📄 আলী রা. ও দুর্গের দরজা
যুদ্ধ ভয়াবহভাবে চলতে লাগল। যোদ্ধাদের মাথার পাশে মৃত্যু ঘুরঘুর করছিল। আলী ﷺ প্রাণপণ আক্রমণ চালাচ্ছিলেন। তিনি তাঁর বক্ষ শাহাদাতের জন্যে উন্মুক্ত করে দিলেন। তিনি ভয় ভীতিহীনভাবে লড়াই করতে লাগলেন। এমনকি তিনি দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করার একটি পথও তৈরি করে ফেলছিলেন এবং দুর্গতি বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেলেন। এমন সময় দুর্গের কিছু পাহারাদার এসে তাঁর ওপর হামলা চালায়। তাদের একজন তাঁকে এমন এক আঘাত করল যে, সাথে সাথে তাঁর ঢাল হাত থেকে পড়ে গেল।
তখন তিনি চিৎকার দিয়ে বলতে লাগলেন, আল্লাহ্ শপথ! হয় আমি হামযার মতো শাহাদাতের স্বাদ ভোগ করব অথবা আল্লাহ্ তা’আলা আমাকে বিজয় দান করবেন।
তিনি দ্রুত গিয়ে দুর্গের পাশে পড়ে থাকা একটি পুরাতন দরজা ঢাল হিসেবে তুলে নিলেন। এমনকি খায়বার বিজয় শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি ওই দরজাটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
রাসূল ﷺ-এর আযাদকৃত দাস আবু রাফে যিনি আলী ﷺ-এর বাহিনীতে ছিলেন। তিনি বলেন, যে দরজাটি আলী ﷺ যুদ্ধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন যুদ্ধ শেষে সে দরজাটি আমি ও আমার সত্ত্বরজন লোক তুলতে চেষ্টা করেছি তবু মাটি থেকে উপরে তুলতে পারিনি。
টিকাঃ
৯৭ আল বায়হাকী ফি দালায়েলুন নুবুওয়াত, ৪খ. ১৮২ পৃ.
📄 ফাতেমা রা. একজন গোলাম চাইলেন
সূর্য ঘুম থেকে জেগে উঠে তার সোনালি রশ্মি চারিদিকে ছড়িয়ে দেওয়ার আগেই ফাতেমা ﷺ উঠে তার কাজ সমাধান করতে লেগে যান। অথচ তিনি রাসূল ﷺ-এর পরিবার-পরিজনের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ছিলেন।
তিনি যব পিষে সেগুলো ছাতুতে এনে তাঁর হাত ব্যথায় ফুলে উঠত। তারপর পানির মশক বহন করে পানি নিয়ে আসতেন। বাড়ি নিজ হাতে ঘর ঝাড়ু দিতেন। এতে তাঁর অনেক কষ্ট হতো। এমনকি তাঁর ওড়নার উপরের অংশেও ধুলো-বালি লেগে যেত। এরপর তিনি চুলায় পাত্র রেখে রান্না শুরু করতেন। রান্না তৈরি করতে গিয়ে দেখা যেত তাঁর পরিহিত কাপড় ময়লা হয়ে গেছে। এতসব কাজ একা শেষ করতে দিতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তেন।
একদিন রাসূল ﷺ-এর কাছে কিছু বন্দি ও গোলাম আসল। তখন আলী ﷺ ফাতেমা ﷺ-এর কাছে ছুটে গিয়ে বললেন, ফাতেমা, রাসূল ﷺ-এর কাছে কিছু খাদেম ও গোলাম এসেছে। তুমি তাঁকে গিয়ে একজন খাদেম দিতে বল।
ফাতেমা নবী ﷺ-এর কাছে গিয়ে একজন খাদেম চাইলেন, কিন্তু নবী ﷺ তাঁকে কোনো খাদেম দিলেন না।
তিনি তাঁকে বললেন, আমি কী তোমাকে খাদেম থেকেও উত্তম কিছু বলে দিব না? যখন তুমি তোমার বিছানায় যাবে (রাতে ঘুমাতে যাবে) তখন সুবহানাল্লাহ তেত্রিশ বার বলবে, আল হামদুলিল্লাহ তেত্রিশ বার বলবে আর আল্লাহু আকবার চৌত্রিশ বার বলবে।
তখন ফাতেমা ﷺ লাজুকতার সাথে মাথা তুলে বললেন, আমি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের ওপর সন্তুষ্ট।……আমি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের ওপর সন্তুষ্ট। এ কথা বলে তিনি ফিরে গেলেন。
টিকাঃ
৯৮ রিয়াজুস সাহাবা, ২য় খণ্ড, ৭০৬ পৃ.। ফার্মা-১৬
