📄 সালাতে মনোযোগের তিনটি ধাপ
সালাতে মনোযোগের তিনটি ধাপ রয়েছে:
এক. প্রথম ধাপে বান্দা তার অন্তরকে একমাত্র আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট করে। ফলে এটি তার অন্তরকে নিরাপদ রাখে। নাফসের অসুস্থতা, শাইতানের প্ররোচনা এবং সালাতের জন্য ক্ষতিকর ও সাওয়াব বিনষ্টকারী সকল কাজ ও চিন্তা থেকে অন্তরকে রক্ষা করে।
দুই. এই ধাপে পৌঁছলে বান্দা আল্লাহর 'ইবাদাতে এমনভাবে মগ্ন হয়, যেন সালাতে সে আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছে।
তিন. তৃতীয় ধাপে পৌঁছা যায় যখন বান্দা কুর'আন তিলাওয়াতের সময় এর অর্থের প্রতি মনোযোগ দেয় এবং এর মর্ম উপলব্ধি করতে পারে; যখন সে 'ইবাদাতের বিভিন্ন দিকগুলোর রহস্য ভেদ করে, বিনয় এবং প্রশান্তির সাথে সেগুলো আদায় করে।
যদি কেউ এ তিনটি ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করে, তার সালাত যথাযথভাবে আদায় হয়েছে বলে বিবেচিত হবে। এর বিনিময়ে তখন সে আল্লাহ্র নিকট থেকেও পূর্ণ মনোযোগ লাভ করবে।
📄 সালাতের প্রতিটি কর্মে মনোযোগ বাড়ানোর উপায়
আল্লাহ্র সম্মুখে বান্দার বিনীতভাবে দণ্ডায়মান অবস্থা তখনই ফলপ্রসু হয়, যখন তার পূর্ণ মনোযোগ কেবল আল্লাহ্ দিকে নিবদ্ধ থাকে এবং সে ডানে বামে তাকানো থেকে নিজেকে বিরত রাখে।
■ যখন বান্দা সালাতে দাঁড়াবে, তখন ভাববে, সে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়েছে। তার পূর্ণ মনোযোগ আল্লাহ্ দিকে নিবিষ্ট থাকবে। সে স্মরণ করবে মহান রবের মহানুভবতা ও বৈশিষ্ট্যের কথা-যা তাকে ডানে বামে তাকানো থেকে বিরত রাখবে।
■ যখন 'তাকবীর' বলবে, তার মহত্ত্ব ও মাহাত্ম্য, সম্মান ও 'ইযযাতের কথা স্মরণ করবে। ভরাট কণ্ঠে 'আল্লাহু আকবার' বলে সালাত শুরু করবে।
■ সানা পড়ার সময় তার তাসবীহ ও হামদের প্রতি মনোযোগী হবে, এবং ঘোষণা করবে-মানবীয় গুণাবলি, যাবতীয় দোষ-ত্রুটি থেকে তার সত্তা পবিত্র। তিনি তার সকল গুণে পূর্ণাঙ্গ।
■ যখন 'আ'উযুবিল্লাহ...' পড়বে, ভাববে আল্লাহর শক্তি ও শক্তিমত্তার কথা। তার নিরাপদ আশ্রয়ের কথা। শত্রু থেকে বান্দাকে রক্ষা করা এবং নিরাপত্তাদানের কথা।
■ যখন তিলাওয়াত করবে তখন সে যা তিলাওয়াত করছে তার অর্থের প্রতি মনোনিবেশ করবে এবং কালামুল্লাহ'র গভীরে এমনভাবে পরিভ্রমণ করবে যেন সে কালামুল্লাহর মধ্যে আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছে। কোনো এক ইমাম বলেছেন, 'কালামুল্লাহর মাঝে আল্লাহ্ তার বান্দার কাছে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন।'
সালাতে খুশু-খুযুর ব্যাপারে, তিলাওয়াতের অর্থ ও মর্ম অনুধাবনে মানুষের স্তর ভিন্ন ভিন্ন। কেউ আছে কালামুল্লাহর অর্থ ও মর্ম পরিপূর্ণ বুঝে তার স্বাদ আস্বাদন করতে পারে; এ ব্যক্তির উদাহরণ দৃষ্টিসম্পন্ন পূর্ণ সুস্থ মানুষের মতো। কেউ আছে কালামুল্লাহর অর্থ ও মর্ম কিছু বোঝে, কিছু বোঝে না; এ ব্যক্তির উদাহরণ একচোখবিশিষ্ট মানুষের মতো। আবার কেউ মোটেও বুঝতে পারে না; তার উদাহরণ অন্ধ ব্যক্তির মতো।
