📄 মুসলিম জাহানের খলিফা ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)
মুসলিম জাহানের প্রতাপশালী খলিফা সুলাইমান বিন আব্দুল মালিক তখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত। হযরত ওমর খলিফার কক্ষের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি রাজা বিন হাইয়ানকে খলিফার কক্ষের দিকে যেতে অনুরোধ করে বললেন, রাজা তোমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, সুলাইমান যদি পরবর্তী খলিফা নির্বাচনে তোমার কাছে পরামর্শ চায় তবে আমার নাম বলবে না। আল্লাহর শপথ! আমি এ কাজের উপযুক্ত নই। রাজা ভান করে ভারি চমৎকার সুরে তাঁকে বলল, তুমিতো দেখছি খিলাফতের লোভ করছ। তুমি কি করে ভেবেছ আমি তোমার নাম প্রস্তাব করব। রাজা বিন হাইয়ান মুখে এমন কথা শুনে হযরত ওমর লজ্জা পেয়ে গেলেন। এমনকি তাঁর পুরো শরীর ঘেমে গেল। এদিকে রাজা খলিফার কক্ষে প্রবেশ করে তাকে বিছানায় শায়িত দেখলেন। খলিফা সুলাইমান তাকে জিজ্ঞেস করলেন, রাজা খিলাফতের জন্য তুমি কাকে উপযুক্ত মনে কর। রাজা জবাবে বলল, আমীরুল মুমিনীন! আপনার উচিত ও ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা। আপনিতো সে পথেই রওনা দিতে যাচ্ছেন যেখানে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে। খলিফা বললেন, তবে কাকে নিয়োগ দেওয়াতে পরামর্শ দিচ্ছ? রাজা বলল, ওমর বিন আব্দুল আযীয। সুলাইমান বলল, আমি জানি, ওমর একজন যোগ্য, দক্ষ ও মুগ্ধকারী শাসক। কিন্তু আমি যদি আব্দুল মালিকের কোনো পুত্রকে নিয়োগ না দিয়ে তাকে নিয়োগ দেই তবে নিশ্চিত বিবাদ সৃষ্টি হবে। তারা তাদের তাদের ওপর শাসন চালাতে দিবে না। তবে একটা পথ অবলম্বন করা যেতে পারে তা হলো, ওমরের পরবর্তী খলিফা হিসেবে তাদের কারো একজনকে নাম ঘোষণা করতে হবে। এরপর খলিফা সুলাইমান হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-কে খলিফা ঘোষণা করেন এবং ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-এর পরবর্তী খলিফা হিসেবে ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিকের নাম ঘোষণা করেন।
📄 স্বপ্নে নবী করীম সা.-এর দেখা
হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীয দুর্লভ ও জ্ঞানীদের এক মণ্ডলে বসে তাঁর দেখা স্বপ্নের কথা বলছিলেন। তিনি বললেন, আমি স্বপ্নে দেখি, রাসূল ﷺ আমাকে বললেন, ওমর আমার কাছে আস। আমি রাসূল ﷺ-এর নিকটবর্তী হয়ে তাঁর সাথে মুসাফাহা করব এমন সময় দেখি দু'জন লোক তাঁর দু'পাশে দাঁড়াল। তখন রাসূল ﷺ বললেন, যখন তোমাকে আমার উম্মতের দায়িত্ব দেওয়া হবে তখন তুমি এ দু'জন যেভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করেছ তেমন করবে। আমি বললাম, উনারা কারা? তিনি বললেন, এ হচ্ছে আবু বকর, এ হচ্ছে ওমর। ওয়াহিব বিন ওয়াহেদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আমি মাকামে ইবরাহীমের পাশে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম। তখন আমি স্বপ্নে দেখি নবী শারবা নামক দরজা দিয়ে এক লোক প্রবেশ করে ঘোষণা করতে লাগল, হে লোক! সে তোমাদের ওপর আল্লাহর কিতাব বাস্তবায়ন করেছে। আমি বললাম, কে? তখন সে তার নম্বরে ইশারা করল। আমি তার নম্বরের দিকে তাকিয়ে দেখি নম্বরতলাতে ক্রমান্বয়ে লিখিত ১-২-৩ অর্থাৎ ওমর, যা দ্বারা হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীযের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
