📘 কিতাবুল ইলম > 📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: যে সকল ভুল থেকে সতর্ক থাকা আবশ্যক

📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: যে সকল ভুল থেকে সতর্ক থাকা আবশ্যক


এখানে কিছু ভুল উল্লেখ করব, যেগুলো ভুল কিছু শিক্ষার্থী করে থাকে। ১. হিংসা করা ( الحسد ): "হিংসা” এর সংজ্ঞা: "আল্লাহ অন্যের উপর যে নি'আমত দান করেছেন, তা অপছন্দ করা। আর হিংসা অন্যের উপর থেকে আল্লাহর নি'আমত চলে যাওয়ার আকাঙ্খা করা নয়। বরং এটি শুধুমাত্র অন্যের উপর আল্লাহ যে নি'আমত দিয়েছেন, তা কোনো লোকের অপছন্দ করা"।

তার নি'আমত চলে যাওয়া বা থাকা উভয়টিই সমান। কিন্তু মানুষ তা অপছন্দ করে। যেমন শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রহঃ) অনুসন্ধান করে বলেছেন,
الْحَسَدُ كَرَاهَةُ الْإِنْسَانِ مَا أَنْعَمَ اللَّهِ بِهِ عَلَى غَيْرِهِ
"অন্যের উপর আল্লাহ যে নি'আমত দিয়েছেন, তা মানুষের অপছন্দ করাই হলো হিংসা"।

আর কখনো কখনো হিংসা থেকে আত্মসমূহ মুক্ত থাকে না। অর্থাৎ কখনো কখনো হিংসা করা আত্মার জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِذَا حَسَدَتَ فَلَا تَبْعَ ، وَإِذَا ظَنَنْتَ فَلَا تَحَقَّق
"যখন তুমি হিংসা করবে, তখন (কোনো বিষয়ে) বাড়াবাড়ি করবে না। আর যখন তুমি ধারণা করবে, তখন কোনো কিছু অনুসন্ধান করবে না”।[৪০]

নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদ্দেশ্য করেছেন যে, যখন মানুষ অন্তর থেকে অন্যের ব্যাপারে হিংসা করবে, তখন সেই মানুষের জন্য অন্যের ব্যাপারে কথা ও কাজের মাধ্যমে বাড়াবাড়ি না করা আবশ্যক। কেননা এই বাড়াবাড়ি করা ঐ সকল ইয়াহূদীদের স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত, যাদের ব্যাপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسِ عَلَى مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ فَقَدْ آتَيْنَا آلَ إِبْرَاهِيمَ الْكِتَابَ وَ الْحِكْمَةَ وَ آتَيْنَاهُمْ مُلْكًا عَظِيمًا
"আল্লাহ নিজ অনুগ্রহের কারণে লোকদেরকে যে নি'আমত দান করেছেন, এর কারণে তারা (ইয়াহুদীরা) কি মানুষের প্রতি হিংসা করে? তাহলে তো অবশ্যই আমি ইব্রাহীমের বংশধরকে কিতাব এবং প্রজ্ঞা দান করেছিলাম এবং তাদেরকে বিশাল রাজত্ব দান করেছিলাম"। সূরা আন-নিসা ৪:৫৪।

একজন হিংসুক ব্যক্তি কয়েকটি অকল্যাণে পতিত হয়।

(১) আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, হিংসুক ব্যক্তির তা অপছন্দ করা: অতএব, নিশ্চয় আল্লাহ কোনো ব্যক্তির উপর যে নি'আমত দান করেছেন, তা হিংসুক ব্যক্তির অপছন্দ করা আল্লাহর ফায়ছালার বিরোধিতা করার নামান্তর।

(২) হিংসা সৎ আমলগুলোকে ঠিক তেমনভাবে খেয়ে ফেলে, যেমনভাবে আগুন জ্বালানী কাঠকে খেয়ে ফেলে: কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিংসুক ব্যক্তি হিংসাকৃত ব্যক্তির ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে; অপছন্দনীয় বিষয় আলোচনা করার মাধ্যমে, তার থেকে মানুষকে ফিরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে, তার মর্যাদাহানি করার মাধ্যমে এবং এগুলোর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কর্ম করার মাধ্যমে। আর এটি ঐসকল কাবীরাহ গুনাহসমূহের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো কখনো কখনো সৎ আমল সমূহকে নষ্ট করে দেয়।

(৩) একজন হিংসুক ব্যক্তির অন্তরে এমন দুঃখ এবং প্রজ্জ্বলিত আগুন পতিত হয়, যা তাকে পরিপূর্ণরূপে খেয়ে ফেলে: ফলে যখনই ঐ হিংসুক ব্যক্তি কোনো হিংসাকৃত ব্যক্তির উপর আল্লাহর কোনো নি'আমত দেখতে পায়, তখনই তার অন্তর সংকীর্ণ হয়ে যায় এবং সে হিংসুক ব্যক্তি তাকে নজরে রাখে। যখনই আল্লাহ তার উপর কোনো নি'আমত দান করেন, তখনই সে দুঃখিত হয় এবং তার উপর দুনিয়া সংকীর্ণ হয়ে যায়।

(৪) নিশ্চয় হিংসার মাঝে ইয়াহুদীদের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে: আর এটি জানা বিষয় যে, যদি কোনো ব্যক্তি কাফেরদের আচরণগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটি আচরণ করে, তাহলে এই আচরণের দিক দিয়ে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, من تشبه بقوم فهو منهم
যদি কোনো ব্যক্তি কোনো জাতির সাথে সাদৃশ্য রাখে, তাহলে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। [৪১]

(৫) হিংসুকের হিংসা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সে কখনো অন্যের থেকে আল্লাহর নি'আমত সরিয়ে নিতে সক্ষম নয়, বরং সে অক্ষম। তাহলে কেন তাদের অন্তরে হিংসা পতিত হয়?

