📘 খুশূ-খুযূ > 📄 অন্তর কখন শুকিয়ে যায়

📄 অন্তর কখন শুকিয়ে যায়


মানুষের অন্তরের ব্যাপারটিও উপরের উদাহরণের মতোই। অন্তর শুকিয়ে যায় যখন নিচের পাঁচটি জিনিস তাতে অনুপস্থিত থাকে :
এক. আল্লাহ্র প্রতি ভালোবাসা,
দুই. তাঁর ব্যাপারে জ্ঞান,
তিন. আল্লাহ্র স্মরণ (যিক্র),
চার. তার নিকট দু'আ ও প্রার্থনা,
পাঁচ. এবং তাওহীদে বিশ্বাস।
এর কারণ হলো, প্রবৃত্তির তেজ ও লালসা প্রতিনিয়ত হৃদয়কে দগ্ধ করতে থাকে। এতে করে হৃদয়ের শাখা-প্রশাখা 'ইবাদাতে বাধাপ্রাপ্ত হয়, নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ফলে হৃদয়ও উপরোক্ত বৃক্ষের মতো একসময় শুধু আগুনেরই উপযুক্ত হয়ে পড়ে।
فَوَيْلٌ لِلْقُسِيَةِ قُلُوبُهُم مِّن ذِكْرِ اللَّهِ أُولَبِكَ فِي ضَلْلٍ مُّبِينٍ
অতএব, ধ্বংস সে সকল লোকদের জন্য-যাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেছে আল্লাহর স্মরণ থেকে। তারা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে নিপতিত।

