📄 জন্ম ও পরিচয়
ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ্ ৬৯১ হিজরী সনের সফর মাসের সাত তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মস্থান সিরিয়ার দামেস্ক। তার আসল নাম মুহাম্মাদ। উপনাম আবূ 'আব্দিল্লাহ্। উপাধি শামসুদ্দীন (দ্বীনের রবি)। পিতার নাম আবূ বাকর। দাদা আইয়্যুব ইবনু সা'দ। তবে তিনি 'ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ' নামেই অধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেন। অনেকে শুধু 'ইবনুল কায়্যিম' বলেও সম্বোধন করে থাকেন।
এই নামে প্রসিদ্ধির কারণ হলো, তার সম্মানিত পিতা আবু বাকর বিন আইয়্যুব তৎকালে দামেস্কের 'মাদরাসাতুজ জাওযিয়্যাহ'র অন্যতম ব্যবস্থাপক ছিলেন। দীর্ঘদিন সেখানে অধ্যাপনার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। ফলে সেসময় তাকে 'কায়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ' নামে ডাকা হতো। পরবর্তী সময়ে তাঁরই সন্তান মুহাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ্ 'ইবনু কায়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ' (কায়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ'র ছেলে) নামেই অধিক পরিচিতি লাভ করেন।
📄 শিক্ষা-জীবন
হাফিয ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ্ একটি দ্বীনি পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তিনি লালিতপালিত হয়েছেন 'ইলম ও 'আমালের চর্চায় নিরত একটি পরিবারে। তাই ছোটবেলা থেকেই তার মাঝে 'ইলমের প্রতি প্রচণ্ড ঝোঁক পরিলক্ষিত হয়। দিন দিন যেন তার জ্ঞান আহরণের পিপাসা বাড়ছিল। তিনি জ্ঞানার্জনে ব্রত হলেন। বিভিন্ন শাস্ত্র নিয়ে অধ্যয়ন শুরু করলেন। তাঁর সম্মানিত পিতাও একজন বিজ্ঞ 'আলিম হওয়ায় উদ্দেশ্য ও বিধেয় ষোলকলায় পূর্ণ হতে তাকে খুব বেশি বেগ পোহাতে হয়নি।
হাফিয ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ্ ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ্-র পিতার সম্পর্কে বলেন, 'আবূ বাকর বিন আইয়্যুব বিন সা'দ আল-হাম্বলী ছিলেন শ্রদ্ধেয়, সম্মানিত, নেক ও পরহেযগার ব্যক্তি। গণ্যমান্য এবং ভণিতামুক্ত একজন সাহসী মানুষ।'
পিতার কাছেই প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি। পিতাই তার প্রথম শিক্ষক। এছাড়াও তিনি 'ইলমের জন্য তৎকালীন অনেক বিজ্ঞ 'আলিমের শরণাপন্ন হয়েছেন।
যদি তার রচনাবলি ও সংকলন সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করা হয়, তাহলে সহজেই অনুমান করা যায়, তিনি কত গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। আকীদা, ফিকহ, হাদীস, দর্শন, উসূল, তাফসীর, ভাষা, সাহিত্য, ফারায়েয ও তাসাউফসহ নানান শাস্ত্রে তিনি অগাধ পাণ্ডিত্য রাখতেন।
'ইলমের পেছনে তার ব্যতিব্যস্ততা এবং বিদগ্ধ 'আলিম হওয়া সত্ত্বেও কখনো কোনো নফল-মুস্তাহাব 'আমালও ছুটে যেত না। তিনি মুহাক্কিক 'আলিম হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন বুযুর্গ ও যাহিদ। 'ইলম ও 'আমালের অপূর্ব সমন্বয়কারী এক ব্যক্তি।
📄 তাঁর সম্পর্কে শাইখগণের মন্তব্য
হাফিয ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন-
তিনি হাদীস শুনতেন এবং 'ইলমের গভীরতায় হারিয়ে যেতেন। হাদীস, তাফসীর ও ফিকহের মূলনীতিতে তিনি তার সমসাময়িক সকল 'আলিমকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। ৭১২ হিজরীতে ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্ মিশর ছেড়ে দামেস্ক চলে আসেন। তখন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দীর্ঘ সতেরো বছর ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ তার সান্নিধ্যে ছিলেন। রাতদিন 'ইলমের সাগরে সাঁতার কাটতেন। এভাবে ধীরে ধীরে অধ্যয়নের মাধ্যমে বিভিন্ন শাস্ত্রে নিজেকে একক ও অনন্য করে গড়ে তোলেন তিনি। এভাবেই নিজেকে তিনি পরিণত করেন এক প্রস্ফুটিত গোলাপে।
হাফিয ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ্ আরও বলেন-
