📄 ‘হামদ’-এর মর্ম
এখানে আল্লাহর বাণী :
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ
তার নাম এবং সিফাতসমূহের সম্পূর্ণতা নির্দেশ করে এবং যাবতীয় দোষ-ত্রুটি ও অক্ষমতা থেকে তার পবিত্রতা ঘোষণা করে। নিশ্চয় তিনি তার কর্মে, বৈশিষ্ট্যে এবং নামসমূহে প্রশংসিত। সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি ও অক্ষমতা থেকে মুক্ত। তার প্রতিটি কাজ প্রজ্ঞাপূর্ণ। রাহমাতবাহী ও কল্যাণকর। তার সকল সিদ্ধান্ত ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ। তিনি সকল গুণে পরিপূর্ণ। তিনি তার নামসমূহে অতুলনীয়।
দুনিয়া-'আখিরাত, আসমান-যমীন এবং এর মধ্যবর্তী যা কিছু আছে, সব আল্লাহ্ সুবহানাহু তা'আলার প্রশংসায় পরিপূর্ণ। জগতের সকল বস্তু তাঁর প্রশংসায় লিপ্ত। সকল সৃষ্টি তাঁর প্রশংসায় আত্মপ্রকাশ করে, এবং সবকিছু তাঁর প্রশংসার ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রত্যেকটি জিনিস-ই অস্তিত্বে আসে এবং অনস্তিত্ব হয় তাঁর প্রশংসার দ্বারা। সুতরাং তাঁর প্রশংসাই সকল সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সকল বস্তু তাঁর প্রশংসার সাক্ষী। তাঁর প্রশংসার জন্যই নাবীদের প্রেরণ করা হয়েছে। কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে। তার প্রশংসাকারীদের জন্যই জান্নাতকে সজ্জিত করা হয়েছে। আর প্রশংসা বর্জনকারীদের জন্যই জাহান্নামকে প্রজ্জ্বলিত করা হয়েছে। জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব তার প্রশংসার ভিত্তিতেই।
আল্লাহ্র হামদ (প্রশংসা) করা 'ইবাদাত। হামদ না করাই মা'সিয়াত (গুনাহ)। তার হামদ ছাড়া গাছের একটি পাতাও ঝরে না। গ্রহে কিংবা ভিনগ্রহে কোনো কিছুই তার হামদ ব্যতীত সামান্য নড়াচড়ার অধিকার রাখে না। তিনি এমন এক সত্তা-যা সত্তাগতভাবেই প্রশংসিত, যদি বান্দা তাঁর প্রশংসা নাও করে। যেমন বান্দা তাঁর তাওহীদের সাক্ষ্য না দিলেও তিনি এক এবং অদ্বিতীয়। তিনিই একমাত্র উপাস্য যদিও বান্দা তাঁর উপাসনা না করে। তিনি তো এমন পবিত্র সত্তা, যিনি প্রশংসাকারীদের যবান দিয়ে নিজের প্রশংসা আদায় করে নেন। যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাঁর নাবীর যবানে বলিয়েছেন-
GE
سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ
যে ব্যক্তি আল্লাহ্র প্রশংসা করে, তিনি তার কথা শোনেন।
পরোক্ষভাবে এমনটিও বলা যায় যে, বান্দার যবানে মূলত তিনি নিজেই নিজের প্রশংসাকারী। কারণ, তিনিই বান্দার অন্তরে ও মুখে তাঁর স্তুতি জারি করে দিয়েছেন। সুতরাং সকল প্রশংসা তাঁর জন্য। সকল রাজত্বও তাঁরই জন্য। যাবতীয় কল্যাণ তার হাতে। সবকিছুর প্রত্যাবর্তনও তাঁর দিকে, প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে।
এতক্ষণ যা বলা হলো তা হামদের সামান্য এক ব্যাখ্যা। মহা সমুদ্রের তুলনায় এ কেবল একটি ফোঁটামাত্র!
