📄 প্রথম পরিচ্ছেদ: শিক্ষার্থীর আদব-কায়দা
একজন শিক্ষার্থীর আদব-কায়দা/শিষ্টাচারসমূহ মেনে চলা অপরিহার্য। তন্মধ্যে কিছু শিষ্টাচার নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
প্রথম আদেশ: আল্লাহ তা'আলার জন্য নিয়্যাতকে খাঁটি করা (إخلاص النية الله عز وجل): এমনভাবে নিয়্যাতকে খাঁটি করতে হবে যে, 'ইল্ম অন্বেষণের দ্বারা শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি (অর্জন) এবং জান্নাত (পাওয়া)। কেননা আল্লাহ 'ইল্ম অন্বেষণের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করে ও উৎসাহ প্রদান করে বলেন,
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاستَغفر لذنبك [محمد: ١٩]
"(হে নবী!) আপনি এ 'ইলল্ম অর্জন করুন যে, তিনি ছাড়া (সত্য) কোন উপাস্য নেই, আর আপনার ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন"। সূরা মুহাম্মাদ; ৪৭:১৯।
কুরআনে আলিমগণের ব্যাপারে প্রশংসার বিষয়টি জ্ঞাত। আর যখন আল্লাহ কোন বিষয়ের ব্যাপারে বা কোন কাজের ব্যাপারে প্রশংসা করেন, তখন তা 'ইবাদত হয়। আর যদি মানুষ মর্যাদার মাধ্যম বানানোর জন্য শারঈ 'ইল্ম অন্বেষণের দ্বারা প্রশংসাপত্র পাওয়ার নিয়্যাত করে, তাহলে রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَى به وَجْهُ الله عَزَّ وَجَلَّ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدنيا، لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ. يعني ريحها
"যে 'ইল্মের দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা যায়, যদি কোন ব্যক্তি সে 'ইল্মের দ্বারা কেবলমাত্র দুনিয়ার সামগ্রী পাওয়ার জন্যই তা শিক্ষা করে, তাহলে সে ব্যক্তি ক্বিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধ পাবে না। (রাবী বলেন) রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জান্নাতের ঘ্রাণ উদ্দেশ্য করেছেন" ।[১৪]
আর এটি কঠিন হুমকি। কিন্তু যদি ছাত্র/শিক্ষার্থী বলে, আমি দুনিয়ার প্রাচুর্যের জন্য সনদপত্র পেতে চাই না, বরং এজন্য যে, বিভিন্ন নিয়ম-নীতির ক্ষেত্রে সনদপত্রের কারণে একজন আলিমের মান (যোগ্যতা) সুস্পষ্ট হয়। সুতরাং আমরা বলবো, যখন শিক্ষাদান বা পরিচালনা করা অথবা অন্য কিছু করার মাধ্যমে মানুষের উপকার করার জন্যে কোন ব্যক্তির নিয়্যাত হবে সনদপত্র পাওয়া, তখন এটি হবে খাঁটি নিয়্যাত। কোনকিছু এর ক্ষতি করতে পারবে না। কেননা এটি প্রকৃত নিয়্যাত।
আর প্রকৃতপক্ষে, আমি একজন শিক্ষার্থীর (জন্য অপরিহার্য) শিষ্টাচারগুলোর প্রথমেই 'ইল্লাছু' কে উল্লেখ করলাম। কেননা 'ইল্লাছু' হলো মূলভিত্তি। সুতরাং 'ইল্ম অন্বেষণের দ্বারা আল্লাহর আদেশ মেনে চলার নিয়্যাত করা একজন শিক্ষার্থীর উপর অপরিহার্য।
কেননা আল্লাহ তা'আলা 'ইল্ম অর্জনের ব্যাপারে আদেশ করে বলেছেন,
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ [محمد: ١٩]
(হে নাবী!) আপনি এ 'ইল্ম অর্জন করুন যে, তিনি ছাড়া (সত্য) কোন উপাস্য নেই, আর আপনার ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৯।
সুতরাং যদি তুমি 'ইল্ম অর্জন কর, তাহলে নিশ্চয় তুমি আল্লাহর আদেশ মান্যকারী হবে।
দ্বিতীয় আদেশ: নিজের এবং অন্যের থেকে অজ্ঞতা দূর করা ) رفع الجهل عن نفسه وعن غيره( : 'ইল্ম অন্বেষণের দ্বারা নিজের থেকে এবং অন্যের থেকে অজ্ঞতা/মূর্খতা দূর হওয়ার নিয়্যাত করা। কেননা মানুষের মাঝে মূল (সমস্যা) হলো অজ্ঞতা। আর এর দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার বাণী,
وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
"আর আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়েদের পেট থেকে বের করেছেন, এমন অবস্থায় তোমরা কিছুই জানতে না! আর তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং হৃদয়; যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর"। সূরা আন-নাহল ১৬:৭৮।
আর বাস্তবতা এরই সাক্ষ্য দেয়। সুতরাং তুমি 'ইল্ম অন্বেষণের দ্বারা তোমার নিজের থেকে অজ্ঞতা দূর করার নিয়্যাত করো এবং এর দ্বারা আল্লাহভীতি অর্জনের নিয়্যাত করো। আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
"কেবলমাত্র আল্লাহর বান্দাদের মধ্য থেকে আলিমগণই আল্লাহকে ভয় করে"। সূরা ফাতির ৩৫:২৮।
অতএব তুমি তোমার নিজের থেকে অজ্ঞতা দূর করার নিয়্যাত করো। কেননা তোমার মাঝে মূল (সমস্যা) হলো অজ্ঞতা/মূর্খতা। সুতরাং যখন তুমি 'ইল্ম অর্জন করবে এবং আলিমগণের অন্তর্ভুক্ত হবে, তখন তোমার থেকে অজ্ঞতা বিতাড়িত হবে। অনুরূপভাবে উম্মাহর (জাতির) নিকট থেকে অজ্ঞতা দূর করার নিয়্যাত করো। আর এটি (সম্ভব) হবে বিভিন্ন পদ্ধতিতে ('ইল্ম) শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে, যেন তোমার 'ইল্ল্ম দ্বারা তুমি লোকজনের উপকার করতে পার।
প্রশ: (১) 'ইল্ম উপকারে আসার জন্য মসজিদে তোমার গোল হয়ে বসা কি শর্ত? (২) নাকি সর্বাবস্থায় তোমার 'ইল্ম দ্বারা মানুষের উপকার করা সম্ভব?
উত্তর: ২য় টির দ্বারা (মানুষের উপকার করা) সম্ভব। কেননা রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً
"আমার থেকে একটি বাণী/কথা হলেও (মানুষের নিকটে) পৌঁছে দাও”।[১৫]
কেননা যখন তুমি কোন ব্যক্তিকে 'ইল্ম শিক্ষা দিবে, আর সে ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে তা শিক্ষা দিবে; তখন তোমার জন্য দু'জন ব্যক্তির সম-পরিমাণ ছাওয়াব নিধারিত হবে। আর যদি সে ব্যক্তি তৃতীয় ব্যক্তিকে (তা) শিক্ষা দেয়, তাহলে তোমার জন্য তিনজন লোকের (সম-পরিমাণ) ছাওয়াব নির্ধারিত হবে। এভাবে (চলতেই থাকবে)। আর একারণেই যখন মানুষ কোন 'ইবাদত করে, তখন বলেন,
اللَّهُمَّ اجْعَلْ ثَوَابَهَا لِرَسُولِ اللَّهِ
"হে আল্লাহ! ইবাদতটির (সমান) ছাওয়াব রসূলুল্লাহর জন্য নির্ধারণ করুন"।
কেননা যে রাসূল তোমাকে ইবাদতটি শিক্ষা দিয়েছেন, সে রসূলই ইবাদতের ব্যাপারটি পরিষ্কার করে দিয়েছেন। সুতরাং, তার জন্য তোমার ছাওয়াবের সম-পরিমাণ (ছাওয়াব) রয়েছে। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহঃ) বলেছেন,
العلم لا يعدله شيئ لمن صحت نيته
যে ব্যক্তির নিয়্যাত বিশুদ্ধ, সে ব্যক্তির 'ইল্মের সম-পরিমাণ কোন কিছুই হতে পারে না।
ঐ ব্যক্তি নিজের থেকে এবং অন্যের থেকে অজ্ঞতা দূর করার নিয়্যাত করবে। (লেখক বললেন), কেননা তাদের মাঝে মূল (সমস্যা) ছিল অজ্ঞতা, যেমন তোমার মাঝে এটিই মূল (সমস্যা)। সুতরাং যখন তুমি এই উম্মাহ (জাতি) থেকে অজ্ঞতা দূর করার জন্য ('ইল্ম) শিক্ষা করবে, তখন তুমি আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদকারী) এমন মুজাহিদগণের অন্তর্ভুক্ত হবে, যারা আল্লাহর দীনকে উজ্জীবিত করেন এবং প্রতিষ্ঠিত করেন।
তৃতীয় আদেশ: শরী'আত (ইসলামী বিধি-বিধান) রক্ষা করা (الدفاع عن الشريعة) :
'ইল্ম অন্বেষণের দ্বারা (ইসলামী) শরী'আত রক্ষা করার নিয়্যাত করা। কেননা (ইসলামী) গ্রন্থাবলী শরী'আত রক্ষা করতে সক্ষম নয়। আর শরী'আতের ধারকবাহক ছাড়া শরী'আত কেউ রক্ষা করতে পারে না। সুতরাং যদি বিদ'আতপন্থীদের মধ্য থেকে কোন লোক (ইসলামী) বিধি-বিধান সংবলিত গ্রন্থাবলীতে পরিপূর্ণ কোন পাঠাগারে আসে, যেখানে সেসব গ্রন্থাবলী গণনা করে শেষ করা যায় না। তারপর কোন বিদ'আত নিয়ে কথা বলে ও তা সাব্যস্ত করে, তাহলে আমি মনে করি না যে, একটি কিতাব হলেও তার জবাব দিবে। কিন্তু সে যখন জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের মধ্য থেকে কোন ব্যক্তির নিকটে তার বিদ'আত নিয়ে কথা বলবে তা সাব্যস্থ করার জন্য, তখন নিশ্চয় ঐ 'ইল্ম অন্বেষণকারী তার জবাব দিবে এবং আল-কুরআন ও আস-সুন্নাহ দ্বারা তা খণ্ডন করবে।
অতএব, একজন শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যিক হলো 'ইল্ম অন্বেষণের দ্বারা (ইসলামী) শরী'আহ রক্ষা করার নিয়্যাত করা। কেননা পূর্ণ অস্ত্রের ন্যায় শরী'আতের ধারক-বাহকের মাধ্যম ব্যতীত (ইসলামী) শরী'আত রক্ষা করা যায় না। যদি আমাদের নিকটে অনেক অস্ত্র থাকে, তাহলে অস্ত্রের ভান্ডার পূর্ণ হয়ে যাবে।
প্রশ্ন: ক্ষেপনাস্ত্রগুলো অর্জন করার জন্য এ সকল অস্ত্র কি শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সক্ষম, নাকি (অস্ত্রগুলোর) ধারক-বাহকের মাধ্যম ব্যতিত এটি (সম্ভব) হবে না?
উত্তর: (অস্ত্রগুলোর) ধারক-বাহকের মাধ্যম ব্যতিত এটি (সম্ভব) হবে না। আর 'ইল্মের বিষয়টিও এরূপ। এই কারনেই আমি বলি: একজন ছাত্রের জন্য যে বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য রাখা আবশ্যিক, তা হলো (ইসলামী) শরী'আত রক্ষা করা। তাহলে লোকেরা জরুরী প্রয়োজনে আলিমগণের নিকটে যেতে পারবে। একারণে যে, তাঁরা বিদ'আতপন্থীদের ষড়যন্ত্রের এবং আল্লাহর অন্যান্য শত্রুদের ষড়যন্ত্রের জবাব দিতে পারেন। আর এটি 'ইল্ল্ম অর্জন ছাড়া (সম্ভব) হবে না।
চতুর্থ আদেশ: মতভেদপূর্ণ মাসআলার ক্ষেত্রে অন্তর প্রসারিত করা (رحابة الصدر في مسائل الخلاف): এমন মতভেদপূর্ণ বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে ব্যক্তির অন্তর প্রসারিত হওয়া/উদার হওয়া, যার উৎস হলো ইত্তিহাদ। কেননা আলিমগণের মাঝে মতভেদপূর্ণ মাসআলাগুলো হয় এমন বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে, যার ক্ষেত্রে ইজতিহাদের কোন অবকাশ নেই এবং মাসআলাগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি সুস্পষ্ট; তখন কেউ মাসআলাগুলোর মতভেদের ব্যাপারে ওযর গ্রহণ করবে না। অথবা মাসআলাগুলো এমন বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে, যেগুলোর ক্ষেত্রে ইতিহাদের অবকাশ রয়েছে। সুতরাং এই মাসআলাগুলোর ব্যাপারে যারা মতভেদ করেছেন, তারা এগুলোর ক্ষেত্রে ওযর গ্রহণ করেন। আর তোমার উক্তি তার বিরুদ্ধে দলীল হবে না, যিনি মাসআলার ক্ষেত্রে বিরোধিতা করেন। কেননা আমরা যদি এটি গ্রহণ করি, তাহলে অবশ্যই আমরা এর বিপরীতে বলব, তার উক্তি তোমার বিরুদ্ধে দলীল। আর যে ক্ষেত্রে নিজস্ব রায়/মতামতের অবকাশ রয়েছে এবং যে ক্ষেত্রে মানুষ মতভেদ পোষণ করে, সে ক্ষেত্রে আমি এটিই চাই।
পক্ষান্তরে, যদি কোন ব্যক্তি 'আক্বীদার মাসআলাগুলোর ক্ষেত্রে সালাফগণের পদ্ধতির বিরোধিতা করে, তাহলে সালাফে জ্বলিহীন যে পদ্ধতির উপর রয়েছেন, সে পদ্ধতির বিরোধিতা কারও পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হবে না। কিন্তু যে মাসআলাগুলোর ক্ষেত্রে (নিজস্ব) রায়/মতামতের অবকাশ রয়েছে, সে মাসআলাগুলোর ক্ষেত্রে মতানৈক্যের কারণে অন্যদের ব্যাপারে কটুক্তি করা উচিত নয়। অথবা মতভেদের কারণে শত্রুতার এবং হিংসার পথ গ্রহণ করা উচিত নয়।
ছাহাবাগণ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম অনেক বিষয়ে মতভেদ করেছেন। আর যে ব্যক্তি তাদের মতভেদের ব্যাপারে অবগত হতে চায়, সে ব্যক্তি যেন তাদের সম্পর্কে বর্ণিত আছারগুলোর দিকে প্রত্যাবর্তন করে (অর্থাৎ লক্ষ্য করে)। তাহলে সে ব্যক্তি অনেক মাসআলার ক্ষেত্রে মতভেদ দেখতে পাবে। সম্প্রতিকালে মতভেদের কারণে মানুষ অভ্যাসগতভাবে যে মাসআলাহ গ্রহণ করেছে, এটিই সবচেয়ে বড় মাসআলাহ। এমনকি মানুষ এখান থেকেই এমনভাবে দলবদ্ধতা গ্রহণ করেছে যে, তারা বলে: আমরা অমুকের সাথে আছি (অর্থাৎ আমরা অমুক দলের)। একটি মাসআলাহ নির্দিষ্ট দলের মাসআলাহ হয়ে যায়। আর এটি ভুল।
উদাহরণ স্বরূপ: কোন এক ব্যক্তির উক্তি, যখন তুমি রুকু থেকে (মাথা) উঠাবে, তখন তোমার ডান হাত বাম হতের উপর রেখো না, বরং তা তোমার দুই উরুর পার্শ্ব পর্যন্ত ছেড়ে দাও। অতএব যদি তুমি তা না কর, তাহলে তুমি বিদ'আতকারী। কোন ব্যক্তির ব্যাপারে বিদ'আতকারী শব্দটি (ব্যবহার করা এত) সহজ নয়। যখন আমার নিকটে কেউ এধরনের কথা বলে, তখনই আমার অন্তরে অপছন্দের একটি বিষয় সৃষ্টি হয়। অথচ আমরা বলব, এ মাসআলার ব্যাপারে প্রশস্ততা রয়েছে। হয় ব্যক্তি তা পালন করবে অথবা তা ছেড়ে দিবে। আর এ কারণেই ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রহঃ) দলীল গ্রহণ করেছেন যে, يُخَيَّرُ بَينَ أَنْ يَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى وَ بَيْنَ الْإِرْسَالَ
"কোন ব্যক্তির ডান হাত তার বাম হাতের উপর রাখা এবং (উভয় হাত) ছেড়ে দেওয়ার মাঝে স্বাধীনতা রয়েছে"। কেননা এক্ষেত্রে বিষয়টি প্রশস্ত।
প্রশ্ন: কিন্তু এই মাসআলাটির সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সুন্নাহ কি?
