📄 খলিফাকে গালি দিল এক ব্যক্তি
মুসলিম জাহানের খলিফা তখন সুলাইমান ইবনে আব্দুল মালিক। প্রভাবশালী এ খলিফাকে গালিগালাজ করে বেড়াচ্ছে তারই এক প্রজা। বিষয়টি জানতে পেরে খলিফা সুলাইমান তাঁর সভাসদদের নিয়ে পরামর্শ সভায় বসলেন। সুলাইমান তাঁর সভাসদদের কাছে জানতে চাইলেন, লোকটির ব্যাপারে তোমাদের মতামত কি? সভাসদদের একজন বলল, আমীরুল মু'মিনীন! আপনি তাঁর শিরশ্ছেদনের নির্দেশ প্রদান করুন।
তখণও ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) কিছু না বলে চুপ ছিলেন। সুলাইমান তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন, কি ব্যাপার, তুমি কিছু বলছ না কেন? তখন হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) বললেন, আপনি যখন আমার মতামতই জানতে চেয়েছেন, তবে শুনুন, আল্লাহ্র নবী ব্যতীতও অন্য কাউকে গালি দেওয়ায় কোনো মুসলমানের রক্ত প্রবাহিত করা বৈধ নয়। অর্থাৎ নবীকে গালি দিলে হত্যা বৈধ এবং অন্য কাউকে গালি দিলে হত্যা করা বৈধ নয়। এ কথা বলে ওমর (রহ) উঠে চলে গেলেন, ওমরের এ সাহসিকতা দেখে অন্যান্য সভাসদরা নির্বাক হয়ে তাঁর পথের দিকে চেয়ে রইল।
📄 সাঈদ ও আল ওয়ালিদ
সত্য ও ন্যায়ের প্রতি তাঁর আকর্ষণ দেখে স্বয়ং খলিফা সুলাইমান অবাক হয়ে বললেন, ওমর! আল্লাহ্র জন্যে তোমার সাক্ষ্য।
ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) যখন সবেমাত্র মদিনার গভর্নর নিযুক্ত হলেন। এরই মাঝে মদিনার বিখ্যাত বুযুর্গ সাঈদ বিন মুসায়িয়াবের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল। যার ভিত্তি ছিল আন্তরিকতা ও ভালোবাসা। একবার খলিফা আল ওয়ালিদ পবিত্র হজ্ব পালনের জন্যে সফর শুরু করলেন। হজ্বের কার্যক্রম সম্পন্ন করে তিনি পুণ্যভূমি মদিনার পথ ধরলেন। খলিফার দলবল মদিনার কাছে পৌঁছলে, কঠোর নিরাপত্তার খাতিরে মদিনার অধিবাসীদেরকে মসজিদে নববী ও তার আশপাশের এলাকা থেকে কিছু সময়ের জন্যে পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সাঈদ বিন মুসায়িয়াব, যিনি মসজিদে খুব বেশি অবস্থান করার কারণে সবার কাছে 'মসজিদের কবুতর' নামে পরিচিত ছিলেন, খলিফা আল ওয়ালিদ যখন মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলেন তখন শুধু সাঈদ বিন মুসায়িয়াবই ছিলেন। খলিফা আল ওয়ালিদ সাঈদ বিন মুসায়িয়াবকে সালাম দিলে তিনি অন্য সাধারণ মানুষের সালামের জবাবে যেভাবেই খলিফার সালামের জবাব দিলেন। অনুদিক হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) ভয় করতে লাগলেন, না জানি খলিফা আল ওয়ালিদ রেগে গিয়ে সাঈদ বিন ওয়ালিদকে প্রহার করতে নির্দেশ দেয় অথবা হত্যা করতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা এমন কিছু থেকে নিভৃত রেখেছেন। মসজিদ পরিদর্শন শেষে আল ওয়ালিদ সাঈদ বিন মুসায়িয়াবকে কোনো প্রকার কষ্ট না দিয়ে ফিরে গেলেন। পরক্ষণে ওমর বিন আব্দুল আযীয সাঈদ বিন মুসায়িয়াবকে নিকট এসে বিস্ময় হয়ে বললেন, আল্লাহ্র শপথ! সাঈদ, আমি তোমার প্রাণ নাশের আশঙ্কা করেছিলাম। তুমি তোমার ব্যবহার দ্বারা ওলীদএর অন্তরে বড় ধরণের আঘাত করেছ। সাঈদ বিন মুসায়িয়াব তেজোদ্দীপ্ত ইন্নী কণ্ঠে বলতে লাগলেন, ওমর! আমি চেয়েছি আল ওয়ালিদকে এ কথা জানিয়ে দিতে যে, এমনও পৃথিবীতে আল্লাহ্র এমন কিছু বান্দা আছে, যারা শুধু তাঁকেই ভয় করে, অন্য কাউকে নয়।
📄 ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) ও জয়নুল আবেদিন
