📘 কিতাবুল ইলম > 📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: ‘ইলম অর্জনের কারণসমূহ

📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: ‘ইলম অর্জনের কারণসমূহ


'ইল্ম অর্জনের অনেক কারণ বিদ্যমান। সেগুলোর কিছু আমরা উল্লেখ করলাম।

১. তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা (التقوى) :
তাক্বওয়া অর্জন করা তার পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সকল বান্দাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَ لَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَ إِيَّاكُمْ أَنِ اتَّقُوا اللَّهَ وَ إِنْ تَكْفُرُوا فَإِنَّ للَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَ كَانَ اللَّهُ غَنِيًّا حَمِيدًا
"তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল তাদেরকে এবং তোমাদেরকে অবশ্যই আমি এই নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমারা আল্লাহকে ভয় করো। আর যদি তোমরা কুফুরী কর তাহলে, নিশ্চয় আসমানসমূহ এবং যমীনের মধ্যে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহ হলেন অভাবমুক্ত এবং প্রশংসিত"। সূরা আন-নিসা ৪:১৩১।

আর এটা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরও নির্দেশ তার উম্মাতের প্রতি। আবু উমামাহ ছুদী ইবনু 'আজলান 'আল-বাহিলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخْطُبُ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ فَقَالَ: اتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ، وَ صَلُّوا خَمْسَكُمْ، وَ صُومُوا شَهْرَكُمْ، وَ أَدُّوا زَكَاةَ أَمْوَالِكُمْ، وَ أَطِيعُوا ذَا أَمْرِكُمْ تَدْخُلُوا جَنَّةَ رَبِّكُمْ
"আমি রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বিদায় হজ্জে ভাষণ দিতে শুনেছি। তিনি বলেছেন: তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করো, তোমাদের পাঁচ ওয়াক্ত জ্বলাত আদায় করো, তোমাদের রমাযান মাসের দ্বিয়াম পালন করো, তোমাদের ধন-সম্পদের যাকাত প্রদান করো, তোমাদের নেতাদের আনুগত্য করো এবং তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের জান্নাতে প্রবেশ করো" [৩৩]

আর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো নেতাকে কোনো অভিযানে প্রেরণ করতেন, তখন বিশেষ করে তাকে আল্লাহভীতির নির্দেশ দিতেন এবং মুসলিমদের মধ্য থেকে তার (নেতার) সাথে যারা থাকতেন তাদের সাথে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিতেন এবং সালাফে সালেহীন তাদের বক্তৃতায়, তাদের লেখনীতে এবং মৃত্যুর সময় তাদের ওয়াদ্বিয়্যাতে তারা পরস্পরকে সদুপদেশ দিতে অব্যাহত থাকতেন।

উমার ইবনুল খাত্তাব (তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহর নিকটে লিখেছিলেন, أَمَّا بَعْدُ فَإِنِّي أُوْصِيْكَ بِتَقْوَى الله عَزَّ وَجَلَّ - فَإِنَّهُ مَنْ الْقَاهُ وَقَاهُ، وَمَنْ أَقْرَضَهُ جَزَاهُ و من شكره زاده
অতঃপর আমি তোমাকে আল্লাহভীতির ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছি। যে তাকে ভয় করবে, তিনি তাকে রক্ষা করবেন। যে তাকে ঋণ দিবে, তিনি তাকে প্রতিদান দিবেন এবং যে তার কৃতজ্ঞতা আদায় করবে, তিনি তাকে তা বৃদ্ধি করে দিবেন।

আর 'আলী ( কোনো একজন ব্যক্তিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, "আমি তোমাকে এমন আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি, যার সাক্ষাৎ তোমার জন্য আবশ্যক। যাকে ছাড়া তোমার কোনো সমাপ্তি নেই। আর তিনি ইহকাল এবং পরকালের মালিক"।

