📄 ‘আর-রহমানির রহীম’ বলা একটি ‘ইবাদাত
الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
যিনি নিতান্ত মেহেরবান ও দয়ালু।
এই বাক্যটি বলা বিশেষ একটি 'ইবাদাত। আল্লাহ্র অসীম দয়া ও করুণার বর্ণনা এটি। তাঁর দয়া সকল মাখলুকের ওপর ব্যপ্ত। গোটা দুনিয়ার প্রতিটি বস্তু তাঁর অনুগ্রহ ও রাহমাতের ওপর টিকে আছে।
প্রকৃতপক্ষে, এটিও আল্লাহর একটি বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহ যে, বান্দা আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। হাদীসে এসেছে,
'আল্লাহ্ তা'আলা প্রতি রাতে জিবরা'ঈল 'আলাইহিস সালাম-কে বলেন,
'অমুককে সালাতের জন্য জাগিয়ে দাও, অমুককে ঘুম পাড়িয়েই রাখো।
সুতরাং এটা তার বিশেষ রাহমাত যে, তিনি বান্দাকে গভীর রজনীতে সালাতে দাঁড় করিয়ে দেন। তার সাথে নির্জনে কথা বলেন। বান্দা তখন অনুনয়-বিনয় করে। দয়া প্রার্থনা করে। তাকে ডাকে। তার কাছে হিদায়াত ও রাহমাত কামনা করে। দুনিয়া ও 'আখিরাতে এমন বান্দাদের ওপর তার নি'য়ামাত পরিপূর্ণ। এই বিশেষ রাহমাত থেকে যারা দূরে রয়েছে, তারা সত্যিই বঞ্চিত।
এছাড়াও আল্লাহর রাহমাত সকল মাখলুকের ওপর বিস্তৃত। যেমন তার হামদ ও 'ইলম সর্বত্র বিস্তৃত।
📄 ‘মালিকি ইয়াউমিদ দীন’ বলা একটি ‘ইবাদাত
رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا
হে আমাদের পালনকর্তা, আপনার রাহমাত ও জ্ঞান সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত।
ملِكِ يَوْمِ الدِّينِ
বিচার দিবসের মালিক।
অতঃপর বান্দা 'মা-লিকি ইয়াও মিদ্দীন' বলবে। তার হীনতা ও বশ্যতা প্রকাশ করবে। নিজেকে সমর্পণ করবে। আল্লাহ্র ইনসাফ ও পরিমাপযন্ত্র স্থাপনের কথা, এবং বিচার দিবসের কথা স্মরণ করে নিজেকে পাপ ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। এ আয়াত পড়ার সময় একথাও চিন্তা করবে যে, নিশ্চয় কিয়ামাত প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ্ হবেন বিচারক। তিনি মানুষের মাঝে ফয়সালা করবেন। ভালো-মন্দের প্রতিদান দেবেন। তার বিচারকার্যও প্রশংসার অন্তর্ভুক্ত। কুর'আনে ইরশাদ হয়েছে,
وَقُضِيَ بَيْنَهُم بِالْحَقِّ وَقِيلَ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ
তাদের সবার মাঝে ন্যায় বিচার করা হবে। বলা হবে, সকল প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ্র।
বর্ণিত আছে, বিচারকার্য সমাধানের পর সেদিন জান্নাত ও জাহান্নামের সকল অধিবাসী তার ন্যায়, ইনসাফ ও অনুগ্রহের প্রশংসা করবে।
টিকাঃ
১৩ সূরা গাফির, ৪০:০৭
১৪ সূরা যুমার, ৩৯: ৭৫
📄 সানা ও তামজীদের পার্থক্য
সালাত আদায়কারী যখন 'আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল 'আলামীন' বলে, তার জবাবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন-
حَمِدَنِي عَبْدِي
বান্দা আমার হামদ-তথা প্রশংসা করল।
যখন বান্দা 'আর রহমানির রহীম' বলে, তো এর মাধ্যমে সে আল্লাহর প্রশংসার পুনরাবৃত্তি করল। তাঁর একাধিক গুণ বর্ণনা করল। তখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন-
أَثْنَى عَلَى عَبْدِي
বান্দা আমার সানা-তথা প্রশংসা করল।
এখানে আল্লাহ্ 'সানা' শব্দের ব্যবহার করেছেন। 'সানা' বলা হয় বারংবার প্রশংসা করা; প্রশংসিত ব্যক্তির একাধিক গুণ বর্ণনা করাকে। এখানে 'আলহামদু লিল্লাহ্' শুধু প্রশংসা। 'রহমানির রহীম' আল্লাহ্র গুণাবলিসহ একাধিক বার প্রশংসা।
এরপর সালাত আদায়কারী বলবে-
ملِكِ يَوْمِ الدِّينِ
বিচার দিবসের মালিক।
এ বাক্যে রয়েছে বিচার দিবসে তার একক ক্ষমতা, দ্বীন ও দুনিয়ার বাদশাহী, তার বড়ত্ব ও মহত্ত্ব, একত্ববাদ, নাবী-রাসূল প্রেরণের সত্যতার কথা। এর উত্তরে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন-
مَجْدَنِي عَبْدِي
বান্দা 'তামজীদ'-এর সাথে আমার প্রশংসা বর্ণনা করল।
এখানে আল্লাহ্ 'তামজীদ' শব্দের ব্যবহার করেছেন। তামজীদ বলা হয় ন্যায়-ইনসাফ, দয়া-অনুগ্রহ এবং মহিমা ও মহত্ত্ব প্রকাশ্যে যে প্রশংসা করা হয় তাঁকে।
