গ্রহণযোগ্য হয়? সব মাসআলা নাকি নির্দিষ্ট মাসআলায় মতভেদ হয়?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, প্রথমেই তুমি জেনে রেখো, মুসলিম উম্মতের আলিমগণের ইজতেহাদে যদি মতভেদ হয় কোন কারণে তা সঠিক বিষয়ের অনুকূলে না হলে তাতে ক্ষতি নেই। কেননা, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"إذا حكم الحاكم فاجتهد فأصاب فله أجران، وإن أخطأ فله أجر واحد".
কোন বিচারক ইজতেহাদে সঠিক সিন্ধান্তে পৌঁছলে তার জন্য দু'টি পুরস্কার রয়েছে। আর বিচারক ইজতেহাদে ভুল করলে তার জন্য রয়েছে একটি পুরস্কার। [৭১]
কিন্তু হক্ব সুস্পষ্ট হলে সর্বাবস্থায় ঐ হক্কেরই অনুসরণ করা ওয়াজিব। মুসলিম উম্মাতের আলিমগণের মাঝে যে মতভেদ সৃষ্টি হয় তার কারণে অন্তরে ভিন্নতা তৈরি হওয়া বৈধ নয়। কেননা, অন্তরের ভিন্নতার কারণে মারাত্মক গুরুতর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصابرين} [الأنفال: ٤٦] .
তোমরা আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্য করো এবং পরস্পর ঝগড়া করো না, তাহলে তোমরা সাহসহারা হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য ধর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন (সূরা আল- আনফাল ৮:৪৬)।
আলিমদের যে মতভেদ চিন্তা-ভাবনা করে দলীলসহ প্রচার করা হয় তা হিসাবযোগ্য। অপরদিকে, সাধারণ মতভেদ যা মানুষ বুঝে না, উপলব্ধি করতে পারে না তা বিবেচ্য নয়। এজন্য বিদ্বানগণের শরণাপন্ন হওয়া জনসাধারণের উপর ওয়াজিব। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} [النحل: ٤٣] .
জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা কর, যদি তোমরা না জেনে থাক (সূরা আন-নাহাল ১৬:৪৩)।
অপরদিকে, প্রশ্ন কর্তার কথা হচ্ছে, প্রত্যেক মাসআলায় মতভেদ হয় কি না? এ কথার জবাব হচ্ছে, ইজতেহাদের ভিন্নতায় কিছু মাসআলায় মতভেদ হয় অথবা কিতাব ও সুন্নাহর দলীল অবহিত করার দিক থেকে কতিপয় আলিম অন্যদের
চেয়ে বেশি জানেন ফলে মতভেদ হয়। তবে মৌলিক মাসআলায় মতভেদ নেই বললেই চলে।
৭৯. ইসলামে ইজতেহাদের হুকুম কি? জবাবে শাইখ (حفظه الله) বলেন, الاجتهاد في الإسلام هو : بذل الجهد لإدراك حكم شرعي من أدلته الشرعية.
ইসলামে ইজতেহাদ হচ্ছে শারঈ দলীল সমূহ হতে শারঈ হুকুম অবগত হওয়ার জন্য প্রচেষ্টা করা।
আর ইজতেহাদে সক্ষম ব্যক্তির উপর তা আবশ্যক। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {ফَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} [النحل: ٤٣] .
জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা কর, যদি তোমরা না জেনে থাক (সূরা আন-নাহাল ১৬:৪৩)।
ইজতেহাদে সক্ষম এমন ব্যক্তির পক্ষে নিজে হকু বুঝা সম্ভব। কিন্তু এ বিষয়ে গভীর জ্ঞান থাকা আবশ্যক আর এ ক্ষেত্রে শারঈ নছ (দলীল) কার্যকর উছুল ও আলিমদের কথা উপলব্ধি করতে হয়। যাতে বিরোধীতামূলক কোন কিছু না ঘটে। শিক্ষার্থীদের কতিপয় কেবল সহজ ইলমই অর্জন করেছে। অথচ তারা নিজেকে মুজতাহিদ বলে সম্বোধন করার চেষ্টা করে। খাছ নয় এমন ব্যাপক অর্থবোধক হাদীছ অনুযায়ী তাদেরকে আমল করতে দেখা যায় অথবা মানসূখ-রহিত হাদীছ অনুযায়ী সে আমল করে অথচ ঐ হাদীছের নাসিখ-রহিতকারী হাদীছ তার জানা নেই অথবা এমন হাদীছ অনুযায়ী আমল করে যে ব্যাপারে আলিমদের প্রকাশ্যে মতভেদ রয়েছে। তারা আলিমদের ইজমা সম্পর্কেও অবগত নয়। না জেনে এ ধরনের আমল করায় মারাত্মক ক্ষতি সাধন হয়।
শারঈ দলীল সম্পর্কে মুজতাহিদের জ্ঞান থাকা আবশ্যক। উছুলের জ্ঞান অর্জিত হলে এবং আলিমগণ মাসআলা উদ্ঘাটনে যে রীতি অবলম্বন করেন তা জানা থাকলে দলীল থেকে হুকুম সাব্যস্ত করতে সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে যেন অজ্ঞাতসারে ইজমার বিরোধীতা না হয়। পূর্ণরূপে বাস্তবে এ শর্ত পূরণ হলে ইজতেহাদ হতে পারে। আর জ্ঞান খাটিয়ে যেহেতু কোন মাসআলায় ইজতেহাদ করতে হয় তাই ঐ ইজতেহাদ খন্ডিত হওয়াও সম্ভব। কোন মাসআলা অথবা ইলমের কোন অধ্যায়
যেমন: 'কিতাবুত তাহারাত' ইত্যাদি নিয়ে বিশ্লেষণ মুলক আলোচনা করলে হয়তো ইজতেহাদ হতে পারে।
৮০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, নির্দিষ্ট কোন মাযহাবের তাক্বলীদ করা কি ওয়াজিব নাকি ওয়াজিব নয়?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, হ্যাঁ, নির্দিষ্ট মাযহাবের তাক্বলীদ করা ওয়াজিব-আবশ্যক। কিন্তু যে নির্দিষ্ট মাযহাবের তাক্বলীদ করা ওয়াজিব তা হলো রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাযহাব। কেননা, রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পথ অবলম্বন করেছেন তা অনুসরণ করা ওয়াজিব। আর ঐ পথে রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ-সৌভাগ্য। এ মর্মে আল্লাহ তা'আলা বলেন, {قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ} [آل عمران: ۳۱]
বল, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (সূরা আলে-ইমরান ৩:৩১)। তিনি আরো বলেন, {وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ} [آل عمران: ۱۳২]
তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ ও রসুলের, যাতে তোমাদেরকে দয়া করা হয় (সূরা আলে-ইমরান ৩:১৩২)।
সুতরাং বুঝা গেল এ মাযহাবেরই অনুসরণ ওয়াজিব। অপরদিকে এ মাযহাব ব্যতিরেকে অন্য মাযহাবের অনুসরণ করলে পথভ্রষ্ট হবে যদি তাতে মতভেদের ব্যাপারে দলীল স্পষ্ট না হয়। যদি মতভেদের বিপরীতে দলীল স্পষ্ট হয় তাহলে ঐ মাযহাবের অনুসরণ হারাম। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহঃ) উল্লেখ করেন, কেউ যদি বলে থাকে, কোন মানুষ যা কিছু বলে তার আনুগত্য করা ওয়াজিব তাহলে এরূপ বলার কারণে ঐ ব্যক্তিকে তাওবাহ করতে হবে। যদি সে তাওবাহ করে তাকে ছেড়ে দিতে হবে নচেৎ তাকে হত্যা করাই হবে যথাযথ। কেননা, তার কথা রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনুগত্য বিরোধী। আর শাইখুল ইসলাম ঠিকই বলেছেন, নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম এর কথা ছাড়া কোন মানুষের কথা গ্রহণ করা ওয়াজিব নয়। কেবল তার কথাই গ্রহণযোগ্য। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, اقتدوا باللذين من بعدي أبي بكر وعمر".
আমার পরে আবূ বকর ও উমার) এর অনুসরণ করো। [৭২] তিনি আরো বলেন, " إن يطيعوا أبا بكر وعمر يرشدوا".
যদি তারা আবূ বকব ও উমার () এর অনুসরণ করে তারা পথ খুঁজে পাবে। [৭৩]
৮১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামী জাগরণে ইলম অর্জনের প্রতি মনোযোগী হতে হয়। বিশেষত নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ ভিত্তিক ইলম অর্জন করা দরকার। আল্লাহর জন্যই প্রশংসা এবং তার নিকটেই রয়েছে। এ ইলম অর্জন কেন্দ্রীক কিছু মন্তব্য রয়েছে।
১. হাদীছ শাস্ত্রে গভীর ইলম নেই এমন কিছু শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হাদীছ দ্বঈফ ও জ্বহীহ হওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। অথচ তাদের জানা আছে যে, হাদীছের এ মূল কিতাব দু'টি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআ'তের উম্মাতের নিকট গ্রহণীয়।
২. সংখ্যাগুরু যুবকশ্রেণীর নিকট মাযহাবের বাহ্যিক দিকটাই গ্রহণীয়। তারা উম্মাতের ফক্বীহগণের কিতাব থেকে বিমুখ থাকে।
৪. কতিপয় শিক্ষার্থীকে হাদীছের জ্ঞানার্জনে লিপ্ত থাকতে দেখা যায়, এমতাবস্থায় আবশ্যকীয় বিষয় যেমন: আল-কুরআন, আরবী ভাষা, ফিকুহ, ফারায়িয... ইত্যাদির জ্ঞানার্জন থেকে বিরত থাকে।
৫. এমন কতিপয় শিক্ষার্থী আছে যারা কোন শাইখের শরণাপন্ন হয়নি এবং শুধু পঠন ও অধ্যয়ন ছাড়া তাদের ইলমের গভীরতাও নেই অথচ বাহ্যিকভাবে তারা জ্ঞানী হওয়ার ভান করে, তাদের পক্ষ থেকে পাঠদান করা হয়, ফাতওয়া দেয়া হয় এসব বিষয়ে আপনার মন্তব্য-দিকনির্দেশনা কি?
শাইখ (রহঃ) বলেন, প্রথম মন্তব্যের জবাব হলো, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্যই। সন্দেহ নেই যে, সুন্নাহ অনুসরণের ভালোবাসা এবং এর প্রতি উৎসাহিত হওয়া ইসলামী জাগরণের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু তুমি যা উল্লেখ করেছো তাতে দেখা যায়, এমন কিছু শিক্ষার্থী শিক্ষা দেয়ার এ পথ অবলম্বন করেছে, পূর্ববর্তী আলিমদের মত যাদের পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা, দূরদর্শিতা, শারঈ বিষয়গুলোর মাঝে পারস্পারিক সম্পর্কীয় জ্ঞান, মুত্বলাক্বকে তাক্বয়িদ করা এবং আমকে খাছ করণের জ্ঞান নেই। শরী'আতের সুপরিচিত সাধারণ কাওয়ায়েদ শিক্ষার দিকে তাদেরকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তাহলেই সব ব্যাপারে তারা তথ্যাদি সংগ্রহ করতে পারবে। এমনকি হাদীছ শায হওয়ার কারণে যে দ্বঈফ হাদীছ বিদ্বানদের নিকট আমলযোগ্য নয় এবং উম্মাতের মাঝে নির্ভরযোগ্য কিতাবে বিরোধী হাদীছ থাকলে সে ব্যাপারে মন্তব্য করতে পারবে। ঐ সব শিক্ষার্থীদেরকে দেখা যায়, তারা হঠাৎ করে সিন্ধান্ত নেয়, বাড়াবাড়ি মূলক কিছু একটা বলে ফেলে, যে বিষয়ে আলিমগণ ভিন্নমত পোষণ করেছেন, তারা সেটা অস্বীকার করে। আরো আশ্চৰ্যজনক বিষয় হলো, হাদীছের দিক থেকে তারা নির্ভরযোগ্য দু'টি অথবা একটি হাদীছ গ্রন্থের বিরোধিতা করে। আর যে সকল ইমামগণের ইমামত, তাদের সুন্দর নিয়্যাত ও ইলমের ব্যাপারে আলিমগণের ইজমা হয়েছে তারা ঐ সকল ইমামগণকে ফিক্বহের দিক থেকে প্রত্যাখ্যান করে। আরো দেখা যায়, এসব শিক্ষার্থী ইলম ও আমলের দিক থেকে পূর্ববর্তী ইমামগণের মত গভীরে পৌঁছেনি অথচ তারা ঐ সকল ইমামগণের বিরোধীতা করে চলছে। ইমামদেরকে তারা অসম্মান করে। তাদের প্রতি এটাই গুরুতর অমর্যাদা যা ইসলামী জাগরণের অন্তরায়। কোন মাসআলার ব্যাপারে সিন্ধান্তে নিতে বিলম্ব করা, বিচক্ষণতার সাথে ঐসকল ইমামের হক্বকে যথাযথ বুঝার চেষ্টা করা, তাদের কৃতিত্ব স্বীকার করা মানুষের উপর ওয়াজিব। আমরা তাদের জন্য আল্লাহর নিকট হিদায়াত ও তাওফীক কামনা করছি।
আর দ্বিতীয় মন্তব্যের ব্যাপারে আমরা বলবো, مذهب الظاهرية 'যাহিরী মাযহাব' একটা সমস্যা। এ মাযহাবপন্থীরা শুধু বাহ্যিক দিক গ্রহণ করে, উপকারী কায়দা-কানুনের প্রয়োজনবোধ করে না। এ মাযহাবের অনুসারীদের সম্পূর্ণ অথবা কতিপয় রীতি-পদ্ধতির যেসব কথার মাধ্যমে কেবল ফাসাদ স্পষ্ট হয় আমরা যদি তা যাচাই করে দেখতাম তাহলে অনেক গোমরাহী খুঁজে পেতাম। কিন্তু আমরা মানুষের গোপন দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান করা পছন্দ করি না।
তৃতীয় মন্তব্যের জবাব হচ্ছে, নিঃসন্দেহে প্রথমে আল্লাহর দিয়েই শিক্ষাবিদদের ইলম অর্জন শুরু করতে হবে। হাদীশTag দশটি আয়াত শিক্ষা করতেন বুঝে-শুনে, এখানে ইলম ও আমল দুটোই নিহিত ছিল। অতঃপর তারা সুন্নাতের দিকে খেয়াল রাখতেন। সনদ, জীবনী ও বিভিন্ন কারণ জেনেই তারা ফাতওয়া দিতেন। সুন্নাহ পদ্ধতিতে তারা ফিক্হী মাসআলা বুঝতে উদ্বুদ্ধ হতেন। কেননা, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
رُبَّ مُبَلَّغٍ اَوْعَى مِنْ سَامِعٍ
এমন অনেক প্রচারকারী আছে যে শ্রোতার চেয়ে বেশি সংরক্ষণশীল [৯৪] তিনি আরো বলেন,
رُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ لَيْسَ بِفَقِيْهِ .
এমন অনেক লোক আছে যারা নিজেদের তুলনায় উচ্চতর জ্ঞানের অধিকারী নিকট জ্ঞান পৌঁছে দিতে পারে [৯৫]।
সনদ ও তার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে আবশ্যকীয়ভাবে মানুষের জানা উচিত। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে উদ্ধৃত সুন্নাহর আলোকে ফিক্হ সম্পর্কে জানা আবশ্যক। কাওয়ায়েদ ও শর্ত উসূলের উপর ভিত্তি করে সামঞ্জস্য বিধান জরুরী। যাতে মানুষ নিজে পথভ্রষ্ট না হয় এবং অন্যকেও ভ্রষ্টতার দিকে ঠেলে না দেয়।
চতুর্থ মন্তব্যের জবাব হলো, মুফতির নিকট থেকে কোন বিষয় জেনে নেয়া মানুষের জন্য আবশ্যক। কেননা, আল্লাহ ও সৃষ্টির মাঝে ফায়ছালার দিক থেকে তিনি মধ্যস্থতাকারী এবং রসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওয়ারিছ হিসাবে গণ্য। সুতরাং তার গভীর জ্ঞান থাকা আবশ্যক যাতে তিনি ফাতওয়া দানে সক্ষম হন। সুতরাং ইলম ছাড়া কোন ব্যাপারে ফাতওয়া প্রদান ও পাঠ শিক্ষা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়া ঠিক নয়। কেননা, রসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে আমাদেরকে অবহিত করেছেন, তিনি বলেন,
"إن الله لا يقبض العلم انتزاعاً ينتزعه من العباد، ولكن يقبض العلم بقبض العلماء حتى إذا لم يبق عالما اتخذ الناس رؤوساً جهالا فسئلوا فأفتوا بغير علم فضلوا وأضلوا" .
আল্লাহ তার বান্দাদের অন্তর থেকে ইলম উঠিয়ে নেন না, কিন্তু দীনের আলিমদের উঠিয়ে নেয়ার ভয় করি। যখন কোন আলিম অবশিষ্ট থাকবে না তখন লোকেরা মুর্খদেরকেই নেতা বানিয়ে নিবে। তাদের নিকট জানতে চাওয়া হলে তারা না জানলেও ফাতওয়া প্রদান করবে। ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবে।[৭৬]
আল-হামদুলিল্লাহ, যে মানুষ কল্যাণ কামনা করে এবং জানার উদ্দেশ্যে ও প্রচারের জন্য আসে পর্যাপ্ত সময় থাকার কারণে তার ইচ্ছানুযায়ী সে জানতে সক্ষম হয়, এটাই তার উদ্দেশ্যে। অপরদিকে, বাড়ি থেকে বের হয়ে ইলম অর্জনের পথে কারো যদি পর্যাপ্ত সময় না থাকে এবং এমতাবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে তাহলে সে যেন আল্লাহ ও তার রসূলের পথেই মুহাজির হিসাবে মৃত্যু বরণ করলো। আল্লাহ তা'আলা তার প্রতিদান ধার্য করবেন। অনেকেই পাঠদান ও ফাতওয়া দেয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করে, ফলে এ অবস্থা তার অনুশোচনার কারণ হয়। কেননা, তার পাঠদান ও ফাতওয়ায় যে ভুল রয়েছে তা স্পষ্ট হয়। আর একবার কোন কথা মুখ ফসকে বের হলে ঐ কথা ব্যক্তকারীর দিকেই ন্যস্ত হয়। সুতরাং যারা ইলম অর্জনের পথে আছে তারা যেন ত্বরান্বিত না করে, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকে। কোন ব্যাপারে ফাতওয়ার নির্ভুলতা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত যেন বিলম্ব করে। আর ইলম মালের মত নয় যে, মানুষ খরিদ্দার খুঁজবে বরং যে ক্রয় করবে সেই তা পাবে। ইলম হলো নাবীগণের উত্তরাধিকার। এ জন্য ফাতওয়া দেয়ার সময় দু'টি বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখা আবশ্যক।
প্রথম: আল্লাহ তা'আলা এবং তার শরী'আত থেকে কথা বলতে হবে।
দ্বিতীয়: আল্লাহর রসূল জ্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। এ আদর্শের কারণেই আলিমগণ নাবীগণের উত্তরাধিকারী।
৮২. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আল-কুরআন ও জ্বহীহ সুন্নাহর ইলম অর্জনের দিক থেকে মানুষ কয় শ্রেণীতে বিভক্ত হতে পারে?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, কিতাব-সুন্নাহর ইলম অর্জনের দিক থেকে মানুষ চার শ্রেণীতে বিভক্ত।
প্রথম: কুরআন-সুন্নাহর ইলম অর্জন থেকে বিমুখ হয়ে যেসব শিক্ষার্থী মাযহাবী ফিক্বহের ইলম অর্জনের দিকে ধাবিত হয় তারা সাধারণত ঐ ফিক্বহী ধারায় আমল করে থাকে। আর মাযহাবী কিতাবের লেখকগণ যা বলেছেন তারা কেবল সেটারই অনুসরণ করে।
দ্বিতীয়: কুরআন সংশ্লিষ্ট যেসব জ্ঞান অর্জনের প্রতি শিক্ষার্থীরা আগ্রহী তার মধ্যে রয়েছে তাজভীদের ইলম অথবা কুরআনের অর্থ বুঝা অথবা শব্দাবলীর ই'রাব (কারক চিহ্ন) প্রদান এবং বালাগাত (অলংঙ্কার শাস্ত্র) ইত্যাদির জ্ঞান। অন্যদিকে, সুন্নাত ও হাদীছের জ্ঞান অর্জনের দিক থেকে শিক্ষার্থী খুব কমই রয়েছে। নিঃনন্দেহে হাদীছের জ্ঞানে তাদের সীমাবদ্ধতা আছে।
তৃতীয়: হাদীছ, সনদ বিশ্লেষণ, রাবীদের দোষ-ত্রুটি, হাদীছ গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যান করা সম্পর্কিত জ্ঞানার্জনে যারা আগ্রহী; কুরআনের জ্ঞানে তারা খুবই দুর্বল। কোন একটি আয়াতের স্পষ্ট তাফসীর জিজ্ঞেস করা হলে তারা ঐ আয়াতের তাফসীর জানে না বলে অবহিত করে। অনুরূপভাবে তাওহীদ ও আক্বীদা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলেও তারা উত্তর দেয় না। নিঃসন্দেহে এটাই হলো তাদের বড় সীমাবদ্ধতা।
চতুর্থ: কিছু শিক্ষার্থী রয়েছে একত্রে কিতাব ও জ্বহীহ সুন্নাহর জ্ঞানার্জনে উৎসাহী এবং কিতাব-সুন্নাহর জ্ঞান অনুযায়ী সালাফগণ যে রীতির উপর ছিলেন তারা তা অর্জন করে। এ সত্ত্বেও বিদ্বানগণের কিতাব সমূহে যা উল্লেখ আছে তারা তা থেকে বিমুখ হয় না বরং ঐ সব কিতাবাদীকে তারা মানদন্ড হিসাবে ব্যবহার করে এবং আল্লাহর কিতাব ও নাবীর সুন্নাহ বুঝার ক্ষেত্রে এ কিতাবাদীর সহযোগিতা গ্রহণ করে থাকে। কেননা, আলিমগণ কাওয়ায়েদ, রীতি-পদ্ধতি ও উছুল রেখে গেছেন এসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হতে থাকবে। এসব কিতাব থেকে তাফসীরের শিক্ষার্থী তাফসীর, হাদীছের শিক্ষার্থী হাদীছের জ্ঞানার্জন করবে অথবা উভয়ের অর্থের ব্যাখ্যা শিখবে। তাই ঐসব কিতাবাদী কুরআন-সুন্নাহ বুঝার কেন্দ্র স্বরূপ এবং আলিমগণ তাদের কিতাবে যা বলেছেন জ্ঞানার্জনে তা সহযোগী হিসাবে গণ্য। এটাই হলো ইলম অর্জনের উত্তম প্রকার।
আমাদের জন্য লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ উত্তম পদ্ধতি অবলম্বন পূর্বক আমরা যেন জ্ঞানার্জনে সমতা বজায় রাখি। আর জ্ঞানার্জনে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় যে কোন
প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হই। আর সর্বশেষ উত্তম প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হতে না পারলে ইল্ম অর্জনের পদ্ধতি যাচাই করা আমাদের উপর আবশ্যক হবে।
কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ} [النساء: ٥٩] হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর এবং আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের (সূরা আন-নিসা ৪:৫৯)।
আলিম ও আমীরগণ اولى الأمر এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, {فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ} [النساء: ٥٩]
কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রসূলের দিকেই প্রত্যার্পণ কর (সূরা আন-নিসা ৪:৫৯)।
বিশেষত ছাহাবী ও তাবেঈনদের থেকে সর্বদা কোন কিছু গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাবো যে, তারা আল্লাহর কিতাব ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ মোতাবেক ফায়ছালা করতেন। এ সত্ত্বেও আমি বলবো না যে, আলিমদের কথা গ্রহণ করা ওয়াজিব নয়। বরং তাদের কথা মূল্যায়নযোগ্য, গুরুত্বপূর্ণ ও বিবেচিত। কিতাব- সুন্নাহ বুঝতে তাদের কথার সহযোগীতার প্রয়োজন হয়।
৮৩. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কতিপয় শিক্ষার্থী চাকুরী ও বেতন লাভের উদ্দেশ্যে লেখা-পড়া করে অনুরূপভাবে যারা বিনিময় লাভের উদ্দেশ্যে গবেষণার বিষয় লিপিবদ্ধ করে অথবা শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তা তৈরি করে অথবা জ্ঞানগত সনদ পাওয়ার জন্য কিছু কিতাব তাহক্বীক-বিশ্লেষণ করে তাদের ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলার জন্যই একনিষ্ঠভাবে নিয়্যাত করা শিক্ষার্থীদের উপর ওয়াজিব। আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যেই শারঈ ইল্ম অর্জনের জন্য কোন হরফ, কালিমা-শব্দ কোন একটি পৃষ্ঠা যা কিছু হোক শিখবে। কিন্তু ইল্ম অর্জনের মাধ্যমে কিভাবে আল্লাহর নৈকট্য লাভের নিয়্যাত করা সম্ভব? এর জবাব হচ্ছে, তা এভাবে সম্ভব যে, আল্লাহ তা'আলা ইল্ম অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। আর আল্লাহ তা'আলা কোন কিছুর নির্দেশ জারি
করলে আদেশ পালনের উদ্দেশ্যে তা সম্পন্ন করা মানুষের জন্য ফরজ। এটাই আল্লাহর ইবাদত। কেননা, আল্লাহর নির্দেশ পালন করা, তিনি যা নিষেধ করেন তা বর্জন করা, তার সন্তুষ্টি কামনা করা এবং তার শান্তি সম্পর্কে সতর্ক থাকার নাম ইবাদত।
ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে একনিষ্ঠ নিয়্যাত হলো নিজের ও অন্যের অজ্ঞতা দূর করা। এর নিদর্শন হলো ইলম অর্জনের পর তার আমলে ইলমের প্রভাব থাকবে, তার রীতি-পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসবে, অন্যের উপকার সাধনে সে হবে উৎসাহী। আর এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ইলম অর্জনে তার নিয়্যাত ছিল নিজের ও অন্যের অজ্ঞতা দূর করা। এভাবে তার আদর্শ হয় সৎ কল্যাণকর।
এ রীতির উপরই সালাফে জ্বলিহীন বহাল ছিলেন। তাদের পরবর্তীদের মধ্যে বর্তমানে এ বিষয়ে অনেক মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংখ্যাগুরু শিক্ষার্থীদের কারো নিয়্যাত এমন যে, তা দ্বারা দুনিয়া ও আখেরাতের কোন কল্যাণই সাধন হবে না বরং ক্ষতি হবে। কেবল পার্থিব স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে ঐ সব শিক্ষার্থী সনদ অর্জনের নিয়্যাত করে। এ ব্যাপারে রসূল জ্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করে বলেন,
"من تعلم علماً مما يبتغي به وجه الله عز وجل، لا يتعلمه إلا ليصيب به عرضاً من الدنيا، لم يجد عرف الجنة يوم القيامة أي ريحها".
যে ইলম দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা যায়, কোন লোক যদি দুনিয়াবী স্বার্থ লাভের জন্য তা শিক্ষা করে, তবে সে ক্বিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না।[৭৭]
প্রশ্নকারী উল্লেখ যা করেছে তদানুযায়ী ঐসব শিক্ষার্থীর জন্য দুঃখ হয়, যারা বিনিময় লাভের উদ্দেশ্যে কোন গবেষণা কর্মে লিপ্ত থাকে অথবা বার্তা তৈরি করে অথবা যারা কতিপয় কিতাব তাহক্বীক-বিশ্লেষণ করে কাউকে বলে ঐ সব কিতাবের ব্যাখ্যা হাযির করো দেখি, অমুকের গবেষণা কর্ম মিলিয়ে দেখাওতো। অতঃপর এ বিশ্লেষক সম্মান পাওয়ার উদ্দেশ্যে নিজের সন্দর্ভ-থিসিস অথবা অনুরূপ কিছু পেশ করে যা কিছু শিক্ষকের মাঝে সাড়া পায়-স্বীকৃতি লাভ করে। এটিই মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে ও বাস্তবতার পরিপন্থী বিষয়। আমি মনে করি, এটি আমানতের খেয়ানতের একটি প্রকার। এখানে শুধু সনদ লাভের
উদ্দেশ্যেকে আবশ্যক মনে করা হয়েছে, কিছু দিন পর যদি তাকে তার বিষয়- বস্তু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় সে উত্তর দিতে সক্ষম হয় না।
এজন্য আমি বদ নিয়্যাতের অশুভ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করবো ঐসকল ভাইকে যারা কিতাব তাহক্বিক করে অথবা ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে। আমি বলবো, তাহক্বিকের ক্ষেত্রে অন্য কিতাবের সাহায্যে নেয়াতে কোন সমস্য নেই। কিন্তু সম্পূর্ণ গবেষণা কর্মটি যেন হুবহু অন্যের থেকে নকল না হয়। আল্লাহ সকলকে উপকারী ইলম অর্জন ও সৎ আমলের তাওফীক্ব দান করুন। তিনিই সাড়া দানকারী ও সর্বশ্রোতা।
৮৪. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, চিকিৎসা শাস্ত্র ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায় কি দীনের বুঝ আছে?
জবাবে শাইখ বলেন, এসব বিষয় দীনি শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা মানুষ তাতে কিতাব-সুন্নাহর জ্ঞান শিক্ষা করতে পারে না। কিন্তু মুসলিমরা এসবের মুখাপেক্ষী। এজন্য কতিপয় বিদ্বান বলেন, বিভিন্ন কারিগরি, চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারিং, জুওলজি এবং এসবের মত অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞানার্জন করা ফরযে কিফায়ার অন্তর্ভুক্ত। তবে এ সব শারঈ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। শারঈ বিষয় ব্যতিরেকে কেবল এসবের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর পূর্ণ স্বার্থ লাভ হতে পারে না। এজন্য যারা এসব বিষয়-বস্তু নিয়ে পড়া লেখা করে আমি ঐসব শিক্ষার্থী ভাইকে সতর্ক করবো যে, মুসলিম উম্মাহর উপকার সাধন করা এবং তাদের সম্মান বজায় রাখাই যেন এসব বিষয়ে শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে হয়। আজকে লাখ লাখ মুসলিম উম্মাহ যদি এসব বিষয় কাজে লাগাতো যা মুসলিমদের উপকারে আসে তাহলে অনেক কল্যাণ লাভ হতো। আমাদের প্রয়োজন পূরণে কাফিরদের মুখাপেক্ষী হওয়ার দরকার হতো না। কখনো কখনো এসব বিষয়ে শিক্ষা অর্জন করা দরকার হয়। কিন্তু এসব বিষয়কে দীনের অন্তর্ভুক্ত বলে উদ্দেশ্যে নেয়া যাবে না। কেননা, তা দীনি বিষয় নয়। আর আল্লাহর শরী'আতের বিধি-বিধান, আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কিত বিষয়ই হলো দীনি বিষয়।
৮৫. ইলম অর্জনে কিভাবে ইখলাছ গঠিত হবে?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ের মাধ্যমে ইখলাছ গঠিত হতে পারে।
প্রথম: আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্যই নিয়্যাত করা। কেননা, আল্লাহ তা'আলা এটারই নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,
{فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ}
জেনে রাখ, নিঃসন্দেহে আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য ইলাহ নেই (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৯)।
আল্লাহ তা'আলা ইলম অর্জনের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন, তার ভালোবাসাকে আবশ্যক করে, সন্তুষ্টি অর্জিত হয় এমন বিষয় পালন করার প্রতি তিনি উৎসাহ ও নির্দেশ দিয়েছেন।
দ্বিতীয়: আল্লাহর শরী'আত আয়ত্ব করার নিয়্যাত করতে হবে। কেননা, শিক্ষা করা, মুখস্থ করণ অথবা লিখনীর মাধ্যমে আল্লাহর শরী'আত আয়ত্ব করা যায়।
তৃতীয়: শরী'আত রক্ষা করা এবং এর প্রতিবন্ধকতা নিরসন করার নিয়্যাত করতে হবে। কেননা, আলিমদের মাধ্যমে যদি শরী'আত সংরক্ষণ না হতো কোন প্রতিরক্ষক না থাকতো তাহলে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহঃ) সহ অন্যান্য আলিমদেরকে বিদ'আতীদের বিরূদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে দেখা যেত না। আলিমগণ বিদ'আতীদের বিদ'আত বাতিলের বর্ণনা দিয়েছেন। আমরা দেখতে পাই যে, ঐসকল আলিম অনেক কল্যাণ লাভ করেছেন।
চতুর্থ: মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শরী'আত অনুসরণের নিয়্যাত করতে হবে। আর শরী'আত অনুসরণ সম্ভব নয় যতক্ষণ না তা জানা যায়।
পঞ্চম: ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে নিজের এবং অন্যের অজ্ঞতা দূর করার নিয়্যাত করতে হবে।
৮৬. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কতিপয় মানুষ বলে, ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে বর্তমান যুগে নিয়্যাতের বিশুদ্ধতা একটি জটিল ব্যাপার অথবা পরিস্থিতি অনুসারে কখনো সঠিক নিয়্যাত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে; শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশেষত যারা চিন্তামূলক বস্তুবাদী ইলম অর্জন করে; সনদ পাওয়াই কি তাদের উদ্দেশ্যে নয়?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, আমরা বলবো, তুমি দুনিয়াবী স্বার্থ লাভের জন্য সনদ লাভের উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করলে এ ক্ষেত্রে তোমার নিয়্যাত ফাসেদ-ভ্রান্ত বলে গণ্য হবে। অপরদিকে মানুষের উপকার করার জন্য ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে সনদ লাভ হলে তা যথাযথ। কেননা, তুমি জানো যে, আজকাল সনদ ব্যতিরেকে জাতির জন্য বৃহৎ উপকারী পদ-মর্যাদা লাভ করা সম্ভব নয়। মানুষের উপকার সাধনের উদ্দেশ্যে সনদ লাভের নিয়্যাত করলে তা ভাল। এ ধরনের ইচ্ছা বিশুদ্ধ নিয়্যাত বিরোধী নয়।
৮৭. শাইখের কাছে প্রশ্ন হলো, ইলম অনুযায়ী আমল করার ব্যাপারে আপনার উপদেশ কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, ইলম অনুযায়ী আমল করা আবশ্যক। কেননা, ইলমের ফলাফল হলো আমল। কেননা, ইলম অনুসারে আমল না করলে ক্বিয়ামতের দিন প্রথম কাতারের জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। যেমন বলা হয়ে থাকে,
وعالم بعلمه لم يعمل ... معذب من قبل عباد الوثن
ইলম অনুযায়ী আলিমের আমল না হলে মূর্তিপূজকের আগে তাকে শাস্তি দেয়া হবে।
আর ইলম অনুসারে আমল না হলে ইলম হবে অকার্যকর-বরকতহীন এবং তা হবে স্মৃতিভ্রষ্ট। এ মর্মে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
فَبِمَا نَقْضِهِمْ مِيثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةٌ يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ وَنَسُوا حَظًّا مِمَّا ذُكِّرُوا به [المائدة: ١٣]
তারা তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে আমি তাদেরকে লা'নত দিয়েছি এবং তাদের অন্তরসমূহকে করেছি কঠোর। তারা শব্দগুলোকে আপন স্থান থেকে বিকৃত করে এবং তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছে, তার একটি অংশ তারা ভুলে গিয়েছে (সূরা আল-মায়িদা ৫:১৩)।
এ ভুলে যাওয়ার বিষয়টি স্মৃতিহীন হওয়া অথবা আমল না করা উভয়টির অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ ব্যক্তি অর্জিত ইলম ভুলে যাবে অথবা আমল করবে না। কেননা, আরবী ভাষায় আভিধানিক অর্থে কোন কিছু ভুলে যাওয়া বলতে তা পরিত্যাগ
করা বুঝায়। অপরদিকে ইলম অনুযায়ী আমল করলে আল্লাহ তা'আলা তা বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَالَّذِينَ اهْتَدَوْا زَادَهُمْ هُدًى} . [محمد: ۱۷] .
যারা হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছে আল্লাহ তাদের হেদায়াত প্রাপ্তি আরো বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে তাদের তাকওয়া প্রদান করেন (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৭)। আর আল্লাহ তা'আলা তাদের তাক্বওয়াও বৃদ্ধি করে দেন। এজন্য তিনি বলেন,
{و آتاهم تقواهم} [محمد: ۱۷]
তাদেরকে তাদের তাকওয়া প্রদান করেন (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৭)।
ইলম অনুযায়ী আমল করলে আল্লাহ তা'আলা তাকে এমন ইলমের উত্তরাধিকারী করেন যা সে জানতো না। এ কারণে কতিপয় সালাফ বলেন, আমলের মাধ্যমে ইলম বাড়তে থাকে নচেৎ তা বিনষ্ট হয়।
৮৮. শাইখের নিকট প্রশ্ন হলো, ইলম অর্জনে কোন বিষয়গুলো সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীর জন্য আবশ্যক?
জবাবে শাইখ (র) বলেন, আমানতদার একজন বিশ্বস্ত শাইখের নিকট ইলম অর্জন করা আবশ্যক। কেননা, বিশ্বস্ততাই শক্তি আর এ শক্তি বজায় রাখতে আমানত রক্ষা করা আবশ্যক। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ} [القصص: ٢٦] .
নিশ্চয় আপনি যাদেরকে মজুর নিযুক্ত করবেন তাদের মধ্যে সে উত্তম, যে শক্তিশালী বিশ্বস্ত (সূরা আল-ক্বাছাছ ২৮:২৬)।
কখনো দেখা যে, অনেক আলিম বিভিন্ন বিষয়ের উপর শাখা-প্রশাখাগত গভীর জ্ঞানের অধিকারী। কিন্তু তাদের আমানতদারীতা নেই। তারা তোমাকে এমনভাবে ভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যাবে তুমি বুঝতেই পারবে না। অপরদিকে একজন নির্ভরযোগ্য শাইখ ছাড়া তুমি নিজে নিজে শুধু কিতাব অধ্যয়ন করে প্রকৃত ইলম অর্জন করতে পারবে না। এজন্য বলা হয়ে থাকে, কেবল কিতাবই যার দলীল সঠিকের চেয়ে তার ভুল বেশি। কারণ সে কিতাব নামক এমন সমুদ্রে ভেসে বেড়ায় যার কোন উপকূল নেই। আর সে এ সমুদ্রের নির্দিষ্ট গভীরতা নির্ণয়
করতেও সক্ষম নয়। পক্ষান্তরে যে শিক্ষার্থী কোন বিশ্বস্ত শাইখের নিকট ইলম অর্জন নিয়োজিত থেকে যে সব বৃহৎ উপকার লাভ করে তা হলো: (১) قصر المدة তথা সময়ের স্বল্পতা (অর্থাৎ ইলম অর্জনে কম সময় ব্যয় হয়)
(২) قلة التكلفة পরিশ্রমের কমতি (তথা অল্প পরিশ্রমে সহজে ইলম অর্জন করা যায়)।
(৩) শাইখের স্বরনাপন্ন হয়ে ইলম অর্জন করা সঠিকতার অধিক নিকটবর্তী। কেননা, শাইখ কোন বিষয় নিজে ভালভাবে জেনে-বুঝে শিক্ষার্থীর নিকট বর্ণনা করেন। জ্ঞানগত-ইলমী বিষয় আমানত হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীকে জ্ঞানদানের জন্য তিনি অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণ করেন।
অপরদিকে, যারা শুধু কিতাবের উপরই নির্ভর করে তাদেরকে রাত-দিন ইলম অর্জনের জন্য চেষ্টা করতে হয়। অতঃপর আলিমদের কথা তুলনা করার জন্য শিক্ষার্থী যেসব কিতাব অধ্যয়ন করে তাতে বিভিন্ন আলিমদের দলীলগুলোর মধ্যে কোনটি সঠিক? এ নিয়ে সে শঙ্কাবোধ করে। অতঃপর সে হয়ে যায় কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমরা দেখতে পাই যে, ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) যখন দু'জন বিদ্বানের কথা বর্ণনা করতেন চাই তা زاد المعاد অথবা إعلام الموقعين থাক তিনি প্রথম কথার দলীল সাব্যস্ত করে ব্যাখা করলে আমরা ঐ কথাটি সঠিক বলে মনে করি আর এটাও মনে করা হয় কোন অবস্থাতেই এ কথা পরিবর্তন করা বৈধ নয়। অতঃপর তিনি যখন ঐ কথা প্রত্যাহার করে এর বিপরীত ব্যাখ্যা করত সিন্ধান্তে উপনিত হন তখন আমরা পরবর্তী কথাটিই সঠিক বলে ধরে নিই। এভাবে শিক্ষার্থীর মাঝে সন্দেহ ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়। তাই একজন বিশ্বস্ত শাইখের শরণাপন্ন হয়ে পাঠ গ্রহণ করা আবশ্যক।
৮৯. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, বিতর্ক চর্চার জন্য কতিপয় প্রাথমিক শিক্ষার্থী ইবনে হাজম (রহঃ) এর المحلى کتاب পাঠ করে। আপনি যখন তাদেরকে এ উপদেশ দিবেন যে, এটা পূর্ববর্তীদের পন্থা তখন তারা বলে, আমরা এ কিতাব পাঠ করি চর্চার জন্য। এভাবে কিতাব পাঠ করা কি জ্বহীহ? জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, ইবনে হাজম (রহঃ) এর মুনাযারা-বিতর্ক পদ্ধতি জটিল। তিনি বিতর্কের ক্ষেত্রে কঠোরতা আরোপ করেন। এ ধরনের বিতর্কের
মাধ্যমে বিরোধী পক্ষকে কখনো গালি দেয়া হয়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। আমি আশঙ্কা করছি যে, প্রাথমিক ছোট শিক্ষার্থীরা ইবনে হাজমের কিতাব পাঠ করলে তার বিতর্ক পদ্ধতির দিকে তারা ফিরে আসবে। তার বিতর্ক পদ্ধতি সহজ হলে তা অবশ্যই উত্তম হতো। গভীর ইলম অর্জিত হলে ইনশাল্লাহ শিক্ষার্থী বুঝতে পারবে ইবনে হাজমের বিতর্ক পদ্ধতি থেকে কিভাবে উপকৃত হতে হয়। অতঃপর গভীর ইলম অর্জনের পর সে তার কিতাব অধ্যয়ন করে বুঝবে। একারণে আমি প্রাথমিক শিক্ষার্থীদেরকে তার কিতাব পাঠ করার উপদেশ দেই না। তবে হক্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য উত্তম পন্থায় বিতর্ক চর্চা করা আবশ্যক। অনেকেই গভীর ইলমের অধিকারী সত্ত্বেও তারা হক্ব প্রতিষ্ঠা করণে উত্তম পন্থায় তর্ক করতে সক্ষম নয়।
৯০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ফিক্বহ বিষয়ে শিক্ষার্থী ইলম অর্জন করতে চাইলে উছুলে ফিক্বহের উপর নির্ভরশীল না হওয়া কি তার জন্য উচিত হবে?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, ফিক্বহ বিষয়ে কোন শিক্ষার্থী জ্ঞানার্জন করতে চাইলে ফিক্বহ এবং উছুলে ফিক্বহ উভয় বিষয়ে একত্রে জ্ঞানার্জন করা আবশ্যক। যাতে সে এ নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞানার্জন করতে পারে। তবে উছুলের জ্ঞান ছাড়াই ফিক্বহ জানা সম্ভব। কিন্তু ফিক্বহ ছাড়া উছুল জানা সম্ভব নয়। ফিক্বহ ছাড়া ফক্বিহ হওয়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ ফক্বিহের জন্য উছুলে ফিক্বহের উপর নির্ভরশীল না হওয়াও সম্ভব। তবে ফিক্বহ শিক্ষা করতে চাইলে উছুলে ফিকুহের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এজন্য উছুল বিষয়ের আলিমগণ মতানৈক্য করেছেন যে, শিক্ষার্থীকে প্রথমে উছুলুল ফিক্বহের জ্ঞানার্জন করতে হবে। যাতে এর উপর ফিক্বহী জ্ঞানের ভিত্তি গঠিত হয়। আর ফিক্বহের সঠিক নিয়ম কানুনের মাধ্যমে মানুষ যেন আমল, ইবাদত ও লেন-দেনে প্রয়োজনীয় সমাধান খুঁজে পায়।
৯১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কতিপয় শিক্ষার্থীকে দেখা যায়, জ্ঞানগত কোন মাসআলা নিয়ে তার দলীলের আলোকে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করত ঐ মাসআলাকে কেন্দ্র করে আলিমদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়। অতঃপর জ্ঞানে অপরিপক্ক ঐ শিক্ষার্থী আলিমের সমাবেশে উপস্থিত হয়ে আলিমকে বলে, আপনি এরূপ এরূপ যা বলছেন সে ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা আপনাকে দয়া করুন। এটাতো হারাম। অতঃপর আলিম বলে কিভাবে হারাম? প্রতিউত্তরে সে বলে, আপনি কি নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথার আলোকে জবাব দিচ্ছেন নাকি অমুক অমুক ব্যক্তির কথার উপর ভিত্তি করে জবাব দিচ্ছেন?
অতঃপর শিক্ষার্থী এমন দলীল উপস্থাপন করে যা ঐ আলিম জানে না। কেননা, আলিম হলেও সব বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণরূপে জ্ঞাত নন। সর্বোপরি এটা প্রকাশ পায় যে, ঐ শিক্ষার্থী আলিমের চেয়ে অধিক জানেন। এ পরিস্থিতির আলোকে আপনার মতামত কি?
জবাবে শাইখ (আ) বলেন, মাসআলা বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটতে দেখা যায়, মানুষ কোন মাসআলা নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করে অতঃপর আলিমদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়। যেমনটা উল্লেখ করা হল। নিজের ইলম প্রকাশ করা ও অন্যের ইলম দুর্বল প্রতিপন্ন করার জন্য নয় বরং ইলম অর্জন ও হকু জানার উদ্দেশ্যে মানুষের প্রশ্ন করা আবশ্যক। মোদ্দা কথা হলো যে বড় তার প্রতি শ্রদ্ধা-শিষ্টাচার বজায় রাখা উচিত। বড়দের কারো ভুল পরিলক্ষিত হলে তা একান্তে অনুকূল পরিস্থিতে তুলে ধরা আবশ্যক। অথবা ঐ আলিমের সাথে সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করা দরকার অথবা শিষ্টাচার বজায় রেখে তার সাথে কথা বলা আবশ্যক। কথা হলো যে আলিম আল্লাহকে ভয় করে তার নিকট হকু স্পষ্ট হলে শীঘ্রই তিনি সে দিকেই প্রত্যাবর্তন করবেন। আর নিজের ভুল সিন্ধান্ত থেকে ফিরে এসে তিনি মানুষের মাঝে হক্ব ব্যক্ত করবেন।
৯২. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের সময় নষ্ট করা ও তা অপচয় রোধের ব্যাপারে আপনার দিক-নির্দেশনা কি?
জবাবে শাইখ (আ) বলেন, শিক্ষার্থীরা কয়েকভাবে সময় নষ্ট করে তা হলো:
প্রথম: যা পড়া হয়েছে তা পুনরাবৃত্তি ও পর্যালোচনা ছেড়ে দেয়া।
দ্বিতীয়: সহপাঠীদের সাথে এমন আলোচনায় বসা যাতে তাদের জন্য কোন উপকারীতা নেই।
তৃতীয়: শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর দিক হচ্ছে মানুষের কথার অনুসরণ করা এবং উপকারহীন কথা যা বলা হয়েছে, বলা হয় এবং উপকার নেই এমন বিষয় যা অর্জিত হয়েছে, অর্জন হয়। সন্দেহাতীত এটি তার ঈমানের দুর্বলতা। কেননা, নাবী জ্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"من حسن إسلام المرء تركه ما لا يعنيه". কোন ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্যতা হলো তার উপকারহীন বিষয় ছেড়ে দেয়া। [৭৮]
অনর্থক আলাপচারিতায় লিপ্ত থাকা এবং বেশি বেশি অহেতুক প্রশ্ন করার কারণে সময় নষ্ট হয়। এটা প্রকৃতপক্ষে মানুষের অভ্যাসগত ব্যাধি। আমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট এ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। এটাই বড় শঙ্কার বিষয়। এসব অহেতুক কর্মের কারণে কখনো সে এমন ব্যক্তির শত্রুতা পোষণ করে যার সাথে শত্রুতা করা ঠিক নয় এবং এমন লোকের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে যে বন্ধু হওয়ার উপযুক্ত নয়। এ ধরনের যে সব বিষয়ে গুরুত্ব দেয়ার কারণে ইলম অর্জন হতে বিরত থেকে মনে করা হয় যে, তা হক্বের জন্য সহায়ক স্বরূপ। আসলে এসব কর্ম-কাণ্ড মোটেই হজ্বের সহায়ক নয়। বরং এসবের মাধ্যমে নিজেকে অনর্থক কাজে নিয়োজিত রাখা হয় মাত্র। মানুষের নিকট সহজে কোন বিষয়ে সঠিক সংবাদ পৌঁছলে সে তা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু সে ঐ সংবাদ নিয়েই ব্যস্ত থাকবে না এবং তা নিয়ে বড় চিন্তা-ভাবনাও করবে না। কেননা, এ কারণে শিক্ষার্থী ইলম অর্জন থেকে অহেতুক বিষয়ে ব্যস্ত থাকবে। আর এটা হবে তার জন্য বিশৃঙ্খলার কারণ। এমনিভাবে ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলে জাতির মাঝে দেখা দিবে দলবিচ্ছিন্নতা।
৯৩. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, জনসমাবেশে শিক্ষার্থীর নিকট শিক্ষার্থীর মাসআলা জানতে চাওয়া বৈধ হবে কি? যার জবাব দেয়া হলে উপকার লাভ হবে।
জবাবে শাইখ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, শিক্ষার্থী এবং জনসাধারণ যে বিষয়ে প্রশ্ন করবে তার জবাব দেয়া আলিমের জন্য বৈধ। আর আলিম নিজেকে প্রকাশ করার জন্য কোন বিষয়ে জবাব দিবে না। কেননা, প্রশ্নকারী কখনো বলে যে, আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করছি, কিন্তু অমুক কেন উত্তর দেয়। এ ধরনের কথা বলায় নিজের আমিত্ব ও দাম্ভিকতা প্রকাশ পায় না? আমরা বলবো, ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে এসব উদ্দেশ্যে নয় বরং ইলম ছড়িয়ে দেয়াই উদ্দেশ্যে হতে হবে। আর মানুষ জানে না যে, তার ভাইয়ের অন্তরে কি আছে যতক্ষণ না তা বর্ণনা করে। কোন কাজে মানুষ নিজের বড়ত্ব প্রকাশের ইচ্ছা না করে থাকলে কাজটি সঠিক হলে তা ভুল বলা ঠিক নয়। তাই সর্বোপরি ইলম ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে জবাব দেয়া হলে তাতে কোন সমস্যা নেই।
৯৪. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, মিডিয়া কি ইলম অর্জনের কোন পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত হয়? বাস্তবে কিভাবে এর মাধ্যমে উপকৃত হওয়া যায়?
জবাবে শাইখ (সা) বলেন, এ মিডিয়া ইলম অর্জনের একটি মাধ্যম এতে কারো সন্দেহ নেই। মিডিয়ার মাধ্যমে ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে অনেক উপকার লাভ
করি, এ কারণে আমাদের প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত নি'আমতকে আমরা অস্বীকার করি না। কেননা, আমরা যেখানেই থাকি না কেন এর মাধ্যমে আলিমদের কথা আমাদের নিকট পৌঁছে যায়। আমরা গৃহে অবস্থান করলে সাধারণত আলিম ও আমাদের মাঝে বেশ দুরত্ব বজায় থাকে। আমরা ঘরে বসে সহজেই এ মিডিয়ার মাধ্যমে ঐ আলিমের কথা শুনতে পাই। তাই এটা আল্লাহর নি'আমতের অন্তর্ভুক্ত। এটা আমাদের জন্য একটা নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। এর মাধ্যমে সর্বত্র ইলম ছড়িয়ে দেয়া যায়। এর মাধ্যমে বাস্তবে উপকার লাভের ধরণ হলো মানুষ তার নিজের অবস্থা অনুযায়ী উপকার লাভ করবে। উদাহরণ স্বরূপ যারা গাড়ি চালায় তারা মিডিয়ার মাধ্যমে শুনে শুনে উপকার লাভ করতে সক্ষম। আবার খাদ্য গ্রহণ অথবা চা-কফি পানের সময়েও অনেকে এর মাধ্যমে নসিহত শুনে শুনে উপকৃত হয়। এখানে মূলত উপকার লাভের ধরণই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রত্যেকে তার নিজের অনুকূল অবস্থার আলোকে মিডিয়ার মাধ্যমে উপকার লাভ করবে। আমাদের পক্ষে এটা বলা সম্ভব নয় যে, এর মাধ্যমে উপকার লাভের সাধারণ নীতি আছে।
৯৫. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কোনটি উত্তম রাত জেগে ইবাদত করা নাকি ইলম অন্বেষণে নিয়োজিত থাকা?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, রাত জেগে ইবাদত করার চেয়ে ইলম অর্জন করতে থাকা উত্তম। কেননা, ইলম অর্জন সম্পর্কে ইমাম আহমদ (রহঃ) বলেন, নিজের এবং অন্যের অজ্ঞতা দূরিভূত করার বিশুদ্ধ নিয়তে ইলম অর্জন করলে তার সাথে কোন জিনিসেরই তুলনা হবে না। আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে রাতের প্রথমাংশে মানুষকে ইলম শিক্ষা দেয়ায় নিয়োজিত থাকা রাত জেগে ইবাদতের চেয়ে উত্তম। তবে ইলম অন্বেষণ ও ইবাদত উভয়টি একত্রে সম্পন্ন করলে আরো উত্তম। সম্ভব না হলে শারঈ ইলম অর্জনই উত্তম। এজন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমানোর পূর্বে আবু হুরাইরা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কে বিতর জ্বলাত আদায় করার নির্দেশ দিতেন।
আলিমগণ বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উক্ত নির্দেশের কারণ হলো আবূ হুরাইরা (রাঃ) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীছ রাতের প্রথমভাগে মুখস্থ করতেন এবং শেষভাগে তিনি ঘুমাতেন। তাই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমানোর পূর্বে তাকে বিতর জ্বলাত আদায় করার নির্দেশ দিতেন।
৯৬. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে দাঈ হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য কোন দিক-নির্দেশনা আছে কি? কেবল ইলম অর্জনে নিয়োজিত থাকলে দাওয়াত দান থেকে কি বিরত থাকা হয় না?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, ইলম অর্জন ছাড়া যে দাওয়াত দেয়া হয় তাতে কল্যাণ নেই। অর্থাৎ ইলম বিহীন দাঈর অনেক কল্যাণই ছুটে যায়। তাই আল্লাহর দিকে দাওয়াত দানের সাথে ইলম অর্জন করা শিক্ষার্থীর উপর ওয়াজিব। মসজিদে কাউকে ইলম অর্জন করতে দেখলে তাকে দাওয়াত দিতে শিক্ষার্থীর জন্য কি কোন প্রতিবন্ধকতা আছে? নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য বাজারের উদ্দেশ্যে বের হলে আল্লাহর দীন বিমুখ ব্যক্তিকে দাওয়াত দিতে কি তার কোন অসুবিধা আছে? যখন সে মাদ্রাসায় উপস্থিত হয়ে দেখতে পায় যে, শিক্ষার্থীরা আল্লাহর দিকে দাওয়াত দান হতে বিমুখ তখন তাদের হাত ধরে দাওয়াতী কাজে নিয়ে যেতে তার কোন প্রতিন্ধকতা আছে কি? তবে পাপাচারীতার সাথে কাউকে বিরোধী মনে হলে, অসৎ কাজ ছেড়ে না দিলে, তার প্রতি অতিষ্ট হলে, তাকে সংশোধন করা সম্ভব না হলে সে ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা তার নাবীকে বলেন,
{فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ وَلَا تَسْتَعْجِلْ لَهُمْ} [الأحقاف : ٣٥] .
তুমি ধৈর্য ধারণ কর, যেমন ধৈর্য ধারণ করেছিল সুদৃঢ় সংকল্পের অধিকারী রাসূলগণ। আর তাদের জন্য তাড়াহুড়া করো না (সূরা আল-আহক্বাফ ৪৬:৩৫)।
সুতরাং ধৈর্য ধারণ করা মানুষের উপর ওয়াজিব। নিজের অথবা অন্যের মাঝে কোন সমস্যা দেখতে পেলে তা সমাধানের ব্যাপারটি আল্লাহর উপর ন্যস্ত করবে। কোন এক যুদ্ধে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একটি আঙ্গুল রক্তাক্ত হলে তিনি বলেছিলেন,"هل أنت إلا أصبع دميت وفي سبيل الله ما لقيت ".
