📄 সালাত মু’মিনের জন্য আল্লাহর উপহারস্বরূপ
সালাত আল্লাহ্র পক্ষ থেকে মু'মিনের জন্য উপহার। তিনি তাদের সালাতের দিকে আহ্বান করেন। তাদের অন্তর সালাত দ্বারা পরিশুদ্ধ করেন। তিনি এই বারকাতময় উপঢৌকন রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে তাদের নিকট অর্পণ করেছেন। সালাত তাদের জন্য রাহমাত, যাতে তারা এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ মর্যাদায় সমাসীন হতে পারে। সর্বোচ্চ সফলতা ও নৈকট্য অর্জন করতে পারে। এতে আল্লাহ্র কোনো চাওয়া নেই; বরং এই সালাত আল্লাহ্র পক্ষ থেকে মু'মিনদের জন্য দয়া, সুবিশাল অনুগ্রহ। সালাতকে তিনি মু'মিনদের অন্তর এবং অঙ্গসমূহের 'ইবাদাত হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
তিনি মু'মিনদের জন্য সালাতকে এমন এক মাধ্যম বানিয়েছেন, যার দ্বারা মু'মিন আল্লাহ্ ব্যতীত সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে, একমাত্র আল্লাহর দিকে ধাবিত হতে পারে। তার নৈকট্যলাভে ধন্য হয়ে, ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে, তার সামনে দাঁড়ানোর স্বাদ উপভোগ করতে পারে এবং একজন দাস হিসাবে দাসত্বের যত আদেশ-নিষেধ রয়েছে তা যথাযথভাবে পূরণের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সম্মান ও সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পারে। এভাবে একজন বান্দা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কাছে প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে এবং আল্লাহ্ তাকে ভালোবাসতে শুরু করেন।
যেহেতু আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর বান্দাকে কামনা, প্রবৃত্তি ও বাহ্যিক উপায়-উপকরণ দিয়ে পরীক্ষা করে থাকেন, তাই তিনি এর পাশাপাশি দয়া ও অনুগ্রহস্বরূপ তার জন্য এমন এক 'দস্তরখানের' ব্যবস্থা করে রেখেছেন, যা সকল প্রকার খাবারে পরিপূর্ণ, স্বাদে ভরপুর; এবং যা রঙ-বেরঙের পানীয়, উপহার-উপঢৌকনসমৃদ্ধ। তিনি প্রতিদিন পাঁচবার সেই সমৃদ্ধ 'দস্তরখানে' তাকে ডাকেন, কোমল স্বরে আহ্বান করেন এমন অনুগ্রহের প্রতি-যা সুস্বাদু, পুষ্টিকর ও রুচিবর্ধক। কোনোকিছুর সাথে যে দস্তরখানের তুলনা চলে না। তিনি এ জন্যই এমন দস্তরখানের ব্যবস্থা করেছেন-যেন বান্দা 'ইবাদাতের পরিপূর্ণ স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী হতে পারে, এবং তার এই সালাত যেন তার গুনাহর (সাগিরা) কাফফারা হয়ে যায়। আল্লাহ্ তা'আলা সালাত আদায়কারীকে এক বিশেষ প্রকার নূর দান করেন। নিশ্চয় সালাত একটি নূর। অন্তর ও অঙ্গসমূহের শক্তি। রিযক প্রশস্ততার কারণ। ফেরেশতাগণ সালাত আদায়কারীকে দেখে আনন্দিত হন। যমীনের অধিবাসী, পাহাড়, বৃক্ষরাজি, সাগর-নদী-সবকিছু সালাত আদায়কারীকে নিয়ে গর্ব করে। কিয়ামাতের দিন এসব তার জন্য বিশেষ নূর ও সাওয়াব হিসেবে দেখা দেবে।
টিকাঃ
১ 'দস্তরখান' একটি ফারসী শব্দ। যে পাত্রে খাবার রেখে খাওয়া হয় সেটাই দস্তরখান।
📄 জমীনের সাথে অন্তরের উপমা
বান্দার অন্তরের ওপর শুষ্কতা ও রুক্ষতা (উদাসীনতা ও আলস্য) ধারাবাহিকভাবে আসতেই থাকে। তাই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাকে প্রতি মুহূর্তে দস্তরখানের দিকে নতুনভাবে আহ্বান করতে থাকেন।