📄 ‘ইয়্যাকা না‘বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতা‘ঈন’ বলা একটি ‘ইবাদাত
إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
আমরা একমাত্র আপনারই 'ইবাদাত করি এবং শুধু আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি।
'ইয়্যাকা না'বৃদ্ধ' পড়ার পর সে একটু থামবে।
প্রতিপালক জবাবে বলেন-
هَذَا بَيْنِي وََيْنَ عَبْدِي ، وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ
আমার আর আমার বান্দার মাঝে এটাই পার্থক্য। আমার বান্দা যা চেয়েছে, তা পাবে।
বান্দা এই দুটি (إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِين) বাক্যের গভীরে মনোনিবেশ করবে। বাক্য দুটির মর্ম নিয়ে চিন্তা করবে। এখানে দুটি অংশ। একটি আল্লাহর জন্য (إِيَّاكَ نَعْبُدُ) একটি বান্দার জন্য (وَإِيَّاكَ نَسْتَمِين)। উভয় বাক্য তাওহীদের সাক্ষ্য বহন করে।
'إِيَّاكَ نَعْبُدُ' বললে একজনই উপাস্য ; 'وَإِيَّاكَ نَسْتَعِين' বললে একজনই সাহায্যকারী বোঝায়।
চিন্তা করবে, এই বাক্য দুটি সুরা ফাতিহার ঠিক কোন স্থানে আছে? মাঝখানে। তার শুরুতে আছে স্মৃতি ও প্রশংসাবাক্য। পরে আছে দু'আ ও প্রার্থনাবাক্য।
বান্দা 'অনুধাবন করার চেস্টা করবে, 'ইবাদাতকে 'সাহায্যপ্রার্থনা'র আগে কেন আনা হয়েছে?'
কেন অবজেক্টকে (বিধেয়) সাবজেক্ট (উদ্দেশ্য)-এর আগে উল্লেখ করা হয়েছে? মনোযোগী হয়ে চিন্তা করবে, কেন তিনি সর্বনাম বার বার উল্লেখ করেছেন? ('আরবীতে সর্বনাম বার বার উল্লেখ করা হয় ব্যক্তি বা সত্তার সম্মান ও গুরুত্ব বোঝানোর জন্য)
'ইবাদাত'কে 'আগে আনার কারণ:
সুরা ফাতিহায় 'ইবাদাত'কে 'সাহায্যপ্রার্থনার' আগে আনা হয়েছে। কেননা, 'ইবাদাত 'আল্লাহর জন্য। সাহায্য বান্দার জন্য। আল্লাহ্ তা'আলা উপাসা। তিনি উপাসনার পর বান্দাকে সাহায্য করলেন। সুতরাং আগে 'ইবাদাত, পরে উঞ্জরত (প্রতিদান)।
'ইবাদাত' দ্বারা উদ্দেশ্য-
إِيَّاكَ أُرِيدُ بِعِبَادَتِي
আমার 'ইবাদাত দ্বারা কেবল তোমাকেই চাই।
অতএব, যাবতীয় নেককাজ-যা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য করা হয়-তা 'ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত, এবং আল্লাহ্ মারেফাত, মুহাব্বাত, সাদাকাত ও ইখলাসের দিকে পথ প্রদর্শক সকল উপকারী 'ইলম 'ইবাদাতের শামিল।
সাহায্য দ্বারা বান্দার সকল কাজে তাওফীকপ্রাপ্ত হওয়া উদ্দেশ্য। সুতরাং যে 'ইবাদাত আল্লাহর জন্য হয় না, তা প্রত্যাখ্যাত, এবং যে সাহায্য আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ছাড়া অন্য কারও কাছে চাওয়া হয় তা বিবর্জিত। এতে কেবল রয়েছে অপমান, লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা।
উভয় বাক্যের মর্ম:
প্রত্যেকের গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত এই আয়াত থেকে নিসৃত উপকারী জ্ঞান নিয়ে-যা 'ইবাদাতের বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে মানুষকে সাহায্য করে এবং রক্ষা করে আমলের ঘাটতি ও বাঁচিয়ে রাখে যাবতীয় হারাম কাজ থেকে।
আর ভাবনার বিষয়, দুটি মাত্র বাক্যে তাঁর সকল সৃষ্টির রহস্য, আদেশ ও নিষেধ, সাওয়াব ও শাস্তি, দুনিয়া ও 'আখিরাতের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কতটা সুগভীরভাবে বস্তু করা হয়েছে! আদতে পুরো কুর'আনের সারমর্মই এই দুটি বাক্য।
এখানে বুঝতে হবে, কীভাবে সর্বনামে নাম পুরুষ থেকে উত্তম পুরুষের দিকে উঠিয়ে আনা হয়েছে? এ বিষয়টি বিস্তারিত বোঝাতে গেলে বড় একটি গ্রন্থ রচনা করা যাবে। এটি যদি আলোচ্য বিষয়ের বহির্ভূত না হতো, তাহলে আরও আলোচনা করতাম। এ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বিবরণ দিতাম। কারও যদি এ বিষয়ে অধিক জ্ঞান অর্জনের স্পৃহা থাকে, তাহলে সে মারাহিলস সা-ইরিন এবং আররিসালাতুল মুসরিয়া নামক গ্রন্থ দুটি দেখতে পারে।