আর কোনো একজন ধার্মিক ব্যক্তি তার কোনো এক দীনি ভাইয়ের নিকটে লিখেছেন, "আমি তোমাকে এমন আল্লাহভীতির নির্দেশ দিচ্ছি, যিনি তোমাকে তোমার বিছানায় (বিপদ-আপদ থেকে) রক্ষা করেন এবং তোমাকে তোমার বাহিরে আরোহণে (বিপদ-আপদ থেকে) রক্ষা করেন। সুতরাং তুমি তোমার অন্তরকে দিনে এবং রাতে সর্বাবস্তায় আল্লাহর কাছে প্রদান করো। তুমি আল্লাহকে ভয় করো তোমার নিকট তার নিকটবর্তীতা অনুযায়ী, তোমার উপর তার ক্ষমতা অনুযায়ী। আর জেনে রাখো! নিশ্চয় তুমি তার চোখের সামনে রয়েছো, তুমি তার কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে অন্যের কর্তৃত্বের দিকে যেতে পারবে না এবং তার মালিকানা থেকে অন্যের মালিকানার দিকে যেতে পারবে না। অতএব তার প্রতি তোমার ভয় যেন বেশি থাকে"।

আর তাক্বওয়ার শাব্দিক অর্থ: "বান্দা তার মাঝে এবং সে যার ভয় করে তার মাঝে এমন প্রতিরক্ষা স্থাপন করবে, যা তাকে ভয় হতে রক্ষা করবে"।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: "বান্দা তার নিজের মাঝে এবং সে যার রাগ ও অসন্তুষ্টির ভয় করে তার মাঝে, তার আনুগত্যের মাধ্যমে ও তার পাপসমূহ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে এমন প্রতিরক্ষা স্থাপন করবে, যা তাকে তার রাগ ও অসন্তুষ্টির ভয় থেকে রক্ষা করবে"।

জেনে রাখো! কখনো কখনো "তাক্বওয়া" শব্দটি "বির" শব্দটির সাথে যুক্ত হয়ে আসে, তখন বলা হয় যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَ تَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَ التَّقْوَى
"আর তোমরা পরস্পরকে সাহায্য করো আদেশসমূহ পালন এবং নিষেধসমূহ বর্জনের ব্যাপারে"। সূরা আল-মায়িদা ৫:২।

আর কখনো কখনো এ শব্দ দু'টির একটিকে উল্লেখ করা হয়। অতএব, যখন "বির" শব্দটির সাথে "তাক্বওয়া" শব্দটি মিলিত হয়ে আসে, তখন "বির” শব্দটি "আদেশ পালন” এর অর্থ দেয়। আর "তাক্বওয়া” শব্দটি "নিষেধসমূহ বর্জন" এর অর্থও দেয়। আর "তাক্বওয়া” শব্দটি যখন এককভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন এটি এমন ব্যাপক অর্থ দেয়, যা আদেশসমূহ পালন ও নিষেধসমূহ বর্জনের অর্থকে অন্তর্ভুক্ত করে।

আর অবশ্যই আল্লাহ তা'আলা তার কুরআনে উল্লেখ করেছেন যে, জান্নাত মুত্তাকীদের (আল্লাহভীরুদের) জন্য তৈরি করা হয়েছে। সুতরাং, আল্লাহভীরুরাই জান্নাতের অধিবাসী (আল্লাহ আমাদেরকে এবং তোমাদেরকে জান্নাতের অন্তর্ভুক্ত করুন)। আর একারণেই মানুষের উপর আবশ্যক হলো আল্লাহকে ভয় করা; তার আদেশসমূহ মেনে চলার জন্য, তার প্রতিদান অন্বেষণের জন্য এবং তার শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَتَّقُوا اللهَ يَجْعَلْ لَكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَ اللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ
"হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তাহলে তিনি তোমাদেরকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী শক্তি প্রদান করবেন, তোমাদের থেকে তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ তা'আলা মহা অনুগ্রহশীল। সূরা আল-আনফাল ৮:২৯।

আর এই আয়াতের মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ফায়দাহ/মর্যাদা রয়েছে,

প্রথম ফায়দাহ: ﴿يجعل لكم فرقانا "তোমাদেরকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী শক্তি প্রদান করবেন"। অর্থাৎ তিনি তোমাদেরকে এমন শক্তি প্রদান করবেন, যার মাধ্যমে তোমরা সত্য-মিথ্যার মাঝে ও ভাল-মন্দের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করবে। আর আয়াতের এই অংশে 'ইল্ম অন্তর্ভুক্ত। এটি এভাবে যে, আল্লাহ তা'আলা মানুষের জন্য যে জ্ঞানসমূহ উন্মোচন করে দিয়েছেন, তা অন্য কারো জন্য উন্মোচন করেননি। কেননা আল্লাহভীতির মাধ্যমেই সঠিক পথের আধিক্যতা, 'ইল্মের আধিক্যতা এবং সংরক্ষণের আধিক্যতা অর্জিত হয়।

