📄 আলী রা. ও অহংকারী ইহুদি
ইহুদি মারহাব তার ধূসর রঙের ঘোড়ার পিঠে বসে তীক্ষ্ণ ধারালো তরবারি নাড়াতে নাড়াতে গর্ব আর অহংকারের সাথে গাইতে লাগল।
قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَبٌ شَاكِي الْسِلاحِ بَطَلٌ مُجَرَبٌ إِذَا الْحُرُوبُ أَقْبَلَتْ تَلَهَبُ
যারব্বার সম্পর্কে
আমি মারহাব অবগত হয়েছি।
যখন যুদ্ধ অগ্নির মতো এসেছে।
তখন আমি অস্ত্র সজ্জিত বিজয়ী বীর প্রতাপ।
তখন তার মোকাবিলা করার জন্য আমের বিন সিনান ﺭَﺿِﻲَ اللّٰهُ عَنْهُ তার প্রতিউত্তরের দিয়ে তার সামনে এগিয়ে গেলেন।
قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي عَامِرٌ شَاكِي الْسِلاحِ بَطَلٌ مُغَامِرٌ
যারব্বার সম্পর্কে
অস্ত্র সজ্জিত সাহসী বীর আমের অবগত হয়েছে।
এরপর তারা দু'জন সম্মুখ যুদ্ধ করলেন। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে ইহুদি মারহাবের তরবারি আমের ﺭَﺿِﻲَ اللّٰهُ عَنْهُ-এর টালে পড়ল। তখন তিনি তাঁর তরবারি ফিরিয়ে নিয়ে মারহাবকে নিচ থেকে মারতে চাইলেন, কিন্তু তিনি মারহাবকে মারতে গিয়ে নিজেই মারা গেলেন।
তখন কোনো কোনো লোক বলতে লাগল, আমের নিজেকে হত্যা করে নিজেরই আমল নষ্ট করে ফেলেছে। এ কথা শুনে সালামা বিন আকওয়া কাঁদতে কাঁদতে দ্রুত নবী ﷺ-এর কাছে ছুটে গেলেন।
নবী ﷺ কাঁদতে দেখে বললেন, তোমার কী হয়েছে? তিনি চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, মানুষ বলছে আমের নাকি নিজের আমল নষ্ট করে ফেলেছে!
এ কথা শুনে রাগে নবী ﷺ-এর চেহারা মোবারক রক্তে পরিবর্তন হয়ে গেল। তিনি বললেন, আবু সালামা, এ কথা কে বলেছে? তিনি বললেন, আপনার সাহাবীদের মধ্য থেকে একজন লোক বলেছে। নবী ﷺ বললেন, তারা মিথ্যা বলেছে; বরং তার জন্যে রয়েছে দ্বিগুণ প্রতিদান। তারপর নবী ﷺ তার মোকাবিলাত্পর জন্য আলী ﷺ-কে পাঠালেন। তিনি তাঁর হাতে ইসলামের পতাকা তুলে দিলেন। আলী রাসূল ﷺ-এর নির্দেশে গিয়ে ইহুদি মারহাবের উদ্দেশে ছুটে গেলেন। ইহুদি মারহাব তখনো গাইছে ছিল, قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَبٌ شَاكِي السِّلَاحِ بَطَلٌ مُجَرَّبٌ إِذَا الْحُرُوبُ أَقْبَلَتْ تَلَهَبُ
মারহাব সম্পর্কে আমি মারহাব অবগত হয়েছি। যখন যুদ্ধ অগ্নির মতো তেলে উঠে তখন আমি অস্ত্রে সজ্জিত অভিজ্ঞ বীর প্রস্তুত।
আলী ﷺ তার প্রতিউত্তরে গাইতে লাগলেন, أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أُمِّي حَيْدَرَة كَلَيْثِ غَابَاتٍ كَرِيحِ الْمَنْظَرَة أُوفِيهِمُ بِالصَّاعِ كَيْلِ السِّنْدَرَة
আমি সেই ব্যক্তি যার তার নাম রেখেছে সিংহ। যেন নিকটস্থ এক পরিবেশ বনের রাজা তারপর তিনি দ্রুত ইহুদির দিকে এগিয়ে গিয়ে সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তিনি তার এতো কাছে গেলেন যে, তার নিঃশ্বাসের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলেন। তিনি তাকে এমনভাবে আঘাত করলেন যে, সে মাটিতে পড়ে গেল। তারপর তিনি আকাশের দিকে তরবারি উঠিয়ে তার মাথায় মারলেন। সাথে সাথে তার মাথা দুই খণ্ড হয়ে গেল।
তারপর মারহাব গলাকাটা গরুর মতো মাটিতে লাফালাফি করতে শুরু করল। অবশেষে সে তার অভিশপ্ত জীবন শেষে নিঃশ্বাস ত্যাগ করল。
টিকাঃ
৫৬৬ মুসনাদে আহমদ, ৪র্থ খণ্ড, ৫২ পৃ.