উত্তর: সুন্নাহ হলো: যখন তুমি রুকু থেকে (মাথা) উঠাবে, তখন তোমার ডান হাতকে বাম হাতের উপর রাখবে, যেমনভাবে তুমি ডান হাতকে বাম হাতের উপর রাখ, যখন তুমি দাঁড়িয়ে থাক। আর এর দলীল রয়েছে ইমাম বুখারী (রহঃ) কর্তৃক সাহল ইবনু সা'দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীছে। তিনি বলেছেন, كَانَ النَّاسُ يُؤْمَرُونَ أَنْ يَضَعَ الرَّجُلُ اليَدَ الْيُمْنَى عَلَى ذراعه الْيُسْرَى فِي الصَّلَاةَ
"(রসূলের যুগে) লোকদেরকে আদেশ দেওয়া হতো যে, ব্যক্তি জ্বলাতে তার ডান হাত তার বাম হাতের যিরা'র উপর রাখবে। [১৬]
সুতরাং, তুমি লক্ষ্য করো তিনি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদার অবস্থায় এটি চেয়েছেন, নাকি রুকুর অবস্থায় এটি চেয়েছেন, নাকি বসা অবস্থায় এটি চেয়েছেন? না! বরং তিনি দাঁড়ানো অবস্থায় এটি চেয়েছেন। আর এটি রুকুর পূর্বে এবং রুকুর পরে দাঁড়ানোকে অন্তর্ভুক্ত করে। সুতরাং আলিমগণের মাঝে এ মতভেদের কারণে আমাদের দ্বন্দ্ব ও বির্তকের পথ গ্রহণ না করা আবশ্যক। কেননা আমরা সকলেই হকু চাই। বিদ্বানগণের মাঝে মতভেদের কারণে আমাদের শত্রুতা ও দলাদলির পথ গ্রহণ করা বৈধ হবে না। কেননা আলিমগণ মতভেদ করতেই থাকবেন। এমনকি নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগেও (এটি হয়েছে)।
সুতরাং সকল শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক হলো, তারা সকলেই মিলে এক হাত হবে এবং তারা এই মতভেদের মত পারস্পারিক বিচ্ছন্নতা ও শত্রুতার পথ বানাবে না। বরং ওয়াজীব হলো: যখন তুমি দলীলের দাবিতে তোমার সঙ্গীর সাথে মতভেদ করবে এবং সে (তার) দলীলের দাবিতে তোমার সাথে মতভেদ করবে, তখন তোমাদের নিজেদেরকে একই পথের উপর রাখা এবং তোমাদের দু'জনের মাঝে ভালোবাসা বৃদ্ধি করা।
আর একারণেই আমি এমন যুবকদেরকে ভালবাসি এবং সাহায্য করি, বর্তমানে যাদের রয়েছে দলীলসমূহ সহকারে মাসআলাগুলো একত্রিত করার প্রতি কঠিন ঝোঁক এবং যাদের রয়েছে তাদের 'ইল্মকে আল্লাহর কিতাব ও তার রাসূলের জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্নাহ অনুযায়ী গঠন করার প্রতি কঠিন ঝোঁক। আমরা লক্ষ্য করে দেখি এটিই উত্তম। আর আমরা তাদের থেকে এটি কামনা করি না যে, তারা 'ইল্মকে দলবদ্ধতা এবং শত্রুতার পথ বানাবে। আল্লাহ তার নাবী মুহাম্মদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ
"নিশ্চয় যারা তাদের দীনের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে এবং দলে দলে বিভক্ত হয়েছে, কোন ব্যাপারেই আপনি তাদের অন্তর্ভুক্ত নন"। সূরা আল-আন'আম ৬:১৬৯।
সুতরাং যারা তাদের নিজেদেরকে বিভিন্ন দলে নিয়োজিত করে এবং বিভিন্ন দলে দলভুক্ত হয়, এ ব্যাপারে আমরা তাদেরকে সমর্থন করি না। কেননা আল্লাহর দল একটিই। আর আমরা মনে করি যে, বুঝের ভিন্নতা মানুষের একে অপরকে ঘৃণা করাকে এবং তাদের কেউ তার ভাইয়ের সম্মান নষ্ট করবে, এটিকে অপরিহার্য করে না। অতএব, সকল শিক্ষার্থীর উপর অপরিহার্য হলো পরস্পর ভাই হয়ে যাওয়া। এমনকি যদিও তারা কিছু শাখাগত মাসআলাহর ক্ষেত্রে মতভেদ করে। আর প্রত্যেকের উপর দায়িত্ব হলো একে অপরকে এমন বিতর্কে আহ্বান করা, যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা হয় এবং 'ইলম বিস্তৃত হয়। আর এর মাধ্যমে ভালোবাসা/বন্ধুত্ব অর্জিত হয় এবং ভুল-ভ্রান্তি ও এমন কঠোরতা দূর হয়ে যায়, যা কিছু মানুষের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। এমনকি কখনো কখনো তাদের মাঝে পারস্পারিক দ্বন্দ্ব লেগে থাকে। আর কোন সন্দেহ নেই যে, এতে মুসলিমদের শত্রুরা খুশি হয়। আর (মুসলিম) উম্মাহর মাঝে পারস্পারিক দ্বন্দ্ব সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَ تَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصابرين
"আর তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করো এবং তোমরা পরস্পর দ্বন্দ্ব করো না, (যদি কর) তাহলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি দূর হয়ে যাবে। অতএব, তোমরা (শত্রুদের মুকাবেলায়) ধৈর্যধারণ করো। নিশ্চয় আল্লাহর (সাহায্য) ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছে"। সূরা আল-আনফাল ৮:৪৬।
ছাহাবাহগণ এ ধরনের মাসআলায় মতানৈক্য করতেন। কিন্তু তারা এক হৃদয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং ভালোবাসা ও বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন। বরং আমি সুস্পষ্টভাবে বলব,
إِنَّ الرَّجُلَ إِذَا خَالَفَكَ بِمُقْتَضَى الدَّلِّيْلِ عِنْدَهُ، فَإِنَّهُ مُوَافِقٌ لَكَ فِي الْحَقِيقَةِ، لِأَنَّ كُلَّا مِنْكُمَا طالب للحقيقة.
"যখন কোনো ব্যক্তি তার নিকটে বিদ্যমান দলীলের দাবিতে তোমার সাথে মতানৈক্য করে, তখন বাস্তবে সে ব্যক্তি তোমার সাথে একমত হয়। কেননা বাস্তবিকভাবে তোমাদের দু'জনের মধ্য থেকে প্রত্যেকেই ('ইল্ম) অন্বেষণকারী।"
তাই, উদ্দেশ্য একটিই। আর তা হলো দলীলের মাধ্যমে সত্যে উপনীত হওয়া। অতএব, যতক্ষণ তুমি দলীলের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, ততক্ষণ সে ব্যক্তি তোমার সাথে মতানৈক্য করবে না। কেবলমাত্র সে ব্যক্তি তার নিকটে বিদ্যমান দলীলের দাবিতে তোমার সাথে মতানৈক্য করে। তাহলে মতবিরোধ কোথায়? আর এই পদ্ধতিতেই (মুসলিম) উম্মাহ এক থাকে। যদিও মুসলিম উম্মাহর নিকট বিদ্যমান দলীল প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণে কিছু মাসআলাহর ক্ষেত্রে তারা মতানৈক্য করে। পক্ষান্তরে, যদি কেউ সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর পরস্পর বিরোধিতা করে ও অহংকার করে, তাহলে নিঃসন্দেহে পারস্পারিক বিরোধিতার পর তার সাথে উপযুক্ত আচরণ করা অপরিহার্য।
পঞ্চম আদেশ: 'ইল্ল্ম অনুযায়ী আমল করা (العمل بالعلم):
একজন শিক্ষার্থী 'আক্বীদা, ইবাদত, চরিত্র, শিষ্টাচার এবং মু'আমালাত (লেনদেন) এর ক্ষেত্রে তার 'ইল্ল্ম অনুযায়ী আমল করবে। কেননা আমলই 'ইল্মের প্রতিফল ও ফলাফল। আর 'ইল্মের অধিকারী ব্যক্তি অস্ত্র বহনকারী ব্যক্তির ন্যায়। হয় এটি ঐ ব্যক্তির পক্ষে যাবে অথবা বিপক্ষে যাবে। আর এ কারণেই নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন,
الْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ
"আল-কুরআন তোমার পক্ষে দলীল হবে অথবা তোমার বিপক্ষে দলীল হবে"।[১৭]
যদি তুমি আল-কুরআন অনুযায়ী আমল কর, তাহলে তা তোমার পক্ষে দলীল হবে। আর যদি তুমি আল-কুরআন অনুযায়ী আমল না কর, তাহলে তা তোমার বিপক্ষে দলীল হবে। অনুরূপভাবে আমল হবে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যা বর্ণিত হয়েছে তা অনুযায়ী হাদীছগুলোকে স্বীকার করার মাধ্যমে এবং (ইসলামী) বিধানাবলী মেনে চলার মাধ্যমে। যখন আল্লাহ ও তার রসূল থেকে কোন সংবাদ আসবে, তখন তা স্বীকার করো এবং গ্রহণ করা ও মেনে নেওয়ার মাধ্যমে তা আঁকড়ে ধরো। আর (এ কথা) বলো না কেন? এবং কিভাবে? এটি কাফিরদের পন্থা। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَ مَا كَانَ لِمُؤْمِنِ وَ لَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَ مَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا
"যখন আল্লাহ এবং তার রসূল কোন বিষয়ে ফায়ছালা দেন, তখন কোন মুমিন পুরুষ এবং কোন মুমিনাহ নারীর তাদের সেই বিষয়ে কোন স্বাধীন ইচ্ছা থাকে না। আর যদি কেউ আল্লাহ এবং তার রসূলের অবাধ্য হয়, তাহলে সে ব্যক্তি সুস্পষ্ট পথভ্রষ্ট হবে"। সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৬।
নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাহাবাগণের নিকট কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। কখনো কখনো সে বিষয়গুলো বিস্ময়কর হতো এবং ছাহাবাগণের "বুঝ" থেকে দূরবর্তী হতো। কিন্তু তারা তা দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করতেন। তারা বলতেন না, কেন? এবং কিভাবে? এটি এই উম্মাহর পরবর্তী লোকেরা যে মতের উপর রয়েছে তার বিপরীত। (এই উম্মাহর) পরবর্তী লোকদের মধ্য থেকে আমরা কোন এক ব্যক্তিকে দেখতে পায়, হাদীছ সম্পর্কে যার বোধশক্তি কম। যখন তার নিকট রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোন একটি হাদীছ বর্ণনা করা হয়, তখন তাকে আমরা রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণীর বিরুদ্ধে এমন কিছু কথা উল্লেখ করতে দেখতে পায়, যে কথাগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় যে, সে ব্যক্তি প্রতিবাদ করার ইচ্ছা করে, সঠিক পথ পাওয়ার ইচ্ছা করে না। আর এই কারণেই তার মাঝে এবং সঠিক দিক-নির্দেশনার মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। এমনকি সে ব্যক্তি রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীছ প্রত্যাখ্যান করে। কেননা সে ব্যক্তি হাদীছটি দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করেনি এবং মেনে নেয়নি। আর আমি এ কারণেই একটি উদাহরণ পেশ করছি:
নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, يَتَنَزَّلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا، حينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخر، يَقُولُ: مَن يَدْعُونِي فَاسْتَجيب لَهُ ، مَن يسألني فأعطيهُ، مَن يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفَرَ لَهُ
"আমাদের প্রতিপালক (আল্লাহ) প্রত্যেক রাত্রে দুনিয়াবী আসমানে অবতরণ করেন, যখন রাতের শেষ এক তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে। অতঃপর বলেন, কে আমাকে ডাকবে, তার ডাকে আমি সাড়া দিব? কে আমার নিকট (কিছু) চাইবে, আমি তাকে (তা) দান করব? কে আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দিব?"[১৮]
এই হাদীছ নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন। এটি প্রসিদ্ধ হাদীছ। বরং এটি মুতাওয়াতির হাদীছ। আর ছাহাবাগণের মধ্য থেকে কেউ তার জবান উঁচু করেননি এ কথা বলার জন্য যে, হে আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! কিভাবে আল্লাহ অবতরণ করেন? আর তার থেকে কি 'আরশ খালি হয়ে যায়, নাকি 'আরশ খালি হয়ে যায় না? এবং এর সাথে যে প্রশ্নগুলো সাদৃশ্য রাখে (সেগুলো প্রশ্নও করেননি)।
কিন্তু আমরা কিছু মানুষকে দেখতে পায়, যারা এ ধরনের কথা বলে। আর বলে কিভাবে আল্লাহ 'আরশের উপর থাকেন এবং কিভাবে দুনিয়াবী আসমানে অবতরণ করেন? আর যে কথাগুলো তারা উল্লেখ করে, সেগুলোর মধ্য থেকে যা এর সাথে সাদৃশ্য রাখে। যদিও তারা এই হাদীছটি দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করে। আর ছাহাবাগণ বলেন: নিশ্চয় আল্লাহ তার 'আরশের উপর সমুন্নত। আর সমুন্নত হওয়া তার সত্তাগত বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্তর্ভুক্ত এবং তিনি যেভাবে ইচ্ছা অবতরণ করেন, যেন তাদের থেকে এই সন্দেহ দূর হয়ে যায়। আর নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রতিপালক সম্পর্কে তাদেরকে যে সংবাদ দেন, সে ব্যাপারে তারা হতভম্ব হন না।
অতএব, আমাদের উপর আবশ্যক হলো আল্লাহ তার সম্পর্কে এবং তার রাসূল সম্পর্কে অদৃশ্যের যে বিষয়গুলোর সংবাদ দিয়েছেন, সেগুলো আমাদের দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করা ও মেনে নেওয়া এবং আমাদের স্মরণশক্তিতে যে অনুভবযোগ্য ও সুস্পষ্ট বিষয় রয়েছে, তার কারণে সেগুলোর বিরোধিতা না করা। কেননা অদৃশ্যের বিষয় অনুভূতি এবং সুস্পষ্টতার ঊর্ধ্বতম বিষয়। এ ব্যাপারে অনেকগুলো উদাহরণ রয়েছে। আমি সেগুলোর আলোচনা দীর্ঘ করা পছন্দ করছি না। প্রকৃতপক্ষে, এ ধরনের বর্ণনাগুলো থেকে বুঝা যায় মুমিনের নীতি হলো: এমনভাবে গ্রহণ করা এবং মেনে নেওয়া যে, একজন মুমিন ব্যক্তি বলবেন, আল্লাহ এবং তার রসূল সত্য বলেছেন। যেমন এ সম্পর্কে আল্লাহ তার বাণীতে সংবাদ দিয়ে বলেন,
آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ
"রসূলের নিকট তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তার প্রতি রসূল বিশ্বাস স্থাপন করেছেন"। সূরা আল-বাক্বারা ২:২৮৫