তুমি একটি আঙ্গুল ছাড়া আর কিছু নও; তুমি রক্তাক্ত হয়েছো আল্লাহর পথেই [৭৯]
৯৭. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কোন মাসআলা নিয়ে আলিমের ইজতেহাদের পর জ্বহীহ বিধান উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হলে তার হুকুম কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, কোন মাসআলা নিয়ে ইজতেহাদ করলে আলিম কখনো সঠিক সিন্ধান্তে উপনিত হন এবং কখনো তিনি ভুল করেন। যেমন বুরাইদাহ (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে এসেছে,
"وإذا حاصرت أهل حصن فأرادوك أن تترلهم على حكم الله فلا تترلهم على حكم الله، ولكن أنزلهم على حكمك فإنك لا تدري أتصيب فيهم حكم الله أم لا". رواه مسلم.
তুমি কোন দূর্গ অবরোধ করার পর তারা তোমার নিকট আল্লাহর হুকুমে দূর্গ থেকে বেরিয়ে আসার আবেদন করলে তুমি তাদেরকে বেরিয়ে আসার অনুমতি দিও না, বরং তাদেরকে তোমার নিজের হুকুমে বেরিয়ে আসার অনুমতি দাও। কারণ তোমার জানা নেই যে, তাদের ব্যাপারে তুমি আল্লাহর হুকুম কার্যকর করতে পারবে কি না।[৮০] নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"إذا حكم الحاكم فاجتهد فأصاب فله أجران، وإن أخطأ فله أجر واحد".
বিচারক ইজতেহাদে সঠিক সিন্ধান্তে উপনিত হলে তার জন্য রয়েছে দু'টি প্রতিদান আর ভুল হলে রয়েছে একটি প্রতিদান।[৮১]
আমরা কি একথা বলবো, মুজতাহিদ ভুল করলেও তিনি সঠিক সিন্ধান্তে বহাল থাকেন?
জবাবে বলা হয়েছে, কেউ কেউ বলেন, মুজতাহিদদের প্রত্যেকে সঠিক সিন্ধান্ত গ্রহণ করেন, আবার কেউ বলেন, প্রত্যেক মুজতাহিদ সঠিক নন। আরো বলা হয়, উছুল ছাড়াই শাখাগত বিষয়ে মুজতাহিদ সঠিক রায় দেন। আর উছুলের ক্ষেত্রে বিদ'আতপন্থীদেরকে সঠিক বলা থেকে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। যা হোক, বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, ইজতেহাদের দিক থেকে প্রত্যেক মুজতাহিদ সঠিক রায় দেন। অপরদিকে, হক্বের অনুকূলতার দিক থেকে তিনি সঠিক রায় দেন অথবা ভুল করেন। এটা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথা দ্বারা প্রমাণিত।
সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, সঠিক রায় ও ভুল সিন্ধান্ত উভয়টি মুজতাহিদগণের দ্বারা ঘটে থাকে। হাদীছের ভাষ্য ও দলীল দ্বারা বুঝা যায়, ইজতেহাদের বিষয়টি শাখাগত ও উছুলের অন্তর্ভুক্ত। আর এটাও প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না। কিন্তু সালাফদের ইজমা বিরোধী ইজতেহাদে ভুল সর্বদা ভুল বলেই গণ্য। আর এটা সম্ভন নয় যে, শাখাগত ও উছুলের বিষয়ে মুজতাহিদ সব সময় সঠিক বিবেচিত হবেন আর সালাফগণ সঠিক বলে গণ্য হবেন না। ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ ও ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রহঃ) দীনের শাখা ও উছুল এ ধরনের শ্রেণী বিন্যাসকে অস্বীকার করেন। তারা বলেন, ছাহাবীদের যুগের পর এ শ্রেণী বিন্যাস সৃষ্ট।
আমরা দেখতে পাই যে, কতিপয় আলিম এ শ্রেণী বিন্যাসের মাধ্যমে দীনের উছুলগত গুরুত্বপূর্ণ বিধানকে শাখার অন্তর্ভুক্ত করেছেন অথচ তা শাখা নয়। যেমন: الصلاة। এটি ইসলামের স্তম্ভ বা খুঁটি। তারা আক্বীদাগত ব্যাপারে এমন কিছু বিষয় বের করেন যা নিয়ে সালাফগণ মতানৈক্য করেছেন। ঐ সকল আলিমগণ বলেন, জ্বলাত হচ্ছে দীনের শাখার অন্তর্ভুক্ত। আর এটা আক্বীদাগত বিষয় নয়। এটা আক্বীদার শাখা মাত্র। এ ধরনের কথার জবাবে আমরা বলবো, যদি আক্বীদাগত বিষয়কে উছুল উদ্দেশ্যে নেয়া হয় তাহলে সম্পূর্ণ দীনই উছুল হিসাবে গণ্য। কেননা, শরী'আতসম্মত আক্বীদা ছাড়া আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য অর্থনৈতিক ও শারীরিক ইবাদত পালন করা সম্ভব নয়। এটাই হলো আমলের উপর আক্বীদা। যদি এটাকে আক্বীদা হিসাবে গণ্য করা না হতো তাহলে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইবাতদই বিশুদ্ধ হতো না। যা হোক, সঠিক কথা হলো উছুল ও শাখা যা কিছু নামকরণ করা হোক না কেন উভয় ক্ষেত্রে ইজতেহাদের দরজা উন্মুক্ত। কিন্তু সালাফগণ যেসব পন্থা বের করেননি তা সাধারণত গ্রহণযোগ্য নয়।
৯৮. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, যারা ইজতেহাদ সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করে বলে যে, বর্তমান যুগ মুজতাহিদ মুক্ত; এ ব্যাপারে আপনার ভাষ্য কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, সঠিক কথা হলো, সুন্নাহর দলীল অনুসারে ইজতেহাদের দরজা অবশিষ্ট রয়েছে। যেমন উমার ইবনে আছ এর হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
"إذا حكم الحاكم فاجتهد فأصاب فله أجران، وإن أخطأ فله أجر واحد".
বিচারক ইজতেহাদে সঠিক সিন্ধান্তে উপনিত হলে তার জন্য রয়েছে দু'টি প্রতিদান আর ভুল হলে রয়েছে একটি প্রতিদান। [৮২]
যারা বলে, এখন ইজতেহাদ নেই, বর্তমান যুগ মুজতাহিদ মুক্ত উক্ত হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় তাদের এ কথাটি দুর্বল। তবে কিতাব-সুন্নাহ হতে বিমুখ হয়ে কেবল মানুষের মতামতের উপর ভিত্তি করে ইজতেহাদ করা ভুল। বরং কিতাব-সুন্নাহ হতে যতটুকু সম্ভব মাসআলা উদ্ঘাটন করে তা গ্রহণ ওয়াজিব। সুন্নাহর আধিক্যতা এবং ভিন্নতায় কোন বিষয়ে একটা হাদীছ শুনেই ফায়ছালা গ্রহণ করা উচিত হবে না যতক্ষণ না ঐ ব্যাপারে স্পষ্ট দলীল সাব্যস্ত হয়। কেননা, কখনো এমনও ঘটে যে, কোন হুকুম সম্পর্কে মানসুখ অথবা মুক্বাইয়াদ কিংবা আম হাদীছ রয়েছে অথচ এ ব্যাপারে ব্যক্তির হয়তো বিপরীত ধারণা রয়েছে। আর যদি এটা বলা হয় যে, তোমরা কুরআন সুন্নাহ দেখে কিছু বুঝতে পারবে না; কারণ তোমরা মুজতাহিদ নও তাহলে এ ধরনের কথা বলাও ঠিক হবে না। সর্বোপরি আমরা বলবো যে, ইজতেহাদের দরজা উন্মুক্ত। এজন্য পূর্ববর্তী আলিমদের কথাকে সব সময় উপেক্ষা করা অথবা তাদের অসম্মান করা বৈধ নয়। কেননা, তারা মাসআলা উদ্ঘাটনে চেষ্টা-সাধনা ও ইজতেহাদ করেছেন। এ ব্যাপারে তারা ত্রুটি মুক্ত নন। তাদের দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করা, তারা যে মাসআলা দিয়েছেন তাতে ত্রুটি বের করে তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে মানুষের সামনে তা তুলে ধরা তোমার জন্য বৈধ নয়। কেননা, শত্রুর গিবত করা হারাম হয়ে থাকলে ঐ সব আলিমের গিবত করা কিভাবে সম্ভব যারা দলীল ভিত্তিক মাসআলা উদঘাটনে নিজেদেরকে বিলিন করে দিয়েছেন? অতঃপর কথা হলো, শেষ যুগে কিছু লোক বলতে থাকবে, ঐসব আলিম কিছুই জানে না, তাদের মাসআলায় ত্রুটি রয়েছে। তারা এরূপ আরো অনেক কথাই বলবে। বিরল কিছু মাসআলায় যদিও ত্রুটি হয়ে থাকে কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ মাসআলা উদ্ঘাটন করা তাদের উদ্দেশ্যে ছিল না। বরং তারা চর্চার উদ্দেশ্যে কাওয়ায়েদ ও উছুলের ভিত্তিতে মাসআলায় সমতা বিধান করেছেন।
৯৯. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইমাম নববী, ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহঃ) এর ব্যাপারে কতিপয় লোক বলে যে, তারা বিদ'আতপন্থী। এ শ্রেণীর আলিমদের আক্বীদায় কোন ভুল ছিল কি? যদিও ইজতেহাদ ও তা'বিলে ভুল
থাকার কারণে তাদেরকে বিদ'আতপন্থী বলা হয়ে থাকে। এখানে ইলম ও আমলগত বিষয়ে ভুলের মাঝে কোন পার্থক্য আছে কি?
জবাবে শাইখ () বলেন, তাদের বাস্তব অবদান ও বৃহৎ উপকার মুসলিম উম্মাহর জন্য স্বীকৃত। যদিও কতিপয় নছ (দলীলে) উল্লেখিত ছিফাত গুণাবলী সম্পর্কে তাদের ত্রুটি রয়ে গেছে তদুপরি তাদের মর্যাদা ও বৃহৎ উপকারের কারণে তা লজ্জাকর নয়। তাদের ইজতেহাদ ও সুক্ষ্ম তা'বিলে ত্রুটি হয়ে থাকলে তা নিয়ে আমরা বিরূপ মন্তব্য করবো না। আমরা কামনা করি যে, তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করবেন। কল্যাণকর, উপকারী ও প্রশংসাযোগ্য অবদান যা কিছু তারা রেখে গেছেন আল্লাহ তা'আলা এসবের বিণিময় দান করবেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهبن السيئات} [هود: ١١٤] নিশ্চয়ই ভালকাজ মন্দকাজকে মিটিয়ে দেয় (সূরা হুদ ১১:১১৪)।
আমি মনে করি, তারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআ'তের অনুসারী। আর এটাই সাক্ষ্যে বহন করে যে, তারা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহর জন্য খেদমত করেছেন। আর সুন্নাহর সাথে সম্পৃক্ত এমন সর্ব প্রকার কলুষতা থেকে সুন্নাহকে রক্ষার জন্য তারা ছিলেন উৎসাহী এবং যা দ্বারা হুকুম সাব্যস্ত হয় এমন দলীল বিশ্লেষণে ছিলেন তৎপর। কিন্তু গুণাবলী সম্পর্কি আয়াত ও হাদীছের ব্যাপারে তাদের মতভেদ আছে অথবা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআ'তের কতিপয় ইজতেহাদ সম্পর্কে তাদের বিরূপ মন্তব্য রয়েছে। আমরা কামনা করি, আল্লাহ তা'আলা যেন তাদের সাথে ক্ষমা সুন্দর আচরণ করেন।
আর আক্বীদার ক্ষেত্রে বলবো, আক্বীদায় সালাফদের রীতি বিরোধী কোন ত্রুটি ঘটলে নিঃসন্দেহে তা ভ্রষ্টতার অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে এক্ষেত্রে দলীল প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ভ্রষ্ট বলে আখ্যা দেয়া সমীচিন নয়। আক্বীদাগত ভুল-ভ্রান্তির উপর দলীল সাব্যস্ত হলে তা হক্ব বিরোধী বিদ'আতের অন্তর্ভুক্ত হবে যদিও ব্যক্তি সালাফপন্থী হয়ে থাকে। সাধারণত তাদেরকে বিদ'আতী বলে আখ্যা দেয়া যাবে না এবং সালাফীও বলা যাবে না। বরং সালাফদের যেসব রীতির উপর তারা বহাল ছিলেন তদানুযায়ী সালাফ বলে গণ্য হবেন আর যেসব রীতির বিরোধীতা করা হয়েছে সেক্ষেত্রে বিদ'আতী বিবেচিত হবেন।
যেমন ফাসিকের ব্যাপারে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআ'তের কথা হলো, যতটুকু ঈমান রয়েছে তার কারণে ব্যক্তি মুমিন আর অবাধ্যতার কারণে তিনি ফাসিক।
সুতরাং সাধারণ কথায় এককভাবে কোনটির দিকেই ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করে গুণান্বিত করা যায় না। আর এটিই হলো ইনসাফ যে ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিয়েছেন। তবে বিদআ'তের সীমা অতিক্রম করলে ব্যক্তি মিল্লাত থেকে বের হয়ে যাবেন, এক্ষেত্রে তার কোন মূল্যায়ন নেই।
আর আমল ও ইলমগত ভুলের মাঝে পার্থক্যের ব্যাপারে কথা হলো, আমি মূলত এ ধরনের ভুলের মাঝে পার্থক্যকরণ জানি না। তবে অত্যাবশক ইলমগত ঈমান সম্পর্কে আমরা যা জানি যে ব্যাপারে সালাফদের সবাই একমত ছিলেন এবং কিছু বিষয়ে মতভেদ করেছেন তা ছিল শাখাগত বিষয়, মৌলিক নয়। কম সংখ্যকই এ শাখাগত বিষয়ে বিরোধীতা করেছেন। কখনো সালাফগণ শাখাগত ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। যেমন: নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি তার প্রভুকে জাগ্রত অবস্থায় দেখেছিলেন। এরূপ কবরে প্রশ্নকারী দু'জন ফিরিস্তা সম্পর্কে তাদের মতভেদ আছে। আরো মতভেদ হলো, বিচারের মাঠে দাড়ি পাল্লায় আমল অথবা আমলনামা নাকি আমলকারী ব্যক্তিকে রাখা হবে। কবরে রূহ ছাড়া শুধু শারীরিক শাস্তি হবে কি না? দায়িত্ব বর্তায়নি এমন নাবালক শিশুদেরকে কবরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি না? পূর্ববর্তী উম্মাতকে কবরে জিজ্ঞেস করা হবে কি না যেমনভাবে এ উম্মাতকে জিজ্ঞেস করা হবে। জাহান্নামের উপর নির্মিত রাস্তার বৈশিষ্ট্য কেমন হবে? জাহান্নামের আগুন নিভে যাবে নাকি সর্বদা স্থায়ী হবে? এরূপ অন্যান্যে বিষয়ে মতভেদ আছে। এসব মাসআলায় জমহুর আলিমদের সঠিক সমাধান আছে। এ বিষয়ে মতানৈক্য দুর্বল বলে বিবেচিত হবে। অনরূপভাবে আমলগত ব্যাপারেও শক্তিশালী ও দুর্বল মতভেদ রয়েছে। এজন্য আমাদেরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দু'আ জানতে হবে তা হলো,
"اللهم فاطر السماوات والأرض، عالم الغيب والشهادة، أنت تحكم بين عبادك فيما كانوا فيه يختلفون، اهدني لما اختلف فيه من الحق بإذنك إنك تهدي من تشاء إلى صراط مستقيم".
হে আল্লাহ! আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, প্রকাশ্য ও গোপন বিষয়সমূহের জ্ঞানের অধিকারী। তোমার বান্দারা যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করে তুমিই সে গুলোর ফায়ছালা করবে। সত্য ও ন্যায়ের যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করা
হয়েছে সে বিষয়ে তুমি আমাকে পথ দেখাও। তুমিই তো যাকে ইচ্ছা সরল-সহজ পথ দেখিয়ে থাকে। [৮৩]
১০০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, একই বিষয়ে ফাতওয়া দানে দু'জন মুফতির মাঝে মতভেদ হয় এর কারণ কি? আর এক্ষেত্রে ফাতওয়া গ্রহণে করণীয় কি?
জবাবে শাইখ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এখানে দু'টি কারণ রয়েছে। প্রথম: কখনো এমন হয় যে, দু'জন মুফতির মধ্যে একজন যা জানেন অপর জনের তা জানা নেই। তাই প্রথম মুফতি তথ্যের দিক থেকে বেশি অগ্রগামী। তাই যে ব্যাপারে তার পর্যবেক্ষণের জ্ঞান রয়েছে তা অপরের নেই।
দ্বিতীয়: কোন বিষয় উপলব্ধি করার ব্যাপারে মানুষের মাঝে অনেক মতানৈক্য আছে। কখনো কখনো মানুষ ইলমের দিক থেকে সমান হয়ে থাকে কিন্তু বুঝার ক্ষেত্রে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তা'আলা কাউকে গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন বুঝ দান করেন। তাই অন্যের চেয়ে তিনি একটু বেশিই জানেন। তার ইলমের আধিক্যতা ও প্রবল বুঝ থাকার কারণে অন্যের চেয়ে তিনি সঠিকতার অধিক নিকটে অবস্থান করেন। অপরদিকে, দু'জন আলিমের মাঝে মতভেদ দেখা দিলে ফাতাওয়া জানতে আগ্রহী ব্যক্তি যাকে ইলম, আল্লাহভীরুতা ও ধার্মিকতার দিক থেকে অধিক সঠিক মনে করবেন তার নিকট থেকেই তিনি ফাতওয়া জেনে নিবেন। যেমন মানুষ অসুস্থ হলে দু'জন চিকিৎসকের মধ্যে রোগী যাকে অধিক অভিজ্ঞ মনে করে সে তার কাছ থেকেই চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করে থাকে। তেমনি দু'জন মুফতি যদি যোগ্যতার দিক থেকে সমান হয়ে থাকেন কাউকে প্রাধান্য দেয়া সম্ভব না হয় তাহলে ইচ্ছানুযায়ী যে কোন একজনের তার কাছে থেকে ফাতওয়া গ্রহণ করতে হবে।
১০১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আলিমদের দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করে যেসব শিক্ষার্থী তাদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে ঐসব শিক্ষার্থীর ব্যাপারে আপনার উপদেশ কি?
জবাবে শাইখ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, নিঃসন্দেহে আলিমগণ ভুল করে এবং সঠিক সিদ্ধান্তে উপনিত হয়। তাদের কেউ ত্রুটি মুক্ত নয়। তাদের ভুল-ত্রুটিকে অপবাদ হিসাবে নির্ধারণ করা উচিত নয়, বৈধ নয়। কারণ সঠিক বিষয়ে উপনিত
হতে না পারলে বৈশিষ্ট্যগতভাবে মানুষ ভুল করে। কোন আলিম অথবা দাঈ অথবা কোন মাসজিদের ইমামের ভুল-ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে তা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তাদের প্রতি এ দোষ আরোপ করা হতে বিরত থাকতে হবে। কেননা, কখনো বর্ণনা করা অথবা বুঝের ক্ষেত্রে ভুল-ত্রুটি ঘটে থাকে অথবা যার নিকট হতে তিনি শুনেছেন তা শ্রবণের ক্ষেত্রেও অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি ঘটতে পারে। তাই সর্বাবস্থায় কোন আলিম অথবা দাঈ অথবা কোন মাসজিদের ইমাম অথবা কোন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির ভুল-ত্রুটির কথা শুনেই তা তাদের প্রতি আরোপ করা ঠিক নয়। ঐ ত্রুটি সম্পর্কে জানতে হবে যে, আসলেই তার মাধ্যমে তা ঘটেছে কি না। তাদের কারো ত্রুটি হয়ে থাকলে যা ভুল মনে করা হয়েছে তা স্পষ্ট করতে হবে। এক্ষেত্রে দু'টি বিষয় স্পষ্ট হবে, ভুল প্রমাণিত হলে তিনি সংশোধন করে নিবেন অথবা যা ভুল মনে করা হতো তা ভুল নয় বরং সঠিক বলে বিবেচিত। অতঃপর ঐ আলিমের কথার তাৎপর্য স্পষ্ট হলে আমরা যা বিশৃঙ্খলা মনে করতাম তা বিশেষত যুব শ্রেণী থেকে দূরিভূত হবে।
আর কোন কথা শুনার পর তা বলার ব্যাপারে সংযত হওয়া, উপদেশ গ্রহণ করা এবং যা বর্ণনা করা হয়েছে স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তার যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা যুব শ্রেণী এবং অন্যদের উপর ওয়াজীব। কোন সমাবেশ বিশেষত জন সমাবেশে কোন কথা প্রসঙ্গে এভাবে বলা যে, অমুকের ব্যাপারে তুমি কি বলো? যে অন্যেদের কথার বিরোধীতা করে তুমি তার সম্পর্কে কি বলো? এ ধরনের প্রশ্ন তুলে সাধারণত কথা ছড়িয়ে দেয়া ঠিক না। এভাবে ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। তাই জিহবাকে সংযত করা ওয়াজিব। মুআ'য ইবনে জাবাল (রাঃ) কে নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"ألا أخبرك بملاك ذلك كله؟ قلت: بلى يا رسول الله فأخذ بلسان نفسه، وقال: "كف عليك هذا. قلت: يا رسول الله وإنا لمؤاخذون بما نتكلم به. قال: "ثكلتك أمك يا معاذ، وهل يكب الناس في النار على وجهوهم أو قال على مناخرهم إلا حصائد ألسنتهم".
আমি তোমাকে এসব কাজের নির্যাস সম্পর্কে অবহিত করবো না? আমি বললাম, হাঁ। তিনি তার জিহবা ধরে বলেন, তুমি এটা সংযত রাখো। আমি বললাম, হে আল্লাহর নাবী! আমরা যা কিছু বলি সে জন্য কি পাকড়াও হবো? তিনি বলেন,
হে মুআ'য! তোমার মা তোমার জন্য কাঁদুক। মানুষতো তার অসংযত কথাবার্তার কারণে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। [৮৪]
শিক্ষার্থীসহ সবাইকে আমি উপদেশ দিবো যে, তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং আলিম ও আমীরদের বিরোধীতা না করে কারণ তারা জাতিকে পরিচালিত করেন। সাধারণ মানুষের গীবত করা কাবীরাহ গুনাহ আর আলিম-আমীরদের গীবত করা তার চেয়েও মারাত্মক। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে তার ক্রোধ থেকে রক্ষা করুন। আমাদের ভাইদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা দূরিভূত করুন। তিনি অত্যন্ত দয়াশীল।
১০২. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, যারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত (الفرق والتحزب) হয় তাদের ব্যাপারে আপনার দিক-নির্দেশনা কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, আল্লাহর দীনে বিভক্ত হওয়া নিষিদ্ধ এবং হারাম। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ} [آل عمران : ١٠٥] .
তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা বিভক্ত হয়েছে এবং মতবিরোধ করেছে তাদের নিকট স্পষ্ট নির্দশনসমূহ আসার পর। আর তাদের জন্যই রয়েছে কঠোর আযাব (সূরা আলে ইমরান ৩:১০৫)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ فَرِّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بما كانُوا يَفْعَلُونَ} [الأنعام: ١٥٩] .
নিশ্চয় যারা তাদের দীনকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং দল-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোন ব্যাপারে তোমার দায়িত্ব নেই। তাদের বিষয়টি তো আল্লাহর নিকট। অতঃপর তারা যা করত, তিনি তাদেরকে সে বিষয়ে অবগত করবেন (সূরা আল-আনআ'ম ৭:১৫৯)।
সুতরাং মুসলিম উম্মাতের জন্য বিভিন্ন দলে বিভক্ত বৈধ নয়। প্রত্যেক দলের রয়েছে ভিন্ন রীতি-পদ্ধতি। সুতরাং একই রীতি-পদ্ধতিতে আল্লাহর দীনের উপর একতাবদ্ধ থাকা ওয়াজিব। আর ঐ মানহাজ-পদ্ধতিই হলো নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পথ নির্দেশনা, খুলাফায়ে রাশেদীন ও ছাহাবীদের পন্থা। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"عليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين من بعدي تمسكوا بها وعضوا عليها بالنواجذ، وإياكم ومحدثات الأمور فإن كل بدعة ضلالة".
আমার পরে তোমরা আমার সুন্নাত ও হিদায়াত প্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাত অবশ্যই অবলম্বন করবে, তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরবে। অবশ্যই তোমরা বিদআ'ত কাজ পরিহার করবে। কারণ প্রতিটি বিদআ'তই ভ্রষ্টতা। [৮৫]
وليس من هدي النبي صلى الله عليه وسلم وخلفائه الراشدين أن تتفرق الأمة أحزابا لكل حزب أمير ،ومنهج، وأمير الأمة الإسلامية واحد وأمير كل ناحية واحد، من قبل الأمير العام.
বিভিন্ন দলে বিভক্ত হওয়া নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও খুলাফায়ে রাশেদীনের পথ নির্দেশ নয়। প্রত্যেক দলের রয়েছে নির্দিষ্ট আমীর ও রীতি-পদ্ধতি। অথচ মুসলিম উম্মাতের আমীর একটাই। সব দিক হতে সাধারণ আমীর-শাসক একজনই।
নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সফরে আমীর নিযুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। কেননা, মুসাফিরগণ তাদের গ্রাম ও শহর ছেড়ে প্রবাসী হয়েছেন সেখানেও সাধারণ আমীরের দিক হতে তাদের আমীর রয়েছে। কখনো এমন সমস্যা সৃষ্টি হয় যে, গ্রাম ও শহর পৌঁছতে তাদের দেরী হয়ে যায় অথবা এমন ছোট ছোট সমস্যা যা শহর-গ্রামের আমীরদের নিকট তুলে ধরা সম্ভব নয়। যেমন: কোন জায়গায় বসবাস করা, দূরে গমন করা, ভ্রমণের জন্য অনুমতি প্রদান করা অথবা বিরত থাকা অনুরূপ অন্যান্য বিষয়। সুতরাং এসব সমস্যা সমাধানের জন্য এক্ষেত্রে মুসাফিরগণ একজন আমীরের শরণাপন্ন হলে তা হবে প্রজ্ঞাপূর্ণ কাজ।
মূলত উম্মাতের জন্য আমার উপদেশ হচ্ছে তারা দীনের উপর একতাবদ্ধ থাকবে বিচ্ছিন্ন হবে না। কোন ব্যক্তি অথবা দলকে দীন হতে বের হতে দেখলে তারা তাদেরকে নসিহত করবে। তাদের সামনে হক্ব তুলে ধরবে আর দীনের বিরোধীতার ব্যাপারে সতর্ক করবে।
আরো বর্ণনা করবে যে, বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেয়ে হক্বের উপর একতাবদ্ধ থাকা সঠিক ও কল্যাণের কাছাকাছি পৌঁছা যায়। আর অনুমোদিত ইজতেহাদ সম্পর্কে যখন কোন মতানৈক্য দেখবে তখন ভিন্ন মতের অনুসারীদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখবে এ কারণে মতবিরোধে লিপ্ত হবে না। কেননা, নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে ছাহাবীগণ ও তার পরবর্তীদের মাঝে ইজতেহাদ নিয়ে দ্বন্দ্ব হতো অথচ তাদের মাঝে আন্তরিক মনো মালিন্য ও বিচ্ছিন্নতা ছিল না। আমাদের মাঝে তাদের আদর্শ থাকা উচিত। যে পন্থায় পূর্ববর্তীগণ সংশোধন হয়েছেন ঐ পন্থায় মুসলিম উম্মাতেকে সংশোধন হতে হবে। আল্লাহ তা'আলা যা পছন্দ করেন এবং যে বিষয়ে সন্তুষ্ট হন তিনি যেন আমাদেরকে তা পালন করার তাওফীক দান করেন।
১০৩. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, জনসাধারণ এবং যারা ইলম অর্জনে সক্ষম নন তাদের উপর করণীয় কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, যাদের জ্ঞান নেই এবং ইজতেহাদে সক্ষমতাও নেই বিদ্বানদের নিকট জিজ্ঞাসাবাদ করা তাদের উপর ওয়াজীব। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ফَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} [الأنبياء: ٧]
সুতরাং তোমরা জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর যদি তোমরা না জান (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৭)।
বুঝা যায়, আলিমদের কথা গ্রহণ করার উদ্দেশ্যেই আল্লাহ তা'আলা এ নির্দেশ দিয়েছেন। এটাই হলো তাক্বলীদ। কিন্তু তাকুলিদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসরণ আবশ্যক মনে করে সর্বাবস্থায় ঐ মাযহাবের রীতি-পদ্ধতি গ্রহণ করা এবং মাযহাবের রীতি দলীল বিরোধী হলেও এ মাযহাবীয় রীতি আল্লাহরই বিধান বলে বিশ্বাস করা নিষিদ্ধ। অপরপক্ষে, যারা ইজতেহাদে সক্ষম যেমন: ইলমের পূর্ণতা আছে এমন শিক্ষার্থী দলীল নিয়ে ইজতেহাদ করতে পারবে এবং সঠিক অথবা সঠিকের অধিক নিকটবর্তী যা কিছু বুঝতে সক্ষম হবে তা গ্রহণ করবে। আর হক্বের ক্ষেত্রে ইলমের গভীরতা, দীনদারিতা ও ধার্মিকতার দিক হতে
জনসাধারণ এবং প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা যাকে অধিক সঠিক বলে মনে করবে তারা ঐ আলিমের অনুসরণ করবে।
১০৪. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, শারঈ জ্ঞানের শিক্ষার্থীরা ছাহাবীদের কথাকে উচুঁ মনে করে সে দিকে ধাবিত হয়, এটা দলীল হিসাবে কি আমলযোগ্য?
জবাবে শাইখ বলেন, নিঃসন্দেহে ছাহাবীদের কথা অন্যের চেয়ে সত্যতার অধিক নিকটবর্তী। তাদের কথা দুটি শর্তসাপেক্ষ দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য।
প্রথম: তাদের কথা আল্লাহর কিতাব ও রসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ বিরোধী হবে না।
দ্বিতীয়: অন্য ছাহাবীদের কথার বিরোধী হবে না।
যদি তাদের কথা কিতাব-সুন্নাহর বিরোধী হয় তাহলে আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহই হবে দলীল। আর ছাহাবীদের ত্রুটি ক্ষমাপ্রাপ্ত। অন্যদিকে, কোন ছাহাবীর কথা অন্য ছাহাবীর কথার বিরোধী হলে উভয়ের কথার মাঝে প্রাধান্যতা খুঁজতে হবে। যার কথা অগ্রগণ্য বলে মনে হবে তার অনুসরণ হবে যথাযথ। আর কথার প্রাধান্যতার বুখারীর নিয়ম হলো ছাহাবীদের অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া অথবা শরীয়াতের সাধারণ কাওয়ায়েদ অথবা অনুরূপ নিয়মের সাথে তাদের কথার মিল থাকা। এ হুকুম কি সকল ছাহাবীর জন্য আম-সাধারণ হিসাবে গণ্য নাকি তা খুলাফায়ে রাশেদীনের অথবা আবু বকর ও উমার এর সাথে নির্দিষ্ট। নিঃসন্দেহে আবু বকর ও উমার এর কথা উক্ত দুটি শর্তের আলোকে দলীলযোগ্য। অন্যদের চেয়ে তাদের কথা অগ্রগণ্য। আবার উমার এর চেয়ে আবু বকর এর কথা অধিকারপ্রাপ্ত। হুযাইফা ইবনে ইয়ামান হতে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"اقتدوا بالذين من بعدي أبي بكر وعمر".
আমার পরে আবু বকর ও উমার এর অনুসরণ করো।
আবু কাতাদা হতে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"فإن يطيعوا أبا بكر وعمر يرشدوا".
যদি তোমরা আবূ বকর ও উমার (আ) এর আনুগত্য করো তাহলে তারা পথ দেখাবে। [৮৭]
باب الاقتداء بسنن رسول الله صلى الله عليه জ্বহীহ বুখারীর আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামক অধ্যায়ে উমার ইবনে খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
هما المرءان يقتدى بهما,
তাদের দু'জনের (রসূল জ্বলাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকরের) আনুগত্য করতে হবে। [৮৮]
অবশিষ্ট খুলাফায়ে রাশেদীনের ব্যাপারে ইরবাদ্ধ ইবনে সারিয়া (আ) হতে বর্ণিত, সুনান ও মাসনাদে উল্লেখ করা হয়েছে, নাবী জ্বলাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين تمسكوا بها وعضوا عليها بالنواجذ".
আমার এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা তোমাদের উপর আবশ্যক। মাড়ির দাঁত দিয়ে তোমরা তা কামড়ে ধরো।[৮৯]
গুণাবলীর দিক থেকে চারজন খলীফা উত্তম। তাদের কথা দলীল হিসাবে স্বীকৃত। অন্যদিকে, অবশিষ্ট ছাহাবীগণের মধ্যে যারা ইলমের দিক থেকে সুপ্রসিদ্ধ এবং দীর্ঘকাল রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সহচর্য লাভ করেছেন তাদের কথা দলীল হিসাবে গণ্য। আর যারা এরূপ নয় তাদের কথা চিন্তা-ভাবনা করে গ্রহণ করতে হবে। ইবনুল কাইয়্যিম (এ) তার কিতাবের শুরু "إعلام الموقعين" এ উল্লেখ করেন। ইমামের ফাতওয়া পাঁচটি উছুলের উপর গঠিত।
ছাহাবীদের ফাতওয়া, ভিন্নমতের আলিমগণের ফাতওয়া; কিন্তু এখানে প্রধান্য বিস্তারকারী এবং আবশ্যক বিষয় হলো হয়তো ছাহাবীদের ফাতওয়ার সাথে ঐ
আলিমের কথার প্রধান্য বজায় থাকতে হবে নচেৎ তা দলীল বিরোধী বলে গণ্য হবে। (এভাবে যাচাই পূর্বক) প্রধান্যতা বজায় থাকলে ঐ ফাতওয়াদানকারী আলিমের দলীলের উপর আমল করা যেতে পারে।
আল্লাহ তা'আলা যেন আমাদের সকলকে হক্বের দাঈ ও সাহায্যেকারী হিসাবে কবুল করে নেন। আর বিশ্বাস, কথা ও কর্মে সঠিক সিন্ধান্ত গ্রহণের তাওফীক্ব দান করেন। এখানে তিনটি মাসআলা উল্লেখিত হয়েছে:
প্রথম মাসআলা: তোমার নিকট এমন দু'টি কথার প্রধান্যতা স্পষ্ট হয় যার বিপরীতে তুমি ফাতওয়া দিয়েছো অথবা ফায়ছালা গ্রহণ করেছো। যে ব্যাপারে ফাতওয়া অথবা ফায়ছালা দেয়া হয়েছে তা থেকে তোমার প্রত্যাবর্তন করা বৈধতা আছে কি না।
দ্বিতীয় মাসআলা: তোমার নিকট যে দু'টি কথার প্রধান্যতা স্পষ্ট হয় যার বিপরীতে তুমি ফাতওয়া দিয়েছো অথবা ফায়ছালা গ্রহণ করেছো। যে ব্যাপারে প্রধান্যতা স্পষ্ট হয় ভবিষ্যতে সে বিষয়ে তোমরা ফাতওয়া দেয়া অথবা ফায়ছালা গ্রহণ করা বৈধ হবে কি না।
তৃতীয় মাসআলা: কোন ব্যক্তির দু'টি কথার একটি দ্বারা এবং অন্য লোকের দ্বিতীয় কথার মাধ্যমে মতভেদপূর্ণ মাসআলায় ফাতওয়া দেয়া বৈধ হবে কি।
আল্লাহ তা'আলার সাহায্যে এবং তার তাওফীক্বে উক্ত গুরুত্বপূর্ণ মাসআলার জবাব নিম্নে তুলে ধরা হলো, আমরা আল্লাহর নিকট হিদায়াত ও সঠিক ফায়ছালা কামনা করি।
প্রথম মাসআলা: মানুষ যে রায়-সিন্ধান্তের উপর বহাল ছিল তা দুর্বল বলে স্পষ্ট হলে এবং অন্যের মাঝে হক্ব পাওয়া গেলে দুর্বল রায় বর্জন করত জ্বহীহ দলীল অনুসারে যা সঠিক মনে হয় তার দিকেই প্রত্যাবর্তন করা ওয়াজিব। আর আল্লাহর কিতাব, রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহর অনুসরণ, খুলাফায়ে রাশেদীনের রীতি, মুসলিমদের ইজমা ও ইমামগণের আমলের দিকে প্রত্যাবর্তন করা ওয়াজিব প্রমাণিত। আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে দলীল হলো,
{وَمَا اختلفتم فيه من شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ ذَلِكُمُ اللهُ رَبِّي عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ} [الشورى: ١٠] .
যে বিষয়েই তোমরা মতবিরোধ কর না কেন, তার ফায়সালা আল্লাহর কাছে; তিনিই আল্লাহ, আমার রব; তারই ওপর আমি তাওয়াক্কুল করি এবং তারই অভিমুখী হই (সূরা আশ শূরা ৪২:১০)।
মাসআলায় মতভেদ দেখা দিলে আল্লাহর কিতাবের দিকে প্রত্যাবর্তন করা ওয়াজিব। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذلك خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا} [النساء: ٥٩]
কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ করো তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যার্পণ কর- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর (সূরা আন নিসা ৪:৫৯)। তিনি আরো বলেন,
{وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا} [النساء: ١١٥] .
যে রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে তার জন্য হিদায়াত প্রকাশ পাওয়ার পর এবং মুমিনদের পথের বিপরীত পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে ফেরাবো যেদিকে সে ফিরে এবং তাকে প্রবেশ করাবো জাহান্নামে। আর আবাস হিসেবে তা খুবই মন্দ (সূরা আন-নিসা ৪:১১৫)।
সুতরাং বুঝা গেল, কিতাব ও সুন্নাহ হতে যা কিছু প্রমাণিত হয় সে দিকেই প্রত্যাবর্তন করা মুমিনদের পন্থা। সুন্নাহ দলীল সাব্যস্ত হওয়ার ব্যাপারে রসূল জ্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"إنه من يعش منكم فسيرى اختلافا كثيراً فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهدين من بعدي".
তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে তারা অনেক মতভেদ দেখতে পাবে, তাই আমার পরে আমার সুন্নাহ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের রীতি-পদ্ধতি অনুসরণ করা তোমাদের উপর ওয়াজিব। [৯০] এ হাদীছের অর্থ নিয়ে কিছু কথা আছে,
খুলাফায়ে রাশেদীনের কথা: তাদের মধ্যে আমীরুল মুমিনিন উমার ইবনে খাত্তাব (রা)এর কথা প্রসিদ্ধ। স্বামী, মাতা ও বৈপিত্রিয় ভাইয়ের জন্য আছাবাহ হিসাবে তিনি মিরাছ নির্ধারণ করেছেন। কখনো রেখে যাওয়া সম্পদে পরিপূর্ণভাবে তাদেরকে মিরাছে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের অংশীদারিত্বের সাথে বৈপিত্রিয় ভাইয়ের অংশ নির্ধারণ করেছেন জনৈক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করলো, আমি প্রথম বছরে বৈপিত্রিয়ের মিরাছের ব্যাপারে অন্যরকম ফায়ছালা করেছি, আপনি কিভাবে ফায়ছালা করলেন, তিনি বলেন, আমি বৈপিত্রিয় ভাইয়ের জন্য মিরাছ নির্ধারণ করেছি, অথচ তুমি সহোদর ভাইয়ের জন্য কিছুই নির্ধারণ করোনি। উমার (রা) বলেন, আমরা এভাবেই ফায়ছালা করে থাকি। ইবনু আবি শাইবা ১১/২৫৩।
فى القضاء کتاب لأبي موسى -এ তিনি বলেন, আজকে তুমি যে ফায়ছালা করবে তাতে যেন কোন কিছু তোমাকে বাধা না দেয়, তোমার রায়-সিন্ধান্ত নিয়ে পর্যবেক্ষণ করবে তাহলে ঐ রায় অনুযায়ী হক্বের পথ খুঁজে পাবে। আর বাতিলে পড়ে থাকার চেয়ে হক্ব নিয়ে পর্যালোচনা করা উত্তম।
ইজমা: এ সম্পর্কে ইমাম শাফেঈ (র) বলেন, মুসলিমগণের ইজমা হয়েছে যে, যার নিকট রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ স্পষ্ট হয়েছে কোন মানুষের কথা গ্রহণ করা তার জন্য উচিত নয়।
ইমামদের আমল: ইমাম আহমাদ (র) কোন বলার পর তার বিপরীতও বলেছেন, এ ক্ষেত্রে তিনি স্পষ্টভাবেই তার কথা থেকে প্রত্যাবর্তন করেছেন। যেমন মদ পানকারী ব্যক্তির তালাক্ব পতিত হওয়ার কথা থেকে তিনি ফিরে এসেছেন। কখনো তার শিষ্যরাও স্পষ্টভাবে তার কথা থেকে প্রত্যাবর্তন করেছেন। যেমন ইমাম আহমাদ (র) খিলাল করার কথা থেকে স্পষ্টতঃ প্রত্যাবর্তন করেছেন। যে লোক মুকিম অবস্থায় মোজার উপর মাসাহ করে সফর করলো, তাহলে মুকিম অবস্থায় তার মাসাহ পূর্ণ হলে সফর অবস্থায়ও মাসাহ পূর্ণ
হবে। আবার কখনো তিনি তার কথা থেকে প্রত্যাবর্তন করেননি। এক্ষেত্রে তার মাসআলায় দু'টি কথা আছে:
এখানে গুরুত্ব পূর্ণ বিষয় হলো প্রথম রায়-সিন্ধান্ত দুর্বল বলে স্পষ্ট হলে তা থেকে প্রত্যাবর্তন করা ওয়াজিব। প্রথম হুকুম ভঙ্গ করা তার জন্য বৈধ। তবে যাকে ফাতওয়া দেয়া হয়েছে তার জন্য প্রত্যাবর্তন করা আবশ্যক নয়। উভয় রায়-সিন্ধান্ত ইজতেহাদ ভিত্তিক। ইজতেহাদ যথাযথ হলে তা ভঙ্গ করার দরকার নেই। আর প্রথম ইজতেহাদে ভুল প্রকাশ হলে দ্বিতীয়টিতে ভুল না থাকার অন্তরায় নেই তথা ভুল থাকা সম্ভব। আবার কখনো এমন হয় যে, বাস্তবে প্রথম ইজতেহাদই সঠিক যদিও তা বাহ্যিকভাবে বিপরীত মনে হয়। তবে প্রথম-দ্বিতীয় কোন ইজতেহাদেই মানুষ ত্রুটি মুক্ত নয়।
দ্বিতীয় মাসআলা: প্রথম মাসআলার জবাব থেকেই এর জবাব জেনে নিতে হবে। আর তা হলো হকু স্পষ্ট হলে তার দিকে প্রত্যাবর্তন করা মানুষের উপর ওয়াজিব। যদিও পূর্বে ঐ হক্বের বিপরীত ফাতওয়া দেয়া হয়েছে অথবা ফায়ছালা গ্রহণ করা হয়েছে।
তৃতীয় মাসআলা: যদি মাসআলা সম্পর্কে নছ (দলীল) থাকে। তাহলে তা গ্রহণের ব্যাপারে সবাই সমান, এতে ব্যক্তিভেদে কোন পার্থক্য সৃষ্টি করা যাবে না। অপর দিকে, ইজতেহাদ বিষয়ক মাসআলা ইজতেহাদের উপরই গঠিত। যদিও ইজতেহাদ হয় কোন বিষয়ের হুকুম অথবা অনুরূপ ক্ষেত্র নিয়ে। এজন্য আমীরুল মুমিনিন উমার (যখন দেখলেন, মানুষের মাঝে মদপান বেড়ে গেছে তখন মদপানের শাস্তিও তিনি বৃদ্ধি করলেন। আর যখন দেখলেন তিন তালাকের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে না তখন তিনি জনগণের উপর আইন কার্যকর করলেন। যাতে আল্লাহর কালাম ও রসূলের সুন্নাহ শক্তিশালী হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَعَلَى الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا كُلَّ ذِي ظُفُرِ وَمِنَ الْبَقَرِ وَالْغَنَمِ حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ شُحُومَهُمَا إِلَّا مَا حَمَلَتْ ظُهُورُهُمَا أَوِ الْحَوَايَا أَوْ مَا اخْتَلَطَ بِعَظْمٍ ذَلِكَ جَزَيْنَاهُمْ بِبَغْيِهِمْ وَإِنَّا لَصَادِقُونَ}
ইয়াহূদীদের উপর আমি নখবিশিষ্ট সব জন্তু হারাম করেছিলাম এবং গরু ও ছাগলের চর্বিও তাদের উপরে হারাম করেছিলাম- তবে যা এগুলোর পিঠে ও ভুঁড়িতে থাকে, কিংবা যা কোন হাড়ের সাথে লেগে থাকে, তা ব্যতীত। এটি
তাদেরকে প্রতিফল দিয়েছিলাম তাদের অবাধ্যতার কারণে। আর নিশ্চয় আমি সত্যবাদী (সূরা আল-আনআ'ম ৬:১৪৬)।
সুতরাং বুঝা গেল, আল্লাহ তা'আলা তাদের অবস্থার চাহিদা অনুসারে তাদের সাথে আচরণ করেছেন এবং তাদের সীমালঙ্ঘন ও যুলুমের কারণে তিনি পবিত্র জিনিস হারাম করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَبِظُلْمٍ مِنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتِ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ كثيرا}
ইয়াহুদীদের যুলমের কারণে আমি তাদের উপর উত্তম খাবারগুলো হারাম করেছিলাম, যা তাদের জন্য হালাল করা হয়েছিল এবং আল্লাহর রাস্তা থেকে অনেককে তাদের বাধা প্রদানের কারণে (সূরা আন-নিসা ৪:১৬০)।
মদপানকারীর উপর তিনবার শান্তি পূনরাবৃত্তি হওয়ার পর চতুর্থবার হত্যা করার কথা হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, মদপানকারীকে হত্যা করার শান্তি বাস্তবে ধার্য না হওয়ায় তাদের মূলৎপাটন করা হয়নি। তাই যিনি ফাতওয়া চাইবেন অথবা যার উপর ফায়সালা আরোপ করা হবে তার চাহিদা অনুসারে তার সাথে নির্দিষ্ট আচরণ বজায় রাখতে হবে যাতে তা দলীল বিরোধী না হয়।
অনুরূপভাবে কোন বিষয় আপতিত হলে দু'জনের একজনের কথায় ফাতওয়া দেয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিলে এবং দ্বিতীয় কথার মাধ্যমে ফাতওয়া প্রদান করলে অসুবিধা নেই। এ বিষয়টি হাজ্জ অথবা উমরায় উযূ ছাড়া তাওয়াফ করার মতই। মক্কা থেকে দূরে অথবা অন্য কোন কারণে তাওয়াফ কষ্টকর হয়। এক্ষেত্রে সঠিক মতামতের উপর ভিত্তি করে উযূর শর্ত ছাড়াই তাওয়াফ বিশুদ্ধ হওয়ার ফাতওয়া দিতে হবে। আমাদের শাইখ আব্দুর রহমান সা'দী (রহঃ) মাঝে মধ্যে এমনটা করতেন। তিনি আমাকে বলেন, هناك فرق بين من فعل ومن سيفعل .وبين ما وقع وما لم يقع যারা এ নিয়ম পালন করেন এবং শীঘ্রই করবেন আর যা কিছু ঘটেছে এবং ঘটেনি তার মাঝে পার্থক্য নিহিত আছে।
ইমাম নববী (রহঃ) এর মাজমুআ'র মুকাদ্দামায় ছাইমিরি (রহঃ) বলেন, যখন মুফতি দেখবে যে, ফাতওয়া দানের ক্ষেত্রে কঠোরতা আরোপে কল্যাণ নিহিত আছে এবং যার ব্যাপারে ফাতওয়া দেয়া হবে সে বাহ্যিকভাবে বিশ্বাসী নয় এবং তার বিষয়টি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ এ ক্ষেত্রে মুফতির কঠোরতা আরোপ করা বৈধ।
যেমন ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তাকে হত্যাকারীর তাওবাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তার কোন তাওবাহ নেই। অন্যজন তাকে আবার জিজ্ঞেস করে তাওবাহ আছে কি না তিনি বলেন, তার তাওবাহ আছে। অতঃপর তিনি বলেন, আমি প্রথম জনের চোখে হত্যাকান্ড পূনরাবৃত্তির ছাপ দেখতে পাচ্ছিলাম। তার জন্য তাওবাহ নেই একথা বলে তার মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করছিলাম। আর দ্বিতীয় জন তাওবার আশাবাদী হয়ে এসেছিলো তাই আমি তাকে নিরাশ করিনি।
আর আমি যা কিছু উল্লেখ করলাম তা সব ক্ষেত্রে নিয়মিত হয় না। রেখে যাওয়া সম্পত্তি বেশি হওয়ায় কোন কাযী অথবা মুফতি যদি উক্ত আছাবাদেরকে অভাবী মনে করে কোন কথার মাধ্যমে দাদার সাথে ভাইয়ের মিরাছ নির্ধারণ করতে চাইতেন অথবা সম্পদ কম থাকায় তারা ধনী হওয়ায় তাদের মিরাছ নির্ধারণ না করার ইচ্ছা করতেন (বাহ্যিকতা ও অনুমানের কারণে) তাহলে উভয় সিন্ধান্ত বৈধ হতো না। কারণ এখানে অন্যের অধিকার ক্ষুন্ন হওয়ার সম্ভবনা আছে। এতে শারঈ অনুমতি নেই। কথা, কর্ম ও বিশ্বাসে আমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট হিদায়াত কামনা করি যাতে সঠিক পথ খুঁজে পাই।
১. সম্মানিত শাইখ (মা) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: যে সব শিক্ষার্থী সালাফে জ্বলিহীনের রীতি-পদ্ধতি ব্যতিরেকে কোন আলিম অথবা ইমামের আক্বীদা বিষয়ক পাঠ গ্রহণ করা প্রয়োজন মনে করে এ ক্ষেত্রে কি তাদের ওজর গ্রহণযোগ্য হবে কি?
এ প্রশ্নের জবাবে শাইখ বলেছেন, হক্ব পাওয়ার পরে এ অবস্থায় শিক্ষার্থীর জন্য কোন ওযর-আপত্তি গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা, হক্ব যেখানেই থাক তার অনুসরণ করা এবং হক্ব স্পষ্ট করার জন্য এ সম্পর্কে আলোচনা করা শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক। আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা যে, হকু সুস্পষ্ট। যার নিয়্যাত বিশুদ্ধ তার নিকট হক্ব স্পষ্ট এবং তার পন্থা উত্তম। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُدَّكِرٍ} [القمر: ١٧]
আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্য। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি? সূরা আল কুমার ৫৪:১৮
কতিপয় মানুষের এমন অনুসরণীয় সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ রয়েছে যারা তাদের (ভ্রান্ত) মতাদর্শ থেকে পিছ পা হয় না। যদিও তাদের স্মৃতিপটে এটা রেখাপাত করে যে, তাদের মতাদর্শ দুর্বল কিংবা বাতিল-পরিত্যাজ্য। আর হকু স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও পক্ষপাতিত্ব ও কু-প্রবৃত্তির অনুসরণই তাদের (ভ্রান্ত মতাদর্শের লোকদের) আনুগত্য করতে লোকেরা প্ররোচিত হয়।
২. সম্মানিত শাইখ (মা) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, পদস্খলনের শঙ্কায় আক্বীদা বিষয়ক বিশেষত ভাগ্য বিষয়ে পাঠ গ্রহণ করতে যারা আগ্রহী নয়, তাদের ব্যাপারে আপনার মত কি?।
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, এটিও অন্যান্য মাসআলার মত একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা যা দীন ও দুনিয়া সম্পর্কিত বিষয় তা জানা মানুষের জন্য আবশ্যক। এ বিষয়ে অজ্ঞতা সম্পর্কে মানুষের পর্যালোচনা করা উচিত এবং এ ব্যাপারে বিশ্লেষণ ও উপলব্ধির জন্য আল্লাহ তা'আলার সাহায্যে কামনা করা প্রয়োজন যাতে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। কেননা এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোন প্রকার সন্দেহ থাকা উচিত নয়। আর যেসব মাসআলায় দীন প্রশ্নবিদ্ধ হয় না এবং দীন বিমুখ হওয়ার শঙ্কা না থাকে তাহলে যতক্ষণ না তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা পাওয়া যায় (সাধারণ) মাসআলার আলোচনা স্থগিত করাতে কোন সমস্যা নেই। আর গুরুত্বপূর্ণ মাসআলার মধ্যে ভাগ্য সংক্রান্ত বিষয় অন্যতম। এ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করা বান্দার উপর আবশ্যক। যেন এ বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস অর্জন হয়। আর প্রকৃতপক্ষে এ বিষয়ে কোন প্রশ্ন নেই। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি কতিপয় মানুষের উপর আক্বীদা বিষয়ক অধ্যয়নকে গুরুত্ববহ করছেন। অথচ তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করত আক্বীদার বিষয়ের উপর অন্য কিছুকে প্রধান্য দেয়। কিন্তু কেন?
"لم" (কেন?) ও "كيف" (কিভাবে?) এ দু'টি প্রশ্নবোধক পদ ব্যবহার করে মানুষের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অর্থাৎ এরূপ আমল কেন করেছিলে? এটা ইখলাছ সম্পর্কিত প্রশ্ন। কিভাবে তা করেছিলে? এটা রসূল এর আনুগত্য বিষয়ক প্রশ্ন। আজকাল অধিকাংশ মানুষই "كيف"
(কিভাবে?) পদটির জবাব বিশ্লেষণে ব্যস্ত। অথচ "لم" (কেন?) পদটির জবাব বিশ্লেষণে তারা অনাগ্রহী। এ জন্য দেখা যায়, তাদের অধিকাংশই আমলের ইখলাছ (একনিষ্ঠতাকে) প্রধান্য দেয় না। তাই গুরুত্বহীন (অনর্থক) বিষয়ের আনুগত্যে তারা উৎসাহিত হয়। আজকাল অধিকাংশ মানুষই এর উপর গুরুত্বারোপ করে চলছে। আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আক্বীদা, ইখলাছ ও তাওহীদ বিষয়ক আমল-আলোচনা হতে তারা বিস্মৃত-অমনোযোগী।
তাই দেখা যায়, কতিপয় মানুষ দীনের অত্যন্ত সহজ কিছু বিষয় সম্পর্কে তারা প্রশ্ন করে। মূলত তাদের অন্তর দুনিয়ামুখী, আল্লাহর আনুগত্য হতে বিস্মৃত, ফলে পার্থিব ক্রয়-বিক্রয়, ভ্রমণ, বাসস্থান ও অন্ন-বস্ত্র নিয়ে তারা নিমগ্ন। তাই আজকাল কিছু মানুষ দুনিয়াপূজারী অথচ তারা এ ব্যাপারে বেখবর-বোধহীন। কখনো তারা আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে অথচ তারা বুঝে না। কেননা, তারা তীব্র ক্ষোভ বশতঃ তাওহীদ ও আক্বীদার বিষয়কে গুরুত্ব দেয় না। এ
অবস্থা শুধু সর্বসাধারণের মাঝেই বিদ্যমান নয়। বরং কতিপয় শিক্ষার্থীর মাঝেও তা চালু রয়েছে। এটাই হচ্ছে ভয়াবহ বিষয়। যেমন আমল ছাড়াই শুধু সম্পর্ক সুদৃঢ় করণের বিষয়টি ঝুকিপূর্ণ। বন্ধন দৃঢ় করণের বিষয়টি শরী'আত প্রণেতা নির্ধারণ করেছেন (আমলসহ)। যারা সম্পর্ক-সংহতি রক্ষা করে তাদের মাঝেও ভুল-ত্রুটি আছে।
কেননা, প্রচারের সময় শুনি ও কিতাবাদী পাঠ করে আমরা বুঝি যে, উদার বন্ধন হচ্ছে দীনি সংহতি রক্ষা এবং অনুরূপ কিছু করা। আক্বীদার ব্যাপারে প্রকৃতপক্ষে এ আশঙ্কা থেকে যায় যে, আক্বীদা সঠিক আছে এ দলীল পেশ করে কেউ কেউ কতিপয় হারামকে হালালকরণের পথে পা বাড়ায়। কিন্তু হালাল ও হারামের ব্যাপারে পর্যালোচনার দৃষ্টিভঙ্গি থাকা আবশ্যক; যাতে কেন? এবং কিভাবে? প্রশ্নের সঠিক জবাব পাওয়া যায়। সারকথা হচ্ছে তাওহীদ ও আক্বীদা বিষয়ক পাঠ গ্রহণ করা ব্যক্তির উপর আবশ্যক। যাতে প্রকৃত উপাস্য ও মা'বুদ সম্পর্কে দূরদৃষ্টি বজায় থাকে এবং আল্লাহর নাম, গুণাবলী, তার কর্ম সমূহ, তার ঐচ্ছিক বিধান, শারঈ বিষয়, তার হিকমত (প্রজ্ঞা), তার শরী'আত ও সৃষ্টির গোপন রহস্য সম্পর্কে প্রমাণ ভিত্তিক জ্ঞান লাভ হয়। ফলে ব্যক্তি যেমন নিজে পথভ্রষ্ট হবে না অথবা অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবে না। আর তাওহীদের জ্ঞান হচ্ছে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ। একারণে আলিমগণ এ জ্ঞানকে (الفقه الأكبر) আল-ফিকহুল আকবার নামকরণ করেছেন। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
من يرد الله به خيرا يفقهه في الدين".
আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে দীনের জ্ঞান দান করেন। ১৫১৪
জ্ঞানের মধ্যে তাওহীদ ও আক্বীদা বিষয়ক জ্ঞানই উত্তম। কিন্তু কিভাবে জ্ঞান অর্জন করবে এবং কোথা থেকে তা গ্রহণ করবে এ ব্যাপারেও শিক্ষার্থীর মনোযোগ দেয়া আবশ্যক। তাই শিক্ষার্থী যেন প্রথমেই সন্দেহ মুক্ত সঠিক বিষয়ে জ্ঞানার্জন করে। অতঃপর দ্বিতীয়ত (সঠিকতা নির্ণয়ে) সে যেন উদ্ভুত বিদ'আত ও সন্দেহ যুক্ত বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করে। যাতে সঠিক আক্বীদা গ্রহণের দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিষয়ের আলোচনায় সচ্ছতা পাওয়া যায়। আর জ্ঞানার্জনের উৎস যেন হয় কুরআন এবং সুন্নাহ অতঃপর ছাহাবীগণের কথা-কর্ম, অতঃপর তাবেঈ ইমাম ও তাদের অনুসারীদের কথা এবং সবশেষে ইলম ও আমানতের
দিক থেকে নির্ভরযোগ্য-বিশ্বস্ত বিদ্বানগণের কথা। আর বিশেষ করে আল্লাহর পূর্ণ রহমত বর্ষিত হোক ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ ও তার ছাত্র ইবনুল কাইয়্যিম জাওজী (রহঃ) এর উপর এবং সকল মুসলিম ও তাদের ইমামগণের উপর।
৩. কতিপয় শারঈ জ্ঞানের শিক্ষার্থী জ্ঞান ও সনদপত্র উভয়টি অর্জনের মাঝে জটিলতা সৃষ্টি করছে। এ অবস্থা থেকে শিক্ষার্থী কিভাবে মুক্ত হতে পারে? জবাবে সম্মানিত শাইখ বলেন, এ ব্যাপারে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়,
প্রথম: কেবল সনদপত্র অর্জন করাই যেন শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যে না হয়। বরং সৃষ্টির উপকারে কাজের মাধ্যম হিসেবে শিক্ষার্থী এ সনদপত্র গ্রহণ করতে পারে। কেননা, বর্তমান যুগে কাজ-কর্ম সনদপত্রের উপর নির্ভরশীল। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ এ সনদপত্র ছাড়া সৃষ্টির উপকার সাধন করতে সক্ষম নয়। এ জন্য এক্ষেত্রে নিয়্যাত যেন বিশুদ্ধ থাকে।
দ্বিতীয়: যেসব শিক্ষার্থী ইলম অর্জন করতে চায় কিন্তু প্রতিষ্ঠান ছাড়া যদি ইলম অর্জনের কোন উৎস-ক্ষেত্র না পাওয়া যায় তাহলে সেক্ষেত্রে ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে তারা প্রতিষ্ঠানেই ভর্তি হবে। তারপর সনদপত্র অর্জন হওয়ায় এটা তার উপর খারাপ প্রভাব ফেলবে না।
তৃতীয়: মানুষ যদি পার্থিব কাজ-কর্ম ও আখেরাতের আমলের সৌন্দর্যতা বজায় রাখতে চায় তাহলে সাধারণত এক্ষেত্রে তার কোন মাধ্যমের দরকার হয় না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا} [الطلاق: ٢ ، ٣] .
যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্যে উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তার জন্যে যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেনই। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন (সূরা আত-ত্বলাক্ব ৬৫:২,৩)।
এটাই হচ্ছে পার্থিব কাজে তাক্বওয়ার উৎস। যদি বলা হয়, যে তার আমলের মাধ্যমে দুনিয়া পেতে চায় কি হিসেবে তাকে মুখলিছ (একনিষ্ঠ) বলা হবে?
জবাব হচ্ছে সে তার ইবাদতে একনিষ্ঠতা বজায় রাখবে। আর সে কেবল দুনিয়া পাওয়ার ইচ্ছা করবে না। তাই লোক দেখানো ও প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে যেন ইবাদত করা না হয়। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যমে ইবাদতের প্রতিদান পাওয়াই যেন মূল উদ্দেশ্যে হয়। যে আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয় তা দ্বারা লৌকিকতা প্রদর্শনকারী ব্যক্তি মানুষের সান্নিধ্য ও তাদের প্রশংসা লাভ করতে চাইলে তা ইবাদত বলে গণ্য হবে না। মূলত এরূপ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটলে ইবাদতে ইখলাছ (একনিষ্ঠতা) বিনষ্ট হয়। ফলে তা শিরকের শ্রেণীভুক্ত হয়ে যায় এবং যে কেবল আখেরাতের ইচ্ছা করে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না।
ইবাদত সম্পর্কীয় কথা বলার উদ্দেশ্যে হলো কতিপয় মানুষকে সতর্ক করা যারা ইবাদতের উপকারীতা নিয়ে কথা বলে অথচ তা পার্থিব স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে তারা ব্যবহার করে। যেমন: তারা বলে, জ্বলাতে রয়েছে শরীর চর্চা ও একতার শিক্ষা। আর ছিয়ামে রয়েছে অতিরিক্ত পানাহার বর্জন এবং পর্যাক্রমে ফরয-ওয়াজীব পালনের উপকারীতা। তারা পার্থিব উপকারীতাকেই আসল বলে গণ্য করে। অথচ শুধু পার্থিব উপকারীতা ইবাদতে ইখলাছ (একনিষ্ঠতা) বিনষ্ট এবং আখেরাতের প্রতি অমনোযোগিতা সৃষ্টি করে। তাই আল্লাহ তা'আলা তার কিতাবে ছিয়াম পালনের তাৎপর্য বর্ণনা করেন। অর্থাৎ ছিয়াম হচ্ছে তাক্বওয়া অর্জনের মাধ্যম। তাই দীনি উপকারীতা লাভ করাই মুখ্য উদ্দেশ্যে। পার্থিব উপকারীতা মুখ্য নয়। আমরা যখন জনসাধারণের সাথে কথা বলবো, তখন তাদের সামনে দীনি বিষয় তুলে ধরবো এবং যারা কেবল বস্তুবাদী বিষয় ছাড়া অন্য কিছুতে পরিতুষ্ট হয় না তাদের সামনে দীন ও দুনিয়া উভয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো এবং সবক্ষেত্রেই আমরা দীনি আলোচনাকে অগ্রাধীকার দিবো।
৪. সম্মানিত শাইখ (রহ.) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, অনেক শিক্ষার্থী (আহলুল মা'আছি) পাপাচারীদের সাথে কিরূপ আচরণ করা হবে এ নিয়ে মতভেদ করে এ সম্পর্কে আপনার সঠিক মত কি?
জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা বলবো, কতিপয় শিক্ষার্থী যখন দেখে যে, চরিত্র, চিন্তা-ভাবনা ও আমলগতভাবে কারো পদস্খলন হয়েছে, সেক্ষেত্রে তাকে তারা অপছন্দ করে আর এটাই ঐ ব্যক্তির প্রতি বিরূপভাব ও তার মাঝে দুরত্ব সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থীরা তাদেরকে সংশোধনের চেষ্টা করেন না। তবে মাশা'আল্লাহ যেসব শিক্ষার্থীর অন্তর আল্লাহ তা'আলা আলোকিত করেছেন, তারা
চেষ্টা করে, কতিপয় শিক্ষার্থী মনে করে চরিত্রহীন ব্যক্তিকে ত্যাগ করা, তার মাঝে দুরত্ব বজায় রাখা, তাকে দূরভিত করা মহৎ কাজ। কিন্তু নিঃসন্দেহে এটা ভুল। তাই তাদেরকে উপদেশ দেয়া, তাদের প্রতি খেয়াল রাখা শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক। যেসব মানুষ অবহেলায় দিন কাটায়, তাদেরকে উপদেশ দেয়া হলে কেউ কেউ উপদেশ গ্রহণ করে। যারা দাঈ তথা দাওয়াতপন্থী জামা'আত ও মুবাল্লিগ বলে পরিচিত তাদের দাওয়াত অধিক ফলপ্রসূ। মানুষ তাদের দাওয়াতে অধিক প্রভাবিত হয়। অনেক ফাসিক সঠিক পথের সন্ধান পেয়ে আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্য করছে, অনেক কাফির তাদের হাতে ইসলাম গ্রহণ করে হেদায়াত লাভ করেছে। কেননা দাঈগণ উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে মানুষকে বিমোহিত করে। এ জন্য আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যে, আল্লাহ তা'আলা আমাদের যেসব ভাইকে জ্ঞান দান করেছেন তিনি যেন তাদেরকে ঐসকল দাঈর মত উত্তম চরিত্রের অধিকারী করেন।
যেন তারা বেশি বেশি মানুষের উপকার করতে পারে। যদি হক্বপন্থী দাঈ ও মুবাল্লিগগণের দাওয়াত দানের পদ্ধতি কেউ গ্রহণ করে তাহলে দাঈ ও মুবাল্লিগগণের সংস্পর্শে থাকার কারণে প্রভাবিত হয়ে তারাও সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হয়। ফলে দাঈগণের মর্যাদা কেউ অস্বীকার করে না। শাইখ আব্দুল আজিজ ইবনে বায হাফিযাহুল্লাহর কিতাবে দেখেছি, দাঈগণের সমালোচনা করে এমন একজন ব্যক্তি সম্পর্কে উল্লেখ করে তিনি বলেন,
أقلوا عليهم لا أبا لأبيكم من اللوم ... أو سدوا المكان الذي سدوا
সন্দেহ নেই যে, দাঈর দাওয়াতে মানুষের সাড়া দানে উত্তম চরিত্র বৃহৎ প্রভাব বিস্তার করে। অপর দিকে দেখা যায়, কিছু দাঈ মানুষের মাঝে শরী'আত বিরোধী কিছু দেখলে তারা শরী'আতের বিধি-নিষেধ পালনের উপর তাদেরকে গালি দেয়, তিরক্ষিত করে। যেমন: দাড়ি ছেড়ে দেয়া নিয়ে তাদেরকে গালি-গালাজ করতে দেখা যায়। অবশ্য দাড়ি রাখা শরী'আতের আমল। অনুরূপভাবে কোন কাজে ছাওয়াবের কমতি ও (অহংকার বশত) খালি পায়ে হাঁটার বিষয়কে কেন্দ্র করেও তারা গালি-গালাজ করে। কিন্তু কেন? এটাতো মানুষের সাথে সদাচরণ নয়। এমনটি যারা করে তারাতো উত্তম চরিত্রের দিকে মানুষকে দাওয়াত দেয় না। তারা মূলত অসদাচরণ ও কঠোরতার দিকেই দাওয়াত দেয়। আর তারা চায়, সবাই একবারেই সংশোধন হোক। এটাই ভুল পন্থা। একবারে কোন মানুষের সংশোধন হওয়া কখনোই সম্ভব নয়। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম কি মক্কায় তের বছর অবস্থান করে দাওয়াত দেননি? পরিশেষে ষড়যন্ত্র করে তাকে মক্কা থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ} [الأنفال: ٣٠] .
যখন কাফিররা তোমাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছিল, তোমাকে বন্দী করতে অথবা তোমাকে হত্যা করতে কিংবা তোমাকে বের করে দিতে (সূরা আনফাল ৮:৩০)।
يثبتوك অর্থাৎ তোমাকে আটক করতে অথবা হত্যা করতে কিংবা বের করে দিতে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ} [الأنفال: ٣٠]
তারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহও ষড়যন্ত্র করেন। আর আল্লাহ হচ্ছেন ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে উত্তম (সূরা আল আনফাল ৮:৩০)।
সুতরাং বুঝা গেল, শুধু একবার অথবা দু'বার দাওয়াত দিয়ে মানুষের চরিত্র সংশোধন করা সম্ভব নয়। বিশেষত এভাবে দাওয়াত দানের কোন মূল্যায়ন হবে না। তবে ধৈর্য, হৃদ্যতা, প্রজ্ঞা ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে দাওয়াত ফলপ্রসূ হয়। শীঘ্রই এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত আলোচনা করা।
সন্দেহ নেই যে, উত্তম কথায় পূর্ণপ্রভাব বিদ্যমান। কথিত আছে যে, আহলে হিসবাহর জনৈক ব্যক্তি এক কৃষকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল যার উট ছিল উৎফুল্ল। এটা ছিল মাগরিবের আযানের সময়। কৃষক তখন গান করছিল। যখন উটটি গান শুনতে পেল তখন সেটা পাগলের মত চলতে আরম্ভ করলো। কেননা, সে আনন্দচিত্তে অন্য কিছু থেকে অমনোযোগী হয়ে গান করছিল, সে আযান শুনছিল না। অতঃপর হিসবাহর লোকটি তার ব্যাপারে খুব কঠোর ভাষা ব্যবহার করত (রাগ করে বললো), কে উটের মালিক; শীঘ্রই আমি অব্যাহতভাবে গান গাইতে থাকবো। আমার লাঠির জোর আছে কিনা আমি দেখে নিবো। এ বলে তার প্রতি সে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলো। অতঃপর (আযানের সময় গান করার) বিষয়কে কেন্দ্র করে সে বিচারকের কাছে গিয়ে বললো, আমি কৃষকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, এমতাবস্থায় আমি শুনছিলাম যে, মাগরিবের আযানের সময় সে তার উটকে গান শুনাচ্ছিল, এ ব্যাপারে আমি তাকে উপদেশ দেই (গান করতে নিষেধ করি) কিন্তু সে তা গ্রহণ করেনি। অতঃপর পরের দিন বিচারক নিজে ঐ
সময়ে উটের মালিকের জায়গায় গেলেন। অতঃপর আযান হলে কৃষক এসে তাকে (হিসবার লোককে) বললো, হে ভাই! আযান হয়েছে। এখন তোমার জ্বলাত আদায় করতে যাওয়া উচিত। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى} [طه: ۱۳২]
এবং তোমার পরিবার-পরিজনকে সালাত আদায়ে আদেশ দাও এবং নিজেও তার উপর অবিচল থাক। আমি তোমার কাছে কোন রিযক চাই না। আমিই তোমাকে রিযক দেই আর শুভ পরিণাম তো মুত্তাকীদের জন্য (সূরা ত্ব-হা ২০:১৩২)।
এরপর উটের মালিক جزاك الله خير বলে দু'আ করলো, অতঃপর সে উটের চাবুক রেখে উযূ করে তাদের সাথে জ্বলাতে অংশ গ্রহণ করলো। এখান থেকে কি বুঝা গেল? এখানে প্রথম কথা হচ্ছে, যদি তার থেকে দূরে থাকা হতো তাহলে অবশ্যই সে মন্দ পথ বেছে নিতো এবং কল্যাণকর কাজ ছেড়ে দিতো। দ্বিতীয়ত তার সাথে সদাচরণের কারণে সে পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করেছে। এ জন্য আমি বলবো, কতিপয় শিক্ষার্থীর আত্মসম্মান আছে কিন্তু তারা ভাল আচরণ করতে জানে না। মানুষের উচিত যে, সে তার জ্ঞান, দূরদর্শিতা এবং বড় মর্যাদাপূর্ণ প্রজ্ঞা ব্যবহার করে সদাচরণ করবে। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন সকলকে কল্যাণমূলক কাজের তাওফীক দান করেন। সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই।
৫. সম্মানিত শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, জ্ঞানের ধারকবাহক আলিমদেরকে গুরুত্ব দেয়া ব্যতীরেকে কতিপয় শিক্ষার্থী অন্য শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে তাদের কাছ থেকে পাঠ গ্রহণ করে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি?
জবাবে তিনি বলেন, আমি মনে করি, শিক্ষার্থীর উচিত, দক্ষ আলিমের কাছে জ্ঞানার্জন করা। কেননা, কতিপয় শিক্ষার্থী পাঠ দানে পারদর্শী এবং হাদীছ অথবা ফিক্বহ কিংবা আক্বীদার বিষয়ে তারা কোন মাসআলা পর্যালোচনা পূর্বক পূর্ণবিশ্লেষণ করতে পারে। তরুণ শ্রেণীর কেউ এ পর্যালোচনা শুনলে ঐ শিক্ষার্থীকে সে বড় আলিম মনে করে, যদিও ঐ শিক্ষার্থী এসব বিষয়ের সামান্যই বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও পরিমার্জন করতে সক্ষম। মূলত তার কাছে কোন জ্ঞান
নেই। একারণে প্রথম পর্যায়ের শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক হচ্ছে নির্ভরশীল আলিমদের জ্ঞান, আমানত ও দীন অনুযায়ী তাদের কাছে থেকে জ্ঞানার্জন করা।
৬. সম্মানিত শাইখ (রহিমাহুল্লাহ) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মন্তব্য করা হয় যে, শিক্ষার্থীর মাঝে সক্ষমতা কম এবং তাদের মাঝে দুর্বলতা রয়েছে। বিদ্যার্জনে অধিক সক্ষম হওয়ার প্রতি উৎসাহ প্রদানে কোন কোন মাধ্যম ও পন্থা রয়েছে?
জবাবে তিনি বলেন, শারঈ জ্ঞানের শিক্ষার্থীর মাঝে সাহসের দুর্বলতা একটি বড় সমস্যা। এ ব্যাপারে কয়েকটি বিষয় আবশ্যক।
প্রথম: বিদ্যার্জনে আল্লাহর প্রতি একনিষ্টতা বজায় রাখা। মানুষ যখন জ্ঞানার্জনে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা বজায় রাখবে এবং বুঝতে সক্ষম হবে যে, জ্ঞানার্জনে ছাওয়াব রয়েছে। অচিরেই সে তৃতীয় স্তরের মর্যাদায় উন্নিত হবে। কারণ তার সক্ষমতা তাকে উৎসাহী করে তুলবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصَّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيقًا} [النساء: ٦৯]
আর যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে তারা তাদের সাথে থাকবে, আল্লাহ যাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে। আর সাথী হিসেবে তারা হবে উত্তম (সূরা আন নিসা ৪:৬৯)।
দ্বিতীয়: এমন সহচর্য গ্রহণ করা আবশ্যক যারা তাদেরকে বিদ্যার্জনে উৎসাহ দিবে এবং আলোচনা ও পর্যালোচনায় তারা তাকে সহযোগিতা করবে। আর যতক্ষণ তারা বিদ্যার্জনে সহযোগিতা করবে সে তাদের সহচর্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে না।
তৃতীয়: নিজেকে ধৈর্যের জালে আবদ্ধ রাখতে হবে, যদিও অন্তর বিদ্যার্জন হতে বিমুখ হতে চায়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِي يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا} [الكهف: ٢٨]
তুমি নিজকে ধৈর্যশীল রাখ তাদের সাথে, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের রবকে ডাকে, তার সন্তুষ্টির উদ্দেশে এবং দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে (সূরা আল কাহাফ ১৮:২৮)।
মোট কথা, শিক্ষার্থী যেন ধৈর্য ধারণ করে, তারা ধৈর্য ধারণের দিকে ফিরে আসলে তখনই তাদের জ্ঞানার্জন সার্থক হবে। আর বিদ্যার্জন না করা হলে সময় হবে দীর্ঘ। কিন্তু নিজেকে সাহায্যে করলে এরূপ হবে না। আর নাফসে আম্মারা তথা কু-প্রবৃত্তি খারাপ-গর্হিত কাজের দিকে ঠেলে দিয়ে মানুষকে অলস করে তুলে এবং বিদ্যার্জন না করার প্রতি উৎসাহ দেয়।
৭. সম্মানি শাইখ (রহিমাহুল্লাহ) এর নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কোন মাসআলা নিজের মতাদর্শের অনুকূলে হওয়া কিংবা না হওয়ার দিক থেকে যারা তাদের ভাইয়ের সাথে বন্ধুত্ব বজায় রাখে অথবা শত্রুতা করে এবং অনুরূপভাবে শিক্ষার্থীর মাঝেও হিংসা-বিদ্বেষ রয়েছে তাদের ব্যাপারে আপনার মত কি?
জবাবে তিনি বলেন, এটা ঠিক যে, কতিপয় শিক্ষার্থী তাদের মাসআলা অনুকূলে হওয়া বা না হওয়ার দিক দিয়ে তারা বন্ধুত্ব ও শত্রুতা নির্ধারণ করে। দেখা যায়, তাদের কাছ কিছু মানুষ মাসআলা জেনে নেয়, কেননা, ঐ মাসআলা তাদের অনুকূলে হয়েছে ফলে তাদের সাথে বন্ধুত্ব হয়। আর কতিপয় মানুষ ঐ মাসআলার বিরোধিতা করে ফলে তাদের সাথে শত্রুতা সৃষ্টি হয়। আফ্রিকার অধিবাসী দু'দলের মাঝে মিনায় ঘটে যাওয়া একটি কাহিনী তোমাদের সামনে পেশ করবো; যারা একে অপরকে অভিশম্পাত করে এবং কাফির বলে আখ্যা দেয়। ঝগড়ারত অবস্থায় তাদেরকে আমাদের সামনে নিয়ে আসা হলো। আমরা বললাম, কি হয়েছে? প্রথম দল বললো, এ লোক জ্বলাতে দাঁড়িয়ে তার ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর হাত বেধেছে। এটাতো সুন্নাহ বিরোধী কুফরী কাজ। অপর দল বললো, এ লোক জ্বলাতে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা ব্যতীরেকেই তার দু'হাত উরুর উপর রেখেছে যা কুফরী বলে গণ্য। কেননা, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, من رغب عن سنتي فليس مني"
যে আমার সুন্নাহ থেকে বিমুখ হয় সে আমার উম্মত নয়। ১৫২।
এটা সুন্নাহ বিষয়ক মাসআলা, যা ওয়াজীব নয়, জ্বলাতের রুকন নয় এবং জ্বলাত বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য তা শর্তও নয়। তা জানা সত্ত্বেও এভাবে তারা একে অপরকে কাফির বলে আখ্যা দেয়। অনেক প্রচেষ্টা-পরিশ্রমের পর তারা আমাদের সামনে এক মত হয়েছে। আমাদের মত সম্পর্কে আল্লাহই ভাল জানেন। বর্তমানে দেখা যায়, কিছু ভাই ক্ষোপের সাথে তার অপর ভাইকে ঐসব নাস্তিকদের চেয়ে বেশি
মিথ্যাপ্রতিপন্ন করে যাদের কুফরী স্পষ্ট। তারা নাস্তিকদের চেয়ে তাদের সাথে বেশি শত্রুতা পোষণ করে, তাদের কথায় নিন্দা জ্ঞাপন করে যার কোন মূলই নেই, বাস্তবতা নেই। কিন্তু এর মাধ্যমে হিংসা ও বাড়াবাড়িই করা হয়। নিঃসন্দেহে হিংসা ইয়াহূদীদের চরিত্র। হিংসুক আল্লাহর নিকৃষ্ট বান্দার মধ্যে গণ্য। হিংসুক তার হিংসা থেকে উপকার লাভ করতে পারে না। এটা কেবল বিষন্নতা ও দুঃখ বৃদ্ধি করে। তাই অন্যের কল্যাণ কামনা কর; তোমার কল্যাণ হবে। জেনে রেখো, আল্লাহ যাকে চান তাকেই তিনি অনুগ্রহ করেন। তুমি যদি বিদ্বেষ পোষণ করো তবুও আল্লাহর অনুগ্রহ ঠেকাতে পারবে না। অন্যের উপর অনুগ্রহ না হোক এ মন্দ কামনাই কখনো তোমার উপর আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতিবন্ধক হয় এবং অন্যের প্রতি তোমার অপছন্দনীয়তা থাকার কারণে তার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষণ হয়।
এ কারণে হিংসুক বিদ্যার্জনে শিক্ষার্থীর নিয়্যাত ও একনিষ্ঠতায় সন্দেহের সৃষ্টি করে। হিংসুক মানুষের কাছে মর্যাদা পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীর সাথে হিংসা করে। শিক্ষার্থীর জ্ঞানের কথায় মানুষ তার কাছে আসে এজন্য হিংসুক তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, যাতে দুনিয়ায় তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। সত্যই যদি সে আখিরাত কামনা করতো, প্রকৃত পক্ষে ইলম অর্জন করতে চাইতো, তাহলে অবশ্যই সে ঐ জ্ঞানী লোকের কাছে জেনে নিতো যার কাছে মানুষ জ্ঞানের কথা জেনে নেয়। এরূপ করলে সেও তার মতো হতো। জ্ঞানের কথা জেনে শিক্ষার্থীর উপকৃত হওয়া উচিত। অপরদিকে যদি জ্ঞানী লোকের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা হয়, তার নিন্দাজ্ঞাপন ও দোষ-ত্রুটি তুলে ধরা হয় যা তার মাঝে নেই; তাহলে এটা নিঃসন্দেহে বাড়াবাড়ি, শত্রুতা ও নিকৃষ্ট স্বভাব বলে গণ্য হবে।
৮. সম্মানিত শাইখ (রহিমাহুল্লাহ) এর নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, বাগদাদের খতিব ইলম অর্জনের ব্যাপারে একটি বিষয় তুলে ধরেন, তা হচ্ছে কেবল আলিম অথবা শাইখদের কারো থেকে ইলম অর্জন করা আবশ্যক এ সম্পর্কে আপনার মত কি?
জবাবে তিনি বলেন, এটা ভাল যে, মানুষ বিশস্ত শাইখদের কাউকে কেন্দ্র করে ইলম অর্জন করবে। বিশেষত প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য। প্রাথমিক পর্যায়ের নীচের স্তরের শিক্ষার্থী বিভিন্ন মানুষের কাছে ইলম অর্জন করতে গিয়ে তারা হয় দোদুল্যমান। কারণ মানুষ বিশেষত বর্তমান যুগে কোন বিষয়ে একটি সিন্ধান্ত মেনে নিতে চায় না। কয়েক যুগ আগেও মানুষ তাদের দেশের আলিমদের নিকট থেকে সর্বদা সন্তুষ্ট চিত্তে চূড়ান্ত পর্যায়ের ফাতওয়া গ্রহণ
করতো। কারণ ঐ সকল আলিমের ফাতওয়া ও ব্যাখ্যা ছিল একই ধরনের। অবহিত করণ ও উত্তম পন্থা ব্যতীরেকে কেউ কারো বিরুদ্ধে মতভেদে লিপ্ত হতো না। কিন্তু এখন কেউ একটি অথবা দু'টি হাদীছ মুখস্থ করে বলে আমি অমুক ইমামের অনুসারী ই। ইমাম আহমদ (রহঃ) মানুষ ছিলেন, আমরাও মানুষ। এ অজুহাতে মাসআলায় ভিন্নতা সৃষ্টি হয়। প্রত্যেকেই কখনো কখনো নিজের মত ফাতওয়া দিতে শুরু করে, ফলে ফাতওয়া হয় গোলকধাধা। আমি এ ধরনের গোলযোগপূর্ণ ফাতওয়া লিপিবদ্ধ করতে গুরুত্বারোপ করেছি কিন্তু যার অনুসরণ করা হয় তার গোপনীয়তা প্রকাশের আশঙ্কা করছি। তাই সতর্কতামূলক এ বর্ণনা ছেড়ে দিয়েছি। আলিমদের কেউ এমন বিষয়ের বর্ণনা করেছেন যা সঠিক বিষয়ের সাথে সম্পর্কহীন।
আমি বলবো, শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় প্রথমত একজন আলিমের শরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যাতে শিক্ষার্থী দোদুল্যমান অবস্থার মুখোমুখী না হয়। এ জন্য মুগনি, শারহুল মুহায্যাব এবং যেসব কিতাবে অনেক মতামত উল্লেখ আছে আমাদের শাইখগণ ছাত্র অবস্থায় ঐ সব কিতাব পাঠ না করার পরামর্শ দেন। আমাদের কতিপয় শাইখ উল্লেখ করেন যে, শাইখ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান (রহঃ) শাইখদের মধ্যে বড় মাপের নজদী মুফতি। তারা উল্লেখ করেন যে, তিনিই আর রাওযুল মুরব্বি অধ্যয়নে ছিলেন নিবেদিত-মনোযোগী। তিনি তা পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি এর সারকথা পুনরায় উল্লেখ করেন। তাৎপর্য, বক্তব্য, ইশারা এবং ইবারতকে (মূল রচনা) তিনি গ্রহণ করেন। যা অনেক কল্যাণকর। মানুষ বিস্তারিত জানতে চাইলে তার উচিত হবে, আলিমদের কথা নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা। যাতে জ্ঞানগত ও সামঞ্জস্য বিধানের উপকারীতা লাভ হয়। এ ক্ষেত্রে জ্ঞানার্জনের প্রথম পর্যায়ে কোন একজন শাইখের শরণাপন্ন হওয়ার জন্য আমি শিক্ষার্থীকে পরামর্শ দিবো; যাতে ঐ শিক্ষার্থী (মাসআলা-মাসায়েলের ব্যাপারে) সীমা অতিক্রম না করে।
৯. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষার্থী যদি এমন হাদীছ বর্ণনা করার ইচ্ছা করে যা ইবনে হদীর কিতাবুল মুহরর অথবা বুলুগুল মারাম হতে অতিরিক্ত। এ ধরনের বর্ণনা পদ্ধতিতে কোন উপকার আছে কি?
শাইখ জবাবে বলেন, এ পদ্ধতি অনুসরণে কোন ফায়েদা নেই। এটা একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি মাত্র। মূলত ব্যাপক পরিসরে প্রচলিত প্রসিদ্ধ কিতাবাদী অধ্যয়ন করা উত্তম।
১০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইবনে হাদীর কিতাবুল মুহারার কি বুলুগুল মারামের চেয়ে উত্তম নয় কি?
শাইখ জবাবে বলেন, بلوغ المرام কিতাবটি প্রচলিত। এ কিতাবের সংকলক একজন ব্যাখ্যাকার। আর অন্য কিছুর চেয়ে প্রচলিত কোন বিষয়ে মানুষের মনোযোগ বেশি হওয়াই যেন অত্যাবশ্যক। কেননা, অনেকেই ছেড়ে দেয়া-বর্জিত কোন বিষয়ের মাধ্যমে উপকৃত হয় না। যেমন জ্ঞাতব্য যে, বুলুগুল মারাম কিতাবটি হতে মানুষ উপকৃত হয়। আমাদের আলিম ও শাইখগণ এ কিতাবটি পাঠ করেন।
১১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইবনে ওয়াজির উল্লেখ করেন যে, ছাহাবী আবু বকর, উমার ও উছমান (রাঃ) তারা সকলে কুরআন সংরক্ষণ করেননি। অনুরূপভাবে ইমামগণ হতে বর্ণিত আছে যে, উছমান ইবনু আবি শাইবা (রহঃ) কুরআন সংরক্ষণ করেননি। কতিপয় শিক্ষার্থী বলে, আল্লাহর কিতাব সম্পূর্ণ মুখস্থ না করলে চলবে ঐ বিষয়েই তারা পরামর্শ দেয়, এটা কি ঠিক?
জবাবে শাইখ বলেন, আমি মনে করি, আবু বকর, উমার, উছমান ও আলী (রাঃ) এ সকল মর্যাদাবান ছাহাবী আল্লাহর কিতাব সংরক্ষণ করেননি এ কথাটি অপ্রচলিত। জেনে রাখতে হবে যে, আবূ বকর, উছমান (রাঃ) এর যুগে কুরআন একত্রিত করা হয়েছে। তারা কুরআন একত্রিত করেছেন অথচ তারাই কুরআন সংরক্ষণ করেননি? এ কথাটি খুবই অপ্রচলিত। কিন্তু এ কথাটি যার মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে প্রথমত তার সনদ সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করতে হবে। যদি সনদ জ্বহীহ প্রমাণিত হয়, তাহলে আমরা বলবো, সমালোচনা করে এ কথা যারা বলে যে, ঐ সকল ছাহাবী কুরআন সংরক্ষণ করেননি তারা মূলত কিছুই জানে না। ছাহাবীগণ কুরআন সংরক্ষণ করেননি এ কথাটি অত্যন্ত অপ্রচলিত-দূর্বোধ্য। আর কুরআন (সম্পূর্ণ) মুখস্থ করা হতে কাউকে বিরত থাকা বলা উচিত নয়।
১২. আমি সম্মানিত শাইখের নিকট শারঈ বিভিন্ন ইলম অর্জনের সঠিক মানহাজ-পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা আশা করছি, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন, আপনাকে ক্ষমা করুন। জবাবে শাইখ বলেন, শারঈ জ্ঞান কয়েক প্রকার: তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে,
ক. علم التفسير : শিক্ষার্থীর উচিত আল্লাহর কিতাব সংরক্ষণে ছাহাবীদের অনুসরণ পূর্বক তাফসীরের জ্ঞান লাভ করা। এ ক্ষেত্রে তারা কমপক্ষে দশটি আয়াত না শিখা পর্যন্ত সীমা অতিক্রম করবে না। তাই আয়াত সম্পর্কে জ্ঞান ও আমল উভয়টি থাকা বাঞ্ছনীয়। যাতে কুরআনের শব্দাবলী সংরক্ষণে অর্থের সম্পর্ক (যথার্থতা) ঠিক থাকে। তাই মানুষ মনোযোগ সহকারে কুরআন তিলাওয়াত করলে তা হয় যথাযথ তিলাওয়াত।
খ. علم السنة: শুরুতেই জ্বহীহ হাদীছের জ্ঞানার্জন করবে। আর ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রঃ) যে হাদীছের ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন তা অধিক বিশুদ্ধ। তবে সুন্নাহর জ্ঞানার্জন দু'ভাবে হয়।
প্রথম পর্যায় মানুষ শারঈ বিধি-বিধান জানার ইচ্ছা করে হোক তা আক্বাঈদ ও তাওহীদের জ্ঞান। অথবা দ্বিতীয় পর্যায় আমলগত বিধি-বিধান জানার ইচ্ছা করে। এ বিষয়ে জ্ঞানার্জনের জন্য রচিত কিতাবাদী অধ্যয়ন করেই ঐ জ্ঞান সংরক্ষণ করা উচিত। যেমন, বুলুগুল মারাম , উমদাতুল আহকাম , শাইখ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব রচিত كتاب التوحيد এবং অনুরূপ অন্যান্য কিতাব। মূল কিতাবাদী পর্যালোচনা ও পাঠ করার মাধ্যমেই অবশিষ্ট থাকবে। এভাবেই তা সংরক্ষিত হবে এবং পঠন হতে থাকবে হবে। আর এতে চিন্তা-গবেষণাও হবে বেশি। কেননা, এখানে দু'টি বিষয়ে উপকারীতা লাভ হয়।
প্রথম: উছুলের দিকে প্রত্যাবর্তন।
দ্বিতীয়: রাবীদের নাম বারবার স্বরণ হওয়া। হাদীছ পঠনের মধ্যে দিয়ে রাবীগণের নাম বারবার স্বরণ হওয়ায় হাদীছ পাঠকারী বুখারীতে বর্ণিত হাদীছের সনদ এড়িয়ে যেতে পারবে না। তথা বুখারীতে বর্ণিত হাদীছের সনদ বুঝতে সে সক্ষম হবে। এভাবেই ঐ পাঠকারীর হাদীছ পঠনগত উপকারীতা লাভ হয়।
গ. علم العقائد এ বিষয়ের অনেক কিতাব রয়েছে। আমি মনে করি, বর্তমানে এ কিতাবাদী পঠনে অনেক সময় ব্যয় হয়। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম জাওজী (রঃ) ও আমাদের আলিমদের মধ্যে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব এবং (তার সমপর্যায়) পরবর্তী আলিমগণ এ সম্পর্কে যে সার-সংক্ষেপ কিতাব রচনা করেছেন তা পঠনের মাঝেই উপকার নিহিত আছে।
ঘ. علم الفقه সন্দেহ নেই যে, মানুষের উচিত কোন একটি মাযহাবকে কেন্দ্র করে তার উছুল ও কায়েদা সমূহ সংরক্ষণ করা। কিন্তু এ অর্থ নয় যে, এ মাযহাবের ইমাম যা বলেছেন তা মেনে নেয়া আমাদের জন্য আবশ্যক।
নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলেছেন তা মেনে নেয়াই আমাদের জন্য আবশ্যক। কিন্তু এর উপর ভিত্তি করেই ফিক্বহের উৎপত্তি হয়।
অন্য মাযহাবের জ্বহীহ দলীল পাওয়া গেলে তা গ্রহণ করতে হবে। এর উপর ভিত্তি করেই ইমামগণ যেমন ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইমাম নববী (র.) এবং অন্যান্য আলিম মাযহাবের অনুসরণ করতেন। এভাবেই ফিক্বহের মূল ভিত্তি গঠিত হয়। কেননা, আমি মনে করি, শারঈ বিধি-বিধান সম্পর্কে আলিমগণের রচিত কিতাব অধ্যয়ন ব্যতীরেকে যারা হাদীছ গ্রহণ করেন, তাদের মাঝে থাকে সিদ্ধান্তহীনতা যদিও তারা হাদীছের জ্ঞানে অধিকতর যোগ্য-শক্তিশালী। কিন্তু ফিক্বহ না বুঝার কারণে থেকে যায় সিন্ধান্তহীনতা। কেননা, ফক্বীহগণের কথা থেকে তারা রয়েছে বিচ্ছিন্ন-দূরতম অবস্থানে।
তাদের মাসআলায় দুর্বোধ্যতা লক্ষ্য করা যায়। ঐ মাসআলা ইজমা বিরোধী কিনা তা নিশ্চিত নয় অথবা এ ধারণা নিশ্চিত হতে পারে যে, তা ইজমা বিরোধী। একারণে মানুষের উচিত হবে ফক্বীহগণের রচিত কিতাবাদীর সাথে সম্পর্ক রেখে মাসআলা গ্রহণ করা। এর অর্থ এটা নয় যে, আবশ্যক মনে করে কোন মাযহাবের ইমামকে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মত নির্ধারণ করত তার কথা ও কর্মকে গ্রহণ করতে হবে। বরং এর মাধ্যমে দলীল গ্রহণ করতে হবে এবং এটা কায়েদা-পন্থা বলে গণ্য হবে। কোন মাযহাবে সঠিক কথা পাওয়া গেলে তা গ্রহণ করা আবশ্যক; এতে কোন আপত্তি নেই। ইমাম আহমাদ (রহঃ) এর মাযহাবের অধিকাংশ কথাই সঠিক। তার মাযহাবকে নির্দিষ্ট কোন বলে মনেই হবে না। মাযহাবের কোন বিষয়ে দু'টি বর্ণনা আছে এমন কিতাব তিনি অনুসরণ করতেন। দেখা যায়, দলীলের সাথে ইমাম আহমাদ (রহঃ) কথার সঙ্গতি থাকলেই তিনি তা মাযহাব মনে করতেন। তিনি কোন বিষয় বিস্তারিত অনুসন্ধান করতেন এবং হক্ব যেখানেই থাক তার দিকে তিনি অগ্রগামী হতেন। আমি মনে করি, মানুষ (শিক্ষার ক্ষেত্রে) কোন একটি মাযহাবকে কেন্দ্র করবে যা সে পছন্দ করে। আর আমাদের জানা মতে, সুন্নাহর অনুসরণের দিক থেকে ইমাম আহমাদ (রহঃ) এর মাযহাবই উত্তম। আর অন্যান্য মাযহাব সুন্নাতের অধিক নিকটবর্তী। এ বিষয়ে বলা হয়েছে। দেখা যায়, ইমাম আহমাদ (রহঃ) এর মাযহাব (কুরআন-সুন্নাহর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়ায়) তা উপযোগী। চিন্তা-গবেষণা ও
অধ্যয়ন করে ফক্বীহ হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর মানহাজ-পদ্ধতি প্রসঙ্গে তার মাযহাবে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও নিহিত আছে। অর্থাৎ শারঈ বিধান, তার প্রভাব-ফলাফল ও তাৎপর্য সম্পর্কে বুঝা যাবে। আর যা জানা আছে তার মাধ্যমে সাধ্য অনুযায়ী সমতা বিধান করা সম্ভব হবে। এ মর্মে আল্লাহ ত'আলা বলেন, {لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا} [البقرة: ٢٨٦] .
আল্লাহ তা'আলা কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না (সূরা আল-বাক্বারা ২:২৮৬)।
এখানে সক্ষমতা বজায় রেখে সামঞ্জস্য বিধানের উপর উৎসাহিত করা হয়েছে। আমি শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যে "التطبيق" )সমতা বিধান) বিষয়টি সর্বদাই পুনরাবৃত্তি করি হোক তা ইবাদত অথবা চরিত্র কিংবা আদান-প্রদান সম্পর্কিত। হে শিক্ষার্থী! তুমি সমন্বয় সাধন করতে শিখো যাতে বুঝা যায়, তোমার জানা বিষয়ে তুমি আমলকারী শিক্ষার্থী।
আমরা একটা উদাহরণ পেশ করবো, যখন তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে তখন তাকে সালাম দেয়া শরী'আত সম্মত হবে কি?
জবাব হচ্ছে, হ্যাঁ, শরী'আত সম্মত। কিন্তু আমি অনেককে দেখি যে, যখন কেউ তার ভাইয়ের পাশ দিয়ে যায়, মনে যেন সে একটা খুঁটির পাশ দিয়ে যাচ্ছে; সে তাকে সালাম দেয় না। অথচ এটা মারাত্মক ভুল। জনসাধারণের ব্যাপারে এধরনের সমালোচনা করা গেলে ছাত্রদের ক্ষেত্রে কেন করা যাবে না? السلام عليكم কথাটি বলতে ছাত্রদের অসুবিধা কি? অনেকেই ছাত্রদের কাছে আসে, তাদেরকে সালাম দিলে দশগুণ বেশি প্রতিদান পাওয়া যায়। দুনিয়ার সকল ভাল কাজের জন্য দশগুণ বেশি প্রতিদান পাওয়া যায়। যদি মানুষকে উৎসাহমূলক বলা হয়, যে কেউ তার ভাইয়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাকে সালাম দিলে সালাম প্রদানকারী ব্যক্তিকে কয়েক রিয়াল দেয়া হবে। তাহলে অবশ্যই দেখা যাবে, সালাম প্রদানকারীকে সালাম দেয়ার জন্য (রিয়াল পাওয়ার উদ্দেশ্যে) মানুষ বাজারে তাকে খুজছে। কিন্তু আমরা দশগুণ প্রতিদান পাওয়ার ক্ষেত্রে শৈথিল্যতা দেখাই-অবহেলা করি। আল্লাহই প্রকৃত সাহায্যেকারী।
অন্যান্য উপকারীতা: মানুষের মাঝে ভালোবাসা ও হৃদ্যতা সৃষ্টি হওয়া। ভালোবাসা ও হৃদ্যতা বজায় রাখা, তা সুদৃঢ় করা ও অব্যাহত রাখার ব্যাপারে অনেক দলীল রয়েছে। আর ভালোবাসা ও হৃদ্যতা বিরোধী বিষয় থেকে বিরত
থাকতে হবে। ভালোবাসা ও হৃদ্যতা বিরোধী অনেক বিষয় আছে। যেমন: ক্রয়- বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কারো দরদামে দরকষাকষি করা। কোন মুসলিমের বিবাহ প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব দেয়া। অনুরূপ অন্যান্য বিষয়। এ ধরনের প্রত্যেক শত্রুতা ও বিদ্বেষকে দমন করে ভালোবাসা ও হৃদ্যতা বজায় রাখতে হবে। এখানেই রয়েছে ঈমানের বাস্তবতা। এ প্রসঙ্গে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
" والله لا تدخلوا الجنة حتى تؤمنوا ولا تؤمنوا حتى تحابوا".
আল্লাহর শপথ! তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা ঈমান করো এবং পরস্পরকে ভালোবাসো। ১৫৩
জ্ঞাতব্য যে, আমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছতে ভালোবাসে, তার ঐ সম্মান ঈমান বাস্তবায়নের মধ্যে নিহিত। কেননা, আমাদের শারীরিক আমল খুবই কম এবং দুর্বল। জ্বলাত আদায় করলে তা অতিত হয়ে যায়, অনুরূপ ছিয়াম পালন ও দান-ছাদাক্বাও গত হয়। অথচ আমরা এসব ইবাদত থেকে অন্য কিছু অর্জন করি। এসব আমল সম্পর্কে আল্লাহই অধিক জানেন। আমাদের এসব আমলের দিক থেকে আমরা দুর্বল। আমাদের ঈমান শক্তিশালী করা দরকার। আর সালাম প্রদানের মাধ্যমে ঈমান শক্তিশালী হয়। কেননা, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"লা تدخلوا الجنة حتى تؤمنوا ولا تؤمنوا حتى تحابوا أفلا أخبركم بشيء إذ فعلتموه تحاببتم يعني حصل لكم الإيمان أفشوا السلام بينكم"
আল্লাহর শপথ! তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা ঈমান করো এবং পরস্পরকে ভালোবাসো। আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয় সম্পর্কে সংবাদ দিবো না যখন তোমরা তা করবে তোমাদের পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ তোমাদের ঈমান অর্জন হবে। তোমরা বেশি বেশি সালাম প্রদানে অভ্যস্ত হও। [৫৪]
আমরা যা জানলাম তা একটি মাত্র বিষয়। কিন্তু এ বিষয়ে আমরা অনেক কিছুই লঙ্ঘন করি। এ জন্য আমি বলি, আমরা যা জেনেছি তা সমন্বয় সাধনের জন্য আল্লাহ তা'আলার কাছে এ কামনা করছি তিনি যেন আমাকে এবং তোমাদের সকলকে এ ব্যাপারে সাহায্যে করেন। কেননা, আমরা জানি অনেক কিছু আমল করি কম। হে আমার শিক্ষার্থী ভাইগণ! ইলম অর্জন, তদানুযায়ী আমল এবং এর মাঝে সমন্বয় সাধন সবই তোমাদের উর আবশ্যক। ইলম হচ্ছে দলীল-প্রমাণ স্বরূপ। যখন ইলম অনুযায়ী আমল করবে তখন তা বৃদ্ধি পাবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَالَّذِينَ اهْتَدَوْا زَادَهُمْ هُدًى وَآتَاهُمْ تَقْوَاهُمْ} [محمد: ۱۷] .
যারা হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছে আল্লাহ তাদের হেদায়াত প্রাপ্তি আরো বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে তাদের তাক্বওয়া প্রদান করেন (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৭)।
বুঝা গেল, তোমরা ইলম অনুযায়ী আমল করলে তোমাদের আলো ও দলীল বৃদ্ধি পাবে। এ মর্মে আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَتَّقُوا اللهَ يَجْعَلْ لَكُمْ فُرْقَانًا ويُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ} [الأنفال: ٢٩] .
হে মুমিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তাহলে তিনি তোমাদের জন্য ফুরকান প্রদান করবেন, তোমাদের থেকে তোমাদের পাপসমূহ দূর করবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল (সূরা আল-আনফাল ৮:২৯)। তিনি আরো বলেন,
{يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَآمِنُوا بِرَسُولِهِ يُؤْتِكُمْ كَفْلَيْنِ مِنْ رَحْمَتِهِ وَيَجْعَلْ لَكُمْ نُورًا تَمْشُونَ بِهِ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ} [الحديد: ۲۸] .
হে মুমিনগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন, তিনি স্বীয় রহমতে তোমাদেরকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন, আর তোমাদেরকে নূর দেবেন যার সাহায্যে তোমরা চলতে পারবে এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু (সূরা আল-হাদীদ ৫৭:২৮)।
এ আয়াতের অনেক অর্থ রয়েছে। তোমাদের উচিত হবে যে, ইবাদত, চরিত্র ও আদান-প্রদান সব কিছুতেই সমতা বজায় রাখা। যাতে তোমরা প্রকৃত শিক্ষার্থী হিসাবে গণ্য হও। আল্লাহর কাছে সাহায্যে কামনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে সঠিক কথা-কর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রেখে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা দান করেন। তিনিই সর্বশ্রোতা ও সাড়াদানকারী। সকল প্রশংসা বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।
১৩. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কখন শিক্ষার্থীরা ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর মাযহাবের অনুসারী হবে? জবাবে তিনি বলেন, ইমাম আহমাদ (রহঃ) ও অন্যান্য ইমামগণের মাযহাব দু'শ্রেণীতে বিভক্ত।
(ক) ব্যক্তি কেন্দ্রীক মাযহাব (খ) পরিভাষাগত মাযহাব।
বর্ণনা সমূহের মধ্যে (নির্দিষ্ট করে) কোন একটি বর্ণনা গ্রহণ করলে তুমি হবে ব্যক্তি কেন্দ্রীক মাযহাবের অনুসারী। আর পরিভাষাগত মাযহাবের সাথে ব্যক্তি কেন্দ্রীক মাযহাবের বৈপরীত্য থাকায় তা গ্রহণ করলে ব্যক্তি কেন্দ্রীক মাযহাবের উপর তুমি অটল থাকতে পারবে না। ইমাম আহমাদ (রহঃ) তার ব্যক্তি কেন্দ্রীক মাযহাব থেকে প্রত্যাবর্তন করে কখনো পরিভাষাগত মাযহাবকে নির্ধারণ করতেন। ব্যক্তি কেন্দ্রীক মাযহাবের কথা বলতেন না। তবে মাযহাবের সঠিক বিষয় অনুসরণে প্রত্যেকের জন্য যে পদ্ধতি রয়েছে মানুষ ঐ পদ্ধতি অনুসরণ করে চলবে।
১৪. প্রশ্ন হচ্ছে, প্রাথমিক শিক্ষার্থীর জন্য আপনার দিক-নির্দেশনা কি? তারা নির্দিষ্ট কোন মাযহাবের অনুসরণ করবে নাকি মাযহাব থেকে বের হবে?
জবাবে তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, {ফَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} [الأنبياء: ٧]
তোমার পূর্বে আমি পুরুষই পাঠিয়েছিলাম, যাদের প্রতি আমি ওহী পাঠাতাম। সুতরাং তোমরা জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর যদি তোমরা না জান (সূরা আম্বিয়া ২১:৭)।
কথা হলো, প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা বুঝবে না যে, কিভাবে দলীল বের করতে হয়। তাই এ ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী মৃত কোন ইমামের অনুসরণ করা অথবা বর্তমানে জীবিত কোন আলিমের নিকট জেনে নেয়া ছাড়া তার কোন পন্থা নেই। এটাই তার জন্য।
উত্তম। কিন্তু তার নিকট যখন ছুহীহ হাদীছ বিরোধী কথার বর্ণনা স্পষ্ট হবে তখন হাদীছকেই গ্রহণ করা ওয়াজীব-আবশ্যক।
১৫. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আলিমদের নিকট থেকে অর্জিত যে সব শিক্ষার্থীর আক্বীদা ও ফিক্বহী বিধান সম্পর্কিত জ্ঞানের ভিত্তি রয়েছে তারা কি মাসজিদে দাওয়াত দানের ভূমিকা পালন করতে পারবে নাকি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন না হওয়া পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করবে?
জবাবে শাইখ বলেন, আমি মনে করি, অনুমতি ছাড়া যে সব বিষয়ে শিক্ষার্থীর কথা বলা-আলোচনা করা নিষেধ, তারা ঐ বিষয়ে বক্তব্য দিবে না। কেননা, কোন বিষয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ওয়ালিউল আমর-নির্দেশ দাতার আনুগত্য করা ওয়াজীব-আবশ্যক। আর জেনে রাখতে হবে যে, ছোট প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের যদি কথা বলা-আলোচনা করার সুযোগ দেয়া হয় তাহলে তারা এমন বিষয়ে বক্তব্য দিবে যা তারা নিজেরা জানে না। এতে মানুষের মাঝে বিশৃঙ্খলা এবং জটিলতার সৃষ্টি হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শারীরিক আমল সম্পর্কিত আক্বীদা বিষয়ক অতিরিক্ত কথা বলা হয়। তাই অনুমতি ছাড়া কোন বিষয়ে কথা বলা নিষেধ। তবে কেউ আলোচনার যোগ্য হলে তার জন্য কথা বলা সম্পূর্ণ নিষেধ নয়। এমনকি আমরা এক্ষেত্রে বলি যে, ঐ যোগ্য ব্যক্তির জন্য নির্দেশদাতার আনুগত্যর দরকার নেই। কেননা, অযোগ্য ব্যক্তির মাধ্যমে শরী'আত প্রচারণা নিষেধ। কিন্তু শরী'আতের প্রচারকারী যোগ্য কিনা তা বুঝার জন্যই এখানে منع নিষেধ শব্দটি শর্তযুক্ত করা হয়েছে। যেমন এখন তোমরা জানো যে, যারা স্বীকৃত প্রাপ্ত আলিম জেনে-বুঝে প্রত্যেকেই তাদের কাছে জানার জন্য এগিয়ে যায়। আর যে বিষয়ে নির্দেশদাতার অনুমতি ছাড়া কথা বলা নিষেধ ঐ বিষয়ে কথা বৈধ নয়। অর্থাৎ মাসজিদে অথবা জনসমাবেশে কথা বলা ঠিক নয়। তবে শিক্ষার্থীদের পরস্পরের মাঝে কোন ঘরে অথবা কামরায় আলোচনা হলে তাতে কোন সমস্যা নেই। আর কেউ তাতে বাধা সৃষ্টি করবে না।
১৬. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইলম অর্জনের পদ্ধতি সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। যে ইলম অর্জন করতে চায় সে কোন পদ্ধতি অবলম্বন করে শুরু করবে? কোন এক মূল রচনা মুখস্থ করবে? ঐ সব শিক্ষার্থীর ব্যাপারে আপনার দিক-নির্দেশনা কি?
