📄 ‘আল্লাহু আকবার’ বলা একটি ‘ইবাদাত
বান্দাকে আদেশ করা হয়েছে, তার চেহারা কিবলামুখি আর অন্তর আল্লাহমুখি করে রাখার জন্য। যেন দুনিয়ার সকল ব্যস্ততা, ঝুট-ঝামেলা তার অন্তর থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর সে মালিকের সামনে দয়াপ্রার্থী দাসের মতো বিনয়ী ভঙ্গিতে দাঁড়াবে। মালিকের সামনে বান্দা তার হাত ছেড়ে রাখবে। মাথা ঝুঁকিয়ে রাখবে। অন্তরে একাগ্রতা তৈরি করবে। যেন সালাতে তার অন্তর এদিক-ওদিক ছোটাছুটি না করে।
এভাবে সে আল্লাহ্র প্রতি পূর্ণ মনোযোগী হবে। এরপর ভরাট কণ্ঠে তাঁর বড়ত্ব ও মহত্ত্ব প্রকাশে বলবে- 'আল্লাহু আকবার'। অর্থাৎ, আল্লাহ্ মহান। যবানে উচ্চারণের সময় অন্তরকেও উপস্থিত রাখবে। তাহলে তার অন্তরেও একথা প্রোথিত হবে যে, সে যা-কিছু নিয়ে ভাবে, যা-কিছু নিয়ে কল্পনা করে, সেসব তুচ্ছ। আর আল্লাহ্ হলেন সবকিছু থেকে বড়। যদি মুখে উচ্চারণের সাথে সাথে অন্তরও আল্লাহ্র বড়ত্বের স্বীকৃতি না দেয়, তাহলে সে বিভিন্ন চিন্তায় মশগুল হয়ে পড়বে। তার অবস্থা এমন দাঁড়াবে যে, সে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে মুখে বলছে 'তিনি বড়', অথচ তার অন্তর অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত-যেন সেসব কিছুই তার কাছে আল্লাহ্ চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ! তবে, তার অন্তর ও জিহ্বা যদি একইসাথে 'আল্লাহু আকবার' বলে ওঠে, তার হৃদয় থেকে অহংকারের চাদর সরে যাবে-যা গাইরুল্লাহ্ (আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যকিছুর) প্রতি মনোযোগী হয়ে পড়া থেকে তাকে রক্ষা করবে।
তাকবীর একটি 'ইবাদাত। যা হৃদয় ও জিহ্বা দ্বারা পূর্ণতা পায় এবং যথার্থভাবে তা আদায় হয়। এই দুটি অঙ্গই আল্লাহ্ ও বান্দার মাঝে দূরত্বের সবচেয়ে বড় কারণ। নৈকট্যলাভের অন্যতম প্রতিবন্ধক।
📄 ‘সানা পড়া’ একটি ‘ইবাদাত
'আল্লাহু আকবার' বলে বান্দা হাত বাঁধবে। তার গুণকীর্তন করবে। সানা পড়বে-
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ
হে আল্লাহ্, আপনি মহাপবিত্র, আপনার জন্যই প্রশংসা, আপনার নাম বারকাতপূর্ণ, আপনার মর্যাদা সর্বোচ্চ।
যখন সালাত আদায়কারী সানা পড়ল, তখন সে আল্লাহর মর্যাদা অনুযায়ী প্রশংসা প্রকাশ করল। এর মাধ্যমে সে উদাসীনদের দল থেকে বেরিয়ে গেল। নিঃসন্দেহে ঔদাসীন্য আল্লাহ ও বান্দার মাঝে বড় অন্তরায়। তাছাড়া, সানা হলো একধরনের সম্ভাষণ, অভিবাদন। এর উপমা হলো এমন যে, কেউ যখন বাদশাহর দরবারে প্রবেশ করে প্রথমেই সে সালাম পেশ করে, গুণকীর্তন করে। এরপর তার চাওয়া-পাওয়ার আর্জি পেশ করে। সানাও ঠিক এমনই। সানায় আছে উপাসকের আদব। উপাস্যের মর্যাদা। এর দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়। আল্লাহ্ তাঁর বান্দার ওপর সন্তুষ্ট হন। এবং তার চাওয়া-পাওয়াগুলো পূর্ণ করেন।
টিকাঃ
৮ সহীহ মুসলিম, ৩৯৯
📄 ‘আ‘উযুবিল্লাহ...’ বলা একটি ‘ইবাদাত
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ
আমি আল্লাহ্র কাছে বিতাড়িত শাইতান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
