📄 আলী রা.-এর বুদ্ধিমত্তা
হঠাৎ করে একদিন এক অবরোধী অশ্বের পদাবাতে মরুর বালু উড়ছিল। সে বাতাসে বেশ মদিনার দিকে ছুটে আসছিল, আর চিৎকার দিয়ে বলতে লাগল, হে আল্লাহ্র রাসূল, কুরাইশরা চুক্তি ভঙ্গ করেছে।
কুরাইশদের পক্ষ থেকে চুক্তি ভঙ্গ করার পর রাসূল ﷺ মক্কায় অভিযানের প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। তখন হাতিব বিন আবু বালতা রাসূল ﷺ কুরাইশদেরকে মক্কা আক্রমণের সংবাদ দিয়ে একটি চিঠি লিখলেন। তারপর সে চিঠি এক মহিলার দ্বারা মক্কাবাসীদের কাছে পাঠালেন। তিনি সে মহিলাকে কুরাইশদের কাছে চিঠিটি লুকিয়ে দেওয়ার জন্যে কিছু স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে রাজি করালেন। মহিলাটি চিঠিটি তাঁর মাথার চুলের ভেতরে লুকিয়ে নিল। এরপর সে দ্রুত মদিনা থেকে মক্কার দিকে রওনা দিল।
মহিলাটি মক্কা পৌঁছার আগেই আল্লাহ্র পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে রাসূল ﷺ জেনে গেলেন। রাসূল ﷺ এ সংবাদ পাওয়ার পর মহিলাটির কাছ থেকে চিঠি উদ্ধার করে নিয়ে আসতে আলী বিন আবু তালিব ﷺ ও মিকদাদ ﷺ-কে প্রেরণ করলেন। কোনো কোনো বর্ণনায় মিকদাদ ﷺ-এর পরিবর্তে যুবাইর বিন আওয়াম ﷺ-এর নাম এসেছে। নবী করীম ﷺ তাঁদেরকে বললেন, তোমরা দুজন অমুক জায়গায় এক মহিলাকে পাবে, যে মহিলা হাতিব বিন আবু বালতার লেখা চিঠি নিয়ে মক্কাবাসীর কাছে যাচ্ছে। যে চিঠিতে আমরা কুরাইশদের বিরুদ্ধে যা করেছি সে সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে।
তখন আলী ﷺ তাঁর সঙ্গীকে নিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চলতে লাগলেন। যেতে যেতে তাঁরা রাসূল ﷺ-এর বলে দেওয়া জায়গায় গিয়ে মহিলাটিকে পেলেন।
তাঁরা মহিলাটিকে বলল, তোমার সাথে একটি চিঠি আছে।
মহিলাটি ভীতু হয়ে বলল, না, ...আমার কাছে কোনো চিঠি নেই।
তখন তাঁরা দুজন মহিলাটির সাথে থাকা আসবাবপত্র সবকিছু তল্লাশি করেও কোনোকিছুই পেলেন না। এমনকি তাঁরা নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে চাইলেন, কিন্তু পরক্ষণে আলী ﷺ পূর্ণ ঈমানের সাথে বললেন, আল্লাহ্র শপথ! রাসূল ﷺ-এর ওপর মিথ্যা অহি নাযিল হয় না, আর রাসূল ﷺ ও আমাদের সাথে মিথ্যা বলেন না। আল্লাহ্র শপথ! হয় তুমি চিঠি বের করবে অথবা আমরা তোমাকে উলঙ্গ করব।
যখন মহিলা তাঁর দৃঢ়তা দেখল তখন সে বলল, আমার থেকে অনাদিকে নিয়ে দাঁড়াও। তখন তারা অন্য দিকে ফিরে দাঁড়ালেন। এরপর সে তার চুলের গোছা থেকে চিঠিটি বের করে দিল।
চিঠি বের করার সাথে সাথে খুশিতে আলী ﷺ-এর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি চিঠিটি নিয়ে রাসূল ﷺ-এর কাছে ছুটে এলেন。
টিকাঃ
৩০৩। তারীখুত তাবারী, ৩য় খণ্ড, ৪৮,৪৯ পৃঃ。
📄 নবী সা.-এর ঘরে প্রতিপালিত