আল্লাহর কিতাব (আল-কুরআন) ও তার রাসূলের সুন্নাহর ব্যাপারে 'আক্বীদা ভিত্তিশীল হওয়া অপরিহার্য এবং মানুষের এটি জানা অপরিহার্য যে, 'আক্বীদার ক্ষেত্রে বিবেকের জন্য (নতুন কিছু অনুধাবন করার) কোন অবকাশ নেই। আমি বলব না 'আক্বীদার ক্ষেত্রে বিবেকের জন্য কোন প্রবেশস্থল নেই। কেবলমাত্র আমি বলব 'আক্বীদার ক্ষেত্রে বিবেকের জন্য (নতুন কিছু অনুধাবন করার) কোন অবকাশ নেই। কেননা আল্লাহর পূর্ণতার ক্ষেত্রে যে দলীলগুলো বর্ণিত হয়েছে, বিবেক (শুধুমাত্র) সেগুলোর সাক্ষ্য প্রদান করে। যদিও আল্লাহর জন্য যে পরিপূর্ণতা অপরিহার্য, বিবেক তার বিস্তারিত বর্ণনা বুঝতে পারে না। কিন্তু এটি বুঝতে পারে যে, অবশ্যই আল্লাহ তার নিজের জন্য প্রত্যেক পরিপূর্ণ গুণ প্রমাণিত করেছেন। 'আক্বীদার দিক থেকে আল্লাহ প্রদত্ত এই 'ইল্ল্ম অনুযায়ী আমল করা আবশ্যক। অনুরূপভাবে ইবাদতের দিক থেকে আল্লাহর ইবাদত করা অপরিহার্য। যেমন আমাদের মধ্য থেকে অধিকাংশ লোক জানে যে, ইবাদত দু'টি মূল বিষয়ের উপর ভিত্তিশীল।
ক. আল্লাহর জন্য নিবেদিত হওয়া। খ. রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণ করা।
অতএব, আল্লাহ তা'আলা এবং তার রাসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যা বর্ণিত হয়েছে, তা অনুযায়ী মানুষ তার ইবাদত প্রতিষ্ঠা করবে। আল্লাহর দীনের মাঝে মানুষ বিদ'আত সৃষ্টি করবে না, যা ইবাদতের মূল ভিত্তির ক্ষেত্রে এবং ইবাদতের বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে দীনের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর এই কারণে আমরা বলব: ইবাদতের অস্তিত্ব, স্থান, সময়, নিয়মনীতি, পরিমাণ এবং ধরনের ক্ষেত্রে ইবাদতটি শরী'আত (ইসলামী বিধি-বিধান) দ্বারা প্রমাণিত হওয়া আবশ্যক।
সুতরাং যদি কেউ আল্লাহর ইবাদতের জন্য (আল-কুরআন ও হাদীছের) দলীল ছাড়াই নিয়মসমূহের মধ্য থেকে কোন একটি নিয়ম সাব্যস্ত করে, তাহলে এ ব্যাপারে আমরা তার প্রতিবাদ করব এবং বলব: নিশ্চয় এটি অগ্রহণযোগ্য। কেননা এটি এভাবে সাব্যস্ত হওয়া আবশ্যক যে, এটি অমুক ইবাদতের নিয়ম। নতুবা এটি তার পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্য হবে না। আর যদি কেউ কোন একটি ইবাদতের নিয়ম চালু করে, যে নিয়ম শরী'আত নিয়ে আসেনি; তাহলে আমরা বলব: নিশ্চয় এটি তোমার জন্য প্রত্যাখ্যাত। কেননা (ইসলামী) শরী'আত যা নিয়ে এসেছে, ইবাদত তার উপর ভিত্তিশীল হওয়া আবশ্যক। কেননা আল্লাহ তা'আলা তোমাকে যে 'ইল্ম শিক্ষা দিয়েছেন তার দাবি এটিই যে, যা বিধান হিসেবে দেওয়া হয়েছে তা অনুযায়ী তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে। আর এ কারণেই আলিমগণ বলেছেন:
إِنَّ الْأَصْلَ فِي الْعِبَادَاتِ الْحَظر حتى يقوم دليل على المشروعية
"নিশ্চয় ইবাদতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো তা (ইবাদত করা) নিষেধ, যতক্ষণ না (ইবাদতটির) বৈধতার ব্যাপারে একটি দলীল প্রতিষ্ঠিত হয়"।
আর তারা এই ব্যাপারে আল্লাহর বাণী দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন,
أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُمْ مِنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنْ بِهِ اللَّهُ
"বরং তাদের (মক্কার কাফিরদের) কি এমন কতিপয় অংশীদার (উপাস্য) আছে, যারা তাদের জন্য এমন (বাতিল) ধর্মের বিধান দিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?" সূরা আশ-শূরা ৪২:২১।
এবং তারা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই বাণী দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন, যা আয়িশা () এর বর্ণিত হাদীছে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে জ্বহীহ মুসলিমে প্রমাণিত হয়েছে,
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدُّ
"যদি কেউ আমাদের এই দীনের মধ্যে বিদ'আত সৃষ্টি, যা দীনের অন্তর্ভুক্ত নয়; তাহলে তা প্রত্যাখ্যাত। ১৯]
যদিও তুমি একনিষ্ঠ বান্দা হও এবং আল্লাহর নিকটে পৌঁছার ইচ্ছা কর (অতঃপর বিদ'আত কর, তবুও এটি দীনের অন্তর্ভুক্ত নয়)। কেননা এটি তোমার জন্য প্রত্যাখ্যাত। আর যদি তুমি এমন পথে আল্লাহর নিকটে পৌঁছার ইচ্ছা কর, আল্লাহ যে পথকে তার নিকটে পৌঁছার পথ হিসেবে নির্ধারণ করেননি, তাহলে এটিও তোমার জন্য প্রত্যাখ্যাত। অতএব শরী'আতের (ইসলামী বিধি-বিধানের) জ্ঞানানুপাতে আল্লাহর (সন্তুষ্টির) জন্য ইবাদতকারী হওয়া একজন শিক্ষার্থীর জন্য আবশ্যক। আর শরী'আতের জ্ঞান বাড়েও না, কমেও না। একজন শিক্ষার্থী (এই কথা) বলবে না, নিশ্চয় আমি এমন বিষয়ের কারণেই আল্লাহর (সন্তুষ্টির) জন্য ইবাদত করার ইচ্ছা পোষণ করছি, যার প্রতি আমার অন্তর আস্থা রাখে, প্রশান্তি লাভ করে এবং যার দ্বারা আমার বক্ষ প্রসারিত হয়। যদিও এটি তার অর্জিত হয়। সে যেন এটিকে শরী'আতের মানদন্ডে যাচাই করে। পক্ষান্তরে, কখনো কখনো তার নিকটে তার মন্দ কর্মকে সুন্দর করে উপস্থাপন করা হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
أَفَمَنْ زُيِّنَ لَهُ سُوْءُ عَمَلِهِ فَرَآهُ حَسَنًا فَإِنَّ اللَّهَ يُضِلُّ مَنْ يَشَاءُ
"অতঃপর যার নিকটে তার মন্দ কর্মকে সুন্দর করে উপস্থাপন করা হয়েছে। তারপর সে এটিকে উত্তম মনে করেছে (এই ব্যক্তি কি ঐ ব্যক্তির সমান, যাকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন?)। নিশ্চয় আল্লাহ যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন।" সূরা ফাতির ৩৫:৮।
অনুরূপভাবে আখলাক (চরিত্র) এবং মু'আমালাত (লেনদেন) এর ক্ষেত্রে একজন ছাত্রের তার 'ইল্ম অনুযায়ী আমলকারী হওয়া আবশ্যিক। আর শার'ঈ 'ইল্ম (ইসলামী বিধিসম্মত জ্ঞান) মুমিনগণের প্রতি বিশ্বস্ততা এবং উত্তম ভালোবাসা সংবলিত প্রত্যেক উৎকৃষ্ট চরিত্রের দিকে আহ্বান করে। এমনকি নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتَّى يُحِبُّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لَنَفْسِهِ
"তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করে, যা সে তার নিজের জন্য পছন্দ করে। "২০।
তিনি জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন,
فَمَنْ أَحَبُّ أَنْ يُزَحْزَحَ عَنِ النَّارِ، وَيُدْخَلَ الْجَنَّةَ، فَلْتَأْتِهِ منيتُهُ وَهُوَ يُؤْمِنُ بِالله وَالْيَوْمِ الآخر، وليأْتِ إِلَى النَّاسِ الَّذِي يُحِبُّ أَنْ يُؤْتَى إِلَيْهِ
"যদি কেউ নিজেকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা এবং জান্নাতে প্রবেশ করানোকে পছন্দ করে, তাহলে তার নিকটে যেন তার মৃত্যু আসে এমন অবস্থায় যে, সে আল্লাহ এবং শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে। আর সে যেন মানুষের সাথে এমন আচরণ করে, যে আচরণ সে তার নিজের জন্য পছন্দ করে।২১]
আর অধিকাংশ মানুষের উপকারের আগ্রহ এবং ইচ্ছা রয়েছে। কিন্তু তারা তাদের চরিত্রের কারণে তাতে সক্ষম হয় না। আমরা দেখতে পায় তাদের মধ্যে কঠোরতা রয়েছে। এমনকি আল্লাহর দিকে দাওয়াতের ক্ষেত্রে আমরা তাদেরকে কঠোরতা করতে দেখতে পায়। আর এটি ঐ চরিত্রসমূহের বিপরীত, যে চরিত্রসমূহের ব্যাপারে আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন। আরও জেনে রাখো যে, যা আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়, উত্তম চরিত্র তার অন্তর্ভুক্ত। আর সর্বোত্তম মানুষ হলেন রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং মর্যাদার দিক দিয়ে রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সবচেয়ে নিকটতম মানুষ হলেন চরিত্রের দিক দিয়ে সর্বোত্তম ব্যক্তি। যেমন রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ مِنْ أَحَبُّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ القِيَامَةِ أَحَاسِنَكُمْ أَخْلَاقًا، وَ إِنَّ أَبْغَضَكُمْ إِلَيَّ وَ أَبْعَدكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ القِيَامَةِ الثَّرْتَارُونَ وَ المُتَشَدِّقُونَ وَ الْمُتَفَيهِقُونَ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، قَدْ عَلِمْنَا الثَّرْتَارُونَ وَ الْمُتَشَدِّقُونَ فَمَا الْمُتَفَيهِقُونَ؟ قَالَ: الْمُتَكَبِّرُونَ
নিশ্চয় আমার নিকটে তোমাদের মধ্য থেকে সবচেয়ে পছন্দনীয় এবং কিয়ামতের দিন মর্যাদার দিক দিয়ে সবচেয়ে নৈকট্যশীল ব্যক্তি হলেন তোমাদের মধ্য থেকে চরিত্রের দিক দিয়ে সর্বোত্তম ব্যক্তি। আর আমার নিকটে তোমাদের মধ্য থেকে সবচেয়ে ঘৃণিত এবং কিয়ামতের দিন স্থানের দিক দিয়ে সবচেয়ে দূরবর্তী ব্যক্তি হলো বাচাল, ধৃষ্ট-নির্লজ্জ এবং 'আল-মুতাফাইহিকুন'। ছাহাবাগণ বললেন: হে আল্লাহর রসূল, অবশ্যই আমরা বাচাল এবং ধৃষ্ট-নির্লজ্জ সম্পর্কে অবগত হয়েছি। তাহলে 'আল-মুতাফাইহিকুন' কারা? তিনি বললেন: 'অহংকারীরা'। [২২]
ষষ্ঠ আদেশ: আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়া (الدعوة إلى الله)
একজন শিক্ষার্থী তার 'ইল্ম অনুযায়ী (মানুষকে) আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী (দাঈ) হবে। সে প্রতিটি সুযোগেই মসজিদে, বিভিন্ন মজলিসে এবং হাটে-বাজারে (দীনের) দাওয়াত দিবে। আল্লাহ নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নবুওয়াত এবং রিসালাত প্রদানের পরে তিনি তার বাড়িতে বসে থাকতেন না। বরং প্রতিটি সুযোগেই তিনি লোকদেরকে (দীনের) দাওয়াত দিতেন এবং পদক্ষেপ দিতেন। আর আমি সকল শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে এটি চাই না যে, তারা কিতাবসমূহের প্রতিলিপি হবে। বরং আমি তাদের পক্ষ থেকে এটি চাই যে, তারা কর্মঠ আলিম হবে।
সপ্তম আদেশ: প্রজ্ঞা/বিচক্ষণতা )الحكمة( :
একজন শিক্ষার্থী প্রজ্ঞার সাজে সজ্জিত হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَنْ يَشَاءُ وَ مَن يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا
"তিনি যাকে চান প্রজ্ঞা দান করেন। আর যাকে প্রজ্ঞা দান করা হয়, তাকে অনেক কল্যাণ দেওয়া হয়"। সূরা আল-বাক্বরা ২:২৬৯।
যে চরিত্রের দ্বারা চরিত্রবান হওয়া যায়, তা অনুযায়ী একজন শিক্ষার্থী অন্যের শিক্ষক হবে। যেন সে প্রত্যেক মানুষকে যোগ্যতা অনুযায়ী (দীনের পথে) আহ্বান করতে পারে। আর যখন আমরা এই পথে চলব, তখন আমাদের জন্য অনেক কল্যাণ অর্জিত হবে। যেমন আমাদের প্রতিপালক (আল্লাহ তা'আলা) বলেন,
وَ مَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا
"আর যাকে প্রজ্ঞা দান করা হয়, তাকে অনেক কল্যাণ দেওয়া হয়।" সূরা আল-বাক্বরা ২:২৬৯।
আর হাকীম এর পরিচয়: "হাকীম হলেন তিনি, যিনি বিভিন্ন জিনিসকে সেগুলোর নিজ নিজ অবস্থানে নামিয়ে দেন।"
কেননা "হাকীম” শব্দটি )الأحكام( মাছুদার থেকে গৃহীত এবং তার অর্থ হলো: দক্ষতা। আর কোনকিছুর দক্ষতা হলো: তাকে তার অবস্থানে নামিয়ে দেওয়া। অতএব, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য উচিত হলো, বরং অপরিহার্য হলো সে তার দাওয়াতের ক্ষেত্রে হাকীম/প্রজ্ঞাবান হবে। আর আল্লাহ তার বাণীতে দাওয়াত প্রদানের স্তরসমূহ উল্লেখ করেছেন।
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَ الْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
“(হে রসূল!) আপনি (মানুষকে) আপনার প্রতিপালকের পথের দিকে হিকমাহ/প্রজ্ঞা ও সদুপদেশ দ্বারা আহ্বান করুন এবং তাদের সাথে সদ্ভাবে বিতর্ক করুন।" সূরা আন-নাহল; ১৬:১২৫।
আল্লাহ তা'আলা গ্রন্থধারী (ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান) দের সাথে বিতর্ক করার ক্ষেত্রে ৪র্থ স্তর উল্লেখ করে বলেন,
وَلَا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِلَّا الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْهُمْ
"তোমরা গ্রন্থধারী (ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টান) দের সাথে উত্তমভাবে বিতর্ক করো। তবে তাদের মধ্য থেকে যারা সীমালঙ্ঘন করে (তাদের সাথে কোন বিতর্ক নেই)।" সূরা আল-'আনকাবূত ২৯:৪৬।
অতএব, একজন শিক্ষার্থী দাওয়াত প্রদানের পদ্ধতিসমূহের মধ্য থেকে গ্রহণীয়তার অধিক নিকটবর্তী পদ্ধতিকে বেছে নিবে।
আর এর দৃষ্টান্ত নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দাওয়াত প্রদানের মধ্যেই রয়েছে:
এক বেদুঈন (আরবের এক গ্রাম্য) লোক আসল। তারপর মসজিদের এক কোণে পেশাব করল। অতঃপর তার নিকটে দ্বা'হাবাগণ আসলেন তাকে ধমক দেওয়ার জন্য। তারপর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে (ধমক দিতে) নিষেধ করলেন। আর যখন সে লোক পেশাব শেষ করল, তখন নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ডাকলেন এবং তাকে বললেন,
إِنَّ هَذِهِ الْمَسَاجِدَ لَا تَصْلُحُ لِشَيْءٍ مِنْ هَذَا الْبَوْلِ وَ الْقَدَرِ، إِنَّمَا تُبْنَى لِذِكْرِ اللَّهِ وَ الصلاة، وقراءة القرآن
"নিশ্চয় এসব মসজিদ এই পেশাব এবং ময়লা জিনিসের কারণে পবিত্র থাকে না। কেবলমাত্র এসব মসজিদ আল্লাহর যিক্র করা, জ্বলাত আদায় করা এবং আল- কুরআন তিলাওয়াত করার জন্য তৈরি করা হয়। ২৩]
অথবা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা কি মনে কর এই হিকমার চেয়ে অধিকতর উত্তম কিছু আছে? তারপর এই বেদুঈন লোকের বক্ষ প্রসারিত হলো এবং পরিতৃপ্ত হলো। এমনকি সে বলল,
اللَّهُمَّ ارْحَمْنِي وَ مُحَمَّداً، وَ لَا تَرْحَمْ مَعَنَا أَحَداً
"হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রতি এবং মুহাম্মাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। আর আমাদের সাথে কাউকে অনুগ্রহ করবেন না। ২৪]
আরেকটি ঘটনা হলো: মু'আবিয়াহ বিন হাকাম আস-সুলামী ( ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
بَيْنَا أَنَا أُصَلِّي مَعَ رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، إِذْ عَطَسَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ، فَقُلْتُ: يَرْحَمُكَ اللَّهُ فَرَمَانِي الْقَوْمُ بأَبْصَارِهِمْ، فَقُلْتُ: وَا تُكلَ أُمِّيَاهُ، مَا شَأْنُكُمْ؟ تَنظُرُونَ إِلَيَّ، فَجَعَلُوا يَضْرِبُونَ بِأَيْدِيهِمْ عَلَى أَفْخَادِهِمْ، فَلَمَّا رَأَيْتُهُمْ يُصَمِّتُونَنِي لَكُنِّي سَكَتْ، فَلَمَّا صَلَّى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَبِأَبِي هُوَ وَأُمِّي، مَا رَأَيْتُ مُعَلَّمًا قَبْلَهُ وَ لَا بَعْدَهُ أَحْسَنَ تَعْلِيمًا مِنْهُ، فَوَاللهِ، مَا كَهَرَنِي وَلَا ضَرَبَنِي وَلَا شَتَمَنِي، قَالَ: إِنَّ هَذِهِ الصَّلَاةَ لَا يَصْلُحُ فِيهَا شَيْءٌ مِنْ كَلَام النَّاسِ، إِنَّمَا هُوَ التَّسْبِيحُ وَ التَّكْبِيرُ وَ قِرَاءَةُ الْقُرْآنِ
"একদা আমি রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে জ্বলাত আদায় করলাম। যখন জামা'আতের এক লোক হাঁচি দিল, তখন আমি বললাম : يرحمك الله (আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করুন)। অতঃপর জামা'আতের লোকেরা আমার দিকে রুষ্ট দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। তারপর আমি বললাম: হায়! আমার মা সন্তান হারানোর শোক অনুভব করুক। তোমাদের কি অবস্থা? তোমরা আমার দিকে তাকিয়ে আছো? তখন তারা তাদের উরুর উপর তাদের হাত চাপড়াতে শুরু করল। অতঃপর (আমার রাগ হওয়া সত্ত্বেও) যখন আমি তাদেরকে দেখলাম যে, তারা আমাকে চুপ করাতে চায়, তখন আমি চুপ করলাম। অবশেষে যখন রাসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জ্বলাত আদায় (শেষ) করলেন, (তখন আমি তাকে সব কিছু বললাম)। আমার পিতা ও মাতা তার জন্য কুরবান হোক! আমি তার পূর্বে ও পরে এমন কোন শিক্ষককে দেখিনি, যিনি তার চেয়ে শিক্ষাদানের দিক দিয়ে উত্তম। অতএব, আল্লাহর কসম! (আমার কথা শুনে) নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে ধমক দেননি, প্রহার করেননি এবং তিরস্কার করেননি। বরং তিনি বলেছেন: নিশ্চয় জ্বলাতে মানুষের কোন কথা বলা উচিত নয়। কেবলমাত্র জ্বলাতে তাসবীহ পাঠ করা, তাকবীর দেওয়া এবং আল- কুরআন তিলাওয়াত করা চলবে।"[৭২৫]
এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, আল্লাহর দিকে দাওয়াত প্রদান হিকমার (প্রজ্ঞার) সাথে হওয়া অপরিহার্য; যেমনভাবে আল্লাহ তা'আলা আদেশ দিয়েছেন।
আর একটি দৃষ্টান্ত হলো: নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে দেখলেন। এমতাবস্থায় তার হাতে স্বর্ণের আংটি ছিল। আর স্বর্ণের আংটি পুরুষদের জন্য হারাম। তাই নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার হাত থেকে আংটি খুলে ফেললেন এবং তা নিক্ষেপ করলেন। আর তিনি বললেন,
يَعْمِدُ أَحَدُكُمْ إِلَى جَمْرَةٍ مِنْ نَارٍ فَيَجْعَلُهَا فِي يَدِهِ "তোমাদের কেউ কেউ আগুনের টুকরার কাছে যায়। তারপর সে ব্যক্তি তার হাতে তা রাখে। [২৬]
রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চলে যাওয়ার পর তাকে বলা হলো: তুমি তোমার আংটি তুলে নাও এবং তা দ্বারা উপকার গ্রহণ করো। লোকটি বলল: না, আল্লাহর কসম! আমি তা কক্ষনোই তুলে নিব না। (কেননা) অবশ্যই রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা নিক্ষেপ করেছেন"।
এখানে নির্দেশের ধরণ হলো কঠিন। আল্লাহর দিকে প্রত্যেক দাওয়াত প্রদানকারীর জন্য উচিত হলো সকল বিষয়কে সেগুলোর নিজস্ব স্থানে স্থান দেওয়া এবং সকল মানুষকে সমান মনে না করা। আর বর্তমানে অধিকাংশ দাঈ যে অবস্থার উপর রয়েছেন, সে সম্পর্কে যখন আমরা চিন্তা করি; তখন আমরা বুঝতে পারি যে, তাদের কাউকে আবেগ পাকড়াও করেছে। এমনকি মানুষ তার দাওয়াত থেকে দূরে সরে যায়। যদি কোন ব্যক্তি কাউকে তার আবেগের কারণে কোন হারাম কাজ করতে দেখতে পায়, তাহলে সে ব্যক্তি তার কঠিন ও চরম নিন্দা করে এবং বলে, তুমি আল্লাহকে ভয় কর না এবং এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ আরও অনেক কথা বলে। এমনকি লোকটি তার থেকে দূরে চলে যায়। আর এটি ঠিক নয়। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: মানুষ যখন এ ধরনের লোকদের দিকে লক্ষ্য করে, তখন তাদেরকে বাচাল মনে করে। তাদের উপর হতবুদ্ধিতা কর্তৃত্ব করে এবং শয়তান তাদের উপর বিজয়ী হয়। কেননা শয়তান তাদের প্রতি বিনয়ী হয়, তাদেরকে অনুগ্রহ করে এবং যা দ্বারা লোকদেরকে বিপদে ফেলা যায়, শয়তানকে তা দান করার কারণে শয়তান আল্লাহর প্রশংসা করে। ঐ লোকদের শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং অন্তরশক্তি রয়েছে। কিন্তু তাদের শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং অন্তরশক্তি তাদের কোন উপকারে আসে না। হে ভাইয়েরা! পাপীদের দিকে দু'টি দৃষ্টিতে লক্ষ্য করা আমাদের উচিত। (১) শার'ঈ দৃষ্টিতে। (২) ভাগ্যের দৃষ্টিতে
শারঈ দৃষ্টিতে বলতে বোঝায়: আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে কোন নিন্দাকারীর নিন্দা যেন আমাদেরকে পাকড়াও না করে। যেমন ব্যভিচারিণী নারী এবং ব্যভিচারী পুরুষ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
الزانية والزاني فاجلدوا كل واحد منهما مائة جلدة ولا تأخذكم بهما رأفة في دين الله إن كنتم تؤمنون بالله واليوم الآخر
“ব্যভিচারিণী নারী এবং ব্যভিচারী পুরুষের মধ্য থেকে প্রত্যেককে একশ'টি বেত্রাঘাত করো এবং আল্লাহর বিধানের ক্ষেত্রে তাদের দু'জনের প্রতি কোন দয়া তোমাদেরকে যেন পাকড়াও না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর।” সূরা আন-নূর ২৪:২।
আর পাপীদের দিকে আমরা শারঈ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করব। অতঃপর তাদের প্রতি আমরা অনুভব করব, তাদের প্রতি সদয় হব এবং তাদের সাথে ভাল আচরণ করব। আর এটি হলো একজন ‘ইলম অন্বেষণকারীর বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্য থেকে একটি বৈশিষ্ট্য। যা একজন মূর্খ লোকের বৈশিষ্ট্যের বিপরীত, যার আবেগ রয়েছে, কিন্তু ‘ইলম নেই। অতএব, আল্লাহর দিকে দাওয়াত প্রদানকারী একজন শিক্ষার্থীর হিকমাহ (প্রজ্ঞা) ব্যবহার করা অপরিহার্য।
অষ্টম আদেশ: ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থীর ধৈর্যশীল হওয়া (أن يكون الطالب صابراً على العلم) : (একজন ছাত্র ‘ইলম অর্জন থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না এবং বিরক্ত হবে না)। বরং সক্ষমতা অনুযায়ী ‘ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে অটল থাকবে। আর সে যেন ‘ইলম অর্জনের ব্যাপারে ধৈর্যধারণ করে এবং বিরক্ত না হয়। কেননা যখন কোন লোক বিরক্ত হয়, তখন সে লোক ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং কাজ ছেড়ে দেয়। কিন্তু যখন সে ‘ইলম অর্জনের ব্যাপারে অধ্যবসায়ী হবে, তখন সে একদিকে থেকে ধৈর্যশীলগণের মত ছায়া পাবে, অপরদিকে থেকে ভাল ফল হবে। অতএব, তুমি আল্লাহর বাণী মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করো, যা তার নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সম্বোধন করে বলেছেন,
تلك من أنباء الغيب نوحيها إليك ما كنت تعلمها أنت ولا قومك من قبل هذا فاصبر إن العاقبة للمتقين
“এটি অদৃশ্যের সংবাদসমূহের অন্তর্ভুক্ত, যা আপনার নিকটে প্রত্যাদেশ পাঠিয়েছি, যা এর পূর্বে আপনি এবং আপনার সম্প্রদায় জানত না। অতএব, আপনি ধৈর্যধারণ ধারণ করুন। নিশ্চয় শুভ পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য"। সূরা হুদ ১১:৪৯।
নবম আদেশ: 'আলিমগণকে সম্মান এবং মূল্যায়ন করা )احترام العلماء : ( وتقديرهم
নিশ্চয় 'আলিমগণকে সম্মান করা এবং মূল্যায়ন করা সকল শিক্ষার্থীর উপর অপরিহার্য। 'আলিমগণ এবং সাধারণ জনগণের মাঝে যে মতানৈক্য হয়, সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অন্তর প্রসারিত হওয়া আবশ্যিক। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা কিছু লোক অন্যদের ভুলগুলোর অনুসরণ করে, যেন ভুলগুলো থেকে এমন কিছু গ্রহণ করতে পারে, যা তাদের ক্ষেত্রে উপযোগী নয়। আর মানুষের সাথে গণ্ডগোল করে। এটি সবচেয়ে বড় ভুলসমূহের অন্তর্ভুক্ত। আর যখন একজন সাধারণ মানুষের 'গিবত করা কাবীরাহ (বড়) গুনাহসমূহের অন্তর্ভুক্ত, তখন একজন 'আলিমের 'গিবত করা সবচেয়ে বড় গুনাহ। একজন 'আলিমের বিরুদ্ধে অপর একজন 'আলিমের 'গিবত করার ক্ষতি কম নয়। আর মানুষ যখন কোন 'আলিমের ব্যাপারে উদাসীন হয় অথবা কোন 'আলিম মানুষের দৃষ্টি থেকে দূরে সরে যান, তখন তার বাণী ও বাতিল হয়ে যায়। আর যখন কোন 'আলিম হকু কথা বলেন এবং হক্বের দিকে দাওয়াত দেন, তখন এই 'আলিমের ব্যাপারে কোন লোকের 'গিবত মানুষের মাঝে এবং তার শারঈ 'ইল্মের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। আর এর ভয়াবহতা অনেক বড় এবং কঠিন।
আমি বলব: নিশ্চয় এসকল যুবকদের উপর অপরিহার্য হলো যে, ভাল নিয়্যাতে এবং ইজতিহাদের কারণে 'আলিমগণের মাঝে যে মতানৈক্য চলে তা মেনে নেওয়া। আর ইজতিহাদের ক্ষেত্রে 'আলিমগণ যে ভুল করেন, সে ক্ষেত্রে তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া। কোন প্রতিবন্ধকতা নেই যে, 'আলিমগণ যা বিশ্বাস করেন সে ব্যাপারে যুবকরা তাদেরকে বলবে, আপনাদের বিশ্বাসটি ভুল। যেন 'আলিমগণের নিকটে এটি সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, ভুলটি কি তাদের পক্ষ থেকে; নাকি যারা বলেছে: 'আলিমগণ ভুল করেছেন, তাদের পক্ষ থেকে? কেননা মানুষ কখনো কখনো কল্পনা করে যে, 'আলিমের কথাটি ভুল। অতঃপর বির্তকের পর 'আলিমের নিকটে তার মতের সঠিকতা সুস্পষ্ট হয়ে যায়। আর মানুষ সর্ম্পকে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
"প্রত্যেক আদম সন্তান ভুলকারী। আর সর্বোত্তম ভুলকারী হলো তাওবাকারী”।[২৭]
একজন 'আলিমের ভুলের কারণে এবং মানুষের মাঝে ভুলটি ছড়িয়ে পড়ার কারণে খুশি হওয়া, তারপর বিভিন্ন দল সৃষ্টি হওয়া সালাফগণের পন্থা নয়। অনুরূপভাবে নেতাবর্গের পক্ষ থেকে যে ভুলগুলো হয়, প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের ব্যাপারে নিন্দা করা থেকে মুক্ত থাকার জন্য সে ভুলগুলো ধরা এবং তাদের ভাল কাজগুলো উপেক্ষা করা আমাদের জন্য ঠিক নয়। কেননা আল্লাহ তার কিতাব (আল-কুরআন) এ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَ لَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে (হক্বের উপর) প্রতিষ্ঠিত থাকো (এবং) ন্যায়পরায়ণতার সাথে সাক্ষ্য প্রদান করো। আর (কাফির) সম্প্রদায়ের বিদ্বেষ যেন সুবিচার না করার ব্যাপারে তোমাদেরকে প্ররোচিত না করে"। সূরা আল-মায়িদা ৫:৮।
অর্থাৎ (কাফির) সম্প্রদায়ের বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন অন্যায়ভাবে কিছু করতে প্ররোচিত না করে। অতএব ন্যায়পরায়ণতা হলো অপরিহার্য বিষয়। আর নেতাবর্গের মধ্য থেকে অথবা 'আলিমগণের মধ্য থেকে কারও দোষ-ত্রুটি ধরা মানুষের জন্য বৈধ নয়। (যদি দোষ-ত্রুটি ধরা হয়) তাহলে সেগুলো মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়বে। তারপর মানুষ নেতাবর্গের এবং 'আলিমগণের ভাল কাজ ও ভাল উপদেশ থেকেও বিরত থাকবে। সুতরাং, এটি ন্যায়পরায়ণতা নয়। আর এই বিষয়টিকে তোমার নিজের সাথে তুলনা করো। যদি কোন ব্যক্তি তোমার নিজের উপর কর্তৃত্ব করে; আর তোমার নিন্দা ও খারাপ কর্মসমূহ ছড়িয়ে পড়ে এবং তোমার ভাল কর্মসমূহ গোপন থাকে; তাহলে তুমি এটিকে তার পক্ষ থেকে তোমার নিজের বিরুদ্ধে অপরাধ মনে করবে। অতএব, যখন তুমি তোমার নিজের ক্ষেত্রে এটিকে অপরাধ মনে করলে, তখন তোমার উপর অপরিহার্য হলো যে, অন্যের ক্ষেত্রেও তুমি এটিকে অপরাধ মনে করবে। সুতরাং, কত মানুষ বিতর্কের পর তার নিজের মত থেকে যার মত সঠিক, তার মতের দিকে ফিরে আসে। অথচ আমরা মনে করি, এটি ভুল। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الْمُؤْمِنَ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبَنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا
"নিশ্চয় একজন মুমিন আরেকজন মুমিনের জন্য প্রসাদস্বরূপ। যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে। [২৮]
নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন,
فَمَنْ أَحَبَّ أَنْ يُزَحْزَحَ عَنِ النَّارِ، وَيُدْخَلَ الْجَنَّةَ، فَلْتَأْتِه مَنيتُهُ وَهُوَ يُؤْمِنُ بِالله وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، وَلْيَأْتِ إِلَى النَّاسِ الَّذِي يُحِبُّ أَنْ يُؤْتَى إِلَيْهِ
"যদি কেউ নিজেকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা এবং জান্নাতে প্রবেশ করানোকে পছন্দ করে, তাহলে তার নিকটে যেন তার মৃত্যু আসে এমন অবস্থায় যে, সে আল্লাহ এবং শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে। আর সে যেন মানুষের সাথে এমন আচরণ করে, যে আচরণ সে তার নিজের জন্য পছন্দ করে। [২৯] আর এটিই হলো ন্যায়পরায়ণতা এবং সততা।
দশম আদেশ: কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা (التمسك بالكتاب والسنة):
'ইল্ম অর্জনের ব্যাপারে এবং এমন কিছু মূলনীতি আঁকড়ে ধরার ব্যাপারে পূর্ণ আকাঙ্খা থাকা সকল শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক। যদি একজন শিক্ষার্থী সেসব মূলনীতি দ্বারা আরম্ভ না করে, তাহলে তার কোনই সফলতা নেই। আর সে মূলনীতিগুলো হচ্ছে:
ক. আল-কুরআনুল কারীম (القرآن الكريم): (কুরআন) তিলাওয়াত করা, মুখস্থ করা, বুঝা এবং এর প্রতি আমল করার দিক দিয়ে এর সাথে লেগে থাকা একজন শিক্ষার্থীর উপর অপরিহার্য। কেননা আল-কুরআন আল্লাহর মজবুত রশি, সকল জ্ঞানের মূলভিত্তি। সালাফগণ আল-কুরআনের সাথে চূড়ান্তভাবে লেগে থাকতেন। সুতরাং আল-কুরআনের সাথে তাদের লেগে থাকার কারণে তাদের সম্পর্কে আশ্চর্যজনক বিষয় বর্ণনা করা হয়। অতএব তুমি তাদের কাউকে সাত বছর বয়স অবস্থায় এবং তাদের কাউকে এক মাসের কম সময়ে আল-কুরআন মুখস্থ করতে দেখতে পাবে। আর এর মাঝে আল-কুরআনের সাথে সালাফগণের আঁকড়ে থাকার ব্যাপারে দলীল রয়েছে।
সুতরাং আল-কুরআনের সাথে আঁকড়ে থাকা এবং একজন শিক্ষকের সাহায্যে তা মুখস্থ করা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যিক। কেননা শিক্ষা করার মাধ্যমেই তা অর্জন করা যায়। আর দুঃখজনক বিষয় হলো যে, আল-কুরআন মুখস্থ করে না এমন কতিপয় শিক্ষার্থীকে তুমি দেখতে পাবে, এমনকি কতিপয় শিক্ষার্থী সুন্দরভাবে আল-কুরআন তিলাওয়াত করে না। আর এটি 'ইল্ম অন্বেষণের পদ্ধতির ক্ষেত্রে একটি বড় ত্রুটি। এ কারণে আমি পুনরাবৃত্তি করছি যে, আল-কুরআন মুখস্থ করা, এর প্রতি আমল করা, এর দিকে দাওয়াত দেওয়া এবং 'সালাফে-জ্বলেহগণের "বুঝ” অনুযায়ী তা বুঝা সকল শিক্ষার্থীর উপর অপরিহার্য।
খ. জ্বহীহ সুন্নাহ )السنة الصحيحة) :
এটি ইসলামী শরী'আতের দু'টি উৎসের দ্বিতীয়তম (উৎস)। আর এটি আল-কুরআনুল কারীমকে ব্যাখ্যা করে। সুতরাং আল-কুরআনুলকারীম এবং জ্বহীহ সুন্নাহর মাঝে সমন্বয় করা, এ দু'টির সাথে আঁকড়ে থাকা এবং সুন্নাহ সংরক্ষণ করা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যিক। হয় মূল হাদীছগুলো মুখস্থ করার মাধ্যমে অথবা হাদীছগুলোর সানাদ ও মতন (মূলভাষ্য) সম্পর্কে গবেষণা করার মাধ্যমে এবং য'ঈফ (দুর্বল) হাদীছ থেকে ছুহীহ (বিশুদ্ধ) হাদীছকে পৃথক করার মাধ্যমে (সুন্নাহকে সংরক্ষণ করবে)। অনুরূপভাবে সুন্নাহর পক্ষ সমর্থন করার মাধ্যমে এবং সুন্নাহর ক্ষেত্রে বিদ'আতপন্থীদের সংশয়গুলোর জওয়াব দেওয়ার মাধ্যমেও সুন্নাহর সংরক্ষণ হয়। সুতরাং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য আবশ্যিক আল-কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহকে আঁকড়ে থাকা। আর এই দু'টি প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য পাখির দু'টি ডানার মত। যখন এ দু'টি ডানা ভেঙ্গে যাবে, তখন পাখিটি উড়তে পারে না। এ কারণেই তুমি আল-কুরআন থেকে অন্যমনস্ক হয়ে (শুধুমাত্র) আস-সুন্নাহকে রক্ষা করো না। অথবা তুমি আস-সুন্নাহ থেকে অন্যমনস্ক হয়ে (শুধুমাত্র) আল-কুরআনকে রক্ষা করো না। অধিকাংশ শিক্ষার্থী সুন্নাহ, এর ব্যাখ্যাসমূহ, এর রাবীগণ (বর্ণনাকারীগণ) এবং এর পরিভাষাগুলোর প্রতি পূর্ণ মনযোগ দেয়। কিন্তু তুমি যদি তাকে আল্লাহর কুরআন থেকে কোন একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর, তাহলে অবশ্যই তুমি তাকে আয়াতটি সম্পর্কে অজ্ঞ দেখতে পাবে। আর এটি একটি বড় ত্রুটি/ভুল। অতএব হে শিক্ষার্থী! আল-কুরআন এবং আস-সুন্নাহ তোমার জন্য দু'টি ডানা হওয়া অপরিহার্য।
গ. আলিমগণের বক্তব্য )كلام العلماء :
এটি তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতএব আলিমগণের বক্তব্যকে অবহেলা করো না এবং তা উপেক্ষা করো না। কেননা আলিমগণ 'ইল্মের ক্ষেত্রে দক্ষতার দিক দিয়ে তোমার চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী। আর তাদের নিকটে (ইসলামী) শরী'আতের নিয়ম-নীতি, তাৎপর্য এবং মূলনীতিসমূহ রয়েছে; যা তোমার নিকটে নেই। আর একারণেই যখন গবেষণাকারী সম্মানিত আলিমগণের নিকটে কোন ১টি মত অগ্রাধিকার পেত, তখন তারা বলতেন: যদি কেউ এরূপ বলে, তবুও আমরা এরূপ বলি না।
এজন্য আল্লাহর কিতাব (আল-কুরআন) ও তার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা এবং আলিমগণের বক্তব্যের সাহায্য নেওয়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যিক। আর আল-কুরআন মুখস্ত করা, গবেষণা করা এবং আল-কুরআন যা (বিধি-বিধান) নিয়ে এসেছে তার উপর আমল করার মাধ্যমে আল্লাহর কিতাবের দিকে প্রত্যাবর্তন (সম্পন্ন) হয়। কেননা আল্লাহ বলেন,
كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ)
"আমি এই কল্যাণময় গ্রন্থ আপনার নিকটে অবতীর্ণ করেছি, যেন তারা (লোকেরা) এর আয়াতসমূহ গবেষণা করে এবং জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ উপদেশ গ্রহণ করে"। সূরা ছুদ ৩৮:২৯।
}الدبر{ শব্দটি দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে (আয়াতসমূহের) অর্থ বুঝা। আর }الذكر{ শব্দটি দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে এই আল-কুরআনের প্রতি আমল করা। এই তাৎপর্যের কারণেই এই আল-কুরআনটি নাযিল হয়েছে। আর যখন এই কারণে আয়াতটি নাযিল হলো, তখন আমরা আল-কুরআন গবেষণা করার জন্য এবং এর অর্থসমূহ জানার জন্য কিতাব (আল-কুরআন) এর দিকে প্রত্যাবর্তন করব। অতঃপর আল-কুরআন যা নিয়ে এসেছে তা মেনে চলব। আর আল্লাহর শপথ (করে বলছি)! নিশ্চয় এর মাঝে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّي هُدًى فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَى وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى
"তারপর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে দিক-নির্দেশনা আসবে, তখন যে ব্যক্তি আমার দিক-নির্দেশনার অনুসরণ করবে; সে ব্যক্তি পথভ্রষ্ট হবে না এবং দুর্ভাগ্যবান হবে না। আর যে ব্যক্তি আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, সে ব্যক্তির জন্য দুঃখময় জীবন রয়েছে। আর আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় পুনরুত্থিত করব"। সূরা ত্ব-হা ৩৮:১২৩-১২৪।
আর একারণেই তুমি মুমিনের চেয়ে অবস্থার দিক দিয়ে অধিকতর সুখী, অন্তরের দিক দিয়ে অধিকতর প্রশস্ত এবং অন্তরে প্রশান্তির দিক দিয়ে দৃঢ়তর কাউকে কখনোই খুঁজে পাবে না। এমনকি যদিও উক্ত মুমিন লোকটি দরিদ্র হয়। অতএব, একজন মুমিন সুখের দিক দিয়ে ও প্রশান্তির দিক দিয়ে সর্বাধিক শক্তিশালী এবং অন্তরের দিক দিয়ে সর্বাধিক প্রশস্ত। আর তোমরা যদি চাও, তাহলে আল্লাহর (এই) বাণীটি তিলাওয়াত করো,
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
"পুরুষ এবং মহিলার মধ্য থেকে যদি কেউ মুমিন অবস্থায় সৎ আমল করে, তাহলে অবশ্যই আমি তাকে সুখী জীবন দান করব এবং তারা যে আমল করত তার চেয়ে অধিকতর উত্তম পুরুষ্কার তাদেরকে দান করব"। সূরা আন-নাহল ১৬:৯৭।
প্রশ্ন: সুখী জীবন কী?
উত্তর: সুখী জীবন হলো: অন্তরের আনন্দ এবং মনের প্রশান্তি, এমনকি যদিও মানুষ গুরুতর দারিদ্রের মাঝে থাকে। কেননা এটি প্রশান্ত আত্মা, প্রফুল্ল অন্তর। নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
"মুমিনের বিষয় আশ্চর্যজনক। নিশ্চয় তার সকল কাজ সর্বাধিক কল্যাণকর। এটি মুমিন ছাড়া অন্য কারও জন্য হতে পারে না। যদি তার নিকটে সুখ-শান্তি এসে পড়ে, তাহলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। অতএব, এটি তার জন্য কল্যাণকর। আর যদি তার নিকটে দুঃখ-কষ্ট এসে পড়ে, তাহলে সে ধৈর্যধারণ করে। অতএব, এটি তার জন্য কল্যাণকর”।[৩০]
প্রশ্ন: যখন কাফিরের নিকটে দুঃখ-কষ্ট এসে পড়ে, তখন সে কি ধৈর্যধারণ করে?
উত্তর: না! বরং সে হতাশ হয়ে পড়ে এবং দুনিয়া তার উপর চাপ দেয়। আর কখনো কখনো সে আত্মহত্যা করে। কিন্তু মুমিন ধৈর্যধারণ করে এবং আনন্দ ও শান্তির মাধ্যমে ধৈর্যের স্বাদ পায়। আর একারণেই তার জীবন সুখী হয়। এব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার বাণীটি হচ্ছে,
فلنحيينه حياة طيبة
তাহলে অবশ্যই আমি তাকে সুখী জীবন দান করব। সূরা আন-নাহল ১৬:৯৭। অতএব, একজন মুমিন যেখানেই থাকুক, (সেখানেই) কল্যাণের মধ্যে থাকে এবং সে ইহকালে ও পরকালে লাভবান হয়। আর একজন কাফির অকল্যাণের মধ্যে থাকে এবং সে ইহকালে ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَالْعَصْرِ * إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وتواصوا بالصبر
"মহাকালের শপথ, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে (তারা নয়) যারা ঈমান আনে, সৎ আমল করে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় এবং পরস্পরকে ধৈর্যধারণের উপদেশ দেয়"। সূরা আল আছর ১০৩:১-৩।
একাদশ আদেশ: [বিভিন্ন সংবাদ এবং বিভিন্ন বিধানের ব্যাপারে] নিশ্চিত হওয়া: (الثبت والثبات) যেসব গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচারসমূহের দ্বারা সজ্জিত হওয়া একজন শিক্ষার্থীর জন্য অপরিহার্য, সেগুলোর মধ্য থেকে একটি শিষ্টাচার হলো; বর্ণিত সংবাদসমূহের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া এবং প্রকাশিত বিধানসমূহের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া। অতএব, যখন সংবাদগুলো বর্ণিত হবে: তখন প্রথমত এগুলোর ব্যাপারে এটি নিশ্চিত হওয়া অপরিহার্য যে, যার নিকটে উক্ত সংবাদগুলো বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলো জ্বহীহ নাকি জ্বহীহ না? অতপর যখন সংবাদগুলো জ্বহীহ হবে, তখন সংবাদগুলো বিধানে সাব্যস্ত হবে। কখনো কখনো তোমার শ্রুত বিধানটি কোনো একটি মূলনীতির উপর ভিত্তিশীল, যে মূলনীতিটি তুমি জান না। ফলে তুমি ফাছসালা দাও যে, এই বিধানটি ভুল। অথচ বাস্তবতা হলো যে, এই বিধানটি ভুল নয়। তাহলে এই অবস্থায় সমাধান কিরূপ হবে?
