📄 বন্দি ও রোমের বাদশাহ
একবার ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) রোমের বাদশাহর কাছে একজন দূত প্রেরণ করলেন। লোকটি বাদশাহর সাথে কথা সেরে বের হওয়ার সময় দেখল এক লোক বসে কোরআন তেলাওয়াত করছে আর হাত বীজ ছূঁয়ে ধরছে। আগত দূত লোকটিকে ছূঁই তিনবার সালাম দিল, কিন্তু তবুও লোকটি কোনো উত্তর দিল না। এবার লোকটি বলল, এ শহরে সালাম দিবে কে?
দূত লোকটিকে বলল, আমি আমীরুল মুমিনীন ওমর বিন আব্দুল আযীযের দূত রোমের বাদশাহ কাছে দেখা করতে এসেছি।
সে তাকে বলল, তুমি কি অবস্থা?
লোকটি বলল, আমি অমুক জায়গায় থেকে বন্দি হয়েছি। আমাকে রোম সম্রাটের দরবারে নিয়ে আসা হলে সে আমাকে স্ত্রীর ধর্ম গ্রহণ করতে বলে। আমি তা গ্রহণে অস্বীকার করি।
সে আমাকে বলল, যদি তুমি তা না কর তাহলে তোমার চোখ উপড়ে ফেলা হবে। তখন আমি চোখের পরিবর্তে ইসলামকেই প্রাধান্য দিয়েছি। পরে সে আমার দু চোখ উপড়ে ফেলে। তারা প্রতিদিন আমার কাছে গম পাঠায় সেগুলো আমি চূর্ণ করি আর আমার খাওয়ার জন্য একটি রুটি পাঁটায় সেট খাই।
দূত দেশে ফিরে আসার পর ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-এর কাছে লোকটির কথা বর্ণনা করে। তিনি এ করুণ কাহিনী শুনে দু চোখের পানিতে তার বুক ভেসে গেল।
তখন ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) রোমের বাদশার কাছে লিখলেন...
পরকথা, অমুকের ছেলে অমুকের কথা আমি জানতে পেরেছি। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, হয়তো তুমি তাকে ফিরত পাঠাবে নতুবা আমি তোমার বিরুদ্ধে এত পরিমাণ সৈন্য পাঠাব যা অগ্রভাগ থেকে তোমার কাছে আর শেষভাগ থাকবে আমার কাছে।
এরপর একজন দূত চিঠি নিয়ে রোম সম্রাটের দরবারে পৌঁছে গেলেন। সম্রাট চিঠিটা পড়ে বলল, আমরা একজন সৎ লোকের সাথে যুদ্ধ করতে চাই না; বরং একে পাঠিয়ে দিব।
বন্দি যেখানে অবস্থান করছিল তার অপেক্ষায় ওই দূত সেখানে অবস্থান করছিল। এরই মধ্যে একদল দিনারবাহী দূতেরা ডাক পড়ে। সে এসে দেখল রোমের সম্রাট সিংহাসন ছেড়ে জমিনের ওপর বসে আছে।
সম্রাট দূতকে লক্ষ্য করে বলল, তুমি কি বলতে পার আমি এমনটি কেন করেছি।
দূত বলল, না।
সম্রাট বলল, আমি বিভিন্ন দিক থেকে সংবাদ পেয়েছি সে সৎ লোক মারা গেছেন।
এ কথা শুনে দূত বন্দিকে ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়লেন। তাই সে রোম সম্রাটকে বলল, আপনি কি আমাকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছেন?
রোম সম্রাট দূতের চেহারায় হতাশার ভাব দেখে বলল, আমরা তো এমন নই যে, জীবিত অবস্থায় তাঁর কথা মেনে নেব আর তাঁর মৃত্যুর পর তা ভঙ্গ করব।
অতঃপর দূতকে সাথে বন্দিকে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন।
📄 সৎ লোকটি মারা গেছেন
আমীরুল মুমিনীন ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) রোমানদের হাতে বন্দি মুসলিমদের ফিরত আনতে বন্দি বিনিময় চুক্তির ভিত্তিতে মুসলমানদের কাছে আটটি রোমানবাসীদের আশায়, কিন্তু না, তারা দেখছিলেন স্বয়ং দূত কাঁদছে।
উপস্থিত লোকেরা তাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করল।
সে বলল, আমীরুল মুমিনীন ওমর বিন আব্দুল আযীয মারা গেছেন।
এতে উপস্থিত লোকদের মাঝে কান্নার রোল পড়ে গেল। তারা কাঁদতে কাঁদতে মসজিদে প্রবেশ করল। মসজিদে প্রবেশ করার পর সকলের সম্মুখে দূত আমীরুল মুমিনীন ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-এর মৃত্যুর কথা ঘোষণা করল।
সে আরো বলল, আমার ধারণা যদি ঈসা রুহুল্লাহর ন্যায় মৃত্যুর পর পুনরায় কাউকে জীবন দান করা হতো তবে সে হতো ওমর বিন আব্দুল আযীয।
সে আরো বলল, যদি কোনো পুত্তী দুনিয়াদারী ত্যাগ করে দরজা বন্ধ করে সারাটি জীবন ইবাদতে কাটিয়ে দেয় তবে তাকে আমি আশ্চর্য হব না। কিন্তু আশ্চর্য তো ওই লোককে নিয়ে যার পদতলে দুনিয়া এসেছে, কিন্তু তিনি তা ত্যাগ করে ইবাদতে মগ্ন হয়েছেন।
একদিন দিনার বিন মালিককে জনৈক এক ব্যক্তি ডাক দিয়ে বলল, হে দুনিয়াবাদী.........
তখন তিনি লোকটিকে বললেন, আল্লাহ্র শপথ! আমি দুনিয়াবাবাদী নই।
দুনিয়াবাবাদী তো হচ্ছেন ওমর বিন আব্দুল আযীয যার পদতলে দুনিয়া এসেছিল, কিন্তু তিনি তা ত্যাগ করেছেন।
📄 মানুষের কান্না
আমীরুল মুমিনীন ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-এর দূত যখনই বসরারতে এসে পৌঁছতেন তখন লোকজন আনন্দের তাঁর দিকে দ্রুত ছুটে আসত। কারণ তারা জানত যে, ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-এর দূত কোনো না কোনো সুসংবাদ দিবে অথবা ভালো নির্দেশ দিবে অথবা কোনো খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিবে।
এসব নিশ্চয়তার কারণেই তারা দ্রুততার সাথে মসজিদে এসে উপস্থিত হতো এবং দূত আমীরুল মুমিনীন এর চিঠি পাঠ করে শেষ করা পর্যন্ত তারা বসে থাকত।
একইভাবে একদিন দূত এসে উপস্থিত হলো। পূর্বের ন্যায় এবারও তারা ছুটে আসল লোকজনের সুসংবাদের আশায়, কিন্তু না, তারা দেখছিলেন স্বয়ং দূত কাঁদছে।
উপস্থিত লোকেরা তাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করল।
সে বলল, আমীরুল মুমিনীন ওমর বিন আব্দুল আযীয মারা গেছেন।
এতে উপস্থিত লোকদের মাঝে কান্নার রোল পড়ে গেল। তারা কাঁদতে কাঁদতে মসজিদে প্রবেশ করল। মসজিদে প্রবেশ করার পর সকলের সম্মুখে দূত আমীরুল মুমিনীন ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-এর মৃত্যুর কথা ঘোষণা করল।