টিকাঃ
৩ সূরা যুমার, ৩৯ : ২১

📘 খুশূ-খুযূ > 📄 অঙ্গসমূহের ব্যবহারে মানুষের প্রকারভেদ

📄 অঙ্গসমূহের ব্যবহারে মানুষের প্রকারভেদ


হৃদয় যখন রাহমাতের বর্ষণে সিক্ত থাকে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো থাকে সতেজ ও কোমল, তখন হৃদয়কে আল্লাহর 'ইবাদাতের প্রতি আহ্বান করা হলে তা দ্রুত সাড়া দেয় এবং শরীরের প্রতিটি কোষ তখন তার সঙ্গ দেয়। কল্যাণের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয় এবং প্রত্যেকটি 'ইবাদাতের যে ভিন্ন ভিন্ন ফল আছে, তা আহরণ করে এবং তা থেকে নিঃসৃত সঞ্জীবনী পানিই তার অন্তর ও অঙ্গসমূহের মাঝে প্রভাব সৃষ্টি করে। বিপরীতে, অন্তর যদি 'পানিশূন্য' (খুশু-খুযূ বিহীন) হয়ে পড়ে, তার সঞ্জীবনী শক্তি হারিয়ে ফেলে। ফলে তার শাখা-প্রশাখাও 'ইবাদাতবিমুখ হয়ে পড়ে।
প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু 'ইবাদাত, বিশেষ কিছু আনুগত্য। এসব 'ইবাদাতের জন্যই এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহের সৃষ্টি এবং এর জন্য রয়েছে উপযুক্ত প্রতিদানও।
অঙ্গসমূহের ব্যবহারে মানুষ প্রধানত তিনভাগে বিভক্ত :
প্রথম ভাগ :
এই শ্রেণির ব্যক্তি হলেন তারা-যারা তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে কেবল ওই সকল কাজে ব্যবহার করেন, যে কাজের জন্য তা সৃষ্টি করা হয়েছে। এরা হলেন সেইসব ব্যক্তি, যারা আল্লাহ্র সাথে ব্যবসা করেন। অধিক মুনাফায় আল্লাহর কাছে নিজেদের বিক্রি করে দেন।
যেহেতু সালাত এমনভাবে আদায়ের কথা বলা হয়েছে যেন অন্তরের সাথে সাথে দেহের প্রতিটি অঙ্গও এদের উপর নির্ধারিত 'ইবাদাত আদায় করে আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ করতে পারে, এই শ্রেণির ব্যক্তিগণ আল্লাহর এইসব নির্দেশনাকে অনুগ্রহ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং সেগুলো যথাযথভাবে মেনে চলেন। ফলে প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে, লোকসম্মুখে কিংবা নির্জনে-সর্বদা তারা নিজেদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ আল্লাহর আনুগত্যে নিয়োজিত রাখেন। প্রতিপালকের অবাধ্য-অসন্তুষ্টি ডেকে আনে-এমন কাজ থেকে নিজেকে এবং নিজের অঙ্গসমূহ হিফাযত করেন।
দ্বিতীয় ভাগ:
যে তার অঙ্গগুলোকে এমন কাজে ব্যবহার করে, যার জন্য সেগুলোর সৃষ্টি হয়নি; তারা সেগুলোকে অবিরাম নিষিদ্ধ ও পাপকাজে ব্যবহার করার মাধ্যমে আল্লাহর অবাধ্যতা প্রদর্শন করে। এ হলো সেই ব্যক্তি, যাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ, যাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত। তারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে না। 'আখিরাতের কোনো পাথেয় তারা পায় না; বরং তাদের পরিণাম হলো আল্লাহর অসন্তুষ্টি এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
তৃতীয় ভাগ :
এ প্রকারের ব্যক্তিরা অজ্ঞতা ও অলসতার দ্বারা তাদের অঙ্গগুলো অকেজো করে রাখে। তারা না দুনিয়া অর্জন করে, না 'আখিরাত। তারা এমন ব্যক্তি, যারা চরম ক্ষতিগ্রস্ত। দ্বিতীয় প্রকারের চেয়েও বেশি হতভাগা। কেননা, মানুষকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেওয়া হয়েছে কাজের জন্য। অনুসরণ, আনুগত্য ও 'ইবাদাতের জন্য; অনর্থক ফেলে রাখার জন্য নয়। এ ধরনের লোকেরা আল্লাহ্র কাছে সর্বাধিক ঘৃণিত। দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য বোঝা! যে ব্যক্তি বস্তুবাদী দুনিয়ার পেছনে ছুটে শুধু দুনিয়ার ধান্দা করে, 'আখিরাত বরবাদ করে, সে তো অবশ্যই নিন্দিত ও ক্ষতিগ্রস্ত-এতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু যে দুটিই নষ্ট করে, সে কেমন ক্ষতিগ্রস্ত?

টিকাঃ
৪ নিশ্চয়ই, আল্লাহ্ মু'মিনদের কাছ থেকে তাদের জান আর মাল কিনে নিয়েছেন; কারণ, (বিনিময়ে) তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে। অতঃপর (দুশমনদের) হত্যা করে এবং (নিজেরা) নিহত হয়।। সূরা তাওবাহ, ৯ : ১১১