সমাধান হলো: যার সাথে সংবাদটি সম্পৃক্ত, তার নিকটে তোমার যাওয়া এবং বলা: আপনার থেকে এরূপ এরূপ সংবাদ বর্ণিত হয়েছে। এটি কি ছুহীহ? তারপর তুমি তার সাথে বিতর্ক করবে। প্রথমবার তুমি যা শুনেছ, সে সম্পর্কে তোমার না জানার কারণে কখনো কখনো তার প্রতি তোমার বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হতে পারে। কেননা এই বর্ণনার মাধ্যম কি, তা তুমি জান না। আর বলা হয়ে থাকে:
إِذَا عُلِمَ السَّبَبُ بَطْلَ الْعَجَبُ
"যখন মাধ্যম জানা যায়, তখন বিস্ময় দূর হয়ে যায়।"
অতএব, প্রথমত আবশ্যিক হলো: সংবাদ এবং বিধানের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া। এরপর যার থেকে সংবাদটি বর্ণিত হয়েছে, তার নিকটে তুমি যাবে এবং তাকে জিজ্ঞেস করবে: এটি কি জ্বহীহ নাকি ছুহীহ না? তারপর তুমি তার সাথে বিতর্ক করবে। যদি সে লোক হক্বের উপর এবং সঠিক মতের উপর থাকে, তাহলে তুমি তার মতের দিকে ফিরে যাবে। আর যদি সঠিকতা তোমার নিকটে থাকে, তাহলে সে লোকটি তোমার সঠিক মতের দিকে ফিরে আসবে।
এখানে, الثَّبَاتُ এবং الثبت শব্দ দু'টির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এই দু'টি শব্দ শব্দগতভাবে সমার্থবোধক, কিন্তু অর্থগতভাবে বিপরীত।
الثبات অর্থ হলো: ধৈর্যধারণ করা এবং অটল থাকা, বিরক্ত না হওয়া, অসন্তুষ্ট না হওয়া এবং প্রত্যেক কিতাব থেকে অথবা প্রত্যেক বিষয় থেকে কিছু অংশ গ্রহণ করে তারপর তা পরিত্যাগ না করা। কেননা এটি একজন শিক্ষার্থীর ক্ষতি করে এবং কোন উপকারিতা ছাড়াই তার অনেক দিন কেটে যায়।
উদাহরণস্বরূপ: কিছু শিক্ষার্থী নাহু সম্পর্কে পড়াশোনা করে। একবার 'মাতুনুল আজরুমিয়্যাহ', একবার 'কত্বরুন নাদা' এবং একবার 'আলফিয়্যাহ ইবনু মালিক' পড়ে। অনুরূপভাবে একই সাথে মুদ্ধত্বলাহুল হাদীছ সম্পর্কে পড়াশোনা করে। একবার 'নুখবাতুল ফিক্স' এবং একবার 'আলফিয়্যাতুল ইরাক্বী' পড়ে। ঠিক অনুরূপভাবে ফিক্হ সম্পর্কে পড়াশোনা করে। একবার 'যাদুল মুসতাকুনি', একবার 'উম্দাতুল ফিক্হ্ন', একবার 'মুগ্গ্নী' এবং একবার 'শারহুল মুহায্যাব' পড়ে। প্রত্যেক কিতাবের ক্ষেত্রেই এমন হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এভাবে একজন শিক্ষার্থী 'ইল্ম অর্জন করতে পারে না, যদিও সে ব্যক্তিত্ব অর্জন করতে পারে। কেননা সে মাসআলাহগুলো শিক্ষা করে, কিন্তু নিয়ম-নীতি শিক্ষা করে না। আর শুধুমাত্র মাসআলাহগুলো শিক্ষা করা এমন জিনিসের মত, যা ফড়িং একটির পর একটি আহরণ করে। কিন্তু নিয়ম-নীতি শিক্ষা করা, সুদক্ষ হওয়া এবং (বিভিন্ন সংবাদের ব্যাপারে) নিশ্চিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। অতএব, তুমি যে কিতাবগুলো পড় এবং অনুশীলন কর, সে কিতাবগুলো সম্পর্কে নিশ্চিত হও এবং যে শাইখগণের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ কর, তাদের সম্পর্কে নিশ্চিত হও। প্রতি সপ্তাহে এবং প্রতি মাসে কোন একজন শাইখের নিকটে শুধুমাত্র সুরুচিসম্পন্ন ব্যক্তি হয়ো না।
প্রথমত তুমি মনস্থ করো, কার নিকটে তুমি 'ইল্ম শিক্ষা করবে। অতঃপর যখন তুমি এটি মনস্থ করবে, তখন তুমি তা নিশ্চিত করো। আর তুমি তোমার জন্য প্রতি সপ্তাহে অথবা প্রতি মাসে একজন করে শাইখ নিযুক্ত করো না। ফিক্হের ক্ষেত্রে তোমার জন্য একজন শাইখ নির্ধারণ করবে এবং ফিক্হ বিষয়ে তাঁর সাথে লেগে থাকবে। নাহু'র ক্ষেত্রে অন্য একজন শাইখ নির্ধারণ করবে এবং নাহু বিষয়ে তাঁর সাথে লেগে থাকবে। 'আক্বীদাহ ও তাওহীদের ক্ষেত্রে আরেকজন শাইখ নির্ধারণ করবে এবং এই বিষয়ে তাঁর সাথে লেগে থাকবে। এগুলোর মাঝে কোন পার্থক্য নেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে, তুমি ('ইল্ম অর্জনের ক্ষেত্রে শাইখগণের কাছে) স্থির থাকবে, শুধুমাত্র স্বাদ আস্বাদন করবে না। আর তুমি তালাক্ব প্রদানকারী ঐ ব্যক্তির মত হবে না, যে ব্যক্তি কোন একজন মহিলাকে বিবাহ করল ও তার নিকটে কয়েকদিন অবস্থান করে তাকে তালাকু দিল এবং অন্য একজন মহিলার খোঁজে বের হলো।
"السبت" (নিশ্চিত হওয়া)ও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা কখনো কখনো বর্ণনাকারীদের খারাপ নিয়্যাত থাকে। আর কখনো কখনো তাদের খারাপ নিয়্যাত থাকে না। কিন্তু তারা উদ্দিষ্ট অর্থের বিপরীত বিষয় বুঝে। আর একারণেই (কোনো সংবাদের ব্যাপারে) নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক। সুতরাং, যখন বর্ণিত বিষয়টি সানাদ (বর্ণনা সূত্র) সহকারে সাব্যস্ত হবে, তখন কোনো একজন ব্যক্তি কোনো বর্ণনার ব্যাপারে ভুল অথবা সঠিক ফায়সালা দেওয়ার পূর্বে তার ঐ সঙ্গীর সাথে বিতর্কের পর্যায়ে আসবে, যা থেকে বর্ণনাটি বর্ণিত হয়েছে। বর্ণনাটি সানাদ সহকারে একারণে সাব্যস্ত হতে হবে যে, কখনো কখনো বিতর্কের মাধ্যমে তোমার নিকটে এটি সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে সঠিকতা ঐ ব্যক্তি সাথে রয়েছে, যার থেকে বর্ণনাটি বর্ণিত হয়েছে (অর্থাৎ, যার থেকে সংবাদটি বর্ণিত হয়েছে তার কথায় সঠিক)
সারাংশ হলো যে: যখন কোনো ব্যক্তির থেকে কোনো সংবাদ বর্ণিত হবে, যা তুমি মনে কর যে এটি ভুল; তখন তুমি ধারাবাহিক তিনটি পন্থা অবলম্বন করবে,
(১) সংবাদটির বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে নিশ্চত হওয়া।
(২) বিধানটির বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখা। অতএব, বিধানটি যদি বিশুদ্ধ হয়, তাহলে তার পক্ষ অবলম্বন কর। আর যদি বিধানটিকে তুমি ভুল দেখ, তাহলে তুমি সঠিক পন্থা অবলম্বন কর।
(৩) যার দিকে বর্ণনাটিকে সম্বোধন করা হয়েছে, তার নিকটে সে বর্ণনার ব্যাপারে বিতর্ক করার জন্য যাওয়া। আর এই বিতর্কটি যেন শান্তভাবে এবং সম্মানের সাথে হয়।
দ্বাদশ আদেশ: আল্লাহ তা'আলা এবং তার রাসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ( الحرص على فهم مراد الله تعالى ومراد رسوله صلى الله عليه وسلم): 'ইল্ম অর্জনের ক্ষেত্রে আল্লাহ এবং তার রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উদ্দেশ্য বুঝা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত। কেননা অধিকাংশ মানুষকে 'ইল্ম দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদেরকে (সঠিক) বুঝ দেওয়া হয় নি। (অতএব) বুঝা ছাড়া আল্লাহর কুরআন এবং রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ থেকে যা সহজ, তা তোমার মুখস্ত করা যথেষ্ট নয়। আল্লাহ এবং তার রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা উদ্দেশ্য করেছেন, তা আল্লাহ এবং তার রসূল থেকেই তোমার বুঝা আবশ্যক। কোনো কোনো দলের পক্ষ থেকে কতইনা ভুল সংঘটিত হয়! যে দলের লোকজন আল্লাহ এবং তার রসূলের উদ্দেশ্য ছাড়াই কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা দলীল গ্রহণ করে। এর ফলে পথভ্রষ্টতা সৃষ্টি হয়।
আর এখানে আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ব্যাপারে সংবাদ দিচ্ছি। জেনে নাও! তা হলো- বুঝার ক্ষেত্রে যে ভুল হয়, তা কখনো কখনো অজ্ঞতার ভুলের চেয়ে কঠিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়। কেননা অজ্ঞ ব্যাক্তি যখন তার না জানার কারণে ভুল করে, তখন সে জানে যে, সে জাহেল। ফলে সে শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তি যখন ভুল করে, তখন সে নিজে নিজে এই বিশ্বাস করে যে, সে একজন অভ্রান্ত আলিম এবং সে এটাও বিশ্বাস করে যে, এটিই আল্লাহ এবং তার রাসূলের উদ্দেশ্য।
আর একারণে আমরা কিছু উদাহরণ পেশ করব, যেন আমাদের নিকটে "বুঝ” এর গুরুত্ব সুস্পষ্ট হয়ে যায়।
প্রথম উদাহরণ: আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَ دَاوُودَ وَ سُلَيْمَانَ إِذْ يَحْكُمَانِ فِي الْحَرْثِ إِذْ نَفَشَتْ فِيهِ غَيْمُ الْقَوْمِ وَ كُنَّا لِحُكْمِهِمْ شَاهِدِينَ * فَفَهَمْنَاهَا سُلَيْمَانَ وَ كُلَّا آتَيْنَا حُكْمًا وَ عِلْمًا وَ سَخَّرْنَا مَعَ دَاوُودَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَ الطَّيِّرَ وَ كُنَّا فَاعِلِينَ
"স্মরণ করো দাউদ এবং সুলাইমানের কথা! যখন তারা শস্যক্ষেতের ব্যাপারে বিচার করছিল। যখন তাতে কোনো সম্প্রদায়ের মেষ রাতের বেলা ঢুকে পড়েছিল। আর আমি তাদের বিচার (কার্য) প্রত্যক্ষ করছিলাম। অতঃপর আমি সুলাইমানকে এবিষয়ের (সঠিক) বুঝ দিয়েছিলাম। আর আমি (তাদের) প্রত্যেকেই বিচারশক্তি এবং জ্ঞান দিয়েছিলাম। আর আমি পর্বতমালা এবং পাখিদেরকে (দাউদের) অধীন করে দিয়েছিলাম, তারা দাউদের সাথে তাসবী'হ পাঠ করত। আর এসবকিছু আমিই করছিলাম। সূরা আল-আম্বিয়া; ২১:৭৮-৭৯।
আল্লাহ তা'আলা এই বিচারের ক্ষেত্রে "বুঝ” এর কারণে দাউদ (আ) এর উপর সুলাইমান (আ) কে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলেন। যেমন আল্লাহর বাণী: (অতঃপর আমি সুলাইমানকে এবিষয়ের (সঠিক) বুঝ দিয়েছিলাম)। কিন্তু এখানে দাউদ (আ) এর 'ইল্মে কমতি নেই। যেমন আল্লাহর বাণী: (আর আমি (তাদের) প্রত্যেকেই বিচারশক্তি এবং জ্ঞান দিয়েছিলাম)। আর তুমি এই সম্মানিত আয়াতের দিকে লক্ষ্য করো, আল্লাহ যা উল্লেখ্য করেছেন। যার কারণে সুলাইমান (আ) শ্রেষ্ঠ হয়েছেন, তা হলো "বুঝ”। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা দাউদ (আ) এর ও শ্রেষ্ঠত্ব উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আর আমি পর্বতমালা এবং পাখিদেরকে (দাউদের) অধীন করে দিয়েছিলাম, তারা দাউদের সাথে তাসবী'হ পাঠ করত"।
যেন তাদের দু'জনের মধ্য থেকে প্রত্যেকেই সমান। তারপর তারা দু'জন যে ক্ষেত্রে একত্রিত হয়েছেন, আল্লাহ তা উল্লেখ করেছেন। আর তা হলো: বিচারশক্তি এবং 'ইল্ম। অবশেষে দু'জনের মধ্য থেকে প্রত্যেকেই যে কারণে একে অপরের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়েছেন, আল্লাহ তা উল্লেখ করেছেন। এই আয়াতটি আমাদের নিকট "বুঝ” এর গুরুত্বের উপর প্রমাণ করে। আর 'ইল্ম অর্জনই সবকিছু নয়।
দ্বিতীয় উদাহরণ: যদি তোমার নিকটে দু'টি পাত্র থাকে। দু'টি পাত্রের একটিতে তীব্র গরম পানি থাকে এবং অপরটিতে তীব্র ঠান্ডা থাকে। এমতাবস্থায় ঋতু হলো শীতকাল। অতএব, কোনো এক লোক জানাবাত (শারীরিক অপবিত্রতা) এর গোসল করার উদ্দেশ্যে আসল। তারপর অপর একজন লোক বলল: ঠান্ডা পানি ব্যবহার করা তোমার জন্য আবশ্যক। আর এটি একারণে যে, ঠান্ডা পানিতে কষ্ট রয়েছে। কেননা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহ যার দ্বারা গুনাহসমূহ মুছে দেন এবং যার দ্বারা মর্যাদাসমূহ বৃদ্ধি করে দেন, আমি কি তোমাদেরকে সে ব্যাপারে সংবাদ দিব না? ছাহাবাহগণ বললেন: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রসূল! রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন:
إِسْبَاغُ الْوُضُوءِ عَلَى الْمَكَارِهِ কষ্ট সত্ত্বেও পরিপূর্ণরূপে অযু করা”। [৩১]
লোকটি (এই হাদীছ থেকে) উদ্দেশ্য নিয়েছেন ঠান্ডার দিনগুলিতে পরিপূর্ণরূপে উযূ করা। অতএব, যখন তুমি ঠান্ডা পানি দিয়ে পরিপূর্ণরূপে উযূ করবে, তখন এটি অবহাওয়ার প্রকৃতির অনুকূল গরম পানি দ্বারা তোমার উযূ করার চেয়ে অধিকতর উত্তম। সুতরাং লোকটি ফাতওয়া দিয়েছেন যে, ঠান্ডা পানি ব্যবহার করা সর্বোত্তম। আর তিনি পূর্ববর্তী হাদীছ দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন। তাহলে ভুলটি কি জানার ক্ষেত্রে, নাকি বুঝার ক্ষেত্রে?
উত্তর: ভুলটি বুঝার ক্ষেত্রে হয়েছে। কেননা রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "কষ্ট সত্ত্বেও পরিপূর্ণরূপে অযু করা"। অথচ তিনি বলেননি: অযুর জন্য ঠান্ডা পানি নির্বাচন করো। আর তিনি দু'টি ব্যাখ্যার মাঝে পার্থক্য করেছেন। যদি হাদীছটিতে দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি বর্ণিত হতো, তাহলে আমরা বলতাম: হ্যাঁ, তুমি ঠান্ডা পানি নির্বাচন কর। অথচ রাসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
"কষ্ট সত্ত্বেও পরিপূর্ণরূপে উযূ করা"।
অর্থাৎ পানির শীতলতা পরিপূর্ণরূপে উযূ করা থেকে মানুষকে বাধা দেয় না। অতঃপর আমরা বলব: আল্লাহ কি তার বান্দাদের প্রতি সহজতা চান, নাকি তাদের প্রতি কঠোরতা চান?
উত্তর: আল্লাহ তা'আলা বলেন, يُرِيدُ اللهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَ لَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ
"আল্লাহ তোমাদের প্রতি সহজতা চান এবং তোমাদের প্রতি কঠোরতা চান না"। সূরা আল-বাক্বারাহ; ২:১৮৫।
আর নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: إِنَّ الدِّينَ يُسْر
"নিশ্চয় দীন সহজ”।[৩২]
সুতরাং আমি সকল ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলব: নিশ্চয় "বুঝ”এর বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতএব, আল্লাহ তার বান্দাদের থেকে কি চেয়েছেন, তা বুঝা আমাদের উপর আবশ্যক। ইবাদতসমূহ পালন করার ক্ষেত্রে আল্লাহ কি তাদের উপর কষ্ট দিতে চান, নাকি তাদের প্রতি সহজতা চান?
