📄 তাঁর সম্পর্কে শাইখগণের মন্তব্য
হাফিয ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন-
তিনি হাদীস শুনতেন এবং 'ইলমের গভীরতায় হারিয়ে যেতেন। হাদীস, তাফসীর ও ফিকহের মূলনীতিতে তিনি তার সমসাময়িক সকল 'আলিমকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। ৭১২ হিজরীতে ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্ মিশর ছেড়ে দামেস্ক চলে আসেন। তখন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দীর্ঘ সতেরো বছর ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ তার সান্নিধ্যে ছিলেন। রাতদিন 'ইলমের সাগরে সাঁতার কাটতেন। এভাবে ধীরে ধীরে অধ্যয়নের মাধ্যমে বিভিন্ন শাস্ত্রে নিজেকে একক ও অনন্য করে গড়ে তোলেন তিনি। এভাবেই নিজেকে তিনি পরিণত করেন এক প্রস্ফুটিত গোলাপে।
হাফিয ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ্ আরও বলেন-
তিনি ছিলেন উত্তম চরিত্রের অধিকারী। দরদী ও সহনশীল। দুনিয়ার প্রতি ছিলেন নির্মোহ ও নিরাসক্ত একজন মানুষ। কারও সাথে কোনো মনোমালিন্য ছিল না। কখনো কারও গীবত কিংবা ছিদ্রান্বেষণ করতেন না। কাউকে কষ্ট দিতেন না। আমি ছিলাম তার কাছের ও প্রিয়দের একজন। আমাদের যুগে আমি তার মতো 'আবিদ গোটা বিশ্বে দ্বিতীয় আর কাউকে দেখিনি! তার সালাত ছিল দেখার মতো। রুকু'-সিজদা হতো প্রলম্বিত। কখনো সালাত এত দীর্ঘায়িত করতেন যে, সাথিরা অভিযোগ করত। তবুও তিনি তা থেকে ফেরেননি। মৃত্যু পর্যন্ত এভাবেই সালাত আদায় করে গেছেন।
হাফিয ইবনু রজব রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন-
তিনি ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্-র সান্নিধ্যে থেকে 'ইলমের সকল শাখায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। তাফসীরের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। শারী'আতের মূলনীতি, হাদীস ও ফিকহের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় অনুধাবনে কেউ তার সমপর্যায়ের ছিল না। 'আরবী ভাষা-সাহিত্য ও তর্কশাস্ত্রে ছিল তার অবাধ বিচরণ। তাসাউফ এবং আত্মশুদ্ধির পথে তিনি ছিলেন অগ্রপথিক।
ইবনু রজব রাহিমাহুল্লাহ্ আরও বলেন-
তিনি খুব 'ইবাদাতগুযার ছিলেন। সালাত অত্যাধিক পরিমাণে দীর্ঘায়িত করতেন। প্রভুভক্তি, সুন্নাতের অনুসরণ, বিনয় ও নম্রতা, দুনিয়ার প্রতি নির্মোহতা ছিল তার চরিত্রের অনন্য ভূষণ। 'ইবাদাতে তার সমকক্ষ আমি আর কাউকে খুঁজে পাইনি। আমি জানি, তিনি নিষ্পাপ নন; কিন্তু তার মতো নিষ্পাপও আমি আর কাউকে দেখিনি।
ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্ ছিলেন ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ-র শিক্ষক। ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্-র সাথে থাকার কারণে ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ-কেও অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুকাবিলা করতে হয়েছে। বাতিলের চোখরাঙানি, শাসকের হুশিয়ারির সম্মুখীন হতে হয়েছে। জেল-যুলুম তো ছিলই। তবুও কখনো তিনি ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্-র সান্নিধ্য ছেড়ে যাননি। ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্ দামেস্কে আসেন ৭১২ হিজরীতে। তখন থেকে ৭২৮ পর্যন্ত সতের বছর ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ্ তার সাথে ছায়ার মতো লেগে ছিলেন। আর ওই বছরই ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্ ইনতিকাল করেন।
ইমাম শাওকানী রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন-
ইলমের বিভিন্ন শাখায় তার অসামান্য দখল ছিল। সমসাময়িক সকলের মাঝে ছিলেন অতুলনীয়। উজ্জ্বল নক্ষত্র। আসলাফদের মাযহাব সম্পর্কে তিনি গভীর পাণ্ডিত্য রাখতেন। তিনি তার জীবদ্দশায় জগৎজোড়া খ্যাতি লাভ করেন।
ইমাম সুয়ূতী রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন-
তিনি লেখক, সংকলক, বিতার্কিক ও বিদগ্ধ মুজতাহিদ। হাদীস, তাফসীর ও ফিকহের শাখাগত ক্ষেত্রে তাকে অনেকেই ইমামগণের সমপর্যায়ে গণ্য করে থাকেন। ইবনুল কায়্যিম-এর জ্ঞানের পরিধি সুবিস্তৃত। জ্ঞানের এই বিশালতা তিনি অর্জন করেছেন বিভিন্ন শাইখ থেকে। বিশেষত ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ; তার থেকেই তিনি সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন।
📄 ‘উস্তাদগণের নাম
১. শাইখুল ইসলাম আবুল 'আব্বাস আহমদ বিন 'আব্দুল হালীম বিন 'আব্দুস সালাম বিন তাইমিয়া।
২. আবুল 'আব্বাস আহমদ বিন 'আব্দুর রাহমান বিন 'আব্দুল মুনাইম আল হাম্বলী। রাহিমাহুল্লাহ্। (মৃত্যু-৬৯৭ হিজরি)
৩. ইসমা'ঈল মাজদুদ্দীন বিন মুহাম্মাদ আল ফাররা। রাহিমাহুল্লাহ্। (মৃত্যু-৭২৯ হিজরি)
৪. মুহাম্মাদ শামসুদ্দীন আবু 'আব্দিল্লাহ্ বিন আবিল ফাতাহ আল হাম্বলী। রাহিমাহুল্লাহ্। (মৃত্যু-৭০৯ হিজরি)
৫. ইউসুফ জামালুদ্দীন আবুল হাজ্জাজ বিন যাকিউদ্দীন 'আবদুর রাহমান। রাহিমাহুল্লাহ্। (মৃত্যু-৭৪২ হিজরি)
এছাড়াও তাঁর আরও অনেক 'উস্তায ছিলেন।
📄 তাঁর হাতে-গড়া প্রসিদ্ধ কিছু ছাত্রের নাম
১. আল হাফিয আল মুফাসসির আল মাশহুর, 'ইমাদুদ্দীন ইসমা'ঈল আবুল ফিদা বিন 'উমার বিন কাসীর আশ-শাফে'য়ী। তিনি ইবনু কাসীর নামেই অধিক প্রসিদ্ধ। রাহিমাহুল্লাহ্। (মৃত্যু-৭৭৪ হিজরি)
২. 'আব্দুর রাহমান যাইনুদ্দীন আবুল ফারায ইবনু আহমদ ইবনু 'আবদুর রাহমান। তিনিই বিখ্যাত ইবনু রজব হাম্বলী। রাহিমাহুল্লাহ্। (মৃত্যু-৭৯৫ হিজরি)
