📄 এক লোক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে
মদিনার নিকট খারবারে ইহুদিদের একটি শক্তিশালী দুর্গ ছিল। দুর্গের প্রাচীরের নিচে সৈন্য ও ঘোড়ার পদঘাতে সর্বদা মুখর হয়ে থাকত। দুর্গের প্রাচীর ছিল অনেক উঁচু। নিচ থেকে সেখানে তীর নিক্ষেপ করে পৌঁছানো যেত না। এ দুর্গের পাশেই নবী তাঁর সাথীদের নিয়ে অবস্থান করলেন।
প্রথম দিন আবু বকর নেতৃত্ব পতাকা নিয়ে তরবারি হাতে বীরের মতো বের হলেন। তাঁর পিছনে পিছনে মুসলমান সেনারাও বের হলেন। তারা সূর্য ডুবে যাওয়া পর্যন্ত কঠিনভাবে যুদ্ধ করলেন, কিন্তু তবুও তাঁরা দুর্গের ভেতরে ঢুকতে পারেননি।
দ্বিতীয় দিন নেতৃত্বের পতাকা নিয়ে উমর বের হলেন। তাঁর নেতৃত্বে মুসলমানগণ কঠিন থেকে কঠিনভাবে যুদ্ধ করেন, কিন্তু সূর্য ডুবে গেলে তবুও দুর্গ জয় হলো না।
তখন নবী বললেন, আগামী কাল অবশ্যই আমি পতাকা এমন এক লোকের হাতে দিব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে আর তাঁকেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালোবাসেন। আল্লাহ তাঁর হাতে বিজয় দান করবেন।
তখন সাহাবায়ে কেরাম প্রত্যেকে সেই রাত কাটিয়েছিল আর এ বিষয় নিয়ে ভাবছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকে মনে মনে এ সম্মান পাওয়ার আশা করতে লাগলেন।
উমর বললেন, আমি কখনো নেতৃত্বের লোভ করিনি, তবে সেই দিন করেছিলাম শুধু এ কারণে যে, আমি ওই ব্যক্তি হব যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালোবাসেন।
সকাল বেলা সাহাবায়ে কেরামগণ রাসূল -এর কাছে এসে ভিড় জমাতে লাগলেন। তাঁরা প্রত্যেকে নবী -এর দিকে বারবার তাকাতে লাগলেন। প্রত্যেকে নিজেকে নবী -এর দৃষ্টিতে রাখতে চেষ্টা করলেন, এ আশায় যে, ওই ব্যক্তির মর্যাদা অর্জন করবেন যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালোবাসেন।
সবার মাঝে এক নীরবতা বিরাজ করছিল। অবশেষে নীরবতা ভেঙে রাসূল বললেন, আলী বিন আবূ তালিব কোথায়?
তখন তাঁর কাছে আলী আসলেন। সে রাতে আলী -এর চোখ উঠছিল।
নবী তাঁকে বললেন, তোমার কী হয়েছে?
তিনি বললেন, আমার চোখ উঠেছে।
নবী বললেন, আমার কাছে আস।
তিনি নবী -এর কাছে আসলে, নবী নিজের সালা মোবারক তাঁর চোখে লাগিয়ে দিলেন, এতে তাঁর চোখ ভালো হয়ে গেল। এরপর তিনি তাঁকে বললেন, এ পতাকা ধর, এটি নিয়ে চলতে থাক যতক্ষণ না আল্লাহ তা'আলা বিজয় দান করেন।
আলী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল,...........আমি তাদের সাথে ততক্ষণ যুদ্ধ করব যতক্ষণ না তারা আমাদের মতো হয়।
নবী বললেন, তারা মমদানে নেমে আসা পর্যন্ত ভূমি অপেক্ষা করবে, তারপর তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করবে এবং আল্লাহ তা'আলা তাদের ওপর কী আবশ্যক করেছে তা তাদেরকে অবগত করাবে। আল্লাহ্র শপথ! আল্লাহ তা'আলা তোমার দ্বারা একজন ব্যক্তিকে হেদায়েত দান করা তোমার জন্যে হুমরুন্নিয়ামাত থেকেও উত্তম। (আরবরা উত্তম কোনো কিছু বুঝাতে বলত “হুমরুন্নিয়ামাত” অর্থ হচ্ছে লাল উট, যা আরবদের কাছে খুব প্রিয় ছিল)।
আলী যখন দুর্গের কাছে গেলেন তখন এক ইহুদি দুর্গের উপর থেকে বলল, তুমি কে?