📘 খুশূ-খুযূ > 📄 প্রত্যেকটির উপমা

📄 প্রত্যেকটির উপমা


প্রথম উপমা :
প্রথম ভাগ হলো সেই ব্যক্তির মতো, যাকে প্রশস্ত একখণ্ড জমি দেওয়া হয়েছে এবং চাষাবাদের জন্য দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় সকল যন্ত্রপাতি। বীজ ও পানি। অতঃপর সে চাষ শুরু করে। মাটিতে হাল দেয়। বীজ বপন করে। নানান স্বাদের ফলবান বৃক্ষচারা রোপণ করে। এরপর সীমানা-প্রাচীর তুলে জমি বেষ্টনী দেয়। এটুকুতেই সে ক্ষান্ত হয় না; বরং সে প্রহরা বসায়। কীটপতঙ্গ, পশুপাখি এবং অনিষ্টকর প্রাণীর ক্ষতির ব্যাপারে সে সজাগ দৃষ্টি রাখে। প্রতিদিন সে তার ফসলের দেখভাল করে। কোথাও কোনো চারা মরে গেলে সেখানে আরেকটি চারা রোপণ করে। নিয়মিত নিড়ানি দেয়। আগাছা পরিষ্কার করে। এভাবে শ্রম ও সময় দিয়ে সাজিয়ে তোলে তার প্রশস্ত জমি, এবং জমি থেকে যে ফসল উৎপন্ন হয়, সেগুলো দিয়ে সে তার আরও উন্নতি ঘটায়।
দ্বিতীয় উপমা :
দ্বিতীয় ভাগ হলো সেই ব্যক্তির মতো, যে তার জমিকে পোকা-মাকড় ও হিংস্র প্রাণীর অভয়ারণ্যে পরিণত করে রেখেছে। ভাগাড় ও নর্দমা বানিয়ে ফেলেছে। চোর-ডাকাত ও অনিষ্টকর মানুষের নিরাপদ আস্তানা করে তুলেছে। চাষাবাদের জন্য তাকে যে যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সে এই অমঙ্গল ও অনিষ্টকর প্রাণীর আস্তানা তৈরির সহজিকরণে ব্যবহার করে থাকে।
তৃতীয় উপমা :
তৃতীয় ভাগ হলো সেই ব্যক্তি, যে তার যন্ত্রগুলো অনর্থক ফেলে রাখে। মরুভূমি ও অনাবাদি জমিতে পানি সিঞ্চন করে। এরপর সে কেবল আক্ষেপ ও আফসোস নিয়ে বেঁচে থাকে। এ হলো উদাসীন, অলস ও সীমালঙ্ঘনকারী ব্যক্তির দৃষ্টান্ত।
এখানে তিন শ্রেণীর ব্যক্তির উপমা উপস্থাপন করা হয়েছে যার মধ্যে প্রথম উপমাটি হলো সচেতন ব্যক্তির। যে জিনিস-পত্রের সঠিক ব্যবহার করেছে। দ্বিতীয় উপমাটি হলো খিয়ানতকারী ব্যক্তির এবং তৃতীয় উপমাটি হলো উদাসীন, অলস ও সীমালঙ্ঘনকারী ব্যক্তির।
প্রথম ব্যক্তি :
সে যা-ই করে-স্থির থাকে কিংবা নড়াচড়া করে, ওঠে কিংবা বসে, খায় কিংবা পান করে, ঘুমায় কিংবা সজাগ থাকে, কাজ করে কিংবা পড়ে, চুপ থাকে কিংবা কথা বলে, সবকিছুই তার 'ইবাদাত। সকল অবস্থায় সে আল্লাহর যিকরে, আনুগত্যে নৈকট্যশীল বান্দাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে। এমন ব্যক্তি চলতে-ফিরতে সর্বদা আল্লাহ্র হুকুম মানে। তার আনুগত্য করে।
দ্বিতীয় ব্যক্তি :
দ্বিতীয় ব্যক্তি জীবন অতিবাহিত করে স্রষ্টার অবাধ্যতায়। মালিকের বিশ্বাসঘাতকতায়। কেননা, আল্লাহ্ তাকে এই অধিকার দেননি যে, সে তার এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরোধিতায় ব্যবহার করবে। নিষিদ্ধ কাজে প্রয়োগ করবে। অতএব, সে পাপী। নি'য়ামাতের খিয়ানতকারী। তার জন্য রয়েছে অশুভ পরিণতি। সে যা-ই করে সবই তার গুনাহ ও অবাধ্যতা। সর্বাবস্থায় সে অভিশাপ ও ক্ষতিগ্রস্ততায় ডুবে থাকে।
তৃতীয় ব্যক্তি :
তৃতীয় ব্যক্তি জীবনটা পার করে দিচ্ছে স্রষ্টা ও সৃষ্টির ঘৃণা নিয়ে। সে প্রবৃত্তির পূজারী। আত্মার অনুসারী। সে তার কোনো কর্ম দ্বারাই আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জন করতে পারে না। এ ব্যক্তি যে চরম ক্ষতিগ্রস্ত-তা সুস্পষ্ট। কেননা, জীবনের প্রতিটি অমূল্য মুহূর্ত সে অযথা নষ্ট করছে। তৃতীয় ব্যক্তি হলো উদাসীন, অলস ও সীমালঙ্ঘনকারী।