৩. মুহাম্মাদ শামসুদ্দিন আবূ 'আব্দিল্লাহ্ বিন আহমাদ বিন 'আব্দুল হাদি। রাহিমাহুল্লাহ্। (মৃত্যু-৭৪৪ হিজরি)
📄 প্রকাশিত গ্রন্থ
তিনি অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। সংকলন করেছেন অনেক বড় বড় কিতাব। তার চিন্তার দূরদর্শিতা এবং জ্ঞানের গভীরতা ফুটে ওঠে তার লিখনীতে। এমনকি যুগযুগ ধরে তা পরবর্তীদের জন্য পাথেয় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। শাইখ জালিল বাকর আবূ যায়দ রাহিমাহুল্লাহ্ ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ্-র গ্রন্থাবলির একটি তালিকা করেছেন, যার সংখ্যা ৯৬ ছাড়িয়ে! তন্মধ্যে প্রকাশিত প্রসিদ্ধ কিছু কিতাবের নাম:
১. যাদুল মা'আদ (চার খণ্ড)
২. তাহযীব সুনানে আবি দাউদ ওয়া ইযাহু মুশকিলাতিহি।
৩. সফরুল হিজরাতাইন।
৪. মারাহিলুস সায়িরীন।
৫. আল কালিমুত তাইয়্যিব।
৬. যাদুল মুসাফিরীন।
৭. নকদিল মানকূল।
৮. ই'লামুল মু'কীয়ীন 'আন রব্বিল 'আলামীন (তিন খণ্ড)।
৯. বাদায়িয়ুল ফাওয়ায়িদ (দুই খণ্ড)।
১০. আস সাওয়ায়িকুল মুরসালা।
১১. হাদীউল আরওয়াহ ইলা বিলাদিল আফরাহ।
১২. নুযহাতুল মুশতাকীন।
১৩. আদ্দাউ ওয়াদ্দাওয়।
১৪. মিফতাহ্র দারিস সা'আদাহ্ (একটি বিশাল গ্রন্থ)।
১৫. গরীবুল উসলুব।
১৬. ইজতিমা'উ জুয়ুশিল ইসলামিয়া।
১৭. কিতাবুত তুরুকিল হিকমাহ্।
১৮. 'ইদ্দাতুস সাবিরীন।
১৯. ইগাসাতুল লাহিফান।
২০. আত তিবয়ান ফী আকসামিল কুর'আন।
২১. কিতাবুর রূহ।
২২. আসসিরাতুল মুসতাকীম।
২৩. আল ফাতহুল কুদসী।
২৪. আততুহফাতুল মাক্কীয়াহ।
২৫. আল ফাতাওয়া, ইত্যাদি।
২৬. জাম 'উল ইফহাম।
২৭. আসরারুস সলাহ।
২৮. রওজাতুল মুহিব্বীন ও নুযহাতুল মুসতাকীন।
২৯. আহকামু আহলিয যিম্মী।
৩০. জালাউল আফহামি ফিসসালাতি ওসসালামু আ'লা খাইরিল আনামী।
৩১. আহকামুল মাউলুদ।
৩২. আল জাওয়াবুল কাফি লিমান সাআলা আন দাওয়া ইশশাফী।
৩৩. হুকমু তারিকিস সালাহ
৩৪. আসসাওয়া'ইকুল মুরসালাতু 'আলাল জাহমিয়্যাতি।
৩৫. আততুরুকুল হিকমিয়্যাহ ফি সিয়াসাতিল ইসলামিয়্যাহ।
৩৬. মিফতাহু দারিস সা'আদাহ।
মুসলিম উম্মাহর এই অতন্দ্র প্রহরী জীবনভর ইসলামের অনেক খেদমত করেছেন। নিজের চিন্তা-চেতনা, বিবেক-বুদ্ধি, জ্ঞান ও 'ইলমের কাছে পরবর্তীদের চির ঋণী করে রেখেছেন। এই দীপ্তিমান প্রদীপটি ষাট বছর বয়সে ৭৫১ হিজরীর ১৩ই রজব বুধবার দিবাগত রাতে 'ঈশার 'আযানের সময় চিরদিনের জন্য নিভে যায়। পরদিন যুহরের সালাতের পর তার জানাযা অনুষ্ঠিত হয়-যা তৎকালীন সর্ববৃহৎ জানাযা। দামেস্কের 'আল বাবুস সগীর' নামক কবরস্থানে পিতার পাশে আজও তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত। আল্লাহ্ তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন। এবং জান্নাতের উঁচু মাকাম নসীব করুন।