📄 ‘সানা পড়া’ একটি ‘ইবাদাত
'আল্লাহু আকবার' বলে বান্দা হাত বাঁধবে। তার গুণকীর্তন করবে। সানা পড়বে-
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ
হে আল্লাহ্, আপনি মহাপবিত্র, আপনার জন্যই প্রশংসা, আপনার নাম বারকাতপূর্ণ, আপনার মর্যাদা সর্বোচ্চ।
যখন সালাত আদায়কারী সানা পড়ল, তখন সে আল্লাহর মর্যাদা অনুযায়ী প্রশংসা প্রকাশ করল। এর মাধ্যমে সে উদাসীনদের দল থেকে বেরিয়ে গেল। নিঃসন্দেহে ঔদাসীন্য আল্লাহ ও বান্দার মাঝে বড় অন্তরায়। তাছাড়া, সানা হলো একধরনের সম্ভাষণ, অভিবাদন। এর উপমা হলো এমন যে, কেউ যখন বাদশাহর দরবারে প্রবেশ করে প্রথমেই সে সালাম পেশ করে, গুণকীর্তন করে। এরপর তার চাওয়া-পাওয়ার আর্জি পেশ করে। সানাও ঠিক এমনই। সানায় আছে উপাসকের আদব। উপাস্যের মর্যাদা। এর দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়। আল্লাহ্ তাঁর বান্দার ওপর সন্তুষ্ট হন। এবং তার চাওয়া-পাওয়াগুলো পূর্ণ করেন।
টিকাঃ
৮ সহীহ মুসলিম, ৩৯৯
📄 ‘আ‘উযুবিল্লাহ...’ বলা একটি ‘ইবাদাত
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ
আমি আল্লাহ্র কাছে বিতাড়িত শাইতান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
অতঃপর যখন তিলাওয়াত শুরু করবে, তার পূর্বে 'আ'ঊযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতনির রজীম' পাঠ করবে। কেননা, শাইতান এধরনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বান্দার পদস্থলন ঘটাতে বেশি উৎসুক। সে যেকোনো মূল্যে বান্দাকে সালাতে যাওয়া থেকে ফিরিয়ে রাখার চেষ্টা করে; কিন্তু যখন সে অক্ষম হয়ে যায়, তখন সে চায়, বান্দার অন্তরকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে। খুশু-খুযু নষ্ট করতে। তাই সে অন্তরে কুমন্ত্রণা দিতে থাকে। যাতে বান্দা আল্লাহ্র সামনে দাঁড়িয়েও গাইরুল্লাহকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই বান্দাকে আদেশ করা হয়েছে, সে যেন 'আ'ঊযুবিল্লাহ...' পড়ে। আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শাইতান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে। যেন সে নিজেকে পদস্থলন থেকে নিরাপদ রাখতে পারে। অন্তরকে হিফাযত করতে পারে, এবং সে যেন এমন এক নূর অর্জন করতে পারে, যার দ্বারা সে কুর'আনের মর্ম অনুধাবন এবং এর গভীরতায় পৌঁছতে পারবে; যা অন্তরের জন্য এক সঞ্জীবনী সুধা। বান্দার সাফল্য। অতএব, শাইতান চায় কুর'আন পাঠের উদ্দেশ্য থেকে তাকে দূরে রাখতে।
আল্লাহ্ শাইতানের ব্যাপারে অবগত রয়েছেন। অবগত রয়েছেন তার হিংসা এবং শত্রুতা সম্পর্কে। তিনি এও জানেন-তার বান্দা শাইতানের মুকাবিলা করতে অক্ষম, অপারগ। তাই তিনি তাঁর নিকট সাহায্য চাওয়া এবং আশ্রয় প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন; যেন শাইতানের মুকাবিলায় তিনিই বান্দার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। যেন বান্দাকে বলা হচ্ছে, 'তোমার শক্তি নেই এই শত্রুর সাথে লড়াই করার; অতএব, তুমি আমার সহায়তা গ্রহণ করো। আমাকে ডাকো। আমি তোমাকে তার কুমন্ত্রণার নাগপাশ থেকে বাঁচিয়ে রাখবো।'
📄 ইবনু তাইমিয়ার উপদেশ
একবার শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (আল্লাহ্ তার আত্মাকে পবিত্র করুন, তার কবরকে আলোকিত রাখুন) শাইতানের কবল থেকে আশ্রয় প্রার্থনার ব্যাপারে আমাকে রূপক একটা উদাহরণ দিয়ে বললেন-
যদি কখনো পালের কোনো কুকুর তোমাকে দেখে আক্রমণের চেষ্টায় ঘেউ ঘেউ শুরু করে, তুমি তার সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ো না; বরং রাখালকে ডাকবে এবং তার সাহায্য চাইবে। সে-ই তোমাকে কুকুরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে।
যখন কোনো বান্দা অভিশপ্ত শাইতান হতে আল্লাহ্র নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে (অর্থাৎ, আ'উযুবিল্লাহ... পাঠ করে), তখন শাইতানের প্ররোচনা এবং মন্দ প্রভাব থেকে তিনি তাকে নিরাপদ রাখেন এবং তার অন্তরকে শৃঙ্খলমুক্ত করেন।
ফলে সালাত আদায়কারীর অন্তর কুর'আনের অর্থ উপলব্ধির প্রতি মনোযোগী হয়। কালামুল্লাহ্র মনোরম বাগানে বিচরণ করতে থাকে। এতে সে ওইসকল আশ্চর্যজনক দৃশ্যগুলো পরিদর্শন করে, যা তার বিবেক-বুদ্ধিকে আরও শাণিত করে এবং এর রত্নভাণ্ডার থেকে সে এমন সব জিনিস বের করে আনে, যা কোনো চোখ ইতোপূর্বে দেখেনি। যার বর্ণনা কোনো কান কখনো শোনেনি। এমনকি কোনো অন্তর তা কখনো কল্পনাও করেনি!
