📘 খুশূ-খুযূ > 📄 আমীন ও রাফ‘উল ইয়াদাইন

📄 আমীন ও রাফ‘উল ইয়াদাইন


বান্দা সূরা ফাতিহা শেষে 'আমীন' বলবে দু'আ কবুল হওয়ার আশা ও আস্থা নিয়ে, এবং আমীন জোরে পড়তে হবে। কেননা, সালাতে মু'মিনের জোরে আমীন বলা শুনে ইয়াহুদীদের গাত্রদাহ শুরু হয়ে যেত। তারা হিংসায় ফেটে পড়ত।
রুকু'তে যাওয়ার সময়ে দুই হাত উঠাবে। অর্থাৎ, রাফ'উল ইয়াদাইন করবে। এতে আল্লাহ্র প্রতি সম্মান প্রদর্শন হয়। এটি হাতের বিশেষ 'ইবাদাত। যেমন অন্যসব অঙ্গেরও বিশেষ বিশেষ 'ইবাদাত রয়েছে। এছাড়া এটি রাসূলের সুন্নাত, সালাতের সৌন্দর্য। নিদর্শন ও মর্যাদা।
প্রত্যেক ওঠা-বসায়, এক রুকন থেকে আরেক রুকনে যাওয়ার সময় 'আল্লাহু আকবার' বলবে। আল্লাহ্র বড়ত্বের ঘোষণা দিবে। কেননা, সালাতে তাকবীর হলো হজে তালবিয়া পাঠের মতোই। হাজীরা যেমন এক ঘাঁটি থেকে অন্য ঘাঁটি, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার সময় তালবিয়া (লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারীকা লাকা লাব্বাইক...) পড়ে। এটা হজের নিদর্শন। তদ্রুপ সালাতের প্রত্যেক অবস্থান পরিবর্তনে তাকবীর বলবে। এটা সালাতের তালবিয়া এবং নিদর্শন।

টিকাঃ
১৫ আদাবুল মুফরাদ, ৯৯৭; ইবনু মাজাহ, ৮৫৬
১৬ সালাতে উচ্চসুরে আমীন বলা, রাফ'উল ইয়াদাইন করা, এসব সুন্নাত কিংবা মুস্তাহাব পর্যায়ের আমল। ইমামদের মাঝে এ নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজ নিজ মতের পক্ষে দলীল-প্রমাণ। অতএব, এসব বিষয় নিয়ে উম্মাহর মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

📘 খুশূ-খুযূ > 📄 রুকু’ একটি ‘ইবাদাত

📄 রুকু’ একটি ‘ইবাদাত


অতঃপর রুকু' করার দ্বারা আল্লাহ্র প্রতি সম্মান ও বিনয় প্রদর্শন করবে। তার প্রতিপত্তির কাছে নিজের অসহায়ত্ব, তার 'ইযযাতের কাছে নিজের তুচ্ছতা, নগন্যতা প্রকাশ করবে। রুকু'তে মহান প্রভুর প্রশংসা করা একজন দাসের জন্য আবশ্যক। কারণ, দাসের বৈশিষ্ট্যই হলো নিজেকে প্রভুর নিকট সমর্পণ করা।
আর বান্দা রুকুতে নিজের মেরুদণ্ড বিছিয়ে দিবে। হাঁটুর ওপর ভর দিবে। মাথা ঝোঁকানো থাকবে। পিঠ ও ঘাড় সমান রাখবে। আর তাকবীর বলতে বলতে রুকু'তে যাবে। এরপর তাসবীহ পড়বে-
سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ
আমি আমার প্রতিপালকের পবিত্রতা বর্ণনা করছি।
রুকু'তে তিনটি বস্তুর খুশু-খুযূ রয়েছে।
এক. অন্তরে খুশ। সেটা হলো মনোযোগী ও বিনয়ী হওয়া।
দুই. অঙ্গসমূহের খুশ। দেহকে নত করা।
তিন. মুখের খুশ। তাসবীহ পাঠ করা। যিক্র করা। এভাবে রুকু' করাই হলো রুকু'র পূর্ণতা। মানুষের প্রতি বিনীত আর স্রষ্টার কাছে বিনয়াবনত হওয়ার পার্থক্যটা এখানে বুঝে আসে। কেননা, মানুষ যত বড়ই হোক সে কারও-না-কারও গোলাম। গোলামের কাজ হলো দাসত্ব; আর আল্লাহ্ হলেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তার সিফাত হলো, 'আজমাত (বড়ত্ব)।
মোটকথা, রুকু' একটি 'ইবাদাত। তার পূর্ণতাই হলো নিজেকে হীন, নীচ ও তুচ্ছভাবে উপস্থাপন করা। নিজের বড়ত্ব অন্তর থেকে বের করে আল্লাহ্র ভয় ও ওহদানিয়্যাত (একত্ববাদ) সেখানে প্রতিস্থাপন করা। কোনো অন্তরে যখন আল্লাহর ভয় ঢুকে পড়ে, তখন আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য যে কোনো কিছুর ভয় সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। অতএব, রুকু'তে যে যত বেশি তাসবীহ পাঠ করবে, বিনয়ী হবে, আল্লাহ্র ভয় তার ভেতর তত বেশি শক্তিশালী হবে। এই-ই হলো রুকু'র হাকীকত, রুকু'র বাস্তবতা।
রুকু'র এই অবস্থা আল্লাহ্র খুব প্রিয়। তাই বান্দা বেশি বেশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। হামদ (আল্লাহর প্রশংসা) করবে। 'সুবহানা রব্বিয়াল আযীম' পড়বে। কেননা, আল্লাহই তাকে রুকু' করার তাওফীক দিয়েছেন। আল্লাহ তাওফীক দিয়েছেন বলেই সে 'ইবাদাতের সৌভাগ্য অর্জন করেছে। অথচ কত মানুষ এই তাওফীক থেকে বঞ্চিত।