সুতরাং কির'আতপাঠের সময় উচিত হলো-আল্লাহর সত্তা ও সিফাত, কথা ও কর্ম, আদেশ ও নিষেধ, ও 'য়াদা ও ও 'য়াঈদের (প্রতিশ্রুতি প্রদান ও ভীতিপ্রদর্শন) প্রতি খেয়াল রাখা, গভীর মনোযোগী হওয়া।
■ যখন রুকু' করবে, তখন প্রতিপালকের শান-শওকত, 'ইযযাত ও 'আজমাত (বড়ত্ব), মহিমা ও পূর্ণতার কথা মনে করবে। আর পড়বে 'সুবহানা রব্বিয়াল আযীম'।
■ অতঃপর যখন রুকু' থেকে সোজা হয়ে স্থিরতার সাথে দাঁড়াবে। তার হামদ, সানা ও তামজীদ করবে। যবানের সাথে হৃদয়কেও যুক্ত রাখবে এবং তার বন্দেগী, প্রতিদান ও সাজা দানের একক ক্ষমতার কথা স্মরণ করবে।
■ যখন বান্দা সিজদায় লুটিয়ে পড়বে, তখন সে কেবল আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার নৈকট্যলাভে মনোযোগী হবে। নিজের শক্তিহীনতা, দুর্বলতা, অক্ষমতা ও অপারগতা তার সামনে ফুটিয়ে তুলবে। দাসের মতো নিজের অহমিকা ও অস্তিত্ব মিটিয়ে দেবে মহান রবের সামনে।
■ যখন সে সিজদা থেকে মাথা তুলে আসামীর মতো হাঁটু গেঁড়ে বসবে, তখন সে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার অমুখাপেক্ষিতা ও উদারতার কাছে নিজের মুখাপেক্ষিতা ও প্রয়োজনের কথা তুলে ধরবে। একাগ্রচিত্তে বিনয়াবনত হয়ে রাহমাত, মাগফিরাত, হিদায়াত, সুস্থতা ও রিযক চাইবে।
■ এরপর বৈঠক। এটি সালাতের সর্বশেষ অবস্থা ও 'ইবাদাত। যার দৃষ্টান্ত হলো হজের বিদায়ী তাওয়াফের মতো। সে তখন ভাবতে শুরু করে—তার সালাত পূর্ণাঙ্গ হওয়ার পথে এবং পূর্ণাঙ্গ হলেই তার এই শান্তি ও রাহমাতবেষ্টিত অবস্থা থেকে বের হয়ে তাকে পার্থিব বিভিন্ন ব্যস্ততা, অস্থিরতা ও যন্ত্রণায় ফিরে যেতে হবে, যে অবস্থায় সে সালাতে আসার পূর্ববর্তী সময়ে ছিল। সালাতের বেষ্টনী থেকে বেরিয়ে যেতে তার খারাপ লাগবে। একটা মৃদু যন্ত্রণা অনুভূত হবে তার হৃদয়ে। সে ভাববে, হায়, যদি কিয়ামাত পর্যন্ত সময়টা সালাতেই কাটিয়ে দেওয়া যেত!
■ সালাত আদায়কারী যখন সালাত শেষ করে, তখন সে আল্লাহর সাথে কথা বলা এবং সকল প্রকার সুখ ও সৌভাগ্যে ডুবে থাকা থেকে বেরিয়ে আসে। অভিশপ্ত দুনিয়ার দিকে ধাবিত হয়। এটা কেবল ওই ব্যক্তি-ই অনুধাবন করতে পারে, যার হৃদয় জাগ্রত। রব্বে কারীমের স্মরণ, মুহাব্বাত ও দয়ার বর্ষণে সিক্ত। যে সৃষ্টির পিছনে ছোটা, তাদের সাথে ব্যস্ত থাকা এবং সময় অপচয় করার কষ্ট ও দুর্ভোগ সম্পর্কে সে সম্পূর্ণ অবগত। আর যার বক্ষ সংকীর্ণ, ওই ব্যক্তি সালাতের স্বাদ এবং সালাত থেকে বের হয়ে আসার মর্মব্যথা কখনো উপলব্ধি করতে পারবে না। তার অন্তর অন্ধকার। হৃদয় নির্জীব। সে অন্যা পথে অগ্রসরমান। পাপাচারে নিমজ্জিত। পূণ্য তার কাছে বিবর্জিত। তার চিত্ত ও চিন্তা বহুমুখী।
📄 ‘ইসলাম’ শব্দ নিয়ে কিছু কথা
বান্দার প্রতি আল্লাহ্র দুই ধরনের নির্দেশ রয়েছে :