আর একারণেই শাফিঈ (রহঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: شكوتُ إِلَى وَكيع سوء حفظي ... فَأَرْشَدَنِي إِلَى تَرْك الْمَعَاصِي وَ قَالَ اعْلَمْ بِأَنَّ الْعِلْمُ نور ... و نور الله لا يؤتاه عاصي
"আমি আমার শিক্ষক ওয়াকী' এর নিকট আমার স্মরণশক্তির দুর্বলতার ব্যাপারে অভিযোগ করলাম। অতঃপর তিনি আমাকে গুনাহসমূহ বর্জনের পরামর্শ দিলেন এবং বললেন: তুমি জেনে রাখো যে, 'ইল্ম হলো নূর। আর আল্লাহর নূর কোনো পাপীকে দেওয়া হয় না"।

কোনো সন্দেহ নেই যে, মানুষ যখন 'ইল্ম বৃদ্ধি করতে চায়, তখন মানুষ শিক্ষা ব্যবস্থা, সত্য-মিথ্যা মাঝে এবং ভাল-মন্দের মাঝে পার্থক্যকারী শক্তি বৃদ্ধি করতে চায়।

অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা মানুষের জন্য যে "বুঝ” উন্মোচন করে দিয়েছেন, তা আয়াতের এ অংশের অন্তর্ভুক্ত। আর তাক্বওয়া হচ্ছে বুঝশক্তির উপকরণ এবং বুঝশক্তির মাধ্যমে 'ইল্মের আধিক্যতা অর্জিত হয়। অতঃপর তুমি দু'জন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করবে, তারা আল্লাহর কুরআন থেকে কোনো আয়াত সংরক্ষণ করে এবং তাদের দু'জনের একজন উক্ত আয়াত থেকে তিনটি হুকুম বের করতে সক্ষম হয়। আর অপরজন; আল্লাহ তাকে যে "বুঝ” দিয়েছেন, তা অনুযায়ী সে উক্ত আয়াত থেকে অনেক হুকুম বের করতে সক্ষম হয়। তাক্বওয়া হচ্ছে বুঝের আধিক্যতার উপকরণ।

আর আয়াতের এই অংশে অন্তরদৃষ্টিও অন্তর্ভুক্ত যে, আল্লাহ মুত্তাকীদের এমন অন্তরদৃষ্টি প্রদান করেন, যার মাধ্যমে সে মানুষের মাঝে (ভাল-মন্দের) পার্থক্য করে। সুতরাং শুধুমাত্র মানুষকে দেখেই সে চিনতে পারে যে, সে (মানুষটি) সত্যবাদী নাকি মিথ্যাবাদী, নেক্কার নাকি বদ্কার। এমনকি আল্লাহ তাকে যে
অন্তরদৃষ্টি দিয়েছেন, তার মাধ্যমে কখনো কখনো সে ব্যক্তি কোনো এক ব্যক্তির ব্যাপারে ফায়ছালা দেয়। অথচ সে (কখনো) তার সঙ্গী হয়নি এবং তার সম্পর্কে (পূর্ব থেকে) কোনো কিছুই জানে না।

দ্বিতীয় ফায়দাহ: "তোমাদের থেকে তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন"। আর সৎ আমলের মাধ্যমে পাপ মোচন হয়। কেননা সৎ আমল খারাপ আমলের কাফ্ফারা। যেমন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِذَا اجْتَنِبَ الْكَبَائِرُ যদি বান্দা কাবীরাহ গুনাসমূহ বর্জন করে, তাহলে পাঁচ ওয়াক্ত জ্বলাত, এক জুম'আহ থেকে অপর জুম'আহ এবং এক রমাযান (মাস) থেকে অপর রমাযান (মাস), এগুলোর মধ্যবর্তী সময়ে যে (দ্ব'গীরাহ) গুনাসমূহ হয়েছে, সেগুলোর কাফ্ফারা হয়ে যাবে। [৩৪] রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
العمرة إلى العمرة كفارة لما بينهما এক 'উমরা থেকে অপর 'উমরা উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ে যে (ছুগীরা) গুনাহগুলো হয়েছে, সেগুলোর কাফ্ফারা হয়ে যাবে। [৩৫]