নাফস এবং শাইতানের প্ররোচনাই এসব বিস্ময় থেকে তাকে দূরে রাখে। কারণ, নাফসের বৈশিষ্ট্যই হলো শাইতানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়ে পড়া। তবে সে যখনই শাইতান থেকে নিজেকে দরে সরিয়ে নেয়, আল্লাহ তার অন্তরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। সত্যের পথে তাকে অটল রাখেন এবং পরম শান্তি ও নিরাপত্তা প্রদান করেন।
📄 ফাতিহা; আল্লাহ ও বান্দার কথোপকথন
সালাত আদায়কারী যখন তিলাওয়াত আরম্ভ করে, তখন সে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সাথে কথা বলতে থাকে। একান্তে। নিভৃতে। তখন সে যেন খুব সতর্ক থাকে আদবের ব্যাপারে। আল্লাহ্র সম্মান ও মর্যাদার ব্যাপারে। গাইরুল্লাহর দিকে অন্তর ধাবিত হওয়ার ব্যাপারে। কেননা, মালিকের সামনে দাঁড়িয়ে অন্যমনস্ক থাকা বেয়াদবী, যা তাঁর ক্রোধকে ত্বরান্বিত করে।
এমন লোক তো ওই ব্যক্তির মতো, যাকে দুনিয়ার কোনো প্রতাপশালী বাদশাহ অনুগ্রহ দেখালেন, কাছে ডাকলেন। এরপর তার সাথে একান্তে কথা বলতে আরম্ভ করলেন। আর সে কিনা একবার ডানে তাকায়, একবার বামে তাকায়। বাদশাহ কী বলছেন, সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। এতে বাদশাহ কেমন রাগান্বিত হবেন? নিশ্চয়ই অনেক। তাহলে এমনটি যদি আসমান ও যমীনের নিয়ন্ত্রক, বিশ্বজগতের প্রতিপালক, পরাক্রমশালী বাদশাহ আল্লাহ্র সম্মুখে হয়, তাঁর ক্রোধের মাত্রা কেমন হতে পারে?
সালাত আদায়কারী ব্যক্তির উচিত সূরা ফাতিহার প্রত্যেক আয়াত এমনভাবে থেমে থেমে পড়া-যেন সে তিলাওয়াতের সময় আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার জবাবের জন্য অপেক্ষা করছে। অর্থাৎ, যখন সে পড়বে-
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ
যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার- যিনি সকল সৃষ্টিজগতের পালনকর্তা।
তখন সে কল্পনা করবে, আল্লাহ্ তার প্রশংসা শুনেছেন এবং বলছেন-
حمدني عبدي
আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।
যখন সে পড়বে-
الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
যিনি অত্যন্ত মেহেরবান ও দয়ালু।
তখন কিছু সময়ের জন্য থামবে এবং আল্লাহ্র উত্তরের জন্য অপেক্ষা করবে। কল্পনা করবে, তিনি বলছেন-
أَثْنَى عَلَى عَبْدِي
আমার বান্দা আমার গুণ বর্ণনা করছে।
যখন সে পড়বে—
مُلِكِ يَوْمِ الدِّينِ
যিনি বিচার দিনের মালিক।
তখন সে একটু অপেক্ষা করবে। কল্পনা করবে, তিনি বলছেন-
مَجْدَنِي عَبْدِي
আমার বান্দা আমার 'আজমাতের (বড়ত্বের) প্রশংসা করেছে।
এরপর যখন সে পড়বে-
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
'আমরা একমাত্র আপনারই 'ইবাদাত করি এবং শুধু আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি।
আল্লাহর জবাবের জন্য তখন সে একট থামবে। কল্পনা করবে, উত্তরে তিনি বলছেন-
هَذَا بَيْنِي وَبَيْنَ عَبْدِي
আমার ও আমার বান্দার মাঝে এটাই পার্থক্য।
এরপর যখন বান্দা পড়ে-
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمِ
صصِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ
আমাদের সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। তাদের পথ, যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ করেছেন। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি আপনার গাযব পতিত হয়েছে, তাদের পথও নয় যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।
কল্পনা করবে, তখন আল্লাহ্ বলছেন-
هَذَا لِعَبْدِي مَا سَأَلَ
আমার বান্দা যা চেয়েছে তা পাবে।
এভাবে বান্দা প্রতি আয়াতে আল্লাহ্র উত্তরের প্রতি মনোনিবেশ করবে।
যে ব্যক্তি সালাতের স্বাদ পেয়েছে, সে জানে, তাকবীর ও ফাতিহার বিকল্প আর কিছুই হতে পারে না। যেভাবে কিয়াম, রুকু' ও সিজদার কোনো বিকল্প হতে পারে না। সালাতের প্রতিটি কর্মই ভিন্ন ভিন্ন 'ইবাদাত। প্রতিটি 'ইবাদাতের স্বাদ ও রহস্য প্রভাব ও গুরুত্ব একদম ভিন্ন। যার কোনোটাই অন্যটার সমকক্ষ কিংবা বিকল্প হতে পারে না। এমনকি সূরা ফাতিহার প্রতিটি আয়াতও এক একটি 'ইবাদাত। একেকটির স্বাদ একেক রকম।
টিকাঃ
৯ মুসলিম, ৩৯৫; নাসায়ী, ৯০৯; আবূ দাউদ, ৮২১; তিরমিযী, ২৯৫৩