📄 দ্বিতীয় সিজদার মাহাত্ম্য
অতঃপর বান্দা তাকবীর বলে দ্বিতীয় সিজদায় যাবে। যেভাবে খুশু-খুযূর সাথে প্রথম সিজদা করেছিল, দ্বিতীয় সিজদাও ঠিক সেভাবে আদায় করবে। রুকূ'র মতো এক সিজদায় রাক'আত পূর্ণ হয় না। দুটি সিজদা আদায় করতে হয়। এটিই সিজদার বৈশিষ্ট্য, শ্রেষ্ঠত্ব। মনে রাখা জরুরী যে, সালাতের অন্যান্য রুকনের মধ্যে সিজদা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এমন-যেন এটাই সালাতের মূল, বাকি সব হলো তার ভূমিকা।
সিজদা বান্দাকে আল্লাহ্র অধিক নিকটবর্তী হওয়ার সুযোগ প্রদান করে। সালাতে সিজদার মর্যাদা হলো হজে তাওয়াফের মর্যাদার মতো। তাওয়াফে যিয়ারত দ্বারা হাজী যেমন আল্লাহ্র নৈকট্য লাভ করে, অনুরূপ সালাত আদায়কারীও সিজদার মাধ্যমে আল্লাহ্র নৈকট্য লাভ করে। তাওয়াফ আর সিজদা প্রায় একই।
একবার কেউ 'আব্দুল্লাহ্ ইবনু 'উমার রাযিয়াল্লাহু 'আনহু-কে তার কন্যার জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিলেন, তখন তিনি তাওয়াফে ছিলেন। তাওয়াফ শেষে বললেন, 'তুমি আমাকে দুনিয়ার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছ, অথচ আমি তাওয়াফে আমার আল্লাহকে দেখছিলাম।'
এই জন্য সিজদাকে রুকু'র পরে রাখা হয়েছে। যেন বান্দা শ্রেষ্ঠ রুকন থেকে শ্রেষ্ঠতর রুকনের দিকে ধাবিত হতে পারে।
বান্দা দ্বিতীয় সিজদা করবে। প্রথম সিজদায় যা যা করেছে, দ্বিতীয় সিজদায় তার পুনরাবৃত্তি করবে। দ্বিতীয় সিজদা হলো আত্মার খোরাক। সুতরাং দ্বিতীয়বার সিজদা করাটা হলো খাদ্য আর পানির মতো। এক লোকমার পর আরেক লোকমা খেলে যেমন মানুষ তৃপ্ত হয়, এক ঢোকের পর আরেক ঢোক পান করলে যেমন তৃষ্ণা মেটে, তেমনই সালাত আদায়কারী এক সিজদার পর আরেক সিজদার দ্বারা আত্মতৃপ্তি লাভ করে।
যদি কোনো ক্ষুধার্তকে এক লোকমা খেতে দেওয়ার পর তার সামনে থেকে খাদ্যপাত্র সরিয়ে ফেলা হয়, তখন সে পরবর্তী লোকমার জন্য কেমন করবে? এতে কি তার ক্ষুধা মিটবে না বাড়বে? এ কারণে কোনো এক ইমাম বলেছিলেন, 'যে ব্যক্তি সালাত আদায় করে কিন্তু অন্তরে প্রশান্তি পায় না, তার দৃষ্টান্ত হলো ওই ক্ষুধার্ত ব্যক্তির মতো যাকে খাবার দেওয়া হয়েছে আর সে কেবল এক লোকমাই খেতে পেরেছে।' এমন ব্যক্তি তো পরবর্তী লোকমার জন্য অস্থির ও মরিয়া হয়ে উঠবেই।
বলা যায়, এটা প্রথম সিজদার শুকরিয়াস্বরূপ। অধিক কল্যাণ ও 'ঈমানিয়্যাত অর্জনের উপায়। এতে অন্তর আলোকিত হয়। প্রাণবন্ত হয়। হৃদয় প্রশান্ত হয়। অন্তরের পঙ্কিলতা, সংকীর্ণতা বিদূরিত হয়। অনেকটা কাপড় ধোয়ার মতো। একবার ধোয়ার পর আরেকবার ধোয়ার দ্বারা যেমন অধিক পরিষ্কার হয়, তেমন দ্বিতীয় সিজদার বেলাতেও। একবার সিজদা দেওয়ার পর দ্বিতীয়বারে অন্তর আরও প্রশান্ত হয়। আরও বিগলিত হয়।
এটি আল্লাহ্র বিশেষ কৌশল-যা সালাত আদায়কারীর অন্তর উজ্জ্বল করে তোলে। তাঁর রাহমাত ও লুতফের (গূঢ় রহস্য) দিকে ধাবিত করে। এর চেয়ে বেশি আমরা তাঁর হিকমাত্র কী-ই বা ব্যাখ্যা দিতে পারি-যা আমাদের জ্ঞান-পরিধির বাইরে?