📄 খিলাফতের বাহন
খলিফা সুলাইমান বিন আব্দুল মালিকের দারুণ শেষে ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) ফিরে যাবেন এমন সময় তিনি হালকা কম্পন অনুভব করলেন। তিনি লোকদেরকে বললেন, এ কম্পন কিসের? তারা বলল, আমীরুল মুমিনীনকে নেওয়ার জন্য রাজকীয় বাহন আসছে। হযরত ওমর বললেন, এটা সাথে আমার কি সম্পর্ক, এটা দূরে সরিয়ে আমার খচ্চরটা নিয়ে আস। খচ্চর আনা হলে তিনি তাতে আরোহণ করে চলতে লাগলেন। পরক্ষণে তিনি লক্ষ্য করলেন পুলিশ বাহিনী তাঁর নিরাপত্তার বিধানে চতুর্দিকে সমন্বয় অবস্থান নিয়েছে। তিনি তাদেরকে বললেন, আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাও। তোমরা আমার ও জনসাধারণের মাঝে আড়াল সৃষ্টি করবে আমিতো তাদেরই একজন। এরপর তিনি সাধারণ মানুষের সাথে পথ চলতে লাগলেন। তারপর তিনি খলিফার ব্যবহৃত দামি পোশাক ও জিনিসপত্র নিয়ে আসতে নির্দেশ দিলেন। তাঁর নির্দেশে সেগুলো আনা হলো। তিনি তা বিক্রয় করে মুসলমানদের অর্থভাণ্ডারে জমা দিয়ে দিলেন।
📄 খলিফা ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) কাঁদছেন
গভীর রাতে সুন্দর সৃষ্টি বীর ঘুমিয়ে বিভোর হয়ে আছে, খলিফা ওমর বিন আব্দুল আযীয তখন আরামের ঘুম ত্যাগ করে দু'রাকাত নামাজ আদায় করার পর তাঁর দু'হাতের উপর মাথা রেখে উচ্চ কণ্ঠে দু'হাতে কাঁদতে লাগলেন। তাঁর স্ত্রী ফাতেমা বলেন, তিনি এত জোরে কান্না করছিলেন যে, আমার ভয় হচ্ছিল, তাঁর কলিজা ফেটে ক্রুশই হবে না যাবে। তিনি সকাল পর্যন্ত এভাবেই কাঁদলেন। পরের দিন রাখা অবস্থায় তাঁর সকাল হলো। তাঁর স্ত্রী ফাতেমা তাঁর নিকটবর্তী হয়ে বললেন, আপনি কী গত রাতের পূর্বে ঘুটে যাওয়া এমন কোনো কারণে কান্না করেছেন? তিনি বললেন, ইঁয়া, আমাকে আমার মতো থাকতে দাও, তুমি তোমার মতো থাক।
তাঁর স্ত্রী ফাতেমা বললেন, আমি অবশ্যই আপনার থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে। তিনি বললেন, তবে শুন, আমি নিজেকে নিয়ে ভাবতে গিয়ে দেখলাম যে, উম্মতের ছোট বড় সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে আমাকে অভিভাবক নিযুক্ত করা হয়েছে। অতঃপর গরিব, ক্ষুধার্ত, অসহায়, সাহায্যপ্রার্থী, বঞ্চনাহারা, যুদ্ধবন্দি তাদের ন্যায় অন্যান্য যারা আছে তাদের চিন্তাও আমার মাথায় আসল। আমিতো তাদের জন্য কিছুই করতে পারিনি। আমি জানি আল্লাহ তাআ'লা আমাকে কিয়ামতের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। মুহাম্মদ ﷺ-ও নিশ্চয় তাদের মাঝে উপস্থিত থাকবেন। তখন তো আল্লাহর আদালতে পেশ করার মতো কোনো যুক্তিও আমার থাকবে না। সে চিন্তায় আমাকে ভীতু করেছে। যে ভয় আমার চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত করেছে। আমি বিষয়টি তোমাকে খুলে বললাম, এবার তুমি উপদেশ গ্রহণ করতে পার আবার নাও করতে পার।