📄 আমাকে পরামর্শ দাও
ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) খলিফা নিযুক্ত হওয়ার পর তিনি তাঁর সঙ্গী সালেম বিন আব্দুল্লাহ, মুহাম্মাদ বিন কা'ব ও রাজা বিন হাইয়্যানকে নিয়ে পরামর্শে বসলেন। তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা তো দেখছ খিলাফতের দায়িত্ব নিয়ে আমি মহা পরীক্ষায় পড়েছি, কাজেই কি করলে ভালো হয় এ ব্যাপারে তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও।
সালেম বললেন, আমীরুল মুমিনীন আপনি যদি পরকালের আযাব থেকে মুক্তি পেতে চান তবে দুনিয়ার ভোগবিলাস ত্যাগ করুন। আর এ ত্যাগ যেন মৃত্যু পর্যন্ত হয়। মুহাম্মদ বললেন, আমীরুল মুমিনীন আপনি যদি পরকালের শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে চান তবে মুসলমানদের বড়দের পিতা হিসেবে, যুবকদের ভাই হিসেবে ও ছোটদের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করুন। এরপর আপনি আপনার পিতামহের মর্যাদা দিন, ভাইদেরকে সম্মান করুন আর সন্তানদের প্রতি সহানুভূতিশীল হন। রাজা বিন হাইয়্যান বললেন, আপনি যদি আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তি পেতে চান তাহলে নিজের জন্যে যা পছন্দ করছেন সর্বসাধারণের জন্যেও তা পছন্দ করুন। নিজের জন্যে যা অপছন্দ করছেন অন্যান্যের জন্যেও তা অপছন্দ করুন। তবেই আপনি চিন্তাহীনভাবে যে কোনো সময় মৃত্যুবরণ করতে পারবেন।
📄 যখন আপনি অটল থাকবেন তারাও অটল থাকবে
ওমর বিন আব্দুল আযীয ইয়াজিদ বিন আলেমসের কাছে চিঠি লিখে তাঁদেরকে তাঁর কাছে আসার জন্য অনুরোধ করলেন, কিন্তু বিখ্যাত বুযুর্গ হাসান বসরী তখন পেটের অসুখে আক্রান্ত ছিলেন। তাই তিনি ওমরের কাছে যেতে না পেরে একটি চিঠি লিখে পাঠালেন। তাতে তিনি লিখলেন, আমীরুল মুমিনীন! যখন আপনি অটল থাকবেন তারও অটল থাকবে। আর আপনি যদি বিচ্যুত হন তারও বিচ্যুত হবে। হে আমীরুল মুমিনীন! যদি নূহ (আ)-এর মতো আপনার হায়াত হয়, সুলাইমানের (আ)-এর মতো আপনার রাজত্ব হয়, ইবরাহীম (আ)-এর মতো আপনার ইয়াক্বীন হয়, লোকমান (আ)-এর মতো আপনার প্রজ্ঞা হয় তবুও আপনি শেষ পরিণতির ব্যাপারে অবহেলা করবেন না। কেননা শেষ পরিণতি জান্নাত বা জাহান্নام। হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীযের কাছে এ চিঠি আসলে তিনি তা চোখের ওপর ধরে কান্না শুরু করলেন। তারপর তিনি আফসোস সাথে বলতে লাগলেন, আমার জন্যে নূহের হায়াত, সুলাইমানের রাজত্ব, লোকমানের প্রজ্ঞা? যদি তা আমি লাভ করি তবে আমার জন্যে আবশ্যক পূর্ববর্তীদের পেয়ালা দ্বারা পানি পান করা। অর্থাৎ তাদের অনুসরণ করা। ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) একদিন তাঁর প্রধান প্রহরী ওমর বিন মুজফিরেরকে বলল, যদি তুমি কখনো দেখ আমি সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছি তবে নির্দ্বিধায় আমার জামার কলার ধরে বলবে, ওমর একি করছ?