যদি কোনো নি'য়ামাত প্রাপ্তির পর বান্দা তাঁর প্রশংসা করে, তখন এ প্রশংসা করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হওয়া আরেক প্রশংসার দাবি রাখে। তার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আরেক প্রশংসা এবং তার জন্য আবার প্রশংসা... এভাবে চলতেই থাকবে।
সত্যিকার অর্থে বান্দা যদি তার প্রতিটা শ্বাসপ্রশ্বাস কেবল আল্লাহর একটিমাত্র নি'য়ামাতের প্রশংসার জন্যও নিয়োজিত রাখে, জীবন ফুরিয়ে যাবে, তবুও আল্লাহর প্রতি তার প্রশংসা যথেষ্ট হবে না। আর তাঁর নি'য়ামাত তো অগণিত। অসংখ্য।
তিনিই তাঁর বান্দাকে হামদ-এর জন্য অনুপ্রাণিত করেছেন। সে জন্যও তিনি প্রশংসার দাবি রাখেন।
যদি তিনি কোনো নি'য়ামাত নাও দিতেন, তবু তিনি তাঁর বান্দাকে যে বিপদ-আপদ দেওয়া থেকে হিফাযত করেছেন, সেজন্য তিনি প্রশংসার উপযুক্ত। ইমাম আওযায়ী রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন-
আমি কাউকে বলতে শুনেছি, সকল প্রশংসা তোমারই জন্য। নি'য়ামাতের জন্য হোক কিংবা বিপদ না দেওয়ার কারণেই হোক।
টিকাঃ
১০ ... আর যখন ইমাম 'সামি আল্লাহ লিমান হামিদাহ' বলবে, তখন তোমরা 'আল্লাহুম্মা রব্বানা লাকাল হামদ' বলবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুখ দ্বারা বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রশংসা করে আল্লাহ তা'আলা তা শোনেন। (সহীহ মুসলিম, ৪০৪; নাসায়ী, ১২৮০)
১১ তারীখে বাগদাদ, ৬/১২২
📄 ‘রব্বিল ‘আলামীন’ বলা একটি ‘ইবাদাত
আবার, আল্লাহ তার বান্দাকে সঠিক পথ প্রদর্শন না করলে, সে কোনোভাবেই তার হামদ আদায়ে সক্ষম হতো না। আল্লাহ তা'আলা অনুগ্রহ করে বান্দার অন্তরে হামদ প্রক্ষেপণ করেছেন। সুতরাং তিনি এর জন্যও প্রশংসিত। কেননা, তিনিই তা বান্দার জিহ্বা ও অন্তরে জারি করেছেন। যদি আল্লাহ্ পথ না দেখাতেন, তাহলে কে আছে যে নিজ প্রচেস্টায় পথপ্রাপ্ত হতো?
বান্দার জন্য আবশ্যক হলো সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং তার প্রশংসা করা। সুখে থাকুক কিংবা দুঃখে, সকল মাখলুক তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। চাই সে নেককার হোক বা পাপী, সম্মানিত হোক বা অপমানিত। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সর্বাবস্থায় তার প্রশংসার উপযুক্ত। যদিও তার কর্মের নেপথ্য কারণ আমাদের অন্তর্দৃষ্টির বাইরে। সুতরাং যে বান্দা আল্লাহ্র যত নিকটবর্তী হবে, তার কৃতজ্ঞতাপ্রকাশও ততই আন্তরিক হয়ে উঠবে।
'আলহামদু লিল্লাহ্' এটি আল্লাহ্র পক্ষ থেকে তাঁর বান্দার অন্তরে ঐশী অনুপ্রেরণা। নাবী করিম সাল্লালাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুপারিশের হাদীসে বলেছেন-
GG
হাশরের দিন আমি সিজদায় পড়ে যাব। অতঃপর আল্লাহ্ আমার অন্তরে ইলহাম প্রক্ষেপণ করবেন। ফলে আমি এমন সব বাক্য দ্বারা তার প্রশংসা করব, যা কখনো আমার অন্তরে উদয় হয়নি।
رَبِّ الْعَالَمِينَ
জগৎসমূহের একমাত্র প্রতিপালক
