📄 গরিব ও দিনার
একদিন আমীরুল মুমিনীন আলী বিন আবু তালিব রঃ-এর দরবারে উঁচুপাল, কোটরগত চোখবিশিষ্ট জীর্ণশীর্ণ এক ব্যক্তি ঢুকে পড়ল। তার চেহারায় দারিদ্র্যতার চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। হাজার তৈলযুক্ত তৈরি কাপড়ে তার শরীর ঢাকা ছিল। সে ধীরে ধীরে এসে আলী রঃ-এর সামনে বসল। তার দুই ঠোঁট কথা বলার জন্য নাড়ানোর পূর্বে তার চেহারায় লজ্জা ফুটে উঠল।
সে এত ক্ষীণকণ্ঠে কথা বলতে শুরু করল মনে হচ্ছিল সে নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না। সে বলল, আমীরুল মুমিনীন, আপনার কাছে আমার একটা প্রয়োজন আছে। আপনার কাছে পেশ করার আগে আমি তা আল্লাহ্র কাছে পেশ করেছি। যদি আপনি আমার প্রয়োজন পূরণ করে দেন তাহলে আমি আল্লাহ্র প্রশংসা করব আর আপনার কৃতজ্ঞ হবো। আর যদি আপনি প্রয়োজন পূর্ণ না করেন তাহলে আমিও আল্লাহর প্রশংসা করব এবং আপনার ওপর মেনে নিব। তখন আলী (রাঃ) বললেন, তুমি মাটির উপর লিখ, কেননা আমি তোমার চেহারায় লাজুকতা দেখতে অপছন্দ করছি। তখন লোকটি লিখল, আমি অভাগী। তখন আলী (রাঃ) বললেন, আমার কাছে জামা নিয়ে আস, তাঁর আদেশমতো জামা নিয়ে আসা হলো। তখন লোকটি জামাটি নিয়ে তা পরিধান করল। তারপর সে গাইতে শুরু করল,
فَمُوْنُ أَمُّسِكَ مِنْ حُسُنِ الْقِضَاءِ حَلَا إِنْ يُذَبْ حُسْنُ كَفَافِي لِكَ مُكْرَمَةً وَكُنْتَ تَنْهَضُ بِمَا قَدْ قُلْتَهُ بَدَلًا كَالْغَيْبِ يَحْيَى نَدَاهُ السَّهْلُ وَالْجَبَلَا إِنَّ الْقَضَاءَ لِيُحْيَى ذِكْرُ صَاحِبِهِ لَا تُؤَخِّرْ الْدَّهْرَ فِي حُجْرٍ مُوَقِّفَةً فَتَلْكَ عَبْدٍ سَيُجْزَى بِالدِّينِ عِجْلًا
আপনি আমাকে জামা পরিধান করিয়েছিলেন যার সৌন্দর্য প্রকাশযোগ্য হচ্ছে।
অচিরেই আমি আপনাকে প্রশংসার পোশাক পরিয়ে দেব।
যদি আপনি আমার প্রশংসা পান আপনি সম্মান পেলেন।
কেননা প্রশংসা প্রশংসাকেও ব্যক্তির আলোচনা বাড়িয়ে দেয়।
যেমনভাবে বৃষ্টি পাহাড় পর্বত ও সমতল জমিকে জীবিত করে।
আপনাকে করার অফকীফ দেওয়া হয়েছে এমন কোনো কল্যাণকে তুচ্ছ মনে করবেন না।
কেননা প্রতিটি বাক্য তার কৃতকর্মের পুরস্কার পাবে।
তখন আলী (রাঃ) বললেন, আমার কাছে দিনার নিয়ে আস। তখন দুইশত দিনার দিয়ে আসা হলো। তিনি তা ওই লোককে দিলেন। তখন আসবাগ বলল, আমীরুল মুমিনীন, একটি দামি জামার সাথে আরো দুই শত দিনার!
আলী (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ, আমি রাসূল (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘প্রত্যেক মানুষকে তার মর্যাদায় রাখ।’ আর আমার কাছে এটাই হচ্ছে ঐ লোকটির মর্যাদা。
টিকাঃ
১০০ আল কাজায়, ১ম খণ্ড, ২৯০ পৃঃ。
📄 অবাধ্যতার প্রতিদান
আমীরুল মুমিনীন আলী (রাঃ) বললেন, অপরাধের প্রতিদান হচ্ছে- ইবাদতের ক্ষেত্রে দুর্বলতা আসবে, জীবনে চলার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা আসবে। স্ত্রীর কাছে মনোবাসনা পূরণের জন্য গেলে তুচ্ছ না হওয়া। আলী (রাঃ) আরো বললেন, কারো আত্মীয় না হয়ে তার থেকে যে ব্যক্তি সম্মানের আশা করে, আতিথেয়তা ব্যতীত যে ব্যক্তি আতিথেয়তা চায়, সম্পদ ব্যতীত যে ব্যক্তি ধনী হতে চায় সে যেন পাপ থেকে বেঁচে থাকে এবং আনুগত্যশীল হয়。
টিকাঃ
১০১ তারিখুল ইয়া’কুবী, ২য় খণ্ড, ১৩৫ পৃ.
📄 আবু যর রা.-এর মেহমানদারী
রাসূল (সাঃ)-এর আগমনের কথা জানতে পেরে আবু যর গিফারী (রাঃ) সত্যের সন্ধানে মক্কায় এসে পৌঁছেছেন, কিন্তু তিনি মনে মনে মক্কাবাসীদেরকে ভয় করতে লাগলেন। কেননা তিনি জানতে পেরেছেন কোরাইশরা মুসলমানদের ওপর ক্ষুব্ধ। মক্কায় কেউ যদি ইসলামের কথা প্রকাশ্য ঘোষণা করত তাকে তারা কঠিন শাস্তি দিত। আর এ কারণে তিনি কাউকে মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে ভয় করেছেন। কেননা তিনি তো জানেন না, কে তাঁর অনুসারী আর কে তাঁর বিরোধী। যখন রাত ঘনিয়ে আসল তিনি মসজিদে এসেছিলেন, তাঁর পাশ দিয়ে হযরত আলী (রাঃ) যেতেছিলেন। আলী (রাঃ) তাঁকে দেখতে পেয়ে বুঝতে পারলেন তিনি অন্য দেশের লোক। আলী (রাঃ) বললেন, এই যে ভাই, আপনি আমাদের ঘরে চলুন। তিনি তাঁর সাথে গেলেন এবং তাঁর ঘরে রাত কাটালেন। যখন সকাল হলো তিনি তাঁর পানি ও খাদ্য নিয়ে মসজিদে চলে গেলেন, কিন্তু তারা এক অপরকে কিছুই জিজ্ঞেস করেননি। তারপর তিনি পরের দিনও মক্কায় এভাবে কাটালেন, কিন্তু রাসূল (সাঃ) সম্পর্কে কিছু জানতে পারেননি। সন্ধ্যা হয়ে গেলে তিনি মসজিদে থাকার প্রস্তুতি নেন। আগের দিনের মতো হযরত আলী (রাঃ) তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন। তিনি তাঁকে দেখতে পেয়ে বললেন, লোকটির কি তাঁর থাকার জায়গা চিনার সময় হয়নি।
এবং কথা শুনে তিনি হযরত আলী (রাঃ)-এর বাড়িতে গেলেন এবং তাঁর ঘরে রাত কাটালেন। সেদিনও তাঁরা একে অপরকে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। তৃতীয় দিন আলী (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন- আপনি কেন মক্কায় এসেছেন তা কি আমাকে বলবেন না? তিনি বললেন, আপনি যদি আমাকে ওয়াদা দেন আমি যা খুঁজতে এসেছি তা দেখিয়ে দিবেন তাহলে বলব। হযরত আলী (রাঃ) তাঁকে ওয়াদা দিলেন। তিনি বললেন, আমি মক্কা নগরীতে অনেক দূর থেকে এসেছি নতুন নবীর সাথে দেখা করার জন্য এবং তাঁর কাছ থেকে কিছু কথা শুনার জন্য। তাঁর এ কথা শুনে হযরত আলী (রাঃ) মন আনন্দে মেতে উঠলেন। হযরত আলী (রাঃ) বললেন, নিশ্চয়ই তিনি সত্য নবী, নিশ্চয়ই ...... নিশ্চয়ই। সকালে আপনি আমার সাথে তাঁর কাছে যাবেন। যখন আমি কফিলের কিছু দেখব আমি দাঁড়িয়ে যাব এবং পেশাব করার অজুহয় করব আর যখন আপনি ইঁটতক থাকব আপনি আমার অনুসরণ করে হাঁটবেন। হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) যেন রাতটি কাটালেন না। তাঁর কাছে অন্যান্য রাতও থেকে এ রাতটি অনেক লম্বা মনে হচ্ছিল। তিনি সারা রাত অপেক্ষা করছিলেন কখন সকাল হবে আর রাসূল (সাঃ)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হবে এবং তাঁর কাছে আসা ওহী থেকে কিছু শুনবেন। রাতের অন্ধকার দূর হয়ে যখন সকাল হলো হযরত আলী (রাঃ) মেহমানকে নিয়ে রাসূল (সাঃ)-এর ঘরের দিকে রওয়ানা দিলেন। হযরত আবু যর (রাঃ) অন্য কোনো দিকে দৃষ্টিপাত না করে তাঁকে অনুসরণ করে চলতে লাগলেন। অবশেষে তাঁরা নবী করীম (সাঃ)-এর কাছে গিয়ে পৌঁছলেন。
টিকাঃ
১০২ মুসতাদরাকুম তিন ফাসাদীয় সাহাবা, আবু যর গিফারী (রাঃ)।
📄 স্বর্ণ, রূপা ও আলী রা.
ইবনে তিব্বাহু ইব্রাদ বাদিয়া আমীরুল মুমিনীন আলী (রাঃ)-এর কাছে আসতে লাগল। যিনি নবী (সাঃ)-এর সুপ্রত্ন মোতাকে তাঁর সঙ্গীদের মাঝে বসে আছেন। সে তাঁর কাছে এসে দীর্ঘশ্বাস দিয়ে বলল, আমীরুল মুমিনীন, বায়তুল মাল স্বর্ণ আর রূপাতে ভরে গেছে। আলী (রাঃ) একখানা ওনার পর মজলিস থেকে উঠে বায়তুল মালে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি স্বর্ণ রূপা হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন, হে হলুদ (‘স্বর্ণ’) ....হে সাদা (রূপা)...আমাকে ভিন্ন অন্য কাউকে নৌকা দাও। (অর্থাৎ আমাকে ধোঁকা দিও না)。
টিকাঃ
১০৩ তারিখুল মুমিনীন আলী বিন আবু তালিব মিবাল ইলাল ইলতিফাদ ২৯ পৃঃ.