মুসলিম জাহানের খলিফা তখন ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)। তিনি তাঁর নেত্রতূল্য জ্ঞানপিপাসু কিছু সঙ্গী-সাথিদের নিয়ে ইলমে হাদিসের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করছিলেন, এরই মাঝে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন যায়নুল আবেদিন আলী বিন হুসাইন। ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিবাদন জানালেন এবং নিজর পাশের আসনে বসালেন। জ্ঞান চর্চার মজলিসে কিছু সময় অতিবাহিত করে যায়নুল আবেদিন (রহ) ফিরে চললেন। তিনি বের হয়ে যাওয়ায় পর ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) তাঁর সঙ্গীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, আব্বাজানরা বলতো, আজকে তোমাদের দেখা লোকদের মাঝে সবচেয়ে সম্মানিত হিসেবে কাকে পেয়েছে? তাঁর সঙ্গীরা বলল, আমীরুল মু'মিনীনকেই আমরা সর্বাধিক সম্মানিত হিসেবে পেয়েছি। জাহিলী যুগের ন্যায় ইসলামী যুগেও আপনারা আমাদের মাঝে সম্মানিত। তখন ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) বললেন, বিষয়টি এমন নয়; বরং আমার দেখা সবচেয়ে সম্মানী ব্যক্তি হচ্ছেন যায়নুল আবেদিন। যার মতো মর্যাদাভাবান হওয়া প্রত্যেক মানুষেরই কামনা, কিন্তু তিনি কারো মতো হতে চান না। কিছুক্ষণ পর, হারিস বিন উসমান রাহাবী নামক এক যুবক তার পিতাকে নিয়ে ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-এর দরবারে প্রবেশ করল। ওমর যুবকটি সম্পর্কে তার পিতার কাছে বিভিন্ন বিষয়াদি জানতে চাইল। ছেলে সম্পর্কে জানার পর তিনি তার পিতাকে বললেন, আপনি তাকে ফিকহে আকবর শিক্ষা দিন। সে বলল, ফিকহে আকবর কি? তিনি বললেন, ফিকহে আকবর হচ্ছে, অজ্ঞতে তুষ্টি ও কদর্যতাযুক্ত বস্তু অপসারণ করা।
📄 আল্লাহ আপনার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখুক
ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) তখন ফিকহ দরসে বসিয়া এক উপদ্রবে যুবক। কোনো এক প্রয়োজনে তিনি দামেস্কে খলিফা আব্দুল মালিকের দরবারে উপস্থিত হলেন। আব্দুল মালিক তাঁর ব্যক্তিত্ব মুগ্ধ হয়ে নিজের মেয়ে ফাতেমাকে তাঁর সাথে বিয়ে দিলেন। খলিফার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ওমর বললেন, আল্লাহ আপনার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখুন, আপনি উদারভাবে দান করেছেন এবং চাওয়া-পাওয়া পূর্ণ করেছেন। হযরত ওমর আব্দুল মালিক খুব খুবই অবাক হলেন। তখন আব্দুল মালিকের কোনো কোনো পুত্র এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে বলতে লাগল, বাবা! তার কথায় অবাক হওয়ার তো কিছুই নেই, এ ধরনের কথা তো আপনার কাছ থেকে শেখা, সে তো শুধু পুনরাবৃত্তি করেছে। পরে একদিন হযরত ওমর খলিফার দরবারে আসলেন।
খলিফা ভান বলতেন, হে ওমর! তোমার জীবন কেমন চলছে? তিনি বললেন, দুটি মন্দের মাঝে একটি ভালো, এভাবে চলছে হে আমীরুল মুমিনীন।
খলিফা বলতেন, মদ দুটি কী কী? ওমর (রহ) বললেন, يُسْقَوْنَ مِنْ رَحِيْقٍ مَخْتُومٍ خِتَامُهُ مِسْكٌ وَفِيْ ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ অর্থ: মুমিনোনো তারাই যারা সম্পদ বায়ে কৃপণতা করে না আবার অপচয়ও করে না; বরং তারা উভয়ের মাঝামাঝি পন্থা অবলম্বন করে। এরপরও খলিফা আব্দুল মালিক তাঁর উপর তবে অবাক হলেন। তিনি তার ছেলেদেরকে তিরস্কার করে বললেন, এবার বল, এটি কে শিখিয়েছে?