জবাবে শাইখ বলেন, প্রথমে ঐ সব শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যে দিক-নির্দেশনা দানের পূর্বে কোন আলিমের নিকট থেকে আমি ইলম অর্জনের পরামর্শ দিবো। কেননা, আলিমের কাছ থেকে ইলম অর্জনে বৃহৎ দু'টি উপকার লাভ হয়।
প্রথম: ইলম অর্জনের দিক থেকে আলিমই অধিক নিকটবর্তী। কেননা, তার নিকট রয়েছে পর্যবেক্ষণের জ্ঞান এবং বুঝানোর যোগ্যতা। শিক্ষার্থীকে পূর্ণতার সাথে সহজে তিনি শিক্ষা দান করে থাকেন।
দ্বিতীয়: শিক্ষার্থীর ইলম অর্জনে আলিম সঠিকতার অধিক নিকটবর্তী। অর্থাৎ আলিম ছাড়াই যে ইলম অর্জন করে, সে মূলত গোলকধাঁধার মধ্যেই থাকে এবং সঠিক বিষয় হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। এটা এজন্য হয় যে, সে অভিজ্ঞ আলিমের নিকট শিক্ষা অর্জন করেনি। ঐ আলিম ইলম অর্জনের পদ্ধতি সম্পর্কে তাকে দিক-নির্দেশনা দিতে পারতেন যা সে পছন্দ করে।
আমি মনে করি, ইলম অর্জনে একজন শাইখের স্বরণাপন্ন হওয়ার ব্যাপারে মানুষের উৎসাহিত হওয়া উচিত। কেননা, কেউ তার শাইখের স্বরণাপন্ন হলে তার জন্য যা কিছু সামঞ্জস্যপূর্ণ ঐ ব্যাপারে তিনি (শাইখ) দিক-নির্দেশনা দান করবেন। আর এ জবাবে সার্বজনীনতার দিক থেকে আমরা বলবো:
প্রথমত: সব কিছুর পূর্বে আল্লাহর কিতাব মুখস্থ করা দরকার। কেননা, এটাই ছাহাবীগণের রীতি। তারা দশটি আয়াতও এড়িয়ে যেতে না যতক্ষণ না তা জানতেন। আর আয়াতের জ্ঞানার্জন করত তদানুযায়ী আমল করতেন। আর আল্লাহর কালামই হচ্ছে অধিকতর মর্যাদাবান।
দ্বিতীয়: সংক্ষিপ্ত হাদীছের মতন-মূল ইবারত গ্রহণ করবে যা প্রমাণ স্বরূপ সংরক্ষিত থাকবে। যেমন: উমদাতুল আহকাম (عمدة الأحكام), বুলুগুল মারাম (بلوغ المرام), ইমাম নববীর আরবাঈন (الأربعين النووية) এবং অনুরূপ হাদীছ গ্রন্থাবলী।
তৃতীয়: বিধান সম্পর্কিত ফিক্বহের মূল ইবারত মুখস্থ করবে। আর "زاد المستقنع في اختصار المقنع" কিতাবটি মতন-মূল রচনা গ্রহণের দিক থেকে উত্তম বলেই জানি। কেননা, মানছুর ইবনে ইউনূস আল-বহুতী কিতাবটির ব্যাখ্যা করেন। তারপর অনেকেই কিতাবটির এ ব্যাখ্যা ও মূল-ইবারতের অনেক টিকা-টিপ্পনী যোগ করেছেন।
চতুর্থ: ইলমুন নাহু। তোমরা কি জানো নাহু কি? খুব কম সংখ্যক ছাত্রই তা জানে। তুমি এমন ছাত্রকে দেখবে যে, সে কুল্লিয়া তথা উচ্চ স্তরের লেখাপড়া শেষ করেছে অথচ ইলমে নাহুর কিছুই সে জানে না। এ প্রসঙ্গে কবির ছন্দ উল্লেখ করে উদাহরণ পেশ করা হলো:
لا بارك الله في النحو ولا أهله ... إذا كان منسوبا إلى نفطويه أحرقه الله بنصف اسمه ... وجعل الباقي صراخا عليه
জবাব হচ্ছে, কবি এখানে নাহু শাস্ত্র শিক্ষার অক্ষমতা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু আমি বলবো, ইলমে নাহুর অধ্যায় কঠিন অর্থাৎ ইলমে নাহু শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে তা কঠিনই মনে হবে। কিন্তু শিক্ষার্থী ইলমে নাহুর অধ্যায় পড়তে থাকলে তার জন্য এর সব নিয়ম-কানুনই সহজ হয়ে যাবে। নাহু শাস্ত্রের প্রাথমিক শিক্ষার্থী যারা নাহু শিক্ষায় আগ্রহী, আমি তাদেরকে সম্বোধন করে বলবো যে, তারা যেন শব্দের শেষে ইরাব প্রদানের অনুশীলন করে। আর নাহু শাস্ত্রের মধ্যে النحو الأجرومية কিতাবটিই উত্তম। এটি একটি সংক্ষিপ্ত মূল কিতাব। আমি প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে এ কিতাবটি পড়ার পরামর্শ দিবো। এসব উছুলের উপর ভিত্তি করেই শিক্ষার্থীরা জ্ঞানার্জন করবে।
পঞ্চম: ইলমে তাওহীদ সম্পর্কিত কিতাব। এ বিষয়ে অনেক কিতাব আছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো: শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব (রহঃ) রচিত 'কিতাবুত তাওহীদ' (كتاب التوحيد)। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহঃ) রচিত 'আল আক্বীদা আল ওয়াসিত্বীয়া' (العقيدة الواسطية)। এ কিতাবটি বহুল পরিচিত। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্যই।
শিক্ষার্থীর প্রতি আমার ব্যাপক উপদেশ হলো আল্লাহভীতি অর্জন, তার আনুগত্য উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা, উত্তম চরিত্র গঠন, শিক্ষাদান ও দিক-নির্দেশনার মাধ্যমে সৃষ্টির প্রতি ইহসান, সকল প্রকার মাধ্যম অবলম্বনে ইলম প্রচারে উৎসাহ প্রদান হোক তা সাংবাদিকতা অথবা কোন ক্ষেত্র অথবা কিতাব রচনা অথবা কোন বার্তা-লিখনী অথবা প্রচার মাধ্যম প্রভৃতির মাঝে যেন শিক্ষার্থীর ইলমের ছাপ-নিদর্শন থেকে যায়। শিক্ষার্থীর প্রতি আমার আরো উপদেশ হচ্ছে, সে যেন কোন বিষয়ে ফায়ছালা প্রদানে ত্বরান্বিত না হয়। কেননা, কতিপয় প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে দেখা যায়, ফাতাওয়া প্রদান ও বিধি-বিধান সম্পর্কিত বিষয়ে (সিদ্ধান্ত গ্রহণে) তাড়াহুড়া করে। অথচ তারা ব্যতিরেকে অনেক বড় বড় আলিমও ভুল করে।
থাকে। এমনকি শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে কতিপয় লোক বলে, আমরা একজন প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীকে তর্কের খাতিরে একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছি যে, এটাতো ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের কথা। প্রতিউত্তরে সে বলে, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল কে? ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল একজন মানুষ আমরাও মানুষ। সুবহানাল্লাহ! এটা ঠিক আছে যে, তিনি মানুষ আর ঐ শিক্ষার্থীও মানুষ। উভয়ে পুরুষ হওয়ার দিক থেকে সমান। কিন্তু বিদ্যা-বুদ্ধির দিক থেকে উভয়ের মাঝে রয়েছে বিশাল ব্যাবধান। ইলমের সম্পর্ক ছাড়া কোন মানুষ বড় হিসাবে গণ্য হয় না। আমি বলবো, বিনয়-নম্রতার সাথে শিক্ষার্থীর শিষ্টাচারিতা অর্জন করা দরকার এবং নিজেকে নিয়ে আশ্চার্য না হওয়াই উচিত। আর নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে জানা থাকা প্রয়োজন।
প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীর জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আলিমদের কথা নিয়ে বেশি পর্যালোচনা না করা। কেননা, তাদের কথা নিয়ে বেশি পর্যালোচনা করলে এবং ইবনে কুদামার কিতাব ' المغني في الفقه ' ইমাম নববীর কিতাব والمجموع এবং মতভেদ উল্লেখ আছে এমন বড় বড় কিতাব অধ্যয়ন করলে প্রাথমিক শিক্ষার্থী বিতর্কে লিপ্ত হয়ে বিনষ্ট হবে। শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক পর্যায়ে সংক্ষিপ্ত ইবারত জানতে হবে। যাতে সে উদ্দেশ্যে পৌঁছতে পারে। গাছে উঠে তার ডাল পালায় ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা করা ভুল।
১৭. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, সংক্ষিপ্তভাবে ইলম অর্জনের পদ্ধতি কি? আল্লাহ তা'আলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
তার জবাবে ইলম অর্জনের সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি নিম্নে তুলে ধরা হলো:
১. আল্লাহর কিতাব মুখস্থ করণে তুমি আগ্রহী হবে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট চিন্তা করে ও বুঝে মুখস্থ করবে। এ কিরা'আতের উপকারীতা যখন তোমার জন্য কাজে আসবে তখন তুমি এর গভীরে প্রবেশ করবে।
২. রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জ্বহীহ সুন্নাহ হতে যা সহজ মনে হয় তা মুখস্থ করণে উৎসাহী হবে। আর একারণে বিধি-বিধানের মৌলিক বিষয়গুলো মুখস্থ করতে হবে।
৩. কোন বিষয়কে কেন্দ্রীভূত করে ঐ বিষয়ের উপর অটল থেকে তা অর্জন করবে। কিতাবের যেখানে সেখানে এলোমেলো পাঠ করবে না। এতে সময় অপচয় হবে এবং অন্তর হবে অস্থির।
৪. প্রথমে ছোট কিতাব পড়া আরম্ভ করবে এবং ভালভাবে চিন্তা করে বুঝে নিবে। তারপর এর চেয়ে উচ্চ স্তরের কিতাব পাঠ করবে। এভাবেই অল্প অল্প করে জ্ঞানার্জন হতে থাকবে এমনকি জ্ঞানার্জনে গভীরে প্রবেশ করবে। ফলে আত্মা প্রশান্তি লাভ করবে।
৫. মাসআলা সমূহের উছুল ও নিয়ম কানুন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হবে। তোমার সামনে পেশ করা হয় এমন প্রত্যেক বিষয় নিয়ে তুমি চিন্তা করবে। কেননা, বলা হয়ে থাকে, যে উছুল হতে বঞ্চিত হলো সে মূলত নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা থেকেই বঞ্চিত হলো।
৬. তোমার শাইখ অথবা ইলম ও দীনের দিক থেকে তুমি যাকে বিশস্ত ও নিকটতম মনে করো তার সাথে মাসআলা নিয়ে পর্যালোনা করবে।
১৮. শাইখ (জ) এর কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমানে ইংরেজী ভাষা শিক্ষার হukুম কি?
জবাবে তিনি বলেন, প্রয়োজন মনে হলে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দানের মাধ্যম হিসাবে এ ভাষা শিক্ষা করা আবশ্যক। আর প্রয়োজনীয়তা না থাকলে এ ভাষা শিক্ষা করে সময় নষ্ট করার দরকার নেই। আর এর চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকাই ভাল। আর লোকেরা তাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে ইংরেজী ভাষা শিক্ষা করে থাকে। নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়েদ ইবনে ছাবিত (3) কে ইয়াহূদীদের ভাষা শিক্ষার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সুতরাং প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে দাওয়াতের মাধ্যম হিসাবে ইংরেজী ভাষা শিক্ষা করতে হবে। নচেৎ তা শিক্ষা করে সময় নষ্ট করবে না।
১৯. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, এমন শিক্ষণীয় চলচ্চিত্র যেখানে নারীরা যুক্ত আছে এবং বিশেষতঃ ইংরেজী ভাষা শিক্ষার চলচ্চিত্র দেখার ব্যাপারে হুকুম কি?
জবাবে শাইখ বলেন, আমি মনে করি, শিক্ষণীয় চলচ্চিত্র দেখা বৈধ। এতে সমস্যা নেই। কেননা, কল্যাণ লাভের উদ্দেশেই তা দেখা হয়। এখানে যদি নারীরা যুক্ত থাকে এবং দর্শক পুরুষ হয় আর ঐ সব পুরুষ তাদেরকে দেখে তাহলে এটা হারাম। এরূপ না হলে তা বৈধ। তবে সর্বাবস্থায় আমি তা অপছন্দ করি। কেননা, এটা দেখার কারণে ফিতনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর এ চলচ্চিত্রের অনুষ্ঠানে নারীরা কথা বললে শিক্ষার্থীর সামনে একটা পর্দা দিতে হবে যাতে নারীর চেহারা প্রকাশ না পায়। এ অবস্থা তখনই গ্রহণযোগ্য হবে যখন
প্রশিক্ষণের জন্য পুরুষ লোক পাওয়া যাবে না এবং নারীদের কথা শুনা জরুরী হয়। আর পুরুষ লোক পাওয়া গেলে নারীদের প্রয়োজন হবে না।
২০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কতিপয় সৎ যুবকদের নিকট তাক্বলীদ না করার কথাটি বেশি প্রচলিত। ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) এর কতিপয় কথার উপর তারা বেশি নির্ভর করে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি?
জবাবে তিনি বলেন, মূলত এ বিষয়ে আমি গুরুত্বারোপ করি যে, মানুষ তাক্বলীদকে ভিত্তি হিসাবে নির্ধারণ করবে না। কেননা, মুক্বাল্লিদ কখনো ভুল করে। এসত্ত্বেও আমি মনে করি না যে, পূর্ববর্তী আলিমদের কথা থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। আমরা বিচ্ছিন্ন হবো না আর প্রত্যেক মাযহাব থেকেই সঠিক বিষয় গ্রহণ করবো। কেননা, যারা তাক্বলীদকে অস্বীকার করে এমন ভাইদের দেখতে পাই তারা কখনো ভ্রষ্টতার পথ বেছে নেয় আর তারা এমন কথা বলে যা পূর্ববর্তী আলিমদের কেউ বলেননি। কিন্তু যখন তাকুলিদের প্রয়োজন দেখা দিবে তখন তা আবশ্যক। যেমন: আল্লাহ তা'আলা বলেন,
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
যদি তোমরা না জানো তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৭)।
আয়াতটির মাধ্যমে বুঝা যায়, আমরা কোন কিছু না জানলে ঐ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা আল্লাহ আমাদের জন্য ওয়াজিব করে দিয়েছেন। আর জানার উদ্দেশে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করার বিষয়টি তাদের কথার উপর নির্ভর করা অন্তর্ভুক্ত করে। নচেৎ জিজ্ঞেস করা উপকারহীন বলে গণ্য হবে।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহঃ) বলেন, তাক্বলীদ হচ্ছে মৃত জন্তুর ন্যায়। অপারগ অবস্থায় যা খেতে পারো। নচেৎ তা তোমার জন্য হারাম।
মানুষের অবস্থা যদি এমন হয় যে, সে দলীল ভিত্তিক কিতাবাদী পাঠ করতে সক্ষম নয় তখন তাক্বলীদ করা তার জন্য অসুবিধা নেই। কিন্তু সে এমন ব্যক্তির তাক্বলীদ করবে যে ইলম ও আমানতের দিক থেকে হক্বের অধিক নিকটবর্তী। অপর দিকে যদি সে আল্লাহর কিতাব ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ হতে বিধান সাব্যস্ত করতে সক্ষম হয়, সে ক্ষেত্রে তার জন্য তাক্বলীদ দরকার নেই।
২১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, বিষয় ভিত্তিক বিদ্যা যেমন: চিকিৎসা শাস্ত্র, ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি শিক্ষা অর্জনের প্রয়োজন হলে মানুষ এসব বিষয় ভিত্তিক বিদ্যার্জন করবে নাকি শারঈ বিদ্যা?
জবাবে শাইখ বলেন, সন্দেহ নেই যে, শারঈ বিদ্যার্জনই আসল। আর শারঈ বিদ্যার্জন ছাড়া যথাযথভাবে আল্লাহর ইবাদত করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। যেমন: আল্লাহ তা'আলা বলেন,
قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةِ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي
বল, এটাই আমার পথ, আল্লাহর পথে মানুষকে আহবান করি সজ্ঞানে আমি এবং আমার অনুসারীগণও (সূরা ইউসূফ ১২:১০৮)।
সুতরাং বুঝা যায়, শারঈ বিদ্যার্জনই আবশ্যক যার মাধ্যমে ব্যক্তির জীবন দুনিয়া ও আখিরাতে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর শারঈ ইলমের ভিত্তি ছাড়া কোন বিষয়ে দাওয়াত দানে প্রতিষ্ঠিত থাকা সম্ভব নয়। আর এ প্রাসঙ্গিকতার দিক থেকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দানের পূর্বে শারঈ জ্ঞানার্জনের প্রতি ভাইদেরকে উৎসাহিত করা আমি গুরুত্বারোপ করি। এ অর্থ নয় যে, তাদেরকে গভীর জ্ঞানার্জন করতে হবে। কিন্তু কোন বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান না থাকলে ঐ ব্যাপারে তারা কথা বলবে না। কেননা, কোন অজ্ঞাত বিষয়ে কথা বললে তারা আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
বল, আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর উাপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না (সূরা আল-আ'রাফ ৭:৩৩)।
শারঈ জ্ঞান দু'প্রকার:
(ক) ফরয: দীন ও পার্থিব প্রয়োজনীয় বিষয়ে জ্ঞানার্জন করা আবশ্যক।
(খ) ফরযে কেফায়াহ: এখানে শারঈ বিদ্যা এবং শারঈ নয় এমন অন্যান্য বিদ্যা যা মানুষের প্রয়োজন উভয়ের মাঝে সমতা রক্ষা করা সম্ভব। অনুরূপভাবে শারঈ নয় এমন অন্যান্য বিদ্যা তিন প্রকার:
১. ক্ষতিকর বিদ্যা যা শিক্ষা করা হারাম এবং এ বিদ্যার্জনে নিয়োজিত থাকা মানুষের জন্য বৈধ নয় যতক্ষণ তার কুফল থাকবে।
২. উপকারী বিদ্যা, যাতে উপকার নিহিত আছে তা অর্জন করবে।
৩. এমন বিদ্যা যা না জানলে ক্ষতি হবে না এবং তার মাধ্যমে উপকারও লাভ হবে না। এ সব বিদ্যার্জনে সময় নষ্ট করা শিক্ষার্থীর জন্য উচিত নয়। যেমন: ইলমে মানতেক বা তর্ক শাস্ত্র।
২২. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, অধিকাংশ যুবক প্রভাবিত হয়ে সাংস্কৃতিক পুস্তকাদী পাঠ করার প্রতি গুরুত্বারোপ করে এবং উছুলের কিতাবাদী পাঠে গুরুত্ব দেয় না এ ব্যাপারে আপনার উপদেশ কি?
শাইখ (রহঃ) জবাবে বলেন, প্রথমত আমার নিজের জন্য উপদেশ এবং শিক্ষার্থী ভাইদের প্রতি উপদেশ হচ্ছে যে, তারা সালাফদের কিতাবাদী পাঠে মনোযোগী হবে। কেননা, তাদের কিতাবে অনেক কল্যাণ ও জ্ঞান আছে এবং তাদের কিতাব পঠনে অনেক বরকত নিহিত আছে যা জ্ঞাত।
২৩. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা অনেক মানুষকে দেখি যে, কতিপয় শারঈ জ্ঞান তাদের রয়েছে যেমন: দাড়ি মুণ্ডন করা, ধুমপান করা হারাম হওয়ার জ্ঞান অথচ এ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তারা আমল করে না। এর কারণ কি? এ প্রকাশ্য মারাত্মক অপরাধের কি প্রতিকার রয়েছে?
জবাবে তিনি বলেন, এর কারণ হলো: কু-প্রবৃত্তির অনুসরণ করা। যা সে হারাম মনে করে তা থেকে বিরত থাকতে আল্লাহভীতি অর্জনের জন্য উদ্বুদ্ধ করে এমন দীনি সংযোমশীলতা এ শ্রেণীর মানুষের মাঝে নেই।
আরো কারণ হচ্ছে, বান্দার অন্তরে শয়তান এ ধরনের পাপাচারিতার কুমন্ত্রনা দেয়। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন,
إياكم ومحقرات الذنوب، فإنما مثل ذلك كمثل قوم نزلوا أرضاً فأتى هذا بعود وهذا بعود وهذا بعود ثم إذا جمعوا حطبا كثيرا وأضرموا ناراً كثيراً"
তোমরা ছোট গুনাহ থেকেও বিরত থাকো। কেননা, এ ধরনের গুনাহের উদাহরণ হলো ঐ সম্প্রদায়ের মত যারা কোন এক এলাকায় প্রবেশ করে, অতঃপর তারা এর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে অতঃপর অনেক কাঠ সংগ্রহ করার পর বিশাল অগ্নিকুন্ড প্রজ্জলিত করে।
অনুরূপভাবে মানুষ যে সব গুনাহকে তুচ্ছ মনে তাতে সর্বদা লিপ্ত থাকার কারণে তা কাবীরাহ গুনাহে পরিণত হয়। এজন্য আলimগণ বলেন, ছোট গুনাহে সদা লিপ্ত থাকলে তা কাবীরাহ গুনাহে পরিণত হয়। আর কাবীরাহ গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলে তা মিটে যায়। এজন্য আমি এ শ্রেণীর লোকদের বলি, তোমাদের নিজেদের ব্যাপারে ভেবে দেখা উচিত। আরো কারণ হলো, সৎকাজের আদেশ কমে যাওয়া এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ না করা। আমাদের প্রত্যেকে কোন অন্যায় কাজ দেখলে সে অন্যায়কারীকে সুপথ দেখাবে এবং তাকে বর্ণনা করে বুঝাবে যে, এটা রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দিক-নির্দেশনার বিপরীত কর্ম। কেননা, অচিরেই বিবেককে এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে এবং বিবেকের পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
২৪. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহর দিকে দাওয়াত দানের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ও আলিমের করণীয় কি?
জবাবে শাইখ বলেন, আল্লাহর দিকে দাওয়াত দান ওয়াজিব। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
{ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ} [النحل: ١٢٥]
তুমি তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান কর এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর (সূরা আন-নাহাল ১৬:১২৫)।
আল্লাহ তা'আলা দাওয়াতের তিনটি পর্যায় নির্ধারণ করেছেন। তা হচ্ছে, ক. হিকমত-প্রজ্ঞাসহ দাওয়াত দান খ. উপদেশের মাধ্যমে দাওয়াত দান ও গ. উত্তম পন্থায় তর্কের মাধ্যমে দাওয়াত দান।
যাকে দাওয়াত দেয়া হবে হয়তো তার জ্ঞান নেই, তর্ক-বিতর্ক ও বিরোধীতার করার সক্ষমতাও নেই। এ শ্রেণীর মানুষদেরকে হিকমত-প্রজ্ঞা সহ
দাওয়াত দিতে হবে। হজ্বের বর্ণনাই হলো প্রজ্ঞা। আর এক্ষেত্রে যদি হক্ব বর্ণনায় প্রজ্ঞা অবলম্বন করাই সহজ মনে হয় এবং কোন হকু কেউ বর্জন করে এবং হকু গ্রহণ হতে বিরত থাকে তাহলে তাকে হক্ব গ্রহণের প্রতি উৎসাহ দিতে হবে অথবা ভীতি প্রদর্শন করতে হবে। অবস্থা অনুপাতে উভয়টি প্রযোজ্য হবে। আর যে হকুকে বর্জন করে এবং হক্ব বর্জনে তর্ক করে তার সাথে উত্তম পন্থায় তর্ক-বিতর্ক করতে হবে এবং তাকে সন্তুষ্ট করতে হবে।
যে লোক তার প্রভূর ব্যাপারে ঝগড়া করেছিল তার সাথে ইবরাহীম (আঃ) এর তর্ক-বিতর্কের দিকে লক্ষ্য কর। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِي حَاجَ إِبْرَاهِيمَ فِي رَبِّهِ أَنْ آتَاهُ اللهُ الْمُلْكَ إِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّيَ الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ قَالَ أَنَا أُحْيِي وَأُمِيتُ قَالَ إِبْرَاهِيمُ فَإِنَّ اللَّهَ يَأْتِي بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ فَبُهِتَ الَّذِي كَفَرَ وَاللهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالمين} [البقرة: ٢٥٨]
তুমি কি সে ব্যক্তিকে দেখনি, যে ইব্রাহীমের সাথে তার রবের ব্যাপারে বিতর্ক করেছে যে, আল্লাহ তাকে রাজত্ব দিয়েছেন? যখন ইব্রাহীম বলল, আমার রব তিনিই যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। সে বলল, আমিই জীবন দান করি এবং মৃত্যু ঘটাই। ইব্রাহীম বলল, নিশ্চয় আল্লাহ পূর্বদিক থেকে সূর্য আনেন। অতএব, তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে আন। ফলে কাফির ব্যক্তি হতভম্ব হয়ে গেল। আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হেদায়াত দেন না (সূরা আল-বাক্বারা ২:২৫৮)।
এটা কেমন ব্যাপার! মৃত্যুদন্ডের উপযুক্ত এক লোককে হত্যা করার জন্য ফিরআউনের কাছে নিয়ে আসা হলো অতঃপর সে তাকে হত্যা না করে ছেড়ে দিলো। ফিরআউনের ধারণা অনুযায়ী এটাই হলো ঐ লোকের জন্য জীবন ফিরিয়ে দেয়ার অবস্থা। অন্যদিকে অপর এক লোক মৃত্যুদন্ডের উপযুক্ত নয় অথচ সে তাকে হত্যা করলো। তার ধারণা মতে, এটাই হলো ঐ লোকের দান। এখানে এ কথা বলে তর্ক করা সম্ভব যে, মৃত্যুদন্ডের উপযুক্ত লোকটিকে তোমার কাছে নিয়ে আসা হলে তাকে হত্যা না করে তুমি তাকে জীবন দান করোনি। কেননা, পূর্ব হতেই ঐ লোক জীবিত ছিল। কিন্তু হত্যা না করার কারণে সে বেঁচে আছে। অনুরূপভাবে বলা যায়, যে লোক মৃত্যুদন্ডের উপযুক্ত নয় তাকে হত্যা করার কারণে সে মৃত্যু বরণ করে নাই। বরং ঐ লোকের মৃত্যুর কারণ সৃষ্টি হয়েছিল মাত্র। এজন্য নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাজ্জালের ঘটনায় উল্লেখ করেন যে, তার কাছে এক যুবককে নিয়ে আসা হবে। অতঃপর যুবক
সাক্ষ্য দিবে যে, এ হলো দাজ্জাল যার সম্পর্কে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন। অতঃপর দাজ্জাল তাকে হত্যা করে দ্বিখন্ডিত করবে। অতঃপর সে দ্বিখন্ডের মাঝে অবস্থান করে ঐ মৃত যুবককে ডাকবে। অতঃপর ঐ যুবক আলোকময় অবস্থায় হাস্যেজ্জল চেহারায় সাক্ষ্য দিবে যে, তুই সেই দাজ্জাল যার সম্পর্কে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের খবর দিয়েছেন। অতঃপর সে তাকে হত্যা করার জন্য এগিয়ে যাবে কিন্তু তাকে হত্যা করতে সক্ষম হবে না। এটাই প্রমাণিত হয় যে, সবকিছুর চাবিকাঠি আল্লাহর হাতে। কারো সাথে অযথা তর্ক করা সম্ভব কিন্তু ইবরাহীম (আঃ) দলীল-প্রমাণ পেশ করতে চেয়েছিলেন যার জন্য কোন তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়ার প্রয়োজন হবে না। ইবরাহীম (আঃ) এর ভাষায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَإِنَّ اللَّهَ يَأْتِي بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ
ইব্রাহীম বলল, নিশ্চয় আল্লাহ পূর্বদিক থেকে সূর্য আনেন। অতএব, তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে আন (সূরা আল-বাক্বারা ২:২৫৮)।
অতঃপর জবাব দান থেকে তারা বিরত থাকলো। আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَبُهِتَ الَّذِي كَفَرَ} [البقرة: ٢٥٨] কাফির ব্যক্তি হতভম্ব হয়ে গেল (সূরা আল-বাক্বারা ২:২৫৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ} [النحل: ١٢٥]
তোমরা উত্তম পন্থায় তর্ক করো (সূরা আন-নাহাল ১৬:১২৫)।
অর্থাৎ তর্কের নিয়ম অনুসরণ ও শ্রোতাকে তুষ্ট করণে উত্তম পন্থা অবলম্বন করা। আর সক্ষমতা অনুসারে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়া আমাদের উপর ওয়াজিব। কিন্তু আল্লাহর দিকে দাওয়াত দান ফরযে কিফায়াহ বলে গণ্য। অর্থাৎ কিছু সংখ্যক মানুষ দাওয়াত দানের জন্য প্রস্তুত থাকলে অবশিষ্টদের জন্য তা যথেষ্ট হবে।
যখন দাওয়াত দান হতে লোকজনকে বিমুখ দেখবে এবং এমন কেউ নেই যে, দাওয়াত দিবে তখন এটা 'ফরযে আইন' বলে গণ্য হবে। কেননা, আলিমগণ বলেন, দাঈ ছাড়া দাওয়াত দানে আর কোন লোক না থাকলে সেক্ষেত্রে তা হবে ফরযে আইন।
২৫. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, মু'তাযিলা, জাহমিয়াহ ও খারেজী দল বিদ্যমান নেই তাহলে তাদের সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জেনে লাভ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, এ যুগে বিদ'আতী দল সম্পর্কে জানার উপকারীতা হচ্ছে, এসব দল যা কিছু গ্রহণ করেছে তা পাওয়া গেলে আমরা প্রত্যাখ্যান করবো। তারা কার্যতঃ বিদ্যামান। যেমন কোন প্রশ্নকারী বলেন, বর্তমানে তাদের কোন অস্তিত্বই নেই, তাদের ইলমের উপর ভিত্তি করতে হবে কেন। কিন্তু আমাদের সকলের নিকট এটা জ্ঞাতব্য যে, মানুষ মনে করে, এসব দলের অস্তিত্ব এখনও বিদ্যমান। বিদ'আত প্রচারে তাদের তৎপরতা রয়েছে। একারণে তাদের মতামত আমাদের জেনে রাখা দরকার। যাতে তাদের মিথ্যা ও হক্ব বুঝতে পারি এবং তারা যে সব বিষয়ে তর্ক করে তা প্রত্যাখ্যান করতে পারি।
২৬. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা শিক্ষার্থীরা অনেক আয়াত মুখস্থ করি, কিন্তু অনেক আয়াত ভুলে যাই। এমতাবস্থায় মুখস্থ করার পর ভুলে যাওয়ার কারণে কি শান্তি ধার্য করা হবে?
জবাবে শাইখ বলেন, কুরআন ভুলে যাওয়ার দু'টি কারণ আছে: প্রথম: স্বভাবগত কারণ।
দ্বিতীয়: কুরআন থেকে বিমুখ হওয়া এবং ভ্রুক্ষেপ না করা।
প্রথম কারণে কোন গুনাহ হবে না এবং শান্তি ধার্য হবে না। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন জ্বলাতের ইমামতি করতেন তখন আয়াত ভুলে যেতেন। জ্বলাত শেষে উবাই ইবনে কা'ব ভুলে যাওয়া আয়াত তাকে স্বরণ করিয়ে দিতেন। অতঃপর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতেন, هلا" كنت ذكرتنيها তুমি তা আমাকে কেন স্বরণ করিয়ে দিলে না?[৫৫] তিনি রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে পাঠ করতে শুনতেন:
يرحم الله فلانا فقد ذكرني آية كنت أنسيتها".
আল্লাহ তা'আলা অমুককে দয়া করুন, সে আমাকে আয়াত স্বরণ করিয়ে দিয়েছে যা আমি ভুলে গেছি।[৫৬]
এটা প্রমাণিত হয় যে, স্বভাবগত কারণে মানুষ ভুলে যেতে পারে এতে তিরস্কারের কিছু নেই। অপরদিকে কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া ও ভ্রক্ষেপ না করার কারণে গুনাহ হবে। কতিপয় মানুষকে শয়তান আয়ত্বাধীন করে নেয় এবং এভাবে কুমন্ত্রণা দেয় যে, কুরআন মুখস্থ করো না, তা ভুলে যাবে। এতে গুনাহ হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا ﴾ [النساء: 76]
তোমরা লড়াই কর শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে। নিশ্চয় শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল। (সূরা আন-নিসা ৪:৭৬)।
কতিপয় মানুষ উদাহরণ স্বরূপ আল্লাহ তা’আলার নিম্নোক্ত বাণীর মাধ্যমে দলীল পেশ করেন, আল্লাহ তা’আলা বলেন,
لَا تَسْأَلُوا عَنْ أَشْيَاءَ إِنْ تُبْدَ لَكُمْ تَسُؤْكُمْ ﴾ [المائدة: 101]
হে মুমিনগণ, এমন বিষয়াবলী সম্পর্কে প্রশ্ন করো না যা তোমাদের কাছে প্রকাশ করা হলে তা তোমাদেরকে পীড়া দেবে। (সূরা আল-মায়েদা ৫:১০১)।
অতঃপর উক্ত আয়াতকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন করা, জেনে নেয়া ও শিক্ষা অর্জন অহেতুক কারণে তারা ছেড়ে দেয়। অথচ এ প্রেক্ষাপট ওহী নাযিল হওয়া ও শরী’আত প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। কতিপয় মানুষ এমন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতো যে ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা আয়াত নাযিল করেননি। অতঃপর তাদের সামনে ঐ জিজ্ঞাসিত বিষয় স্পষ্ট করা হতো। কোন বিষয় গ্রহণ করা অথবা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে মুসলিমদের উপর কঠোরতা আরোপ করা হতো। কিন্তু এখন বিধি-বিধানের কোন পরিবর্তন নেই। এতে কোন অপূর্ণতাও নেই। সুতরাং এখন জানার উদ্দেশ্যে দ্বীন সম্পর্কে প্রশ্ন করা ওয়াজিব।
২৯. শায়েখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, যে বিষয়ে মানুষ কিছু জানে এবং অপরকে ঐ বিষয় পালনের আদেশ দেয় অথচ সে নিজে আমল করে না। হোক তা ফরজ অথবা নফল। যে বিষয়ে সে আমল করে না তা পালনে অন্যকে আদেশ দেয়া কি তার জন্য বৈধ হবে? আর আদিষ্ট ব্যক্তির জন্য তা পালন করা ওয়াজিব নাকি আমল ছাড়াই তার জন্য বৈধ? অতঃপর দলীল প্রমান উপস্থাপন করা বৈধ? অতঃপর দলীল অনুসরণের জন্য সে কি আমলই করবে না যে ব্যাপারে সে আদেশ দিয়েছে?
জবাবে শায়েখ বলেন, এখানে দুইটি বিষয়।
প্রথম: যিনি কল্যাণের দিকে আহবান করেন অথচ তিনি নিজে আমল করেন না।
তার ব্যাপারে আমরা আল্লাহ তা'আলার নিম্নের বাণী পেশ করবো। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَم تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ } { كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تفعلون} [الصف: ٢، ٣]
হে ঈমানদারগণ! তোমরা তা কেন বল, যা তোমরা কর না?! তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর নিকট বড়ই ক্রোধের বিষয় (সূরা আছ-ছাফ ৬১:২,৩)।
আমি আশ্চর্য হই, ঐ লোক কেমন! যে হজ্বের প্রতি ঈমান আনে, সে বিশ্বাস রাখে আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে তার নৈকট্য লাভ হয়, সে আল্লাহর বান্দা এ বিষয়েও তার বিশ্বাস আছে অথচ সে আমল করে না। এটাই তার আশ্চর্যের বিষয়। এটা তার নির্বোধ হওয়ার প্রমাণ বহন করে। একারণে সে তিরস্কার ও নিন্দার পাত্র হবে। এ জন্য আল্লাহ তা'আলা বলেন, {লَمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ}
সুতরাং আমি এ শ্রেণীর লোককে বলবো, যা তুমি জানো এবং যার দিকে তুমি আহবান করো তদানুযায়ী আমল ছেড়ে দেয়ার কারণে তুমি পাপাচারী। যদি তুমি নিজেকে দিয়ে আমল শুরু করতে তাহলে সেটা হতো বিবেক ও প্রজ্ঞার কাজ। অপরদিকে ঐ আদেশদাতার বিরোধীতা করা আদিষ্ট ব্যক্তির জন্য শুদ্ধ নয়, যদি সে কল্যাণকর কোন কাজের আদেশ দেয় তাহলে সেটা গ্রহণ করা তার জন্য ওয়াজিব। আর যারাই হকু বলবেন তাদের কাছ তা গ্রহণ করা ওয়াজিব। বিদ্যার কারণে তাকে অবজ্ঞা করবে না।
২৮. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কিভাবে তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করবো যারা বলে যে, মুখস্থ করণের উপর প্রভাব ফেলে এমন কোন কর্মব্যস্ততা পূর্ববর্তী আলিমদের ছিল না। যেমন বর্তমানে এ যুগের আলিমদের কর্মব্যস্ততা রয়েছে। তাদের মধ্যে কতিপয় এমন ছিল যারা কোন ব্যস্ততা ছাড়াই কেবল ইলম অর্জন, তা আয়ত্ব করণ ও ইলমের মজলিশে যোগদানের জন্যই বের হতো। কিন্তু এখন পার্থিব ব্যস্ততার মধ্যে দিয়েই সময় অতিবাহিত হয়। আর মানুষ এ ব্যস্ততা থেকে বিরত থাকতে কি সক্ষম নয়?
জবাবে শাইখ বলেন, আমি শিক্ষার্থীকে বলবো, ইলম অর্জনের জন্যই যখন নিজেকে তুমি নিয়োজিত করবে তাহলে প্রকৃতপক্ষে তুমি শিক্ষার্থী হিসাবেই গণ্য হও। আর এটা বিশ্বাস করো যে, নির্মাতা যখন প্রসাদ নির্মাণে নিজেকে নিয়োজিত করে তখন সে অন্যকাজে মনোযোগ দেয় না। বরং যা সে নিজে নির্মাণ করবে তার দিকেই গুরুত্বারোপ করে। আর সে মনে করে, এটা করাই তার জন্য ভাল। অনুরূপ তুমি ইলম অর্জনে নিয়োজিত থাকলে সেটাই তোমার জন্য কল্যাণকর। আর তুমি কেবল ইলম অর্জনের পথ বেছে নেয়ার ইচ্ছা করবে, অন্যদিকে মনোযোগ দিবে না। আমার ধারণা মতে, ঈমান, ইখলাছ (একনিষ্ঠতা) ও সৎ নিয়্যাতের উপর কেউ অবিচল থাকলে আল্লাহ তা'আলা তাকে সাহায্যে করেন এবং তাকে এসব পার্থিব ব্যস্ততায় নিয়োজিত রাখেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا}
যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন (সূরা আত্ব-ত্বালাক্ব ৬৫:৪)। তিনি আরো বলেন,
{وَمَن يَتَّقِ اللهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ}
যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্যে উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না (সূরা আত্ব-ত্বালাক্ব ৬৫:২-৩)।
সুতরাং ইলম অর্জনে সৎ নিয়্যাত আবশ্যব; তাহলেই এটা সহজ-সাধ্য হবে।
২৯. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, যারা শারঈ ইলম অর্জন করতে চায় অথচ তারা আলিমের নিকট ইলম অর্জন থেকে দূরে থাকে। কারণ তাদের কাছে উছুল ও সংক্ষিপ্ত কিতাবাদী রয়েছে। তাদের ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, আমি শিক্ষার্থীকে উপদেশ দিবো যে, তারা যেন ইলম অর্জনে অবিচল থাকে এবং আল্লাহ তা'আলার সাহায্য কামনা করে। অতঃপর তারা যেন বিদ্বানগণের শরণাপন্ন হয়। কেননা, নিজে নিজে কতিপয় কিতাব পাঠ করলে তাতে অনেক মতভেদ পরিলক্ষিত হবে। তাই সরাসরি আলিমের নিকট হতে ইলম অর্জনে কম সময় ব্যয় হয়। অবশ্য আমি এটা বলতে চাচ্ছি না যে, যারা বলে, আলিম অথবা শাইখ ছাড়া ইলম অর্জন সম্ভব নয়। এ কথাটি ঠিক
নয়। বাস্তবে তা মিথ্যাই বটে। কিন্তু শাইখের নিকট পাঠ গ্রহণের ফলে শিক্ষার্থীর ইলম অর্জনের রাস্তা আলোকিত হয় এবং কম সময়ে তা অর্জন হয়।
৩০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আমি একজন শিক্ষার্থী আর আমার পরিবারে পারিপার্শ্বিক বস্তুগত অনেক কাজ আছে। আমার পিতা আমাকে বলে, ইলম অর্জনের চেয়ে পরিবারের জন্য কাজ করা অনেক উত্তম। এমতাবস্থায় আমি কি ইলম অর্জন ছেড়ে দিবো? এক্ষেত্রে পরিবারের জন্য আমার কাজ করা উত্তম নাকি উত্তম নয়?
জবাবে শাইখ বলেন, নিঃসন্দেহে ইলম অর্জন উত্তম। জরুরী অবস্থা ছাড়া এমনটা করা ঠিক নয়। তবে উভয় ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখাও সম্ভব। বিশেষতঃ আর্থিক সংকট দূরিকরণে ভূমিকা পালন করা যেতে পারে। আল-হামদুল্লিাহ আল্লাহ তা'আলা অনেক মানুষকে সচ্ছলতা দান করেছেন। পরিবারের প্রয়োজন পূরণে তোমার এগিয়ে আসা সম্ভব। তুমি এমন মেয়েকে বিয়ে করতে পারো যার নিকট কিছু সম্পদ রয়েছে। তাহলে তুমি ইলম অর্জনে অবিচল থাকতে পারবে।
৩১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমার বইয়ের পাঠসমূহ পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় রচিত যা শরী'আতের সাথে সাংঘর্ষিক। আমি জেনে এ চিন্তাধারার পাঠ গ্রহণের মনস্থ করেছি। আমার সনদ প্রাপ্তির পর এ ধরনের লেখাপড়ার মধ্যে মুসলিম উম্মতের জন্য কোন উপকার নিহিত আছে কি? এ ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, আমি বলবো যে, নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের ইসলাম বিরোধী পাঠ গ্রহণের পর মানুষ তার জ্ঞান-বুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে তা প্রত্যাখ্যান করবে। এজন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআ'য ( )-কে ইয়ামানে পাঠানোর সময় বলেছিলেন,
"إنك ستأتي قوماً من أهل الكتاب" শীঘ্রই তুমি আহলে কিতাবের এক সম্প্রদায়ের কাছে যাচ্ছো। ১৫৭[
অতঃপর নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআ'য ( )-কে ইয়ামানবাসীর অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করলেন। যাতে তাদেরকে দাওয়াত দানের জন্য তিনি প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেন। এমনিভাবে যেসকল আলিম এ ধরনের পাঠ গ্রহণ
করেছেন; যেমন: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহঃ) বিভিন্ন বিষয় ও দার্শনিক চিন্তাধারার লেখা পড়া করেন। অতঃপর তিনি এর মাধ্যমে এ বিষয়ের প্রতি অনুরাগীদেরকে প্রত্যাখ্যান করতে সক্ষম হন। তুমিও যদি এ পাশ্চাত্য চিন্তাধারার বিষয়কে প্রতিহত করার জন্য তা শিখতে থাকো, সক্ষমতা ও সুরক্ষার মাধ্যমে এ বিষয়সমূহ প্রত্যাখ্যান করার উপর তোমার এমন দৃঢ়তা থাকতে হবে যাতে তুমি এ চিন্তাধারায় প্রভাবিত না হও। তা এভাবে হবে যে, তোমাকে শারঈ গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং তোমাকে হতে হবে ইবাদতকারী ও আল্লাহভীরু। তাহলেই আমি আশা করবো, ইনশাল্লাহ এটা তোমার জন্য হবে কল্যাণকর এবং তা মুসলিমদের উপকারে আসবে। অপরদিকে তুমি যদি এ বিষয়ের কোনটিতে সম্পৃক্ত হও যা গ্রহণীয় নয় অথবা তোমার নিকট দলীল-প্রমাণ না থাকে তাহলে তুমি এ পথ অনুসরণ করবে না। এরূপই তুমি যদি বুঝতে পারো, তোমার দৃঢ় বিশ্বাস নেই এবং তা প্রতিহত করণে তোমার শক্ত অবস্থানও নেই তাহলে ইঙ্গিতে বলবো, এ বিষয়সমূহ ছেড়ে দেয়া তোমার উপর আবশ্যক। কেননা, এ অবস্থায় তা মারাত্মক বলে গণ্য হবে। আর শঙ্কার সাথে বিপদে পা বাড়ানো কোন মানুষের উচিত নয়।
৩২. শাইখের নিকট আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আমি একজন ছাত্র। আমি ভাল ছাত্র হিসাবে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পছন্দ করি। এটা আমার ভাল নিয়্যাত। সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে যাওয়ায় খুশি হওয়া এবং নিম্ন অবস্থানে থাকায় দুঃখিত হওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইখলাছ (একনিষ্ঠতার) কোন প্রভাব আছে কি?
জবাবে শাইখ বলেন, ইনশাল্লাহ জ্ঞাতব্য যে, এখানে ইখলাছের প্রভাব নেই। কেননা, এটা স্বভাবগত বিষয়। কারণ মানুষ ভাল কিছুর মাধ্যমে খুশি হয় এবং মন্দের দ্বারা দুঃখিত হয়। আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেন, যা মানুষের জন্য যথাযথ নয় তা খারাপ এমন বিষয়ে দুঃখিত হওয়াই আবশ্যক। অনুরূপভাবে ভাল বিষয়ে খুশি হওয়া আবশ্যক। তাই এ বিষয়ে তোমার ইখলাছে প্রভাব ফেলবে না যদি তোমার নিয়্যাত ভাল হয় যেমনটা তুমি বলছো। অপরদিকে কেবল সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছা ও সনদপত্র অর্জন কেন্দ্রীক চিন্তা-ভাবনায় লিপ্ত থাকো তাহলে এটি হবে অন্য বিষয়। উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, একদা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ছাহাবীদেরকে প্রশ্ন করলেন, গাছ-গাছালির মধ্যে এমন একটি গাছ রয়েছে যার সাথে মুমিনের তুলনা করা যায়। ছাহাবীগণ জঙ্গলের বিভিন্ন গাছ-গাছালির নাম ধারণা করতে লাগলো। ইবনে উমার বলেন,
আমার ধারণা হলো সেটি হবে খেজুর গাছ। কিন্তু আমি ছোট মানুষ হওয়ায় তা বলতে পছন্দ করিনি। [৫৮]
উমার ( তার পুত্রকে বলেন, আমি আশা করছিলাম যে, তুমিই উত্তরটা বলে দিবে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, মানুষের আনন্দ তার সফলতার সাথে জড়িত। এরূপ আনন্দের বিষয় সামনে আসলে তা প্রকাশ করাতে অসুবিধা নেই।
৩৩. শাইখের কাছে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ইংরেজী ভাষা শিক্ষা অর্জন করে বিশেষত আল্লাহর দিকে দাওয়াত দানে তা ব্যবহার সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
জবাবে শাইখ বলেন, আমরা মনে করি, ইংরেজী ভাষা শিক্ষা নিঃসন্দেহে একটি মাধ্যম। ভাল উদ্দেশ্যে এ ভাষাকে মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করা মন্দ নয়। আর উদ্দেশ্যে মন্দ হলে তা প্রয়োগ করাও মন্দ বটে। তবে সাধারণত আরবী ভাষার পরিবর্তে এটাকে গ্রহণ করা হতে বিরত থাকা আবশ্যক। তা ব্যবহার করা সাধারণত বৈধ নয়। আমরা শুনে থাকি যে, কতিপয় নির্বোধ আরবী ভাষার পরিবর্তে ইংরেজী ভাষা প্রয়োগ করে। কতিপয় অনুরাগী নির্বোধ রয়েছে যাদেরকে আমি অন্যের পাপের কারণ মনে করি, তারা তাদের সন্তানদেরকে অমুসলিমের কাছে শিক্ষা অর্জন করতে পাঠায়। ঐ অমুসলিম তাদেরকে বিদায়ী শুভেচ্ছা দেয় শিক্ষা দেয় বাই বাই বলে। এরূপ অন্যন্য শব্দাবলী শিখায়। আরবী ভাষা হলো কুরআনের ভাষা। অন্য ভাষার সাথে এ মর্যাদাপূর্ণ ভাষার পরিবর্তন নিষিদ্ধ। সালাফদের বিশুদ্ধ মত হলো এ ভাষার সাথে অনারবী ভাষার পরিবর্তন নিষিদ্ধ। তবে ইংরেজী ভাষা দাওয়াতের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। নিঃসন্দেহে কখনো কখনো তা প্রয়োগ করা আবশ্যক। আমি এ ভাষা জানি না। আমি মনে করি, যদি তা শিখতাম তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই এর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারতাম।
আমার অন্তরে যা আছে তার পূর্ণ অনুবাদ সম্ভব নয়। জেদ্দা বিমান বন্দর মসজিদে 'তাওঈয়াহ ইসলামিয়া' লোকদের সাথে ঘটে যাওয়া একটা কাহিনী তোমাদের সামনে বর্ণনা করছি, ফজরের জ্বলাত আদায়ের পর التيجاني মাযহাব সম্পর্কে আলোচনায় লিপ্ত হই। এটি মূলত বাতিল-মিথ্যা মাযহাব। এ মাযহাব পন্থীরা ইসলাম অস্বীকার করে। এ মাযহাব সম্পর্কে যা জানি তা বলতে আরম্ভ করলাম।
ইতিমধ্যে আমার কাছে এক লোক এসে বললো, الهوسا নামক ভাষা অনুবাদের জন্য আমি আপনার অনুমতি চাই। আমি বললাম, অসুবিধা নেই অনুবাদ করুন। আরেক লোক দ্রুত প্রবেশ করে বললো, এ লোক যিনি আপনার পক্ষ থেকে অনুবাদ করবেন তিনি التيجانية ভাষার প্রশংসা করেন। আমি এ কথা শুনে অবাক হলাম এবং পাঠ করলাম: إنا لله وإنا إليه راجعون যদি আমি এ ভাষা জানতাম, তাহলে আমি তাদের প্রতারণার মুখোমুখী হতাম না। মোদ্দা কথা হলো তুমি যার সাথে কথা বলবে যোগাযোগ রক্ষায় তার ভাষা জানা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ} [إبراهيم: ٤] .
আমি প্রত্যেক রসূলকে তার কওমের ভাষাতেই পাঠিয়েছি, যাতে সে তাদের নিকট বর্ণনা দেয় (সূরা ইবরাহীম ১৪:৪)।
৩৪. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আমি নির্দিষ্ট বিষয় রসায়নের ছাত্র। আমি বিভিন্ন বিষয় ও পাঠ সমূহ পর্যালোচনা করি, এ ক্ষেত্রে এমন বিষয় উদ্ভূত হয় যার মাধ্যমে আমি নিজে উপকৃত হই এবং অন্যের উপকার সাধনে যে কোন ক্ষেত্রে জ্ঞান চর্চার সাথে কর্মরত থাকতে পারি হোক তা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অথবা শিল্প- কারখানা এ অবস্থায় শারঈ জ্ঞান চর্চা থেকে আমার বঞ্চিত হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। এমতাবস্থায় আমি উভয়ের মাঝে কিভাবে সমতা বজায় রাখবো?
জবাবে শাইখ বলেন, আমি মনে করি, উভয় ইলম চর্চার মাঝে সমন্বয়সাধন এভাবে হওয়া সম্ভব যে, তুমি শারঈ জ্ঞান চর্চাকেই কেন্দ্রীভূত করবে। এটাই হবে তোমার নিকট মৌলিক বিষয়। আর অন্যান্য বিষয়ের জ্ঞান চর্চা অতিরিক্ত হিসাবে গণ্য হবে। অতঃপর তোমার ও জাতির কল্যাণের উদ্দেশ্যে এ দ্বিতীয় স্তরের জ্ঞান চর্চায় তুমি মনোনিবেশ করতে পারো। যেমন এ জ্ঞান চর্চায় তুমি আল্লাহ তা'আলার পূর্ণ হিকমত-প্রজ্ঞা প্রমাণ করবে। আর সব কিছুর কারণ সমূহের মাঝে তুমি বন্ধন খুঁজতে থাকবে। আর এমন বিষয়ে পৌঁছবে যা আমরা জানি না। আর এ বিষয়ে আমাদের জ্ঞান নেই। আমি বলবো, শারঈ জ্ঞান চর্চায় অটল থাকো এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান চর্চায় মনোনিবেশ করতে পারো। সর্বপরি শারঈ জ্ঞান চর্চাকে কেন্দ্রীভূত করবে।
৩৫. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি কুরআনের কোন তাফসীর অধ্যয়নের পরামর্শ দিবেন? মানুষ কুরআন মুখস্থ করার পর তা ভুলে যায় এ কারণে কি শাস্তি
ধার্য হবে? মানুষ কিভাবে মুখস্থ করবে এবং যা মুখস্থ করেছে তা সংরক্ষণ করবে কিভাবে?
জবাবে শাইখ বলেন, কুরআনের বিভিন্ন জ্ঞান রয়েছে। আর প্রত্যেক মুফাস্সির এ জ্ঞানের মাধ্যমে কুরআনের তাফসীর করে একটা পক্ষ অবলম্বন করেছেন। আর বিভিন্ন দিক থেকে তাফসীর করার কারণে সব তাফসীর একই রকম হওয়া সম্ভব নয়।
التفسير الأثري অর্থাৎ ছাহাবী ও তাবেঈনগণ যে তাফসীর করেছেন ঐ তাফসীর কেন্দ্র করে কতিপয় আলিম তাফসীর করেন। যেমন: তাফসীর ইবনে জারির ও তাফসীর ইবনে কাছির।
আবার কেউ চিন্তাধারার আলোকে তাফসীর করেন। যেমন: যামাখশারীর তাফসীর। আমি মনে করি, প্রথমত আয়াতের তাফসীর নিজে বুঝতে হবে। অর্থাৎ পুনরাবৃত্তি করে নিজে বুঝতে হবে যে, এটাই আয়াতের অর্থ। অতঃপর আলিমগণ ঐ আয়াতের ব্যাপারে যা লিখেছেন তা পর্যালোচনা করতে হবে। কেননা, এটা তাফসীরের ক্ষেত্রে দৃঢ়তার উপকারে আসবে।
রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে স্পষ্ট আরবী ভাষার লোকদের মাঝে প্রেরণ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
{بلسان عربي مبين} সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়। (সূরা আশ শুয়ারা ২৬:১৯৫)
আর ছাহাবীদের তাফসীরের দিকে প্রত্যাবর্তন করা আবশ্যক। কেননা, তারা মানুষের মধ্যে হতে কুরআনের অর্থ বেশি বুঝতেন। এরপর তাবেঈ মুফাস্সিরগণের লিখিত তাফসীর অধ্যয়ন করতে হবে। বিভিন্ন তাফসীর রচিত হওয়া সত্ত্বেও কেউ আল্লাহ তা'আলার কালামের দোষ-ত্রুটি বের করতে পারেনি। এটা মনে করা হয় যে, মানুষ আয়াতের তাফসীর বারবার অধ্যয়ন করবে। অতঃপর মুফাস্সিরগণের কথা পর্যালোচনা করবে। তাতে কুরআনের অনুকূলে কথা পাওয়া গেলে সেটাই হবে সম্ভবপর কুরআনের তাফসীর এবং তা গ্রহণ করা মানুষের জন্য সহজ বলে গণ্য হবে। অপরদিকে কুরআনের বিপরীত কিছু পাওয়া গেলে সেক্ষেত্রে সঠিক তাফসীরের দিকে প্রত্যাবর্তন করবে।
আর ব্যক্তি বিশেষে কুরআন মুখস্থ করার পদ্ধতিও ভিন্ন হয়ে থাকে। কিছু মানুষ একটা একটা মুখস্থ করে। তা এভাবে যে, প্রথমে একটি আয়াত মুখস্থ করে পাঠ করে। দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার ঐ আয়াত পুনরাবৃত্তি করে মুখস্থ করতে থাকে। অতঃপর অন্য আয়াত মুখস্থ করে এভাবে অষ্টমাংশ অথবা চতুর্থাংশ এবং এরূপই বাকি অংশ পরিপূর্ণভাবে মুখস্থ করে। আবার কেউ এক অষ্টমাংশ সম্পূর্ণ মুখস্থ করে পুনরাবৃত্তি করতে থাকে এভাবে তা মুখস্থ হয়। মুখস্থ করার ব্যাপারে কোন নিয়ম কানুন বর্ণনা করা আমাদের জন্য সম্ভব নয়। আমরা মানুষকে বলবো, কুরআনের যতটুকু মুখস্থ করা তোমার জন্য উপযোগী তা তুমি কাজে লাগাও। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তোমার নিকট জ্ঞান থাকতে হবে। যখন যা মুখস্থ করার ইচ্ছা করবে সে দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে পারবে। আমি মনে করি, মানুষ যা কিছু মুখস্থ করবে তা সকাল সকাল পাঠ করবে, জ্ঞানার্জনে এটা করাই উত্তম। কেননা, দিনের প্রথমভাগে যা কিছু মুখস্থ করা হয় তা অনেক কাজে আসে। এটা আমি নিজেও করি। এটা ভালভাবে মুখস্থ করণের উপযোগী সময়।
মুখস্থ করে ভুলে যাওয়ার কারণে শান্তি ধার্য হওয়া:
ইমাম আহমদ (রা) বলেন, কোন আয়াত মুখস্থ করার পর তা ভুলে যাওয়ার ব্যাপারে কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। এ কথা দ্বারা ঐসব লোক উদ্দেশ্যে যারা কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এমনকি তা বর্জন করে। অপরদিকে স্বভাবগত অথবা অন্যান্য কারণে যারা কুরআন ভুলে যায় কুরআন মুখস্থ করণে মনোনিবেশ করা তাদের উপর ওয়াজিব। এ ধরনের ভুলে যাওয়ায় তাদের গুনাহ হবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{লَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا} [البقرة: ٢٨৬] .
