📄 আলী ব্যতীত কোনো যুবক নেই
তরবারি ঝনঝন আওয়াজে, তীর বর্শার সাজে সজ্জিত হয়ে অশ্বের উপর আরোহণ করে সৈন্যদের সম্মুখে গিয়ে مسلمانوں প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে আমর বিন আবদে ওয়াদ বলল, তোমাদের মধ্যে কোনো মহাযোদ্ধা আছে?
তার আওয়াজে সাহাবায়ে কেরামদের কেউ সাড়া দিলেন না। তাদের মাঝে নীরবতা বিরাজ করছিল। তাদের মধ্যে কে আছে, যে আমাদের মতো বীরের সাথে সম্মুখ যুদ্ধ করবে। যার সামনে যাওয়া মানে নিশ্চিত মৃত্যুকে টেনে আনা। কেননা সে তার সাথে লড়াই করা কোনো যোদ্ধা হওয়া ব্যতীত হতো না।
তাদের মাঝে কবরস্থানের নীরবতার মতো নীরবতা বিরাজ করছিল। হঠাৎ এ নীরবতা ভেঙে এক যুবক দাঁড় হয়ে ঘোষণা করল, হে আল্লাহ্র রাসূল, আমি এর মোকাবিলা করব। তাঁর মাঝে নবী করীম সঃ-এর ভালোবাসার আলো জ্বলে উঠল। তিনি আমরের ডাকে ছুটে যেতে লাগলেন।
কিন্তু নবী করীম সঃ তাঁর দিকে মায়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, তুমি বস, সে কিন্তু আমর। (অর্থাৎ সে তো সাধারণ যোদ্ধা নয়।)
এরপর আমর আবার চিৎকার দিয়ে বলতে লাগল, আমর মোকাবিলা করার মতো কোনো লোক নেই? তোমাদের সেই জান্নাতী কোথায় যা তোমরা ধারণা কর যে, তোমাদের কেউ নিহত হলে সে জান্নাতে যাবে। তোমাদের কেউ কি আমার মোকাবিলায় আসবে না। তোমার কী জান্নাতও চাও না!
তখন আবার আলী রঃ উঠে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! এর মোকাবিলা আমি করব।
নবী সঃ তাঁকে আবার ধমক দিয়ে বললেন, তুমি বস, সে তো আমর। (অর্থাৎ সে তো সাধারণ যোদ্ধা নয়।)
রাসূল সঃ-এর কথা মতো আলী বসে গেলেন, কিন্তু ওই দিকে আমর বসে নেই। সে আরো বেশি অহংকারের সাথে হাঁক-ডাক লাগল।
وَلقَدْ بَجَحْتُ مِنَ الْبِدَاءِ بِجُهْرَةِ هَلْ مِنْ مُبَارِزٍ وَقَدْ إِنْ جَبَتْ الْعَمْشَجُ مُوْقِفَ الْقَرْنِ الْمُنَازِزِ مُتَسَرَعَافِيَلَ الْهَرَاهِرِ وَلَكَ أَنِّيَ لَمْ أَزَلْ وَالْجَوْدِ وَالْوَغَى مَنْ مِثْلاَتٍ إِنَّ الشَّجَاعَةَ فِي الْفَتَى
আমি তাদের সাড়া পাইনি যখন বলেছি কোনো যোদ্ধা আছ কী? আমি সেখানে অবস্থান করেছিলাম যেখানে বীর দুর্বল হয়ে যায়। আমি তো মৃত্যুর পূর্বে গলার গড়গড় শব্দ হওয়ার আগে যাব না। বীরত্ব তো যুবকদের মাঝে দানশীলতা তো স্বভাবগতই।
তার এমন কবিতা কান ছেদ করে অন্তরে আঘাত করছিল। আলী রঃ-এর মনে দহিজ্বল এ ছন্দগুলো তাঁর অন্তরে তীরের মতো আঘাত করছিল। তিনি বসে থাকতে পারছিলেন না। তাঁর ধৈর্যের বাঁধ মানছিল না। তিনি আবার নবী সঃ-এর কাছে ছুটে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল, এর মোকাবিলা আমি করব।
নবী সঃ বললেন, বস, সে তো আমর। (অর্থাৎ সে তো সাধারণ যোদ্ধা নয়)।
তখন তিনি আল্লাহ্র ওপর পূর্ণ ঈমান রেখে বললেন, হোক না সে আমর।
এ কথা বলে তিনি দৃঢ়তার সাথে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন আর আবৃত্তি করতে লাগলেন,
لاَ تَعْجَلَنَّ فَقَدْ أَذَانَ بِيَوْمَةٍ وَبَصَيْرَةٍ مُدَّيْبِقَ وَكُرْ عَادَ الْمُزَاهَرِ مِنْ ضَرْبِهِ تَجْلاءُ
তুমি তাড়াহুড়া করো না তোমার ডাকে সাড়া দানকারী আসছে নিয়ত ও সুদৃঢ়চিত্তর সাথে সত্যই সব মুক্তিকামীকে রক্ষা করে। এক আঘাতে যার স্মরণ মৃত্যুর পূর্বে গলার গড়গড় শব্দ চলার সময়েও থাকবে।
আলী রঃ বীরের মতো আমরের দিকে ছুটে গেলেন। তিনি যখন তার কাছে পৌঁছলেন তখন সে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, হে যুবক, তুমি কে?