(৬) হিংসা পরিপূর্ণ ঈমানের বিরোধী: নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتَّى يُحِبُّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لَنَفْسِهِ "তোমাদের কেউ পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না; যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করে, যা সে তার নিজের জন্য পছন্দ করে"।[৪২]

এই হাদীছটি তোমার ভাইয়ের উপর থেকে আল্লাহর নি'আমত চলে যাওয়া তোমার অপছন্দ করাকে আবশ্যক করে। অতএব, যদি তার থেকে আল্লাহর নি'আমত চলে যাওয়া তুমি অপছন্দ না কর; তাহলে তুমি তোমার ভাইয়ের জন্য তা অপছন্দ করলে না, যা তুমি তোমার নিজের জন্য অপছন্দ কর। আর এটিই হলো পরিপূর্ণ ঈমানের বিপরীত।

(৭) হিংসা আল্লাহর অনুগ্রহ প্রার্থনা করা থেকে মানুষের বিরত থাকাকে আবশ্যক করে:
ফলে তুমি হিংসুক ব্যক্তিকে সর্বদা এমন নি'আমতের প্রতি আগ্রহী দেখতে পাবে, যে নি'আমত আল্লাহ অন্যের উপর দান করেন। অথচ সে নিজের জন্য আল্লাহর নিকটে তার অনুগ্রহ প্রার্থনা করে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَ لَا تَتَمَنُوا مَا فَضْلَ اللهُ بِه بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ للرِّجَالِ نَصِيبٌ مِمَّا اكْتَسَبُوا وَ للنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِمَّا اكْتَسَبْنَ وَ اسْأَلُوا اللَّهَ مِنْ فَضْلِهِ "আর যে নি'আমতের দ্বারা আল্লাহ তোমাদের একজনের উপর আরেকজনকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, তোমরা তা আকাঙ্খা করো না। পুরুষরা যা উপার্জন করে, তা থেকে তাদের জন্য একটি অংশ রয়েছে। আর মহিলারা যা উপার্জন করে, তা থেকে তাদের জন্য একটি অংশ রয়েছে। আর তোমরা আল্লাহর নিকটে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো"। সূরা আন-নিসা ৪:৩২।

(৮) নিশ্চয় হিংসুক ব্যক্তির উপর আল্লাহর যে নি'আমত রয়েছে, হিংসা তা অবজ্ঞা করাকে আবশ্যক করে:
অর্থাৎ হিংসুক ব্যক্তি মনে করে যে, সে কোনো নি'আমতের মাঝেই নেই। আর সে মনে করে যে, হিংসাকৃত ব্যক্তি তার চেয়ে অনেক বেশি নি'আমতের মাঝে রয়েছে। আর এই সময় সে তার নিজের উপর আল্লাহর নি'আমতকে অবজ্ঞা করে। ফলে সে এই নি'আমতের কৃতজ্ঞতা শিকার করে না। বরং সে (তা থেকে) বিরত থাকে।

(৯) হিংসা একটি খারাপ স্বভাব:
কেননা হিংসুক ব্যক্তি তার সমাজে সৃষ্টির উপর আল্লাহর নি'আমত অনুসন্ধান করে। আর সে তার সক্ষমতা অনুযায়ী মানুষের মাঝে এবং হিংসাকৃত ব্যক্তির মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা চালায়; কখনো কখনো হিংসাকৃত ব্যক্তির মর্যাদাহানি করার মাধ্যমে এবং কখনো কখনো হিংসাকৃত ব্যক্তি যে ভালো কাজ করে, তা অবজ্ঞা করার মাধ্যমে।

(১০) নিশ্চয় হিংসুক ব্যক্তি যখন হিংসা করে, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিংসাকৃত ব্যক্তির ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে:
এর ফলে হিংসাকৃত ব্যক্তি কিয়ামতের দিন ঐ হিংসুক ব্যক্তির নেকআমলসমূহ গ্রহণ করবে। আর যদি তার নেক আমলসমূহ না থাকে, তাহলে তার বদআমলসমূহ নিয়ে তার মুখের উপর ছুঁড়ে মারবে। আর হিংসুক ব্যক্তি হিংসাকৃত ব্যক্তির বদআমলসমূহ গ্রহণ করবে।

সরাংশ: অবশ্যই হিংসা একটি মন্দ স্বভাব। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, হিংসা একটি মন্দ স্বভাব হওয়া সত্ত্বেও, অধিকাংশ 'আলিম, ছাত্র এবং ব্যবসায়ীর মাঝে এটি দেখা যায়। তাদের একজন আরেকজনের প্রতি হিংসা করে। আর প্রত্যেক ব্যবসায়ী তার অংশীদারের সাথে হিংসা করে। কিন্তু আরো পরিতাপের বিষয় এই যে, 'আলিমগণের মাঝে এবং ছাত্রদের মাঝে হিংসা আরো বেশি। অথচ সর্বোত্তম হলো 'আলিমগণ মানুষকে হিংসা থেকে দূরে রাখবে এবং পরিপূর্ণ ভাল আচরণের দিকে আহ্বান করবে।

হে আমার ভাই! যখন তুমি দেখবে আল্লাহ তাঁর কোনো বান্দার উপর নি'আমত দিয়েছেন, তখন তুমি তার মত হওয়ার চেষ্টা কর এবং আল্লাহ যার উপর নি'আমত দিয়েছেন, তাকে তুমি অপছন্দ করো না। বরং তুমি বল:
اللَّهُمَّ زِدْهُ مِنْ فَضْلِكَ وَ أَعْطِنِي أَفْضَلُ مِنْهُ
"হে আল্লাহ! তার প্রতি আপনার অনুগ্রহ বৃদ্ধি করে দিন এবং তার চেয়ে অধিকতর উত্তম অনুগ্রহ আমাকে দান করুন"।

আর হিংসা অবস্থার কোনো পরিবর্তন করতে পারে না। বরং এটি দশটি অকল্যাণ বয়ে নিয়ে আসে, আমরা যেগুলো এইমাত্র কিতাবটিতে উল্লেখ করলাম। আর যে ব্যক্তি যত আসা করবে, সে ব্যক্তি তত বেশি পাবে।