আল্লাহ কোন ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না (সূরা আল-বাক্বারা ২:২৮৬)।
নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত, ছাহাবীদের নিয়ে জ্বলাত আদায়কালে তিনি আয়াত ভুলে গেলেন, জ্বলাত শেষে এক ছাহাবী তা স্বরণ করিয়ে দেন। অতঃপর তিনি বললেন,
هلا كنت ذكرتني بها"
ঐ আয়াত কেন তুমি আমাকে স্বরণ করিয়ে দাওনি।
অবহেলা হেতু ও মুখ ফিরিয়ে নেয়ার কারণে যারা ভুলে যায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত ও পাপী। পক্ষান্তরে কোন সঙ্গত কারণে যারা ভুলে যায় তাতে মনোনিবেশ করা তাদের জন্য ওয়াজিব। এরূপ স্বভাবগত ভুলে যাওয়ায় কোন পাপ হবে না।
৩৬. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ফিকহুস সুন্নাহ কিতাব সম্পর্কে আপনার মত কি?
জবাবে শাইখ বলেন, নিঃসন্দেহে তা উত্তম কিতাব। কেননা, এতে দলীল সম্মত অনেক মাসআলা রয়েছে। তবে তা ত্রুটিমুক্ত নয়। যেমন ইবনে রজব (রহঃ) القواعد الفقهية কিতাবের ভূমিকায় বলেন, আল্লাহ তা'আলা কেবল তার কিতাব সংরক্ষণ করেছেন অন্য কিতাব নয়। তবে লেখকের কিতাবে অনেক বেশি সঠিক বিষয় উল্লেখ থাকার কারণে তার সামান্য ভুল-ত্রুটি ক্ষমার যোগ্য। নিঃসন্দেহে কিতাবটি উপকারী। আমি মনে করি না যে, জ্বহীহ ও দ্বঈফ পার্থক্য করণে শিক্ষার্থী ছাড়া অন্য কেউ এ কিতাবটি সংগ্রহ করবে। কেননা, এ কিতাবে অনেক দ্বঈফ মাসআলা আছে। যেমন: জ্বলাতুত তাসবিহ আদায় মোবাহ হওয়ার ব্যাপারে কথা আছে। জ্বলাতুত তাসবিহ সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন, এ সম্পর্কে বর্ণিত হাদীছ মিথ্যা। তিনি আরো বলেন, ইমামদের কেউ এটাকে বৈধ বলেননি। ইমাম আহমদ (রহঃ) কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, হাদীছটি মুনকার। এ কিতাবে উল্লেখিত বিপরীত বিষয় মিলিয়ে দেখা তাদের জন্য আবশ্যক যারা শিক্ষার্থী নয়। কেবল এ কিতাবের উপর তারা নির্ভর করবে না।
৩৭. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমানে পরীক্ষামূলক কিছু জ্ঞান বিদ্যা হিসাবে চালু আছে। এমনকি মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানে علمى ও أدبي নামে বিদ্যা চালু আছে। এ ধরনের প্রকার কি সঠিক? প্রতিষ্ঠানে এধরনের জ্ঞান শিক্ষা করা ছাত্রদের ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত। এটা কি ভবিষ্যতে তাদের উপর কোন প্রভাব ফেলবে?
জবাবে শাইখ বলেন, علمي ও أدبي নামকরণ পরিভাষাগত বিষয়। আর পরিভাষায় কোন সমস্যা নেই। কেননা, তারা মনে করে, বিষয় ভিত্তিক জ্ঞান বস্তুগত, জীব, উদ্ভিদ এবং অনুরূপ বিদ্যার সাথে সম্পৃক্ত। তবে আমাদের এটা বুঝা আবশ্যক যে, এসব ঐ বিদ্যা নয় যা অর্জনে উৎসাহ দেয়া এবং ছাত্রদের প্রশংসা করা যেতে পারে। মূলত যে জ্ঞান অর্জনকারীদের আল্লাহ তা'আলা প্রশংসা করেছেন সেটাই হলো বিদ্যা। প্রশংসামূলক এ জ্ঞান অর্জনকারীরাই
আল্লাহভীরু। আর সেটাই মূলত শারঈ জ্ঞান। আর এটা ব্যতিত অন্যান্য জ্ঞান উপকারী হয়ে থাকলে তা অর্জন করা যেতে পারে। তবে উপকার সাধনই এ জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে হতে হবে। পক্ষান্তরে এটা ক্ষতিকর হলে তা অর্জন থেকে বিরত থাকাই ভাল। আর যদি উপকার ও ক্ষতি কোনটিই না থাকে তাহলে এ জ্ঞানার্জনে সময় নষ্ট করা মানুষের জন্য উচিত হবে না।
৩৮. শাইখের কাছে আমার প্রশ্ন হলো, শারঈ জ্ঞান ব্যতিত অন্যান্য জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত থাকা অথবা কর্মে ব্যস্ত থাকা কিংবা অন্য কোন বিষয়ে মগ্ন থাকায় ইলম অর্জন করতে না পারা কারো জন্য কৈফিয়ত হিসাবে গণ্য হবে কি?
জবাবে তিনি বলেন, শারঈ জ্ঞানার্জন ফরযে কিফায়াহ। যথেষ্ঠ সংখ্যক মানুষ এ জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত থাকলে অবশিষ্টদের ক্ষেত্রে তা যথাযথ। আর যে জ্ঞান ফরযে আইন তা অর্জন করা মানুষের জন্য আবশ্যক। যেমন আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করতে চাইলে ইবাদতের পদ্ধতি সম্পর্কে জানা আবশ্যক। ইবাদত পালনের সাথে পরিবারের প্রয়োজন পূরণ অথবা আবশ্যকীয় বিভিন্ন ব্যয়ভার বহনে কর্মে ব্যস্ত থাকায় আপত্তি নেই বলে মনে করি। তবে সাধ্যানুযায়ী শারঈ জ্ঞানার্জন করা উচিত।
৩৯. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, {إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ } এ আয়াতে العلماء দ্বারা উদ্দেশ্যে কি?
জবাবে শাইখ বলেন, আল্লাহভীতি অর্জনে যাদের জ্ঞান আছে এখানে আলিম দ্বারা তারাই উদ্দেশ্যে। কেবল বস্তুগত জ্ঞান যেমন: জ্যোতির্বিদ্যা এবং অনুরূপ অন্যান্য বিষয় অথবা বিস্ময়কর বিজ্ঞান সংক্রান্ত জ্ঞান যারা অর্জন করেছে তারা উদ্দেশ্যে নয়। অবশ্য বাস্তবে বিজ্ঞান সংক্রান্ত জ্ঞান আমরা অস্বীকার করি না। শেষ যুগে কুরআনে বিজ্ঞানের অনেক তথ্য প্রকাশ পেয়েছে আমরা তা অস্বীকার করি না। কিছু মানুষ বিস্ময়কর বিজ্ঞান সম্পর্কে বাড়াবাড়ি মূলক কথা বলে। এমনকি আমরা দেখেছি, মানুষ কুরআনকে গণিতের কিতাব হিসাবে নির্ধারণ করে যা ভুল। আমরা বলবো, বিস্ময়কর বিজ্ঞান সাব্যস্ত করণে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। কেননা, চিন্তাধারার আলোকে বিজ্ঞান সাব্যস্ত হয় এবং চিন্তাধারায় ভিন্নতা থাকতে পারে। এসব চিন্তা-গবেষণার ক্ষেত্রে কুরআনকে প্রমাণ স্বরূপ পেশ করা হলে স্পষ্ট বর্ণনার পর ঐ চিন্তা-গবেষণার দৃষ্টিভঙ্গি ভুল প্রমাণিত হবে। অর্থাৎ কুরআনের অর্থ ভুল মনে হবে (নাউযুবিল্লাহ)। ফলে তা মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি হবে। হে ভাই সকল! তোমরা কুরআনের ঐ বর্ণনায় মনোযোগ দাও যা ইবাদত ও আচার-ব্যবহারে মানুষের উপকারে আসবে। এজন্য কুরআনে সূক্ষ্ম ও
গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে। যেমন: পানাহার, উঠাবসা ও প্রবেশ করা প্রভৃতির বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু বস্তুগত জ্ঞান কি সব কিছুর নিয়ম-কানুনে কাজে আসবে? এ জন্য আমি মনে করি, বিজ্ঞান সংক্রান্ত বিষয়ে নিয়োজিত থাকার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোনিবেশ করা দরকার। আর ইবাদত বাস্তবায়ন করাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কারণেই কুরআন নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُون} [الذاريات: ٥٦] .
আমি জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার 'ইবাদত করবে (সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৬)।
বস্তুবাদী জ্ঞানীরা যে বিষয়ে উপনিত হয় সে ব্যাপারে আমাদেরকে ভেবে দেখতে হবে। যদি তারা হিদায়াতের জ্ঞান পেয়ে থাকে, আল্লাহকে ভয় করে এবং ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তারা আল্লাহভীরু মুসলিম আলিম হিসাবেই গণ্য হবে। আর যদি কুফরীর উপরই অবিচল থাকে এবং বলে যে, এ পৃথিবী সৃষ্ট। প্রথমে ঈমানের কথা থেকে বের হয়ে যাওয়ার কারণে এ কথা তাদের কোন কাজে আসবে না। কারণ প্রত্যেকেই জানে যে, পৃথিবী সৃষ্ট। এখানে তিনটি কথা আছে পৃথিবী নিজেই সৃষ্ট অথবা হঠাৎ করে তার অস্তিত্ব হয়েছে অথবা স্রষ্টা তা সৃষ্টি করেছেন। আর তিনিই হলেন আল্লাহ তা'আলা। সুতরাং এমনিতেই পৃথিবী সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব। কেননা, কোন জিনিস নিজে নিজে সৃষ্টি হতে পারে না। কারণ পূর্বে কোন বস্তুর অস্তিত্ব ছিল না। তাহলে কিভাবে কোন বস্তু নিজে নিজে সৃষ্টি হবে? আর হঠাৎ করে পৃথিবী সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব। কারণ প্রত্যেক সৃষ্টির জন্য একজন স্রষ্টা আবশ্যক।
৪০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে গণিতশাস্ত্র শিক্ষা দেয়া কি বৈধ? এতে কি কোন প্রতিদান আছে নাকি নেই?
জবাবে শাইখ বলেন, মুসলিমদের পারিপার্শ্বিক জীবনে গণিতশাস্ত্র উপকারে আসলে এবং কেউ এর মাধ্যমে মানুষের উপকারের নিয়্যাত করলে তার নিয়্যাত অনুযায়ী তাকে প্রতিদান দেয়া হবে। কিন্তু এটা শারঈ জ্ঞানের মত নয়। এটা মুবাহ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত মাধ্যম হতে পারে। কেননা, শরীয়তে মুবাহ বিষয়ের নিয়ম ব্যাপকতর। কোন বৈধ বস্তু বা বিষয় কখনো হারাম, কখনো মাকরূহ আবার কখনো মুসতাহাব এবং ওয়াজিব বলে গণ্য হয়।
উদাহরণ স্বরূপ বলবো, ব্যবসার মৌলিকত্ব হচ্ছে তা হালাল। কিন্তু তা কখনো মাকরূহ হয়ে থাকে। কেউ তার জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য তোমার কাছ থেকে
খাদ্যপানীয় ক্রয় করতে চাইলে এ ক্ষেত্রে বিক্রয়ের হুকুম কি? এক্ষেত্রে তা ওয়াজিব। আর কেউ মদ তৈরীর জন্য তোমার কাছ থেকে আঙ্গুর ক্রয় করতে চাইলে এ ক্ষেত্রে তা বিক্রয় হারাম। আবার কেউ উযূর জন্য পানি ক্রয় করতে চাইলে তা বিক্রি করা ওয়াজিব। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে আমি বলবো, যখন কোন বৈধ বিষয় শরী'আত সম্মত কোন কাজের মাধ্যম হয় তখন তা শরী'আত সম্মত বলেই গণ্য হয়। আর হারাম কাজের মাধ্যম হলে তা হারাম বলেই গণ্য হয়।
৪১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কতিপয় ছাত্র চিকিৎসক হতে চায় এবং অন্যান্য জ্ঞান অর্জন করতে ইচ্ছুক। কিন্তু এখানে অন্যান্য বিষয় যুক্ত হওয়ার প্রতিবন্ধকতা আছে এবং শিক্ষার উদ্দেশ্যে বহিঃদেশে ভ্রমণের বৈধতা আছে কি? ঐ সব ছাত্রদের ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, চিকিৎসা বিদ্যা শিক্ষার জন্য ঐ সব যুবকদের আমার পরামর্শ রইলো। কেননা, আমাদের দেশে চিকিৎসকের প্রবল চাহিদা আছে।
কতিপয় শর্তসাপেক্ষে কাফিরদের রাষ্ট্রে ভ্রমণ করা বৈধ মনে করি, আর তা হলো প্রথম: মানুষ যে জ্ঞান অর্জন করবে তার মাধ্যমে সন্দেহ নিরসন করতে হবে। কেননা, কাফিররা চায় মুসলিমদের সন্তানদের মাঝে সন্দেহ প্রবেশ করুক। এভাবে তাদের দীন থেকে কাফিররা তাদেরকে বিচ্যুত করে।
দ্বিতীয়: দীনের জ্ঞান ও আমলের মাধ্যমে কু-প্রবৃত্তিকে দমন করতে হবে, দুর্বল কোন দীনের প্রতি ধাবিত হওয়া যাবে না। নচেৎ কু-প্রবৃত্তি জয় লাভ করবে আর এটা ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিবে।
তৃতীয়: যে বিষয়ে পড়তে ইচ্ছুক ঐ নির্দিষ্ট বিষয় ইসলামী রাষ্ট্রে না থাকলে কাফির রাষ্ট্রে ভ্রমণের প্রয়োজন হতে পারে।
এ তিনটি শর্ত বাস্তবায়ন হলেই ভ্রমণ করা যেতে পারে। এর কোন একটি ভঙ্গ হলে ভ্রমণ করবে না। কেননা, অন্য সব কিছুর চেয়ে দীনের সংরক্ষণই গুরুত্বপূর্ণ।
৪২. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আরবী ভাষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তা শিক্ষা করা হতে অনেক শিক্ষার্থী মুখ ফিরিয়ে নেয়। এরূপ হওয়ার কারণ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, হ্যাঁ, আরবী ভাষা বুঝা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হোক তা قواعد الإعراب তথা শব্দের শেষে ই’রাব (কারক চিহ্ন) প্রদানের নিয়ম-পদ্ধতি অথবা قواعد البلاغة (অলংকার শাস্ত্রীয় নিয়ম)। সবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আল-হামদুলিল্লাহ আমরা মূলত আরব জাতি। তাই قواعد اللغة العربية ব্যতিত অন্য কিছু শিক্ষা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব। কিন্তু মানুষের উচিত হবে আরবী ভাষার নিয়ম-পদ্ধতি পরিপূর্ণভাবে শিক্ষা করা। তাই আরবী ভাষার সব নিয়ম-কানুন শিক্ষা করার প্রতি আমি শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করবো।
৪৩. শাইখের কাছে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, কোনটি উত্তম কাজ: আল্লাহর দিকে দাওয়াতের জন্য বের হওয়া নাকি ইলম অর্জন করা?
শাইখের জবাব হচ্ছে, ইলম অর্জনের জন্য বের হওয়াই উত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আর ইলম অর্জন অবস্থায় দাওয়াত দেয়া শিক্ষার্থীর জন্য সম্ভব। আর ইলম ছাড়া আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়াও সম্ভব নয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন, {قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَة} [يوسف: ١٠٨] বল, এটা আমার পথ, আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও (সূরা ইউসূফ ১২:১০৮)।
সুতরাং বলি, কিভাবে ইলম ছাড়া দাওয়াত দেয়া সম্ভব? তাই ইলম ব্যতিত কেউ কখনোই দাওয়াত দিতে পারে না। আর যারা ইলম ছাড়া দাওয়াত দেয় তারা সফলতা লাভ করতে পারে না।
৪৪. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, ইলমের আপদ হচ্ছে ভুলে যাওয়া; এমন কোন বিষয় বা পদ্ধতি আছে কি যা অনুসরণে ইলম সংরক্ষিত হয়?
জবাবে শাইখ বলেন, জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ পথ খুঁজে পায়। আল্লাহ তা’আলা বলেন, {وَالَّذِينَ اهْتَدَوْا زَادَهُمْ هُدًى وَآتَاهُمْ تَقْوَاهُمْ} [محمد: ۱۷] যারা হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছে আল্লাহ তাদের হেদায়াত প্রাপ্তি আরো বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে তাদের তাকওয়া প্রদান করেন (সূরা মুহাম্মদ ৪৭:১৭)।
ইলম অর্জনের চিন্তা-ভাবনা নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। বারবার মুখস্থ ও পর্যালোচনা করতে থাকবে। যে কোন আমলের ক্ষেত্রে হুকুম ও দলীল বের করে তা সম্পন্ন করবে। কেবল অবসরে ইলম অর্জন করবে না। এ কারণে আলিমগণ বলেন, তোমাকে অল্প জ্ঞান দান করা হলে তুমি এর সবটুকুই দান করো। আর তোমাকে কিছুই দেয়া না হলে তুমি অল্প দান করো। সুতরাং রাত-দিন সব সময় তুমি ইলম অর্জনে নিয়োজিত থাকো। তুমি যা জানো তা পর্যালোচনা করে আমল করো এবং সমতা বজায় রাখো। এভাবেই ইলম স্থায়ী হয়।
৪৫. শাইখের নিকট আমার প্রশ্ন হচ্ছে, যে সব শিক্ষার্থী ইলম অর্জনে অবহেলা করে এবং ইলম অর্জনে চেষ্টা-সাধনায় রত না থাকায় তাদের উপর এর কু-প্রভাব রয়েছে কি? এ ব্যাপারে আপনার দিক-নির্দেশনা কি?
জবাবে শাইখ বলেন, ছাত্রদের উচিত হবে ইলম অর্জনে সর্বাধিক চেষ্টা বজায় রাখা। যাতে তারা দৃঢ়তার সাথে ইলম অর্জনে সক্ষম হয়। জ্ঞানার্জনের গভীরে পৌঁছতে পারে। তা এভাবে সম্ভব যে, তারা অল্প অল্প করে জ্ঞানার্জনে চেষ্টা করবে। ফলে জ্ঞানার্জন তাদের জন্য সহজ হবে এবং গভীরতর জ্ঞানার্জনে সক্ষম হবে আর ইলম অর্জনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে। হে শিক্ষার্থীরা! তোমরা ইলম অর্জনে অবহেলা করলে এবং অমনোযোগী হলে সময় তোমাদের জন্য অপেক্ষা করবে না। চর্চা না করায় পঠনে জটিলতা সৃষ্টি হবে। এরূপ হলে ইলম অর্জনের চিন্তা-ভাবনায় তোমরা হবে অক্ষম। ফলে অনুশোচনা তোমাদের কোন কাজেই আসবে না।
৪৬. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, যারা শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত তাদের জন্য আপনার দিক-নির্দেশনা কি যার দ্বারা তারা উপকৃত হতে পারে?
জবাবে শাইখ বলেন, আমরা বলবো, শিক্ষা দানের সাথে সম্পৃক্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শিক্ষকরা ছাত্রদের এমন জ্ঞান দান করেন যা তাদের অন্তরে স্থায়ী হয়। ছাত্রদের সামনে আসার পূর্বে এবং তাদের প্রশ্ন ও পর্যালোচনা ছাড়া কোন শিক্ষকই কর্তব্যবোধ বুঝে উঠবে না। জ্ঞান ও তত্ত্ববধানের দিক থেকে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষকই ছাত্রদের নিকট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জ্ঞানের দিক শক্তিশালী হলে একজন শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তার দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে শক্তিশালী বলা সঙ্গত নয়। কেননা, শিক্ষকের পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকলে ছাত্রদের প্রশ্নের উত্তর দানে জটিলতার সৃষ্টি হবে। যদি উত্তর ভুল হয় তাহলে ছাত্ররা পরবর্তীতে তার উপর নির্ভর করবে না। শিক্ষক যদি ছাত্রদের প্রশ্ন উপেক্ষা করেন তাহলে কখনোই তারা ঐ শিক্ষকের সাথে সিদ্ধান্তে একমত হবে না।
এজন্য শিক্ষকের উচিত প্রস্তুত থাকা, উদ্বেগ গ্রহণ করা, দায়িত্ব বুঝে নেয়া এবং ধৈর্যশীল হওয়া। শিক্ষক ছাত্রের প্রশ্নের মুখোমুখী হলে তিনি যদি গভীর জ্ঞানী হন তাহলে সহজেই উত্তর দিতে সক্ষম হবেন। নচেৎ হিতে বিপরীত হবে।
৪৭. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, কোন শিক্ষার্থী আল্লাহর রাস্তায় ইলম অর্জনের জন্য তার সঙ্গীদের সাথে বের হতে চায়। কিন্তু বের হওয়ার মাঝে তার প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে তার পরিবার, পিতা-মাতা ইত্যাদি। এক্ষেত্রে ইলম অর্জনের জন্য বের হওয়ার হুকুম কি?
জবাবে শাইখ বলেন, যদি তাদের নিকট অবস্থান করাই ঐ শিক্ষার্থীর জন্য আবশ্যক হয় তাহলে থেকে যাওয়াই উত্তম। অবশ্য তাদের সাথে অবস্থান করেও ইলম অর্জন সম্ভব। কেননা, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের চেয়ে পিতা-মাতার খেদমত অগ্রগণ্য। আর জ্ঞানার্জন জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। পিতা-মাতা সন্তানের অভিমুখী হলে তাদের খেদমতই হবে অগ্রগণ্য। আর এমনটা না হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইলম অর্জনের জন্য সন্তানের বের হওয়াতে অসুবিধা নেই। পিতা-মাতার দিকে খেয়াল রাখা ও সাথে থাকা হচ্ছে তাদের হক্ব। এটা যেন সন্তান ভুলে না যায়। আর শারঈ জ্ঞানার্জনে পিতা-মাতার অনিহা থাকলে সেক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য নেই। এ জ্ঞানার্জনের জন্য বের হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অনুমতির প্রয়োজন নেই। কেননা, শারঈ জ্ঞানার্জনে তাদের অনিহা আছে।
৪৮. শাইখের নিকট প্রশ্ন হলো, আলিম ছাড়াই শুধু কিতাব পড়ে ইলম অর্জন বৈধ কি? বিশেষত যখন আলিমদের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ইলম অর্জন কঠিন হয়ে যায়। আর যখন কেউ বলে যে, কিতাবই যার শাইখ হয় সে সঠিকতায় পৌঁছতে বেশি ভুল করে। এ ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, নিঃসন্দেহে আলিমদের শরণাপন্ন হয়ে এবং কিতাবাদী পাঠ করে উভয় পন্থায় ইলম অর্জন করবে। কেননা, আলিমের কিতাবই যেন স্বয়ং আলিম। আলim তার কিতাব হতেই তোমাকে পাঠদান করবে। যদি সরাসরি আলিমের নিকট ইলম অর্জনে প্রতিবন্ধকতা থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে কিতাব হতেই ইলম অর্জন করবে। তবে কিতাব পাঠ করে ইলম অর্জনের চেয়ে সরাসরি আলিমের কাছ থেকে ইলম অর্জনের পন্থাই উত্তম। কেননা, কিতাব পাঠ করত যারা ইলম অর্জন করে তাদেরকে বেশি পরিশ্রম করতে হয় এবং অত্যাধিক চেষ্টা-সাধনায় নিয়োজিত থাকতে হয়। এ সত্ত্বেও কিছু বিষয় তাদের নিকট অস্পষ্ট থেকে যায়। যেমন আলিমগণ ও রক্ষণশীল পন্ডিতেরা শরী'আতের নিয়ম- পদ্ধতি সুবিন্যস্ত করেন। তাই সম্ভবপর আলিমগণের দিকে প্রত্যাবর্তন করাই
শিক্ষার্থীর জন্য আবশ্যক। অপরদিকে যারা প্রমাণ স্বরূপ বলে যে, কিতাব পাঠ করে ইলম অর্জন করলে বেশি ভুল হয়, তাদের একথা সঠিক নয়। আবার অগ্রহণযোগ্যও নয়। কেননা, যারা কেবল কিতাব হতে ইলম অর্জন করে তারা সন্দেহ মূলক বেশি ভুল দেখতে পায়। তবে যারা বিশস্ততা, আমানাত ও ইলমের দিক হতে প্রসিদ্ধ বলে গণ্য তাদের কিতাব পাঠ করত ইলম অর্জন করলে ভুল বেশি হওয়ার সম্ভবনা নেই। বরং তারা যা বলেছেন তার অধিকাংশই সঠিক বলে বিবেচিত।
৪৯. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, জ্ঞানগত নতুন চিন্তাধারার আলোকে কুরআনের তাফসীর করা বৈধ হবে কি?
জবাবে শাইখ বলেন, জ্ঞানগত চিন্তাধারার আলোকে তাফসীর করা মারাত্মক অন্যায়। এ চিন্তাধারায় তাফসীর করলে এর বিপরীত মতবাদ সৃষ্টি হবে। সুতরাং এ অবস্থায় ইসলামের শত্রুদের চোখে কুরআন অশুদ্ধ বলে গণ্য হবে। অপরদিকে মুসলিমদের দৃষ্টিতে এ তাফসীরের ব্যাপারে তাদের কথা হলো, কল্পনা প্রসূত যারা কুরআনের তাফসীর করেন তাদের তাফসীর ভুল বলে গণ্য। ইসলামের শত্রুরা এর মাধ্যমে গোলযোগ সৃষ্টির ইচ্ছা করে। এজন্য এধরনের জ্ঞানগত তাফসীরের ব্যাপারে চুড়ান্ত পর্যায়ে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। যাতে অপব্যাখ্যারোধ করতে পারি। তাফসীরের আলোকে বাস্তবে কোন বিষয় সাব্যস্ত হলেও এটা বলার প্রয়োজন নেই যে, কুরআনের মাধ্যমে তা সাব্যস্ত হয়েছে। মূলত আল্লাহর ইবাদত, চরিত্রগঠন ও চিন্তা-গবেষণার জন্যই কুরআন নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لَيَدبروا آياته وليتذكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ} [ص: ٢٩]
আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে (সূরা দ্বাদ ৩৮:২৯)।
অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের মাধ্যমে তাফসীর করা হলে তা তাফসীর হিসাবে গণ্য হবে না। এটা হবে কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্যের বিপরীতে গুরুতর মারাত্মক ভুল। এ ব্যাপারে কুরআনে দৃষ্টান্ত রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِن استطعتُم أَنْ تَنفُذُوا مِنْ أَقْطَارِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ فَانْفُذُوا لَا تنفذون إلا بِسُلْطَان} [الرحمن: ٣٣]
হে জিন ও মানবজাতি, যদি তোমরা আসমানসমূহ ও যমীনের সীমানা থেকে বের হতে পারো, তাহলে বের হও। কিন্তু তোমরা তো (আল্লাহর দেয়া) শাক্তি ছাড়া বের হতে পারবে না (সূরা আর-রহমান ৫৫:৩৩)।
মানুষ যখন চাঁদের মাটিতে পা রাখলো তখন কতিপয় মুফাস্সির এ আয়াতের তাফসীর করে যে, যা কিছু ঘটে সে ব্যাপারেই আয়াতটি নাযিল হয়েছে। তারা বলে, এখানে السلطان শব্দ দ্বারা ইলম-জ্ঞান উদ্দেশ্যে। আর মানুষ তাদের জ্ঞান ব্যবহার করে পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে এবং মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অতিক্রম করেছে। এটা ভুল ব্যাখ্যা। এভাবে কুরআনের তাফসীর করা বৈধ নয়। এভাবে তাফসীর করা হলে প্রেক্ষাপট তৈরি হবে যে, আল্লাহ তা'আলা এটাই ইচ্ছা করেছেন। এ অবস্থায় বিপরীত তাফসীর বৃহত্তর স্বীকৃতি হিসাবে গণ্য হলে এ ব্যাপারে জবাবদিহী করতে হবে। মূলত আয়াতটি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে দেখা যাবে তা বাতিল-পরিত্যাজ্য তাফসীর। কেননা, আয়াতটি মানুষের অবস্থাদী ও তাদের কর্মের শেষ পরণতি সম্পর্কে নাযিল হয়। যেমন সূরা আর-রহমানের নিম্নের আয়াতের মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَإِن وَيَبْقَى وَجْهُ رَبُّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ} [الرحمن: ٢٦ - ٢٨] .
যমীনের উপর যা কিছু রয়েছে, সবই ধ্বংশশীল। আর থেকে যাবে শুধু মহামহিম ও মহানুভব তোমার রবের চেহারা। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের রবের কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে? (সূরা আর-রহমান ৫৫:২৬, ২৭,২৮)।
আমরা ঐ সকল মানুষের কাছে জানতে চাই তারা কি আকাশ রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে যেতে পারবে? এর জবাব হচ্ছে, পারবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {إِن استطعتُم أَنْ تَنفُذُوا مِنْ أَقْطَارِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ} [الرحمن: ٣৩] .
যদি তোমরা আসমানসমূহ ও যমীনের সীমানা থেকে বের হতে পারো, তাহলে বের হও (সূরা আর-রহমান ৫৫:৩৩)।
দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের প্রতি অগ্নিশিখা ও কালো ধোঁয়া (বাধা স্বরূপ) প্রেরণ করা হয়েছে কি?
জবাব হচ্ছে, প্রেরণ করা হয়নি। কেননা, ঐসব মুফাস্সির যে তাফসীর করে তা সঠিক নয়। আমরা বলবো, তারা যে বিষয়ে উপনিত হয়েছে তা কেবল তাদের
অভিজ্ঞতার আলোকেই সম্ভব হয়েছে যা অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। কুরআনের ভাব উদ্ঘাটনের জন্য আমরা যে বিকৃত অর্থ গ্রহণ করছি তা সঠিক নয়, বৈধ নয়।
৫০. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষের কথার উপর নির্ভর করা ছাত্রদের জন্য ভুল যা ক্ষতিকর। কোন মতামত গ্রহণ অথবা নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণ ব্যতীতই কি তারা পাঠ বুঝবে? বিধি-বিধান সম্পর্কিত সমস্যা সৃষ্টি হবে কিনা?
জবাবে শাইখ বলেন, মানুষ যদি নির্দিষ্ট মাযহাবকে এ উদ্দেশ্যে গ্রহণ করে যে, তার নিজের অথবা অন্য কোন মাযহাবে সঠিক বিষয় থাকলে সে তার মুখাপেক্ষী নয়। অবস্থা এমন হলে মাযহাবের অনুসরণ করা বৈধ হবে না। আমি এটা সমর্থন করি না। তবে উপকৃত হওয়ার প্রত্যাশায় মানুষ কোন নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসরণ করতে চাইলে ঐ মাযহাবের নিয়ম-পদ্ধতি ও রীতি কুরআন-সুন্নাহর সাথে মিলাতে হবে। এক্ষেত্রে যদি অন্য মাযহাবের অগ্রাধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তাহলে ঐ মাযহাবের সঠিক বিষয় গ্রহণ করবে। এতে অসুবিধা নেই। মুহাক্কিক আলিম যেমন: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) এবং অন্যান্যরা এ নীতিই অবলম্বন করেছেন। তাদেরও নির্দিষ্ট মাযহাব ছিল। কিন্তু সঠিক দলীল স্পষ্ট হলে তারা ঐ দলীল-প্রমাণের বিরোধীতায় লিপ্ত হননি, বরং তা গ্রহণ করেছেন।
৫১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, "كل أمر ذي بال لم يبدأ ببسم الله" অর্থাৎ যে কাজে বিসমিল্লাহ বলা হয়নি তা অসম্পূর্ণ। ৫৯। এটা কি জ্বহীহ হাদীছ? আলিমগণের কিতাবে এটা বেশি বেশি উল্লেখ হতে দেখা যায়। কারণ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, এ হাদীছের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে আলিমগণের মতামত আছে। কতিপয় বিদ্বান এটাকে জ্বহীহ ও নির্ভরযোগ্য বলেছেন। যেমন: ইমাম নববী। আর কতিপয় আলিম বলেছেন, এটা দ্বঈফ। তবে হাদীছটি গ্রহণের ব্যাপারে আলিমগণ একমত। এজন্য তাদের কিতাবে হাদীছটি উল্লেখ করেছেন। আর প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে বিsmillah পাঠ করা অথবা শুরুতে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করা উচিত।
৫২. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে ইশার পর মানুষকে প্রশিক্ষণে লিপ্ত রাখা, দিক-নির্দেশনা দান করা এবং উপদেশ দেয়ায় কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের
জ্বলাত আদায় সম্ভব হয় না অথবা তাদেরকে থেকে বিচ্ছিন্ন হলে তাহাজ্জুদ আদায় পূর্ণ হয়, এ দু'টির মধ্যে কোনটি উত্তম?
জবাবে শাইখ বলেন, রাতের নফল ইবাদত বন্দেগীর চেয়ে ইলম অর্জনে লিপ্ত থাকা উত্তম। ইলম অর্জন সম্পর্কে ইমাম আহমদ (রহঃ) বলেন, "لا يعدله شيء لمن صحت نيته"
ইলম অর্জনের জন্য যে সঠিক নিয়্যাত করেছে কোন কিছুই তার সমপরিমাণ হবে না।
তার শিষ্যরা জিজ্ঞেস করলো, কিভাবে তা হয়? তিনি বলেন, শিক্ষার্থী নিজের এবং অন্যের অজ্ঞতা দূর করার জন্য নিয়্যাত করে। নিজে শিখা অথবা অন্যকে শিক্ষা দেয়ার কাজে মানুষ রাতের প্রথমাংশে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইলম অর্জনে লিপ্ত থাকে তাহলে ইলম অর্জনের এ রাতই তাদের জন্য উত্তম। রাত জেগে ইবাদত করা ও ইলম অর্জনে প্রতিযোগিতা হলে এক্ষেত্রে শারঈ জ্ঞান অর্জন করাই উত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে। এজন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু হুরাইরাহ (রাঃ)-কে তার ঘুমানোর আগে বিতর জ্বলাত আদায়ের নির্দেশ দেন। আলিমগণ বলেন, এর কারণ হলো, আবু হুরাইরাহ (রাঃ) রাতের প্রথমাংশে হাদীছ মুখস্থ করতেন এবং শেষাংশে ঘুমাতেন। অতঃপর নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ঘুমানোর আগে বিতর জ্বলাত আদায়ের নির্দেশ দেন।[৬০]
৫৩. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, যে সকল শিক্ষক বিশেষত দীনি ক্ষেত্রে ভুল করেন, তাদের ব্যাপারে আমার করণীয় কি? সঠিক জবাব পেতে আমি কি তার উপর নির্ভর করতে পারি?
জবাবে শাইখ বলেন, এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিছু শিক্ষক রয়েছেন যাদের দ্বারা ভুল সংঘটিত হলে তারা ঐ ভুলকে কারো জন্য ভুল হিসাবে গণ্য করতে চান না। এটা ঠিক নয়। মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। ভুল হওয়ার পর সতর্ক হলে তা আল্লাহর নিআ'মত হিসাবেই গণ্য। যাতে কেউ ঐ ভুলের কারণে প্রতারিত না হয়। ছাত্রদের বিচক্ষণতা বজায় রাখা উচিত। সকল শিক্ষার্থীর সামনে যেন কোন শিক্ষার্থী ঐ ভুলকারী শিক্ষককে প্রত্যাখ্যান না করে। তাহলে এটা হবে শিষ্টাচার বিরোধী কাজ। পাঠদান শেষে ঘটে যাওয়া ভুল সম্পর্কে শিক্ষককে অবগত করা।
যেতে পারে। শিক্ষক ভুল বুঝতে পারলে পাঠদানের সময় সরাসরি তিনি ছাত্রদের সামনে তা ব্যক্ত করবেন। আর যদি তিনি ভুল না বুঝেন তাহলে পাঠদানের সময় ছাত্ররা তা স্বরণ করিয়ে দিবে। তা এভাবে যে, ছাত্র বলবে, হে শিক্ষক! আপনি এটা এটা বলেছেন অথচ এটা ঠিক নয়।
৫৪. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, ক্লাশে অথবা বাইরে অমুসলিম শিক্ষককে সালাম দেয়া বৈধ হবে কি?
জবাবে শাইখ বলেন, নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূত্রে বর্ণিত হাদীছে তিনি বলেন,
"লা تبدءوا اليهود والنصارى بالسلام " তোমরা ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের আগে বাড়িয়ে সালাম করো না।[৬১] রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পাশ দিয়ে ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানরা অতিক্রম করার সময় বলতো السام عليكم السلام অর্থ হলো তোমার মৃত্যু হোক। তাদের প্রতিউত্তরে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে وعليكم বলতে শিক্ষা দিলেন। অর্থাৎ তোমাদের উপরও।[৬২] সুতরাং তোমরা আগ বাড়িয়ে সালাম দিও না। যখন অমুসলিম আগ বাড়িয়ে সালাম দিবে তখন وعليكم বলে তোমরা উত্তর দিবে। ইবনুল কাইয়্যিম (في أحكام أهل الذمة ) আহলু যিম্মার বিধি-বিধান সংক্রান্ত পরিচ্ছেদে উল্লেখ করেন যে, আমরা যদি বুঝতে পারি যে, কাফিররা السلام عليكم বলেছে, তাহলে আমরা وعليكم السلام বলে জবাব দিবো।
৫৫. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, মুসলিমদের উপকার সাধনে আমার সামনে অনেক জ্ঞানগত অনুষদ আছে, আমি ঐ সব অনুষদের কোনটিতে ভর্তি হবো নাকি শারঈ কোন অনুষদে ভর্তি হবো?
জবাবে শাইখ বলেন, আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ে দীনি অনুষদে ভর্তি হওয়াই উত্তম। তবে অন্যান্য অনুষদে অল্প সংখ্যক ছাত্র ভর্তি হতে পারে। বিশেষত
যাদের দীনি বিষয় অধ্যয়নের উৎসাহ রয়েছে তাদের জন্য শারঈ অনুষদে ভতি হওয়াই উত্তম।
৫৬. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ফাতওয়া হতে আলিমদের ক্ষ্যান্ত হওয়ার কারণ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, ফাতওয়া দানে সক্ষম এমন আলিম ফাতওয়া থেকে বিরত থাকে অথচ তার ফাতওয়া প্রদানের উপর জ্ঞান রয়েছে। ঐ আলিমের নিকট দলীলের বৈপরীত্যে পরিলক্ষিত হওয়ার কারণে তিনি বিরত থাকতে পারেন। কখনো ঐ আলিমের এ ধারণা হতে পারে যে, কোন মুফতির ফাতওয়ায় প্রতারণা রয়েছে। কেননা, এমন কতিপয় মুফতি আছে যারা হক্বের উদ্দেশ্যে ফাতওয়া প্রদান করে না। এসব মুফতি ফাতওয়া নিয়ে ছলনা করতে চায়। তাই এ বিষয়টি দু'একজন করে সব ফাতওয়া দানকারী হক্বপন্থী আলিমের দৃষ্টিগোচর হয়। ফলে তারা ফাতওয়া থেকে বিরত থাকে অথবা প্রশ্নকারীর জবাব দান থেকে মুখফিরিয়ে নেয় অথবা তার এটা প্রবল ধারণা রয়েছে যে, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি যাচাইয়ের জন্য মুফতি ফাতওয়া নিয়ে ছলনা করতে পারে। অথবা সে কতিপয় মানুষের কথাকে দৃষ্টান্ত হিসাবে পেশ করতে চায়। এটাই সবচেয়ে মারাত্মক। ঐ প্রতারক মুফতি এ ছলনাময় পন্থা অবলম্বন করে বলে, অমুক অমুক আলিম এটা এটা বলেছেন। একারণে হয়তো হক্বপন্থী আলিম ফাতওয়া থেকে বিরত থাকেন।
৫৭. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, কিছু মানুষ ইলম ছাড়াই ফাতওয়া প্রদান করে তাদের ব্যাপারে হুকুম কি?
জবাবে শাইখ বলেন, এ ধরনের কাজ মারাত্মক ক্ষতিকর ও মহা অন্যায়। ইলম ছাড়া কথা বলার কারণে আল্লাহর সাথে শিরক স্থাপন করা হয় এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُনَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ} [الأعراف:
[৩৩
বল, আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর উপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না (সূরা আল-আরাফ ৭:৩৩)।
আয়াতের ভাষ্যে আল্লাহ তা'আলার সত্তা, তার গুণাবলী, তার কর্মসমূহ ও শারঈ বিষয়াদী অন্তর্ভুক্ত। শারঈ কোন বিষয় নিশ্চিত না জানা পর্যন্ত ঐ ব্যাপারে ফাতওয়া প্রদান করা কারো জন্য বৈধ নয়। আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাহর নছে (মূলপাঠে) যা বুঝানো হয়েছে তা দক্ষতা ও মেধা দ্বারা সঠিকভাবে বুঝা সম্ভব হলে ফাতওয়া দেয়া যেতে পারে। আর মুফতি হচ্ছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষণাকারী ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পক্ষ থেকে প্রচারকারী মাত্র। মুফতি যদি এমন কোন কথা বলেন যা তিনি জানেন না অথবা দলীল নিয়ে চিন্তা-ভাবনা, ইজতেহাদ ও গবেষণার পর যে ব্যাপারে তার প্রবল ধারণা নেই ঐ বিষয়ে কথা বললে তা আল্লাহ ও তার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিরোধী হবে এবং তা জ্ঞানহীন কথা হিসাবেই গণ্য হবে। এভাবে বলার কারণে শাস্তি ধার্য হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِالْحَقِّ لَمَّا جَاءَهُ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى للكافرين} [العنكبوت: ٦٨] .
আর সে ব্যক্তির চেয়ে যালিম আর কে, যে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে অথবা তার নিকট সত্য আসার পর তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে? জাহান্নামের মধ্যেই কি কাফিরদের আবাস নয়? (সূরা আল আনকাবুত ২৯:৬৮)
৫৮. শাইখের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, কুরআন হিফয করার কোন দু'আ আছে কি? আর কুরআন হিফয করার পদ্ধতি কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, একটি হাদীছ ছাড়া কুরআন হিফয করার কোন দু'আ আমার জানা নেই। নাবী দ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি আলী ইবনে আবি তালেব (রাঃ) কে দু'আ শিখিয়ে দেন। [৬৩] হাদীছটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে কথা রয়েছে। ইবনে কাছির (রহঃ) বলেন, হাদীছটি স্পষ্ট গরিব এবং মুনকারও বটে। ইমাম যাহাবী (রহঃ) বলেন, হাদীছটি منکر شاذ (মুনকার শায)। তবে হিফয করার পদ্ধতি হচ্ছে মানুষ হিফয অব্যাহত রাখবে। এক্ষেত্রে দু'টি পদ্ধতি আছে।
প্রথমত: যথাসম্ভব একটি অথবা দু'তিনটি করে আয়াত মুখস্থ করবে। দ্বিতীয়ত: একটি করে পৃষ্ঠা মুখস্থ করা যেতে পারে।
মানুষ বিভিন্নভাবে কুরআন মুখস্থ করে। কতিপয় মানুষ একটি করে পৃষ্ঠা মুখস্থ করা উত্তম মনে করে যতক্ষণ মুখস্থ না হয় তা পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। আবার কেউ একটি করে আয়াত মুখস্থ করে তা বারবার পড়তে থাকে অতঃপর তা মুখস্থ হলে অন্য আয়াত মুখস্থ করতে থাকে। এভাবেই মুখস্থ পূর্ণ হতে থাকে। প্রথম অথবা দ্বিতীয় পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত হবে। ভালভাবে মুখস্থ না হওয়া পর্যন্ত অন্য আয়াত বা পৃষ্ঠা মুখস্থ করবে না। প্রতিদিন সকালে নির্দিষ্ট অংশ মুখস্থ করার জন্য প্রস্তুতি নেয়া উচিত। ঐ নির্দিষ্ট অংশ মুখস্থ হলেই নতুন পাঠ মুখস্থ আরম্ভ করবে।
৫৯. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আমি শারঈ জ্ঞানার্জন করতে ইচ্ছুক। আমি তা শুরু করতে চাই কিন্তু কিভাবে তা শুরু করবো এ ব্যাপারে আমাকে আপনি কি উপদেশ দিবেন?
জবাবে শাইখ বলেন, শিক্ষার্থীর জন্য উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে: (১) আল্লাহর কিতাব বুঝার জন্য নির্ভরযোগ্য তাফসীর অধ্যয়ন শুরু করবে। যেমন: তাফসীর ইবনে কাছির ও তাফসীরে বাগাভি। (২) অতঃপর নির্ভরযোগ্য জ্বহীহ হাদীছ অধ্যয়ন করবে। যেমন: বুলুগুল মারাম, মুনতাক্বি এবং আবশ্যকীয় জ্বহীহ হাদীছের মূল কিতাবসমূহ। যেমন: ছুহীহ বুখারী, জ্বহীহ মুসলিম। (৩) সঠিক আক্বীদার কিতাবসমূহও অধ্যয়ন করবে। যেমন: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) রচিত আক্বীদা আল-ওয়াসেত্বীয়া। (৪) অতঃপর ফিক্বহের সংক্ষিপ্ত কিতাবসমূহ অধ্যয়ন করবে যাতে কুরআন-সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী মাযহাবের মাসআলাসমূহ বুঝা যায়। এরপর গভীর জ্ঞানার্জনের জন্য বিস্তারিত ব্যাখ্যামূলক কিতাব অধ্যয়ন করবে যাতে ইলম বৃদ্ধি পায়।
৬০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আমল পরিত্যাগ করে ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে বের হওয়া কারো জন্য বৈধ হবে কি যাতে সে তার পিতা-ভাই পরিবারের জন্য মর্যাদার কারণ হয়?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, নিঃসন্দেহে আমলের চেয়ে ইলম অর্জন করা উত্তম। বরং এটা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে ইসলামী সমাজে বিদ'আত প্রকাশ পেয়েছে, তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে এবং দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
যারা ইলম ছাড়া ফাতওয়া দেয় তাদের মাঝে রয়েছে অনেক অজ্ঞতা। আর অনেক মানুষ বিতর্কে লিপ্ত হচ্ছে। নিচের তিনটি বিষয়ে নবীন শিক্ষার্থীদেরকে উৎসুক হতে বাধ্য করা হচ্ছে।
প্রথমত: নিকৃষ্ট বিদ'আত প্রকাশ পাওয়া।
দ্বিতীয়ত: ইলম ছাড়াই কতিপয় মানুষের ফাতওয়া প্রদান করা।
তৃতীয়ত: কখনো আলিমদের নিকট স্পষ্ট এমন বিভিন্ন মাসআলা নিয়ে বেশি বেশি তর্কে লিপ্ত হওয়া। আর যে বিষয়ে তর্ক করা হয় ঐ ব্যাপারে ইলম ছাড়াই ফাতওয়া দেয়া।
এ প্রেক্ষিতে আমাদেরকে এমন আলিমের শরণাপন্ন হতে হবে যাদের রয়েছে পর্যবেক্ষণের যথার্থ গভীর জ্ঞান এবং আল্লাহর দীন সম্পর্কে সুক্ষ্ম বুঝ। আর রয়েছে আল্লাহর বান্দাদেরকে দিক-নির্দেশনা দানে হিকমত-প্রজ্ঞা। কেননা, বর্তমানে অনেকেই কোন মাসআলা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে চলেছে। অথচ মস্তিষ্ক প্রসূত চিন্তাধারার জ্ঞান মানুষের সংশোধন ও প্রশিক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইলম ছাড়া এভাবে ফাতওয়া দেয়া মারাত্মক অনিষ্ট সাধনের মাধ্যম বলে গণ্য হয় যার অনিষ্টতার সীমারেখা আল্লাহ ব্যতিত কারো জানা নেই। শিক্ষার জন্য ছাহাবীগণ কখনো এমন বিষয় পালন করতে বাধ্য হতেন যা নছ দ্বারা আবশ্যকতা বুঝায় না। উমার ইবনে খাত্তাব (রা.) তিন তালাক্ব সম্পন্ন করা আবশ্যক করেন। রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে, আবু বকর (রা.) এর শাসনামলে ও উমার (রা.) এর খিলাফতকালে প্রথম দু'বছর পর্যন্ত তিন তালাক্ব এক তালাক্ব হিসাবে সাব্যস্ত হতো। কিন্তু একই বৈঠকে তিন তালাক্ব দেয়া হারাম। কেননা, এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার সীমারেখা অতিক্রম করা হয়। উমার (রা.) বলেন, আমি লোকদের দেখেছি যে, তারা একটি বিষয়ে অতি ব্যস্ততা দেখিয়েছে যাতে তাদের ধৈর্যের (ও সুযোগ গ্রহণের) অবকাশ ছিল। এখন যদি বিষয়টি তাদের জন্য কার্যকর সাব্যস্ত করে দেই (তবে তা-ই কল্যাণকর হবে)। সুতরাং তিনি তাদের জন্য বাস্তবায়ন ও কার্যকর সাব্যস্ত করলেন। [৬৪]
রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে, আবূ বকর (রা.) এর শাসনামলে ও উমার (রা.) এর খিলাফতকালে প্রথম দু'বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তিন
তালাকুকে তিন তালাক্ব হিসাবেই তিনি সাব্যস্ত করেন; এক তালাকু নয়। তিনি মানুষের জন্য পৃথকভাবে তিন তালাক্ব আবশ্যক করে দেন। প্রথম দু'যুগে এক তালাকের পর মানুষ যদি তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চাইতো তাহলে বিশুদ্ধ পন্থায় ফিরিয়ে নিতে পারতো। কিন্তু তিনি মনে করলেন যে, তিন তালাক্ব সম্পন্ন করাই ভাল এবং স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতেও তিনি মানুষকে নিষেধ করেন। নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে কাপড়ের এক পার্শ্বে খেজুরের ডাল দ্বারা চল্লিশ বেত্রাঘাত করে অথবা জুতা পিটিয়ে মদপানকারীকে শান্তি দেয়া হতো। আবূ বকর ও উমার ( এর যুগেও এরূপ করা হতো। মদপান বৃদ্ধি পেলে তিনি ছাহাবীদেরকে সমবেত করে তাদের কাছে পরামর্শ চান। আব্দুর রহমান ইবনে আওফ ( বলেন, সর্বনিম্ন শাস্তি হওয়া উচিত আশি বেত্রাঘাত। অতঃপর তিনি মদপানের শান্তি আশি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করেন।[৬৫] আসলে এসবই হলো মানুষকে সংশোধন করার বিধান। সুতরাং কোন মুসলিম অথবা মুফতি অথবা আলিমের উচিত হবে মানুষের অবস্থাদী নিরীক্ষণ করা এবং তাদের জন্য কল্যাণকর বিষয় ভেবে দেখা।
৬১. শাইখের কাছে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা কি দলীল নিয়ে পর্যালোচনা করত ইলম অর্জন করবে নাকি ইমামদের কোন মাযহাবের অনুসরণ করবে? এ ব্যাপারে আপনার মত কি?
জবাবে শাইখ (বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা ইলম অর্জনে যথাসম্ভব দলীল নিয়ে আলোচনা করতে পারে। এখানে দলীল খুঁজে পাওয়াই উদ্দেশ্য। ফলত দলীল অনুসন্ধানের উপর শিক্ষার্থীর অনুশীলন বজায় থাকবে এবং দলীল উপস্থাপনের পদ্ধতিও তারা জানবে। আর এভাবে তারা দেখে-শুনে দলীলসহ আল্লাহর দিকে অগ্রগামী হবে। বাধ্যগত অবস্থা ব্যতিরেকে কারো জন্য তাক্বলীদ করা বৈধ নয়। অবস্থা যদি এমন হয় যে, পর্যালোচনার পরও কোন সিন্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব হলো না। তাৎক্ষণিক নতুন কোন বিষয় জানার প্রয়োজনবোধ হলো কিন্তু চাহিদা শেষ হওয়ার আগে দলীলসহ হুকুম জানা সম্ভব হলো না; তাহলে এমতাবস্থায় তাক্বলীদ করা যেতে পারে, তবে দলীল স্পষ্ট হলে সে দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে। আর মুফতিদের মাঝে মতভেদ হলে কখনো বলা হবে, এটা উত্তম, এটা সহজ। এসব উক্তি আল্লাহ তা'আলার বাণীর সাথে সামঞ্জস্যতা রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ} [البقرة: ١٨٥]
আল্লাহ তোমাদের সহজ চান এবং কঠিন চান না (সূরা আল-বাক্বারা ২:১৮৫)।
আবার কখনো বলা হবে, এটা কঠিন হিসাবেই নেয়া হবে। কেননা, সন্দেহ ছাড়াই এতে সতর্কতা রয়েছে। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, "من اتقى الشبهات فقد استبرأ لدينه وعرضه".
যে সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকে সে মূলত তার দীন ও মান-ইজ্জতকেই রক্ষা করে। [৬৬]
সুতরাং প্রবল ধারণায় কোন বিষয় সঠিকতার অধিক নিকটবর্তী হলে ঐ বিষয়টি সম্পর্কে অধিক জানা ও সতর্ক থাকার কারণে তা গ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রগণ্যতা বজায় থাকবে।
৬২. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কোন কোন কিতাব অধ্যয়নের পরামর্শ দিবেন? আমরা আপনার নিকট শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে দিক নির্দেশনা কামনা করছি।
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, কিতাবসমূহের মধ্যে যা অধ্যয়ন করা উত্তম তা হচ্ছে নির্ভরযোগ্য তাফসীরের কিতাবসমূহ যেমন : تفسير ابن کثیر তাফসীরে ইবনে কাসীর ও শাইখ আব্দুর রহমান সা'দী (রঃ) এর কিতাব। আর হাদীছের কিতাবের মধ্যে উত্তম হলো: ফাতহুল বারী শারহু জ্বহীহ বুখারী, ছুবুলুস সালাম শারহু বুলুগুল মারাম, নাইলুল আওত্বার, রিয়াযুছ জ্বালেহীন ইত্যাদি।
উপকারী ইলম অর্জন, সৎ আমল করা ও উত্তম চরিত্র গঠনের জন্য আমরা শিক্ষার্থীদেরকে উপদেশ দিবো। আর দীন ও দুনিয়া উভয় ক্ষেত্রে যা কিছু উত্তম ও কল্যাণকর তা অর্জনে সময় ব্যয় করবে। নিজেদেরকে ভাল কাজে নিয়োজিত রাখবে। যে সব ক্ষেত্রে পার্থিব ও পরকালিন স্বার্থকতা ও সৌভাগ্য নিহিত আছে তাতে ধৈর্য ধারণ করবে।
৬৩. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, বয়স্কদের মধ্যে যারা ইলম অর্জন শুরু করতে চায় তাদের ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি? কোন শাইখের শরণাপন্ন
হওয়া ও সাক্ষাত করা তাদের পক্ষে সম্ভব না হলে এক্ষেত্রে শাইখ ছাড়া ইলম অর্জন তাদের কোন কাজে আসবে কি?