এক. আকীদা (বিশ্বাস)। অর্থাৎ, আমাদের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশে, গ্রহে কিংবা ভিনগ্রহে যখন যা-কিছু ঘটে, সব আল্লাহ্ তত্ত্বাবধানেই হয়। তার শক্তিতেই হয়। দুনিয়ার সব নিয়ম ও শৃংখলায় রয়েছে তাঁর বিশেষ প্রজ্ঞা ও কর্তৃত্ব। বুঝে আসুক বা না আসুক, এসব বিনাবাক্যে বিশ্বাস করা।
দুই. 'ইবাদাত। যত প্রকার 'ইবাদাত বান্দার ওপর আবশ্যক রয়েছে, তা এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত।
এই উভয় আদেশের দাবি হলো, নিজের সত্তাকে আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়া। 'তাসলীম' (আত্মসমর্পণ) করা। 'ইসলাম' শব্দের উৎপত্তি মূলত এই 'তাসলীম' থেকেই। যখন বান্দা বিশ্বাস ও 'ইবাদাতের কাছে নিজেকে অর্পণ করে, এর জন্য নিজের সময় ও সম্পদ ব্যয় করে, নাফস ও প্রবৃত্তিকে দমন করে এবং সমস্ত পাপ থেকে নিজেকে বিরত রাখে, তাকে বলা হয় মুসলিম। আত্মসমর্পণকারী।
📄 খুশু-খুযুর উপকারিতা
যখন সালাত আদায়কারীর অন্তর আল্লাহর স্মরণে, তিলাওয়াতে, যিক্রে ও ভালোবাসায় তৃপ্ত হয়, সে আল্লাহ্র 'ইবাদাত করাকে উপভোগ করে। তাঁর নৈকট্যলাভে ধন্য হয়। চক্ষু শীতল হয়। এগুলো ছাড়াও সে আরও দুটি নি'য়ামত লাভ করে:
এক. 'ঈমানের নিরাপত্তা। অর্থাৎ, জাহান্নাম থেকে মুক্তি।
দুই. আল্লাহ্র অনুগ্রহ দ্বারা সৌভাগ্যশালী হওয়া। অর্থাৎ, জান্নাত পাওয়া।
আর মু'মিন বান্দার চূড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এ দুটিই। এই জীবন। এই সফলতা। এই সৌভাগ্য। পক্ষান্তরে, যখন কোনো ব্যক্তির হৃদয় 'নাফসে 'আম্মারা'র (মন্দ কর্মপ্রবণ অন্তর) আঘাতে দুর্বল হয়ে পড়ে, প্রবৃত্তি এবং বিতাড়িত শাইতান দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন তার 'ইবাদাত প্রাণহীন হয়ে পড়ে।
আল্লাহ্র অসীম করুণা যে, তিনি বান্দার জন্য সালাতকে ফরয করেছেন। তাতে যুক্ত করে দিয়েছেন আরও বহু 'ইবাদাত। যাতে বান্দার পাপ মোচন হয়। আত্মা পবিত্র হয়। 'ঈমান বৃদ্ধি পায়। সৎকাজে উদ্বুদ্ধ হয় এবং তিনি প্রত্যেক দুই সালাতের মাঝে রেখেছেন সময়ের বিস্তর ব্যবধান। এটি তার বিশেষ দয়া। যাতে অপবিত্র হৃদয়-মন বার বার ধৌত করা যায়। অবাধ্য নাফসকে 'ইবাদাতের বন্ধনে বেঁধে রাখা যায়। মধ্যবর্তী সময়ে যেসব পাপ-পঙ্কিলতা বান্দার হৃদয়ে লেগে যায়, তা বিদূরিত করা যায়।
তিনি নাফসের পরিশোধনের জন্য সালাতে অনেক রকমের 'ইবাদাত রেখে দিয়েছেন। প্রতিটি অঙ্গের পৃথক পৃথক 'ইবাদাত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এসব তখনই পরিপক্ক ও গ্রহণযোগ্য হবে, যখন খুশু-খুযু ও একাগ্রতার সাথে সালাত আদায় করা হবে। এজন্যই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা 'ইবাদাতের ফল ও উপকারিতা রেখেছেন খুশু-খুযুর মাঝে। আর খুশু-খুযুকে করেছেন সাওয়াব ও নৈকট্যলাভের মাধ্যম। খুশু-খুযূর সাথে বান্দা যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র 'আমাল আল্লাহর কাছে পেশ করছে, কিয়ামাতের দিন তিনি তার সামনে তা বৃহৎ আকারে তুলে ধরবেন।