২. 'ইল্ম ছাড়া ফাতাওয়া দেওয়া )الإفتاء بغير علم
ফাতাওয়া দেয়া একটি বড় যোগ্যতার কাজ। একারণে সাধারণ মানুষের নিকটে তাদের দীনের বিষয়ে যা সমস্যাপূর্ণ, তা ব্যাখ্যা করার জন্য একজন ফাল্গুয়া প্রদানকারী উদ্যোগ নেন এবং তাদেরকে সঠিক পথের দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকনে। একারণেই ফাল্গুয়া প্রদানের যোগ্য ব্যক্তি ছাড়া কেউ এই বড় পদটির জন্য নেতৃত্বে থাকে না। এজন্য আল্লাহকে ভয় করা এবং 'ইল্ম ও বুদ্ধিমত্তা থেকে কথা বলা সকল বান্দাদের উপর আবশ্যক। আর তাদের এটা জানা আবশ্যক যে, আল্লাহ এক। সৃষ্টিজগৎ এবং সমস্ত আদেশ তারই। অতএব, আল্লাহ ছাড়া কোনো সৃষ্টিকর্তা নেয়, আল্লাহ ছাড়া সৃষ্টি জগতের কোনো পরিচালক নেয় এবং আল্লাহর বিধি-বিধান ছাড়া সৃষ্টি জগতে কোনো বিধি-বিধান বৈধ হতে পারে না। অতএব, তিনি সেই সত্তা, যিনি কোনো জিনিসকে ফরয করেন, হারাম করেন, নফল করেন এবং হালাল করেন। আর যারা তাদের প্রবৃত্তির তাড়নায় যে জিনিসকে হালাল করে এবং হারাম করে, আল্লাহ তা অবশ্যই প্রতাখ্যান করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
قُلْ أَرَأَيْتُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ لَكُمْ مِنْ رِزْقِ فَجَعَلْتُمْ مِنْهُ حَرَامًا وَ حَلَالًا قُلْ اللَّهُ أَذِنَ لَكُمْ أَمْ عَلَى اللَّهِ تَفْتَرُونَ وَ مَا ظَنُّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
"হে নাবী! আপনি বলুন, তোমরা কি ভেবে দেখেছো, আল্লাহ তোমাদের জন্য যে রিক অবতীর্ণ করেছেন, তোমরা তার কিছুকে হারাম এবং কিছুকে হালাল করেছো? আপনি বলুন, আল্লাহ কি তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছো? যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দেয়, কিয়ামতের দিন (তার পরিণতি সম্পর্কে) তাদের ধারণা কি"? সূরা ইউনুস ১০:৫৯-৬০। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
وَ لَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلَالٌ وَ هَذَا حَرَامٌ لَتَفْتَرُوا عَلَى اللَّه الْكَذِبَ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ * مَتَاعٌ قَلِيلٌ وَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
"তোমাদের জিহ্বা যেসব মিথ্যা বর্ণনা করে, তার কারণে আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করার জন্য তোমরা একথা বল না যে, এটি হালাল; আর এটি হারাম। নিশ্চয় যারা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে, তারা কখনোই কৃতকার্য হয় না। (এসব মিথ্যাচারে লাভ হয়) সামান্য ভোগসামগ্রী। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি"। সূরা আল-নাহল ১৬:১১৬-১১৭।

আর নিশ্চয় এটি কাবীরাহ গুনাহের অন্তর্ভুক্ত যে, কোনো জিনিস সম্পর্কে কোনো ব্যক্তি বলবে, এটি হালাল। অথচ সে জানে না এই জিনিসের ব্যাপারে আল্লাহ কি বিধান দিয়েছেন। অথবা ঐ জিনিস সম্পর্কে ঐ ব্যক্তি বলবে, এটি হারাম। অথচ সে ব্যক্তি এ ব্যাপারে আল্লাহর বিধান সম্পর্কে জানে না। অথবা ঐ জিনিস সম্পর্কে ঐ ব্যক্তি বলবে: এটি ফর্য। অথচ সে ব্যক্তি জানে না যে, আল্লাহ তা'আলা এটি ফরয করেছেন। অথবা ঐ জিনিস সম্পর্কে ঐ ব্যক্তি বলবে: নিশ্চয় এটি ফরয নয়। অথচ সে ব্যক্তি জানে না যে, আল্লাহ তা'আলা এটি ফর্য করেননি। নিশ্চয় এগুলো (বলা) পাপ এবং আল্লাহর সাথে খারাপ আচরণ। হে বান্দা! আল্লাহর আগে আগে কথা বলার পরও তুমি কিভাবে জানলে যে, সমস্ত বিধান আল্লাহর জন্য? অতঃপর আল্লাহর দীনের ব্যাপারে এবং তার বিধি-বিধানের ব্যাপারে এমন কথা বল, যা তুমি জানো না? অবশ্যই আল্লাহ তার ব্যাপারে 'ইল্ম ছাড়া কোনো কথা বলাকে তাঁর প্রতি শির্ক করার সাথে যুক্ত করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَ أَنْ تُشْرِكُوا بِالله مَا لَمْ يُنَزِّلُ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
“(হে নবী)! আপনি বলুন, নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতাকে, পাপ কাজকে, অন্যায় ভাবে বাড়াবাড়িকে, আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করাকে; যে ব্যাপারে তিনি কোনো দলীল অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর ব্যাপারে তোমাদের এমন কথা বলাকে, যা তোমরা জানো না। সূরা আল-আ'রাফ ৭:৩৩।

আর নিশ্চয় অনেক সাধারণ মানুষ এমন কিছুর ব্যাপারে একে অপরকে ফাল্গুয়া দেয়, যা তারা জানে না। অতএব, তুমি তাদেরকে বলতে দেখবে: এটি হালাল
বা হারাম বা ফর্য অথবা নফল। অথচ তারা এ সম্পর্কে কিছুই জানে না।