জবাবে শাইখ বলেন, যারা ইলম অর্জনের দিকে অগ্রসর হয় তাদেরকে যেন আল্লাহ তা'আলা সাহায্য করেন, আমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট এ প্রার্থনাই করি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইলম অর্জন কঠিন কাজ; তা অর্জনে কঠোর চেষ্টা-সাধনার প্রয়োজন হয়। কেননা, আমরা জানি যে, যাদের বয়স বেশি সাধারণত তাদের শারীরিক কাঠামো বর্ধিত হয় কিন্তু তাদের বুঝ শক্তি তুলনা মূলক কমে যায়। ইলম অর্জনে ইচ্ছুক এ বয়স্ক ব্যক্তি এমন একজন আলিম নির্বাচন করবেন যিনি ইলমের দিক থেকে বিশ্বস্ত। যাতে তিনি ঐ আলিমের নিকট ইলম অর্জন করতে পারেন। কেননা, শাইখদের শরণাপন্ন হয়ে ইলম অর্জন অধিকতর সফল ও সহজ হয়। আর এভাবেই তিনি অধিক সফল হবেন। শাইখ হচ্ছেন জ্ঞানগত দিক থেকে সুপরিসর। বিশেষত ইলমুন নাহু, তাফসীর, হাদীছ, ফিক্বহসহ অন্যান্য বিষয়ের উপকারী জ্ঞান যার রয়েছে বিশটা কিতাব অধ্যয়নের চেয়ে ঐ শাইখের নিকট সহজে ইলম অর্জন করা যায় এবং এতে কম সময় ব্যয় হয়। আর এভাবে অধিক নিরাপদে ইলম অর্জন করা যায়। কখনো এমন হয় যে, শিক্ষার্থী যে কিতাবের উপর নির্ভর করে ঐ কিতাবের লেখকের মতাদর্শ দলীল-প্রমাণ অথবা বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে সালাফদের রীতি-পদ্ধতি বিরোধী হয়। সুতরাং ইলম অর্জনে ইচ্ছুক এ বয়স্ক ব্যক্তির জন্য আমাদের পরামর্শ থাকবে যে, তিনি কোন একজন বিশ্বস্ত শাইখের শরণাপন্ন হয়ে তার নিকট থেকে ইলম অর্জন করবেন। এটাই তার জন্য অধিকতর সফলতা বয়ে আনবে। এতে সে নিরাশ হবে না। আর সে একথাও বলবে না, 'আমিতো বৃদ্ধ হয়ে গেছি' আমি ইলম অর্জন থেকে বঞ্চিত।
একটা ঘটনা স্বরণ হলো, জৈনক লোক যুহর জ্বলাতের পর মসজিদে প্রবেশ করে বসে পড়ে। এরপর একজন লোক তাকে বলে, তুমি দু'রাকাআ'ত জ্বলাত আদায় করে বসো। অতঃপর সে দু'রাকাআ'ত জ্বলাত আদায় করে বসে। আবার আছর জ্বলাতের পর একদিন সে মসজিদে প্রবেশ করে দু'রাকাআ'ত জ্বলাত আদায়ের জন্য তাকবির দেয়। অতঃপর লোকটি বলে, তুমি জ্বলাত আদায় করো না; এটা নিষিদ্ধ সময়। তোমার জন্য ইলম অর্জন করা আবশ্যক। এ কথা শুনে সে ইলম অর্জন শুরু করে। এমনকি সে ইমাম হয়ে যায়। জ্বলাত আদায় করা বা না করার এ অজ্ঞতা ছিল তার ইলম না থাকার কারণে। আল্লাহ তা'আলা শিক্ষার্থীর উত্তম নিয়্যাতের কারণে তার উপর অনুগ্রহ করেন। ফলে শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত জ্ঞানার্জন করতে সক্ষম হয়।
৬৪. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইলম অর্জনে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য কোন কোন বই অধ্যয়নের পরামর্শ দিবেন? বিশেষ করে আক্বীদা বিষয়ক বই পঠন সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, আক্বীদা বিষয়ক কিতাবসমূহের মধ্যে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহঃ) রচিত আল-আক্বীদা আল ওয়াসেত্বিয়া (العقيدة الواسطية) বইটি উত্তম। বইটি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআ'তের আক্বীদা বিষয়ক সংক্ষিপ্ত সার নির্যাস হিসাবেই সুপরিচিত। বইটি ব্যাখ্যার প্রয়োজন।[৬৭] প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা ঐ ব্যাখ্যা বুঝার প্রয়োজবোধ করবে। আক্বীদা সংক্রান্ত আরেকটি সুবিন্যস্ত কিতাব হলো کتاب عقيدة السفارييني এ কিতাবে এমন কিছু কথা আছে যা প্রকাশ্যে সালাফদের রীতি বিরোধী।
وليس ربنا بجوهر ولا عرض ... ولا جسم تعالى في العلى
অর্থাৎ আমাদের রব বস্তু নন, তাকে প্রদর্শন করা যায় না......আর তিনি উচ্চে দেহধারী নন।
এসবই সালাফদের রীতি বিরোধী কথা। কোন শিক্ষার্থী বিচক্ষণ শাইখের নিকট আক্বীদা বিষয়ক পাঠ গ্রহণ করলে সালাফদের মানহায-রীতি বিরোধী কথা তার নিকট স্পষ্ট হবে যা ঐ শিক্ষার্থীর জন্য উপকারী।
আর শিক্ষার্থী ছোট হলে 'উমদাতুল আহকাম' (عمدة الأحكام) মুখস্থ করবে, যা বুখারী ও মুসলিমের সংক্ষিপ্ত সংকলন। এক্ষেত্রে হাদীছের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে পর্যালোচনা ও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হবে না।
আর পরিভাষাগত জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বিরচিত نخبة الفكر গ্রন্থের তিন-চারটি পৃষ্ঠা মুখস্থ করবে যা স্মৃতিপটে স্থায়ী হওয়ায় উপণিত বয়সে এর উপকারীতা লাভ করবে।
আর তাফসীরের ক্ষেত্রে 'তাফসীর ইবনে কাছির' (تفسیر ابن کثیر) অত্যন্ত উপকারী গ্রন্থ এবং আব্দুর রহমান নাছির আস-সা'দী এর তাফসীর ( وتفسير الشيخ
(عبد الرحمن بن ناصر السعدي) গ্রন্থটিও সহজ ও নির্ভরযোগ্য। শিক্ষার্থীরা এ দু'টি কিতাব অধ্যয়ন শুরু করবে তারপর ক্রমান্বয়ে অন্যান্য ব্যাখ্যামূলক কিতাব পাঠ করবে।
ফিক্বহের কিতাবসমূহের মধ্যে زاد المستقنع গ্রন্থটি ভাল। যা সংক্ষিপ্ত ও বরকত পূর্ণ। আব্দুর রহমান আস-সা'দী এটির মূলপাঠ মুখস্থ করার পরামর্শ দেন।
নাহু শাস্ত্রে الأجرومية নামক গ্রন্থটি ভাল। এ সংক্ষিপ্ত কিতাবটি শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করবে। এরপর নাহুর সার সংক্ষেপ ألفية ابن مالك গ্রন্থটি পাঠ করবে যা শিক্ষার্থীদের জন্য উপকারী। আর সীরাত গ্রন্থের মধ্যে ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রহঃ) বিরচিত زاد المعاد গ্রন্থটি ভাল। বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ গ্রহণের অনেক বিধান সাব্যস্ত করণসহ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবনের যাবতীয় অবস্থা গ্রন্থটিতে তুলে ধরা হয়েছে। আর উছুল ফিক্বহের ক্ষেত্রে বলবো, বিষয়টি কঠিন। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য الأصول من علم الأصول নামক সংক্ষিপ্ত কিতাব রচিত হয়েছে।
ফারায়িযের ক্ষেত্রে البرهانية নামক কিতাবটি সংক্ষিপ্ত ও উপকারী যা সব ফারায়িয গ্রন্থের পরিপূরক। গ্রন্থটির লেখক মুহাম্মাদ আল-বুরহানী (রহঃ)।
৬৫. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, যে শিক্ষার্থী কোন কিছু পাঠ করে অথবা শিখে কিন্তু ভুলে যায় তার ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মানুষ যা কিছু শিখে তদানুযায়ী আমল করা দরকার। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَالَّذِينَ اهْتَدَوْا زَادَهُمْ هُدًى وَآتَاهُمْ تَقْوَاهُمْ}
যারা হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছে আল্লাহ তাদের হেদায়াত প্রাপ্তি আরো বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে তাদের তাকওয়া প্রদান করেন (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৭)। তিনি আরো বলেন,
{وَيَزِيدُ اللَّهُ الَّذِينَ اهْتَدَوْا هُدًى}
যারা সঠিক পথে চলে আল্লাহ তাদের হিদায়াত বৃদ্ধি করেন (সূরা মারইয়াম ১৯:৭৬)।
মানুষ তার ইলম অনুযায়ী আমল করলে আল্লাহ তা'আলা তার ইলম ও বুঝ শক্তি বৃদ্ধি করে দেন। }زادهم هدی{ এ আয়াতাংশের সাধারণ অর্থ থেকে এটা বুঝা যায়।
ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন, আমার মুখস্থ শক্তির দুর্বলতা সম্পর্কে আমি আমার শিক্ষকের নিকট অভিযোগ পেশ করলাম। তিনি আমাকে গুনাহ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন এবং তিনি বলেন, ইলম হচ্ছে নুর-আলো; আল্লাহ তা'আলা কোন পাপী তার আলো দান করেন না। যে বিদ্যার দ্বারা কুফরী হয় তা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা, মানুষ নানাবিধ অনর্থক চিন্তায় মগ্ন থেকে আনন্দবোধ করে ফলে তার ইলম অর্জনের সক্ষমতা দুর্বল হয়। মুখস্থ শক্তি অটুট রাখার আরো পদ্ধতি হলো যে, হক্ব জানার উদ্দেশ্যে সহপাঠীদের সাথে বেশি বেশি আলোচনা করতে হবে। পরস্পরকে পরাভূত করার উদ্দেশ্যে যেন আলোচনা না হয়। এভাবে হকু জানার একনিষ্ঠতা বজায় থাকলে নিঃসন্দেহে মুখস্থ শক্তি অটুট থাকবে ইনশাল্লাহ।
৬৬. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ফাতাওয়ার ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা যায় এমনকি অযোগ্য ছোটরাও ফাতাওয়া দেয়। এ সম্পর্কে আপনার পরামর্শ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, ফাতাওয়া প্রদান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গণ্য হওয়ায় এ সম্পর্কে জবাবদিহীতার কারণে এবং ইলম ছাড়াই ফাতওয়া দানের আশঙ্কায় সালাফ আলিমগণ কোন বিষয়ে ফাতাওয়া নিয়ে পর্যালোচনা করতেন। কেননা, মুফতি হচ্ছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ প্রচারক এবং শরী'আতকে স্পষ্টকারী। এ হিসাবে তিনি যদি না জেনেই কোন কিছু বলেন, হয়তো তা শিরক বলে গণ্য হতে পারে। তারা আল্লাহর তা'আলার নিম্নোক্তবাণী মনোযোগসহ শুনতেন- বুঝতেন। আল্লাহ বলেন,
{قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِالله مَا لَمْ يُنَزِّلْ به سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهُ مَا لَا تَعْلَمُونَ} [الأعراف: [۳۳
বল, আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর উপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না (সূরা আল-আরাফ ৭:৩৩)।
ইলম ছাড়া কথা বলার কারণে তার সাথে কোন কিছু অংশীদার স্থাপন হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا} [الإسراء: ٣٦] .
যে বিষয় তোমার জানা নাই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তকরণ এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৩৬)।
ফাতওয়া প্রদানে মানুষের ত্বরান্বিত করা উচিত নয়। বরং ভেবে দেখবে, গভীরভাবে চিন্তা ও পর্যবেক্ষণ করবে। সমাধানে অপারগ হলে তার চেয়ে যে অধিক জানে তার নিকট থেকে জেনে নিবে। যাতে আল্লাহ তা'আলার বিরূদ্ধে ইলম ছাড়াই কথা বলা থেকে বিরত থাকতে পারে। আল্লাহ তা'আলা তার একনিষ্ঠ নিয়্যাত সম্পর্কে জানেন। তিনি চাইলে তাকে সংশোধন করবেন। ফলে সে সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছতে সক্ষম হবে যা সে চায়। আল্লাহ তা'আলা যাকে চান তাওফীক দান করেন এবং তাকে মর্যাদাবান করে দেন। আর যে ইলম ছাড়াই ফাতওয়া দেয় সে জাহিলের চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট। কারণ জাহিলতো শুধু বলে, আমি জানি না। জাহিল নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে জানে এবং সত্যকে সে আবশ্যক মনে করে। অপর দিকে যে নিজেকে সকল আলিমের চেয়ে অধিক জ্ঞাত মনে করে সে কখনো নিজে পথভ্রষ্ট হয় এবং অন্যকে পথভ্রষ্ট করে। আর জেনে-বুঝে সে মাসআলায় ভুল করে। এমনটা করা ছোট শিক্ষার্থীর জন্য গুরুতর অন্যায় ও মারাত্মক ক্ষতিকর।
৬৭. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কতিপয় ফিক্বহী মতভেদকে কিছু মতভেদের উপর প্রধান্য দেয়া শিক্ষার্থীর জন্য বৈধ হবে কি? অতঃপর সে ঐ প্রধান্য পাওয়া মতভেদ গ্রহণ করা আবশ্যক মনে করে। অগ্রগণ্য মতভেদ সম্পর্কে জেনে কিছু ক্ষেত্রে এ মতভেদকে সে গ্রহণ করবে কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, শিক্ষার্থীর নিকট কোন বিষয়ের হুকুম যদি পূর্ণরূপে স্পষ্ট না হয় এবং ঐ ক্ষেত্রে সন্দেহ থাকে তাহলে সতর্কতার সাথে অগ্রগণ্য মতকে গ্রহণ করবে। এছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করা আবশ্যক মনে করবে না। কেননা, হারাম অথবা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে তার নিকট এমন কোন সুস্পষ্ট দলীল নেই যা সে আল্লাহর কাছে যুক্তি হিসাবে পেশ করবে যা শরীয়তে সাব্যস্ত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কিছু বিষয়ে মুজতাহিদ সিন্ধান্ত নিতে দ্বিধাবোধ করেন। অতঃপর তিনি ঐ ব্যাপারে নিজে সমন্বয় সাধন করতে পছন্দ করেন। আর দুর্বোধ্য বিষয়ের সমাধানে তিনি ধৈর্য ধারণ করেন। কিন্তু তার এ আশঙ্কাও হয় যে, আল্লাহর বান্দা হয়তো ঐ বিষয়টাকে গ্রহণ করা আবশ্যক মনে করবে। এ জন্য আমরা বলবো, অগ্রগণ্য মত গ্রহণ করায় কোন বাধা নেই। কিন্তু চিন্তা-ভাবনার পুনরাবৃত্তি ছেড়ে দিবে না যতক্ষণ না বিষয়টি স্পষ্ট হয় এবং মানুষ দলীলের চাহিদা অনুসারে তা গ্রহণ করা আবশ্যক মনে করে। আর দলীল অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বিষয়টি সংক্ষিপ্ত হবে না বরং শরী'আত বর্ণনায় তা সংক্ষেপ হতে পারে। আর অগ্রগণ্য মত স্পষ্ট হলেই তার উপর আমল করা বৈধ নচেৎ বৈধ নয়।
৬৮. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইলম অনুযায়ী আমল করে ক্ষ্যান্ত থাকার ব্যাপারে মন্তব্য করা হয়, এ ব্যাপারে আপনার উপদেশ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, শরী'আতের কোন বিষয় সঠিক জেনে তা প্রচার করা আবশ্যক। কেননা, মানুষ যা জানে তা আমলের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা ওয়াজিব। এমনটা হলে আল্লাহ তা'আলা তার জন্য কুরআনের আলো বৃদ্ধি করে দিবেন। ফলে আমলের মাধ্যমে তার জ্ঞানের আলো বৃদ্ধি পেতে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَإِذَا مَا أُنْزِلَتْ سُورَةٌ فَمِنْهُمْ مَنْ يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذه إِيمَانًا فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا فَزَادَتْهُمْ إيمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ} [التوبة: ١٢٤]
যখনই কোন সূরা নাযিল করা হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, এটি তোমাদের কার ঈমান বৃদ্ধি করল? অতএব যারা মুমিন, নিশ্চয় তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং তারা আনন্দিত হয় (সূরা আত-তাওবাহ ৯:১২৪)।
{وَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ فَزَادَتْهُمْ رِجْسًا إِلَى رِجْسِهِمْ وَمَاتُوا وَهُمْ كَافِرُونَ} [التوبة: ١٢٥]
যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, এটি তাদের অপবিত্রতার সাথে অপবিত্রতা বৃদ্ধি করে এবং তারা কাফির মৃত্যুবরণ করে কাফির অবস্থায় (সূরা আত-তাওবাহ ৯:১২৫)।
বলা হয়ে থাকে, আমলের মাধ্যমে ইলম সংরক্ষিত হয় নচেৎ তা চলে যায়। সালাফে জ্বলিহীনরা কোন মাসআলা জানার পর তদানুযায়ী আমল করতেন। আর তাদের অনেকেই যা কিছু জানতেন দ্রুততার সাথে প্রকাশ্যে তা পালন করতেন। ছাহাবীগণ যা কিছু শিখতেন তা পালন করার ব্যাপারে তাদের মাঝে প্রতিযোগিতা হতো। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদেরকে ঈদের দিন ছাদাক্বাহ করা জন্য উৎসাহ দিতেন। দানের উদ্দেশ্যে তাদের কানের অলংঙ্কার তারা বিলাল (রাঃ) এর কাপড়ে জমা করতেন। বাড়ীতে পৌঁছার পর তাদেরকে বলতে শুনা যায়নি যে, 'আমরা ছাদাক্বাহ করেছি' বরং তারা বলতেন, আমরা প্রতিযোগিতা করেছি।
অনুরূপভাবে পুরুষ লোকের জন্য স্বর্ণের আংটি ব্যবহার হারাম জানার পর যে লোক তা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট পেশ করতেন সেটা আর ফেরত নিতেন না। এমনকি ঐ লোককে বলা হতো, তুমি তোমার আংটি নিয়ে নাও, তা দ্বারা উপকৃত হও। জবাবে সে বলতো, আল্লাহর শপথ! আমি আংটি ফেরত নিবো না যা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট পেশ করা হয়েছে। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বলতেন,
اخرجوا إلى بني قريظة: "لا يصلين أحد منكم العصر إلا في بني قريظة"
তোমরা বনী কুরাইযার উদ্দেশ্যে বের হও। বনী কুরাইযার এলাকায় পৌঁছা ব্যতিত কেউ যেন আছরের জ্বলাত আদায় না করে। [৬৮]
তারা বনী কুরাইযার উদ্দেশ্যে বের হয়ে এলাকার নিকটতম অবস্থানে পৌঁছলে রাস্তায় জ্বলাতের সময় হলে জ্বলাতের সময় শেষ হওয়ার আশঙ্কায় তাদের কেউ কেউ জ্বলাত আদায় করে নিল। তাদের কতিপয় লোক নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিম্নোক্ত বাণীর কারণে জ্বলাত দেরিতে আদায় করলো। নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"لا يصلين أحد العصر إلا في بني قريظة".
বনী কুরাইযার এলাকায় পৌঁছা ব্যতিত কেউ যেন আছরের জ্বলাত আদায় না করে।
সুতরাং হে শিক্ষার্থী ভাইয়েরা তোমরা লক্ষ্য করো ছাহাবীদের প্রতি যারা রসূল জ্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণের পর তা দ্রুত পালন করার জন্য এগিয়ে আসতেন। ইবাদত পালনে বর্তমানে যা কিছু ঘটে তা সামঞ্জস্য বিধান করলে প্রশ্ন জাগে বর্তমানে আমরা কি এ নির্দেশের উপর বহাল আছি? আমি বিশ্বাস করি যে, অনেকেই এ নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হয়। আমাদের অধিকাংশরই জানা আছে যে, জ্বলাত ইসলামের একটি স্তম্ভ যা পরিত্যাগের কারণে ব্যক্তি কাফির হয়ে যায়। আমরা এটাও জানি, জামাআ'তের সাথে জ্বলাত আদায় ফরযে আইনের অন্তর্ভুক্ত এবং তা আবশ্যক। আর অধিকাংশ নিষিদ্ধ বিষয়ও অনেকের জানা আছে। এরপরও দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা ঐ সব নিষিদ্ধ বিষয় হতে বিরত থাকে না। অনুরূপভাবে যারা ওয়াজিব পালন ছেড়ে দেয় তারা কোন ভ্রুক্ষেপই করে না। এটাই হলো পূর্ববর্তী ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মাঝে পার্থক্য।
৬৯. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইলম অর্জনের সঠিক পন্থা কি? শরী'আত বিষয়ক কিতাবের মূলপাঠ আয়ত্ব করবে নাকি তা বুঝে নিবে? এ ব্যাপারে স্পষ্ট ব্যাখ্যা জানতে চাই।
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, শিক্ষার্থীর উচিত যথাসাধ্য অল্প করে শিক্ষা অর্জন শুরু করা। উছুল শাস্ত্র, কাওয়ায়েদ ও রীতি-পদ্ধতি বিষয়ক সংক্ষিপ্ত কিতাব এবং অনুরূপ বিষয়ের মূলপাঠ অধ্যয়ন করতে হবে। কেননা, সংক্ষিপ্ত কিতাবাদী অধ্যয়নের মধ্যে দিয়ে ব্যাখ্যামূলক কিতাব পঠনের উপযোগীতা তৈরি হয়। এ কারণে উছুল শাস্ত্র ও কাওয়ায়েদ জানতে হয়। যে শিক্ষার্থী উছুল শাস্ত্র জানে না, সে মূলত (মৌলিক শিক্ষা থেকে) বঞ্চিত।
অনেক শিক্ষার্থীকে দেখা যায় যে, বিভিন্ন মাসআলা মুখস্থ করে কিন্তু তাদের কোন উছুলের জ্ঞান নেই। মুখস্থ নেই এমন বিরল কোন মাসআলা তারা দেখলে তা বুঝতে সক্ষম হয় না। কিন্তু আইন শাস্ত্র ও উছুল জানা থাকলে আংশিক মাসআলার উপর হুকুম নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়। এ কারণে আমি আমাদের ভাইদেরকে আইন শাস্ত্র, উছুল ও কাওয়ায়েদ শিক্ষা অর্জনের প্রতি উৎসাহিত করবো। এতে বৃহৎ উপকার লাভ হবে। এ বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে, আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি যে, উছুল সম্পর্কে জ্ঞান লাভ এবং সংক্ষিপ্ত পাঠ আয়ত্ব করা উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিছু মানুষ ষড়যন্ত্র মূলক আমাদেরকে বলে, মুখস্থ
করাতে কোন উপকারীতা নেই বরং অর্থ জেনে রাখাই মূল বিষয়। কিন্তু তাদের এ ধরনের চিন্তা-চেতনা আমরা দূর করেছি। আল্লাহ তা'আলা যা চেয়েছেন নাহু শাস্ত্র, উছুল ফিক্বহ ও তাওহীদের পাঠ আমরা মুখস্থ করেছি। মুখস্থ বিদ্যাকে অবহেলা করা যাবে না। এটাই মৌলিক বিষয়। হয়তো তোমাদের মধ্যে কেউ ইবারত উল্লেখ পূর্বক পাঠ করে। কিন্তু শিক্ষার্থীর জন্য পাঠ মুখস্থ করাই গুরুত্বপূর্ণ যদিও তাতে কিছু জটিলতা রয়েছে। আমরা তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, যেন তোমরা সালাফে জ্বলিহীনের পথ খুঁজে পাও। তিনি যেন আমাদেরকে হেদায়াত প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। তিনিই দাতা, দয়াময়।
৭০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে বের হওয়াকে কেন্দ্র করে যে সব শিক্ষার্থী দাওয়াত দান ছেড়ে দেয় তাদের ব্যাপারে আপনার মতামত কি? ইলম অর্জন ও দাওয়াত দান উভয়ের মাঝে তারা সমন্বয় সাধন করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রবল ধারণা রয়েছে যে, দাওয়াত দানে ব্যস্ত থাকলে ইলম অর্জন ছুটে যাবে। তারা মনে করে, ইলম অর্জনেই লিপ্ত থাকতে হবে এমনকি আংশিক ইলম অর্জন হলে দাওয়াত দান ও প্রশিক্ষণের কাজে যোগদান করতে পারবে এ ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি?
জবাবে শাইখ বলেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দান একটি সুউচ্চ মর্যাদাপূর্ণ মহৎ কাজ। কেননা, এটা নাবী রসূলদের কর্ম। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ}
তার চেয়ে কার কথা উত্তম? যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, অবশ্যই 'আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত (সূরা হা-মিম-সাজদাহ ৪১:৩৩)।
আল্লাহ তা'আলা নাবী মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নিম্নের বাণী প্রচার করতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন,
{قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةِ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ}
বল, এটা আমার পথ, আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই (সূরা ইউসূফ ১২:১০৮)।
এখানে জ্ঞাতব্য যে, ইলম ছাড়া দাওয়াত দান সম্ভব নয়। যেহেতু আয়াতে বলা হয়েছে }على بصيرة{। তাই না জেনে ব্যক্তি কিভাবে দাওয়াত দিবে? আর যারা ইলম-বিদ্যা ছাড়া আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয় তারা আল্লাহর বিরূদ্ধে এমন কথা বলে যা তারা জানে না। কাজেই দাওয়াত দানের জন্য জ্ঞান অর্জনই প্রথম স্তর। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইলম অর্জন ও দাওয়াত দানের মাঝে সমতা বজায় রাখতে হবে। যদি সমন্বয় সাধন সম্ভব না হয় তাহলে ইলম অর্জনেই লিপ্ত থাকবে। কেননা, ইলম অর্জনকে কেন্দ্রীভূত করে দাওয়াত দেয়া হয়। 'কিতাবুল ইলম' পর্বের দশম অধ্যায়ে ইমাম বুখারী (রহ.) বলেন, باب العلم قبل القول والعمل। এ অধ্যায়ের অনূকুলে আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত বাণী দলীল হিসাবে তিনি পেশ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلِّبَكُمْ ومثواكم}
জেনে রাখ, নিঃসন্দেহে আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য ইলাহ নেই। তুমি ক্ষমা প্রার্থনা কর তোমার এবং মুমিন নারী-পুরুষদের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্যে। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং নিবাস সম্পর্কে অবগত রয়েছেন (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৯)।
ইমাম বুখারী (রহ.) প্রথমে ইলম অর্জনের কথা বলেন। আর যারা মনে করে যে, ইলম অর্জন ও দাওয়াত দানের মাঝে সমতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। তাদের এ ধারণা ভুল। ইলম অর্জন ও দাওয়াত দান উভয়ই সম্ভব। শিক্ষার্থী ইলম অর্জন অবস্থায় তার পরিবারবর্গ, প্রতিবেশী, নিজ এলাকা ও দেশবাসীকে দাওয়াত দিবে। বর্তমানে জরুরী হলো সম্ভবপর গভীর জ্ঞানার্জন করা যার ভিত্তি হচ্ছে শারঈ উছুল। আর বস্তুগত জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ কিছু বিষয় বুঝতে পারে যা সে শিখে। উছুল ছাড়াই সে তা সাধারণভাবে শিখে, যার কোন ভিত্তি নেই। এ ইলম হচ্ছে খুবই সীমিত। এ ইলমের মাধ্যমে উপযুক্ত সময়ে মানুষ হক্বের প্রতিবন্ধকতা ও বাতিলপন্থীদের তর্ক-বিতর্ক দূর করতে পারে না। এজন্য মুসলিম যুবক শ্রেণীর প্রতি আমার উপদেশ হচ্ছে তারা যেন আল্লাহর দিকে দাওয়াত দানে প্রতিষ্ঠিত।
থেকে ইলম অর্জনে যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালায়। কোন প্রতিবন্ধকতাই যেন ইলম অর্জন থেকে তাদেরকে বিরত না রাখে। কেননা, ইলম অর্জন করা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের নামান্তর। এজন্য আলিমগণ বলেন: ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে কেউ বেরিয়ে গেলে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ হিসাবে তাকে যাকাত দেয়া যেতে পারে। এটা ইবাদতে লিপ্ত থাকার বিপরীত বিষয়। কেননা, ইবাদতকারীকে যাকাত দেয়া যায় না। যেহেতু তিনি অর্থ উপার্জনে সক্ষম।
৭১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইলমুত তাজভীদ শিক্ষা আবশ্যকতার ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি? আর "الصلاة، الزكاة" ইত্যাদি শব্দের শেষে : বর্ণে ওয়াক্ফ করা জ্বহীহ?
জবাবে শাইখ (রহ.) বলেন, ইলমুত তাজভীদের হুকুমসমূহ জানা আমি ওয়াজিব মনে করি না। এটা ক্বিরাত তথা পঠনরীতির সৌন্দর্যতার অন্তর্ভুক্ত। আর সৌন্দর্যতা আবশ্যকতার অন্তর্ভুক্ত নয়। জ্বহীহ বুখারীতে উল্লেখ আছে আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ক্বিরাআত কেমন ছিল? তার কিরাআত ছিল দীর্ঘ। অতঃপর তিনি পাঠ করতেন,
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ তিনি বিসমিল্লাহ টেনে পড়তেন। الرَّحْمَنِ ও الرَّحِيمِ শব্দেও টেনে পড়তেন। এখানে টেনে পড়া স্বভাবগত ব্যাপার; এর উপর নির্ভর করার দরকার নেই। দলীলের মাধ্যমে বুঝা যায়, তা স্বভাবগত বিষয়। যদি বলা হতো, তাজভীদের কিতাব সমূহে তাজভীদের বিস্তারিত হুকুমসমূহ জানা ওয়াজিব। তাহলে অবশ্যই তা আবশ্যক মনে করার কারণে অধিকাংশ মুসলিমের পাপ হতো। আমরা এক্ষেত্রে বলবো, যারা অধিকতর ভাষার বিশুদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করতে চায়, তারা বিদ্বানদের কিতাবে লিখিত ইলমুত তাজভীদের হুকুম-নিয়মাবলী মেনে চলবে। এটা শিক্ষার্থীর প্রশিক্ষণেও প্রযোজ্য হতে পারে। যাতে সকলের জানা থাকে যে, কোন কথা ওয়াজিব হওয়ার জন্য দলীল প্রয়োজন যা পালনের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট এমন বিষয় হতে দায়িত্বমুক্ত থাকা যায় যা বান্দার উপর আবশ্যক হওয়ার ব্যাপারে দলীল নেই। আব্দুর রহমান ইবনে সা'দী (রহ.) বলেন, তাজভীদের নিয়মাবলী বিস্তারিত (ব্যাকরণগত) নিয়ম কানুনের মতই যা ওয়াজিব নয়। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) এর কথা থেকে জানতে
পেরেছি। ইবনে কাসিম (রাহিমাহুল্লাহ) এর মাজমূ'আহ ফাতওয়ার ১৬ তম খন্ড ৫০ পৃষ্ঠায় তাজভীদের হুকুম সম্পর্কে তিনি বলেন, এমন বিষয়ে উৎসাহিত হওয়ার দরকার নেই যা কুরআনের প্রকৃত জ্ঞান থেকে অধিকাংশ মানুষকে নিবৃত রাখে। হরফসমূহের মাখরাজ, কণ্ঠস্থ করণ, উচ্চারণে জোড় প্রদান, আকৃষ্ট করণ, দীর্ঘ, সংক্ষিপ্ত ও মধ্যম পন্থায় টেনে পড়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে ওয়াসওসা রয়েছে যা আল্লাহ তা'আলার কথার উদ্দেশ্যে বুঝা থেকে অন্তরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। যেমন {اَنذَرْتَهُم}
আয়াতাংশের উচ্চারণ এবং "عليهم" শব্দের 'মিম' বর্ণ পেশ পড়া এবং তা 'ওয়াও' বর্ণের সাথে মিলিয়ে পড়া, 'হা' বর্ণে যের অথবা পেশ পড়া অনুরূপ অন্যান্য নিয়মে বিভিন্ন শব্দ পড়া। অনুরূপভাবে কেবল সুর করে সুন্দর আওয়াজে পড়ার উদ্দেশ্যে তাজভীদ শিখলে কুরআনের মর্মার্থ বুঝার অন্তরায় সৃষ্টি হবে। আর "الصلاة ، الزكاة ইত্যাদি শব্দের ':' বর্ণে ওয়াক্ফ করা হয় বলে যা শুনো তা সঠিক নয়। বরং বর্ণে ওয়াক্ত করা হয়।
৭২. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, صلى الله عليه وسلم বাক্যেটির সংক্ষিপ্তরূপ প্রকাশ করণে কিছু মানুষ বন্ধনী ব্যবহার করে "ص" বর্ণ লিখে থাকে। এরূপ সংক্ষিপ্তভাবে লেখা সঠিক বলে গণ্য হবে কি?
জবাবে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, কোন হাদীছ লেখার ব্যাপারে আলিমগণ যে পরিভাষা ব্যবহার করেছেন তা অনুরূপভাবে লিখে প্রকাশ করা শিষ্টাচারিতার অন্তর্ভুক্ত। صلى الله عليه وسلم বাক্যেটির সংক্ষিপ্তরূপ "ص" বর্ণ ব্যবহার করে প্রকাশ করা ঠিক নয়। অনুরূপভাবে "صلعم" লেখাও দরূদ বলে গণ্য হবে না। নিঃসন্দেহে এরূপ সংক্ষিপ্ত বর্ণ প্রতীক ব্যবহারের কারণে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর দরূদ পাঠের ছাওয়াব থেকে ঐ ব্যবহারকারী বঞ্চিত হবে। আর পূর্ণ দরূদ যে লিখবে অতঃপর যে তা পাঠ করবে ঐ প্রথম লেখকের জন্য ছাওয়াব লাভ হবে। আর প্রকাশ থাকে যে, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
"أن من صلى عليه صلى الله عليه وسلم مرة واحدة صلى الله عليه بها عشراً".
যে ব্যক্তি নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর একবার দরূদ পাঠ করবে আল্লাহ তা'আলা তার উপর দশবার দয়া বর্ষণ করবেন।[৬৯] সুতরাং ত্বরান্বিত হয়ে এরূপ প্রতীকি বর্ণ লিখে ছাওয়াব ও প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হওয়া মুমিনের জন্য উচিত নয়।
৭৩. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কোন সমাবেশে শারঈ প্রশ্ন উত্থাপন করা হলে জনসাধারণ অধিকাংশ সময় ইলম ছাড়াই ঐ মাসআলায় ফাতওয়া দানে প্রতিযোগিতা শুরু করে দেয়। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি? এ অবস্থা আল্লাহ ও তার রসূলের সামনে আগ বাড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে গণ্য হবে কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, জেনে রাখতে হবে যে, আল্লাহর দীনের ব্যাপারে ইলম ছাড়া কথা বলা কারো জন্য বৈধ নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেন, {قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُনَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ} [الأعراف: ৩৩]
বল, আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর উপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না (সূরা আল-আরাফ ৭:৩৩)।
ইলম ছাড়া আল্লাহর বিরূদ্ধে কোন কিছু বলার ব্যাপারে মানুষের ভীত-সন্ত্রস্ত থাকা ওয়াজিব-আবশ্যক। এটা পার্থিব বিষয় নয় যে, তাতে বিবেক খাঁটিয়ে কিছু বলার সুযোগ আছে। আর দুনিয়াবী কোন বিষয় হলেও তাতে যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করা ও ভেবে দেখা উচিত। মানুষকে কোন বিষয়ে যে জবাব দান করা হয় তা জবাব প্রাপ্তদের মাঝে হুকুমের মতই গণ্য হয়। আর ঐ জবাবটিই হয়তো শেষ ফায়ছালা হিসাবে বিবেচিত হয়। দেখা যায়, অধিকাংশ মানুষ শারঈ মাসআলার শরণাপন্ন হওয়া ব্যতিরেকে নিজের রায় তথা সিন্ধান্ত অনুসারে কথা বলে। বিভিন্ন রায়-সিন্ধান্ত গ্রহণের চেয়ে সঠিক বিষয়ের সন্ধানে একটু বিলম্ব হলেও মানুষের নিকট ঐ সঠিক পন্থা স্পষ্ট হয় যার উপর সে বহাল ছিল না। এজন্য সকলের প্রতি আমার উপদেশ থাকবে যে, চূড়ান্ত ফায়ছালা খুঁজে পেতে একটু বিলম্ব
করবে। বিভিন্ন রায়-সিন্ধান্তের মাঝে যেন তা ফায়ছালা হিসাবে গণ্য হয়। নানা রকম রায়-সিন্ধান্তে এটাও স্পষ্ট হবে যা শুনার পূর্বে প্রকাশ পায়নি। এটা পার্থিব বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত। অপরদিকে কিতাব-সুন্নাহ অথবা বিদ্বানগণের কথা জেনে-বুঝে তার উপর আমল করা ব্যতিরেকে কারো জন্য দীনি ব্যাপারে কথা বলা কখনোই বৈধ নয়।
৭৪. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, بدائع الزهور নামক কিতাব সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
জবাবে শাইখ (স) বলেন, এ কিতাবে এমন কিছু বিষয় আমি দেখেছি যা ছুহীহ নয়। আমি মনে করি না যে, মানুষ এ কিতাবের প্রতি মনোযোগী হবে। এ কিতাবে মুনকার বিষয় নিহিত থাকায় তা অনুসরণযোগ্য নয়।
৭৫. تنبيه الغافلين নামক কিতাব সম্পর্কে কি বলবেন?
জবাবে শাইখ (স) বলেন, এটি একটি উপদেশ মূলক বই। এতে অধিকাংশ উপদেশ দ্বঈফ-দুর্বল হিসাবে গণ্য। বইটিতে বানোয়াট উপদেশ ও কাহিনী রয়েছে যা জ্বহীহ নয়। অন্তর বিগলিত করণ এবং অশ্রু ঝড়ানোই এ কিতাবের লেখকের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এটা সঠিক পন্থা নয়। কেননা, আল্লাহর কিতাব ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ নির্ধারিত উপদেশই যথেষ্ট। ছুহীহ নয় এমন বিষয়ের মাধ্যমে উপদেশ দেয়া উচিত হবে না হোক তা রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অথবা সৎলোক সম্পর্কিত কোন বিষয়। এমন বিষয়ের মাধ্যমে উপদেশ দেয়া হলে মানুষ কথা-কর্মে ভুল পথ অনুসরণ করবে। তবে কিতাবটিতে কিছু বিষয় আছে যাতে অসুবিধা নেই। এ সত্ত্বেও আমি কিতাবটি পড়ার জন্য উপদেশ দিবো না। যে লেখকের কিতাবে ইলমের কথা ও বুঝ আছে, যাতে রয়েছে জ্বহীহ, দ্বঈফ ও মাওদুউ-জালের মাঝে পার্থক্য কেবল ঐ কিতাবই পাঠ করবে।
৭৬. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামে আলিমগণের গুরুত্ব ও অবস্থান কি?
জবাবে শাইখ (স) বলেন, ইসলামে আলimগণের বড় মর্যাদা রয়েছে। কেননা, তারাই নাবীগণের উত্তরাধিকারী। এজন্য ইলম শিক্ষা দেয়া এবং আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়া তাদের উপর ওয়াজিব যা অন্যের উপর ওয়াজিব নয়। আকাশে তারকার অবস্থান যেমন পৃথিবীতে তাদের অবস্থান তেমনই। পথভ্রষ্টদেরকে তারা
পথ দেখান। তাদের নিকট হক্বের বর্ণনা করেন এবং মন্দ কর্ম সম্পর্কে তারা সতর্ক করেন। পৃথিবীতে আলিমগণ হলেন বৃষ্টির মত যা বর্ষণ হওয়ায় অনূর্বর ভূমি আল্লাহর হুকুমে সবুজ হয়। আলিমদের ইলম, আমল, চরিত্র ও শিষ্টাচার সবই থাকা ওয়াজিব। কেননা, তারা জাতির জন্য আদর্শ। আর চরিত্র ও শিষ্টাচারের দিক থেকে তারাই উপযুক্ত ও উত্তম।
৭৭. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কিছু মানুষ মনে করে, মুসলিমদের আলিমগণের ভূমিকা শারঈ বিধি-বিধানের মধ্যেই সীমিত। অন্যান্য জ্ঞান যেমন: রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের কোন ভূমিকা নেই এ ধরনের বিশ্বাস সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, আমরা মনে করি, আলিমদের অবস্থা সম্পর্কে তাদের এ বিশ্বাসের ভিত্তি হচ্ছে অজ্ঞতা। সন্দেহ নেই যে, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং শারঈ জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত এমন প্রয়োজনীয় সব ধরনের জ্ঞানে শারঈ আলিমদের ভূমিকা রয়েছে। আলিমদের সম্পর্কে অহেতুক যা কিছু বলা হচ্ছে তা জানতে চাইলে মুহাম্মাদ রশিদ রেজা সম্পর্কে জানতে হবে। তাফসীরসহ তার বিভিন্ন বিষয়ের কিতাব রয়েছে। তার পূর্ববর্তী শারঈ জ্ঞান সম্পন্ন আলিমদের দিকে খেয়াল করো যারা ছিলেন সবচেয়ে বেশি মর্যাদা সম্পন্ন। দেখা যায়, শারঈ জ্ঞান ও অন্যান্য বিষয়ে তাদের বলিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। তাদের ভিত্তি মূলক কায়েদা-কানুনের জ্ঞান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যা শিক্ষার্থী প্রথমেই অর্জন করা শুরু করে। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, "من يرد الله به خيرا يفقهه في الدين".
আল্লাহ তা'আলা যার কল্যাণ চান তাকে দীনের বুঝ দান করেন। [১৭০]
৭৮. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, দীনের ব্যাপারে মতভেদ কখন গ্রহণযোগ্য হয়? সব মাসআলা নাকি নির্দিষ্ট মাসআলায় মতভেদ হয়?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, প্রথমেই তুমি জেনে রেখো, মুসলিম উম্মতের আলিমগণের ইজতেহাদে যদি মতভেদ হয় কোন কারণে তা সঠিক বিষয়ের অনুকূলে না হলে তাতে ক্ষতি নেই। কেননা, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"إذا حكم الحاكم فاجتهد فأصاب فله أجران، وإن أخطأ فله أجر واحد".
কোন বিচারক ইজতেহাদে সঠিক সিন্ধান্তে পৌঁছলে তার জন্য দু'টি পুরস্কার রয়েছে। আর বিচারক ইজতেহাদে ভুল করলে তার জন্য রয়েছে একটি পুরস্কার। [৭১]
কিন্তু হক্ব সুস্পষ্ট হলে সর্বাবস্থায় ঐ হক্কেরই অনুসরণ করা ওয়াজিব। মুসলিম উম্মাতের আলিমগণের মাঝে যে মতভেদ সৃষ্টি হয় তার কারণে অন্তরে ভিন্নতা তৈরি হওয়া বৈধ নয়। কেননা, অন্তরের ভিন্নতার কারণে মারাত্মক গুরুতর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصابرين} [الأنفال: ٤٦] .
তোমরা আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্য করো এবং পরস্পর ঝগড়া করো না, তাহলে তোমরা সাহসহারা হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য ধর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন (সূরা আল- আনফাল ৮:৪৬)।
আলিমদের যে মতভেদ চিন্তা-ভাবনা করে দলীলসহ প্রচার করা হয় তা হিসাবযোগ্য। অপরদিকে, সাধারণ মতভেদ যা মানুষ বুঝে না, উপলব্ধি করতে পারে না তা বিবেচ্য নয়। এজন্য বিদ্বানগণের শরণাপন্ন হওয়া জনসাধারণের উপর ওয়াজিব। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} [النحل: ٤٣] .
জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা কর, যদি তোমরা না জেনে থাক (সূরা আন-নাহাল ১৬:৪৩)।
অপরদিকে, প্রশ্ন কর্তার কথা হচ্ছে, প্রত্যেক মাসআলায় মতভেদ হয় কি না? এ কথার জবাব হচ্ছে, ইজতেহাদের ভিন্নতায় কিছু মাসআলায় মতভেদ হয় অথবা কিতাব ও সুন্নাহর দলীল অবহিত করার দিক থেকে কতিপয় আলিম অন্যদের
চেয়ে বেশি জানেন ফলে মতভেদ হয়। তবে মৌলিক মাসআলায় মতভেদ নেই বললেই চলে।
৭৯. ইসলামে ইজতেহাদের হুকুম কি? জবাবে শাইখ (حفظه الله) বলেন, الاجتهاد في الإسلام هو : بذل الجهد لإدراك حكم شرعي من أدلته الشرعية.
ইসলামে ইজতেহাদ হচ্ছে শারঈ দলীল সমূহ হতে শারঈ হুকুম অবগত হওয়ার জন্য প্রচেষ্টা করা।
আর ইজতেহাদে সক্ষম ব্যক্তির উপর তা আবশ্যক। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {ফَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} [النحل: ٤٣] .
জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা কর, যদি তোমরা না জেনে থাক (সূরা আন-নাহাল ১৬:৪৩)।
ইজতেহাদে সক্ষম এমন ব্যক্তির পক্ষে নিজে হকু বুঝা সম্ভব। কিন্তু এ বিষয়ে গভীর জ্ঞান থাকা আবশ্যক আর এ ক্ষেত্রে শারঈ নছ (দলীল) কার্যকর উছুল ও আলিমদের কথা উপলব্ধি করতে হয়। যাতে বিরোধীতামূলক কোন কিছু না ঘটে। শিক্ষার্থীদের কতিপয় কেবল সহজ ইলমই অর্জন করেছে। অথচ তারা নিজেকে মুজতাহিদ বলে সম্বোধন করার চেষ্টা করে। খাছ নয় এমন ব্যাপক অর্থবোধক হাদীছ অনুযায়ী তাদেরকে আমল করতে দেখা যায় অথবা মানসূখ-রহিত হাদীছ অনুযায়ী সে আমল করে অথচ ঐ হাদীছের নাসিখ-রহিতকারী হাদীছ তার জানা নেই অথবা এমন হাদীছ অনুযায়ী আমল করে যে ব্যাপারে আলিমদের প্রকাশ্যে মতভেদ রয়েছে। তারা আলিমদের ইজমা সম্পর্কেও অবগত নয়। না জেনে এ ধরনের আমল করায় মারাত্মক ক্ষতি সাধন হয়।
শারঈ দলীল সম্পর্কে মুজতাহিদের জ্ঞান থাকা আবশ্যক। উছুলের জ্ঞান অর্জিত হলে এবং আলিমগণ মাসআলা উদ্ঘাটনে যে রীতি অবলম্বন করেন তা জানা থাকলে দলীল থেকে হুকুম সাব্যস্ত করতে সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে যেন অজ্ঞাতসারে ইজমার বিরোধীতা না হয়। পূর্ণরূপে বাস্তবে এ শর্ত পূরণ হলে ইজতেহাদ হতে পারে। আর জ্ঞান খাটিয়ে যেহেতু কোন মাসআলায় ইজতেহাদ করতে হয় তাই ঐ ইজতেহাদ খন্ডিত হওয়াও সম্ভব। কোন মাসআলা অথবা ইলমের কোন অধ্যায়
যেমন: 'কিতাবুত তাহারাত' ইত্যাদি নিয়ে বিশ্লেষণ মুলক আলোচনা করলে হয়তো ইজতেহাদ হতে পারে।
৮০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, নির্দিষ্ট কোন মাযহাবের তাক্বলীদ করা কি ওয়াজিব নাকি ওয়াজিব নয়?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, হ্যাঁ, নির্দিষ্ট মাযহাবের তাক্বলীদ করা ওয়াজিব-আবশ্যক। কিন্তু যে নির্দিষ্ট মাযহাবের তাক্বলীদ করা ওয়াজিব তা হলো রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাযহাব। কেননা, রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পথ অবলম্বন করেছেন তা অনুসরণ করা ওয়াজিব। আর ঐ পথে রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ-সৌভাগ্য। এ মর্মে আল্লাহ তা'আলা বলেন, {قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ} [آل عمران: ۳۱]
বল, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (সূরা আলে-ইমরান ৩:৩১)। তিনি আরো বলেন, {وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ} [آل عمران: ۱۳২]
তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ ও রসুলের, যাতে তোমাদেরকে দয়া করা হয় (সূরা আলে-ইমরান ৩:১৩২)।
সুতরাং বুঝা গেল এ মাযহাবেরই অনুসরণ ওয়াজিব। অপরদিকে এ মাযহাব ব্যতিরেকে অন্য মাযহাবের অনুসরণ করলে পথভ্রষ্ট হবে যদি তাতে মতভেদের ব্যাপারে দলীল স্পষ্ট না হয়। যদি মতভেদের বিপরীতে দলীল স্পষ্ট হয় তাহলে ঐ মাযহাবের অনুসরণ হারাম। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহঃ) উল্লেখ করেন, কেউ যদি বলে থাকে, কোন মানুষ যা কিছু বলে তার আনুগত্য করা ওয়াজিব তাহলে এরূপ বলার কারণে ঐ ব্যক্তিকে তাওবাহ করতে হবে। যদি সে তাওবাহ করে তাকে ছেড়ে দিতে হবে নচেৎ তাকে হত্যা করাই হবে যথাযথ। কেননা, তার কথা রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনুগত্য বিরোধী। আর শাইখুল ইসলাম ঠিকই বলেছেন, নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম এর কথা ছাড়া কোন মানুষের কথা গ্রহণ করা ওয়াজিব নয়। কেবল তার কথাই গ্রহণযোগ্য। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, اقتدوا باللذين من بعدي أبي بكر وعمر".
আমার পরে আবূ বকর ও উমার) এর অনুসরণ করো। [৭২] তিনি আরো বলেন, " إن يطيعوا أبا بكر وعمر يرشدوا".
যদি তারা আবূ বকব ও উমার () এর অনুসরণ করে তারা পথ খুঁজে পাবে। [৭৩]
৮১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামী জাগরণে ইলম অর্জনের প্রতি মনোযোগী হতে হয়। বিশেষত নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ ভিত্তিক ইলম অর্জন করা দরকার। আল্লাহর জন্যই প্রশংসা এবং তার নিকটেই রয়েছে। এ ইলম অর্জন কেন্দ্রীক কিছু মন্তব্য রয়েছে।
১. হাদীছ শাস্ত্রে গভীর ইলম নেই এমন কিছু শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হাদীছ দ্বঈফ ও জ্বহীহ হওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। অথচ তাদের জানা আছে যে, হাদীছের এ মূল কিতাব দু'টি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআ'তের উম্মাতের নিকট গ্রহণীয়।
২. সংখ্যাগুরু যুবকশ্রেণীর নিকট মাযহাবের বাহ্যিক দিকটাই গ্রহণীয়। তারা উম্মাতের ফক্বীহগণের কিতাব থেকে বিমুখ থাকে।
৪. কতিপয় শিক্ষার্থীকে হাদীছের জ্ঞানার্জনে লিপ্ত থাকতে দেখা যায়, এমতাবস্থায় আবশ্যকীয় বিষয় যেমন: আল-কুরআন, আরবী ভাষা, ফিকুহ, ফারায়িয... ইত্যাদির জ্ঞানার্জন থেকে বিরত থাকে।
৫. এমন কতিপয় শিক্ষার্থী আছে যারা কোন শাইখের শরণাপন্ন হয়নি এবং শুধু পঠন ও অধ্যয়ন ছাড়া তাদের ইলমের গভীরতাও নেই অথচ বাহ্যিকভাবে তারা জ্ঞানী হওয়ার ভান করে, তাদের পক্ষ থেকে পাঠদান করা হয়, ফাতওয়া দেয়া হয় এসব বিষয়ে আপনার মন্তব্য-দিকনির্দেশনা কি?
শাইখ (রহঃ) বলেন, প্রথম মন্তব্যের জবাব হলো, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্যই। সন্দেহ নেই যে, সুন্নাহ অনুসরণের ভালোবাসা এবং এর প্রতি উৎসাহিত হওয়া ইসলামী জাগরণের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু তুমি যা উল্লেখ করেছো তাতে দেখা যায়, এমন কিছু শিক্ষার্থী শিক্ষা দেয়ার এ পথ অবলম্বন করেছে, পূর্ববর্তী আলিমদের মত যাদের পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা, দূরদর্শিতা, শারঈ বিষয়গুলোর মাঝে পারস্পারিক সম্পর্কীয় জ্ঞান, মুত্বলাক্বকে তাক্বয়িদ করা এবং আমকে খাছ করণের জ্ঞান নেই। শরী'আতের সুপরিচিত সাধারণ কাওয়ায়েদ শিক্ষার দিকে তাদেরকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তাহলেই সব ব্যাপারে তারা তথ্যাদি সংগ্রহ করতে পারবে। এমনকি হাদীছ শায হওয়ার কারণে যে দ্বঈফ হাদীছ বিদ্বানদের নিকট আমলযোগ্য নয় এবং উম্মাতের মাঝে নির্ভরযোগ্য কিতাবে বিরোধী হাদীছ থাকলে সে ব্যাপারে মন্তব্য করতে পারবে। ঐ সব শিক্ষার্থীদেরকে দেখা যায়, তারা হঠাৎ করে সিন্ধান্ত নেয়, বাড়াবাড়ি মূলক কিছু একটা বলে ফেলে, যে বিষয়ে আলিমগণ ভিন্নমত পোষণ করেছেন, তারা সেটা অস্বীকার করে। আরো আশ্চৰ্যজনক বিষয় হলো, হাদীছের দিক থেকে তারা নির্ভরযোগ্য দু'টি অথবা একটি হাদীছ গ্রন্থের বিরোধিতা করে। আর যে সকল ইমামগণের ইমামত, তাদের সুন্দর নিয়্যাত ও ইলমের ব্যাপারে আলিমগণের ইজমা হয়েছে তারা ঐ সকল ইমামগণকে ফিক্বহের দিক থেকে প্রত্যাখ্যান করে। আরো দেখা যায়, এসব শিক্ষার্থী ইলম ও আমলের দিক থেকে পূর্ববর্তী ইমামগণের মত গভীরে পৌঁছেনি অথচ তারা ঐ সকল ইমামগণের বিরোধীতা করে চলছে। ইমামদেরকে তারা অসম্মান করে। তাদের প্রতি এটাই গুরুতর অমর্যাদা যা ইসলামী জাগরণের অন্তরায়। কোন মাসআলার ব্যাপারে সিন্ধান্তে নিতে বিলম্ব করা, বিচক্ষণতার সাথে ঐসকল ইমামের হক্বকে যথাযথ বুঝার চেষ্টা করা, তাদের কৃতিত্ব স্বীকার করা মানুষের উপর ওয়াজিব। আমরা তাদের জন্য আল্লাহর নিকট হিদায়াত ও তাওফীক কামনা করছি।
আর দ্বিতীয় মন্তব্যের ব্যাপারে আমরা বলবো, مذهب الظاهرية 'যাহিরী মাযহাব' একটা সমস্যা। এ মাযহাবপন্থীরা শুধু বাহ্যিক দিক গ্রহণ করে, উপকারী কায়দা-কানুনের প্রয়োজনবোধ করে না। এ মাযহাবের অনুসারীদের সম্পূর্ণ অথবা কতিপয় রীতি-পদ্ধতির যেসব কথার মাধ্যমে কেবল ফাসাদ স্পষ্ট হয় আমরা যদি তা যাচাই করে দেখতাম তাহলে অনেক গোমরাহী খুঁজে পেতাম। কিন্তু আমরা মানুষের গোপন দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান করা পছন্দ করি না।
তৃতীয় মন্তব্যের জবাব হচ্ছে, নিঃসন্দেহে প্রথমে আল্লাহর দিয়েই শিক্ষাবিদদের ইলম অর্জন শুরু করতে হবে। হাদীশTag দশটি আয়াত শিক্ষা করতেন বুঝে-শুনে, এখানে ইলম ও আমল দুটোই নিহিত ছিল। অতঃপর তারা সুন্নাতের দিকে খেয়াল রাখতেন। সনদ, জীবনী ও বিভিন্ন কারণ জেনেই তারা ফাতওয়া দিতেন। সুন্নাহ পদ্ধতিতে তারা ফিক্হী মাসআলা বুঝতে উদ্বুদ্ধ হতেন। কেননা, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
رُبَّ مُبَلَّغٍ اَوْعَى مِنْ سَامِعٍ
এমন অনেক প্রচারকারী আছে যে শ্রোতার চেয়ে বেশি সংরক্ষণশীল [৯৪] তিনি আরো বলেন,
رُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ لَيْسَ بِفَقِيْهِ .
এমন অনেক লোক আছে যারা নিজেদের তুলনায় উচ্চতর জ্ঞানের অধিকারী নিকট জ্ঞান পৌঁছে দিতে পারে [৯৫]।
সনদ ও তার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে আবশ্যকীয়ভাবে মানুষের জানা উচিত। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে উদ্ধৃত সুন্নাহর আলোকে ফিক্হ সম্পর্কে জানা আবশ্যক। কাওয়ায়েদ ও শর্ত উসূলের উপর ভিত্তি করে সামঞ্জস্য বিধান জরুরী। যাতে মানুষ নিজে পথভ্রষ্ট না হয় এবং অন্যকেও ভ্রষ্টতার দিকে ঠেলে না দেয়।
চতুর্থ মন্তব্যের জবাব হলো, মুফতির নিকট থেকে কোন বিষয় জেনে নেয়া মানুষের জন্য আবশ্যক। কেননা, আল্লাহ ও সৃষ্টির মাঝে ফায়ছালার দিক থেকে তিনি মধ্যস্থতাকারী এবং রসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওয়ারিছ হিসাবে গণ্য। সুতরাং তার গভীর জ্ঞান থাকা আবশ্যক যাতে তিনি ফাতওয়া দানে সক্ষম হন। সুতরাং ইলম ছাড়া কোন ব্যাপারে ফাতওয়া প্রদান ও পাঠ শিক্ষা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়া ঠিক নয়। কেননা, রসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে আমাদেরকে অবহিত করেছেন, তিনি বলেন,
"إن الله لا يقبض العلم انتزاعاً ينتزعه من العباد، ولكن يقبض العلم بقبض العلماء حتى إذا لم يبق عالما اتخذ الناس رؤوساً جهالا فسئلوا فأفتوا بغير علم فضلوا وأضلوا" .