উত্তর: কোনো সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ তা'আলা আমাদের প্রতি সহজতা চান এবং আমাদের প্রতি কঠোরতা চান না। অতএব, যে শিষ্টাচারগুলো দ্বারা একজন শিক্ষার্থীর 'ইল্ম অর্জনের ক্ষেত্রে প্রভাবিত হওয়া, উত্তম আর্দশ হওয়া, এমনকি কল্যাণের দিকে আহ্বানকারী হওয়া এবং আল্লাহর দীনের ক্ষেত্রে নেতা হওয়া উচিত; সেগুলোর মধ্য থেকে এগুলো কিছু শিষ্টাচার। সুতরাং ধৈর্য এবং দৃঢ় বিশ্বাসের মাধ্যমে দীনের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব অর্জন হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَ جَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ
"আর আমি তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা নির্ধারণ করেছিলাম যারা আমার আদেশ অনুযায়ী সৎপথ প্রদর্শন করত, যতদিন তারা ধৈর্যধারণ করেছিল। আর তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস করত"। সূরা আস-সাজদাহ; ৩২:২৪।
টিকাঃ
[১৪] জ্বহীহ ইবনু হিব্বান হা/৭৮, সুনান আবু দাউদ হা/৩৬৬৪, সুনান ইবনু মাজাহ হা/২৫২, মুসনাদ আহমাদ হা/৮৪৫৭, মুছুন্নাফ ইবনু আবী শাইবা হা/২৬১২৭।
[১৫] জ্বহীহ বুখারী হা/৩৪৬১।
[১৬] দ্বহীহ বুখারী হা/৭৪০, মুয়াত্তা মালিক হা/৩৭৬।
[১৭] জ্বহীহ মুসলিম হা/২২৩।
[১৮] জ্বহীহ বুখারী হা/৬৩৩১, জ্বহীহ মুসলিম হা/৭৫৯।
[১৯] জ্বহীহ মুসলিম হা/১৭১৮।
[২০] জ্বহীহ বুখারী হা/১৩।
[২১] জ্বহীh মুসলিম হা/১৮৪৪।
[২২] সুনান আত-তিরমিযী হা/২০১৮।
[২৩] জ্বহীহ মুসলিম হা/২৮৫, মুনাদে আহমাদ ৩/১৯১।
[২৪] জ্বহীহ: সুনান আবু দাউদ হা/৩৮০।
[২৫] জ্বহীহ মুসলিম হা/৫৩৭।
[২৬] জ্বহীহ মুসলিম হা/২০৯১, ইবনে হিব্বান হা/১৫।
[২৭] সুনান আত-তিরমিযী; হা/২৪৯৯।
[২৮] জ্বহীহ বুখারী হা/৪৮১, জ্বহীহ মুসলিম হা/২৫৮৫।
[২৯] জ্বহীহ মুসলিম হা/১৮৪৪।
[৩০] জ্বহীহ মুসলিম হা/২৯৯৯ ছুহীহ ইবনু হিব্বান হা/২৮৯৬।
[৩১] জ্বহীহ মুসলিম, হা/২৫১, তিরমিযী হা/৫১, নাসাঈ হা/১৪৩।
[৩২] দ্বহীহ বুখারী হা/৩৯, নাসাঈ হা/৫০২৪।
📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: ‘ইলম অর্জনের কারণসমূহ
'ইল্ম অর্জনের অনেক কারণ বিদ্যমান। সেগুলোর কিছু আমরা উল্লেখ করলাম।
১. তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা (التقوى) :
তাক্বওয়া অর্জন করা তার পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সকল বান্দাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَ لَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَ إِيَّاكُمْ أَنِ اتَّقُوا اللَّهَ وَ إِنْ تَكْفُرُوا فَإِنَّ للَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَ كَانَ اللَّهُ غَنِيًّا حَمِيدًا
"তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল তাদেরকে এবং তোমাদেরকে অবশ্যই আমি এই নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমারা আল্লাহকে ভয় করো। আর যদি তোমরা কুফুরী কর তাহলে, নিশ্চয় আসমানসমূহ এবং যমীনের মধ্যে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহ হলেন অভাবমুক্ত এবং প্রশংসিত"। সূরা আন-নিসা ৪:১৩১।
আর এটা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরও নির্দেশ তার উম্মাতের প্রতি। আবু উমামাহ ছুদী ইবনু 'আজলান 'আল-বাহিলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخْطُبُ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ فَقَالَ: اتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ، وَ صَلُّوا خَمْسَكُمْ، وَ صُومُوا شَهْرَكُمْ، وَ أَدُّوا زَكَاةَ أَمْوَالِكُمْ، وَ أَطِيعُوا ذَا أَمْرِكُمْ تَدْخُلُوا جَنَّةَ رَبِّكُمْ
"আমি রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বিদায় হজ্জে ভাষণ দিতে শুনেছি। তিনি বলেছেন: তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করো, তোমাদের পাঁচ ওয়াক্ত জ্বলাত আদায় করো, তোমাদের রমাযান মাসের দ্বিয়াম পালন করো, তোমাদের ধন-সম্পদের যাকাত প্রদান করো, তোমাদের নেতাদের আনুগত্য করো এবং তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের জান্নাতে প্রবেশ করো" [৩৩]
আর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো নেতাকে কোনো অভিযানে প্রেরণ করতেন, তখন বিশেষ করে তাকে আল্লাহভীতির নির্দেশ দিতেন এবং মুসলিমদের মধ্য থেকে তার (নেতার) সাথে যারা থাকতেন তাদের সাথে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিতেন এবং সালাফে সালেহীন তাদের বক্তৃতায়, তাদের লেখনীতে এবং মৃত্যুর সময় তাদের ওয়াদ্বিয়্যাতে তারা পরস্পরকে সদুপদেশ দিতে অব্যাহত থাকতেন।
উমার ইবনুল খাত্তাব (তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহর নিকটে লিখেছিলেন, أَمَّا بَعْدُ فَإِنِّي أُوْصِيْكَ بِتَقْوَى الله عَزَّ وَجَلَّ - فَإِنَّهُ مَنْ الْقَاهُ وَقَاهُ، وَمَنْ أَقْرَضَهُ جَزَاهُ و من شكره زاده
অতঃপর আমি তোমাকে আল্লাহভীতির ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছি। যে তাকে ভয় করবে, তিনি তাকে রক্ষা করবেন। যে তাকে ঋণ দিবে, তিনি তাকে প্রতিদান দিবেন এবং যে তার কৃতজ্ঞতা আদায় করবে, তিনি তাকে তা বৃদ্ধি করে দিবেন।
আর 'আলী ( কোনো একজন ব্যক্তিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, "আমি তোমাকে এমন আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি, যার সাক্ষাৎ তোমার জন্য আবশ্যক। যাকে ছাড়া তোমার কোনো সমাপ্তি নেই। আর তিনি ইহকাল এবং পরকালের মালিক"।
আর কোনো একজন ধার্মিক ব্যক্তি তার কোনো এক দীনি ভাইয়ের নিকটে লিখেছেন, "আমি তোমাকে এমন আল্লাহভীতির নির্দেশ দিচ্ছি, যিনি তোমাকে তোমার বিছানায় (বিপদ-আপদ থেকে) রক্ষা করেন এবং তোমাকে তোমার বাহিরে আরোহণে (বিপদ-আপদ থেকে) রক্ষা করেন। সুতরাং তুমি তোমার অন্তরকে দিনে এবং রাতে সর্বাবস্তায় আল্লাহর কাছে প্রদান করো। তুমি আল্লাহকে ভয় করো তোমার নিকট তার নিকটবর্তীতা অনুযায়ী, তোমার উপর তার ক্ষমতা অনুযায়ী। আর জেনে রাখো! নিশ্চয় তুমি তার চোখের সামনে রয়েছো, তুমি তার কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে অন্যের কর্তৃত্বের দিকে যেতে পারবে না এবং তার মালিকানা থেকে অন্যের মালিকানার দিকে যেতে পারবে না। অতএব তার প্রতি তোমার ভয় যেন বেশি থাকে"।
আর তাক্বওয়ার শাব্দিক অর্থ: "বান্দা তার মাঝে এবং সে যার ভয় করে তার মাঝে এমন প্রতিরক্ষা স্থাপন করবে, যা তাকে ভয় হতে রক্ষা করবে"।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: "বান্দা তার নিজের মাঝে এবং সে যার রাগ ও অসন্তুষ্টির ভয় করে তার মাঝে, তার আনুগত্যের মাধ্যমে ও তার পাপসমূহ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে এমন প্রতিরক্ষা স্থাপন করবে, যা তাকে তার রাগ ও অসন্তুষ্টির ভয় থেকে রক্ষা করবে"।
জেনে রাখো! কখনো কখনো "তাক্বওয়া" শব্দটি "বির" শব্দটির সাথে যুক্ত হয়ে আসে, তখন বলা হয় যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَ تَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَ التَّقْوَى
"আর তোমরা পরস্পরকে সাহায্য করো আদেশসমূহ পালন এবং নিষেধসমূহ বর্জনের ব্যাপারে"। সূরা আল-মায়িদা ৫:২।
আর কখনো কখনো এ শব্দ দু'টির একটিকে উল্লেখ করা হয়। অতএব, যখন "বির" শব্দটির সাথে "তাক্বওয়া" শব্দটি মিলিত হয়ে আসে, তখন "বির” শব্দটি "আদেশ পালন” এর অর্থ দেয়। আর "তাক্বওয়া” শব্দটি "নিষেধসমূহ বর্জন" এর অর্থও দেয়। আর "তাক্বওয়া” শব্দটি যখন এককভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন এটি এমন ব্যাপক অর্থ দেয়, যা আদেশসমূহ পালন ও নিষেধসমূহ বর্জনের অর্থকে অন্তর্ভুক্ত করে।
আর অবশ্যই আল্লাহ তা'আলা তার কুরআনে উল্লেখ করেছেন যে, জান্নাত মুত্তাকীদের (আল্লাহভীরুদের) জন্য তৈরি করা হয়েছে। সুতরাং, আল্লাহভীরুরাই জান্নাতের অধিবাসী (আল্লাহ আমাদেরকে এবং তোমাদেরকে জান্নাতের অন্তর্ভুক্ত করুন)। আর একারণেই মানুষের উপর আবশ্যক হলো আল্লাহকে ভয় করা; তার আদেশসমূহ মেনে চলার জন্য, তার প্রতিদান অন্বেষণের জন্য এবং তার শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَتَّقُوا اللهَ يَجْعَلْ لَكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَ اللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ
"হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তাহলে তিনি তোমাদেরকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী শক্তি প্রদান করবেন, তোমাদের থেকে তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ তা'আলা মহা অনুগ্রহশীল। সূরা আল-আনফাল ৮:২৯।
আর এই আয়াতের মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ফায়দাহ/মর্যাদা রয়েছে,
প্রথম ফায়দাহ: ﴿يجعل لكم فرقانا "তোমাদেরকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী শক্তি প্রদান করবেন"। অর্থাৎ তিনি তোমাদেরকে এমন শক্তি প্রদান করবেন, যার মাধ্যমে তোমরা সত্য-মিথ্যার মাঝে ও ভাল-মন্দের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করবে। আর আয়াতের এই অংশে 'ইল্ম অন্তর্ভুক্ত। এটি এভাবে যে, আল্লাহ তা'আলা মানুষের জন্য যে জ্ঞানসমূহ উন্মোচন করে দিয়েছেন, তা অন্য কারো জন্য উন্মোচন করেননি। কেননা আল্লাহভীতির মাধ্যমেই সঠিক পথের আধিক্যতা, 'ইল্মের আধিক্যতা এবং সংরক্ষণের আধিক্যতা অর্জিত হয়।
আর একারণেই শাফিঈ (রহঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: شكوتُ إِلَى وَكيع سوء حفظي ... فَأَرْشَدَنِي إِلَى تَرْك الْمَعَاصِي وَ قَالَ اعْلَمْ بِأَنَّ الْعِلْمُ نور ... و نور الله لا يؤتاه عاصي
"আমি আমার শিক্ষক ওয়াকী' এর নিকট আমার স্মরণশক্তির দুর্বলতার ব্যাপারে অভিযোগ করলাম। অতঃপর তিনি আমাকে গুনাহসমূহ বর্জনের পরামর্শ দিলেন এবং বললেন: তুমি জেনে রাখো যে, 'ইল্ম হলো নূর। আর আল্লাহর নূর কোনো পাপীকে দেওয়া হয় না"।
কোনো সন্দেহ নেই যে, মানুষ যখন 'ইল্ম বৃদ্ধি করতে চায়, তখন মানুষ শিক্ষা ব্যবস্থা, সত্য-মিথ্যা মাঝে এবং ভাল-মন্দের মাঝে পার্থক্যকারী শক্তি বৃদ্ধি করতে চায়।
অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা মানুষের জন্য যে "বুঝ” উন্মোচন করে দিয়েছেন, তা আয়াতের এ অংশের অন্তর্ভুক্ত। আর তাক্বওয়া হচ্ছে বুঝশক্তির উপকরণ এবং বুঝশক্তির মাধ্যমে 'ইল্মের আধিক্যতা অর্জিত হয়। অতঃপর তুমি দু'জন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করবে, তারা আল্লাহর কুরআন থেকে কোনো আয়াত সংরক্ষণ করে এবং তাদের দু'জনের একজন উক্ত আয়াত থেকে তিনটি হুকুম বের করতে সক্ষম হয়। আর অপরজন; আল্লাহ তাকে যে "বুঝ” দিয়েছেন, তা অনুযায়ী সে উক্ত আয়াত থেকে অনেক হুকুম বের করতে সক্ষম হয়। তাক্বওয়া হচ্ছে বুঝের আধিক্যতার উপকরণ।
আর আয়াতের এই অংশে অন্তরদৃষ্টিও অন্তর্ভুক্ত যে, আল্লাহ মুত্তাকীদের এমন অন্তরদৃষ্টি প্রদান করেন, যার মাধ্যমে সে মানুষের মাঝে (ভাল-মন্দের) পার্থক্য করে। সুতরাং শুধুমাত্র মানুষকে দেখেই সে চিনতে পারে যে, সে (মানুষটি) সত্যবাদী নাকি মিথ্যাবাদী, নেক্কার নাকি বদ্কার। এমনকি আল্লাহ তাকে যে
অন্তরদৃষ্টি দিয়েছেন, তার মাধ্যমে কখনো কখনো সে ব্যক্তি কোনো এক ব্যক্তির ব্যাপারে ফায়ছালা দেয়। অথচ সে (কখনো) তার সঙ্গী হয়নি এবং তার সম্পর্কে (পূর্ব থেকে) কোনো কিছুই জানে না।
দ্বিতীয় ফায়দাহ: "তোমাদের থেকে তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন"। আর সৎ আমলের মাধ্যমে পাপ মোচন হয়। কেননা সৎ আমল খারাপ আমলের কাফ্ফারা। যেমন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِذَا اجْتَنِبَ الْكَبَائِرُ যদি বান্দা কাবীরাহ গুনাসমূহ বর্জন করে, তাহলে পাঁচ ওয়াক্ত জ্বলাত, এক জুম'আহ থেকে অপর জুম'আহ এবং এক রমাযান (মাস) থেকে অপর রমাযান (মাস), এগুলোর মধ্যবর্তী সময়ে যে (দ্ব'গীরাহ) গুনাসমূহ হয়েছে, সেগুলোর কাফ্ফারা হয়ে যাবে। [৩৪] রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
العمرة إلى العمرة كفارة لما بينهما এক 'উমরা থেকে অপর 'উমরা উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ে যে (ছুগীরা) গুনাহগুলো হয়েছে, সেগুলোর কাফ্ফারা হয়ে যাবে। [৩৫]
সুতরাং সৎ আমলসমূহের মাধ্যমেই কাফ্ফারা হয়। আর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদ্দেশ্য নিয়েছেন যে, মানুষ যখন আল্লাহকে ভয় করে, তখন আল্লাহ তার জন্য এমন সৎ আমলসমূহ সহজ করে দেন, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন।
