📘 খুশূ-খুযূ > 📄 গান-বাজনার সূক্ষ্ম একটি বিষয়

📄 গান-বাজনার সূক্ষ্ম একটি বিষয়


কোথায় একই কাব্য বার বার শোনা এবং সুর ও বাদ্যের তালে তালে উল্লসিত হওয়া, আর কোথায় আল্লাহর কুর আন পড়ে 'ঈমানের জোশে উদ্বেলিত হওয়া? হৃদয়ের অস্তিত্বই তো কুর'আন বোঝার জন্য। আর কুর'আনের অবতারণই হলো আঁধার কালো অন্তরে আলোর প্রজ্জ্বলন এবং খরা-শুষ্ক হৃদয় সঞ্জীবনী সুধা বর্ষণের জন্য। সুতরাং যখন কেউ মধুর সুরে সুললিত কণ্ঠে তিলাওয়াত করে...
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
طه
مَا أَنزَلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ لِتَشْقَى
إِلَّا تَذْكِرَةٌ لِمَن يَخْشَى
تَنزِيلًا مِّمَّنْ خَلَقَ الْأَرْضَ وَالسَّمَاوَاتِ الْعُلَى
الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى
لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَمَا تَحْتَ الثَّرَى
وَإِن تَجْهَرْ بِالْقَوْلِ فَإِنَّهُ يَعْلَمُ السِّرَّ وَأَخْفَى
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ্র নামে শুরু করছি। ত-হা। তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আমি তোমার প্রতি কুর'আন অবতীর্ণ করিনি; বরং তা আল্লাহভীরুদের জন্য সতর্কবাণী হিসেবে অবতীর্ণ করেছি-যিনি পৃথিবী ও সুউচ্চ আকাশ সৃষ্টি করেছেন, এই কুর'আন তাঁর নিকট হতে অবতীর্ণ হয়েছে। দয়াময় আল্লাহ্ 'আরশে সমুন্নত আছেন। যা আকাশসমূহে আছে, যা যমীনে আছে, যা এ দুয়ের মাঝে আছে আর যা ভূগর্ভে আছে-সব তাঁরই। যদি তুমি উচ্চকণ্ঠে কথা বল,-তাহলে জেনে রেখো-তিনি গোপন ও তদপেক্ষাও গোপন বিষয়ও জানেন।
এতো কেবল ওই ব্যক্তিই উপলব্ধি করতে পারে যার হৃদয় জাগ্রত। যার অন্তর স্বচ্ছ। যে প্রভুর ভালোবাসা উপলব্ধি করতে পারে, তার মিষ্টতা আস্বাদন করতে পারে। এমন ব্যক্তির হৃদয়ই কেবল কুর'আন তিলাওয়াতে তৃপ্ত হয়। চক্ষু শীতল হয়। অন্তর বিগলিত হয়। মন প্রশান্ত হয়। তার অবস্থা হলো এমন, যেন বহু প্রতীক্ষার পর প্রিয়তমের সাক্ষাৎ পেয়েছে। তীব্র তৃষ্ণার পর ঠান্ডা পানির প্রস্রবণ মিলেছে। এমন ভূমির ব্যাপারে তোমার কী ধারণা-যা শুষ্ক অনুর্বর; পানিশূন্যতায় যার মাটি ফেটে চৌচির। পানির দিকে সে জমি কেমন মুখাপেক্ষী?
অতঃপর যখন বর্ষা নামে, ভূমি তখন তার প্রাণ ফিরে পায়। ফলে সেখানে ঘাস ও ফসল উৎপন্ন হয়। সতেজ ও সজীবতায় চারদিক ভরে ওঠে। নয়নাভিরাম হয়ে ওঠে তার দৃশ্য। এই জমি হলো হৃদয় আর বৃষ্টি হলো তিলাওয়াত।
এই বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া উচিত যে, আল্লাহ্র দৃষ্টিতে তার ফেরেশতা, তার নাবী-রাসুল ও সালিহীনদের যে পদ-মর্যাদা এবং কুর'আন থেকে তাদের লব্ধ যে অভিজ্ঞতা, গান শ্রবণকারীদের পদ-মর্যাদা এবং অভিজ্ঞতা কোনোভাবেই তার সমকক্ষ হবে না। এর কারণ, গানে আসক্ত ব্যক্তি হলো নাফসের গোলাম। প্রবৃত্তির পূজারী। মন যা চায়-সে তা-ই করে। এই সামান্য পার্থক্যটুকুও যারা করতে পারে না। তারা যেন আল্লাহর নিকট এই প্রার্থনা করে-যাতে আল্লাহ তাদের সুস্থ রুচিবোধ দান করেন এবং তাদের নির্জীব অন্তরে প্রাণের সঞ্চার করেন। অজ্ঞতা ও পঙ্কিলতা বিদূরিত করে হিদায়াতের আলো প্রজ্জ্বলন করেন। আর এমন এক বিবেক দান করেন, যার দ্বারা সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করা যায়। নিশ্চয় আল্লাহ্ অতি নিকটে। তিনি বান্দার প্রার্থনা কবুল করেন।
গানের ক্ষতিকর অনেক দিক রয়েছে। তন্মধ্যে সূক্ষ্ম ও মারাত্মক একটা দিক আছে, যা কেবল সচেতন ব্যক্তিরাই বুঝতে পারে। যেমন : কোনো গানে যখন আল্লাহ্র প্রশংসা থাকে, তার একত্ববাদের (তাওহীদের) কথা থাকে, তখন কিছু মানুষ তা শোনা বৈধ মনে করে। সেসব আসরে যোগদান করে। ফলে হয়তো অন্তর সাময়িক তৃপ্ত হয়, ভেতরটা আন্দোলিত হয়; কিন্তু আসর ভাঙার পর ক্রমেই শুরু হয় অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা, হীনম্মন্যতা। ফলে বহু মানুষের মাঝেও নিজেকে মনে হয় বড্ড একা।