তিনি বললেন, আলী বিন আবূ তালিব।
ইহুদি বলল, তোমরা উচ্চ মর্যাদাবান হয়েছ, আর মূসা (আ)-এর ওপর যা নাযিল হয়েছে তাও মর্যাদাবান হয়েছে।
টিকাঃ
৭৬৯. বুখারী শরীফ, ৪খ ৪৩, ৭৫ ও মুসলিম শরীফ, ৪খ ৮৯, ১৯৭।
📄 মৃতব্যক্তি তার ঋণের কাছে বন্ধক
এক দুপুরে লোকদের কাছে আহরণ করে একটি জানাযা আসল। মৃত ব্যক্তির জানাযায় নামায পড়ানোর জন্য তাঁর পরিবারের লোকেরা নবী -কে খুঁজতে লাগল।
নবী বললেন, তোমাদের এ সাথির ওপর ঋণ আছে?
তারা বলল, দুই দিনার।
এ কথা শুনে নবী ওই ব্যক্তির জানাযা পড়া থেকে বিরত থাকলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, তোমরা তোমাদের সাথির জানাযা পড়। যার ওপর ঋণ থাকত নবী তাঁর জানাযার নামায আদায় করতেন না। তখন আলী খুব ভয় করলেন যে, মৃতব্যক্তি নবী -এর দোওয়া পাওয়ার বরকত থেকে বঞ্চিত হয়ে কবরে যাবে, তাই তিনি দ্রুত নবী -এর কাছে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল, দুই দিনারের দায়িত্ব আমার, মৃতব্যক্তি তা থেকে মুক্ত।
তখন নবী মৃতব্যক্তির নামায আদায় করলেন। তারপর তিনি আলীকে বললেন, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন...... আল্লাহ তোমার যুদ্ধ করুন, যেমনিভাবে তুমি তোমার ভাইয়ের ঋণের দায়িত্ব নিয়ে তাকে মুক্ত করেছ। প্রত্যেক মৃতব্যক্তি তার ঋণের কাছে বন্ধক। যে ব্যক্তি কোনো মৃতব্যক্তির ঋণের দায়িত্ব নিবে আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতোর দিন তার ঋণের দায়িত্ব নিবেন।
টিকাঃ
৭৭০. ইমাম আলী বিন আবূ তালিব, জি মুহাম্মাদ রশীদ রিযা ১৭ পৃ.।
📄 মৃত্যু পর্যন্ত যুদ্ধ
উহুদের যুদ্ধ চলেছিল, হঠাৎ করে একটি মিথ্যা খবর ছড়িয়ে পড়ল। সকলের কানে এসে পৌঁছল, রাসূল ইন্তেককাল করেছেন। মুসলিম সেনারা এ কথা শুনে ভেঙে পড়ল। অনেকের হাত থেকে তরবারি পড়ে যেতে লাগল। আলী মৃতদের মাঝে রাসূল -কে খুঁজতে লাগলেন, কিন্তু তিনি রাসূল -কে পেলেন না। এরপর তিনি বললেন, মৃতদের মাঝে রাসূল নেই। আল্লাহ্র শপথ! রাসূল যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যাওয়ার মতো ব্যক্তি নন; বরং আমরা যা করেছি তাতে আল্লাহ তা'আলা অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তারপর তিনি তাঁর খাপ থেকে তরবারি বেরু করে খাপ ভেঙে ফেললেন। এরপর তিনি বললেন, যদি আমি মরণ পর্যন্ত যুদ্ধ না করি তবে আমার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই।
তারপর তিনি সিংহের মতো কাফেরদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তিনি কঠিন থেকে কঠিনভাবে যুদ্ধ করতে লাগলেন। অবশেষে তারা জানতে পারলেন তাদের মাঝে রাসূল জীবিত আছেন। তখন তিনি রাসূল -এর কাছে ছুটে গিয়ে তাঁকে চুমু খেলেন এবং বিপদ দূর হওয়া পর্যন্ত তাঁর সাথে থাকলেন।
📄 হাসান ও হুসাইন রা.-এর প্রতি আলী রা.-এর অসিয়ত
আলী -এর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসলে তিনি তাঁর ছেলে হাসান ও হুসাইন -কে ডাকলেন। তিনি তাঁদেরকে লক্ষ করে বললেন,
-সত্যাগ্রহ করবে।
-ইয়াতিমদের প্রতি রহম করবে।
-অভিভাবকের জন্য প্রস্তুত থাকবে।
-অত্যাচারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।
-মাযলুমকে সহযোগিতা করবে।
-আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী আমল করবে।
-আল্লাহ্র হুকুম পালন করতে গিয়ে কোনো নিন্দাকারীর নিন্দা যেন তোমাকে দুর্বল করে না দেয়।
এভাবে তিনি অনেকগুলো ওসিয়ত করলেন।
টিকাঃ
৭৭২. তারিখুত তাবরী, ৬ষ্ঠ খন্ড, ৮০ পৃ.।