আল্লাহ তার বান্দাদের অন্তর থেকে ইলম উঠিয়ে নেন না, কিন্তু দীনের আলিমদের উঠিয়ে নেয়ার ভয় করি। যখন কোন আলিম অবশিষ্ট থাকবে না তখন লোকেরা মুর্খদেরকেই নেতা বানিয়ে নিবে। তাদের নিকট জানতে চাওয়া হলে তারা না জানলেও ফাতওয়া প্রদান করবে। ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবে।[৭৬]
আল-হামদুলিল্লাহ, যে মানুষ কল্যাণ কামনা করে এবং জানার উদ্দেশ্যে ও প্রচারের জন্য আসে পর্যাপ্ত সময় থাকার কারণে তার ইচ্ছানুযায়ী সে জানতে সক্ষম হয়, এটাই তার উদ্দেশ্যে। অপরদিকে, বাড়ি থেকে বের হয়ে ইলম অর্জনের পথে কারো যদি পর্যাপ্ত সময় না থাকে এবং এমতাবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে তাহলে সে যেন আল্লাহ ও তার রসূলের পথেই মুহাজির হিসাবে মৃত্যু বরণ করলো। আল্লাহ তা'আলা তার প্রতিদান ধার্য করবেন। অনেকেই পাঠদান ও ফাতওয়া দেয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করে, ফলে এ অবস্থা তার অনুশোচনার কারণ হয়। কেননা, তার পাঠদান ও ফাতওয়ায় যে ভুল রয়েছে তা স্পষ্ট হয়। আর একবার কোন কথা মুখ ফসকে বের হলে ঐ কথা ব্যক্তকারীর দিকেই ন্যস্ত হয়। সুতরাং যারা ইলম অর্জনের পথে আছে তারা যেন ত্বরান্বিত না করে, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকে। কোন ব্যাপারে ফাতওয়ার নির্ভুলতা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত যেন বিলম্ব করে। আর ইলম মালের মত নয় যে, মানুষ খরিদ্দার খুঁজবে বরং যে ক্রয় করবে সেই তা পাবে। ইলম হলো নাবীগণের উত্তরাধিকার। এ জন্য ফাতওয়া দেয়ার সময় দু'টি বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখা আবশ্যক।
প্রথম: আল্লাহ তা'আলা এবং তার শরী'আত থেকে কথা বলতে হবে।
দ্বিতীয়: আল্লাহর রসূল জ্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। এ আদর্শের কারণেই আলিমগণ নাবীগণের উত্তরাধিকারী।
৮২. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আল-কুরআন ও জ্বহীহ সুন্নাহর ইলম অর্জনের দিক থেকে মানুষ কয় শ্রেণীতে বিভক্ত হতে পারে?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, কিতাব-সুন্নাহর ইলম অর্জনের দিক থেকে মানুষ চার শ্রেণীতে বিভক্ত।
প্রথম: কুরআন-সুন্নাহর ইলম অর্জন থেকে বিমুখ হয়ে যেসব শিক্ষার্থী মাযহাবী ফিক্বহের ইলম অর্জনের দিকে ধাবিত হয় তারা সাধারণত ঐ ফিক্বহী ধারায় আমল করে থাকে। আর মাযহাবী কিতাবের লেখকগণ যা বলেছেন তারা কেবল সেটারই অনুসরণ করে।
দ্বিতীয়: কুরআন সংশ্লিষ্ট যেসব জ্ঞান অর্জনের প্রতি শিক্ষার্থীরা আগ্রহী তার মধ্যে রয়েছে তাজভীদের ইলম অথবা কুরআনের অর্থ বুঝা অথবা শব্দাবলীর ই'রাব (কারক চিহ্ন) প্রদান এবং বালাগাত (অলংঙ্কার শাস্ত্র) ইত্যাদির জ্ঞান। অন্যদিকে, সুন্নাত ও হাদীছের জ্ঞান অর্জনের দিক থেকে শিক্ষার্থী খুব কমই রয়েছে। নিঃনন্দেহে হাদীছের জ্ঞানে তাদের সীমাবদ্ধতা আছে।
তৃতীয়: হাদীছ, সনদ বিশ্লেষণ, রাবীদের দোষ-ত্রুটি, হাদীছ গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যান করা সম্পর্কিত জ্ঞানার্জনে যারা আগ্রহী; কুরআনের জ্ঞানে তারা খুবই দুর্বল। কোন একটি আয়াতের স্পষ্ট তাফসীর জিজ্ঞেস করা হলে তারা ঐ আয়াতের তাফসীর জানে না বলে অবহিত করে। অনুরূপভাবে তাওহীদ ও আক্বীদা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলেও তারা উত্তর দেয় না। নিঃসন্দেহে এটাই হলো তাদের বড় সীমাবদ্ধতা।
চতুর্থ: কিছু শিক্ষার্থী রয়েছে একত্রে কিতাব ও জ্বহীহ সুন্নাহর জ্ঞানার্জনে উৎসাহী এবং কিতাব-সুন্নাহর জ্ঞান অনুযায়ী সালাফগণ যে রীতির উপর ছিলেন তারা তা অর্জন করে। এ সত্ত্বেও বিদ্বানগণের কিতাব সমূহে যা উল্লেখ আছে তারা তা থেকে বিমুখ হয় না বরং ঐ সব কিতাবাদীকে তারা মানদন্ড হিসাবে ব্যবহার করে এবং আল্লাহর কিতাব ও নাবীর সুন্নাহ বুঝার ক্ষেত্রে এ কিতাবাদীর সহযোগিতা গ্রহণ করে থাকে। কেননা, আলিমগণ কাওয়ায়েদ, রীতি-পদ্ধতি ও উছুল রেখে গেছেন এসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হতে থাকবে। এসব কিতাব থেকে তাফসীরের শিক্ষার্থী তাফসীর, হাদীছের শিক্ষার্থী হাদীছের জ্ঞানার্জন করবে অথবা উভয়ের অর্থের ব্যাখ্যা শিখবে। তাই ঐসব কিতাবাদী কুরআন-সুন্নাহ বুঝার কেন্দ্র স্বরূপ এবং আলিমগণ তাদের কিতাবে যা বলেছেন জ্ঞানার্জনে তা সহযোগী হিসাবে গণ্য। এটাই হলো ইলম অর্জনের উত্তম প্রকার।
আমাদের জন্য লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ উত্তম পদ্ধতি অবলম্বন পূর্বক আমরা যেন জ্ঞানার্জনে সমতা বজায় রাখি। আর জ্ঞানার্জনে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় যে কোন
প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হই। আর সর্বশেষ উত্তম প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হতে না পারলে ইল্ম অর্জনের পদ্ধতি যাচাই করা আমাদের উপর আবশ্যক হবে।
কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ} [النساء: ٥٩] হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর এবং আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের (সূরা আন-নিসা ৪:৫৯)।
আলিম ও আমীরগণ اولى الأمر এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, {فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ} [النساء: ٥٩]
কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রসূলের দিকেই প্রত্যার্পণ কর (সূরা আন-নিসা ৪:৫৯)।
বিশেষত ছাহাবী ও তাবেঈনদের থেকে সর্বদা কোন কিছু গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাবো যে, তারা আল্লাহর কিতাব ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ মোতাবেক ফায়ছালা করতেন। এ সত্ত্বেও আমি বলবো না যে, আলিমদের কথা গ্রহণ করা ওয়াজিব নয়। বরং তাদের কথা মূল্যায়নযোগ্য, গুরুত্বপূর্ণ ও বিবেচিত। কিতাব- সুন্নাহ বুঝতে তাদের কথার সহযোগীতার প্রয়োজন হয়।
৮৩. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কতিপয় শিক্ষার্থী চাকুরী ও বেতন লাভের উদ্দেশ্যে লেখা-পড়া করে অনুরূপভাবে যারা বিনিময় লাভের উদ্দেশ্যে গবেষণার বিষয় লিপিবদ্ধ করে অথবা শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তা তৈরি করে অথবা জ্ঞানগত সনদ পাওয়ার জন্য কিছু কিতাব তাহক্বীক-বিশ্লেষণ করে তাদের ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলার জন্যই একনিষ্ঠভাবে নিয়্যাত করা শিক্ষার্থীদের উপর ওয়াজিব। আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যেই শারঈ ইল্ম অর্জনের জন্য কোন হরফ, কালিমা-শব্দ কোন একটি পৃষ্ঠা যা কিছু হোক শিখবে। কিন্তু ইল্ম অর্জনের মাধ্যমে কিভাবে আল্লাহর নৈকট্য লাভের নিয়্যাত করা সম্ভব? এর জবাব হচ্ছে, তা এভাবে সম্ভব যে, আল্লাহ তা'আলা ইল্ম অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। আর আল্লাহ তা'আলা কোন কিছুর নির্দেশ জারি
করলে আদেশ পালনের উদ্দেশ্যে তা সম্পন্ন করা মানুষের জন্য ফরজ। এটাই আল্লাহর ইবাদত। কেননা, আল্লাহর নির্দেশ পালন করা, তিনি যা নিষেধ করেন তা বর্জন করা, তার সন্তুষ্টি কামনা করা এবং তার শান্তি সম্পর্কে সতর্ক থাকার নাম ইবাদত।
ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে একনিষ্ঠ নিয়্যাত হলো নিজের ও অন্যের অজ্ঞতা দূর করা। এর নিদর্শন হলো ইলম অর্জনের পর তার আমলে ইলমের প্রভাব থাকবে, তার রীতি-পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসবে, অন্যের উপকার সাধনে সে হবে উৎসাহী। আর এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ইলম অর্জনে তার নিয়্যাত ছিল নিজের ও অন্যের অজ্ঞতা দূর করা। এভাবে তার আদর্শ হয় সৎ কল্যাণকর।
এ রীতির উপরই সালাফে জ্বলিহীন বহাল ছিলেন। তাদের পরবর্তীদের মধ্যে বর্তমানে এ বিষয়ে অনেক মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংখ্যাগুরু শিক্ষার্থীদের কারো নিয়্যাত এমন যে, তা দ্বারা দুনিয়া ও আখেরাতের কোন কল্যাণই সাধন হবে না বরং ক্ষতি হবে। কেবল পার্থিব স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে ঐ সব শিক্ষার্থী সনদ অর্জনের নিয়্যাত করে। এ ব্যাপারে রসূল জ্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করে বলেন,
"من تعلم علماً مما يبتغي به وجه الله عز وجل، لا يتعلمه إلا ليصيب به عرضاً من الدنيا، لم يجد عرف الجنة يوم القيامة أي ريحها".
যে ইলম দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা যায়, কোন লোক যদি দুনিয়াবী স্বার্থ লাভের জন্য তা শিক্ষা করে, তবে সে ক্বিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না।[৭৭]
প্রশ্নকারী উল্লেখ যা করেছে তদানুযায়ী ঐসব শিক্ষার্থীর জন্য দুঃখ হয়, যারা বিনিময় লাভের উদ্দেশ্যে কোন গবেষণা কর্মে লিপ্ত থাকে অথবা বার্তা তৈরি করে অথবা যারা কতিপয় কিতাব তাহক্বীক-বিশ্লেষণ করে কাউকে বলে ঐ সব কিতাবের ব্যাখ্যা হাযির করো দেখি, অমুকের গবেষণা কর্ম মিলিয়ে দেখাওতো। অতঃপর এ বিশ্লেষক সম্মান পাওয়ার উদ্দেশ্যে নিজের সন্দর্ভ-থিসিস অথবা অনুরূপ কিছু পেশ করে যা কিছু শিক্ষকের মাঝে সাড়া পায়-স্বীকৃতি লাভ করে। এটিই মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে ও বাস্তবতার পরিপন্থী বিষয়। আমি মনে করি, এটি আমানতের খেয়ানতের একটি প্রকার। এখানে শুধু সনদ লাভের
উদ্দেশ্যেকে আবশ্যক মনে করা হয়েছে, কিছু দিন পর যদি তাকে তার বিষয়- বস্তু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় সে উত্তর দিতে সক্ষম হয় না।
এজন্য আমি বদ নিয়্যাতের অশুভ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করবো ঐসকল ভাইকে যারা কিতাব তাহক্বিক করে অথবা ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে। আমি বলবো, তাহক্বিকের ক্ষেত্রে অন্য কিতাবের সাহায্যে নেয়াতে কোন সমস্য নেই। কিন্তু সম্পূর্ণ গবেষণা কর্মটি যেন হুবহু অন্যের থেকে নকল না হয়। আল্লাহ সকলকে উপকারী ইলম অর্জন ও সৎ আমলের তাওফীক্ব দান করুন। তিনিই সাড়া দানকারী ও সর্বশ্রোতা।
৮৪. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, চিকিৎসা শাস্ত্র ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায় কি দীনের বুঝ আছে?
জবাবে শাইখ বলেন, এসব বিষয় দীনি শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা মানুষ তাতে কিতাব-সুন্নাহর জ্ঞান শিক্ষা করতে পারে না। কিন্তু মুসলিমরা এসবের মুখাপেক্ষী। এজন্য কতিপয় বিদ্বান বলেন, বিভিন্ন কারিগরি, চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারিং, জুওলজি এবং এসবের মত অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞানার্জন করা ফরযে কিফায়ার অন্তর্ভুক্ত। তবে এ সব শারঈ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। শারঈ বিষয় ব্যতিরেকে কেবল এসবের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর পূর্ণ স্বার্থ লাভ হতে পারে না। এজন্য যারা এসব বিষয়-বস্তু নিয়ে পড়া লেখা করে আমি ঐসব শিক্ষার্থী ভাইকে সতর্ক করবো যে, মুসলিম উম্মাহর উপকার সাধন করা এবং তাদের সম্মান বজায় রাখাই যেন এসব বিষয়ে শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে হয়। আজকে লাখ লাখ মুসলিম উম্মাহ যদি এসব বিষয় কাজে লাগাতো যা মুসলিমদের উপকারে আসে তাহলে অনেক কল্যাণ লাভ হতো। আমাদের প্রয়োজন পূরণে কাফিরদের মুখাপেক্ষী হওয়ার দরকার হতো না। কখনো কখনো এসব বিষয়ে শিক্ষা অর্জন করা দরকার হয়। কিন্তু এসব বিষয়কে দীনের অন্তর্ভুক্ত বলে উদ্দেশ্যে নেয়া যাবে না। কেননা, তা দীনি বিষয় নয়। আর আল্লাহর শরী'আতের বিধি-বিধান, আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কিত বিষয়ই হলো দীনি বিষয়।
৮৫. ইলম অর্জনে কিভাবে ইখলাছ গঠিত হবে?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ের মাধ্যমে ইখলাছ গঠিত হতে পারে।
প্রথম: আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্যই নিয়্যাত করা। কেননা, আল্লাহ তা'আলা এটারই নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,
{ফَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ}
জেনে রাখ, নিঃসন্দেহে আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য ইলাহ নেই (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৯)।
আল্লাহ তা'আলা ইলম অর্জনের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন, তার ভালোবাসাকে আবশ্যক করে, সন্তুষ্টি অর্জিত হয় এমন বিষয় পালন করার প্রতি তিনি উৎসাহ ও নির্দেশ দিয়েছেন।
দ্বিতীয়: আল্লাহর শরী'আত আয়ত্ব করার নিয়্যাত করতে হবে। কেননা, শিক্ষা করা, মুখস্থ করণ অথবা লিখনীর মাধ্যমে আল্লাহর শরী'আত আয়ত্ব করা যায়।
তৃতীয়: শরী'আত রক্ষা করা এবং এর প্রতিবন্ধকতা নিরসন করার নিয়্যাত করতে হবে। কেননা, আলিমদের মাধ্যমে যদি শরী'আত সংরক্ষণ না হতো কোন প্রতিরক্ষক না থাকতো তাহলে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহঃ) সহ অন্যান্য আলিমদেরকে বিদ'আতীদের বিরূদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে দেখা যেত না। আলিমগণ বিদ'আতীদের বিদ'আত বাতিলের বর্ণনা দিয়েছেন। আমরা দেখতে পাই যে, ঐসকল আলিম অনেক কল্যাণ লাভ করেছেন।
চতুর্থ: মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শরী'আত অনুসরণের নিয়্যাত করতে হবে। আর শরী'আত অনুসরণ সম্ভব নয় যতক্ষণ না তা জানা যায়।
পঞ্চম: ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে নিজের এবং অন্যের অজ্ঞতা দূর করার নিয়্যাত করতে হবে।
৮৬. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কতিপয় মানুষ বলে, ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে বর্তমান যুগে নিয়্যাতের বিশুদ্ধতা একটি জটিল ব্যাপার অথবা পরিস্থিতি অনুসারে কখনো সঠিক নিয়্যাত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে; শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশেষত যারা চিন্তামূলক বস্তুবাদী ইলম অর্জন করে; সনদ পাওয়াই কি তাদের উদ্দেশ্যে নয়?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, আমরা বলবো, তুমি দুনিয়াবী স্বার্থ লাভের জন্য সনদ লাভের উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করলে এ ক্ষেত্রে তোমার নিয়্যাত ফাসেদ-ভ্রান্ত বলে গণ্য হবে। অপরদিকে মানুষের উপকার করার জন্য ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে সনদ লাভ হলে তা যথাযথ। কেননা, তুমি জানো যে, আজকাল সনদ ব্যতিরেকে জাতির জন্য বৃহৎ উপকারী পদ-মর্যাদা লাভ করা সম্ভব নয়। মানুষের উপকার সাধনের উদ্দেশ্যে সনদ লাভের নিয়্যাত করলে তা ভাল। এ ধরনের ইচ্ছা বিশুদ্ধ নিয়্যাত বিরোধী নয়।
৮৭. শাইখের কাছে প্রশ্ন হলো, ইলম অনুযায়ী আমল করার ব্যাপারে আপনার উপদেশ কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, ইলম অনুযায়ী আমল করা আবশ্যক। কেননা, ইলমের ফলাফল হলো আমল। কেননা, ইলম অনুসারে আমল না করলে ক্বিয়ামতের দিন প্রথম কাতারের জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। যেমন বলা হয়ে থাকে,
وعالم بعلمه لم يعمل ... معذب من قبل عباد الوثن
ইলম অনুযায়ী আলিমের আমল না হলে মূর্তিপূজকের আগে তাকে শাস্তি দেয়া হবে।
আর ইলম অনুসারে আমল না হলে ইলম হবে অকার্যকর-বরকতহীন এবং তা হবে স্মৃতিভ্রষ্ট। এ মর্মে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
ফَبِمَا نَقْضِهِمْ مِيثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةٌ يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ وَنَسُوا حَظًّا مِمَّا ذُكِّرُوا به [المائدة: ١٣]
তারা তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে আমি তাদেরকে লা'নত দিয়েছি এবং তাদের অন্তরসমূহকে করেছি কঠোর। তারা শব্দগুলোকে আপন স্থান থেকে বিকৃত করে এবং তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছে, তার একটি অংশ তারা ভুলে গিয়েছে (সূরা আল-মায়িদা ৫:১৩)।
এ ভুলে যাওয়ার বিষয়টি স্মৃতিহীন হওয়া অথবা আমল না করা উভয়টির অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ ব্যক্তি অর্জিত ইলম ভুলে যাবে অথবা আমল করবে না। কেননা, আরবী ভাষায় আভিধানিক অর্থে কোন কিছু ভুলে যাওয়া বলতে তা পরিত্যাগ
করা বুঝায়। অপরদিকে ইলম অনুযায়ী আমল করলে আল্লাহ তা'আলা তা বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَالَّذِينَ اهْتَدَوْا زَادَهُمْ هُدًى} . [محمد: ۱۷] .
যারা হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছে আল্লাহ তাদের হেদায়াত প্রাপ্তি আরো বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে তাদের তাকওয়া প্রদান করেন (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৭)। আর আল্লাহ তা'আলা তাদের তাক্বওয়াও বৃদ্ধি করে দেন। এজন্য তিনি বলেন,
{و آتاهم تقواهم} [محمد: ۱۷]
তাদেরকে তাদের তাকওয়া প্রদান করেন (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৭)।
ইলম অনুযায়ী আমল করলে আল্লাহ তা'আলা তাকে এমন ইলমের উত্তরাধিকারী করেন যা সে জানতো না। এ কারণে কতিপয় সালাফ বলেন, আমলের মাধ্যমে ইলম বাড়তে থাকে নচেৎ তা বিনষ্ট হয়।
৮৮. শাইখের নিকট প্রশ্ন হলো, ইলম অর্জনে কোন বিষয়গুলো সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীর জন্য আবশ্যক?
জবাবে শাইখ (র) বলেন, আমানতদার একজন বিশ্বস্ত শাইখের নিকট ইলম অর্জন করা আবশ্যক। কেননা, বিশ্বস্ততাই শক্তি আর এ শক্তি বজায় রাখতে আমানত রক্ষা করা আবশ্যক। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ} [القصص: ٢٦] .
নিশ্চয় আপনি যাদেরকে মজুর নিযুক্ত করবেন তাদের মধ্যে সে উত্তম, যে শক্তিশালী বিশ্বস্ত (সূরা আল-ক্বাছাছ ২৮:২৬)।
কখনো দেখা যে, অনেক আলিম বিভিন্ন বিষয়ের উপর শাখা-প্রশাখাগত গভীর জ্ঞানের অধিকারী। কিন্তু তাদের আমানতদারীতা নেই। তারা তোমাকে এমনভাবে ভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যাবে তুমি বুঝতেই পারবে না। অপরদিকে একজন নির্ভরযোগ্য শাইখ ছাড়া তুমি নিজে নিজে শুধু কিতাব অধ্যয়ন করে প্রকৃত ইলম অর্জন করতে পারবে না। এজন্য বলা হয়ে থাকে, কেবল কিতাবই যার দলীল সঠিকের চেয়ে তার ভুল বেশি। কারণ সে কিতাব নামক এমন সমুদ্রে ভেসে বেড়ায় যার কোন উপকূল নেই। আর সে এ সমুদ্রের নির্দিষ্ট গভীরতা নির্ণয়
করতেও সক্ষম নয়। পক্ষান্তরে যে শিক্ষার্থী কোন বিশ্বস্ত শাইখের নিকট ইলম অর্জন নিয়োজিত থেকে যে সব বৃহৎ উপকার লাভ করে তা হলো: (১) قصر المدة তথা সময়ের স্বল্পতা (অর্থাৎ ইলম অর্জনে কম সময় ব্যয় হয়)
(২) قلة التكلفة পরিশ্রমের কমতি (তথা অল্প পরিশ্রমে সহজে ইলম অর্জন করা যায়)।
(৩) শাইখের স্বরনাপন্ন হয়ে ইলম অর্জন করা সঠিকতার অধিক নিকটবর্তী। কেননা, শাইখ কোন বিষয় নিজে ভালভাবে জেনে-বুঝে শিক্ষার্থীর নিকট বর্ণনা করেন। জ্ঞানগত-ইলমী বিষয় আমানত হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীকে জ্ঞানদানের জন্য তিনি অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণ করেন।
অপরদিকে, যারা শুধু কিতাবের উপরই নির্ভর করে তাদেরকে রাত-দিন ইলম অর্জনের জন্য চেষ্টা করতে হয়। অতঃপর আলিমদের কথা তুলনা করার জন্য শিক্ষার্থী যেসব কিতাব অধ্যয়ন করে তাতে বিভিন্ন আলিমদের দলীলগুলোর মধ্যে কোনটি সঠিক? এ নিয়ে সে শঙ্কাবোধ করে। অতঃপর সে হয়ে যায় কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমরা দেখতে পাই যে, ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) যখন দু'জন বিদ্বানের কথা বর্ণনা করতেন চাই তা زاد المعاد অথবা إعلام الموقعين থাক তিনি প্রথম কথার দলীল সাব্যস্ত করে ব্যাখা করলে আমরা ঐ কথাটি সঠিক বলে মনে করি আর এটাও মনে করা হয় কোন অবস্থাতেই এ কথা পরিবর্তন করা বৈধ নয়। অতঃপর তিনি যখন ঐ কথা প্রত্যাহার করে এর বিপরীত ব্যাখ্যা করত সিন্ধান্তে উপনিত হন তখন আমরা পরবর্তী কথাটিই সঠিক বলে ধরে নিই। এভাবে শিক্ষার্থীর মাঝে সন্দেহ ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়। তাই একজন বিশ্বস্ত শাইখের শরণাপন্ন হয়ে পাঠ গ্রহণ করা আবশ্যক।
৮৯. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, বিতর্ক চর্চার জন্য কতিপয় প্রাথমিক শিক্ষার্থী ইবনে হাজম (রহঃ) এর المحلى کتاب পাঠ করে। আপনি যখন তাদেরকে এ উপদেশ দিবেন যে, এটা পূর্ববর্তীদের পন্থা তখন তারা বলে, আমরা এ কিতাব পাঠ করি চর্চার জন্য। এভাবে কিতাব পাঠ করা কি জ্বহীহ? জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, ইবনে হাজম (রহঃ) এর মুনাযারা-বিতর্ক পদ্ধতি জটিল। তিনি বিতর্কের ক্ষেত্রে কঠোরতা আরোপ করেন। এ ধরনের বিতর্কের
মাধ্যমে বিরোধী পক্ষকে কখনো গালি দেয়া হয়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। আমি আশঙ্কা করছি যে, প্রাথমিক ছোট শিক্ষার্থীরা ইবনে হাজমের কিতাব পাঠ করলে তার বিতর্ক পদ্ধতির দিকে তারা ফিরে আসবে। তার বিতর্ক পদ্ধতি সহজ হলে তা অবশ্যই উত্তম হতো। গভীর ইলম অর্জিত হলে ইনশাল্লাহ শিক্ষার্থী বুঝতে পারবে ইবনে হাজমের বিতর্ক পদ্ধতি থেকে কিভাবে উপকৃত হতে হয়। অতঃপর গভীর ইলম অর্জনের পর সে তার কিতাব অধ্যয়ন করে বুঝবে। একারণে আমি প্রাথমিক শিক্ষার্থীদেরকে তার কিতাব পাঠ করার উপদেশ দেই না। তবে হক্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য উত্তম পন্থায় বিতর্ক চর্চা করা আবশ্যক। অনেকেই গভীর ইলমের অধিকারী সত্ত্বেও তারা হক্ব প্রতিষ্ঠা করণে উত্তম পন্থায় তর্ক করতে সক্ষম নয়।
৯০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ফিক্বহ বিষয়ে শিক্ষার্থী ইলম অর্জন করতে চাইলে উছুলে ফিক্বহের উপর নির্ভরশীল না হওয়া কি তার জন্য উচিত হবে?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, ফিক্বহ বিষয়ে কোন শিক্ষার্থী জ্ঞানার্জন করতে চাইলে ফিক্বহ এবং উছুলে ফিক্বহ উভয় বিষয়ে একত্রে জ্ঞানার্জন করা আবশ্যক। যাতে সে এ নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞানার্জন করতে পারে। তবে উছুলের জ্ঞান ছাড়াই ফিক্বহ জানা সম্ভব। কিন্তু ফিক্বহ ছাড়া উছুল জানা সম্ভব নয়। ফিক্বহ ছাড়া ফক্বিহ হওয়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ ফক্বিহের জন্য উছুলে ফিক্বহের উপর নির্ভরশীল না হওয়াও সম্ভব। তবে ফিক্বহ শিক্ষা করতে চাইলে উছুলে ফিকুহের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এজন্য উছুল বিষয়ের আলিমগণ মতানৈক্য করেছেন যে, শিক্ষার্থীকে প্রথমে উছুলুল ফিক্বহের জ্ঞানার্জন করতে হবে। যাতে এর উপর ফিক্বহী জ্ঞানের ভিত্তি গঠিত হয়। আর ফিক্বহের সঠিক নিয়ম কানুনের মাধ্যমে মানুষ যেন আমল, ইবাদত ও লেন-দেনে প্রয়োজনীয় সমাধান খুঁজে পায়।
৯১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কতিপয় শিক্ষার্থীকে দেখা যায়, জ্ঞানগত কোন মাসআলা নিয়ে তার দলীলের আলোকে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করত ঐ মাসআলাকে কেন্দ্র করে আলিমদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়। অতঃপর জ্ঞানে অপরিপক্ক ঐ শিক্ষার্থী আলিমের সমাবেশে উপস্থিত হয়ে আলিমকে বলে, আপনি এরূপ এরূপ যা বলছেন সে ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা আপনাকে দয়া করুন। এটাতো হারাম। অতঃপর আলিম বলে কিভাবে হারাম? প্রতিউত্তরে সে বলে, আপনি কি নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথার আলোকে জবাব দিচ্ছেন নাকি অমুক অমুক ব্যক্তির কথার উপর ভিত্তি করে জবাব দিচ্ছেন?
অতঃপর শিক্ষার্থী এমন দলীল উপস্থাপন করে যা ঐ আলিম জানে না। কেননা, আলিম হলেও সব বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণরূপে জ্ঞাত নন। সর্বোপরি এটা প্রকাশ পায় যে, ঐ শিক্ষার্থী আলিমের চেয়ে অধিক জানেন। এ পরিস্থিতির আলোকে আপনার মতামত কি?
জবাবে শাইখ (আ) বলেন, মাসআলা বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটতে দেখা যায়, মানুষ কোন মাসআলা নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করে অতঃপর আলিমদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়। যেমনটা উল্লেখ করা হল। নিজের ইলম প্রকাশ করা ও অন্যের ইলম দুর্বল প্রতিপন্ন করার জন্য নয় বরং ইলম অর্জন ও হকু জানার উদ্দেশ্যে মানুষের প্রশ্ন করা আবশ্যক। মোদ্দা কথা হলো যে বড় তার প্রতি শ্রদ্ধা-শিষ্টাচার বজায় রাখা উচিত। বড়দের কারো ভুল পরিলক্ষিত হলে তা একান্তে অনুকূল পরিস্থিতে তুলে ধরা আবশ্যক। অথবা ঐ আলিমের সাথে সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করা দরকার অথবা শিষ্টাচার বজায় রেখে তার সাথে কথা বলা আবশ্যক। কথা হলো যে আলিম আল্লাহকে ভয় করে তার নিকট হকু স্পষ্ট হলে শীঘ্রই তিনি সে দিকেই প্রত্যাবর্তন করবেন। আর নিজের ভুল সিন্ধান্ত থেকে ফিরে এসে তিনি মানুষের মাঝে হক্ব ব্যক্ত করবেন।
৯২. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের সময় নষ্ট করা ও তা অপচয় রোধের ব্যাপারে আপনার দিক-নির্দেশনা কি?
জবাবে শাইখ (আ) বলেন, শিক্ষার্থীরা কয়েকভাবে সময় নষ্ট করে তা হলো:
প্রথম: যা পড়া হয়েছে তা পুনরাবৃত্তি ও পর্যালোচনা ছেড়ে দেয়া।
দ্বিতীয়: সহপাঠীদের সাথে এমন আলোচনায় বসা যাতে তাদের জন্য কোন উপকারীতা নেই।
তৃতীয়: শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর দিক হচ্ছে মানুষের কথার অনুসরণ করা এবং উপকারহীন কথা যা বলা হয়েছে, বলা হয় এবং উপকার নেই এমন বিষয় যা অর্জিত হয়েছে, অর্জন হয়। সন্দেহাতীত এটি তার ঈমানের দুর্বলতা। কেননা, নাবী জ্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"من حسن إسلام المرء تركه ما لا يعنيه". কোন ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্যতা হলো তার উপকারহীন বিষয় ছেড়ে দেয়া। [৭৮]
অনর্থক আলাপচারিতায় লিপ্ত থাকা এবং বেশি বেশি অহেতুক প্রশ্ন করার কারণে সময় নষ্ট হয়। এটা প্রকৃতপক্ষে মানুষের অভ্যাসগত ব্যাধি। আমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট এ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। এটাই বড় শঙ্কার বিষয়। এসব অহেতুক কর্মের কারণে কখনো সে এমন ব্যক্তির শত্রুতা পোষণ করে যার সাথে শত্রুতা করা ঠিক নয় এবং এমন লোকের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে যে বন্ধু হওয়ার উপযুক্ত নয়। এ ধরনের যে সব বিষয়ে গুরুত্ব দেয়ার কারণে ইলম অর্জন হতে বিরত থেকে মনে করা হয় যে, তা হক্বের জন্য সহায়ক স্বরূপ। আসলে এসব কর্ম-কাণ্ড মোটেই হজ্বের সহায়ক নয়। বরং এসবের মাধ্যমে নিজেকে অনর্থক কাজে নিয়োজিত রাখা হয় মাত্র। মানুষের নিকট সহজে কোন বিষয়ে সঠিক সংবাদ পৌঁছলে সে তা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু সে ঐ সংবাদ নিয়েই ব্যস্ত থাকবে না এবং তা নিয়ে বড় চিন্তা-ভাবনাও করবে না। কেননা, এ কারণে শিক্ষার্থী ইলম অর্জন থেকে অহেতুক বিষয়ে ব্যস্ত থাকবে। আর এটা হবে তার জন্য বিশৃঙ্খলার কারণ। এমনিভাবে ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলে জাতির মাঝে দেখা দিবে দলবিচ্ছিন্নতা।
৯৩. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, জনসমাবেশে শিক্ষার্থীর নিকট শিক্ষার্থীর মাসআলা জানতে চাওয়া বৈধ হবে কি? যার জবাব দেয়া হলে উপকার লাভ হবে।
জবাবে শাইখ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, শিক্ষার্থী এবং জনসাধারণ যে বিষয়ে প্রশ্ন করবে তার জবাব দেয়া আলিমের জন্য বৈধ। আর আলিম নিজেকে প্রকাশ করার জন্য কোন বিষয়ে জবাব দিবে না। কেননা, প্রশ্নকারী কখনো বলে যে, আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করছি, কিন্তু অমুক কেন উত্তর দেয়। এ ধরনের কথা বলায় নিজের আমিত্ব ও দাম্ভিকতা প্রকাশ পায় না? আমরা বলবো, ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে এসব উদ্দেশ্যে নয় বরং ইলম ছড়িয়ে দেয়াই উদ্দেশ্যে হতে হবে। আর মানুষ জানে না যে, তার ভাইয়ের অন্তরে কি আছে যতক্ষণ না তা বর্ণনা করে। কোন কাজে মানুষ নিজের বড়ত্ব প্রকাশের ইচ্ছা না করে থাকলে কাজটি সঠিক হলে তা ভুল বলা ঠিক নয়। তাই সর্বোপরি ইলম ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে জবাব দেয়া হলে তাতে কোন সমস্যা নেই।
৯৪. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, মিডিয়া কি ইলম অর্জনের কোন পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত হয়? বাস্তবে কিভাবে এর মাধ্যমে উপকৃত হওয়া যায়?
জবাবে শাইখ (সা) বলেন, এ মিডিয়া ইলম অর্জনের একটি মাধ্যম এতে কারো সন্দেহ নেই। মিডিয়ার মাধ্যমে ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে অনেক উপকার লাভ
করি, এ কারণে আমাদের প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত নি'আমতকে আমরা অস্বীকার করি না। কেননা, আমরা যেখানেই থাকি না কেন এর মাধ্যমে আলিমদের কথা আমাদের নিকট পৌঁছে যায়। আমরা গৃহে অবস্থান করলে সাধারণত আলিম ও আমাদের মাঝে বেশ দুরত্ব বজায় থাকে। আমরা ঘরে বসে সহজেই এ মিডিয়ার মাধ্যমে ঐ আলিমের কথা শুনতে পাই। তাই এটা আল্লাহর নি'আমতের অন্তর্ভুক্ত। এটা আমাদের জন্য একটা নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। এর মাধ্যমে সর্বত্র ইলম ছড়িয়ে দেয়া যায়। এর মাধ্যমে বাস্তবে উপকার লাভের ধরণ হলো মানুষ তার নিজের অবস্থা অনুযায়ী উপকার লাভ করবে। উদাহরণ স্বরূপ যারা গাড়ি চালায় তারা মিডিয়ার মাধ্যমে শুনে শুনে উপকার লাভ করতে সক্ষম। আবার খাদ্য গ্রহণ অথবা চা-কফি পানের সময়েও অনেকে এর মাধ্যমে নসিহত শুনে শুনে উপকৃত হয়। এখানে মূলত উপকার লাভের ধরণই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রত্যেকে তার নিজের অনুকূল অবস্থার আলোকে মিডিয়ার মাধ্যমে উপকার লাভ করবে। আমাদের পক্ষে এটা বলা সম্ভব নয় যে, এর মাধ্যমে উপকার লাভের সাধারণ নীতি আছে।
৯৫. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কোনটি উত্তম রাত জেগে ইবাদত করা নাকি ইলম অন্বেষণে নিয়োজিত থাকা?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, রাত জেগে ইবাদত করার চেয়ে ইলম অর্জন করতে থাকা উত্তম। কেননা, ইলম অর্জন সম্পর্কে ইমাম আহমদ (রহঃ) বলেন, নিজের এবং অন্যের অজ্ঞতা দূরিভূত করার বিশুদ্ধ নিয়তে ইলম অর্জন করলে তার সাথে কোন জিনিসেরই তুলনা হবে না। আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে রাতের প্রথমাংশে মানুষকে ইলম শিক্ষা দেয়ায় নিয়োজিত থাকা রাত জেগে ইবাদতের চেয়ে উত্তম। তবে ইলম অন্বেষণ ও ইবাদত উভয়টি একত্রে সম্পন্ন করলে আরো উত্তম। সম্ভব না হলে শারঈ ইলম অর্জনই উত্তম। এজন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমানোর পূর্বে আবু হুরাইরা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কে বিতর জ্বলাত আদায় করার নির্দেশ দিতেন।
আলিমগণ বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উক্ত নির্দেশের কারণ হলো আবূ হুরাইরা (রাঃ) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীছ রাতের প্রথমভাগে মুখস্থ করতেন এবং শেষভাগে তিনি ঘুমাতেন। তাই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমানোর পূর্বে তাকে বিতর জ্বলাত আদায় করার নির্দেশ দিতেন।
৯৬. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে দাঈ হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য কোন দিক-নির্দেশনা আছে কি? কেবল ইলম অর্জনে নিয়োজিত থাকলে দাওয়াত দান থেকে কি বিরত থাকা হয় না?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, ইলম অর্জন ছাড়া যে দাওয়াত দেয়া হয় তাতে কল্যাণ নেই। অর্থাৎ ইলম বিহীন দাঈর অনেক কল্যাণই ছুটে যায়। তাই আল্লাহর দিকে দাওয়াত দানের সাথে ইলম অর্জন করা শিক্ষার্থীর উপর ওয়াজিব। মসজিদে কাউকে ইলম অর্জন করতে দেখলে তাকে দাওয়াত দিতে শিক্ষার্থীর জন্য কি কোন প্রতিবন্ধকতা আছে? নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য বাজারের উদ্দেশ্যে বের হলে আল্লাহর দীন বিমুখ ব্যক্তিকে দাওয়াত দিতে কি তার কোন অসুবিধা আছে? যখন সে মাদ্রাসায় উপস্থিত হয়ে দেখতে পায় যে, শিক্ষার্থীরা আল্লাহর দিকে দাওয়াত দান হতে বিমুখ তখন তাদের হাত ধরে দাওয়াতী কাজে নিয়ে যেতে তার কোন প্রতিন্ধকতা আছে কি? তবে পাপাচারীতার সাথে কাউকে বিরোধী মনে হলে, অসৎ কাজ ছেড়ে না দিলে, তার প্রতি অতিষ্ট হলে, তাকে সংশোধন করা সম্ভব না হলে সে ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা তার নাবীকে বলেন,
{ফَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ وَلَا تَسْتَعْجِلْ لَهُمْ} [الأحقاف : ٣٥] .
তুমি ধৈর্য ধারণ কর, যেমন ধৈর্য ধারণ করেছিল সুদৃঢ় সংকল্পের অধিকারী রাসূলগণ। আর তাদের জন্য তাড়াহুড়া করো না (সূরা আল-আহক্বাফ ৪৬:৩৫)।
সুতরাং ধৈর্য ধারণ করা মানুষের উপর ওয়াজিব। নিজের অথবা অন্যের মাঝে কোন সমস্যা দেখতে পেলে তা সমাধানের ব্যাপারটি আল্লাহর উপর ন্যস্ত করবে। কোন এক যুদ্ধে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একটি আঙ্গুল রক্তাক্ত হলে তিনি বলেছিলেন,"هل أنت إلا أصبع دميت وفي سبيل الله ما لقيت ".
তুমি একটি আঙ্গুল ছাড়া আর কিছু নও; তুমি রক্তাক্ত হয়েছো আল্লাহর পথেই [৭৯]
৯৭. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, কোন মাসআলা নিয়ে আলিমের ইজতেহাদের পর জ্বহীহ বিধান উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হলে তার হুকুম কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, কোন মাসআলা নিয়ে ইজতেহাদ করলে আলিম কখনো সঠিক সিন্ধান্তে উপনিত হন এবং কখনো তিনি ভুল করেন। যেমন বুরাইদাহ (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে এসেছে,
"وإذا حاصرت أهل حصن فأرادوك أن تترلهم على حكم الله فلا تترلهم على حكم الله، ولكن أنزلهم على حكمك فإنك لا تدري أتصيب فيهم حكم الله أم لا". رواه مسلم.
তুমি কোন দূর্গ অবরোধ করার পর তারা তোমার নিকট আল্লাহর হুকুমে দূর্গ থেকে বেরিয়ে আসার আবেদন করলে তুমি তাদেরকে বেরিয়ে আসার অনুমতি দিও না, বরং তাদেরকে তোমার নিজের হুকুমে বেরিয়ে আসার অনুমতি দাও। কারণ তোমার জানা নেই যে, তাদের ব্যাপারে তুমি আল্লাহর হুকুম কার্যকর করতে পারবে কি না।[৮০] নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"إذا حكم الحاكم فاجتهد فأصاب فله أجران، وإن أخطأ فله أجر واحد".
বিচারক ইজতেহাদে সঠিক সিন্ধান্তে উপনিত হলে তার জন্য রয়েছে দু'টি প্রতিদান আর ভুল হলে রয়েছে একটি প্রতিদান।[৮১]
আমরা কি একথা বলবো, মুজতাহিদ ভুল করলেও তিনি সঠিক সিন্ধান্তে বহাল থাকেন?
জবাবে বলা হয়েছে, কেউ কেউ বলেন, মুজতাহিদদের প্রত্যেকে সঠিক সিন্ধান্ত গ্রহণ করেন, আবার কেউ বলেন, প্রত্যেক মুজতাহিদ সঠিক নন। আরো বলা হয়, উছুল ছাড়াই শাখাগত বিষয়ে মুজতাহিদ সঠিক রায় দেন। আর উছুলের ক্ষেত্রে বিদ'আতপন্থীদেরকে সঠিক বলা থেকে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। যা হোক, বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, ইজতেহাদের দিক থেকে প্রত্যেক মুজতাহিদ সঠিক রায় দেন। অপরদিকে, হক্বের অনুকূলতার দিক থেকে তিনি সঠিক রায় দেন অথবা ভুল করেন। এটা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথা দ্বারা প্রমাণিত।
সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, সঠিক রায় ও ভুল সিন্ধান্ত উভয়টি মুজতাহিদগণের দ্বারা ঘটে থাকে। হাদীছের ভাষ্য ও দলীল দ্বারা বুঝা যায়, ইজতেহাদের বিষয়টি শাখাগত ও উছুলের অন্তর্ভুক্ত। আর এটাও প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না। কিন্তু সালাফদের ইজমা বিরোধী ইজতেহাদে ভুল সর্বদা ভুল বলেই গণ্য। আর এটা সম্ভন নয় যে, শাখাগত ও উছুলের বিষয়ে মুজতাহিদ সব সময় সঠিক বিবেচিত হবেন আর সালাফগণ সঠিক বলে গণ্য হবেন না। ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ ও ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রহঃ) দীনের শাখা ও উছুল এ ধরনের শ্রেণী বিন্যাসকে অস্বীকার করেন। তারা বলেন, ছাহাবীদের যুগের পর এ শ্রেণী বিন্যাস সৃষ্ট।
আমরা দেখতে পাই যে, কতিপয় আলিম এ শ্রেণী বিন্যাসের মাধ্যমে দীনের উছুলগত গুরুত্বপূর্ণ বিধানকে শাখার অন্তর্ভুক্ত করেছেন অথচ তা শাখা নয়। যেমন: الصلاة। এটি ইসলামের স্তম্ভ বা খুঁটি। তারা আক্বীদাগত ব্যাপারে এমন কিছু বিষয় বের করেন যা নিয়ে সালাফগণ মতানৈক্য করেছেন। ঐ সকল আলিমগণ বলেন, জ্বলাত হচ্ছে দীনের শাখার অন্তর্ভুক্ত। আর এটা আক্বীদাগত বিষয় নয়। এটা আক্বীদার শাখা মাত্র। এ ধরনের কথার জবাবে আমরা বলবো, যদি আক্বীদাগত বিষয়কে উছুল উদ্দেশ্যে নেয়া হয় তাহলে সম্পূর্ণ দীনই উছুল হিসাবে গণ্য। কেননা, শরী'আতসম্মত আক্বীদা ছাড়া আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য অর্থনৈতিক ও শারীরিক ইবাদত পালন করা সম্ভব নয়। এটাই হলো আমলের উপর আক্বীদা। যদি এটাকে আক্বীদা হিসাবে গণ্য করা না হতো তাহলে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইবাতদই বিশুদ্ধ হতো না। যা হোক, সঠিক কথা হলো উছুল ও শাখা যা কিছু নামকরণ করা হোক না কেন উভয় ক্ষেত্রে ইজতেহাদের দরজা উন্মুক্ত। কিন্তু সালাফগণ যেসব পন্থা বের করেননি তা সাধারণত গ্রহণযোগ্য নয়।
৯৮. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, যারা ইজতেহাদ সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করে বলে যে, বর্তমান যুগ মুজতাহিদ মুক্ত; এ ব্যাপারে আপনার ভাষ্য কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, সঠিক কথা হলো, সুন্নাহর দলীল অনুসারে ইজতেহাদের দরজা অবশিষ্ট রয়েছে। যেমন উমার ইবনে আছ এর হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
"إذا حكم الحاكم فاجتهد فأصاب فله أجران، وإن أخطأ فله أجر واحد".
বিচারক ইজতেহাদে সঠিক সিন্ধান্তে উপনিত হলে তার জন্য রয়েছে দু'টি প্রতিদান আর ভুল হলে রয়েছে একটি প্রতিদান। [৮২]
যারা বলে, এখন ইজতেহাদ নেই, বর্তমান যুগ মুজতাহিদ মুক্ত উক্ত হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় তাদের এ কথাটি দুর্বল। তবে কিতাব-সুন্নাহ হতে বিমুখ হয়ে কেবল মানুষের মতামতের উপর ভিত্তি করে ইজতেহাদ করা ভুল। বরং কিতাব-সুন্নাহ হতে যতটুকু সম্ভব মাসআলা উদ্ঘাটন করে তা গ্রহণ ওয়াজিব। সুন্নাহর আধিক্যতা এবং ভিন্নতায় কোন বিষয়ে একটা হাদীছ শুনেই ফায়ছালা গ্রহণ করা উচিত হবে না যতক্ষণ না ঐ ব্যাপারে স্পষ্ট দলীল সাব্যস্ত হয়। কেননা, কখনো এমনও ঘটে যে, কোন হুকুম সম্পর্কে মানসুখ অথবা মুক্বাইয়াদ কিংবা আম হাদীছ রয়েছে অথচ এ ব্যাপারে ব্যক্তির হয়তো বিপরীত ধারণা রয়েছে। আর যদি এটা বলা হয় যে, তোমরা কুরআন সুন্নাহ দেখে কিছু বুঝতে পারবে না; কারণ তোমরা মুজতাহিদ নও তাহলে এ ধরনের কথা বলাও ঠিক হবে না। সর্বোপরি আমরা বলবো যে, ইজতেহাদের দরজা উন্মুক্ত। এজন্য পূর্ববর্তী আলিমদের কথাকে সব সময় উপেক্ষা করা অথবা তাদের অসম্মান করা বৈধ নয়। কেননা, তারা মাসআলা উদ্ঘাটনে চেষ্টা-সাধনা ও ইজতেহাদ করেছেন। এ ব্যাপারে তারা ত্রুটি মুক্ত নন। তাদের দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করা, তারা যে মাসআলা দিয়েছেন তাতে ত্রুটি বের করে তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে মানুষের সামনে তা তুলে ধরা তোমার জন্য বৈধ নয়। কেননা, শত্রুর গিবত করা হারাম হয়ে থাকলে ঐ সব আলিমের গিবt করা কিভাবে সম্ভব যারা দলীল ভিত্তিক মাসআলা উদঘাটনে নিজেদেরকে বিলিন করে দিয়েছেন? অতঃপর কথা হলো, শেষ যুগে কিছু লোক বলতে থাকবে, ঐসব আলিম কিছুই জানে না, তাদের মাসআলায় ত্রুটি রয়েছে। তারা এরূপ আরো অনেক কথাই বলবে। বিরল কিছু মাসআলায় যদিও ত্রুটি হয়ে থাকে কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ মাসআলা উদ্ঘাটন করা তাদের উদ্দেশ্যে ছিল না। বরং তারা চর্চার উদ্দেশ্যে কাওয়ায়েদ ও উছুলের ভিত্তিতে মাসআলায় সমতা বিধান করেছেন।
৯৯. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, ইমাম নববী, ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহঃ) এর ব্যাপারে কতিপয় লোক বলে যে, তারা বিদ'আতপন্থী। এ শ্রেণীর আলিমদের আক্বীদায় কোন ভুল ছিল কি? যদিও ইজতেহাদ ও তা'বিলে ভুল
থাকার কারণে তাদেরকে বিদ'আতপন্থী বলা হয়ে থাকে। এখানে ইলম ও আমলগত বিষয়ে ভুলের মাঝে কোন পার্থক্য আছে কি?
জবাবে শাইখ () বলেন, তাদের বাস্তব অবদান ও বৃহৎ উপকার মুসলিম উম্মাহর জন্য স্বীকৃত। যদিও কতিপয় নছ (দলীলে) উল্লেখিত ছিফাত গুণাবলী সম্পর্কে তাদের ত্রুটি রয়ে গেছে তদুপরি তাদের মর্যাদা ও বৃহৎ উপকারের কারণে তা লজ্জাকর নয়। তাদের ইজতেহাদ ও সুক্ষ্ম তা'বিলে ত্রুটি হয়ে থাকলে তা নিয়ে আমরা বিরূপ মন্তব্য করবো না। আমরা কামনা করি যে, তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করবেন। কল্যাণকর, উপকারী ও প্রশংসাযোগ্য অবদান যা কিছু তারা রেখে গেছেন আল্লাহ তা'আলা এসবের বিণিময় দান করবেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهبن السيئات} [هود: ١١٤] নিশ্চয়ই ভালকাজ মন্দকাজকে মিটিয়ে দেয় (সূরা হুদ ১১:১১৪)।
আমি মনে করি, তারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআ'তের অনুসারী। আর এটাই সাক্ষ্যে বহন করে যে, তারা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহর জন্য খেদমত করেছেন। আর সুন্নাহর সাথে সম্পৃক্ত এমন সর্ব প্রকার কলুষতা থেকে সুন্নাহকে রক্ষার জন্য তারা ছিলেন উৎসাহী এবং যা দ্বারা হুকুম সাব্যস্ত হয় এমন দলীল বিশ্লেষণে ছিলেন তৎপর। কিন্তু গুণাবলী সম্পর্কি আয়াত ও হাদীছের ব্যাপারে তাদের মতভেদ আছে অথবা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআ'তের কতিপয় ইজতেহাদ সম্পর্কে তাদের বিরূপ মন্তব্য রয়েছে। আমরা কামনা করি, আল্লাহ তা'আলা যেন তাদের সাথে ক্ষমা সুন্দর আচরণ করেন।
আর আক্বীদার ক্ষেত্রে বলবো, আক্বীদায় সালাফদের রীতি বিরোধী কোন ত্রুটি ঘটলে নিঃসন্দেহে তা ভ্রষ্টতার অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে এক্ষেত্রে দলীল প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ভ্রষ্ট বলে আখ্যা দেয়া সমীচিন নয়। আক্বীদাগত ভুল-ভ্রান্তির উপর দলীল সাব্যস্ত হলে তা হক্ব বিরোধী বিদ'আতের অন্তর্ভুক্ত হবে যদিও ব্যক্তি সালাফপন্থী হয়ে থাকে। সাধারণত তাদেরকে বিদ'আতী বলে আখ্যা দেয়া যাবে না এবং সালাফীও বলা যাবে না। বরং সালাফদের যেসব রীতির উপর তারা বহাল ছিলেন তদানুযায়ী সালাফ বলে গণ্য হবেন আর যেসব রীতির বিরোধীতা করা হয়েছে সেক্ষেত্রে বিদ'আতী বিবেচিত হবেন।
যেমন ফাসিকের ব্যাপারে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআ'তের কথা হলো, যতটুকু ঈমান রয়েছে তার কারণে ব্যক্তি মুমিন আর অবাধ্যতার কারণে তিনি ফাসিক।
সুতরাং সাধারণ কথায় এককভাবে কোনটির দিকেই ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করে গুণান্বিত করা যায় না। আর এটিই হলো ইনসাফ যে ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিয়েছেন। তবে বিদআ'তের সীমা অতিক্রম করলে ব্যক্তি মিল্লাত থেকে বের হয়ে যাবেন, এক্ষেত্রে তার কোন মূল্যায়ন নেই।
আর আমল ও ইলমগত ভুলের মাঝে পার্থক্যের ব্যাপারে কথা হলো, আমি মূলত এ ধরনের ভুলের মাঝে পার্থক্যকরণ জানি না। তবে অত্যাবশক ইলমগত ঈমান সম্পর্কে আমরা যা জানি যে ব্যাপারে সালাফদের সবাই একমত ছিলেন এবং কিছু বিষয়ে মতভেদ করেছেন তা ছিল শাখাগত বিষয়, মৌলিক নয়। কম সংখ্যকই এ শাখাগত বিষয়ে বিরোধীতা করেছেন। কখনো সালাফগণ শাখাগত ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। যেমন: নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি তার প্রভুকে জাগ্রত অবস্থায় দেখেছিলেন। এরূপ কবরে প্রশ্নকারী দু'জন ফিরিস্তা সম্পর্কে তাদের মতভেদ আছে। আরো মতভেদ হলো, বিচারের মাঠে দাড়ি পাল্লায় আমল অথবা আমলনামা নাকি আমলকারী ব্যক্তিকে রাখা হবে। কবরে রূহ ছাড়া শুধু শারীরিক শাস্তি হবে কি না? দায়িত্ব বর্তায়নি এমন নাবালক শিশুদেরকে কবরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি না? পূর্ববর্তী উম্মাতকে কবরে জিজ্ঞেস করা হবে কি না যেমনভাবে এ উম্মাতকে জিজ্ঞেস করা হবে। জাহান্নামের উপর নির্মিত রাস্তার বৈশিষ্ট্য কেমন হবে? জাহান্নামের আগুন নিভে যাবে নাকি সর্বদা স্থায়ী হবে? এরূপ অন্যান্যে বিষয়ে মতভেদ আছে। এসব মাসআলায় জমহুর আলimদের সঠিক সমাধান আছে। এ বিষয়ে মতানৈক্য দুর্বল বলে বিবেচিত হবে। অনরূপভাবে আমলগত ব্যাপারেও শক্তিশালী ও দুর্বল মতভেদ রয়েছে। এজন্য আমাদেরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দু'আ জানতে হবে তা হলো,
"اللهم فاطر السماوات والأرض، عالم الغيب والشهادة، أنت تحكم بين عبادك فيما كانوا فيه يختلفون، اهدني لما اختلف فيه من الحق بإذنك إنك تهدي من تشاء إلى صراط مستقيم".
হে আল্লাহ! আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, প্রকাশ্য ও গোপন বিষয়সমূহের জ্ঞানের অধিকারী। তোমার বান্দারা যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করে তুমিই সে গুলোর ফায়ছালা করবে। সত্য ও ন্যায়ের যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করা
হয়েছে সে বিষয়ে তুমি আমাকে পথ দেখাও। তুমিই তো যাকে ইচ্ছা সরল-সহজ পথ দেখিয়ে থাকে। [৮৩]
১০০. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, একই বিষয়ে ফাতওয়া দানে দু'জন মুফতির মাঝে মতভেদ হয় এর কারণ কি? আর এক্ষেত্রে ফাতওয়া গ্রহণে করণীয় কি?