এই অনুভূতিটুকু কেবল সে-ই অনুভব করতে পারে, যার হৃদয়ে হিদায়াত ও রাহমাতের প্রাণ আছে। আল্লাহভীতির কিঞ্চিত নূর আছে। আর যার এতটুকুও বোধশক্তি নেই, সে তো মৃত। শত আঘাতেও তার কী আসে যায়! আল্লাহর শপথ! আজ এমন মৃত হৃদয়ের অভাব নেই। যদি তাকে এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তাহলে সে কিছুই বলতে পারে না। বলবে কী করে, সে তো আপাদমস্তক পাপের সাগরে নিমজ্জিত। অন্তরের সামান্য ব্যথাও সে অনুভব করে না! অন্তর জীবিত না মৃত-তাও সে জানে না! যেদিন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে, সেদিন সে বুঝবে, এতদিন সে কীসে বিভোর ছিল!
প্রিয় ভাই, কেন এই হঠাৎ খারাপলাগা? কেন এই হীনম্মন্যতা, দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা? আমি কারণগুলো বলছি, আপনি মনোযোগ দিয়ে শুনুন। আসলে গান-বাজনার মূলেই রয়েছে সমস্যা। যখন তাতে ইসলামী কথাবার্তা যোগ হয়, তখন শ্রোতা ভাবে-এটা বৈধ। অথচ এটা সত্য-মিথ্যা মিশ্রিত। প্রবৃত্তির লালসা দিয়ে ভরপুর। গানের একটা দিক প্রশংসিত হলেও, মূলত তা নাফস ও শাইতানের কর্ম দ্বারা রঞ্জিত, অপবিত্র, অশুদ্ধ। এতে বিবেকের যে অংশটা প্রভুর পক্ষে, তা মিশে যায় বিবেকের মন্দ অংশের সাথে। ফলে এক সময় মন্দ কাজটা বিবেকের যুক্তির কাছে ভালো মনে হয়। আর খারাপ হয়ে যায় নেকির কাজসমূহ।
এ ধরনের গান শোনা মানে স্বচ্ছ পানিকে ঘোলা পানির সাথে প্রবাহিত করা। অপবিত্র বস্তুকে পবিত্র বস্তুর ওপর প্রাধান্য দেওয়া। এই গান শোনাটাই বিশুদ্ধ আকীদা ও বিশুদ্ধ 'আমালের প্রতিবন্ধক। যতক্ষণ সে গান বাজনায় নিমজ্জিত থাকে, ক্ষতিকর দিকটা তার নিকট সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে না। এরপর যখন ঘোর ভাঙে, আনন্দ ফুরিয়ে যায় এবং নেশাগ্রস্ততা থেকে সে বেরিয়ে আসে, তার নিকট রয়ে যায় পাপের কর্দমাক্ত পঙ্কিলতা, রয়ে যায় শাইতানের খারাপ প্রভাব। এগুলোর কারণেই নতুন করে শুরু হয় অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা।
এর উপমা হিসেবে এমন ব্যক্তির কথা চিন্তা করুন, যে তার প্রিয়তমার দর্শনে নিমগ্ন এবং পূর্ণ মনোযোগ কেবল তার প্রতিই নিবিষ্ট, কিংবা এমন কোনো ব্যক্তি যে আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনায় কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এরূপ ব্যক্তির ওপর প্রেম কিংবা হতবিহ্বলতা এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে যে, তার অনুভূতিশক্তি লোপ পায়। এ অবস্থায় যদি তাকে ডাকা হয়, আঘাত করা হয় অথবা কষ্টদায়ক কিছু এসে তার শরীরে পড়েও, তবুও সে তা টের পায় না, উপলব্ধিতে আনতে পারে না; কিন্তু যখনই সেই অবস্থার রেশ কেটে যায়, অনুভূতিশক্তি ফিরে আসে, তখন তার আঘাত অনুভূত হওয়া শুরু হয়।
সেজন্য এ ঘোর কেটে যাওয়ার সাথে সাথে বিশ্বাসীগণের মধ্যে যারা সচেতন এবং সফলতাকামী, তারা তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর এই রোগের কারণগুলো খুঁজে খুঁজে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করে। এটা খুব সহজ নয়। তবে যারা আত্মশুদ্ধির প্রতি আগ্রহী তারা নিজের আত্মিক রোগ ও তার কারণসমূহ জেনে সে অনুপাতে চিকিৎসা নিতে পারে, তাদের জন্য এটা তেমন কঠিনও নয়।
কোনো সন্দেহ নেই, গান-বাজনার মধ্যে তাওহীদ, হামদ ও ইসলামবিষয়ক কথা থাকলে তাতে একধরনের তৃপ্তি লাভ হয়; কিন্তু সেটা হলো নাপাক পাত্রে মধু খাওয়ার মতো।