টিকাঃ
১৭ আবু দাউদ, ৮৫৬

📘 খুশূ-খুযূ > 📄 ‘কওমা’ একটি ‘ইবাদাত

📄 ‘কওমা’ একটি ‘ইবাদাত


'কওমা' বলা হয় রুকু' ও সিজদার মধ্যবর্তী সময় সোজা হয়ে দাঁড়ানোকে। অতঃপর বুক'কারী রুকু' করে পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে। আল্লাহর সামনে সোজা হয়ে দাঁড়াবে, যেভাবে কির'আত পাঠের সময় দাঁড়িয়ে ছিল। তার প্রশংসা স্তুতি করবে, যেভাবে কির'আতের শুরুতে করেছিল।
কওমাও একটি বিশেষ 'ইবাদাত। এটি রুকু-সিজদার মতোই সালাতের অন্যতম একটি রুকন। এর স্বাদ ও মজা একদম ভিন্ন। যা কেবল সালাত আদায়কারীই তার অন্তরে অনুভব করতে পারে। এ কারণে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম কওমাকে রুকূ'-সিজদার মতো প্রলম্বিত করতেন। স্থির দাঁড়িয়ে থাকতেন, এবং খুব বেশি হামদ-সানা পাঠে ব্রত হতেন। যেমনটা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তাহাজ্জুদের সালাতে রুকু' থেকে দাঁড়ানো অবস্থায় তিনি বলতেন-
لِرَبِّيَ الْحَمْدُ لِرَبِّيَ الْحَمْدُ
প্রশংসা আমার প্রতিপালকের জন্যই... প্রশংসা আমার প্রতিপালকের জন্যই.. এভাবে বার বার বলতে থাকতেন।

টিকাঃ
১৮ আবু দাউদ, ৮৭৪

📘 খুশূ-খুযূ > 📄 ‘সিজদা’ একটি ‘ইবাদাত

📄 ‘সিজদা’ একটি ‘ইবাদাত


অতঃপর বান্দা তাকবীর বলতে বলতে সিজদায় লুটিয়ে পড়বে। প্রতিটি অঙ্গকে এই 'ইবাদাতের শামিল করবে। আল্লাহ্র সম্মুখে কপাল রাখবে। মাটির সাথে চেহারা লাগাবে। নাক ধূলি-ধূসরিত করবে। মানুষের অঙ্গসমূহের মধ্যে চেহারা হলো সর্বোচ্চ সম্মানের। সেটাকে সর্বস্রষ্টার সম্মুখে বিছিয়ে দেবে। বিশেষ করে হৃদয়। এছাড়া চেহারার সাথে সাথে অন্তরকেও সিজদা করাবে। মনে রাখতে হবে, অন্তর এবং অঙ্গসমূহের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সম্মান প্রকাশের নামই সিজদা। তাই দেহ যেভাবে আল্লাহকে সিজদা করে, তদ্রুপ অন্তরকেও তার প্রতিপালকের সামনে সিজদাবনত করবে। আর একই সাথে সিজদাবনত করবে নাক, মুখ, হাত, হাঁটু, মাথা ও পা। আর সিজদারত অবস্থায় উরু পায়ের গোড়ালির উপরের অংশ থেকে পৃথক রাখবে। একইভাবে পেট, উরু থেকে, বাহু তার পার্শ্ব থেকে পৃথক রাখবে। যাতে প্রতিটা অঙ্গ থেকে পৃথক পৃথক 'ইবাদাত প্রকাশ পায়।
বান্দা নিজেকে হীন, নীচ, তুচ্ছ, ভূখা-নাঙ্গা, ভিক্ষুকের মতো পেশ করবে। অহংকার ও অহমিকা ধুলোয় মিশিয়ে দেবে। তার বড়ত্বের সামনে নিজের অসহায়ত্ব, 'ইযযাতের সামনে নিজের সম্মানহীনতা ফুটিয়ে তুলবে। মালিকের সামনে একজন দাসের দাসত্ব প্রকাশের সর্বোচ্চ মাধ্যম হলো এই সিজদা। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে বেশি নৈকট্য লাভ করে। যেমনটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
যে কাজের দ্বারা বান্দা আল্লাহ্ অধিক নিকটবর্তী হয়, সেটা হলো সিজদা।
সালাত আদায়কারীর সিজদা যখন পূর্ণ খুশু-খুযূর সাথে হবে, তখন এই এক সিজদায় কিয়ামাত পর্যন্ত কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব! একবার সাহল ইবনু 'আব্দিল্লাহ্ ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, হৃদয়ও কি সিজদা করে? তিনি বলেছিলেন 'অবশ্যই'! আল্লাহ্র কসম! কেউ যদি খুশু-খুযুর সাথে সিজদা করার মজা পেয়ে যেত, তাহলে কিয়ামাত পর্যন্ত সে আর তার মাথা তুলতেই চাইত না। এই সিজদার রহস্য হলো, অন্তরের অহমিকা মিটিয়ে দেওয়া। নিজেকে ছোট ও তুচ্ছ জ্ঞান করা। বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করা। লোকালয়ে বা লোকশূন্যে সর্বাবস্থায়, সকল স্থানে, আল্লাহ্র ধ্যান ও খেয়াল অন্তরে চালু রাখা।

টিকাঃ
১৯ সহীহ মুসলিম, ৪৮২; আবু দাউদ, ৮৭৫
২০ মাজমাউল ফাতওয়া, ২১/২৮৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00