📄 এ দায়িত্ব কার ওপর বর্তাবে
সকালের সূর্য উদিত হয়েছে, মদিনার অলিতে-গলিতে সূর্য তার তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধশয্যায় শায়িত রাসূল ﷺ-এর অবস্থা জানার জন্য মানুষজন তাঁর দরজায় ভিড় করছিল। এমন সময় আলী রাসূল ﷺ-এর কক্ষ থেকে বের হয়ে এলেন। তিনি ওই সকল লোকদের পাশ দিয়ে যেতে লাগলেন। তখন তারা রাসূল ﷺ-এর অবস্থা জানার জন্য তাঁকে ঘিরে ধরল। তারা তাঁকে বলল, হাসানদের বাবা, রাসূল ﷺ-এর কী অবস্থা? আলী ﷺ বললেন, আল্লাহর শুকরিয়া তিনি সুস্থ আছেন। তখন আব্বাস ﷺ তাঁর হাত ধরে কানে কানে বললেন, আমি রাসূল ﷺ-কে দেখেছি, তিনি এ অসুস্থতায় ইন্তেকাল করবেন। কেননা আব্দুল মুত্তালিবের সন্তানদের মৃত্যুর সময়ে চেহারা আমার জানা আছে... সুতরাং তুমি রাসূল ﷺ- কে গিয়ে জিজ্ঞেস কর যে, এ দায়িত্ব (খিলাফাত) কার ওপর বর্তাবে। যদি তা আমাদের কারো মধ্যে থেকে হয়ে থাকে তবে আমরা তা জানতে পারলাম আর যদি অন্য কারো মধ্যে থেকে হয়ে থাকে তবে তিনি অসিয়ত করে যাবেন। তখন আলী ﷺ জান ও বিবেকের সাথে বললেন, আল্লাহর শপথ! যদি আমরা রাসূল ﷺ-কে তা জিজ্ঞেস করার পর তিনি আমাদেরকে নিষেধ/বাদ দিয়ে দেন তাহলে মানুষ কখনোই আমাদেরকে তা দিবে না। আল্লাহর শপথ! আমি কখনো তা রাসূল ﷺ-কে জিজ্ঞেস করব না。
টিকাঃ
৫৬৭ তারিখুত তাবারী, ৩য় খণ্ড, ১৯০, ১৯৪ পৃ.
📄 বিচারের সম্মুখীন আমীরুল মুমিনীন
আলী ﷺ একটি বর্ম হারিয়ে ফেলেছিলেন। পরে তিনি তা এক ইহুদির হাতে দেখতে পেলেন। তখন তিনি ইহুদিকে বললেন, এটিতো আমার বর্ম, আমি তো কাউকে তা দান করিনি অথবা বিক্রয় করিনি। ইহুদি বলল, এটি আমার বর্ম, আর এটিতো আমার হাতেই। তিনি বললেন, আমরা বিচারকের কাছে যাব। এ কথা বলে উভয়ে বিচারক ওরাইহের কাছে রওনা দিলেন। ওরাইহ বললেন, আমীরুল মুমিনীন, আপনার অভিযোগ পেশ করুন।
আলী ﷺ বললেন, এ ইহুদির হাতে যে বর্মটি এটি আমার বর্ম। আমি কাউকে তা দানও করিনি, কারো কাছে বিক্রয়ও করিনি। তারপর ওরাইহ ইহুদিকে বললেন, হে ইহুদি, এ ব্যাপারে আপনি কী বলেন। ইহুদি বলল, এটি আমার বর্ম আর এটিতো আমার হাতেই। ওরাইহ আলী ﷺ-কে বললেন, আপনার কোনো প্রমাণ আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমার আযাদকৃত দাস কানবার ও আমার ছেলে হাসান আছে, তারা সাক্ষ্য দিবে এটি আমার। তখন ওরাইহ বললেন, বাবার পক্ষে ছেলের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং বর্মটি ইহুদি'র।
মুসলিম বিশ্বের খলিফা আমীরুল মুমিনীন আলী ﷺ-এর বিরুদ্ধে বিচারক রায় দেওয়ার কারণে ইহুদি অবাক হলো। সে চিৎকার দিয়ে বলতে লাগল, আমীরুল মুমিনীন আমাকে বিচারকের কাছে নিয়ে এসেছেন, আর বিচারক তাঁর বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি এটি (ধর্ম) সত্য। আর আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর এ বর্মটি আপনার, আমীরুল মুমিনীন。
টিকাঃ
৫৬৮ তারিখুল খুলাফা, ১২-১৩৯ পৃ.
📄 সেদিন কিছু চেহারা উজ্জ্বল হবে আর কিছু চেহারা কালো হয়ে যাবে
আমীরুল মুমিনীন ওমর ﷺ আলী ﷺ-কে এক খণ্ড জমিন দিলেন। আলী ﷺ জমিনটি কিনে নিতে তাতে পানির জন্য একটি কূপ খনন করতে নির্দেশ দিলেন। লোকজন কূপ খনন করতে গিয়ে দেখতে পেল নিচ থেকে শীতল মিষ্টি পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তখন তারা আলী ﷺ-কে এ সুসংবাদ দিতে দ্রুত ছুটে গেল। তিনি বিনয়ের সাথে মাথা তুলে বললেন, এটি উত্তরাধিকারীদেরকে আনন্দ দিবে। এবং তিনি উচ্চ আওয়াজে বললেন, হে লোক সকল, আমি আল্লাহকে সাক্ষ্য রেখে, এরপর তোমাদের সাক্ষ্য রেখে এ কূপটি ও জমিনটি যুদ্ধ বা শান্তি সব সকলের জন্য গরীব-মিসকীন, মুসাফির, আল্লাহ্র রাস্তার মুজাহিদ, কাছে-দূরের সকলের জন্য সাকা করে দিলাম, সে দিনের নাজাতের জন্যে যেদিন কিছু চেহারা হাস্যোজ্জ্বল হবে আর কিছু চেহারা কালো হবে। যাইহোক আল্লাহ তা’আলা আমার চেহারা থেকে জাহান্নামকে দূরে রাখবেন আর জাহান্নাম থেকে আমাকে দূরে রাখবেন。
টিকাঃ
৫৬৯ তারিখুন মদিনাতুল মুনাওয়ারাহ, ১ ম খণ্ড, ২২০ পৃ.