তৃতীয় ফায়দাহ: و يغفر لكم "এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন"। এটা এজন্য যে, তাওবা এবং ইস্তেগফার তোমাদের জন্য সহজ করা হয়েছে।
কেননা এটা বান্দার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ যে, তিনি তাওবা এবং ইস্তেগফারকে সহজ করেছেন।
২. 'ইল্ল্ম অন্বেষণের ব্যাপারে কঠোর পরিশ্রমী হওয়া ও তাতে অটল থাকা (المثابرة والاستمرار على طلب العلم): 'ইল্ম অর্জনের ক্ষেত্রে শ্রম ব্যয় করা, তার উপর ধৈর্যধারণ করা এবং 'ইল্ম অর্জনের পর তা সংরক্ষণ করা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক। কেননা শরীরের প্রশান্তির মাধ্যমে 'ইল্ম অর্জিত হয় না। অতএব, প্রত্যেক শিক্ষার্থী ঐ সকল পথে চলবে, যে সকল পথ 'ইল্ম পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। আর একারণে সে ছওয়াবপ্রাপ্ত হবে। কেননা জ্বহীহ মুসলিমে নবী জ্বাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন,
مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا، سَهُلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ "যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো পথে চলে, যে পথে সে 'ইল্ম অন্বেষণ করবে; তাহলে এর বিনিময়ে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি পথ সহজ করে দিবেন"।[৩৬]
অতএব, প্রত্যেক শিক্ষার্থী যেন অধ্যবসায়ী হয়, কঠোর পরিশ্রমী হয়, রাত্রী জাগরণ করে এবং তার থেকে যেন ঐ প্রত্যেক জিনিস দূরে থাকে, যা তাকে 'ইল্ম অন্বেষণ থেকে বিরত রাখে অথবা তাকে ব্যস্ত রাখে।
আর সালাফে জ্বলেহীনের 'ইল্ম অন্বেষণের ক্ষেত্রে কঠোর পরিশ্রমের ব্যাপারে অনেক ঘটনা রয়েছে। এমনকি আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (আনহুমা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি কিসের মাধ্যমে 'ইলল্ম অর্জন করেছেন? তিনি (জবাবে) বলেছিলেন,
بلِسَانِ سَؤول، وَ قَلْب عقول، و بدن غير كسول অধিক প্রশ্নকারী জিহ্বার মাধ্যমে, জ্ঞানবান অন্তরের মাধ্যমে এবং নিরলস শরীরের মাধ্যমে। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (আনহুমা) থেকে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন,
إِنْ كَانَ لَيَبْلُغُنِي الْحَدِيثُ عَن الرَّجُلِ فَأَتِي بَابَهُ فَأَتَوَسَّدُ رِدَانِي عَلَى بَابه، تسفي الريح عَلَيَّ مِنَ التَّرَابِ، فَيَخْرُجُ فَيَقُولُ : يَا ابْنَ عَمَّ رَسُولِ الله مَا جَاءَ بِكَ؟ أَلَا أَرْسَلْتَ إِلَيَّ فَأَتَيْكَ؟ فَأَقُولُ: أَنَا أَحَقُّ أَن أَتِيَكَ
"নিশ্চয় কোনো একজন ব্যক্তি থেকে কোনো একটি হাদীছ আমার নিকট পৌঁছেছিল। অতঃপর আমি তার দরজায় এসেছিলাম। পরে আমি আমার চাদরটি তার দরজার উপর বালিশরূপে ব্যবহার করেছিলাম। বাতাস আমার উপর দিয়ে ধূলা-বালি উড়িয়ে নিয়েছিল। অতঃপর, সে লোক বের হয়ে বলেছিল, হে রসূলুল্লাহর চাচাতো ভাই! আপনাকে কে নিয়ে এসেছে? আপনি কেন আমার নিকটে (কাউকে) পাঠান নি, তাহলে আমি আপনার নিকটে আসতাম? তারপর আমি বলেছিলাম: আপনার নিকটে আসার আমি বেশি হকদার"।
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস ইলমের কারণে বিনয়ী ছিলেন। ফলে আল্লাহ এর বিনিময়ে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে কঠোর পরিশ্রম করা একজন শিক্ষার্থীর জন্য উচিত। আর ইমাম শাফিঈ (রহঃ) থেকেও বর্ণিত আছে যে, কোনো এক রাত্রিতে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল (রহঃ) তাকে দাওয়াত দিলেন। তারপর তার সামনে রাতের খাবার পেশ করলেন। এরপর শাফিঈ (রহঃ) খাবার খেলেন। খাবার শেষে দু'ব্যক্তি তাদের বিছানায় চলে গেল। তারপর শাফিঈ (রহঃ) কোনো একটি হাদীছের হুকুমগুলো উদ্ঘাটনের জন্য গবেষণা করতে থাকলেন। আর হাদীছটি হলো নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাণী,
يَا أَبَا عُمَيْرٍ مَا فَعَلَ النُّغَيرُ হে আবু 'উমাইর! নু'গাইর (ছোট পাখি) কি করে?৩৭]
আবু উমাইর এর সাথে একটি ছোট পাখি ছিল। যাকে নু'গাইর বলে ডাকা হত। তারপর এই পাখিটি মারা গেল। অতঃপর বালকটি পাখিটির ব্যাপারে দুঃখ পেল। আর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশুদের সাথে খেলা করতেন।
অতঃপর দীর্ঘ রাত্রি ধরে ইমাম শাফিঈ (রহঃ) এই হাদীছটি থেকে (হুকুম) উদ্ঘাটন করতে থাকলেন। বলা হয়ে থাকে: তিনি হাদীছটি থেকে ১০০০ এর চেয়েও বেশি ফায়দাহ উদ্ঘাটন করেছিলেন। সম্ভবত তিনি যখন কোনো ফায়দাহ উদ্ঘাটন করতেন, তখন এর সাথে আরেকটি হাদীছ টেনে আনতেন। অতঃপর যখন ফজরের আযান দেওয়া হল, তখন ইমাম শাফিঈ (রহঃ) জ্বলাত আদায় করলেন। অথচ উযূ করলেন না। তারপর তিনি তার বাড়ির দিকে ফিরে গেলেন। আর ইমাম আহমাদ (রহঃ) তার পরিবারের নিকটে শাফিঈ (রহঃ)
এর প্রশংসা করেছিলেন। তারপর তার পরিবারের লোকজন তাকে বললেন, হে আবু আব্দুল্লাহ! আপনি কিভাবে এমন ব্যক্তির প্রশংসা করেন; যিনি পানাহার করলেন, ঘুমালেন, রাত্রি জাগরণ করলেন না এবং উযূ ছাড়া ফজরের জ্বলাত আদায় করলেন? তারপর ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রহঃ) ইমাম শাফিঈ (রহঃ) কে (এ বিষয়ে) জিজ্ঞেস করলেন। অতঃপর ইমাম শাফিঈ (রহঃ) (জবাবে) বললেন: "আমি পাত্র খালি করা পর্যন্ত খেয়েছি। কেননা আমি ইমাম আহমাদ (রহঃ) এর খাবারের চেয়ে উত্তম খাবার খুঁজে পাইনি। তাই এ খাবার দিয়ে আমার পেট পূর্ণ করার ইচ্ছা করেছি। আর আমি তাহাজ্জুদের জ্বলাত আদায় করিনি। কেননা রাতের (নফল জ্বলাতে) দণ্ডায়মান হওয়ার চেয়ে 'ইল্ম অর্জন করা অধিকতর উত্তম। আর আমি (উক্ত সময়ে) এই হাদীছটির ব্যাপারে গবেষণা করেছিলাম। পক্ষান্তরে, ফজরের জ্বলাতের জন্য আমি উযূ করিনি। কেননা আমি 'ইশার জ্বলাত থেকেই উযূ অবস্থায় ছিলাম"।
(লেখক) আমি সর্বাবস্থায় বলব: 'ইল্ম অর্জনের ক্ষেত্রে কঠোর পরিশ্রমী হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতএব, আমরা যেন আমাদের বর্তমান সময়ের দিকে লক্ষ্য করি, আমরা কি এই কঠোর পরিশ্রমের উপর আছি, নাকি নাই? পক্ষান্তরে, যারা নিয়মিত লেখাপড়া করে। অতঃপর যখন তারা লেখাপড়া থেকে বিরত হয়, তখন তারা এমন কিছু জিনিসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, যেগুলো তাদেরকে পড়াশুনার ব্যাপারে উৎসাহিত করে না।
আমি একটি উদাহরণ পেশ করছি: কোনো একজন শিক্ষার্থী কোনো এক বিষয়ে খারাপ পরীক্ষা দিল। তারপর শিক্ষক বললেন, "কেন (তুমি খারাপ পরীক্ষা দিলে)? অতঃপর ছাত্রটি বলল: কেননা আমি এই বিষয়টি বুঝতে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছি। ফলে আমি এই বিষয়টি পড়ি না। কিন্তু আমি এটি বুঝতে চাই"। এ কেমন হতাশা? এটি একটি বড় ভুল। অতএব, আমাদের কঠোর পরিশ্রম করা আবশ্যক, যতক্ষণ না আমরা উদ্দিষ্ট লক্ষ্য পর্যন্ত পৌঁছতে পারি। আর আমার নিকটে আমাদের শিক্ষক আব্দুর রহমান আস-সা'দী (রহঃ) বর্ণনা করেছিলেন যে: "নাহু বিষয়ে কুফাবাসীর ইমাম আল-কিসায়ী (রহঃ) নাহুশাস্ত্রে 'ইল্ম অন্বেষণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সক্ষম হন নি। কোনো একদিন তিনি এমন একটি পিঁপড়াকে দেখলেন, যে পিঁপড়াটি তার খাবার বহন করে নিয়ে যাচ্ছিল এবং খাবার নিয়ে দেয়ালের (উপর) দিকে আরোহণ করছিল। যখনই সে উপরের দিকে আরোহণ করছিল, তখনই সে পড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সে এই বাধা থেকে মুক্তি পাওয়া পর্যন্ত এবং দেয়ালে আরোহণ করা পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।
তারপর আল-কিসায়ী (রহঃ) বললেন, এই পিঁপড়াটি অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে গেল। তারপর তিনিও নাহুশাস্ত্রে ইমাম হওয়া পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে গেলেন"। হে শিক্ষার্থীরা! আর একারনেই আমাদের কঠোর পরিশ্রম করা এবং হতাশ না হওয়া উচিত। কেননা হতাশার অর্থ হলো: কল্যাণের দরজা বন্ধ করা। আর আমাদের নিজেদেরকে অশুভ মনে না করা উচিত। বরং আমাদের নিজেদেরকে কল্যাণকর এবং শুভ মনে করা উচিত।
৩. হিফয বা মুখস্থকরণ )الحفظ):
পড়াশুনার ব্যাপারে লেগে থাকা একজন শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক। আর সে যা শিক্ষা করে, তা তার অন্তরে সংরক্ষণ করা এবং তা তার কিতাবে সংরক্ষণ করা তার উপর আবশ্যক। কেননা মানুষ ভুলের লক্ষ্যবস্তু। অতএব, যখন মানুষ পড়াশুনার ব্যাপারে লেগে থাকবে না এবং যা শিখেছে তা বারবার চর্চা করবে না, তখন অবশ্যই এটি তার থেকে হারিয়ে যাবে এবং তা সে ভুলে যাবে। বলা হয়ে থাকে: 'ইল্ম হচ্ছে শিকারলব্ধ প্রাণী এবং তা লিখে রাখা হচ্ছে প্রাণীটির বন্দিকরণ। অতএব, তোমার শিকারলব্ধ প্রাণীগুলোকে নির্ভরযোগ্য রশিসমূহ দ্বারা বন্দি করো। কোনো একটি হরিণীকে তোমার বন্দি করে রাখা, তারপর তাকে পৃথিবীর মধ্যে ছেড়ে দেওয়া বোকামির অন্তর্ভুক্ত। এটা যেন তালাকপ্রাপ্তা মহিলার মত। যে সকল পদ্ধতি 'ইল্ম সংরক্ষণের ব্যাপারে উৎসাহিত করে, তার মধ্য থেকে একটি পদ্ধতি হলো, 'ইল্ম অনুযায়ী মানুষের সঠিক পথ পাওয়া। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَ الَّذِينَ اهْتَدَوْا زَادَهُمْ هُدًى وَ آتَاهُمْ تَقْوَاهُمْ
আর যারা সঠিক পথ অবলম্বন করে, তিনি তাদের সঠিকপথ প্রাপ্তি বৃদ্ধি করে দেন এবং তাদেরকে আল্লাহভীতি প্রদান করেন। সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৭। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন,
وَ يَزِيدُ اللَّهُ الَّذِينَ اهْتَدَوْا هُدًى
আর যারা সঠিক পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ (তাদের সঠিক পথপ্রাপ্তি) বৃদ্ধি করে দেন। সূরা মারইয়াম ১৯:৭৬।
অতএব, যখনই মানুষ তার 'ইল্ম অনুযায়ী আমল করে, তখনই আল্লাহ তার মুখস্ত শক্তি এবং “বুঝ” শক্তি বৃদ্ধি করে দেন।
৪. আলিমগণের সংস্পর্শে থাকা (ملازمة العلماء):
আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা একজন শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক। অতঃপর আলিমগণের সংস্পর্শে থাকা এবং তাদের কিতাবে তারা যা লিখেছেন তার সাহায্য নেওয়া একজন শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক। কেননা শুধুমাত্র (নিজে নিজে) পড়াশুনা এবং অধ্যয়নের উপর সীমাবদ্ধ থাকার কারণে একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন মনে করে। যা ঐ ছাত্রের বিপরীত, যে এমন কোনো একজন আলেমের নিকটে বসে, যিনি তার নিকটে (বিভিন্ন বিষয়ে) ব্যাখ্যা প্রদান করেন এবং সঠিক পথ সুস্পষ্ট করে দেন। আর আমি বলছি না, নিশ্চয় একজন ছাত্র শাইখদের নিকট থেকে 'ইল্ম শিক্ষা করা ছাড়া 'ইল্ম অর্জন করতে পারবে না। বরং অবশ্যই মানুষ (নিজে নিজে) পড়াশুনা এবং অধ্যয়নের মাধ্যমে 'ইল্ম অর্জন করতে পারবে। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রে যখন কোনো একজন ছাত্র (নিজে নিজে) দিনে এবং রাতে পরিপূর্ণরূপে ('ইল্ম অর্জনের কাজে) ঝুঁকে পড়ে এবং "বুঝ" অর্জন করে, তখন কখনো কখনো ছাত্রটি অধিক ভুল করে। একারণেই বলা হয়ে থাকে, "যদি কোনো ব্যক্তির দলীল হয় তার কিতাব, তাহলে তার ভুলের পরিমাণ সঠিকতার চেয়ে অধিকতর বেশি"।
কিন্তু এই কথাটি কোনো ভাবেই সঠিক নয়। বরং শাইখগণের নিকট থেকে 'ইল্ম অর্জন সর্বোৎকৃষ্ট। আর আমি প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে উপদেশ দিব যে, সে কোনো একটি বিষয়ে সকল শাইখ থেকে 'ইল্ম অর্জন করবে না। যেমন সে একের অধিক শাইখ থেকে ফিক্হ সংক্রান্ত বিষয়ে 'ইলম অর্জন করবে না। কেননা 'আলিমগণ কুরআন-সুন্নাহ থেকে দলীল গ্রহণের ক্ষেত্রে মতানৈক্য করেন এবং তাদের মতামতের ক্ষেত্রেও মতানৈক্য করেন।
সুতরাং তুমি তোমার জন্য এমন একজন 'আলিম নির্ধারণ করবে, যার নিকটে ফিক্হ, বাল'গাত ইত্যাদি বিষয়ে তুমি 'ইল্ম অর্জন করবে। অর্থাৎ তুমি একটি বিষয়ে একজন শাইখ থেকেই 'ইলম অর্জন করবে। আর যখন উক্ত শাইখের নিকটে একটি বিষয়ের চেয়ে অধিক বিষয়ে 'ইল্ম থাকবে, তখন তুমি তার সাথে লেগে থাকবে। কেননা যখন তুমি ফিক্হ শাস্ত্র সম্পর্কে একাধিক শাইখ থেকে 'ইল্ম অর্জন করবে, অথচ তারা তাদের মতামতের ক্ষেত্রে মতানৈক্য করেন; তখন তোমার (নিজের) মতামত কি হবে? অথচ তুমি ছাত্র? (তখন) তোমার মতামত হবে হতবুদ্ধিতা এবং সন্দেহ। কিন্তু যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে কোনো একজন 'আলিমের সাথে তুমি লেগে থাকবে, তখন এটি তোমাকে প্রশান্তি দিবে।