বর্ণিত আছে যে, ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর সালেম বিন আবু সালেম নামের এক আল্লাহওয়ালা ব্যক্তিকে ডেকে এনে বললেন, সালেম, আমার ভয় হচ্ছে আমি মনে হয় আল্লাহ্র আযাব থেকে মুক্তি পাব না। সালেম (রহ) বললেন, আমি তোমার ব্যাপারে ভয় করছি যদি না তুমি ভয় না কর, আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে একটি রত্ন রেখেছের। সে সেখানে পাপ করে, আল্লাহ তাকে সে পাপ থেকে মুক্ত করে দেন। আমরাতো অনেক গুনাহর মাঝে লিপ্ত, আমরা সে ঘরেই প্রবেশ করব চাই আমরা সেখানে থাকতে চাই।
📄 আপনি ঘুমাচ্ছেন আর আপনার প্রজারা দরজায়
এক সকালে ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) জনসাধারণের বিচারকার্য নিয়ে বসলেন। সকাল গড়িয়ে যখন দুপুর হলো ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। তিনি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে চাইলেন। তাঁর জনসাধারণকে লক্ষ্য করে বললেন, আমি ফিরে আসা পর্যন্ত তোমরা তোমাদের জায়গায় থাক। এরপর তিনি বিশ্রাম নিতে চলে গেলেন। ইতোমধ্যে তাঁর ছেলে আব্দুল মালিক বিচারালয়ে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি মানুষদেরকে তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বলে, তিনি ভেতরে গেছেন। এরপর তাঁর ছেলে তাঁর কাছে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি চান। তিনি তাকে অনুমতি দিলেন। সে বলল, আমীরুল মুমিনীন! আপনি কেন ভেতরে এলেন? তিনি বললেন, আমি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে এসেছি। সে বলল, আপনার মৃত্যু চলে আসবে অথচ আপনার প্রজারা দরজায় আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে আর আপনি তাদের আড়ালে লুকিয়ে আছেন। এমন মৃত্যু থেকে কি আপনি নিরাপদ? এ কথা শুনে হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীয সাথে সাথে কক্ষ থেকে বের হয়ে মানুষের সামনে উপস্থিত হলেন। তখন আব্দুল মালিক বললেন, আমীরুল মুমিনীন! আপনার যখন ইচ্ছা চুন, আল্লাহর শপথ! আমার ভয় হচ্ছে এটি আমার আর আপনার ওপর বিজয়ী হয়ে যাবে। হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীয, আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন.........। সকল প্রশংসা সেই আল্লাহ তা'আলার যিনি সাহল, আব্দুল মালিক ও মাজাহিমের দ্বারা আমার পিঠ মজবুত করেছেন। উল্লিখিত সাহল হচ্ছে তার ভাই, আব্দুল মালিক তার পুত্র আর মাজাহিম তাঁর গোলাম।
এবং সবাই ছিলেন ওমর (রহ)-এর বিভিন্ন কাজের সহায়ক, অবশ্য এরা সকলে তাঁর শাসনকালেই মৃত্যুবরণ করেছেন।
📄 বিশ্বস্ত উপদেশ প্রদানকারী
সুলাইমান বিন আব্দুল মালিকের মৃত্যুর পর মুসলিম জাহানের খলিফা তখন ওমর বিন আব্দুল আযীয। এরই মাঝে একদিন ওমরের দরবারে নগ্ন ভদ্র সভার এক ব্যক্তি এলেন। এই লোকটি ওমরকে উপদেশ দিয়ে বললেন, আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হও, তাঁর আদেশ পালন নিজেকে সম্পূর্ণ কর, আর আল্লাহর কাছে যা আছে তার আশা করুন। কেননা আল্লাহর কাছে স্থায়ী কল্যাণ ও মসিবতের বিনিময় রয়েছে। লক্ষ্য করুন, আপনি সুলাইমানের জন্যে যে ব্যাপারে ভয় করছেন নিজের জন্যেও সে ব্যাপারে ভয় করুন। এরপর লোকটি ফিরে গেলেন, তাঁর কাছে থাকা উপদেশগুলো যথাযথভাবে বলতে পারায় তার অন্তর জুড়িতে ভরে গেল। লোকটির কথাগুলো ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-এর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল আর তিনি বলতে লাগলে, আমার ওপর তা আবশ্যক.........। যখন লোকটি আবার আসল তখন তিনি তাকে বললেন, তুমি আমাকে এ কথাগুলো কেন বলছ? লোকটি খুব আদবের সাথে বলল, যদি আপনি আমাকে নিরাপত্তা দেন তাহলে আমি বলতে পারি। তিনি বললেন, তুমি নিরাপদ। লোকটি বললেন, আমি দেখলাম আপনি লম্বা জামা পরছেন, চুলগুলো খুব পরিপাটি করে রাখছেন, আপনার শরীর থেকে সুগন্ধি ছড়াচ্ছে, তখন আমি আশ্চর্য হলাম, তবুও আল্লাহ্ তা'আলা কীভাবে আপনাকে তাঁর দ্বীনের ঘাড়ে চাপিয়ে রেখেছেন। হযরত ওমর খিলাফতের দায়িত্ব যখন আপনার ওপর আসে তখন আপনার পরিত্যজ্য জেনে আপনাকে এগুলো বলা নিজের কর্তব্য মনে করলাম। লোকটির কথা শুনে ওমর রুষ্ট চোখের ওপর ছেড়ে দিয়ে বললেন, যাও! যদি আপনি আমাদের দেশে আমার সাথে বসবাস করেন তাহলে আপনি আমাদের নিরাপত্তায়। আর যদি বাইরে থাকেন তাহলে আল্লাহর হিফাজতে।