টিকাঃ
৫০ সূরা ত-হা, ২০: ১-৭

📘 খুশূ-খুযূ > 📄 অন্তরের প্রকার

📄 অন্তরের প্রকার


যাদের হৃদয় পবিত্র, 'ঈমানের আলোয় উদ্ভাসিত, তারা নোংরা পাত্রে পান করা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। যাতে অপবিত্রতা তাকে স্পর্শ না করে। সে যখনই পান করে, পবিত্র পাত্রে পান করে। পাত্র না পেলে অপেক্ষা করে।
যারা গানের মাঝে ইসলাম খোঁজে, তাদের অবস্থা এমন যে, তারা যেকোনো পাত্রেই পান করে। পিপাসা নিবারণ করে। হোক সেটা মৃতপ্রাণীর হাড্ডি, কুকুর, বা শুয়োরের চামড়া থেকে তৈরি কোনো পাত্র, কিংবা মদের পেয়ালা, যাতে মদ লেগে আছে। বস্তুত তারা ওই সকল কাকের মতো, যারা স্বচ্ছ পানি পান করে, আবার নর্দমায়ও মুখ দেয়। এতে তার কিছুই আসে যায় না। পান করার দ্বারা তার তৃষ্ণা নিবারণ হয় ঠিকই, কিন্তু মুখে দুর্গন্ধ লেগে থাকে।
কিছু মানুষ আছে যারা মিথ্যা, বানোয়াট ও অর্থহীন সব কাব্য ও গান শুনে আত্মতৃপ্তি লাভ করে। তারা মূলত নোংরা পাত্রে নাপাক পানি পান করে। প্রবৃত্তির দাস এরা। ভালো-মন্দ পার্থক্য করার অনুভূতিটুকুও তাদের নেই। অন্যদিকে, কিছু মানুষ আছে যারা নেককার। তারা শুধু কুর'আন পড়ে। কুর'আন শোনে। তারা পবিত্র পাত্রে অমিয় সুধা পানকারী।
পাত্র এবং পানীয় উভয়টি তিন প্রকারের :
১. পবিত্র
২. অপবিত্র
৩. মিশ্রিত
অন্তর বা হৃদয় তিন প্রকার।
এক. সুস্থ ও পবিত্র। এদের পাত্র পবিত্র, পানীয়ও পবিত্র।
দুই. রুগ্ন ও অসুস্থ। এদের পাত্র নোংরা, পানীয়ও নোংরা।
তিন. পাক-নাপাক মিশ্রিত। এমন অন্তরে বিশ্বাস এবং মুনাফিকী উভয়টি বিদ্যমান থাকে। ফলে এরা পবিত্র এবং অপবিত্র উভয় পাত্র থেকেই পান করে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা প্রত্যেকের জন্য উপযুক্ত প্রতিদান রেখেছেন।
যারা ফকীহ, বিদগ্ধ 'আলিম, তারা সকল বিষয়ে গভীর নজর দেন। চিন্তা করেন এবং এর পরিণতি ও পরিণাম নিয়ে গবেষণা করেন। যদি তারা বুঝতে পারেন যে, কোনোকিছু মানুষকে হারাম কাজে ধাবিত করে, তখন সেটাকে তারা হারাম বলে সাব্যস্ত করেন। যেমন নারীর সাথে অবাধ মেলামেশা করা, ব্যভিচার করা হারাম। তদ্রুপ বেগানা নারীর দিকে তাকানো, তার সাথে আলাপ করা, নির্জনে মিলিত হওয়াও হারাম।
মোটকথা, শারী'আতে নিষিদ্ধ কাজ দু'প্রকার।
এক. মূল কাজটাই হারাম।
দুই. যা কিছু হারামের দিকে টেনে নিয়ে যায়, সেটাও হারাম। অনেকেই হারামটা দেখে। বোঝে। হারাম থেকে বিরত থাকতে চেষ্টা করে; কিন্তু হারামের সহায়ক কাজও যে হারাম, সেদিকে অনেকেই ভ্রুক্ষেপ করে না। আল্লাহ্ আমাদের হিফাযত করুন। আমীন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00