তাহলে এসকল লোক কি জানে না যে, তারা যা বলে, সে সম্পর্কে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন?! তারা কি জানে না যে, তারা যখন কোনো ব্যক্তিকে পথভ্রষ্ট করবে আল্লাহ ঐ ব্যক্তির জন্য যা হারাম করেছেন, তার জন্য তা হালাল করার মাধ্যমে অথবা আল্লাহ তার জন্য যা হালাল করেছেন, তা তার জন্য হারাম করার মাধ্যমে; তখন তারা ঐ ব্যক্তির পাপ (নিজেরাই) বয়ে আনবে এবং ঐ ব্যক্তি যে ভুল আমল করবে, তার সমপরিমাণ পাপ তাদের উপর বর্তাবে? আর তারা ঐ ব্যক্তিকে যে ভুল ফাত্ওয়া দিয়েছে, তার কারণেই এটি সংঘটিত হবে। আর নিশ্চয় কিছু সাধারণ মানুষ অন্যাণ্য পাপ করে। যখন সে এমন কোনো ব্যক্তিকে দেখে, যে ব্যক্তি কোনো 'আলিমের নিকটে ফাত্ওয়া চাওয়ার জন্য কামনা করে; তখন সে সাধারণ লোকটি তাকে বলে: তোমার ফাত্ওয়া চাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এটি সুস্পষ্ট বিষয়। প্রকৃতপক্ষে, এটি হালাল হওয়া সত্ত্বেও সে বলে যে, এটি হারাম বিষয়। ফলে আল্লাহ তার জন্য যা হালাল করেছেন, ঐ সাধারণ লোকটি তার জন্য সেটি হারাম করে দেয়। অথবা ঐ সাধারণ লোকটি তাকে বলে: এটি ফরয বিষয়। ফলে আল্লাহ তার জন্য যা ফরয করেননি, সে তার জন্য তা ফরয করে দেয়। অথবা সে সাধারণ লোকটি বলে: এটি নফল বিষয়। অথচ এটি আল্লাহর শারী'আতে ফরয বিষয়। ফলে আল্লাহ তার উপর যা ফর্য করেছেন, তা তার থেকে বাদ পড়ে যায়। অথবা সে লোকটি বলে: এটি হালাল বিষয়। অথচ প্রকৃতপক্ষে এটি হারাম বিষয়। আল্লাহর শরী'আতের ব্যাপারে এগুলো কথা বলা ঐ সাধারণ লোকের পক্ষ থেকে একটি পাপ এবং তার মুসলিম ভাইয়ের সাথে প্রতারণার শামিল। যেহেতু সে তাকে 'ইল্ম ছাড়া ফাত্ওয়া দিয়েছে। তুমি কি মনে কর, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো একটি দেশের কোনো পথ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। তারপর যদি তুমি এখান থেকে পথটি বলে দাও, অথচ তুমি জানো না। তাহলে কি মানুষ এটাকে তোমার পক্ষ থেকে প্রতারণা ধরে নিবে না? তাহলে কিভাবে তুমি জান্নাতের পথ সম্পর্কে কথা বল, অথচ তুমি তা সম্পর্কে কিছুই জান না?! আর এই পথটি এমন একটি পথ, যার ব্যাপারে আল্লাহ বিধান অবতীর্ণ করেছেন?! আর নিশ্চয় কিছু শিক্ষার্থী হলো অর্ধেক 'আলিম। সাধারণ মানুষ সাহসের কারণে আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে যেসকল বিষয়ে ফাত্ওয়া দেয়, তারা ঠিক সেসকল বিষয়ে ফাত্ওয়া দেয়।
বিষয়গুলো হলো: হালাল করা, হারাম করা এবং ফরয করা। তারা যা জানে না, সে ব্যাপারে কথা বলে। তারা শারী'আতের ব্যাপারে কমায় এবং বাড়ায়। আর
আল্লাহর বিধানের ক্ষেত্রে তারা হলো সবচেয়ে অজ্ঞ মানুষের অন্তর্ভুক্ত। যখন তুমি তাদের মধ্য থেকে কাউকে কথা বলতে শুনবে, তখন যেন মনে হয় তার দৃঢ়ভাবে কথা বলার ব্যাপারে তার উপর ওহী নাযিল হচ্ছে। ফলে সে এটা বলতে সক্ষম হয় না, "আমি জানি না"। তার 'ইল্ম না থাকা সত্ত্বেও সে যেন সত্যের প্রতীক। এছাড়াও সে মনে করে যে, সে একজন 'আলিম। এভাবে সে সাধারণ মানুষের ক্ষতি করে। কেননা কখনো কখনো সাধারণ মানুষ তার উপর আস্থাশীল হয় এবং তার দ্বারা প্রতারিত হয়। এসকল মূর্খ জাতি তাদের কথার সম্বন্ধ তাদের নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না। বরং তুমি তাদেরকে দেখবে, তারা তাদের কথাটিকে ইসলাসের দিকে সম্বন্ধ করে বলে: "ইসলাম এরূপ বলে, ইসলাম এরূপ মনে করে"। অথচ এটি কোনো ক্ষেত্রে বৈধ নয়। তবে ঐ ক্ষেত্রে বৈধ, যে ক্ষেত্রে কোনো প্রবক্তা জেনে বলে যে, এটি দীন ইসলামের অন্তর্ভুক্ত। আর জানার কোনো পথ নেই আল্লাহর কুরআন, রাসূলের হাদীছ অথবা মুসলিমদের ঐকমত্যের জ্ঞান রাখা ছাড়া। নিশ্চয় কিছু মানুষ তাদের সাহসের কারণে, তাদের অসতর্কতার কারণে, লজ্জাহীনতার কারণে এবং আল্লাহর প্রতি তাদের ভয় না থাকার কারণে কোনো স্পষ্ট হারাম বিষয় সম্পর্কে বলে থাকে: "আমি এটিকে হারাম মনে করি না"। অথবা কোনো স্পষ্ট ফরয বিষয় সম্পর্কে বলে থাকে: "আমি এটিকে ফর্য মনে করি না"। হয় তারা তাদের অজ্ঞতার কারণে এটা বলে বা বিরোধিতা এবং অহংকারের কারণে অথবা আল্লাহর দীনের ব্যাপারে তার বান্দাদেরকে সন্দেহে পতিত করার জন্য। আর অবশ্যই বিবেক, ঈমান, আল্লাহভীতি এবং তার বড়ত্ব ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত হলো যে, কোনো ব্যক্তি যে সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না, সে সম্পর্কে বলবে: "আমি জানি না, আমি এবিষয়ে অন্যকে জিজ্ঞেস করব"। অতএব, নিশ্চয় এটি পরিপূর্ণ বিবেকের অন্তর্ভুক্ত। কেননা মানুষ তার গ্রহণযোগ্যতা দেখে তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে। আর অবশ্যই একথা বলা ঈমান এবং আল্লাভীতির অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু সে তার প্রতিপালকের আগে আগে কথা বলে না এবং না জেনে তার দীনের ক্ষেত্রে তার ব্যাপারে কথা বলে না।
আর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে এমন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, যে ব্যাপারে তার উপর কোনো ওহী অবতীর্ণ হয় নি। তারপর তার উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন। অথচ তিনি আল্লাহর দীনের ব্যাপারে সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ। তারপর যে সম্পর্কে আল্লাহর নাবীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সে সম্পর্কে আল্লাহ নিজে জবাব দিয়েছিলেন:
যেসকল লোক অজ্ঞতার কারণে আল্লাহর বিধানের ক্ষেত্রে কথা বলে, সে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَ مَا كَانَ لِمُؤْمِنِ وَ لَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَ مَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا
"যখন আল্লাহ এবং তার রসূল কোন বিষয়ে ফায়ছালা দেন, তখন কোন মুমিন পুরুষ এবং কোন মুমিনাহ নারীর তাদের সেই বিষয়ে কোন স্বাধীন ইচ্ছা থাকে না। আর যদি কেউ আল্লাহ এবং তার রসূলের অবাধ্য হয়, তাহলে সে ব্যক্তি সুস্পষ্ট পথভ্রষ্ট হবে"। সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৬।