টিকাঃ
৩৩ তাবাকাতুল কুবরা, ৪/১৬৭
📄 ‘তাশাহহুদ পাঠ’ একটি ‘ইবাদাত
যখন বান্দা সালাত প্রায় শেষ করে ফেলবে, তার সব রুকন আদায় হয়ে যাবে, তখন সে প্রভুর সামনে আদবের সাথে বসবে। তার প্রশংসা করবে। তাঁর এমনসব প্রশংসা করবে-যার জন্য একমাত্র তিনিই উপযুক্ত। অতএব, এ সময় বান্দার জন্য তাশাহহুদ পড়াই উত্তম। কেননা, তাতে প্রশংসা আছে। সালামও আছে। যে প্রশংসা ও সালামের একমাত্র উপযোগী সত্তা তিনি। সেই তাশাহহুদ 'আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস'উদ রা. বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, দুই রাক'আত সালাত আদায়ের পর বসে যা পাঠ করতে হবে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের তা শিক্ষা দিয়েছেন-
📄 ‘আত্তাহিয়্যাতু’ (التحيات) অর্থ সম্ভাষণ
التَّحِيَّاتُ لِلَّهِ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ ، السَّلامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ ، السَّلامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللهِ الصَّالِحِينَ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
সমস্ত সালাম, অভিবাদন, সালাত, দু'আ এবং পবিত্রতা মহান আল্লাহর জন্য। হে নাবী, আপনার ওপর সালাম, আল্লাহর রাহমাত ও কল্যাণ বর্ষিত হোক। আমাদের ও আল্লাহর সকল নেক বান্দার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।
অভিবাদন।
দুনিয়ার নিয়ম হলো-কথা ও কর্ম দ্বারা, বিনয় ও নম্রতার সাথে বিভিন্নভাবে রাজা-বাদশাহদের প্রতি সালাম পেশ করা। অভিবাদন জানানো। কখনো স্তুতিবাক্য উপস্থাপন করে, কখনো রাজ্য ও রাজত্বের স্থায়িত্ব কামনা করে।
তাদের কাউকে শুধু স্তুতিবাক্য ও কবিতা আবৃতির মাধ্যমে অভিবাদন জানানো হয়। আবার কাউকে জানানো হয় কেবল সিজদা করে এবং রাজা ও রাজ্যের স্থায়িত্ব কামনার মাধ্যমে।
আর কোনো রাজা আছে এমন, যাকে অভিবাদনের জন্য যত ধরন ও প্রচলন থাকতে পারে-তার সবই তার সমীপে উপস্থাপন করতে হয়। সিজদা করা, গীত গাওয়া, রাজা ও রাজ্যের অমরত্ব চাওয়া ইত্যাদি। সুতরাং الحِيَّاتُ 'আত্তাহিয়্যাতু' মানে হলো রাজার জন্য, রাজ্য ও রাজত্বের জন্য কল্যাণ কামনা করে অভিবাদন জানানো।
'আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই হলেন প্রকৃত বাদশাহ। তিনি অমর। তিনি চিরঞ্জীব। তাঁর রাজত্বও চিরন্তন এবং চিরস্থায়ী। অতএব, সিজদা, প্রশংসা ও স্থায়িত্ব কামনাসহ অভিবাদন জানানোর যত মাধ্যম হতে পারে, তাঁর সব কিছুর উপযুক্ত একমাত্র সত্তা তিনিই।
التَّحِيَّاتُ এর শুরুতে আলিফ-লাম যুক্ত করা, এবং শব্দটিতে বহুবচন ব্যবহৃত হয়েছে ব্যাপকতা বোঝানোর জন্য। অর্থাৎ, অভিবাদনের যাবতীয় প্রকার শুধু আল্লাহর জন্য।
التَّحِيَّاتُ এর আদলে। তার প্রকৃত রূপ ছিল تحية। অতঃপর উচ্চারণ সহজীকরণে তাতে 'আরবী ব্যাকরণ তথা সরফী কায়দা প্রয়োগ করা হয়েছে। ফলে تَحِيَّةٌ এর বহুবচন হলো تَحِيَّاتُ। এই تَحِيَّاتُ/التَّحِيَّاتُ মূল ধাতু বা উৎপত্তিস্থল হলো حياة অর্থ: জীবন। প্রাণ। সুতরাং التَّحِيَّاتُ। 'আত্তাহিয়্যাতু' দ্বারা উদ্দেশ্য হবে 'কারও জন্য অমরত্ব কামনা করে অভিবাদন জানানো।' যেমনটা সচরাচর বাদশাহদের ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে: আপনি দীর্ঘজীবী হোন, হাজার বছর বেঁচে থাকুন ইত্যাদি। আবার কেউ বলে অমুক রাজা জিন্দাবাদ... এসবই কিন্তু التَّحِيَّاتُ। 'আত্তাহিয়্যাতু'।