এখানে 'রব' একবচন। অর্থ, একজন প্রতিপালক। 'আলামীন' হলো বহুবচন, অর্থ, জগৎসমূহ। 'রব্বিল 'আলামীন' অর্থ: জগৎসমূহের একমাত্র প্রতিপালক। এতে একত্ববাদের সাক্ষ্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বিশ্ব-জাহানের একমাত্র রব। তিনি সবকিছুর স্রষ্টা, রিয্কদাতা, নিয়ন্ত্রণকর্তা। তিনি জীবন দেন। তিনিই মৃত্যু দেন। তিনি এক ও একমাত্র ইলাহ। 'ইবাদাতের উপযুক্ত সত্তা। দুর্যোগে সাহায্যকারী। বিপদে আশ্রয়দানকারী। তিনি ছাড়া কোনো রব নেই। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
টিকাঃ
১২ ইলহাম হলো এক ধরনের অনুপ্রেরণা, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনো প্রকার বাহ্যিক উৎসের যোগসূত্রতা ছাড়াই 'অন্তরে অনুভব করেন।
📄 ‘আর-রহমানির রহীম’ বলা একটি ‘ইবাদাত
الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
যিনি নিতান্ত মেহেরবান ও দয়ালু।
এই বাক্যটি বলা বিশেষ একটি 'ইবাদাত। আল্লাহ্র অসীম দয়া ও করুণার বর্ণনা এটি। তাঁর দয়া সকল মাখলুকের ওপর ব্যপ্ত। গোটা দুনিয়ার প্রতিটি বস্তু তাঁর অনুগ্রহ ও রাহমাতের ওপর টিকে আছে।
প্রকৃতপক্ষে, এটিও আল্লাহর একটি বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহ যে, বান্দা আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। হাদীসে এসেছে,
'আল্লাহ্ তা'আলা প্রতি রাতে জিবরা'ঈল 'আলাইহিস সালাম-কে বলেন,
'অমুককে সালাতের জন্য জাগিয়ে দাও, অমুককে ঘুম পাড়িয়েই রাখো।
সুতরাং এটা তার বিশেষ রাহমাত যে, তিনি বান্দাকে গভীর রজনীতে সালাতে দাঁড় করিয়ে দেন। তার সাথে নির্জনে কথা বলেন। বান্দা তখন অনুনয়-বিনয় করে। দয়া প্রার্থনা করে। তাকে ডাকে। তার কাছে হিদায়াত ও রাহমাত কামনা করে। দুনিয়া ও 'আখিরাতে এমন বান্দাদের ওপর তার নি'য়ামাত পরিপূর্ণ। এই বিশেষ রাহমাত থেকে যারা দূরে রয়েছে, তারা সত্যিই বঞ্চিত।
এছাড়াও আল্লাহর রাহমাত সকল মাখলুকের ওপর বিস্তৃত। যেমন তার হামদ ও 'ইলম সর্বত্র বিস্তৃত।
📄 ‘মালিকি ইয়াউমিদ দীন’ বলা একটি ‘ইবাদাত
رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا
হে আমাদের পালনকর্তা, আপনার রাহমাত ও জ্ঞান সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত।
ملِكِ يَوْمِ الدِّينِ
বিচার দিবসের মালিক।
অতঃপর বান্দা 'মা-লিকি ইয়াও মিদ্দীন' বলবে। তার হীনতা ও বশ্যতা প্রকাশ করবে। নিজেকে সমর্পণ করবে। আল্লাহ্র ইনসাফ ও পরিমাপযন্ত্র স্থাপনের কথা, এবং বিচার দিবসের কথা স্মরণ করে নিজেকে পাপ ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। এ আয়াত পড়ার সময় একথাও চিন্তা করবে যে, নিশ্চয় কিয়ামাত প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ্ হবেন বিচারক। তিনি মানুষের মাঝে ফয়সালা করবেন। ভালো-মন্দের প্রতিদান দেবেন। তার বিচারকার্যও প্রশংসার অন্তর্ভুক্ত। কুর'আনে ইরশাদ হয়েছে,
وَقُضِيَ بَيْنَهُم بِالْحَقِّ وَقِيلَ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ
তাদের সবার মাঝে ন্যায় বিচার করা হবে। বলা হবে, সকল প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ্র।
বর্ণিত আছে, বিচারকার্য সমাধানের পর সেদিন জান্নাত ও জাহান্নামের সকল অধিবাসী তার ন্যায়, ইনসাফ ও অনুগ্রহের প্রশংসা করবে।
টিকাঃ
১৩ সূরা গাফির, ৪০:০৭
১৪ সূরা যুমার, ৩৯: ৭৫