আর যখন মর্যাদাবান ছাহাবীগণের নিকটে এমন মাসআলাহ পেশ করা হতো, যার ব্যাপারে তারা আল্লাহর বিধান জানতেন না; তখন তারা এর জবাব দিতে দ্বিধা করতেন। অতএব, জেনে রাখো! আবূ বকর আছ-ছিদ্দীক (রাঃ) বলতেন,
أَيُّ سَمَاءُ تُظِلُّنِي، وَ أَيُّ أَرْضُ تُقِلُّنِي إِذَا أَنَا قُلْتُ فِي كِتَابِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ
"হে আসমান! তুমি আমার উপর অন্ধকার হয়ে যাবে, আর হে যমীন! তুমি আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে যাবে; যখন আমি আল্লাহর কুরআনের ব্যাপারে 'ইল্ম ছাড়া কথা বলব"।

এছাড়াও আরও জেনে রাখো! একদা উমার (রাঃ)-এর নিকটে একটি কাহিনী বর্ণিত হয়েছিল। তারপর তিনি এ ব্যাপারে পরামর্শ করার জন্য দ্বা'হাবীগণকে একত্রিত করেছিলেন। আর আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেছিলেন,
أَيُّهَا النَّاسُ مَنْ سُئِلَ عَنْ عِلْم يَعْلَمُهُ فَلْيَقُلْ بِهِ، وَ مَنْ لَمْ يَكُنْ عِنْدَهُ عِلْمٌ فَلْيَقُلْ: اللَّهُ أَعْلَمُ، فَإِنَّ مِنَ الْعِلْمِ أَنْ يَقُولَ لِمَا لَا يَعْلَمُ: اللَّهُ أَعْلَمُ
"হে মানুষ সকল! যদি কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো 'ইল্ম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, যা সে জানে; তাহলে সে যেন সে ব্যাপারে কথা বলে। আর যার নিকটে 'ইল্ম নেই সে যেন বলে: الله أعلم )আল্লাহ্ই সবচেয়ে জ্ঞানী)। কেননা যা সে জানে না, সে ব্যাপারে একথা বলা 'ইল্ম এর অন্তর্ভুক্ত।

আশ-শা'বী (রহঃ) কে একটি মাসআলাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তারপর তিনি বললেন, "আমি এর উত্তর ভালো জানি না"। তারপর তার সঙ্গীরা তাকে বললেন, "নিশ্চয় আমরা আপনাকে 'জানি না' কথাটি বলতে লজ্জা পাই"। তারপর তিনি তাদেরকে বললেন, "কিন্তু ফেরেস্তাগণ 'জানি না' কথাটি বলতে লজ্জা পান না, যখন তারা বলেন, لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا
"আপনি আমাদেরকে যা শিখিয়েছেন, সেটা ছাড়া আমাদের কোনো 'ইল্ম নেই"। সূরা আল-বাক্বারা ২:৩২।

আর এখানে 'ইল্ম ছাড়া ফাল্গুয়া দেওয়ার ব্যাপারে অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। সেগুলোর মধ্য থেকে একটি দৃষ্টান্ত হলো: যখন অসুস্থ ব্যক্তির কাপড় অপবিত্র হয় এবং সে তা পবিত্র করতে সক্ষম না হয়, তখন তার ব্যাপারে ফাল্গুয়া দেওয়া হয় যে, তার কাপড় পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত সে জ্বলাত আদায় করবে না। আর এটি মিথ্যা, ভুল এবং বতিল ফাল্গুয়া। সঠিক ফাল্গুয়া হলো: অসুস্থ ব্যক্তি জ্বলাত আদায় করবে। যদিও তার শরীরে অপবিত্র কাপড় থাকে, যদিও তার শরীর অপবিত্র হয়। এটি ঐ সময় জায়েয হবে, যখন সে তার কাপড় পবিত্র করতে সক্ষম হবে না। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَاتَّقُوا اللهَ مَا اسْتَطَعْتُم
"অতএব, তোমরা তোমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো"। সূরা আত্-তাগাবুন ৬৪:১৬।

