📄 এটা আমার জন্যে ভালো তোমাদের জন্যে খারাপ
মুসলিম জাহানের খলিফা তখন ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক। খেলাফতের বিরোধিতা করার অপরাধে এক খারাজীকে দরবারে হাজির করা হলো। খলিফা আল ওয়ালিদ লোকটির শাস্তির ব্যাপারে ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-সহ তার অন্যান্য নিকটস্থ ব্যক্তিবর্গের সাথে কথা বলছিলেন। আল ওয়ালিদ খারাজী লোকটিকে তিরস্কার করে বললেন, খলিফা আব্দুল মালিকের ব্যাপারে তুমি কি বলেছ? খারাজী লোকটি বলল, আমি এমন লোকের ব্যাপারে বলেছিলাম যার সামনে দুটি বিষয় পেশ করা হলো। প্রথমত, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা, কিন্তু সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা গ্রহণ করেছে। তার উপর আল্লাহর অভিশাপ ও গজব পতিত হোক। তার মুখে এ কথা শুনে খলিফা আল ওয়ালিদ ভীষণ রেগে গেলেন। তিনি ওমর বিন আব্দুল আযীযের দিকে তাকিয়ে বললেন, এ পাপীর শাস্তির ব্যাপারে তোমার মত কি?
হযরত ওমর চুপ করে রইলেন। আল ওয়ালিদ আবার বললেন, তোমার কি হয়েছে, তুমি কথা বলছ না কেন? ওমর (রহ) বললেন, আমীরুল মুমিনীন আপনি আমাকে এর থেকে মুক্ত রাখুন। আল ওয়ালিদ বললেন, আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি তুমি বল। তখন তিনি বললেন, লোকটি আপনার পিনাতে যেমন গালি দিয়েছে আপনিও তাকে তেমন গালি দিয়ে দিন। আর যদি ক্ষমা করে দেন সেটা হবে সর্বোত্তম। আল্লাহ তাআ'লা বলেন, وَالَّذِينَ صَبَرُواْ ابْتِغَاء وَجْهِ رَبِّهِمْ وَأَقَامُواْ الصَّلاَةَ وَأَنفَقُواْ مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً وَيَدْرَؤُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ أُوْلَئِكَ لَهُمْ عُقْبَى الدَّارِ অর্থ: অবশ্যই যে সবর করে ও ক্ষমা করে নিশ্চত এটা সহিষ্ণুতার কাজ। (সূরা শুরা: ৪৩) তাঁর কথা শুনে ওয়ালিদের রাগ আরো বেড়ে গেল। তিনি জিব্রাদ খালিদ বিন রায়হানের দিকে তাকালেন, যে এতক্ষণ ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-এর শিরচ্ছেদের নির্দেশ পাওয়ার অপেক্ষায় তরবারিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু খলিফা ওয়ালিদ কোনো নির্দেশ না দিয়েই আসন ছেড়ে উঠে গেলেন। ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-ও ফিরে যাওয়ার মনস্থ করলেন। তিনি জিব্রাদ খালিদকে তিরস্কার করে বললেন, দুর্ভাগ্য, তুমি তো দেখছি ওয়ালিদের নির্দেশ পালন করতে ধাপ মুক্ত করো। জিব্রাদ খালেদ বলল, কাবার রবের শপথ! অবশ্যই আমি তার নির্দেশ মান্য করব। তিনি বললেন, তবে জেনে রাখ, সেটা আমার জন্য কল্যাণকর আর তোমাদের জন্য অকল্যাণকর।
📄 আপনার আজকের প্রজারা কিয়ামতের দিন আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী
পুণ্যভূমি মদিনাতে রাসূল ﷺ-এর হিজরতের পর অতিবাহিতও হয়ে গেল সাতানব্বইটি বসন্ত। মুসলিম জাহানের খলিফা সুলাইমান ইবনে আব্দুল মালিক ও তার চাচাতো ভাই ওমর প্রশাসানের সাথে আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছিলেন। লক্ষ লক্ষ হাজীও আল্লাহর দরবারে কাকুতি মিনতি করতে দেখে খলিফা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বিষণ্নতা কণ্ঠে ওমর (রহ)-কে লক্ষ্য করে বললেন, আল্লাহ ব্যতীত এদের সঠিক সংখ্যা বলা যেমন কারো পক্ষে সম্ভব নয়, তদ্রূপ এদের রিফিকের ব্যবস্থা তিনি ব্যতীত অন্য কারো করা সক্ষম নয়। ওমর (রহ) খলিফাকে বললেন, আমীরুল মুমিনীন আজকে আপনি যাদেরকে দেখছেন আপনার প্রজা, এরাই কিয়ামতের দিন আল্লাহর আদালতে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে। খলিফা সুলাইমান বললেন, আল্লাহ তোমাকে এদের দ্বারা পরীক্ষায় ফেলুন। ধারাবাহিকভাবে হজ্বের কার্যক্রম শেষ করে খলিফা সুলাইমান ইবনে আব্দুল মালিক মদিনার দিকে রওনা দেন। তিনি মদিনায় এসে এখানকার অভিজাত ও সম্মানিত লোকদেরকে ডেকে মূল্যবান উপহার প্রদান করেন। তারপর তিনি ওমর বিন আব্দুল আযীযকে বললেন, আবু হাফস! আমি যা করেছি তা তোমার কেমন লাগল? তিনি বললেন, আমীরুল মুমিনীন, আমি যতটুকু লক্ষ্য করেছি, আপনি ধনীদেরকে আরও ধনী বানিয়ে দিলেন আর গরিবদেরকে তাদের দূরবস্থায় ছেড়ে দিলেন।