যেহেতু কাঠিন্য ও খরায় আক্রান্ত অন্তর সর্বদা আল্লাহ্র রাহমাত বর্ষণের মুখাপেক্ষী, তাই তৃষ্ণার্ত হৃদয় শুধু এ বর্ষণের দিকেই ব্যাকুল নয়নে তাকিয়ে থাকে-যাতে 'ঈমানের গাছপালা এবং ইহসানের শস্য শুকিয়ে না যায়। অন্তর ও আত্মার উর্বর ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে না পড়ে। সেজন্য সে রাহমাতের মেঘ থেকে বৃষ্টি চায়। কখনো সে তার প্রতিপালকের কাছে অন্তরের এমন অবস্থার জন্য অভিযোগ পেশ করে মুক্তি কামনা করে এবং পানির প্রয়োজনের কথা বিনয়ের সাথে উপস্থাপন করে।
যতক্ষণ বান্দা আল্লাহ্র যিক্র (স্মরণে) মগ্ন থাকে এবং তার মনোনিবেশ কেবল আল্লাহ্র প্রতি নিবদ্ধ থাকে, ততক্ষণ তার ওপর মুষলধারে রাহমাতের বৃষ্টি বর্ষিত হয়। আর যখন সে উদাসীন হয়ে পড়ে, তার অবহেলার অনুপাতে রুক্ষতা এবং কাঠিন্য তাকে পেয়ে বসে।
হৃদয়ের খরা ও শুষ্কতা হলো উদাসীনতা, 'ইবাদাতের প্রতি অনীহা। যখন মালিকের সান্নিধ্যলাভের প্রতি তার এ অবহেলা ও উদাসীনতা প্রবল হয়ে ওঠে-তার হৃদয়ে খরা দেখা দেয়। উদ্ভিদ ও শস্যগুলো শুকিয়ে যায়। প্রবৃত্তির আগুন তাকে চারদিক থেকে জ্বালাতে থাকে। ফলে, বিভিন্ন ফল ও ফসল উৎপন্ন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা অনুর্বর ভূমিতে পরিণত হয়। এরপর কখনো যদি তাতে রাহমাতের বর্ষণ নামে, 'ঈমান ও 'আমালের সেই মরা ভূমি পুনরায় প্রাণ ফিরে পায়। নতুন করে উদ্ভিদ গজায়। চারদিক সুশোভিত হয়।
টিকাঃ
২ ইবনু মাজাহ, ৪২১০
📄 অন্তর কখন শুকিয়ে যায়
মানুষের অন্তরের ব্যাপারটিও উপরের উদাহরণের মতোই। অন্তর শুকিয়ে যায় যখন নিচের পাঁচটি জিনিস তাতে অনুপস্থিত থাকে :
এক. আল্লাহ্র প্রতি ভালোবাসা,
দুই. তাঁর ব্যাপারে জ্ঞান,
তিন. আল্লাহ্র স্মরণ (যিক্র),
চার. তার নিকট দু'আ ও প্রার্থনা,
পাঁচ. এবং তাওহীদে বিশ্বাস।
এর কারণ হলো, প্রবৃত্তির তেজ ও লালসা প্রতিনিয়ত হৃদয়কে দগ্ধ করতে থাকে। এতে করে হৃদয়ের শাখা-প্রশাখা 'ইবাদাতে বাধাপ্রাপ্ত হয়, নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ফলে হৃদয়ও উপরোক্ত বৃক্ষের মতো একসময় শুধু আগুনেরই উপযুক্ত হয়ে পড়ে।
فَوَيْلٌ لِلْقُسِيَةِ قُلُوبُهُم مِّن ذِكْرِ اللَّهِ أُولَبِكَ فِي ضَلْلٍ مُّبِينٍ
অতএব, ধ্বংস সে সকল লোকদের জন্য-যাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেছে আল্লাহর স্মরণ থেকে। তারা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে নিপতিত।
টিকাঃ
৩ সূরা যুমার, ৩৯ : ২১
📄 অঙ্গসমূহের ব্যবহারে মানুষের প্রকারভেদ
হৃদয় যখন রাহমাতের বর্ষণে সিক্ত থাকে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো থাকে সতেজ ও কোমল, তখন হৃদয়কে আল্লাহর 'ইবাদাতের প্রতি আহ্বান করা হলে তা দ্রুত সাড়া দেয় এবং শরীরের প্রতিটি কোষ তখন তার সঙ্গ দেয়। কল্যাণের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয় এবং প্রত্যেকটি 'ইবাদাতের যে ভিন্ন ভিন্ন ফল আছে, তা আহরণ করে এবং তা থেকে নিঃসৃত সঞ্জীবনী পানিই তার অন্তর ও অঙ্গসমূহের মাঝে প্রভাব সৃষ্টি করে। বিপরীতে, অন্তর যদি 'পানিশূন্য' (খুশু-খুযূ বিহীন) হয়ে পড়ে, তার সঞ্জীবনী শক্তি হারিয়ে ফেলে। ফলে তার শাখা-প্রশাখাও 'ইবাদাতবিমুখ হয়ে পড়ে।