অতএব, অসুস্থ ব্যক্তি তার অবস্থা এবং সক্ষমতা অনুযায়ী জ্বলাত আদায় করবে। সে দাঁড়ানো অবস্থায় জ্বলাত আদায় করবে। কিন্তু সে যদি সক্ষম না হয়, তাহলে কিছু 'আলিমের মতে সে হুবহু ইশারা করে জ্বলাত আদায় করবে। অতএব, যদি সে ইশারা করতেও সক্ষম না হয়, অথচ তার জ্ঞান রয়েছে; তাহলে সে যেন অন্তর দ্বারা জ্বলাতের নিয়্যাত করে এবং তার জিহ্বা দ্বারা কথা বলে।

উদাহরণস্বরূপ, সে বলবে: اللهُ أَكْبَرُ। তারপর সূরাহ ফাতিহা এবং অন্য একটি সূরাহ পাঠ করবে। অতঃপর সে বলবে: الله أكبر এবং রুকু করার নিয়্যাত করবে। তারপর সে বলবে: الله لمن حمده سمع এবং রুকু থেকে মাথা উঠানোর নিয়্যাত করবে। অতঃপর সে সিজদাহ এবং জ্বলাতের অবশিষ্ট কর্মগুলোর ক্ষেত্রেও অনুরূপ বলবে। সে জ্বলাতের মধ্যে যেগুলো কাজ করতে সক্ষম নয়, অন্তর দ্বারা সেগুলো কাজের নিয়্যাত করবে এবং জ্বলাতকে তার নির্দিষ্ট ওয়াক্ত থেকে পিছিয়ে দেবে না।

আর এই মিথ্যা ও ভুল ফাওয়ার কারণে কিছু মুসলিম মারা যায়, অথচ এই ভুল ফাওয়ার কারণে তারা জ্বলাত আদায় করে না। যদিও তারা জানে যে, অসুস্থ মানুষ যে অবস্থাতেই জ্বলাত আদায় করে মারা যাবে, তারা জ্বলাত আদায়কারী হিসাবে গণ্য হবে। আর এধরনের অনেক মাসআলা রয়েছে।

অতএব, সাধারণ মানুষের উপর আবশ্যক হলো যে, তারা 'আলিমদের নিকট থেকে এসকল মাসআলার বিধি-বিধান শিখে নিবে। এমনকি তারা এব্যাপারে আল্লাহর বিধান জেনে নিবে এবং না জেনে আল্লাহর দীনের ব্যাপারে তারা কোনো কথা বলবে না।

৩. অহংকার করা: অবশ্যই নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংক্ষিপ্ত এবং সুস্পষ্টভবে "অহংকার" এর আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন,
الْكَبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ، وَغَمْطُ النَّاسِ "হিংসা হলো: সত্যকে দম্ভের সাথে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা"।[৪৩]

এখানে, بَطَرُ الْحَقِّ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: رَدُّ الْحَقِّ সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং غَمْطُ النَّاسِ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: احتقار الناس মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা।

তোমার শিক্ষকের সাথে তোমার বাড়াবাড়ি করা এবং তার সাথে খারাপ আচরণ করা অহংকারের অন্তর্ভুক্ত। আর এটিও অহংকারের অন্তর্ভুক্ত যে, তোমার চেয়ে
নিচু পর্যায়ের কোনো ব্যক্তি তোমার কোনো উপকার করে, অথচ তুমি ঐ ব্যক্তি থেকে বিরত থাক। আর এধরনের কাজ কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে সংঘটিত হয়। যখন 'ইল্মের ক্ষেত্রে নিম্ন পর্যায়ের কোনো ছাত্র তাদের নিকটে কোনো বিষয়ে সংবাদ দেয়, তখন তারা অহংকার করে এবং তার সংবাদটি গ্রহণ করে না। যেমনভাবে স্রোত উঁচু স্থান থেকে ডানে ও বামে প্রবাহিত হয় এবং তাতে স্থির থাকে না, ঠিক তেমনভাবে 'ইল্ম অহংকার এবং বড়ত্বের সাথে স্থির থাকে না। আর কখনো কখনো অহংকার এবং বড়ত্বের কারণে 'ইল্মকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

৪. বিভিন্ন মাযহাব এবং মতের পক্ষাবলম্বন করা )التعصب للمذاهب والآراء: দলাদলি এবং দলীয় মনোভাব থেকে মুক্ত থাকা একজন শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক। কেননা এর ফলে কোনো নির্দিষ্ট দলের সাথে বন্ধুত্ব এবং শত্রুতা সংঘটিত হয়। অতএব, কোনো সন্দেহ নেই যে, এটি সালাফে জ্বলিহগণের কর্মপন্থার বিপরীত। সালাফে জ্বলিহগণ বিভিন্ন দলে বিভক্ত নয়। বরং তারা সকলেই একটি দলে ঐক্যবদ্ধ। তারা সকলেই আল্লাহর একটি বাণীর ছায়াতলে একত্রিত হয়েছেন। বাণীটি হলো,
هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ "তিনি তোমাদের নাম দিয়েছেন মুসলিম"। সূরা আল-হজ্জ্ব; ২২:৭৮।

সুতরাং কোন দলাদলি বা একাধিক ভাগে বিভক্ত হওয়ার সুযোগ নেই, কুরআন ও সুন্নাহতে যা এসেছে তা ব্যতীত কোন বন্ধুত্ব ও শত্রুতা নেই। অনেক মানুষ এমন আছে যারা - উদাহরণস্বরূপ- কোন একটি নির্দিষ্ট দলের সাথে জড়িয়ে পড়ে এর মানহাজকে স্বীকৃতি দেয় এবং তার পক্ষে এমন কিছু দলীল পেশ করে থাকে, যা মূলত তার বিরুদ্ধেই দলীল। (এরপর) সে এটার পক্ষে কথা বলে আর তার দলের বাইরের সবাইকে বিভ্রান্ত বলে মনে করে, যদিও অনেক সময় (যার বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে) ঐ তার থেকে হক্বের নিকটবর্তী হয়ে থাকে। এই ব্যক্তি একটি মূলনীতি গ্রহণ করে থাকে, তা হল: যে আমার (দলের) সঙ্গে নেই সেই আমার বিরোধী। এটি একটি জঘন্য মূলনীতি; কেননা তোমার পক্ষে এবং বিপক্ষের মধ্যেও একটি সম্পর্ক আছে। যখন হক্বের কারণে কেউ তোমার বিরোধী, সে যেন তোমার বিরোধীতা করার মাধ্যমেই প্রকৃতপক্ষে তোমার পক্ষে রয়েছে। কেননা নাবী জ্বলাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
"انصر أخاك ظالما أو مظلوما"
তোমার ভাইকে সাহায্য কর, হোক সে জালিম অথবা মজলুম। [৪৪]