জবাবে শাইখ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এখানে দু'টি কারণ রয়েছে। প্রথম: কখনো এমন হয় যে, দু'জন মুফতির মধ্যে একজন যা জানেন অপর জনের তা জানা নেই। তাই প্রথম মুফতি তথ্যের দিক থেকে বেশি অগ্রগামী। তাই যে ব্যাপারে তার পর্যবেক্ষণের জ্ঞান রয়েছে তা অপরের নেই।
দ্বিতীয়: কোন বিষয় উপলব্ধি করার ব্যাপারে মানুষের মাঝে অনেক মতানৈক্য আছে। কখনো কখনো মানুষ ইলমের দিক থেকে সমান হয়ে থাকে কিন্তু বুঝার ক্ষেত্রে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তা'আলা কাউকে গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন বুঝ দান করেন। তাই অন্যের চেয়ে তিনি একটু বেশিই জানেন। তার ইলমের আধিক্যতা ও প্রবল বুঝ থাকার কারণে অন্যের চেয়ে তিনি সঠিকতার অধিক নিকটে অবস্থান করেন। অপরদিকে, দু'জন আলিমের মাঝে মতভেদ দেখা দিলে ফাতাওয়া জানতে আগ্রহী ব্যক্তি যাকে ইলম, আল্লাহভীরুতা ও ধার্মিকতার দিক থেকে অধিক সঠিক মনে করবেন তার নিকট থেকেই তিনি ফাতওয়া জেনে নিবেন। যেমন মানুষ অসুস্থ হলে দু'জন চিকিৎসকের মধ্যে রোগী যাকে অধিক অভিজ্ঞ মনে করে সে তার কাছ থেকেই চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করে থাকে। তেমনি দু'জন মুফতি যদি যোগ্যতার দিক থেকে সমান হয়ে থাকেন কাউকে প্রাধান্য দেয়া সম্ভব না হয় তাহলে ইচ্ছানুযায়ী যে কোন একজনের তার কাছে থেকে ফাতওয়া গ্রহণ করতে হবে।
১০১. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, আলিমদের দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করে যেসব শিক্ষার্থী তাদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে ঐসব শিক্ষার্থীর ব্যাপারে আপনার উপদেশ কি?
জবাবে শাইখ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, নিঃসন্দেহে আলিমগণ ভুল করে এবং সঠিক সিদ্ধান্তে উপনিত হয়। তাদের কেউ ত্রুটি মুক্ত নয়। তাদের ভুল-ত্রুটিকে অপবাদ হিসাবে নির্ধারণ করা উচিত নয়, বৈধ নয়। কারণ সঠিক বিষয়ে উপনিত
হতে না পারলে বৈশিষ্ট্যগতভাবে মানুষ ভুল করে। কোন আলিম অথবা দাঈ অথবা কোন মাসজিদের ইমামের ভুল-ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে তা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তাদের প্রতি এ দোষ আরোপ করা হতে বিরত থাকতে হবে। কেননা, কখনো বর্ণনা করা অথবা বুঝের ক্ষেত্রে ভুল-ত্রুটি ঘটে থাকে অথবা যার নিকট হতে তিনি শুনেছেন তা শ্রবণের ক্ষেত্রেও অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি ঘটতে পারে। তাই সর্বাবস্থায় কোন আলিম অথবা দাঈ অথবা কোন মাসজিদের ইমাম অথবা কোন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির ভুল-ত্রুটির কথা শুনেই তা তাদের প্রতি আরোপ করা ঠিক নয়। ঐ ত্রুটি সম্পর্কে জানতে হবে যে, আসলেই তার মাধ্যমে তা ঘটেছে কি না। তাদের কারো ত্রুটি হয়ে থাকলে যা ভুল মনে করা হয়েছে তা স্পষ্ট করতে হবে। এক্ষেত্রে দু'টি বিষয় স্পষ্ট হবে, ভুল প্রমাণিত হলে তিনি সংশোধন করে নিবেন অথবা যা ভুল মনে করা হতো তা ভুল নয় বরং সঠিক বলে বিবেচিত। অতঃপর ঐ আলিমের কথার তাৎপর্য স্পষ্ট হলে আমরা যা বিশৃঙ্খলা মনে করতাম তা বিশেষত যুব শ্রেণী থেকে দূরিভূত হবে।
আর কোন কথা শুনার পর তা বলার ব্যাপারে সংযত হওয়া, উপদেশ গ্রহণ করা এবং যা বর্ণনা করা হয়েছে স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তার যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা যুব শ্রেণী এবং অন্যদের উপর ওয়াজীব। কোন সমাবেশ বিশেষত জন সমাবেশে কোন কথা প্রসঙ্গে এভাবে বলা যে, অমুকের ব্যাপারে তুমি কি বলো? যে অন্যেদের কথার বিরোধীতা করে তুমি তার সম্পর্কে কি বলো? এ ধরনের প্রশ্ন তুলে সাধারণত কথা ছড়িয়ে দেয়া ঠিক না। এভাবে ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। তাই জিহবাকে সংযত করা ওয়াজিব। মুআ'য ইবনে জাবাল (রাঃ) কে নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"ألا أخبرك بملاك ذلك كله؟ قلت: بلى يا رسول الله فأخذ بلسان نفسه، وقال: "কف عليك هذا. قلت: يا رسول الله وإنا لمؤاخذون بما نتكلم به. قال: "ثكلتك أمك يا معاذ، وهل يكب الناس في النار على وجهوهم أو قال على مناخرهم إلا حصائد ألسنتهم".
আমি তোমাকে এসব কাজের নির্যাস সম্পর্কে অবহিত করবো না? আমি বললাম, হাঁ। তিনি তার জিহবা ধরে বলেন, তুমি এটা সংযত রাখো। আমি বললাম, হে আল্লাহর নাবী! আমরা যা কিছু বলি সে জন্য কি পাকড়াও হবো? তিনি বলেন,
হে মুআ'য! তোমার মা তোমার জন্য কাঁদুক। মানুষতো তার অসংযত কথাবার্তার কারণে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। [৮৪]
শিক্ষার্থীসহ সবাইকে আমি উপদেশ দিবো যে, তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং আলিম ও আমীরদের বিরোধীতা না করে কারণ তারা জাতিকে পরিচালিত করেন। সাধারণ মানুষের গীবত করা কাবীরাহ গুনাহ আর আলিম-আমীরদের গীবত করা তার চেয়েও মারাত্মক। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে তার ক্রোধ থেকে রক্ষা করুন। আমাদের ভাইদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা দূরিভূত করুন। তিনি অত্যন্ত দয়াশীল।
১০২. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, যারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত (الفرق والتحزب) হয় তাদের ব্যাপারে আপনার দিক-নির্দেশনা কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, আল্লাহর দীনে বিভক্ত হওয়া নিষিদ্ধ এবং হারাম। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ} [آل عمران : ١٠٥] .
তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা বিভক্ত হয়েছে এবং মতবিরোধ করেছে তাদের নিকট স্পষ্ট নির্দশনসমূহ আসার পর। আর তাদের জন্যই রয়েছে কঠোর আযাব (সূরা আলে ইমরান ৩:১০৫)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ فَرِّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بما كانُوا يَفْعَلُونَ} [الأنعام: ١٥٩] .
নিশ্চয় যারা তাদের দীনকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং দল-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোন ব্যাপারে তোমার দায়িত্ব নেই। তাদের বিষয়টি তো আল্লাহর নিকট। অতঃপর তারা যা করত, তিনি তাদেরকে সে বিষয়ে অবগত করবেন (সূরা আল-আনআ'ম ৭:১৫৯)।
সুতরাং মুসলিম উম্মাতের জন্য বিভিন্ন দলে বিভক্ত বৈধ নয়। প্রত্যেক দলের রয়েছে ভিন্ন রীতি-পদ্ধতি। সুতরাং একই রীতি-পদ্ধতিতে আল্লাহর দীনের উপর একতাবদ্ধ থাকা ওয়াজিব। আর ঐ মানহাজ-পদ্ধতিই হলো নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পথ নির্দেশনা, খুলাফায়ে রাশেদীন ও ছাহাবীদের পন্থা। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"عليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين من بعدي تمسكوا بها وعضوا عليها بالنواجذ، وإياكم ومحدثات الأمور فإن كل بدعة ضلالة".
আমার পরে তোমরা আমার সুন্নাত ও হিদায়াত প্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাত অবশ্যই অবলম্বন করবে, তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরবে। অবশ্যই তোমরা বিদআ'ত কাজ পরিহার করবে। কারণ প্রতিটি বিদআ'তই ভ্রষ্টতা। [৮৫]
وليس من هدي النبي صلى الله عليه وسلم وخلفائه الراشدين أن تتفرق الأمة أحزابا لكل حزب أمير ،ومنهج، وأمير الأمة الإسلامية واحد وأمير كل ناحية واحد، من قبل الأمير العام.
বিভিন্ন দলে বিভক্ত হওয়া নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও খুলাফায়ে রাশেদীনের পথ নির্দেশ নয়। প্রত্যেক দলের রয়েছে নির্দিষ্ট আমীর ও রীতি-পদ্ধতি। অথচ মুসলিম উম্মাতের আমীর একটাই। সব দিক হতে সাধারণ আমীর-শাসক একজনই।
নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সফরে আমীর নিযুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। কেননা, মুসাফিরগণ তাদের গ্রাম ও শহর ছেড়ে প্রবাসী হয়েছেন সেখানেও সাধারণ আমীরের দিক হতে তাদের আমীর রয়েছে। কখনো এমন সমস্যা সৃষ্টি হয় যে, গ্রাম ও শহর পৌঁছতে তাদের দেরী হয়ে যায় অথবা এমন ছোট ছোট সমস্যা যা শহর-গ্রামের আমীরদের নিকট তুলে ধরা সম্ভব নয়। যেমন: কোন জায়গায় বসবাস করা, দূরে গমন করা, ভ্রমণের জন্য অনুমতি প্রদান করা অথবা বিরত থাকা অনুরূপ অন্যান্য বিষয়। সুতরাং এসব সমস্যা সমাধানের জন্য এক্ষেত্রে মুসাফিরগণ একজন আমীরের শরণাপন্ন হলে তা হবে প্রজ্ঞাপূর্ণ কাজ।
মূলত উম্মাতের জন্য আমার উপদেশ হচ্ছে তারা দীনের উপর একতাবদ্ধ থাকবে বিচ্ছিন্ন হবে না। কোন ব্যক্তি অথবা দলকে দীন হতে বের হতে দেখলে তারা তাদেরকে নসিহত করবে। তাদের সামনে হক্ব তুলে ধরবে আর দীনের বিরোধীতার ব্যাপারে সতর্ক করবে।
আরো বর্ণনা করবে যে, বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেয়ে হক্বের উপর একতাবদ্ধ থাকা সঠিক ও কল্যাণের কাছাকাছি পৌঁছা যায়। আর অনুমোদিত ইজতেহাদ সম্পর্কে যখন কোন মতানৈক্য দেখবে তখন ভিন্ন মতের অনুসারীদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখবে এ কারণে মতবিরোধে লিপ্ত হবে না। কেননা, নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে ছাহাবীগণ ও তার পরবর্তীদের মাঝে ইজতেহাদ নিয়ে দ্বন্দ্ব হতো অথচ তাদের মাঝে আন্তরিক মনো মালিন্য ও বিচ্ছিন্নতা ছিল না। আমাদের মাঝে তাদের আদর্শ থাকা উচিত। যে পন্থায় পূর্ববর্তীগণ সংশোধন হয়েছেন ঐ পন্থায় মুসলিম উম্মাতেকে সংশোধন হতে হবে। আল্লাহ তা'আলা যা পছন্দ করেন এবং যে বিষয়ে সন্তুষ্ট হন তিনি যেন আমাদেরকে তা পালন করার তাওফীক দান করেন।
১০৩. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, জনসাধারণ এবং যারা ইলম অর্জনে সক্ষম নন তাদের উপর করণীয় কি?
জবাবে শাইখ (রহঃ) বলেন, যাদের জ্ঞান নেই এবং ইজতেহাদে সক্ষমতাও নেই বিদ্বানদের নিকট জিজ্ঞাসাবাদ করা তাদের উপর ওয়াজীব। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ফَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} [الأنبياء: ٧]
সুতরাং তোমরা জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর যদি তোমরা না জান (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৭)।
বুঝা যায়, আলিমদের কথা গ্রহণ করার উদ্দেশ্যেই আল্লাহ তা'আলা এ নির্দেশ দিয়েছেন। এটাই হলো তাক্বলীদ। কিন্তু তাকুলিদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসরণ আবশ্যক মনে করে সর্বাবস্থায় ঐ মাযহাবের রীতি-পদ্ধতি গ্রহণ করা এবং মাযহাবের রীতি দলীল বিরোধী হলেও এ মাযহাবীয় রীতি আল্লাহরই বিধান বলে বিশ্বাস করা নিষিদ্ধ। অপরপক্ষে, যারা ইজতেহাদে সক্ষম যেমন: ইলমের পূর্ণতা আছে এমন শিক্ষার্থী দলীল নিয়ে ইজতেহাদ করতে পারবে এবং সঠিক অথবা সঠিকের অধিক নিকটবর্তী যা কিছু বুঝতে সক্ষম হবে তা গ্রহণ করবে। আর হক্বের ক্ষেত্রে ইলমের গভীরতা, দীনদারিতা ও ধার্মিকতার দিক হতে
জনসাধারণ এবং প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা যাকে অধিক সঠিক বলে মনে করবে তারা ঐ আলিমের অনুসরণ করবে।
১০৪. শাইখের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, শারঈ জ্ঞানের শিক্ষার্থীরা ছাহাবীদের কথাকে উচুঁ মনে করে সে দিকে ধাবিত হয়, এটা দলীল হিসাবে কি আমলযোগ্য?
জবাবে শাইখ বলেন, নিঃসন্দেহে ছাহাবীদের কথা অন্যের চেয়ে সত্যতার অধিক নিকটবর্তী। তাদের কথা দুটি শর্তসাপেক্ষ দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য।
প্রথম: তাদের কথা আল্লাহর কিতাব ও রসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ বিরোধী হবে না।
দ্বিতীয়: অন্য ছাহাবীদের কথার বিরোধী হবে না।
যদি তাদের কথা কিতাব-সুন্নাহর বিরোধী হয় তাহলে আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহই হবে দলীল। আর ছাহাবীদের ত্রুটি ক্ষমাপ্রাপ্ত। অন্যদিকে, কোন ছাহাবীর কথা অন্য ছাহাবীর কথার বিরোধী হলে উভয়ের কথার মাঝে প্রাধান্যতা খুঁজতে হবে। যার কথা অগ্রগণ্য বলে মনে হবে তার অনুসরণ হবে যথাযথ। আর কথার প্রাধান্যতার বুখারীর নিয়ম হলো ছাহাবীদের অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া অথবা শরীয়াতের সাধারণ কাওয়ায়েদ অথবা অনুরূপ নিয়মের সাথে তাদের কথার মিল থাকা। এ হুকুম কি সকল ছাহাবীর জন্য আম-সাধারণ হিসাবে গণ্য নাকি তা খুলাফায়ে রাশেদীনের অথবা আবু বকর ও উমার এর সাথে নির্দিষ্ট। নিঃসন্দেহে আবু বকর ও উমার এর কথা উক্ত দুটি শর্তের আলোকে দলীলযোগ্য। অন্যদের চেয়ে তাদের কথা অগ্রগণ্য। আবার উমার এর চেয়ে আবু বকর এর কথা অধিকারপ্রাপ্ত। হুযাইফা ইবনে ইয়ামান হতে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"اقتدوا بالذين من بعدي أبي بكر وعمر".
আমার পরে আবু বকর ও উমার এর অনুসরণ করো।
আবু কাতাদা হতে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"ফإن يطيعوا أبا بكر وعمر يرشدوا".
যদি তোমরা আবূ বকর ও উমার (আ) এর আনুগত্য করো তাহলে তারা পথ দেখাবে। [৮৭]
باب الاقتداء بسنن رسول الله صلى الله عليه জ্বহীহ বুখারীর আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামক অধ্যায়ে উমার ইবনে খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
هما المرءان يقتدى بهما,
তাদের দু'জনের (রসূল জ্বলাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকরের) আনুগত্য করতে হবে। [৮৮]
অবশিষ্ট খুলাফায়ে রাশেদীনের ব্যাপারে ইরবাদ্ধ ইবনে সারিয়া (আ) হতে বর্ণিত, সুনান ও মাসনাদে উল্লেখ করা হয়েছে, নাবী জ্বলাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين تمسكوا بها وعضوا عليها بالنواجذ".
আমার এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা তোমাদের উপর আবশ্যক। মাড়ির দাঁত দিয়ে তোমরা তা কামড়ে ধরো।[৮৯]
গুণাবলীর দিক থেকে চারজন খলীফা উত্তম। তাদের কথা দলীল হিসাবে স্বীকৃত। অন্যদিকে, অবশিষ্ট ছাহাবীগণের মধ্যে যারা ইলমের দিক থেকে সুপ্রসিদ্ধ এবং দীর্ঘকাল রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সহচর্য লাভ করেছেন তাদের কথা দলীল হিসাবে গণ্য। আর যারা এরূপ নয় তাদের কথা চিন্তা-ভাবনা করে গ্রহণ করতে হবে। ইবনুল কাইয়্যিম (এ) তার কিতাবের শুরু "إعلام الموقعين" এ উল্লেখ করেন। ইমামের ফাতওয়া পাঁচটি উছুলের উপর গঠিত।
ছাহাবীদের ফাতওয়া, ভিন্নমতের আলিমগণের ফাতওয়া; কিন্তু এখানে প্রধান্য বিস্তারকারী এবং আবশ্যক বিষয় হলো হয়তো ছাহাবীদের ফাতওয়ার সাথে ঐ
আলিমের কথার প্রধান্য বজায় থাকতে হবে নচেৎ তা দলীল বিরোধী বলে গণ্য হবে। (এভাবে যাচাই পূর্বক) প্রধান্যতা বজায় থাকলে ঐ ফাতওয়াদানকারী আলিমের দলীলের উপর আমল করা যেতে পারে।
আল্লাহ তা'আলা যেন আমাদের সকলকে হক্বের দাঈ ও সাহায্যেকারী হিসাবে কবুল করে নেন। আর বিশ্বাস, কথা ও কর্মে সঠিক সিন্ধান্ত গ্রহণের তাওফীক্ব দান করেন। এখানে তিনটি মাসআলা উল্লেখিত হয়েছে:
প্রথম মাসআলা: তোমার নিকট এমন দু'টি কথার প্রধান্যতা স্পষ্ট হয় যার বিপরীতে তুমি ফাতওয়া দিয়েছো অথবা ফায়ছালা গ্রহণ করেছো। যে ব্যাপারে ফাতওয়া অথবা ফায়ছালা দেয়া হয়েছে তা থেকে তোমার প্রত্যাবর্তন করা বৈধতা আছে কি না।
দ্বিতীয় মাসআলা: তোমার নিকট যে দু'টি কথার প্রধান্যতা স্পষ্ট হয় যার বিপরীতে তুমি ফাতওয়া দিয়েছো অথবা ফায়ছালা গ্রহণ করেছো। যে ব্যাপারে প্রধান্যতা স্পষ্ট হয় ভবিষ্যতে সে বিষয়ে তোমরা ফাতওয়া দেয়া অথবা ফায়ছালা গ্রহণ করা বৈধ হবে কি না।
তৃতীয় মাসআলা: কোন ব্যক্তির দু'টি কথার একটি দ্বারা এবং অন্য লোকের দ্বিতীয় কথার মাধ্যমে মতভেদপূর্ণ মাসআলায় ফাতওয়া দেয়া বৈধ হবে কি।
আল্লাহ তা'আলার সাহায্যে এবং তার তাওফীক্বে উক্ত গুরুত্বপূর্ণ মাসআলার জবাব নিম্নে তুলে ধরা হলো, আমরা আল্লাহর নিকট হিদায়াত ও সঠিক ফায়ছালা কামনা করি।
প্রথম মাসআলা: মানুষ যে রায়-সিন্ধান্তের উপর বহাল ছিল তা দুর্বল বলে স্পষ্ট হলে এবং অন্যের মাঝে হক্ব পাওয়া গেলে দুর্বল রায় বর্জন করত জ্বহীহ দলীল অনুসারে যা সঠিক মনে হয় তার দিকেই প্রত্যাবর্তন করা ওয়াজিব। আর আল্লাহর কিতাব, রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহর অনুসরণ, খুলাফায়ে রাশেদীনের রীতি, মুসলিমদের ইজমা ও ইমামগণের আমলের দিকে প্রত্যাবর্তন করা ওয়াজিব প্রমাণিত। আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে দলীল হলো,
{وَمَا اختلفتم فيه من شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ ذَلِكُمُ اللهُ رَبِّي عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ} [الشورى: ١٠] .
যে বিষয়েই তোমরা মতবিরোধ কর না কেন, তার ফায়সালা আল্লাহর কাছে; তিনিই আল্লাহ, আমার রব; তারই ওপর আমি তাওয়াক্কুল করি এবং তারই অভিমুখী হই (সূরা আশ শূরা ৪২:১০)।
মাসআলায় মতভেদ দেখা দিলে আল্লাহর কিতাবের দিকে প্রত্যাবর্তন করা ওয়াজিব। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذلك خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا} [النساء: ٥٩]
কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ করো তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যার্পণ কর- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর (সূরা আন নিসা ৪:৫৯)। তিনি আরো বলেন,
{وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا} [النساء: ١١٥] .
যে রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে তার জন্য হিদায়াত প্রকাশ পাওয়ার পর এবং মুমিনদের পথের বিপরীত পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে ফেরাবো যেদিকে সে ফিরে এবং তাকে প্রবেশ করাবো জাহান্নামে। আর আবাস হিসেবে তা খুবই মন্দ (সূরা আন-নিসা ৪:১১৫)।
সুতরাং বুঝা গেল, কিতাব ও সুন্নাহ হতে যা কিছু প্রমাণিত হয় সে দিকেই প্রত্যাবর্তন করা মুমিনদের পন্থা। সুন্নাহ দলীল সাব্যস্ত হওয়ার ব্যাপারে রসূল জ্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"إنه من يعش منكم فسيرى اختلافا كثيراً فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهدين من بعدي".
তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে তারা অনেক মতভেদ দেখতে পাবে, তাই আমার পরে আমার সুন্নাহ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের রীতি-পদ্ধতি অনুসরণ করা তোমাদের উপর ওয়াজিব। [৯০] এ হাদীছের অর্থ নিয়ে কিছু কথা আছে,
খুলাফায়ে রাশেদীনের কথা: তাদের মধ্যে আমীরুল মুমিনিন উমার ইবনে খাত্তাব (রা)এর কথা প্রসিদ্ধ। স্বামী, মাতা ও বৈপিত্রিয় ভাইয়ের জন্য আছাবাহ হিসাবে তিনি মিরাছ নির্ধারণ করেছেন। কখনো রেখে যাওয়া সম্পদে পরিপূর্ণভাবে তাদেরকে মিরাছে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের অংশীদারিত্বের সাথে বৈপিত্রিয় ভাইয়ের অংশ নির্ধারণ করেছেন জনৈক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করলো, আমি প্রথম বছরে বৈপিত্রিয়ের মিরাছের ব্যাপারে অন্যরকম ফায়ছালা করেছি, আপনি কিভাবে ফায়ছালা করলেন, তিনি বলেন, আমি বৈপিত্রিয় ভাইয়ের জন্য মিরাছ নির্ধারণ করেছি, অথচ তুমি সহোদর ভাইয়ের জন্য কিছুই নির্ধারণ করোনি। উমার (রা) বলেন, আমরা এভাবেই ফায়ছালা করে থাকি। ইবনু আবি শাইবা ১১/২৫৩।
فى القضاء کتاب لأبي موسى -এ তিনি বলেন, আজকে তুমি যে ফায়ছালা করবে তাতে যেন কোন কিছু তোমাকে বাধা না দেয়, তোমার রায়-সিন্ধান্ত নিয়ে পর্যবেক্ষণ করবে তাহলে ঐ রায় অনুযায়ী হক্বের পথ খুঁজে পাবে। আর বাতিলে পড়ে থাকার চেয়ে হক্ব নিয়ে পর্যালোচনা করা উত্তম।
ইজমা: এ সম্পর্কে ইমাম শাফেঈ (র) বলেন, মুসলিমগণের ইজমা হয়েছে যে, যার নিকট রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ স্পষ্ট হয়েছে কোন মানুষের কথা গ্রহণ করা তার জন্য উচিত নয়।
ইমামদের আমল: ইমাম আহমাদ (র) কোন বলার পর তার বিপরীতও বলেছেন, এ ক্ষেত্রে তিনি স্পষ্টভাবেই তার কথা থেকে প্রত্যাবর্তন করেছেন। যেমন মদ পানকারী ব্যক্তির তালাক্ব পতিত হওয়ার কথা থেকে তিনি ফিরে এসেছেন। কখনো তার শিষ্যরাও স্পষ্টভাবে তার কথা থেকে প্রত্যাবর্তন করেছেন। যেমন ইমাম আহমাদ (র) খিলাল করার কথা থেকে স্পষ্টতঃ প্রত্যাবর্তন করেছেন। যে লোক মুকিম অবস্থায় মোজার উপর মাসাহ করে সফর করলো, তাহলে মুকিম অবস্থায় তার মাসাহ পূর্ণ হলে সফর অবস্থায়ও মাসাহ পূর্ণ
হবে। আবার কখনো তিনি তার কথা থেকে প্রত্যাবর্তন করেননি। এক্ষেত্রে তার মাসআলায় দু'টি কথা আছে:
এখানে গুরুত্ব পূর্ণ বিষয় হলো প্রথম রায়-সিন্ধান্ত দুর্বল বলে স্পষ্ট হলে তা থেকে প্রত্যাবর্তন করা ওয়াজিব। প্রথম হুকুম ভঙ্গ করা তার জন্য বৈধ। তবে যাকে ফাতওয়া দেয়া হয়েছে তার জন্য প্রত্যাবর্তন করা আবশ্যক নয়। উভয় রায়-সিন্ধান্ত ইজতেহাদ ভিত্তিক। ইজতেহাদ যথাযথ হলে তা ভঙ্গ করার দরকার নেই। আর প্রথম ইজতেহাদে ভুল প্রকাশ হলে দ্বিতীয়টিতে ভুল না থাকার অন্তরায় নেই তথা ভুল থাকা সম্ভব। আবার কখনো এমন হয় যে, বাস্তবে প্রথম ইজতেহাদই সঠিক যদিও তা বাহ্যিকভাবে বিপরীত মনে হয়। তবে প্রথম-দ্বিতীয় কোন ইজতেহাদেই মানুষ ত্রুটি মুক্ত নয়।
দ্বিতীয় মাসআলা: প্রথম মাসআলার জবাব থেকেই এর জবাব জেনে নিতে হবে। আর তা হলো হকু স্পষ্ট হলে তার দিকে প্রত্যাবর্তন করা মানুষের উপর ওয়াজিব। যদিও পূর্বে ঐ হক্বের বিপরীত ফাতওয়া দেয়া হয়েছে অথবা ফায়ছালা গ্রহণ করা হয়েছে।
তৃতীয় মাসআলা: যদি মাসআলা সম্পর্কে নছ (দলীল) থাকে। তাহলে তা গ্রহণের ব্যাপারে সবাই সমান, এতে ব্যক্তিভেদে কোন পার্থক্য সৃষ্টি করা যাবে না। অপর দিকে, ইজতেহাদ বিষয়ক মাসআলা ইজতেহাদের উপরই গঠিত। যদিও ইজতেহাদ হয় কোন বিষয়ের হুকুম অথবা অনুরূপ ক্ষেত্র নিয়ে। এজন্য আমীরুল মুমিনিন উমার (যখন দেখলেন, মানুষের মাঝে মদপান বেড়ে গেছে তখন মদপানের শাস্তিও তিনি বৃদ্ধি করলেন। আর যখন দেখলেন তিন তালাকের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে না তখন তিনি জনগণের উপর আইন কার্যকর করলেন। যাতে আল্লাহর কালাম ও রসূলের সুন্নাহ শক্তিশালী হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَعَلَى الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا كُلَّ ذِي ظُفُرِ وَمِنَ الْبَقَرِ وَالْغَنَمِ حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ شُحُومَهُمَا إِلَّا مَا حَمَلَتْ ظُهُورُهُمَا أَوِ الْحَوَايَا أَو مَا اخْتَلَطَ بِعَظْمٍ ذَلِكَ جَزَيْنَاهُمْ بِبَغْيِهِمْ وَإِنَّا لَصَادِقُونَ}
ইয়াহূদীদের উপর আমি নখবিশিষ্ট সব জন্তু হারাম করেছিলাম এবং গরু ও ছাগলের চর্বিও তাদের উপরে হারাম করেছিলাম- তবে যা এগুলোর পিঠে ও ভুঁড়িতে থাকে, কিংবা যা কোন হাড়ের সাথে লেগে থাকে, তা ব্যতীত। এটি
তাদেরকে প্রতিফল দিয়েছিলাম তাদের অবাধ্যতার কারণে। আর নিশ্চয় আমি সত্যবাদী (সূরা আল-আনআ'ম ৬:১৪৬)।
সুতরাং বুঝা গেল, আল্লাহ তা'আলা তাদের অবস্থার চাহিদা অনুসারে তাদের সাথে আচরণ করেছেন এবং তাদের সীমালঙ্ঘন ও যুলুমের কারণে তিনি পবিত্র জিনিস হারাম করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَبِظُلْمٍ مِنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتِ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ كثيرا}
ইয়াহুদীদের যুলমের কারণে আমি তাদের উপর উত্তম খাবারগুলো হারাম করেছিলাম, যা তাদের জন্য হালাল করা হয়েছিল এবং আল্লাহর রাস্তা থেকে অনেককে তাদের বাধা প্রদানের কারণে (সূরা আন-নিসা ৪:১৬০)।
মদপানকারীর উপর তিনবার শান্তি পূনরাবৃত্তি হওয়ার পর চতুর্থবার হত্যা করার কথা হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, মদপানকারীকে হত্যা করার শান্তি বাস্তবে ধার্য না হওয়ায় তাদের মূলৎপাটন করা হয়নি। তাই যিনি ফাতওয়া চাইবেন অথবা যার উপর ফায়সালা আরোপ করা হবে তার চাহিদা অনুসারে তার সাথে নির্দিষ্ট আচরণ বজায় রাখতে হবে যাতে তা দলীল বিরোধী না হয়।
অনুরূপভাবে কোন বিষয় আপতিত হলে দু'জনের একজনের কথায় ফাতওয়া দেয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিলে এবং দ্বিতীয় কথার মাধ্যমে ফাতওয়া প্রদান করলে অসুবিধা নেই। এ বিষয়টি হাজ্জ অথবা উমরায় উযূ ছাড়া তাওয়াফ করার মতই। মক্কা থেকে দূরে অথবা অন্য কোন কারণে তাওয়াফ কষ্টকর হয়। এক্ষেত্রে সঠিক মতামতের উপর ভিত্তি করে উযূর শর্ত ছাড়াই তাওয়াফ বিশুদ্ধ হওয়ার ফাতওয়া দিতে হবে। আমাদের শাইখ আব্দুর রহমান সা'দী (রহঃ) মাঝে মধ্যে এমনটা করতেন। তিনি আমাকে বলেন, هناك فرق بين من فعل ومن سيفعل .وبين ما وقع وما لم يقع যারা এ নিয়ম পালন করেন এবং শীঘ্রই করবেন আর যা কিছু ঘটেছে এবং ঘটেনি তার মাঝে পার্থক্য নিহিত আছে।
ইমাম নববী (রহঃ) এর মাজমুআ'র মুকাদ্দামায় ছাইমিরি (রহঃ) বলেন, যখন মুফতি দেখবে যে, ফাতওয়া দানের ক্ষেত্রে কঠোরতা আরোপে কল্যাণ নিহিত আছে এবং যার ব্যাপারে ফাতওয়া দেয়া হবে সে বাহ্যিকভাবে বিশ্বাসী নয় এবং তার বিষয়টি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ এ ক্ষেত্রে মুফতির কঠোরতা আরোপ করা বৈধ।
যেমন ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তাকে হত্যাকারীর তাওবাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তার কোন তাওবাহ নেই। অন্যজন তাকে আবার জিজ্ঞেস করে তাওবাহ আছে কি না তিনি বলেন, তার তাওবাহ আছে। অতঃপর তিনি বলেন, আমি প্রথম জনের চোখে হত্যাকান্ড পূনরাবৃত্তির ছাপ দেখতে পাচ্ছিলাম। তার জন্য তাওবাহ নেই একথা বলে তার মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করছিলাম। আর দ্বিতীয় জন তাওবার আশাবাদী হয়ে এসেছিলো তাই আমি তাকে নিরাশ করিনি।
আর আমি যা কিছু উল্লেখ করলাম তা সব ক্ষেত্রে নিয়মিত হয় না। রেখে যাওয়া সম্পত্তি বেশি হওয়ায় কোন কাযী অথবা মুফতি যদি উক্ত আছাবাদেরকে অভাবী মনে করে কোন কথার মাধ্যমে দাদার সাথে ভাইয়ের মিরাছ নির্ধারণ করতে চাইতেন অথবা সম্পদ কম থাকায় তারা ধনী হওয়ায় তাদের মিরাছ নির্ধারণ না করার ইচ্ছা করতেন (বাহ্যিকতা ও অনুমানের কারণে) তাহলে উভয় সিন্ধান্ত বৈধ হতো না। কারণ এখানে অন্যের অধিকার ক্ষুন্ন হওয়ার সম্ভবনা আছে। এতে শারঈ অনুমতি নেই। কথা, কর্ম ও বিশ্বাসে আমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট হিদায়াত কামনা করি যাতে সঠিক পথ খুঁজে পাই।
📄 তৃতীয় পরিচ্ছেদ: ইলম অর্জনে আনুষঙ্গিক বিষয়াবলী
প্রথম আনুষঙ্গিক বিষয়: ১. ইলম অর্জনে কতিপয় বিষয় শিক্ষার্থীর খেয়াল রাখা আবশ্যক।
প্রথম: ইলমুন নাহু (ব্যাকরণ) বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে হলে সংক্ষিপ্ত মূল পাঠ মুখস্থ করতে হবে। আমি মনে করি, এ বিষয়ের প্রাথমিক শিক্ষার্থীর জন্য متن الأجرومية সবচেয়ে ভাল। কেননা, এটা স্পষ্ট, পরিপূরক ও সংক্ষিপ্ত পুস্তক। তাতে বরকত রয়েছে। অতঃপর متن ألفية ابن مالك নামক ব্যাকরণের পুস্তকটি ভাল। কেননা, এটা ইলমুন নাহুর সারসংক্ষেপ। যেমন তিনি বলেন, أحصي من الكفاية الخلاصه ... كما اقتضى غنى بلا خصاصه
ফিক্বহ বিষয়ের কিতাবসমূহের মধ্যে زاد المستنقع ভাল। কেননা, কিতাবটি ব্যাখা, টিকা-টিপ্পনী সম্বলিত ও পাঠদানের জন্য উপযুক্ত। যদিও কিছু কিতাবের মূলপাঠ এর চেয়ে ভাল। তবে এ কিতাবটিতে অনেক মাসআলা সন্নিবেশ করা হয়েছে। এ জন্য এটিই ভাল কিতাব হিসাবে গণ্য।
অপর দিকে হাদীছের কিতাবের মধ্যে উমদাতুল আহকাম عمدة الأحكام অন্যতম। তারপর এর চেয়ে 'বুলগুল মারাম' بلوغ المرام আরো ভাল। দু'টির মধ্যে কোনটি ভাল এ কথার জবাবে বলা হবে, বুলুগুল মারামই উত্তম। কেননা, এখানে অনেক হাদীছের সন্নিবেশ করা হয়েছে। এ কিতাবে ইবনে হাজার আসক্বালানী (رحمة الله) হাদীছের স্তর বর্ণনা করেছেন।
আর তাওহীদের কিতাবের মধ্যে শাইখুল ইসলাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব এর 'কিতাবুত তাওহীদ كتاب التوحيد নামক বইটি উত্তম যা আমরা পড়ি।
আর তাওহীদ আল-আসমা ওয়াছ ছিফাত সম্পর্কিত বইয়ের মধ্যে ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা রচিত 'আল-আক্বীদা ওয়াল ওয়াসিত্বীয়া' বইটি উত্তম। এটি একটি পরিপূরক, উপকারী বরকতপূর্ণ বই। বইটিতে আক্বীদার প্রত্যেক বিষয় যা গ্রহণীয় তা সংক্ষিপ্ত পাঠে বর্ণনা করা হয়েছে।
দ্বিতীয়: খুব দীর্ঘ আলোচনায় নিমগ্ন না হওয়া।
শিক্ষার্থীর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই প্রথমত সংক্ষিপ্ত পাঠ গ্রহণ করা শিক্ষার্থীর জন্য আবশ্যক। যাতে স্মৃতিপটে তা ধারণ করে রাখতে পারে। তারপর দীর্ঘ আলোচনার দিকে ধাবিত হবে। কিন্তু কতিপয় শিক্ষার্থীকে দেখা যায়, তারা গভীর অধ্যয়নে নিমগ্ন থাকে। আর কোন সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তথ্য সূত্র উপস্থাপন করে তারা বলে: মুগনি প্রণেতা বলেন, মাজমূ'উ প্রণেতা বলেন, আল-ইনছাফ প্রণেতা বলেন ও আল হাবী-প্রণেতা বলেন ইত্যাদি। এভাবে বলার মাধ্যমে তারা তাদের অধ্যয়নের গভীরতা প্রকাশ করতে চায়। কিন্তু এটা ভুল। এ ব্যাপারে আমরা শিক্ষার্থীদেরকে বলবো, আগে তোমরা সংক্ষিপ্ত পাঠ শিখো যাতে তা তোমাদের স্মৃতিপটে গেথে যায়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ হলে তোমরা দীর্ঘ আলোচনায় নিমগ্ন হতে পারো। বোধগম্যতার বিষয় হচ্ছে এটাই, যে ব্যক্তি সাঁতার কাটতে জানে না, গভীর সমুদ্রে সাঁতার কাটতে যাওয়া তার উচিত নয়। কেননা, সমুদ্রে ডুবে যাওয়া থেকে তার বিশ্বাস তাকে রক্ষা করতে সক্ষম নয়।
তৃতীয়: বিনা কারণে সংক্ষিপ্ত পাঠ গ্রহণ করা ছেড়ে দিয়ে অন্য পাঠের দিকে ধাবিত হওয়াতে বিরক্তিবোধ হতে পারে।
এটা শিক্ষার্থীর বিদ্যার্জনে বিচ্ছিন্নতার সমস্যা সৃষ্টি করে এবং একই সাথে সময় বিনষ্ট হয়। তাই প্রত্যেক দিন একটি করে কিতাব পড়া ভুল; যা বিদ্যার্জন পদ্ধতি বিরোধী বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। কোন বিষয়ের কিতাব পড়লে ঐ বিষয়ে লেগে থাকা ভাল। আর এটা ধারণা করা ঠিক নয় যে, আমি একটা কিতাব পড়ে শেষ করবো অথবা কিতাবের একটা পরিচ্ছেদ পড়বো। অতঃপর দেখা গেল, সে অন্যমনস্ক হয়েছে। এভাবে (এলোমেলো) পাঠ করার কারণেই সময় বিনষ্ট হয়।
চতুর্থ: কোন কিছুর উপকারীতা গ্রহণ করা এবং জ্ঞানগত বিষয় মনে রাখা।
এখানে ঐসব অজ্ঞাত বিষয়ের উপকারীতা সম্পর্কে বলা হচ্ছে যা এমনিতেই স্মৃতিপটে আসে না অথবা যার আলোচনা উপস্থান বিরল অথবা যে বিষয় নিয়ে নতুনভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে জেনে তার উপকারীতা গ্রহণ
করতে হবে। আর এটা লিখনীর সাথে সম্পর্কিত। তাই এ ব্যাপারে বলা ঠিক নয় যে, এসব আমার জানা আছে। এসবে সীমাবদ্ধ থাকার দরকার নেই। কারণ তা তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর এটাও বলবে না, অনেক মানুষ এসবের উপকারীতা গ্রহণ করে এবং বলে এটাতো সহজ সাধ্য বিষয়; এর আলোচনার দরকার নেই। অতঃপর সে অন্তবর্তীকালীন বা কিছু সময় পর তা আর স্মরণ করতে পারে না।
এ কারণে শিক্ষার্থীকে বলি, দুষ্প্রাপ্য কিতাব বা নতুন কোন বিষয়ের উপকারীতা গ্রহণে উৎসাহী হও। এ বিষয়ে আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) রচিত بدائع الفوائد নামক কিতাবটি উত্তম। এতে ইলম অর্জনের মৌলিক বিষয়গুলো সন্নিবেশ করা হয়েছে। এ কিতাবটির মত আলোচনা অন্য কিতাবে পাওয়া দুষ্কর। তাই এটি প্রত্যেক বিষয় সম্বলিত কিতাব। কেননা, যখনই কোন বিষয়ের মাসআলা লেখকের দৃষ্টি গোচর হয়েছে অথবা তিনি কোন উপকারীতার কথা শুনেছেন তখন তা এ কিতাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। আর এ কিতাবে আছে আক্বীদা, ফিক্বহ, হাদীছ, তাফসীর, ইলমুন নাহু এবং বালাগাত ইত্যাদি বিষয়। আর ইলম অর্জনের নিয়ম-নীতির উপর গুরুত্ব আরোপ করত উৎসাহও দেয়া হয়েছে।
আর আহকাম (বিধানবলী) সম্পর্কে আলিমগণ যেসব ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন তা হচ্ছে এর নিয়ম-নীতি। কারণ ফিক্বহী বিধি-বিধান সম্পর্কিত সকল ব্যাখ্যাই হচ্ছে নীতিমালা হিসেবে গণ্য। কেননা, এ ব্যাখ্যাই হচ্ছে বিধি-বিধানের ভিত্তি। তাই শিক্ষার্থীকে এসব ব্যাখ্যা আয়ত্ব করতে হবে। আমি শুনেছি কতিপয় ভাই এ নিয়ম-নীতিকে চার মাযহাবের সাথে সমন্বিত করে অনুসরণ করে। আমি বলবো, এভাবে কোন দল প্রতিষ্ঠা করা ভাল। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন সঠিক ব্যাখ্যা পেলে তা শর্তযুক্ত করে মূলত সব মাযহাবেরই অনুসরণ করা হয়। কেননা, প্রত্যেক ব্যাখ্যার উপর অনেক মাসআলা ভিত্তি করে। তাই ইলম অর্জনের জন্য রয়েছে নিয়ম-নীতি। আর প্রত্যেক নিয়ম অনেক আংশিক বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়। উদাহরণ স্বরূপ পানির পবিত্র হওয়া অথবা না হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহের সৃষ্টি হলে বিষয়টি বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে। তাই বিষয়ে হুকুম অথবা পদ্ধতিগত কারণ রয়েছে। এব্যাপারে এটাও ব্যাখ্যা করা হয় যে, মূল সব সময় মূলই থাকে। তাই পবিত্রতার মাঝে অপবিত্রতার সন্দেহ সৃষ্টি হলে তা পবিত্র বলেই গণ্য হয় অথবা অপবিত্র কোন জিনিসে পবিত্রতার সন্দেহ হলে তা অপবিত্রই ধরে নেয়া হয়। কেননা, মূল সব সময় একই রকম হয়।
আর শিক্ষার্থী উৎসাহিত হয়ে এ বিষয়ে সকল ব্যাখ্যা সংকলন করত সমন্বয় সাধন করে তা সুবিন্যস্ত করবে। অতঃপর ভবিষ্যতে এর উপর ভিত্তি করে আংশিক মাসআলা বের করার প্রচেষ্টা চালাবে। এতে তার নিজের ও অন্যের জন্য বৃহৎ উপকার লাভ হবে।
পঞ্চম: নিজে নিজেই ইলমের সন্ধান করা।
ইলম অর্জনে ডানে বামে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে না। তুমি নিজেই ইলম অর্জন করবে যতক্ষণ পরিতুষ্ট থাকবে। কেননা, এটাই তোমার জন্য হবে পদ্ধতি ও পন্থা। আর ইলম অর্জনে তুমি অগ্রগতি লাভ করলেও তাতে নিরব থাকবে না। মাসআলা ও দলীলাদীর ব্যাপারে তোমার অর্জিত জ্ঞান সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করবে। যাতে তুমি ধারাবাহিকভাবে আরো অগ্রসর হতে পারো। কোন মাসআলার ব্যাপারে সাহায্যের প্রয়োজন হলে তোমার বন্ধু ও ভাইদের মধ্যে যারা ঐ মাসআলার সমাধানে বিশস্ত তুমি তাদের শরণাপন্ন হবে। আর এ কথা বলতে লজ্জাবোধ করবে না যে, 'হে অমুক! কিতাব পর্যালোচনা করে এ মাসআলা বিশ্লেষণে তুমি আমাকে সাহায্যে করো'। কেননা, লজ্জাশীলতার কারণে কেউ ইলম অর্জন করতে পারে না। তাই লজ্জাশীল ও অহংকারী ব্যক্তি ইলম অর্জন করতে পারে না।
প্রথম আনুষঙ্গিক বিষয়: ১. ইলম অর্জনে কতিপয় বিষয় শিক্ষার্থীর খেয়াল রাখা আবশ্যক।
প্রথম: ইলমুন নাহু (ব্যাকরণ) বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে হলে সংক্ষিপ্ত মূল পাঠ মুখস্থ করতে হবে। আমি মনে করি, এ বিষয়ের প্রাথমিক শিক্ষার্থীর জন্য متن الأجرومية সবচেয়ে ভাল। কেননা, এটা স্পষ্ট, পরিপূরক ও সংক্ষিপ্ত পুস্তক। তাতে বরকত রয়েছে। অতঃপর متن ألفية ابن مالك নামক ব্যাকরণের পুস্তকটি ভাল। কেননা, এটা ইলমুন নাহুর সারসংক্ষেপ। যেমন তিনি বলেন, أحصي من الكفاية الخلاصه ... كما اقتضى غنى بلا خصاصه
ফিক্বহ বিষয়ের কিতাবসমূহের মধ্যে زاد المستنقع ভাল। কেননা, কিতাবটি ব্যাখা, টিকা-টিপ্পনী সম্বলিত ও পাঠদানের জন্য উপযুক্ত। যদিও কিছু কিতাবের মূলপাঠ এর চেয়ে ভাল। তবে এ কিতাবটিতে অনেক মাসআলা সন্নিবেশ করা হয়েছে। এ জন্য এটিই ভাল কিতাব হিসাবে গণ্য।
অপর দিকে হাদীছের কিতাবের মধ্যে উমদাতুল আহকাম عمدة الأحكام অন্যতম। তারপর এর চেয়ে 'বুলগুল মারাম' بلوغ المرام আরো ভাল। দু'টির মধ্যে কোনটি ভাল এ কথার জবাবে বলা হবে, বুলুগুল মারামই উত্তম। কেননা, এখানে অনেক হাদীছের সন্নিবেশ করা হয়েছে। এ কিতাবে ইবনে হাজার আসক্বালানী (رحمة الله) হাদীছের স্তর বর্ণনা করেছেন।
আর তাওহীদের কিতাবের মধ্যে শাইখুল ইসলাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব এর 'কিতাবুত তাওহীদ كتاب التوحيد নামক বইটি উত্তম যা আমরা পড়ি।
আর তাওহীদ আল-আসমা ওয়াছ ছিফাত সম্পর্কিত বইয়ের মধ্যে ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা রচিত 'আল-আক্বীদা ওয়াল ওয়াসিত্বীয়া' বইটি উত্তম। এটি একটি পরিপূরক, উপকারী বরকতপূর্ণ বই। বইটিতে আক্বীদার প্রত্যেক বিষয় যা গ্রহণীয় তা সংক্ষিপ্ত পাঠে বর্ণনা করা হয়েছে।
দ্বিতীয়: খুব দীর্ঘ আলোচনায় নিমগ্ন না হওয়া।
শিক্ষার্থীর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই প্রথমত সংক্ষিপ্ত পাঠ গ্রহণ করা শিক্ষার্থীর জন্য আবশ্যক। যাতে স্মৃতিপটে তা ধারণ করে রাখতে পারে। তারপর দীর্ঘ আলোচনার দিকে ধাবিত হবে। কিন্তু কতিপয় শিক্ষার্থীকে দেখা যায়, তারা গভীর অধ্যয়নে নিমগ্ন থাকে। আর কোন সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তথ্য সূত্র উপস্থাপন করে তারা বলে: মুগনি প্রণেতা বলেন, মাজমূ'উ প্রণেতা বলেন, আল-ইনছাফ প্রণেতা বলেন ও আল হাবী-প্রণেতা বলেন ইত্যাদি। এভাবে বলার মাধ্যমে তারা তাদের অধ্যয়নের গভীরতা প্রকাশ করতে চায়। কিন্তু এটা ভুল। এ ব্যাপারে আমরা শিক্ষার্থীদেরকে বলবো, আগে তোমরা সংক্ষিপ্ত পাঠ শিখো যাতে তা তোমাদের স্মৃতিপটে গেথে যায়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ হলে তোমরা দীর্ঘ আলোচনায় নিমগ্ন হতে পারো। বোধগম্যতার বিষয় হচ্ছে এটাই, যে ব্যক্তি সাঁতার কাটতে জানে না, গভীর সমুদ্রে সাঁতার কাটতে যাওয়া তার উচিত নয়। কেননা, সমুদ্রে ডুবে যাওয়া থেকে তার বিশ্বাস তাকে রক্ষা করতে সক্ষম নয়।
তৃতীয়: বিনা কারণে সংক্ষিপ্ত পাঠ গ্রহণ করা ছেড়ে দিয়ে অন্য পাঠের দিকে ধাবিত হওয়াতে বিরক্তিবোধ হতে পারে।
এটা শিক্ষার্থীর বিদ্যার্জনে বিচ্ছিন্নতার সমস্যা সৃষ্টি করে এবং একই সাথে সময় বিনষ্ট হয়। তাই প্রত্যেক দিন একটি করে কিতাব পড়া ভুল; যা বিদ্যার্জন পদ্ধতি বিরোধী বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। কোন বিষয়ের কিতাব পড়লে ঐ বিষয়ে লেগে থাকা ভাল। আর এটা ধারণা করা ঠিক নয় যে, আমি একটা কিতাব পড়ে শেষ করবো অথবা কিতাবের একটা পরিচ্ছেদ পড়বো। অতঃপর দেখা গেল, সে অন্যমনস্ক হয়েছে। এভাবে (এলোমেলো) পাঠ করার কারণেই সময় বিনষ্ট হয়।
চতুর্থ: কোন কিছুর উপকারীতা গ্রহণ করা এবং জ্ঞানগত বিষয় মনে রাখা।
এখানে ঐসব অজ্ঞাত বিষয়ের উপকারীতা সম্পর্কে বলা হচ্ছে যা এমনিতেই স্মৃতিপটে আসে না অথবা যার আলোচনা উপস্থান বিরল অথবা যে বিষয় নিয়ে নতুনভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে জেনে তার উপকারীতা গ্রহণ
করতে হবে। আর এটা লিখনীর সাথে সম্পর্কিত। তাই এ ব্যাপারে বলা ঠিক নয় যে, এসব আমার জানা আছে। এসবে সীমাবদ্ধ থাকার দরকার নেই। কারণ তা তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর এটাও বলবে না, অনেক মানুষ এসবের উপকারীতা গ্রহণ করে এবং বলে এটাতো সহজ সাধ্য বিষয়; এর আলোচনার দরকার নেই। অতঃপর সে অন্তবর্তীকালীন বা কিছু সময় পর তা আর স্মরণ করতে পারে না।
এ কারণে শিক্ষার্থীকে বলি, দুষ্প্রাপ্য কিতাব বা নতুন কোন বিষয়ের উপকারীতা গ্রহণে উৎসাহী হও। এ বিষয়ে আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) রচিত بدائع الفوائد নামক কিতাবটি উত্তম। এতে ইলম অর্জনের মৌলিক বিষয়গুলো সন্নিবেশ করা হয়েছে। এ কিতাবটির মত আলোচনা অন্য কিতাবে পাওয়া দুষ্কর। তাই এটি প্রত্যেক বিষয় সম্বলিত কিতাব। কেননা, যখনই কোন বিষয়ের মাসআলা লেখকের দৃষ্টি গোচর হয়েছে অথবা তিনি কোন উপকারীতার কথা শুনেছেন তখন তা এ কিতাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। আর এ কিতাবে আছে আক্বীদা, ফিক্বহ, হাদীছ, তাফসীর, ইলমুন নাহু এবং বালাগাত ইত্যাদি বিষয়। আর ইলম অর্জনের নিয়ম-নীতির উপর গুরুত্ব আরোপ করত উৎসাহও দেয়া হয়েছে।
আর আহকাম (বিধানবলী) সম্পর্কে আলিমগণ যেসব ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন তা হচ্ছে এর নিয়ম-নীতি। কারণ ফিক্বহী বিধি-বিধান সম্পর্কিত সকল ব্যাখ্যাই হচ্ছে নীতিমালা হিসেবে গণ্য। কেননা, এ ব্যাখ্যাই হচ্ছে বিধি-বিধানের ভিত্তি। তাই শিক্ষার্থীকে এসব ব্যাখ্যা আয়ত্ব করতে হবে। আমি শুনেছি কতিপয় ভাই এ নিয়ম-নীতিকে চার মাযহাবের সাথে সমন্বিত করে অনুসরণ করে। আমি বলবো, এভাবে কোন দল প্রতিষ্ঠা করা ভাল। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন সঠিক ব্যাখ্যা পেলে তা শর্তযুক্ত করে মূলত সব মাযহাবেরই অনুসরণ করা হয়। কেননা, প্রত্যেক ব্যাখ্যার উপর অনেক মাসআলা ভিত্তি করে। তাই ইলম অর্জনের জন্য রয়েছে নিয়ম-নীতি। আর প্রত্যেক নিয়ম অনেক আংশিক বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়। উদাহরণ স্বরূপ পানির পবিত্র হওয়া অথবা না হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহের সৃষ্টি হলে বিষয়টি বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে। তাই বিষয়ে হুকুম অথবা পদ্ধতিগত কারণ রয়েছে। এব্যাপারে এটাও ব্যাখ্যা করা হয় যে, মূল সব সময় মূলই থাকে। তাই পবিত্রতার মাঝে অপবিত্রতার সন্দেহ সৃষ্টি হলে তা পবিত্র বলেই গণ্য হয় অথবা অপবিত্র কোন জিনিসে পবিত্রতার সন্দেহ হলে তা অপবিত্রই ধরে নেয়া হয়। কেননা, মূল সব সময় একই রকম হয়।
আর শিক্ষার্থী উৎসাহিত হয়ে এ বিষয়ে সকল ব্যাখ্যা সংকলন করত সমন্বয় সাধন করে তা সুবিন্যস্ত করবে। অতঃপর ভবিষ্যতে এর উপর ভিত্তি করে আংশিক মাসআলা বের করার প্রচেষ্টা চালাবে। এতে তার নিজের ও অন্যের জন্য বৃহৎ উপকার লাভ হবে।
পঞ্চম: নিজে নিজেই ইলমের সন্ধান করা।
ইলম অর্জনে ডানে বামে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে না। তুমি নিজেই ইলম অর্জন করবে যতক্ষণ পরিতুষ্ট থাকবে। কেননা, এটাই তোমার জন্য হবে পদ্ধতি ও পন্থা। আর ইলম অর্জনে তুমি অগ্রগতি লাভ করলেও তাতে নিরব থাকবে না। মাসআলা ও দলীলাদীর ব্যাপারে তোমার অর্জিত জ্ঞান সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করবে। যাতে তুমি ধারাবাহিকভাবে আরো অগ্রসর হতে পারো। কোন মাসআলার ব্যাপারে সাহায্যের প্রয়োজন হলে তোমার বন্ধু ও ভাইদের মধ্যে যারা ঐ মাসআলার সমাধানে বিশস্ত তুমি তাদের শরণাপন্ন হবে। আর এ কথা বলতে লজ্জাবোধ করবে না যে, 'হে অমুক! কিতাব পর্যালোচনা করে এ মাসআলা বিশ্লেষণে তুমি আমাকে সাহায্যে করো'। কেননা, লজ্জাশীলতার কারণে কেউ ইলম অর্জন করতে পারে না। তাই লজ্জাশীল ও অহংকারী ব্যক্তি ইলম অর্জন করতে পারে না।