সুতরাং সৎ আমলসমূহের মাধ্যমেই কাফ্ফারা হয়। আর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদ্দেশ্য নিয়েছেন যে, মানুষ যখন আল্লাহকে ভয় করে, তখন আল্লাহ তার জন্য এমন সৎ আমলসমূহ সহজ করে দেন, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন।

তৃতীয় ফায়দাহ: و يغفر لكم "এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন"। এটা এজন্য যে, তাওবা এবং ইস্তেগফার তোমাদের জন্য সহজ করা হয়েছে।

কেননা এটা বান্দার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ যে, তিনি তাওবা এবং ইস্তেগফারকে সহজ করেছেন।

২. 'ইল্ল্ম অন্বেষণের ব্যাপারে কঠোর পরিশ্রমী হওয়া ও তাতে অটল থাকা (المثابرة والاستمرار على طلب العلم): 'ইল্ম অর্জনের ক্ষেত্রে শ্রম ব্যয় করা, তার উপর ধৈর্যধারণ করা এবং 'ইল্ম অর্জনের পর তা সংরক্ষণ করা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক। কেননা শরীরের প্রশান্তির মাধ্যমে 'ইল্ম অর্জিত হয় না। অতএব, প্রত্যেক শিক্ষার্থী ঐ সকল পথে চলবে, যে সকল পথ 'ইল্ম পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। আর একারণে সে ছওয়াবপ্রাপ্ত হবে। কেননা জ্বহীহ মুসলিমে নবী জ্বাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন,
مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا، سَهُلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ "যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো পথে চলে, যে পথে সে 'ইল্ম অন্বেষণ করবে; তাহলে এর বিনিময়ে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি পথ সহজ করে দিবেন"।[৩৬]

অতএব, প্রত্যেক শিক্ষার্থী যেন অধ্যবসায়ী হয়, কঠোর পরিশ্রমী হয়, রাত্রী জাগরণ করে এবং তার থেকে যেন ঐ প্রত্যেক জিনিস দূরে থাকে, যা তাকে 'ইল্ম অন্বেষণ থেকে বিরত রাখে অথবা তাকে ব্যস্ত রাখে।

আর সালাফে জ্বলেহীনের 'ইল্ম অন্বেষণের ক্ষেত্রে কঠোর পরিশ্রমের ব্যাপারে অনেক ঘটনা রয়েছে। এমনকি আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (আনহুমা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি কিসের মাধ্যমে 'ইলল্ম অর্জন করেছেন? তিনি (জবাবে) বলেছিলেন,
بلِسَانِ سَؤول، وَ قَلْب عقول، و بدن غير كسول অধিক প্রশ্নকারী জিহ্বার মাধ্যমে, জ্ঞানবান অন্তরের মাধ্যমে এবং নিরলস শরীরের মাধ্যমে। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (আনহুমা) থেকে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন,
إِنْ كَانَ لَيَبْلُغُنِي الْحَدِيثُ عَن الرَّجُلِ فَأَتِي بَابَهُ فَأَتَوَسَّدُ رِدَانِي عَلَى بَابه، تسفي الريح عَلَيَّ مِنَ التَّرَابِ، فَيَخْرُجُ فَيَقُولُ : يَا ابْنَ عَمَّ رَسُولِ الله مَا جَاءَ بِكَ؟ أَلَا أَرْسَلْتَ إِلَيَّ فَأَتَيْكَ؟ فَأَقُولُ: أَنَا أَحَقُّ أَن أَتِيَكَ
"নিশ্চয় কোনো একজন ব্যক্তি থেকে কোনো একটি হাদীছ আমার নিকট পৌঁছেছিল। অতঃপর আমি তার দরজায় এসেছিলাম। পরে আমি আমার চাদরটি তার দরজার উপর বালিশরূপে ব্যবহার করেছিলাম। বাতাস আমার উপর দিয়ে ধূলা-বালি উড়িয়ে নিয়েছিল। অতঃপর, সে লোক বের হয়ে বলেছিল, হে রসূলুল্লাহর চাচাতো ভাই! আপনাকে কে নিয়ে এসেছে? আপনি কেন আমার নিকটে (কাউকে) পাঠান নি, তাহলে আমি আপনার নিকটে আসতাম? তারপর আমি বলেছিলাম: আপনার নিকটে আসার আমি বেশি হকদার"।

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস ইলমের কারণে বিনয়ী ছিলেন। ফলে আল্লাহ এর বিনিময়ে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে কঠোর পরিশ্রম করা একজন শিক্ষার্থীর জন্য উচিত। আর ইমাম শাফিঈ (রহঃ) থেকেও বর্ণিত আছে যে, কোনো এক রাত্রিতে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল (রহঃ) তাকে দাওয়াত দিলেন। তারপর তার সামনে রাতের খাবার পেশ করলেন। এরপর শাফিঈ (রহঃ) খাবার খেলেন। খাবার শেষে দু'ব্যক্তি তাদের বিছানায় চলে গেল। তারপর শাফিঈ (রহঃ) কোনো একটি হাদীছের হুকুমগুলো উদ্‌ঘাটনের জন্য গবেষণা করতে থাকলেন। আর হাদীছটি হলো নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাণী,
يَا أَبَا عُمَيْرٍ مَا فَعَلَ النُّغَيرُ হে আবু 'উমাইর! নু'গাইর (ছোট পাখি) কি করে?৩৭]
আবু উমাইর এর সাথে একটি ছোট পাখি ছিল। যাকে নু'গাইর বলে ডাকা হত। তারপর এই পাখিটি মারা গেল। অতঃপর বালকটি পাখিটির ব্যাপারে দুঃখ পেল। আর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশুদের সাথে খেলা করতেন।

অতঃপর দীর্ঘ রাত্রি ধরে ইমাম শাফিঈ (রহঃ) এই হাদীছটি থেকে (হুকুম) উদ্‌ঘাটন করতে থাকলেন। বলা হয়ে থাকে: তিনি হাদীছটি থেকে ১০০০ এর চেয়েও বেশি ফায়দাহ উদ্‌ঘাটন করেছিলেন। সম্ভবত তিনি যখন কোনো ফায়দাহ উদ্‌ঘাটন করতেন, তখন এর সাথে আরেকটি হাদীছ টেনে আনতেন। অতঃপর যখন ফজরের আযান দেওয়া হল, তখন ইমাম শাফিঈ (রহঃ) জ্বলাত আদায় করলেন। অথচ উযূ করলেন না। তারপর তিনি তার বাড়ির দিকে ফিরে গেলেন। আর ইমাম আহমাদ (রহঃ) তার পরিবারের নিকটে শাফিঈ (রহঃ)
এর প্রশংসা করেছিলেন। তারপর তার পরিবারের লোকজন তাকে বললেন, হে আবু আব্দুল্লাহ! আপনি কিভাবে এমন ব্যক্তির প্রশংসা করেন; যিনি পানাহার করলেন, ঘুমালেন, রাত্রি জাগরণ করলেন না এবং উযূ ছাড়া ফজরের জ্বলাত আদায় করলেন? তারপর ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রহঃ) ইমাম শাফিঈ (রহঃ) কে (এ বিষয়ে) জিজ্ঞেস করলেন। অতঃপর ইমাম শাফিঈ (রহঃ) (জবাবে) বললেন: "আমি পাত্র খালি করা পর্যন্ত খেয়েছি। কেননা আমি ইমাম আহমাদ (রহঃ) এর খাবারের চেয়ে উত্তম খাবার খুঁজে পাইনি। তাই এ খাবার দিয়ে আমার পেট পূর্ণ করার ইচ্ছা করেছি। আর আমি তাহাজ্জুদের জ্বলাত আদায় করিনি। কেননা রাতের (নফল জ্বলাতে) দণ্ডায়মান হওয়ার চেয়ে 'ইল্ম অর্জন করা অধিকতর উত্তম। আর আমি (উক্ত সময়ে) এই হাদীছটির ব্যাপারে গবেষণা করেছিলাম। পক্ষান্তরে, ফজরের জ্বলাতের জন্য আমি উযূ করিনি। কেননা আমি 'ইশার জ্বলাত থেকেই উযূ অবস্থায় ছিলাম"।

(লেখক) আমি সর্বাবস্থায় বলব: 'ইল্ম অর্জনের ক্ষেত্রে কঠোর পরিশ্রমী হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতএব, আমরা যেন আমাদের বর্তমান সময়ের দিকে লক্ষ্য করি, আমরা কি এই কঠোর পরিশ্রমের উপর আছি, নাকি নাই? পক্ষান্তরে, যারা নিয়মিত লেখাপড়া করে। অতঃপর যখন তারা লেখাপড়া থেকে বিরত হয়, তখন তারা এমন কিছু জিনিসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, যেগুলো তাদেরকে পড়াশুনার ব্যাপারে উৎসাহিত করে না।

