📄 ওমর যা করেছে তা আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি
আমীরুল মুমিনিন হিশাম বিন আব্দুল মালিক তখন ওয়ালিদের কাছে অভিযোগ করে বলল, আমীরুল মুমিনিন আপনার পিতা আমার দাদাকে একখণ্ড জমি দান করেছিলেন। ওয়ালিদ এবং সুলাইমান তা বহাল রেখেছিলেন, কিন্তু ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) খিলাফতে বসার পর তা নিয়ে গেলেন।
হিশাম বললেন, তুমি যা বলেছ তা আবার বল।
লোকটি আবার বলল, আমীরুল মুমিনিন আপনার পিতা আমার দাদাকে একখণ্ড জমি দান করেছিলেন। ওয়ালিদ এবং সুলাইমান তা বহাল রেখেছিলেন, কিন্তু ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) খিলাফতে বসার পর তা নিয়ে গেলেন।
হিশাম বিস্ময় কণ্ঠে বললেন, তুমি অদ্ভুত লোক! যে তোমাকে জমি দিলেন এবং যারা তা বহাল রেখেছেন তাদের জন্য একটি বার রহমত কামনা করনি (অর্থাৎ রহ. বলনি) অথচ যে জমি বাজেয়াপ্ত করল তার জন্য রহমত কামনা করছ।
ওমর যা করেছে তা আমরা স্বীকৃতি দিয়ে ফেলেছি।
📄 ওমর (রহ) মারা গেছেন, বাঘ হিংস্র হয়ে গেছে
এক দুপুরে একটি গোলাম তাঁর মনিবের দৌড় দিয়ে এসে অবাক হয়ে বলতে লাগল, বাঘ এসে আমাদের ছাগলের ছানা শিকার করে নিয়ে গেছে একই দিনে দুপুরে।
গোলামের কথা শুনে মনিব নিজ বুকে হাত চিৎকার দিয়ে আফসোস করতে লাগল।
তখন কেউ একজন তাকে বলল, সুবহানাল্লাহ! দুই দিরহামের একটি ছাগলছানার জন্য আপনি এত আফসোস করছেন?
তিনি বললেন, আল্লাহ্র শপথ! আমি এ ছাগলের ছানার জন্য আফসোস করছিনি। নিশ্চয়ই ওমর বিন আব্দুল আযীয মৃত্যুবরণ করেছেন। কেননা ওমরের জীবিত থাকা অবস্থায় বাঘের এত সাহস হতে পারে না।
এরপর তারা অপেক্ষা করতে লাগল আর এই মধ্যে সংবাদ এল ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) মারা গেছেন।
মূসা বিন আ'য়ান বলেন, ওমর বিন আব্দুল আযীযের সময়কালে আমরা এমন একটি বাগানে ছাগল চরাতাম যেখানে বাঘেরও চলাফেরা ছিল, কিন্তু বাঘ ছাগল আক্রমণ করত না। হঠাৎ এক রাতে বাঘ ছাগল আক্রমণ করে বসল।
তখন আমি বলেছি, মনে হয় আল্লাহ্র নেক বান্দা দুনিয়া থেকে চলে গেছেন! এভাবেই তাদের দিন অতিবাহিত হতে লাগল। এরই মধ্যে একদিন সংবাদ এল আমীরুল মুমিনিন ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) মারা গেছেন।
📄 ওমরের চিঠি অগ্রাহ্য হবে না
একদিন জীর্ণ-মলিন বস্ত্র পরিহিতা এক ইরাকী মহিলা আমীরুল মুমিনিন ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-এর দরবারে এসে উপস্থিত হলো। মহিলাটির চেহারায় দারিদ্রতার ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
মহিলাটি ঘরের দরজায় এসে জিজ্ঞেস করল, আমীরুল মুমিনিনের ঘরে কোনো পাহারাদার আছে?
ঘরে ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-এর স্ত্রী ফাতেমা ছিলেন। মহিলাটি তাঁকে সালাম দিল। তিনি সালামের উত্তর দিয়ে তাকে আসার অনুমতি দিলেন।
মহিলাটি বসার পর চারদিকে তাকিয়ে ঘরে কোনো মূল্যবান আসবাবপত্র দেখল না।
ঘরের এ অবস্থা দেখে সে বলল, আমার ঘর রাতে আমি এ শূন্য ঘরে আসলাম! তখন ফাতেমা বললেন, তোমার ঘরের বস্তুর চেয়েও তোমার ঘর তৈরি হয়েছে এ ঘরটি শূন্য হয়েছে।
কিছুক্ষণ পর ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) বাড়িতে এসে বালতি দিয়ে কূপ থেকে পানি উঠিয়ে তা ঘরের সামনের তুলসী বাগানে ঢাললেন। তখন তিনি বার বার ফাতেমার দিকে তাকাচ্ছিলেন।
মহিলাটি ফাতেমাকে বলল, এ শ্রমিক লোকটি তোমার দিকে বার বার তাকাচ্ছে, একটু আড়ালে এসে বস।
ফাতেমা বললেন, ইনি শ্রমিক না, ইনিই স্বয়ং আমীরুল মুমিনিন।
কিছুক্ষণ পর তিনি ফিরে এসে সালাম দিলেন। তারপর মেঝেতে ঢুকে নামায আদায় করলেন। তারপর তিনি একটি বাতি নিলেন যে বাড়িতে তাঁর জন্য অদ্ভুত রাখা ছিল। তিনি সে আদ্রুলো থেকে ভালো ভালো মহিলাটির জন্য রেখে নিজে নিভে ফেললেন।
এরপর তিনি মহিলাটির কাছে এসে বললেন, আপনার কি প্রয়োজন?