📄 প্রতি নেকে দশগুণ
ছেঁড়া কাপড় পরিহিত দুর্বল শরীরের এক গরিব লোক আলী ﷺ-এর কাছে খাবার চাইল।
তখন আলী ﷺ তাঁর ছেলে হাসান ﷺ-কে বললেন, তুমি তোমার মায়ের কাছে গিয়ে তাকে বল, বাবা তোমার কাছে যে ছয় দিরহাম রেখে গেছে, সেখান থেকে এক দিরহাম দাও।
হাসান ﷺ তাঁর মায়ের কাছ থেকে ফিরে এসে বললেন, তুমি তো ছয় দিরহাম গম ক্রয় করার জন্যে রেখেছ।
তখন আলী ﷺ বললেন, ওই বান্দার ঈমান পরিপূর্ণ হয় না যে নিজের হাতে যা আছে তার থেকে আল্লাহ্ যা হতে যা আছে তা পাওয়ার অধিক আশাবাদী না হয়।
তারপর তিনি হাসান ﷺ-কে বললেন, তুমি গিয়ে তাকে দুই দিরহাম গিয়ে দিতে বল।
তখন ফাতেমা ﷺ ছয় দিরহাম পুরাই পাঠিয়ে দিলেন। আলী ﷺ সেগুলো ভিখুককে দিয়ে দিলেন।
আলী ﷺ সেখান থেকে উঠার আগেই এক লোক তার পাশ দিয়ে উট নিয়ে যাচ্ছিল। সে উটটি বিক্রয় করতে চাইল।
তিনি লোকটিকে বললেন, উটের নাম কত?
সে বলল, একশত চল্লিশ দিরহাম।
তিনি বললেন, তুমি আমার কাছে এটি বিক্রি কর, আমি তোমাকে কিছুক্ষণ পর মূল্য পরিশোধ করে দিব। লোকটি তাঁর কথাতে রাজি করল। এরপর সে লোকটি যৌখিক থেকে এসেছে সেদিকে ফিরে গেল।
কিছুক্ষণ পর সেখান দিয়ে আরেকজন লোক আসল। সে এসে বলল, এ উটটি কার?
আলী ﷺ বললেন, আমার।
লোকটি বলল, তুমি কী তা বিক্রি করবে?
তিনি বললেন, হ্যাঁ।
লোকটি বলল, কততে বিক্রি করবে?
তিনি বললেন, দুই শত দিরহামে।
লোকটি বলল, আমি তা কিনে নিলাম।
লোকটি উট নিয়ে গেল আর তাঁকে দুইশত দিরহাম দিয়ে গেল। আলী ﷺ ওই দুইশত দিরহাম থেকে যার কাছ থেকে মূলো নিয়ে গিয়েছিলেন তাকে একশত চল্লিশ দিরহাম দিলেন। আর বাকি ষাট দিরহাম নিয়ে ফাতেমা ﷺ-এর কাছে গেলেন।
তিনি তা দেখে বললেন, এগুলো কী?
আলী ﷺ বললেন, এগুলো তা, যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর রাসূলের মাধ্যমে আমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছিলেন।
مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا وَمَنْ جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَى إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ
لَا يُظْلَمُونَ-
“যে একটি সৎকাজ করবে, সে তার দশগুণ পাবে এবং যে, একটি মন্দ কাজ করবে, সে তার সমান শাস্তিই পাবে। বস্তুত তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।” (সূরা আন’আম : ১৬০)
টিকাঃ
৯৯ আদ্ দোরুসিল মুস্তাম্বাতিল আলীল বিন আবু তালিব মিনাল ইলাল ইলমাইন ইসতিফহাজাল, ৬৩ পৃ.
📄 সাহসী বালক
একদিন আলী ﷺ দেখতে পেলেন তাঁর ছেলে চুপি চুপি নবী ﷺ-এর পিছনে নামাজ পড়ছিলেন।
তিনি প্রথম দেখলেন যে, তাঁর ছেলেটি নবী ﷺ-এর অনুসরণ করছে, তাঁর ধর্মই সন্তুষ্ট হয়েছে এবং কুরাইশদের উপাস্য দেবদেবীকে বর্জন করেছে। নামাজ শেষ হওয়ার পর তাঁর ছেলে তাঁকে ছুটে এসে বলল, হে আমার বাবা, ......আমি আল্লাহ্ ও তাঁর ঈমান এনেছি, তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান এনেছি, তিনি যে ওহী নিয়ে আগমন করেছেন সে ওহীর ওপর ঈমান এনেছি এবং তাঁর অনুসরণ করেছি।
তখন আলী ﷺ মৃদু হেসে বললেন, জেনে রাখ, তিনি তোমাকে ভালো ব্যতীত অন্য কোনো পথে ডাকবেন না, সুতরাং তাঁর সাথে লেগে থাক。
টিকাঃ
১০৭ খুলাফায়ে রাসূল, ৪৪৬-৪৪৭ পৃ.