আমি একটি উদাহরণ পেশ করছি: কোনো একজন শিক্ষার্থী কোনো এক বিষয়ে খারাপ পরীক্ষা দিল। তারপর শিক্ষক বললেন, "কেন (তুমি খারাপ পরীক্ষা দিলে)? অতঃপর ছাত্রটি বলল: কেননা আমি এই বিষয়টি বুঝতে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছি। ফলে আমি এই বিষয়টি পড়ি না। কিন্তু আমি এটি বুঝতে চাই"। এ কেমন হতাশা? এটি একটি বড় ভুল। অতএব, আমাদের কঠোর পরিশ্রম করা আবশ্যক, যতক্ষণ না আমরা উদ্দিষ্ট লক্ষ্য পর্যন্ত পৌঁছতে পারি। আর আমার নিকটে আমাদের শিক্ষক আব্দুর রহমান আস-সা'দী (রহঃ) বর্ণনা করেছিলেন যে: "নাহু বিষয়ে কুফাবাসীর ইমাম আল-কিসায়ী (রহঃ) নাহুশাস্ত্রে 'ইল্ম অন্বেষণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সক্ষম হন নি। কোনো একদিন তিনি এমন একটি পিঁপড়াকে দেখলেন, যে পিঁপড়াটি তার খাবার বহন করে নিয়ে যাচ্ছিল এবং খাবার নিয়ে দেয়ালের (উপর) দিকে আরোহণ করছিল। যখনই সে উপরের দিকে আরোহণ করছিল, তখনই সে পড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সে এই বাধা থেকে মুক্তি পাওয়া পর্যন্ত এবং দেয়ালে আরোহণ করা পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।

তারপর আল-কিসায়ী (রহঃ) বললেন, এই পিঁপড়াটি অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে গেল। তারপর তিনিও নাহুশাস্ত্রে ইমাম হওয়া পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে গেলেন"। হে শিক্ষার্থীরা! আর একারনেই আমাদের কঠোর পরিশ্রম করা এবং হতাশ না হওয়া উচিত। কেননা হতাশার অর্থ হলো: কল্যাণের দরজা বন্ধ করা। আর আমাদের নিজেদেরকে অশুভ মনে না করা উচিত। বরং আমাদের নিজেদেরকে কল্যাণকর এবং শুভ মনে করা উচিত।

৩. হিফয বা মুখস্থকরণ )الحفظ):
পড়াশুনার ব্যাপারে লেগে থাকা একজন শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক। আর সে যা শিক্ষা করে, তা তার অন্তরে সংরক্ষণ করা এবং তা তার কিতাবে সংরক্ষণ করা তার উপর আবশ্যক। কেননা মানুষ ভুলের লক্ষ্যবস্তু। অতএব, যখন মানুষ পড়াশুনার ব্যাপারে লেগে থাকবে না এবং যা শিখেছে তা বারবার চর্চা করবে না, তখন অবশ্যই এটি তার থেকে হারিয়ে যাবে এবং তা সে ভুলে যাবে। বলা হয়ে থাকে: 'ইল্ম হচ্ছে শিকারলব্ধ প্রাণী এবং তা লিখে রাখা হচ্ছে প্রাণীটির বন্দিকরণ। অতএব, তোমার শিকারলব্ধ প্রাণীগুলোকে নির্ভরযোগ্য রশিসমূহ দ্বারা বন্দি করো। কোনো একটি হরিণীকে তোমার বন্দি করে রাখা, তারপর তাকে পৃথিবীর মধ্যে ছেড়ে দেওয়া বোকামির অন্তর্ভুক্ত। এটা যেন তালাকপ্রাপ্তা মহিলার মত। যে সকল পদ্ধতি 'ইল্ম সংরক্ষণের ব্যাপারে উৎসাহিত করে, তার মধ্য থেকে একটি পদ্ধতি হলো, 'ইল্ম অনুযায়ী মানুষের সঠিক পথ পাওয়া। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَ الَّذِينَ اهْتَدَوْا زَادَهُمْ هُدًى وَ آتَاهُمْ تَقْوَاهُمْ
আর যারা সঠিক পথ অবলম্বন করে, তিনি তাদের সঠিকপথ প্রাপ্তি বৃদ্ধি করে দেন এবং তাদেরকে আল্লাহভীতি প্রদান করেন। সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৭। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন,
وَ يَزِيدُ اللَّهُ الَّذِينَ اهْتَدَوْا هُدًى
আর যারা সঠিক পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ (তাদের সঠিক পথপ্রাপ্তি) বৃদ্ধি করে দেন। সূরা মারইয়াম ১৯:৭৬।