তিনি ছিলেন উত্তম চরিত্রের অধিকারী। দরদী ও সহনশীল। দুনিয়ার প্রতি ছিলেন নির্মোহ ও নিরাসক্ত একজন মানুষ। কারও সাথে কোনো মনোমালিন্য ছিল না। কখনো কারও গীবত কিংবা ছিদ্রান্বেষণ করতেন না। কাউকে কষ্ট দিতেন না। আমি ছিলাম তার কাছের ও প্রিয়দের একজন। আমাদের যুগে আমি তার মতো 'আবিদ গোটা বিশ্বে দ্বিতীয় আর কাউকে দেখিনি! তার সালাত ছিল দেখার মতো। রুকু'-সিজদা হতো প্রলম্বিত। কখনো সালাত এত দীর্ঘায়িত করতেন যে, সাথিরা অভিযোগ করত। তবুও তিনি তা থেকে ফেরেননি। মৃত্যু পর্যন্ত এভাবেই সালাত আদায় করে গেছেন।
হাফিয ইবনু রজব রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন-
তিনি ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্-র সান্নিধ্যে থেকে 'ইলমের সকল শাখায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। তাফসীরের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। শারী'আতের মূলনীতি, হাদীস ও ফিকহের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় অনুধাবনে কেউ তার সমপর্যায়ের ছিল না। 'আরবী ভাষা-সাহিত্য ও তর্কশাস্ত্রে ছিল তার অবাধ বিচরণ। তাসাউফ এবং আত্মশুদ্ধির পথে তিনি ছিলেন অগ্রপথিক।
ইবনু রজব রাহিমাহুল্লাহ্ আরও বলেন-
তিনি খুব 'ইবাদাতগুযার ছিলেন। সালাত অত্যাধিক পরিমাণে দীর্ঘায়িত করতেন। প্রভুভক্তি, সুন্নাতের অনুসরণ, বিনয় ও নম্রতা, দুনিয়ার প্রতি নির্মোহতা ছিল তার চরিত্রের অনন্য ভূষণ। 'ইবাদাতে তার সমকক্ষ আমি আর কাউকে খুঁজে পাইনি। আমি জানি, তিনি নিষ্পাপ নন; কিন্তু তার মতো নিষ্পাপও আমি আর কাউকে দেখিনি।
ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্ ছিলেন ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ-র শিক্ষক। ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্-র সাথে থাকার কারণে ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ-কেও অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুকাবিলা করতে হয়েছে। বাতিলের চোখরাঙানি, শাসকের হুশিয়ারির সম্মুখীন হতে হয়েছে। জেল-যুলুম তো ছিলই। তবুও কখনো তিনি ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্-র সান্নিধ্য ছেড়ে যাননি। ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্ দামেস্কে আসেন ৭১২ হিজরীতে। তখন থেকে ৭২৮ পর্যন্ত সতের বছর ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ্ তার সাথে ছায়ার মতো লেগে ছিলেন। আর ওই বছরই ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্ ইনতিকাল করেন।
ইমাম শাওকানী রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন-
ইলমের বিভিন্ন শাখায় তার অসামান্য দখল ছিল। সমসাময়িক সকলের মাঝে ছিলেন অতুলনীয়। উজ্জ্বল নক্ষত্র। আসলাফদের মাযহাব সম্পর্কে তিনি গভীর পাণ্ডিত্য রাখতেন। তিনি তার জীবদ্দশায় জগৎজোড়া খ্যাতি লাভ করেন।
ইমাম সুয়ূতী রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন-
তিনি লেখক, সংকলক, বিতার্কিক ও বিদগ্ধ মুজতাহিদ। হাদীস, তাফসীর ও ফিকহের শাখাগত ক্ষেত্রে তাকে অনেকেই ইমামগণের সমপর্যায়ে গণ্য করে থাকেন। ইবনুল কায়্যিম-এর জ্ঞানের পরিধি সুবিস্তৃত। জ্ঞানের এই বিশালতা তিনি অর্জন করেছেন বিভিন্ন শাইখ থেকে। বিশেষত ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ; তার থেকেই তিনি সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন।
📄 ‘উস্তাদগণের নাম
১. শাইখুল ইসলাম আবুল 'আব্বাস আহমদ বিন 'আব্দুল হালীম বিন 'আব্দুস সালাম বিন তাইমিয়া।
২. আবুল 'আব্বাস আহমদ বিন 'আব্দুর রাহমান বিন 'আব্দুল মুনাইম আল হাম্বলী। রাহিমাহুল্লাহ্। (মৃত্যু-৬৯৭ হিজরি)
৩. ইসমা'ঈল মাজদুদ্দীন বিন মুহাম্মাদ আল ফাররা। রাহিমাহুল্লাহ্। (মৃত্যু-৭২৯ হিজরি)
৪. মুহাম্মাদ শামসুদ্দীন আবু 'আব্দিল্লাহ্ বিন আবিল ফাতাহ আল হাম্বলী। রাহিমাহুল্লাহ্। (মৃত্যু-৭০৯ হিজরি)
৫. ইউসুফ জামালুদ্দীন আবুল হাজ্জাজ বিন যাকিউদ্দীন 'আবদুর রাহমান। রাহিমাহুল্লাহ্। (মৃত্যু-৭৪২ হিজরি)
এছাড়াও তাঁর আরও অনেক 'উস্তায ছিলেন।