তিনি বললেন, আবু তালিবের ছেলে আলী।
সে বলল, ভাতিজা, তোমার থেকে বড় কেউ নেই, কেননা আমি তোমার রক্ত প্রবাহিত করতে অপছন্দ করছ।
তিনি বললেন, তুমি না আল্লাহকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ যে, যদি কুরাইশের কোনো লোক তোমাকে যুদ্ধ করার দিকে আহ্বান করে তবে তুমি তা গ্রহণ করবে।
সে বলল, হ্যাঁ।
তিনি বললেন, তাহলে শোন, আমি তোমাকে আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও ইসলামের দিকে আহ্বান করছি।
তখন সে হেসে বলল, এসব আমার কোনো প্রয়োজন নেই।
তিনি বললেন, তাহলে আমি তোমাকে লড়াই করতে আহ্বান করছি।
সে বলল, কেন ভাতিজা? লাতের শপথ! আমি তোমার রক্ত প্রবাহিত করতে পছন্দ করি না।
তিনি বললেন, কিন্তু আল্লাহ্র শপথ! আমি তোমার রক্ত প্রবাহিত করতে পছন্দ করি।
তাঁর এমন কথাতে আমর খুবই রাগ হলো। সে তার তরবারি আলী রঃ-এর উপর হাঁকাতে লাগল। উভয়ের মাঝে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আলী রঃ তাঁর ঢাল নিয়ে আমরের সামনের দিকে এগিয়ে এলেন। আমর এমন এক আঘাত করল যে, আলী রঃ-এর ঢাল চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।
অন্যদিকে আলী রঃ তার ঘাড়ের শাহ রগে আঘাত করলেন। এতে আমর পড়ে গেল। তাঁর রক্তে মাটি লাল হয়ে গেল।
এ কাকের নিহত হওয়ার পর মুসলমানগণ মাঝে তাকবীর ধ্বনি শুরু হয়ে গেল। তারা বলতে লাগল, আল্লাহু আকবার..... আল্লাহু আকবার...... আলী ব্যতীত কোনো যুবক নেই।
তিনি ফিরে আসলে ওমর রঃ বললেন, তুমি কী তার ঢাল নিয়ে আসতে পারনি। কেননা আরবেরা তাকে উত্তম ঢাল কেউ ব্যবহার করত না।
তিনি বললেন, চাচাতো ভাই, আমার চাচাতো ভাইদেরকে লজ্জা কারণ আমি তার ঢাল নিয়ে আসতে পারিনি。
টিকাঃ
৯৯৭ সিরাহু ইবনি হিশাম, ৩য় খণ্ড, ২৭৬ পৃ.