সে বলল, আমি এক ইরাকী মহিলা, আমার পাঁচটি অচল মেয়ে আছে। আর তাই আমি তাদের ব্যাপারে আমি আপনার সুপারিশ কামনা করছি। অচল বলতে অসুস্থ ও আকর্ষণীয় হীন যার কারণে বিয়ে হচ্ছেনা।
মহিলাটির কথা শুনে তিনি কাগজ ও কালি নিয়ে ইরাকের গভর্নরএর কাছে লিখে পাঠালেন সে যেন মহিলাটির জন্য ভাতা নির্দিষ্ট করে দেয়।
মহিলাটি চিঠিটা নিয়ে ইরাকের গভর্নরএর কাছে উপস্থিত হলেন।
ইরাকের গভর্নর চিঠিটা দেখে কেঁদে ফেললেন। ধীরে ধীরে তাঁর কান্নার আওয়াজ বাড়তে লাগল।
তিনি আকাঙ্ক্ষার সাথে বললেন, আল্লাহ্ এ চিঠির লেখককে রহম করুক।
মহিলাটি বলল, তিনি কি মারা গেছে?
সে বলল, হ্যাঁ।
এ কথা শুনে মহিলাটি মৃত খলিফার নির্দেশ কার্যকর হবে না ভেবে আহাজারি শুরু করল।
তখন গভর্নর বললেন, তোমার কোনো সমস্যা নেই, আমি তাঁর আদেশকে অগ্রাহ্য করব না।
এরপর মহিলাটির প্রয়োজন মিটিয়ে দিল এবং তাঁর মেয়েদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দিল।
📄 ওমর (রহ)-এর প্রতি অভিযোগ
ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-এর মৃত্যুর পর মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে ইয়াজিদ বিন আব্দুল মালিক নিযুক্ত হলেন।
একদিন ইয়াজিদের ভাতিজা ওমর বিন ওয়ালিদ এসে তার কাছে অভিযোগ করল, আমীরুল মুমিনিন! আপনার পূর্বের খলিফা যিনি গতকাল মারা গেছেন (ওমর বিন আব্দুল আযীয) তিনি তো মাখজুমিয়া যা পেয়েছেন সে সব কবজা করে নিয়ে রেখেছেন।
ইয়াজিদ ওমর বিন ওয়ালিদকে কথা শুনতে ইয়াজিদ নিজের বোন ফাতেমা যিনি ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-এর স্ত্রী, তাঁর কাছে লোক পাঠিয়ে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন।
তখন তিনি বললেন, আল্লাহ্র শপথ! ভাই, ওমর তো এ রুমাল ব্যতীত অন্য কোনো কাপড়ও রেখে যায়নি।
ইয়াজিদ তা খুলে দেখলেন তাতে শুধু পুরাতন একটি চাদর আর ধূলায় মলিন একটি জামা।
এসব দেখে ইয়াজিদ বলল, আমি তো তোমাকে এগুলোর কথা বলিনি; বরং তালাবক্বও এই ঘরের কথা জিগেস করেছি।
ফাতেমা বললেন, আল্লাহ্র শপথ! ওমর খলিফা নিযুক্ত হওয়ার পর থেকে আমরা সে ঘরে একটি বাক্সও প্রবেশ করাইনি। কেননা সে এটি অপছন্দ করত। এই ঘর, সে ঘরের চাবি, দেশ থেকে কী আছে। যদি তাতে তোমার কোনো প্রাপ্য থেকে থাকে তাহলে তা বায়তুল মালে নিয়ে যেও।
ইয়াজিদ চাবিগুলো নিয়ে সে ঘরের সামনে আসল। তার সাথে অন্যান্য মানুষও আসল।
সে চাবি দিয়ে ঘরের তালা খুলল। তারপর তারা দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখল, তাতে একটি তেষড়া, ছোট একটি পানির পাত্র ও ছোটখাট সামান্য লিন্ট্রিস বার ব্যতীত আর কিছুই পেল না।
ইয়াজিদ কোনো কিছু না পেয়ে বলল, أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ আমি আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
এরপর দ্বিতীয় ঘর খুলতে ভেতরে প্রবেশ করে দেখলেন মাটিতে একটি জায়নামায বিছানো, তার উপরে ছাদের সাথে একটি শিকল বাঁধা আর অত্যন্ত ফাঁসের মতো করে সেঁত। নামাযের সময় বিষুণ আসলে ওমর তার মাঝ ও ফাঁসের ভেতরে ঢুকাতেন যাতে বিষুণ দূর হয়ে যায়।
তারা আরো দেখলেন সেখানে তালাযুক্ত একটি বাক্স পড়ে আছে। বাক্সটি খুলে দেখতে পেল তাতে পুরাতন একটি জামা পড়ে আছে।
ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-এর এসব জিনিসপত্র দেখে ইয়াজিদ কেঁদে ফেলল। তার সাথে অন্যান্য মানুষও কেঁদে ফেললেন। পরে তারা ওমর বিন আব্দুল আযীযের ব্যাপারে খারাপ খারাপ কারণে ওমর বিন ওয়ালিদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইল।