📄 আবু যর রা.-এর মেহমানদারী
রাসূল (সাঃ)-এর আগমনের কথা জানতে পেরে আবু যর গিফারী (রাঃ) সত্যের সন্ধানে মক্কায় এসে পৌঁছেছেন, কিন্তু তিনি মনে মনে মক্কাবাসীদেরকে ভয় করতে লাগলেন। কেননা তিনি জানতে পেরেছেন কোরাইশরা মুসলমানদের ওপর ক্ষুব্ধ। মক্কায় কেউ যদি ইসলামের কথা প্রকাশ্য ঘোষণা করত তাকে তারা কঠিন শাস্তি দিত। আর এ কারণে তিনি কাউকে মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে ভয় করেছেন। কেননা তিনি তো জানেন না, কে তাঁর অনুসারী আর কে তাঁর বিরোধী। যখন রাত ঘনিয়ে আসল তিনি মসজিদে এসেছিলেন, তাঁর পাশ দিয়ে হযরত আলী (রাঃ) যেতেছিলেন। আলী (রাঃ) তাঁকে দেখতে পেয়ে বুঝতে পারলেন তিনি অন্য দেশের লোক। আলী (রাঃ) বললেন, এই যে ভাই, আপনি আমাদের ঘরে চলুন। তিনি তাঁর সাথে গেলেন এবং তাঁর ঘরে রাত কাটালেন। যখন সকাল হলো তিনি তাঁর পানি ও খাদ্য নিয়ে মসজিদে চলে গেলেন, কিন্তু তারা এক অপরকে কিছুই জিজ্ঞেস করেননি। তারপর তিনি পরের দিনও মক্কায় এভাবে কাটালেন, কিন্তু রাসূল (সাঃ) সম্পর্কে কিছু জানতে পারেননি। সন্ধ্যা হয়ে গেলে তিনি মসজিদে থাকার প্রস্তুতি নেন। আগের দিনের মতো হযরত আলী (রাঃ) তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন। তিনি তাঁকে দেখতে পেয়ে বললেন, লোকটির কি তাঁর থাকার জায়গা চিনার সময় হয়নি।
এবং কথা শুনে তিনি হযরত আলী (রাঃ)-এর বাড়িতে গেলেন এবং তাঁর ঘরে রাত কাটালেন। সেদিনও তাঁরা একে অপরকে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। তৃতীয় দিন আলী (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন- আপনি কেন মক্কায় এসেছেন তা কি আমাকে বলবেন না? তিনি বললেন, আপনি যদি আমাকে ওয়াদা দেন আমি যা খুঁজতে এসেছি তা দেখিয়ে দিবেন তাহলে বলব। হযরত আলী (রাঃ) তাঁকে ওয়াদা দিলেন। তিনি বললেন, আমি মক্কা নগরীতে অনেক দূর থেকে এসেছি নতুন নবীর সাথে দেখা করার জন্য এবং তাঁর কাছ থেকে কিছু কথা শুনার জন্য। তাঁর এ কথা শুনে হযরত আলী (রাঃ) মন আনন্দে মেতে উঠলেন। হযরত আলী (রাঃ) বললেন, নিশ্চয়ই তিনি সত্য নবী, নিশ্চয়ই ...... নিশ্চয়ই। সকালে আপনি আমার সাথে তাঁর কাছে যাবেন। যখন আমি কফিলের কিছু দেখব আমি দাঁড়িয়ে যাব এবং পেশাব করার অজুহয় করব আর যখন আপনি ইঁটতক থাকব আপনি আমার অনুসরণ করে হাঁটবেন। হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) যেন রাতটি কাটালেন না। তাঁর কাছে অন্যান্য রাতও থেকে এ রাতটি অনেক লম্বা মনে হচ্ছিল। তিনি সারা রাত অপেক্ষা করছিলেন কখন সকাল হবে আর রাসূল (সাঃ)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হবে এবং তাঁর কাছে আসা ওহী থেকে কিছু শুনবেন। রাতের অন্ধকার দূর হয়ে যখন সকাল হলো হযরত আলী (রাঃ) মেহমানকে নিয়ে রাসূল (সাঃ)-এর ঘরের দিকে রওয়ানা দিলেন। হযরত আবু যর (রাঃ) অন্য কোনো দিকে দৃষ্টিপাত না করে তাঁকে অনুসরণ করে চলতে লাগলেন। অবশেষে তাঁরা নবী করীম (সাঃ)-এর কাছে গিয়ে পৌঁছলেন。
টিকাঃ
১০২ মুসতাদরাকুম তিন ফাসাদীয় সাহাবা, আবু যর গিফারী (রাঃ)।
📄 স্বর্ণ, রূপা ও আলী রা.
ইবনে তিব্বাহু ইব্রাদ বাদিয়া আমীরুল মুমিনীন আলী (রাঃ)-এর কাছে আসতে লাগল। যিনি নবী (সাঃ)-এর সুপ্রত্ন মোতাকে তাঁর সঙ্গীদের মাঝে বসে আছেন। সে তাঁর কাছে এসে দীর্ঘশ্বাস দিয়ে বলল, আমীরুল মুমিনীন, বায়তুল মাল স্বর্ণ আর রূপাতে ভরে গেছে। আলী (রাঃ) একখানা ওনার পর মজলিস থেকে উঠে বায়তুল মালে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি স্বর্ণ রূপা হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন, হে হলুদ (‘স্বর্ণ’) ....হে সাদা (রূপা)...আমাকে ভিন্ন অন্য কাউকে নৌকা দাও। (অর্থাৎ আমাকে ধোঁকা দিও না)。
টিকাঃ
১০৩ তারিখুল মুমিনীন আলী বিন আবু তালিব মিবাল ইলাল ইলতিফাদ ২৯ পৃঃ.
📄 তুমি আমার পক্ষ থেকে সে অবস্থানে হারুন মুসার পক্ষ থেকে যে অবস্থানে ছিল
নবী (সাঃ) আলী (রাঃ)-কে একদা তাঁর পরিবার-পরিজনকে দেখা-শুনা করার জন্য মদীনায় রেখে যাচ্ছিলেন। ওদিকে মুনাফিকরা তাঁর ব্যাপারে এই বলে গুজব তুলতে লাগল যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) আলীকে বোঝা মনে করে রেখে যাচ্ছে এবং বোঝা কমানোর জন্যই তাকে রেখে যাচ্ছে। মুনাফিকদের এমন কথা আলী (রাঃ)-এর কানে এসে পৌঁছল। তাই তিনি অস্ত্র হাতে নিয়ে নবী (সাঃ)-এর কাছে এলেন। নবী (সাঃ) তখন মদিনার কাছে জুরফে অবস্থান করছিলেন। তিনি এসে নবী (সাঃ)-কে অশ্রুসিক্ত চোখে বললেন, হে আল্লাহর নবী, মুনাফিকরা ধারণা করছে আপনি আমাকে বোঝা মনে করে রেখে যাচ্ছেন। তখন নবী (সাঃ) বললেন, তারা মিথ্যা বলেছে... বরং আমি যাদেরকে রেখে এসেছি দেখাশুনা করার জন্য তোমাকে সুলাভিকৃত করে এসেছি। সুতরাং তুমি ফিরে গিয়ে তোমার ও আমার পরিবারদের দেখাশুনা কর। তারপর নবী (সাঃ) আলী (রাঃ)-এর কাছে এসে তাঁকে আরো উৎসাহিত করতে গিয়ে বললেন, আলী, তুমি কী এত সন্তুষ্ট নও যে, হারুন মুসার পক্ষ থেকে যে অবস্থানে ছিল তুমি আমার পক্ষ থেকে সে অবস্থানে থাকবে। তবে ব্যবধান হচ্ছে আমার পরে আর কোনো নবী আসবে না। নবী (সাঃ) থেকে এমন কথা শুনে আলী (রাঃ)-এর মন প্রশান্তি লাভ করল। তাঁর অন্তর থেকে সব দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেল। তিনি খুশি হয়ে ফিরে গেলেন। তারপর তিনি মদিনায় ফিরে আসলেন。
টিকাঃ
১০৪ তারিখুত তাবায়ী, ৩য় খণ্ড, ১০৪ পৃঃ.
📄 কে অধিক সাহসী বীর?
কুফা নগরীতে মসজিদের মিম্বরের পাশে বসে আলী বিন আবু তালিব (রাঃ) ইসলামের অগ্রগামী সৈনিকদের জীবনী নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখন তিনি বললেন, হে লোক সকল, তোমরা আমাকে বল কে অধিক সাহসী বীর ছিলেন? তারা বলল, আমীরুল মুমিনীন, আপনি। তিনি বললেন, জেনে রাখ, আমি যতবার যুদ্ধ করেছি ততবার তার থেকেও আঘাত পেয়েছি। তোমরা আমাকে বল কে অধিক সাহসী বীর ছিলেন। তারা বলল, আমীরুল মুমিনীন, তাহলে কে ছিলেন আমরা জানি না।
তিনি বললেন, যখন আমরা রাসূল (সাঃ)-এর জন্য তাবু তৈরি করলাম। তখন আমরা বললাম, হে রাসূল (সাঃ)-এর কাছে থাকবে যাতে করে কোনো মুশরিক তাঁর ওপর হামলা করতে না পারে। আল্লাহর শপথ! আবু বকর (রাঃ) ব্যতীত সে দিন কেউই রাসূল (সাঃ)-এর দেহরক্ষী হতে সাহস করেননি। এরপর যখনই কোনো মুশরিক রাসূল (সাঃ)-এর দিকে আসতেন আবু বকর (রাঃ) তাঁর ওপর তীব্রগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন এবং তাঁকে তরবারি দিয়ে তাড়িয়ে দিতেন। তিনি ছিলেন অধিক সাহসী বীর。
টিকাঃ
১০৫ মাজমাউত জাওয়াঈদ, ৯ম খণ্ড, ৬৭ পৃঃ।