আর অত্যাচারী ব্যক্তিকে সাহায্য করার অর্থ হলো: অত্যাচার থেকে তাকে তোমার বাধা দেওয়া। অতএব, ইসলামে কোনো দলাদলী নেই। আর একারণেই যখন মুসলিমদের মাঝে বিভিন্ন দল প্রকাশিত হলো, মুসলিম উম্মাহ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হলো, তাদের একজন আরেকজনকে পথভ্রষ্ট বলতে থাকলো এবং তার মৃত ভাইয়ের গোস্ত খেতে থাকলো (গীবত করতে থাকলো); তখন তারা দুর্বল হয়ে পড়লো। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُم "আর তোমরা পরস্পর দ্বন্দ্ব করো না, (যদি দ্বন্দ্ব কর) তাহলে তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের শক্তি চলে যাবে"। সূরা আল-আনফাল ৮:৪৬।

আমরা কোন কোন শিক্ষার্থীকে দেখতে পাই; যে শিক্ষার্থী শাইখগণের মধ্য থেকে কোন একজন শাইখ এর নিকটে থাকে। ন্যায় ও অন্যায় উভয়ের ক্ষেত্রেই সে ঐ শাইখ এর পক্ষ সমর্থন করে। আর অন্য শাইখ এর বিরোধিতা করে, অন্য শাইখকে পথভ্রষ্ট এবং বিদ'আতী বলে। আর সে মনে করে যে, তার শাইখ হলেন জ্ঞানবান, সংশোধনকারী এবং অন্য শাইখ হলেন মূর্খ অথবা গোলযোগ সৃষ্টিকারী। এটি (ধারণাটি) একটি বড় ভুল। বরং যার মত কুরআন-সুন্নাহ এবং রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ছাহাবাগণের মতের সাথে মিলে যাবে, তার মত গ্রহণ করা আবশ্যক।

৫. যোগ্যতা অর্জনের পূর্বে ফাতাওয়া প্রদান: ফাল্গুয়া প্রদানের যোগ্য হওয়ার পূর্বে একজন শিক্ষার্থীর ফওয়া প্রদান থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। কেননা যখন একজন শিক্ষার্থী এরূপ (ফাতাওয়া প্রদান) করবে, তখন এটি কয়েকটি বিষয়ের প্রমাণ হয়ে যাবে।

প্রথম বিষয়: স্বয়ং নিজেকে বিঘ্নিত করণ। যখন একজন শিক্ষার্থী (যোগ্য হওয়ার পূর্বেই) ফওয়া দিবে, তখন সে নিজেকে দলের নেতাদের মধ্য থেকে একজন নেতা মনে করবে।
দ্বিতীয় বিষয়: বিষয়গুলো তার না বুঝার উপর প্রমাণ। কেননা যখন একজন শিক্ষার্থী (যোগ্য হওয়ার পূর্বেই) ফাত্ওয়া দিবে; তখন কখনো কখনো সে এমন একটি সমস্যায় পতিত হবে, যা থেকে সে মুক্ত হতে সক্ষম নয়। নিশ্চয় যখন লোকেরা তাকে ফাত্ওয়া দিতে দেখবে, তখন তারা তার নিকট কিছু মাসআলা পেশ করবে, সে মাসআলাগুলোর সমস্যা সমাধান করার জন্য।

তৃতীয় বিষয়: যখন কোন শিক্ষার্থী যোগ্য হওয়ার পূর্বেই ফাত্ওয়া প্রদান করবে; তখন আল্লাহর ব্যাপারে না জেনে কথা বলা তার জন্য আবশ্যক হয়ে যাবে। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রে যার উদ্দেশ্য হলো না জেনে ফাত্ওয়া দেওয়া, সে (কোন কিছুকেই) পরোয়া করবে না। তাকে যে ব্যাপারেই জিজ্ঞেস করা হবে, সে ব্যাপারেই উত্তর দিবে (ফাত্ওয়া দিবে)। আর সে 'ইল্ম ছাড়া তার দীনের ব্যাপারে এবং আল্লাহ'র ব্যাপারে কথা বলার সুযোগ গ্রহণ করবে।

চতুর্থ বিষয়: যখন কোন মানুষ (যোগ্য হওয়ার পূর্বেই) ফাত্ওয়া দিবে, তখন সে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সত্যকে গ্রহণ করবে না। কেননা সে তার নির্বুদ্ধিতার কারণে ধারণা করবে যে, তার নিজের কাছে হক্ব থাকা সত্ত্বেও যখন সে অন্যের অধীন হবে, তখন এই কাজটি এটির উপর দলীল হয়ে যাবে যে, সে ব্যক্তি 'আলিম নয়।

