📄 সালাতের মধ্যবর্তী সময়ে বান্দার উদাসীনতা
এক সালাত থেকে আরেক সালাতের মধ্যবর্তী সময়ে কখনো কখনো বান্দা ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় নিজেকে গুনাহের কাজে জড়িয়ে ফেলে। উদাসীনতা, ত্রুটি-বিচ্যুতি তাকে পেয়ে বসে। এভাবে সে তার প্রতিপালকের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। নৈকট্যবঞ্চিত হয়। ফলে 'ইবাদাতের সাথে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে সে নিজেকে শাইতানের কাছে ছেড়ে দেয়। আর শাইতান তাকে আটক করে। বেড়ি পরায়। প্রবৃত্তির কারাগারে বন্দি করে রাখে। এতে করে তার অন্তর সংকীর্ণ হয়ে যায়। অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা, আক্ষেপ, মন্দভাব, হীনম্মন্যতা, খারাপলাগা তার ওপর জেঁকে বসে যদিও এগুলোর পেছনের কারণ সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রে সে উপলব্ধিই করতে পারে না। তার প্রতি আল্লাহ্র দয়া এই যে, তিনি তার জন্য বহু শাখাবিশিষ্ট এমন 'ইবাদাতের (সালাত) ব্যবস্থা করেছেন, যার প্রতিটি অংশ হতেই সে তার প্রয়োজন অনুপাতে কল্যাণ, অনুগ্রহ এবং নৈকট্য অর্জন করতে পারে।
📄 ওযু সম্পর্কে কিছু কথা
সালাত আদায়কারী ওযূর মাধ্যমে অপবিত্রতা থেকে নিজেকে পবিত্র করে নেয়। অতঃপর পবিত্র অবস্থায় আল্লাহ্র সামনে দাঁড়ায়।
প্রভাব অনুসারে ওযুর দুটি দিক রয়েছে। একটা প্রকাশ্য, অন্যটি অপ্রকাশ্য।
প্রকাশ্য দিকটি হলো: শারীরিক পবিত্রতা; অঙ্গসমূহ ধৌত করা।
আর অপ্রকাশ্য দিকটি হলো: অন্তরকে গুনাহ ও অন্যা কাজসমূহের অপবিত্রতা থেকে তাওবার মাধ্যমে পবিত্র করার সাথে সংশ্লিষ্ট। আল্লাহ্ তা'আলা উভয় পবিত্রতাকে একসাথে উল্লেখ করেছেন।
إن الله يُحِبُّ الثَّوبِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাওবাকারী এবং পবিত্রতা রক্ষাকারীদের পছন্দ করেন।
টিকাঃ
৬ সূরা বাকারাহ, ২: ২২২
📄 সালাতের পূর্ণতা যখন মসজিদে
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন কোনো ব্যক্তি ওযু করে, তখন সে কালিমায়ে শাহাদাত পড়বে। এরপর বলবে-
اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنْ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنْ الْمُتَطَهِّرِينَ
হে আল্লাহ্, আপনি আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আপনি আমাকে পবিত্রদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
তাহলে বান্দার পবিত্রতা পূর্ণতা পাবে :
এক. কালিমায় শাহাদাত দ্বারা শিরক থেকে
দুই. তাওবা দ্বারা গুনাহ থেকে
তিন. পানি দ্বারা নাপাকী থেকে
সালাত আদায়কারী যখন আল্লাহ্র সামনে যাওয়ার আগে পবিত্রতার সকল ধাপ পূর্ণ করে, তাকে অনুমতি দেওয়া হয় আল্লাহর ঘরে প্রবেশ করার। তাঁর সামনে দাঁড়ানোর। মাসজিদ আল্লাহ্র ঘর। মাসজিদ 'ইবাদাতের স্থান। এ কারণে অধিকাংশ ইমামের মতেই, ফরয সালাত মাসজিদে আদায় করা ওয়াজিব।