📄 মুসলিম জাহানের খলিফা ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)
মুসলিম জাহানের প্রতাপশালী খলিফা সুলাইমান বিন আব্দুল মালিক তখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত। হযরত ওমর খলিফার কক্ষের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি রাজা বিন হাইয়ানকে খলিফার কক্ষের দিকে যেতে অনুরোধ করে বললেন, রাজা তোমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, সুলাইমান যদি পরবর্তী খলিফা নির্বাচনে তোমার কাছে পরামর্শ চায় তবে আমার নাম বলবে না। আল্লাহর শপথ! আমি এ কাজের উপযুক্ত নই। রাজা ভান করে ভারি চমৎকার সুরে তাঁকে বলল, তুমিতো দেখছি খিলাফতের লোভ করছ। তুমি কি করে ভেবেছ আমি তোমার নাম প্রস্তাব করব। রাজা বিন হাইয়ান মুখে এমন কথা শুনে হযরত ওমর লজ্জা পেয়ে গেলেন। এমনকি তাঁর পুরো শরীর ঘেমে গেল। এদিকে রাজা খলিফার কক্ষে প্রবেশ করে তাকে বিছানায় শায়িত দেখলেন। খলিফা সুলাইমান তাকে জিজ্ঞেস করলেন, রাজা খিলাফতের জন্য তুমি কাকে উপযুক্ত মনে কর। রাজা জবাবে বলল, আমীরুল মুমিনীন! আপনার উচিত ও ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা। আপনিতো সে পথেই রওনা দিতে যাচ্ছেন যেখানে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে। খলিফা বললেন, তবে কাকে নিয়োগ দেওয়াতে পরামর্শ দিচ্ছ? রাজা বলল, ওমর বিন আব্দুল আযীয। সুলাইমান বলল, আমি জানি, ওমর একজন যোগ্য, দক্ষ ও মুগ্ধকারী শাসক। কিন্তু আমি যদি আব্দুল মালিকের কোনো পুত্রকে নিয়োগ না দিয়ে তাকে নিয়োগ দেই তবে নিশ্চিত বিবাদ সৃষ্টি হবে। তারা তাদের তাদের ওপর শাসন চালাতে দিবে না। তবে একটা পথ অবলম্বন করা যেতে পারে তা হলো, ওমরের পরবর্তী খলিফা হিসেবে তাদের কারো একজনকে নাম ঘোষণা করতে হবে। এরপর খলিফা সুলাইমান হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-কে খলিফা ঘোষণা করেন এবং ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-এর পরবর্তী খলিফা হিসেবে ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিকের নাম ঘোষণা করেন।
📄 স্বপ্নে নবী করীম সা.-এর দেখা
হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীয দুর্লভ ও জ্ঞানীদের এক মণ্ডলে বসে তাঁর দেখা স্বপ্নের কথা বলছিলেন। তিনি বললেন, আমি স্বপ্নে দেখি, রাসূল ﷺ আমাকে বললেন, ওমর আমার কাছে আস। আমি রাসূল ﷺ-এর নিকটবর্তী হয়ে তাঁর সাথে মুসাফাহা করব এমন সময় দেখি দু'জন লোক তাঁর দু'পাশে দাঁড়াল। তখন রাসূল ﷺ বললেন, যখন তোমাকে আমার উম্মতের দায়িত্ব দেওয়া হবে তখন তুমি এ দু'জন যেভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করেছ তেমন করবে। আমি বললাম, উনারা কারা? তিনি বললেন, এ হচ্ছে আবু বকর, এ হচ্ছে ওমর। ওয়াহিব বিন ওয়াহেদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আমি মাকামে ইবরাহীমের পাশে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম। তখন আমি স্বপ্নে দেখি নবী শারবা নামক দরজা দিয়ে এক লোক প্রবেশ করে ঘোষণা করতে লাগল, হে লোক! সে তোমাদের ওপর আল্লাহর কিতাব বাস্তবায়ন করেছে। আমি বললাম, কে? তখন সে তার নম্বরে ইশারা করল। আমি তার নম্বরের দিকে তাকিয়ে দেখি নম্বরতলাতে ক্রমান্বয়ে লিখিত ১-২-৩ অর্থাৎ ওমর, যা দ্বারা হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীযের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।