অতএব, যখনই মানুষ তার 'ইল্ম অনুযায়ী আমল করে, তখনই আল্লাহ তার মুখস্ত শক্তি এবং “বুঝ” শক্তি বৃদ্ধি করে দেন।

৪. আলিমগণের সংস্পর্শে থাকা (ملازمة العلماء):
আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা একজন শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক। অতঃপর আলিমগণের সংস্পর্শে থাকা এবং তাদের কিতাবে তারা যা লিখেছেন তার সাহায্য নেওয়া একজন শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক। কেননা শুধুমাত্র (নিজে নিজে) পড়াশুনা এবং অধ্যয়নের উপর সীমাবদ্ধ থাকার কারণে একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন মনে করে। যা ঐ ছাত্রের বিপরীত, যে এমন কোনো একজন আলেমের নিকটে বসে, যিনি তার নিকটে (বিভিন্ন বিষয়ে) ব্যাখ্যা প্রদান করেন এবং সঠিক পথ সুস্পষ্ট করে দেন। আর আমি বলছি না, নিশ্চয় একজন ছাত্র শাইখদের নিকট থেকে 'ইল্ম শিক্ষা করা ছাড়া 'ইল্ম অর্জন করতে পারবে না। বরং অবশ্যই মানুষ (নিজে নিজে) পড়াশুনা এবং অধ্যয়নের মাধ্যমে 'ইল্ম অর্জন করতে পারবে। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রে যখন কোনো একজন ছাত্র (নিজে নিজে) দিনে এবং রাতে পরিপূর্ণরূপে ('ইল্ম অর্জনের কাজে) ঝুঁকে পড়ে এবং "বুঝ" অর্জন করে, তখন কখনো কখনো ছাত্রটি অধিক ভুল করে। একারণেই বলা হয়ে থাকে, "যদি কোনো ব্যক্তির দলীল হয় তার কিতাব, তাহলে তার ভুলের পরিমাণ সঠিকতার চেয়ে অধিকতর বেশি"।

কিন্তু এই কথাটি কোনো ভাবেই সঠিক নয়। বরং শাইখগণের নিকট থেকে 'ইল্ম অর্জন সর্বোৎকৃষ্ট। আর আমি প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে উপদেশ দিব যে, সে কোনো একটি বিষয়ে সকল শাইখ থেকে 'ইল্ম অর্জন করবে না। যেমন সে একের অধিক শাইখ থেকে ফিক্হ সংক্রান্ত বিষয়ে 'ইলম অর্জন করবে না। কেননা 'আলিমগণ কুরআন-সুন্নাহ থেকে দলীল গ্রহণের ক্ষেত্রে মতানৈক্য করেন এবং তাদের মতামতের ক্ষেত্রেও মতানৈক্য করেন।

সুতরাং তুমি তোমার জন্য এমন একজন 'আলিম নির্ধারণ করবে, যার নিকটে ফিক্হ, বাল'গাত ইত্যাদি বিষয়ে তুমি 'ইল্ম অর্জন করবে। অর্থাৎ তুমি একটি বিষয়ে একজন শাইখ থেকেই 'ইলম অর্জন করবে। আর যখন উক্ত শাইখের নিকটে একটি বিষয়ের চেয়ে অধিক বিষয়ে 'ইল্ম থাকবে, তখন তুমি তার সাথে লেগে থাকবে। কেননা যখন তুমি ফিক্হ শাস্ত্র সম্পর্কে একাধিক শাইখ থেকে 'ইল্ম অর্জন করবে, অথচ তারা তাদের মতামতের ক্ষেত্রে মতানৈক্য করেন; তখন তোমার (নিজের) মতামত কি হবে? অথচ তুমি ছাত্র? (তখন) তোমার মতামত হবে হতবুদ্ধিতা এবং সন্দেহ। কিন্তু যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে কোনো একজন 'আলিমের সাথে তুমি লেগে থাকবে, তখন এটি তোমাকে প্রশান্তি দিবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00