📄 গরিব ও দিনার
একদিন আমীরুল মুমিনীন আলী বিন আবু তালিব রঃ-এর দরবারে উঁচুপাল, কোটরগত চোখবিশিষ্ট জীর্ণশীর্ণ এক ব্যক্তি ঢুকে পড়ল। তার চেহারায় দারিদ্র্যতার চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। হাজার তৈলযুক্ত তৈরি কাপড়ে তার শরীর ঢাকা ছিল। সে ধীরে ধীরে এসে আলী রঃ-এর সামনে বসল। তার দুই ঠোঁট কথা বলার জন্য নাড়ানোর পূর্বে তার চেহারায় লজ্জা ফুটে উঠল।
সে এত ক্ষীণকণ্ঠে কথা বলতে শুরু করল মনে হচ্ছিল সে নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না। সে বলল, আমীরুল মুমিনীন, আপনার কাছে আমার একটা প্রয়োজন আছে। আপনার কাছে পেশ করার আগে আমি তা আল্লাহ্র কাছে পেশ করেছি। যদি আপনি আমার প্রয়োজন পূরণ করে দেন তাহলে আমি আল্লাহ্র প্রশংসা করব আর আপনার কৃতজ্ঞ হবো। আর যদি আপনি প্রয়োজন পূর্ণ না করেন তাহলে আমিও আল্লাহর প্রশংসা করব এবং আপনার ওপর মেনে নিব। তখন আলী (রাঃ) বললেন, তুমি মাটির উপর লিখ, কেননা আমি তোমার চেহারায় লাজুকতা দেখতে অপছন্দ করছি। তখন লোকটি লিখল, আমি অভাগী। তখন আলী (রাঃ) বললেন, আমার কাছে জামা নিয়ে আস, তাঁর আদেশমতো জামা নিয়ে আসা হলো। তখন লোকটি জামাটি নিয়ে তা পরিধান করল। তারপর সে গাইতে শুরু করল,
فَمُوْنُ أَمُّسِكَ مِنْ حُسُنِ الْقِضَاءِ حَلَا إِنْ يُذَبْ حُسْنُ كَفَافِي لِكَ مُكْرَمَةً وَكُنْتَ تَنْهَضُ بِمَا قَدْ قُلْتَهُ بَدَلًا كَالْغَيْبِ يَحْيَى نَدَاهُ السَّهْلُ وَالْجَبَلَا إِنَّ الْقَضَاءَ لِيُحْيَى ذِكْرُ صَاحِبِهِ لَا تُؤَخِّرْ الْدَّهْرَ فِي حُجْرٍ مُوَقِّفَةً فَتَلْكَ عَبْدٍ سَيُجْزَى بِالدِّينِ عِجْلًا
আপনি আমাকে জামা পরিধান করিয়েছিলেন যার সৌন্দর্য প্রকাশযোগ্য হচ্ছে।
অচিরেই আমি আপনাকে প্রশংসার পোশাক পরিয়ে দেব।
যদি আপনি আমার প্রশংসা পান আপনি সম্মান পেলেন।
কেননা প্রশংসা প্রশংসাকেও ব্যক্তির আলোচনা বাড়িয়ে দেয়।
যেমনভাবে বৃষ্টি পাহাড় পর্বত ও সমতল জমিকে জীবিত করে।
আপনাকে করার অফকীফ দেওয়া হয়েছে এমন কোনো কল্যাণকে তুচ্ছ মনে করবেন না।
কেননা প্রতিটি বাক্য তার কৃতকর্মের পুরস্কার পাবে।
তখন আলী (রাঃ) বললেন, আমার কাছে দিনার নিয়ে আস। তখন দুইশত দিনার দিয়ে আসা হলো। তিনি তা ওই লোককে দিলেন। তখন আসবাগ বলল, আমীরুল মুমিনীন, একটি দামি জামার সাথে আরো দুই শত দিনার!
আলী (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ, আমি রাসূল (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘প্রত্যেক মানুষকে তার মর্যাদায় রাখ।’ আর আমার কাছে এটাই হচ্ছে ঐ লোকটির মর্যাদা。
টিকাঃ
১০০ আল কাজায়, ১ম খণ্ড, ২৯০ পৃঃ。
📄 অবাধ্যতার প্রতিদান
আমীরুল মুমিনীন আলী (রাঃ) বললেন, অপরাধের প্রতিদান হচ্ছে- ইবাদতের ক্ষেত্রে দুর্বলতা আসবে, জীবনে চলার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা আসবে। স্ত্রীর কাছে মনোবাসনা পূরণের জন্য গেলে তুচ্ছ না হওয়া। আলী (রাঃ) আরো বললেন, কারো আত্মীয় না হয়ে তার থেকে যে ব্যক্তি সম্মানের আশা করে, আতিথেয়তা ব্যতীত যে ব্যক্তি আতিথেয়তা চায়, সম্পদ ব্যতীত যে ব্যক্তি ধনী হতে চায় সে যেন পাপ থেকে বেঁচে থাকে এবং আনুগত্যশীল হয়。
টিকাঃ
১০১ তারিখুল ইয়া’কুবী, ২য় খণ্ড, ১৩৫ পৃ.