অতঃপর যখন তিলাওয়াত শুরু করবে, তার পূর্বে 'আ'ঊযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতনির রজীম' পাঠ করবে। কেননা, শাইতান এধরনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বান্দার পদস্থলন ঘটাতে বেশি উৎসুক। সে যেকোনো মূল্যে বান্দাকে সালাতে যাওয়া থেকে ফিরিয়ে রাখার চেষ্টা করে; কিন্তু যখন সে অক্ষম হয়ে যায়, তখন সে চায়, বান্দার অন্তরকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে। খুশু-খুযু নষ্ট করতে। তাই সে অন্তরে কুমন্ত্রণা দিতে থাকে। যাতে বান্দা আল্লাহ্র সামনে দাঁড়িয়েও গাইরুল্লাহকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই বান্দাকে আদেশ করা হয়েছে, সে যেন 'আ'ঊযুবিল্লাহ...' পড়ে। আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শাইতান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে। যেন সে নিজেকে পদস্থলন থেকে নিরাপদ রাখতে পারে। অন্তরকে হিফাযত করতে পারে, এবং সে যেন এমন এক নূর অর্জন করতে পারে, যার দ্বারা সে কুর'আনের মর্ম অনুধাবন এবং এর গভীরতায় পৌঁছতে পারবে; যা অন্তরের জন্য এক সঞ্জীবনী সুধা। বান্দার সাফল্য। অতএব, শাইতান চায় কুর'আন পাঠের উদ্দেশ্য থেকে তাকে দূরে রাখতে।
আল্লাহ্ শাইতানের ব্যাপারে অবগত রয়েছেন। অবগত রয়েছেন তার হিংসা এবং শত্রুতা সম্পর্কে। তিনি এও জানেন-তার বান্দা শাইতানের মুকাবিলা করতে অক্ষম, অপারগ। তাই তিনি তাঁর নিকট সাহায্য চাওয়া এবং আশ্রয় প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন; যেন শাইতানের মুকাবিলায় তিনিই বান্দার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। যেন বান্দাকে বলা হচ্ছে, 'তোমার শক্তি নেই এই শত্রুর সাথে লড়াই করার; অতএব, তুমি আমার সহায়তা গ্রহণ করো। আমাকে ডাকো। আমি তোমাকে তার কুমন্ত্রণার নাগপাশ থেকে বাঁচিয়ে রাখবো।'
📄 ইবনু তাইমিয়ার উপদেশ
একবার শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (আল্লাহ্ তার আত্মাকে পবিত্র করুন, তার কবরকে আলোকিত রাখুন) শাইতানের কবল থেকে আশ্রয় প্রার্থনার ব্যাপারে আমাকে রূপক একটা উদাহরণ দিয়ে বললেন-
যদি কখনো পালের কোনো কুকুর তোমাকে দেখে আক্রমণের চেষ্টায় ঘেউ ঘেউ শুরু করে, তুমি তার সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ো না; বরং রাখালকে ডাকবে এবং তার সাহায্য চাইবে। সে-ই তোমাকে কুকুরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে।
যখন কোনো বান্দা অভিশপ্ত শাইতান হতে আল্লাহ্র নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে (অর্থাৎ, আ'উযুবিল্লাহ... পাঠ করে), তখন শাইতানের প্ররোচনা এবং মন্দ প্রভাব থেকে তিনি তাকে নিরাপদ রাখেন এবং তার অন্তরকে শৃঙ্খলমুক্ত করেন।
ফলে সালাত আদায়কারীর অন্তর কুর'আনের অর্থ উপলব্ধির প্রতি মনোযোগী হয়। কালামুল্লাহ্র মনোরম বাগানে বিচরণ করতে থাকে। এতে সে ওইসকল আশ্চর্যজনক দৃশ্যগুলো পরিদর্শন করে, যা তার বিবেক-বুদ্ধিকে আরও শাণিত করে এবং এর রত্নভাণ্ডার থেকে সে এমন সব জিনিস বের করে আনে, যা কোনো চোখ ইতোপূর্বে দেখেনি। যার বর্ণনা কোনো কান কখনো শোনেনি। এমনকি কোনো অন্তর তা কখনো কল্পনাও করেনি!
নাফস এবং শাইতানের প্ররোচনাই এসব বিস্ময় থেকে তাকে দূরে রাখে। কারণ, নাফসের বৈশিষ্ট্যই হলো শাইতানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়ে পড়া। তবে সে যখনই শাইতান থেকে নিজেকে দরে সরিয়ে নেয়, আল্লাহ তার অন্তরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। সত্যের পথে তাকে অটল রাখেন এবং পরম শান্তি ও নিরাপত্তা প্রদান করেন।