প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু 'ইবাদাত, বিশেষ কিছু আনুগত্য। এসব 'ইবাদাতের জন্যই এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহের সৃষ্টি এবং এর জন্য রয়েছে উপযুক্ত প্রতিদানও।
অঙ্গসমূহের ব্যবহারে মানুষ প্রধানত তিনভাগে বিভক্ত :
প্রথম ভাগ :
এই শ্রেণির ব্যক্তি হলেন তারা-যারা তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে কেবল ওই সকল কাজে ব্যবহার করেন, যে কাজের জন্য তা সৃষ্টি করা হয়েছে। এরা হলেন সেইসব ব্যক্তি, যারা আল্লাহ্র সাথে ব্যবসা করেন। অধিক মুনাফায় আল্লাহর কাছে নিজেদের বিক্রি করে দেন।
যেহেতু সালাত এমনভাবে আদায়ের কথা বলা হয়েছে যেন অন্তরের সাথে সাথে দেহের প্রতিটি অঙ্গও এদের উপর নির্ধারিত 'ইবাদাত আদায় করে আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ করতে পারে, এই শ্রেণির ব্যক্তিগণ আল্লাহর এইসব নির্দেশনাকে অনুগ্রহ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং সেগুলো যথাযথভাবে মেনে চলেন। ফলে প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে, লোকসম্মুখে কিংবা নির্জনে-সর্বদা তারা নিজেদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ আল্লাহর আনুগত্যে নিয়োজিত রাখেন। প্রতিপালকের অবাধ্য-অসন্তুষ্টি ডেকে আনে-এমন কাজ থেকে নিজেকে এবং নিজের অঙ্গসমূহ হিফাযত করেন।
দ্বিতীয় ভাগ:
যে তার অঙ্গগুলোকে এমন কাজে ব্যবহার করে, যার জন্য সেগুলোর সৃষ্টি হয়নি; তারা সেগুলোকে অবিরাম নিষিদ্ধ ও পাপকাজে ব্যবহার করার মাধ্যমে আল্লাহর অবাধ্যতা প্রদর্শন করে। এ হলো সেই ব্যক্তি, যাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ, যাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত। তারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে না। 'আখিরাতের কোনো পাথেয় তারা পায় না; বরং তাদের পরিণাম হলো আল্লাহর অসন্তুষ্টি এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
তৃতীয় ভাগ :
এ প্রকারের ব্যক্তিরা অজ্ঞতা ও অলসতার দ্বারা তাদের অঙ্গগুলো অকেজো করে রাখে। তারা না দুনিয়া অর্জন করে, না 'আখিরাত। তারা এমন ব্যক্তি, যারা চরম ক্ষতিগ্রস্ত। দ্বিতীয় প্রকারের চেয়েও বেশি হতভাগা। কেননা, মানুষকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেওয়া হয়েছে কাজের জন্য। অনুসরণ, আনুগত্য ও 'ইবাদাতের জন্য; অনর্থক ফেলে রাখার জন্য নয়। এ ধরনের লোকেরা আল্লাহ্র কাছে সর্বাধিক ঘৃণিত। দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য বোঝা! যে ব্যক্তি বস্তুবাদী দুনিয়ার পেছনে ছুটে শুধু দুনিয়ার ধান্দা করে, 'আখিরাত বরবাদ করে, সে তো অবশ্যই নিন্দিত ও ক্ষতিগ্রস্ত-এতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু যে দুটিই নষ্ট করে, সে কেমন ক্ষতিগ্রস্ত?
টিকাঃ
৪ নিশ্চয়ই, আল্লাহ্ মু'মিনদের কাছ থেকে তাদের জান আর মাল কিনে নিয়েছেন; কারণ, (বিনিময়ে) তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে। অতঃপর (দুশমনদের) হত্যা করে এবং (নিজেরা) নিহত হয়।। সূরা তাওবাহ, ৯ : ১১১