📄 আবু যর রা.-এর মেহমানদারী
রাসূল (সাঃ)-এর আগমনের কথা জানতে পেরে আবু যর গিফারী (রাঃ) সত্যের সন্ধানে মক্কায় এসে পৌঁছেছেন, কিন্তু তিনি মনে মনে মক্কাবাসীদেরকে ভয় করতে লাগলেন। কেননা তিনি জানতে পেরেছেন কোরাইশরা মুসলমানদের ওপর ক্ষুব্ধ। মক্কায় কেউ যদি ইসলামের কথা প্রকাশ্য ঘোষণা করত তাকে তারা কঠিন শাস্তি দিত। আর এ কারণে তিনি কাউকে মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে ভয় করেছেন। কেননা তিনি তো জানেন না, কে তাঁর অনুসারী আর কে তাঁর বিরোধী। যখন রাত ঘনিয়ে আসল তিনি মসজিদে এসেছিলেন, তাঁর পাশ দিয়ে হযরত আলী (রাঃ) যেতেছিলেন। আলী (রাঃ) তাঁকে দেখতে পেয়ে বুঝতে পারলেন তিনি অন্য দেশের লোক। আলী (রাঃ) বললেন, এই যে ভাই, আপনি আমাদের ঘরে চলুন। তিনি তাঁর সাথে গেলেন এবং তাঁর ঘরে রাত কাটালেন। যখন সকাল হলো তিনি তাঁর পানি ও খাদ্য নিয়ে মসজিদে চলে গেলেন, কিন্তু তারা এক অপরকে কিছুই জিজ্ঞেস করেননি। তারপর তিনি পরের দিনও মক্কায় এভাবে কাটালেন, কিন্তু রাসূল (সাঃ) সম্পর্কে কিছু জানতে পারেননি। সন্ধ্যা হয়ে গেলে তিনি মসজিদে থাকার প্রস্তুতি নেন। আগের দিনের মতো হযরত আলী (রাঃ) তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন। তিনি তাঁকে দেখতে পেয়ে বললেন, লোকটির কি তাঁর থাকার জায়গা চিনার সময় হয়নি।
এবং কথা শুনে তিনি হযরত আলী (রাঃ)-এর বাড়িতে গেলেন এবং তাঁর ঘরে রাত কাটালেন। সেদিনও তাঁরা একে অপরকে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। তৃতীয় দিন আলী (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন- আপনি কেন মক্কায় এসেছেন তা কি আমাকে বলবেন না? তিনি বললেন, আপনি যদি আমাকে ওয়াদা দেন আমি যা খুঁজতে এসেছি তা দেখিয়ে দিবেন তাহলে বলব। হযরত আলী (রাঃ) তাঁকে ওয়াদা দিলেন। তিনি বললেন, আমি মক্কা নগরীতে অনেক দূর থেকে এসেছি নতুন নবীর সাথে দেখা করার জন্য এবং তাঁর কাছ থেকে কিছু কথা শুনার জন্য। তাঁর এ কথা শুনে হযরত আলী (রাঃ) মন আনন্দে মেতে উঠলেন। হযরত আলী (রাঃ) বললেন, নিশ্চয়ই তিনি সত্য নবী, নিশ্চয়ই ...... নিশ্চয়ই। সকালে আপনি আমার সাথে তাঁর কাছে যাবেন। যখন আমি কফিলের কিছু দেখব আমি দাঁড়িয়ে যাব এবং পেশাব করার অজুহয় করব আর যখন আপনি ইঁটতক থাকব আপনি আমার অনুসরণ করে হাঁটবেন। হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) যেন রাতটি কাটালেন না। তাঁর কাছে অন্যান্য রাতও থেকে এ রাতটি অনেক লম্বা মনে হচ্ছিল। তিনি সারা রাত অপেক্ষা করছিলেন কখন সকাল হবে আর রাসূল (সাঃ)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হবে এবং তাঁর কাছে আসা ওহী থেকে কিছু শুনবেন। রাতের অন্ধকার দূর হয়ে যখন সকাল হলো হযরত আলী (রাঃ) মেহমানকে নিয়ে রাসূল (সাঃ)-এর ঘরের দিকে রওয়ানা দিলেন। হযরত আবু যর (রাঃ) অন্য কোনো দিকে দৃষ্টিপাত না করে তাঁকে অনুসরণ করে চলতে লাগলেন। অবশেষে তাঁরা নবী করীম (সাঃ)-এর কাছে গিয়ে পৌঁছলেন。
টিকাঃ
১০২ মুসতাদরাকুম তিন ফাসাদীয় সাহাবা, আবু যর গিফারী (রাঃ)।