৬. মন্দ ধারণা করা:
অন্যের প্রতি খারাপ ধারণা করা থেকে বিরত থাকা একজন শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক। উদাহরণস্বরূপ: কোন ব্যক্তির ধারণা করে একথা বলা: "অমুক ব্যক্তি শুধুমাত্র লোক দেখানোর জন্যই দান করে; ছাত্রটি শুধুমাত্র লোক দেখানোর জন্যই প্রশ্নের উত্তর দেয়, যেন এটি বুঝা যায় যে, সে একজন জ্ঞানবান ছাত্র"। মুমিনগণের মধ্য থেকে কোন দানকারী ব্যক্তি যখন বেশি পরিমাণে ছাদাক্বাহ প্রদান করে, তখন মুনাফিকুরা বলে: “এই ব্যক্তি লোক দেখানো দান করে"। আর যখন ঐ দানকারী ব্যক্তি কম পরিমাণে ছাদাক্বাহ প্রদান করে, তখন মুনাফিকুরা বলে: "নিশ্চয় আল্লাহ এই দানের থেকে অমুখাপেক্ষী"। আল্লাহ মুনাফিক্বদের সম্পর্কে বলেন,
الَّذِينَ يَلْمِرُونَ الْمُتَطَّوعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَ الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ سَخِرَ اللَّهُ مِنْهُمْ وَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
"যারা দোষারোপ করে মুমিনগণের মধ্য থেকে স্বেচ্ছায় জ্বদাক্বাহ প্রদানকারী মুমিনগণকে এবং তাদেরকে যারা তাদের পরিশ্রম ছাড়া (জ্বদাক্বাহ করার জন্য) কিছুই পায় না। অতঃপর তারা তাদেরকে (স্বেচ্ছায় দানকারীদেরকে) নিয়ে উপহাস করে। আল্লাহও তাদেরকে নিয়ে উপহাস করেন। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি”। সূরা আত-তাওবা ৭৯:৯।

সুতরাং তুমি ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা থেকে বিরত থাকো, যার ন্যায়পরায়ণতা সুষ্পষ্ট। আর তোমার শিক্ষকের ব্যাপারে বা তোমার সঙ্গীর ব্যাপারে খারাপ ধারণা করার মাঝে কোন পার্থক্য নেই। কেননা যার ন্যায়পরায়ণতা সুষ্পষ্ট হয়েছে, তার ব্যাপারে ভাল ধারণা করা অপরিহার্য। পক্ষান্তরে, যার সততা সুষ্পষ্ট নয়, তার ব্যাপারে তোমার অন্তরে খারাপ ধারণা হলে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও তোমার অন্তরে যে সন্দেহ রয়েছে, তা দূর হওয়া পর্যন্ত (সে ব্যাপারে) নিশ্চিত হওয়া তোমার উপর অপরিহার্য। কেননা কিছু মানুষ মিথ্যা সন্দেহের উপর ভিত্তি করে কোন ব্যক্তি সম্পর্কে এমন ধারণা করে, যার কোন সত্যতা নেই।

সুতরাং যখন কোন ব্যক্তি সম্পর্কে তুমি খারাপ ধারণা করবে, সে ব্যক্তি ছাত্রদের মধ্য থেকে হোক অথবা অন্য কেউ হোক; তখন তোমার খারাপ ধারণা করার উপযোগী কোন সুষ্পষ্ট চিহ্ন আছে কিনা, তা লক্ষ্য রাখা বাধ্যতামূলক। পক্ষান্তরে, যখন খারাপ ধারণাটি শুধুমাত্র সন্দেহের উপর ভিত্তি করে হবে; তখন ঐ মুসলিমের ব্যাপারে খারাপ ধারণা করা তোমার জন্য বৈধ নয়, যে মুসলিমের ন্যায়নিষ্ঠতা সুষ্পষ্ট। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা বেশি বেশি ধারণা করা থেকে বিরত থাকো"। সূরা আল-হুজরাত ৪৯:১২।

আল্লাহ (একথা) বলেননি: كُلِّ الظَّ )প্রত্যেক ধারণা থেকে)। কেননা কিছু ধারণার ভিত্তি রয়েছে এবং যৌক্তিকতা রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْم
"নিশ্চয় কিছু ধারণা পাপ"। সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১২।

সুতরাং যে ধারণায় অন্যের প্রতি শত্রুতা সৃষ্টি হয়; কোন সন্দেহ নেই যে, সে ধারণাটি হলো পাপ। অনুরূপভাবে যে ধারণার কোন ভিত্তি নেই, (সে ধারণাটিও পাপ)।

পক্ষান্তরে, যদি ধারণাটির কোন ভিত্তি থাকে, তাহলে আলামত ও প্রমাণ অনুযায়ী তোমার মন্দ ধারণা করায় কোন সমস্যা নেই। একারণেই মানুষের জন্য উচিত হলো তার আত্মাকে স্ব-স্থানে জায়গা দেওয়া, ময়লা দ্বারা আত্মাকে কলুষিত না করা এবং উল্লেখিত গুনাহসমূহ থেকে সর্তক থাকা। কেননা আল্লাহ (দীনের) শিক্ষার্থীকে 'ইল্মের কারণে সম্মানিত করেন এবং তাকে (অন্যদের) আর্দশ বানিয়ে দেন। এমনকি মানুষের (দীনের ক্ষেত্রে) সমস্যাপূর্ণ বিষয়গুলোকে 'আলিমগণের দিকে ফিরিয়ে দিয়ে বলেন,
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ "অতএব, (হে অজানা লোকেরা!) যদি তোমরা (দীনের কোন বিষয়ে) না জান, তাহলে (তা সম্পর্কে) তোমরা 'আলিমগণকে জিজ্ঞেস করো"। সূরা আন-নাহল ১৬:৪৩। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
وَإِذَا جَاءَهُمْ أَمْرٌ مِنَ الْأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُوا بِهِ وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُولِي الأمر منهم لعلمه الذين يستنبطونه منهم "আর যখন তাদের নিকটে শান্তি বা ভয়ের কোন সংবাদ আসে, তখন তারা তা প্রচার করে। আর যদি তারা রাসূল এবং তাদের মধ্য থেকে উলুল আম্রগণের (অর্থাৎ, 'আলিমগণের) দিকে সংবাদটি ফিরিয়ে দিত, তাহলে তাদের মধ্য থেকে তথ্য অনুসন্ধানকারীগণ তার যথার্থতা উপলব্ধি করতেন"। সূরা আন-নিসা ৪:৮৩।

অতএব, (আলোচনার) সারাংশ হলো যে, হে শিক্ষার্থী! তুমি সম্মানিত। সুতরাং, তুমি তোমার নিজেকে অপমান এবং নিকৃষ্টতার ক্ষেত্রে নামিয়ে দিও না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00