📘 খুশূ-খুযূ > 📄 সালাতের রহস্য

📄 সালাতের রহস্য


সালাতের রহস্য ও মূল হলো আল্লাহর দিকে মনোযোগী হওয়া। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাথে অন্তরকেও সালাতে যুক্ত করা। যদি কেউ সালাতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে, নিজের সাথে নিজে কথা বলে, নানান বিষয়ে চিন্তা করে, তাহলে তার দৃষ্টান্ত হলো ওই অপরাধীর মতো, যে বাদশাহর দরবারে রওনা হয় নিজের অপরাধ মার্জনার জন্য; বাদশাহর দয়া, দান ও করুণার মেঘ হতে সামান্য বর্ষণের আশায়; কিন্তু যখন সে দরবারে পৌঁছে, সে তখন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বাদশাহর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ডানে তাকায়, বামে তাকায়। অর্থাৎ, বাদশাহ যা অপছন্দ করেন তাতে সে লিপ্ত হয়ে যায়।
বাদশাহ যখন তার এই অবস্থা দেখেন; তার ন্যায় ও ইনসাফের দাবি হলো, এমন ব্যক্তির প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করা। কোনো দয়া না দেখানো। তবুও তিনি তার প্রতি দয়া দেখান। অনুগ্রহ করেন; কিন্তু চূড়ান্ত পুরস্কার বিতরণের দিন তিনি ঠিকই এই ব্যক্তি এবং খুশু-খুযুর সাথে সালাত আদায়কারীর মাঝে বড় একটা পার্থক্য করে দেবেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَلِكُلِّ دَرَجَتٌ مِّمَّا عَمِلُوا وَلِيُوَفِّيَهُمْ أَعْمَلَهُمْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
প্রত্যেকের জন্য তাদের কৃতকর্ম অনুযায়ী বিভিন্ন স্তর রয়েছে, যাতে আল্লাহ্ তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিফল দেন। বস্তুত তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না।
আল্লাহ্ তা'আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তার 'ইবাদাতের জন্য। আর অপর সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন মানুষের উপকারের জন্য। হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ্ তা'আলা বলেন-
হে আদম সন্তান, আমি তোমাকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার জন্য। বাকি সব সৃষ্টি করেছি তোমার জন্য। সুতরাং তোমার ওপর আমার কিছু হক রয়েছে। সেসব বস্তু যেন তোমাকে আমার হক থেকে ব্যস্ত করে না রাখে, যা তোমার জন্য সৃষ্টি করেছি।
অন্যত্র আছে-
হে মানবপুত্র, তোমাকে আমার 'ইবাদাতের জন্য বানিয়েছি; অবহেলা করো না। তোমার জীবিকার দায়িত্ব আমি নিয়েছি; পেরেশান হয়ো না। হে আদম-সন্তান, তুমি আমাকে চাও, আমাকে পাবে। যদি তুমি আমাকে পেয়ে যাও, তাহলে সব পেয়ে গেলে। আর যদি আমাকে হারাও, তাহলে সব হারালে। সুতরাং তোমার নিকট তো আমিই সর্বাধিক প্রিয় হওয়ার উপযুক্ত।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সালাতকে এমন একটি মাধ্যম বানিয়েছেন যার দ্বারা বান্দা তাঁর নৈকট্য অর্জন, তাঁর সাথে একান্তে কথা বলা, তাঁর ভালোবাসা, দয়া এবং ঘনিষ্ঠতা উপভোগ করার সুযোগ পায়।

টিকাঃ
৫ সূরা আহকাফ ৪৬ : ১৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00