অন্যদিকে বান্দা যখন দুনিয়াবী কাজে ডুবে যায়, 'ইবাদাত থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়, তখন তার অবস্থা দাঁড়ায় পলাতক ভৃত্যের মতো যে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং হৃদয়কে তার প্রভুর জন্য নিয়োজিত করা থেকে বিরত রাখে। অতঃপর যেইমাত্র সে ভৃত্য তার প্রভুর নিকট ফিরে আসে, তার অবাধ্যতা আনুগত্যে রূপ নেয়। ঠিক তেমনই, বান্দা যখন বিনয়ের সাথে আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হয় এবং আল্লাহর নিকট নিজেকে সমর্পণ করে, আল্লাহর দয়া এবং করুণা তাকে ঘিরে ফেলে এবং আল্লাহ তাকে তার অনুগত বান্দা হিসেবে গ্রহণ করে নেন।
টিকাঃ
৭ 'উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যপ্তি সুন্দরভাবে ওযু করার পর বলে: 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তার কোনো অংশীদার নেই; আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও তাঁরই রাসূল; হে আল্লাহ, আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমাকে পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ট করুন। তো তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেওয়া হবে। সে নিজ ইচ্ছেমতো যেকোনো দরজা দিয়েই তাতে প্রবেশ করতে পারবে। (সহীহ মুসলিম, ২৩৪; তিরমিযী, ৫৫)
📄 ‘আল্লাহু আকবার’ বলা একটি ‘ইবাদাত
বান্দাকে আদেশ করা হয়েছে, তার চেহারা কিবলামুখি আর অন্তর আল্লাহমুখি করে রাখার জন্য। যেন দুনিয়ার সকল ব্যস্ততা, ঝুট-ঝামেলা তার অন্তর থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর সে মালিকের সামনে দয়াপ্রার্থী দাসের মতো বিনয়ী ভঙ্গিতে দাঁড়াবে। মালিকের সামনে বান্দা তার হাত ছেড়ে রাখবে। মাথা ঝুঁকিয়ে রাখবে। অন্তরে একাগ্রতা তৈরি করবে। যেন সালাতে তার অন্তর এদিক-ওদিক ছোটাছুটি না করে।
এভাবে সে আল্লাহ্র প্রতি পূর্ণ মনোযোগী হবে। এরপর ভরাট কণ্ঠে তাঁর বড়ত্ব ও মহত্ত্ব প্রকাশে বলবে- 'আল্লাহু আকবার'। অর্থাৎ, আল্লাহ্ মহান। যবানে উচ্চারণের সময় অন্তরকেও উপস্থিত রাখবে। তাহলে তার অন্তরেও একথা প্রোথিত হবে যে, সে যা-কিছু নিয়ে ভাবে, যা-কিছু নিয়ে কল্পনা করে, সেসব তুচ্ছ। আর আল্লাহ্ হলেন সবকিছু থেকে বড়। যদি মুখে উচ্চারণের সাথে সাথে অন্তরও আল্লাহ্র বড়ত্বের স্বীকৃতি না দেয়, তাহলে সে বিভিন্ন চিন্তায় মশগুল হয়ে পড়বে। তার অবস্থা এমন দাঁড়াবে যে, সে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে মুখে বলছে 'তিনি বড়', অথচ তার অন্তর অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত-যেন সেসব কিছুই তার কাছে আল্লাহ্ চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ! তবে, তার অন্তর ও জিহ্বা যদি একইসাথে 'আল্লাহু আকবার' বলে ওঠে, তার হৃদয় থেকে অহংকারের চাদর সরে যাবে-যা গাইরুল্লাহ্ (আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যকিছুর) প্রতি মনোযোগী হয়ে পড়া থেকে তাকে রক্ষা করবে।
তাকবীর একটি 'ইবাদাত। যা হৃদয় ও জিহ্বা দ্বারা পূর্ণতা পায় এবং যথার্থভাবে তা আদায় হয়। এই দুটি অঙ্গই আল্লাহ্ ও বান্দার মাঝে দূরত্বের সবচেয়ে বড় কারণ। নৈকট্যলাভের অন্যতম প্রতিবন্ধক।