সুতরাং হায়াত ও রাজত্বের অমরত্ব কামনায় যত প্রকারের অভিবাদন হতে পারে, সবই প্রয়োগ হবে কেবল সেই সত্তার জন্য, যিনি চিরঞ্জীব। কখনোই যার মৃত্যু আসবে না। যিনি রক্ষণাবেক্ষণকারী। কখনোই তন্দ্রা ও নিদ্রা যাকে স্পর্শ করে না। তিনি ছাড়া আর যা কিছু আছে, সব লয় ও ক্ষয়প্রাপ্ত। ধ্বংস অনিবার্য। স্থায়ী শুধু তিনি আর তাঁর রাজত্ব।
'আত্তাহিয়্যাতু'র (التَحِيَّاتُ) পরের শব্দ হলো 'আসসলাওয়াতু' (الحلوات) অর্থ : 'ইবাদাত, আরাধনা। শব্দটি 'আত্তাহিয়্যাতু'-এর সাথে আত্বফ বা মিলিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ্ জন্য আত্তাহিয়্যাতু যেমন আবশ্যক তেমনি 'আসসালাওয়াত' ও এবং শব্দটিকে আলিফ-লামসহ বহুবচনে উল্লেখ করা হয়েছে। যাতে করে সকল প্রকার সালাত, 'ইবাদাতে শামিল হয়ে যায়। সুতরাং যাবতীয় ইবাদাত কেবল তার জন্য। অন্য কারও জন্য নয়। 'আত্তাহিয়্যাতু' হলো তাঁর রাজত্বের কারণে। 'আসসলাওয়াতু' হলো তার উপাসনা হিসেবে। 'আত্তাহিয়্যাতু' এবং 'আসসলাওয়াতু'-এর একমাত্র উপযুক্ত তিনিই।
📄 আত্তায়্যিবাত
'আত্তাহিয়্যাত' এবং 'আসসলাওয়াত'-এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে আরও এক শব্দ। সেটি হলো 'আত্তয়্যিবাত' (الطَّيِّبَاتُ)। অর্থ: পবিত্র, উত্তম। ব্যাপকতা বোঝানোর জন্য এখানেও আলিফ-লাম ও বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। 'আওয়্যিবাতু'-এর দুটি দিক রয়েছে। এক, গুণগত পবিত্রতা বোঝায়। দুই, সত্তাগত পবিত্রতা বোঝায়।
সুতরাং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা পবিত্র। তার কথাসমূহ পবিত্র। তার সকল কর্ম পবিত্র। তার থেকে যা প্রকাশ পায় তা পবিত্র। তার দিকে যা সম্পৃক্ত করা হয় তাও পবিত্র। যেমন: বাইতুহু (তার ঘর), 'আবদুহু (তার বান্দা), রুহুহু (তার রূহ), নাকতুহ (তার উটনী), জান্নাতুহু (তার জান্নাত) এসব কিছু পবিত্র। পবিত্র 'আমালই তার কাছে গৃহীত হয়। সুতরাং তার সিফাত, কথা, কর্ম ও সম্পৃক্ততা পবিত্র।
এই 'আত্তয়্যিবাত'-এর মাঝে রয়েছে তার তাসবীহ, হামদ, তাকবীর, বড়ত্ব-মহত্ত্ব, নি'য়ামাত ও গুণাবলির ওপর যত বাক্য হতে পারে সব এবং এমন সব কালাম, যাতে রয়েছে তাওহীদ ও একত্ববাদের সাক্ষ্য। যেমন :
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ
হে আল্লাহ, আপনি পাক-পবিত্র, আপনার জন্যই সকল প্রশংসা, আপনার নাম পবিত্র এবং বরকতময়, আপনার গৌরব অতি উচ্চ, আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
سُبْحَانَ اللَّهِ ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ
আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। তিনি ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেই। তিনি মহান।
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ ، سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ
আমরা আল্লাহর প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করছি, মহান আল্লাহ যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে অতি পবিত্র।
এমন আরও অনেক বাক্য রয়েছে। মোটকথা, তিনি এক পবিত্র সত্তা। তিনি বান্দাদের পবিত্র উপাস্য। তাদের প্রতিপালক। জান্নাতে তিনি তাদের প্রতিবেশী।