আবু তালিবের পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেশি ছিল। তাই নবী করীম ﷺ তাঁর চাচা আব্বাস ﷺ-কে বললেন, হে আমার চাচা আব্বাস! নিশ্চয়ই আপনার ভাই আবু তালিবের পরিবারটি বেশি সদস্যবিশিষ্ট। আর এখন খুব অভাব-অনটন চলছে। আসুন আমরা আবু তালিবের বাড়িতে গিয়ে দেখি তাঁর পরিবারের বোঝা কিছুটা হালকা করতে পারি কিনা। নাবী ﷺ আব্বাস ﷺ-কে এ কথা বললেন যে, আব্বাস ﷺ-এর আর্থিক অবস্থা অনেক ভালো ছিল। তিনি তাঁর চাচার সাথে পরামর্শ করে বললেন, আমি আবু তালিবের একটি সন্তান প্রতিপালন করব, আর আপনি একটি সন্তান প্রতিপালন করবেন। তখন আব্বাস ﷺ বললেন, ঠিক আছে চল। অবশেষে চাচা-ভাতিজা দুইজনই আবু তালিবের কাছে এসে বললেন, আমরা দু'জন আপনার দু’টি ছেলের দায়িত্ব নিয়ে আপনার পরিবারের বোঝাটা একটু হালকা করতে চাচ্ছি, এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী? এ কথা শুনে আবু তালিব বললেন, ঠিক আছে, তোমরা আক্বীলকে রেখে বাকিদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা নিয়ে যাও। তখন রাসূল ﷺ আলী ﷺ-কে নিলেন আর আব্বাস ﷺ জাফর ﷺ-কে নিলেন। এরপর থেকে আলী ﷺ নবী ﷺ-এর কাছে বেড়ে উঠতে লাগলেন, আর জাফর ﷺ চাচা আব্বাস ﷺ-এর কাছে বেড়ে উঠতে লাগলেন。
টিকাঃ
৩০৩। আস সিরাতুন নাববীয়্যাহ্ লি ইবনি হিশাম, ১ম খণ্ড, ২৪৯ পৃঃ।
📄 বালকদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী
আলী ﷺ নবী ﷺ-এর সাথে থাকতে লাগলেন। তিনি তাঁর কোলে বড় হতে লাগলেন। এ কারণে তিনি প্রতিটি কাজে নবী ﷺ-এর অনুসরণ করতেন ও তাঁকে অনুকরণ করতেন। নবী ﷺ-এর সাথে থাকার কারণে তিনি জাহিলী যুগেও কোনো মূর্তির উদ্দেশ্যে সিজদা করেননি এবং অন্যান্য শিশুদের মতো অনর্থক দুষ্টামিও করেননি। তিনি তাঁর চাচাতো ভাই মুহাম্মাদ ﷺ-এর দিকে লক্ষ্য করে তাঁকে সবার সেরা মানুষ হিসেবে দেখতেন। এ কারণে তিনি কখনোই তাঁর থেকে আলাদা হতেন না এবং তাঁর কর্মগুলো না করে থাকতেন না। এভাবেই তাঁর নবী ﷺ থেকে আচার-ব্যবহারের ও উত্তম চরিত্র শিক্ষা লাভ করেন। তাঁকে মনে হতো নবী ﷺ-এর ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। এই মধ্যে বেরোত পর্বতের নূরের আলো উজ্জ্বল। মহান আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নবী ﷺ হেদায়েতের বাণী লাভ করলেন। প্রথম কুরআন নাযিল হওয়ার পর নবী ﷺ দ্রুত খাদিজা ﷺ-এর কাছে ছুটে এলেন। নবী সর্বপ্রথম খাদিজা ﷺকে ইসলামের দাওয়াতও দিলেন। খাদিজা তাঁর দাওয়াতও গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গেলেন। এরপর তিনি আলী ﷺ-কে ইসলামের দিকে আহ্বান করলেন। আলী ﷺ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে মুসলমান হয়ে গেলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র আট বছর। এরপর অন্যান্য ইসলাম গ্রহণ করলেন।
এ কারণে তিনিই বালকদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী。
টিকাঃ
৩০৪। বুলায়াতু রাসুলিন নিল আখফাক।
📄 গিরিপথে নামায
বর্ণিত আছে, যখন নামাযের সময় হতো তখন নবী ﷺ মক্কার এক গিরিপথে চলে যেতেন। তাঁর সাথে আলী ﷺ-ও যেতেন। তাঁরা সেখানে গোপনে নামায আদায় করতেন। যখন বিকেল হতো তখন ফিরে আসতেন। এভাবে তাঁদের দিন চলছিল। এরমধ্যে একদিন আলী ﷺ-এর পিতা আবু তালিব নবী ﷺ-কে নামায পড়তে দেখলেন। তখন তিনি নবী ﷺ-কে বললেন, হে আমার ভাইপো, এটা কোন দ্বীন যেদিকে তুমি ডাক।
নবী ﷺ বললেন, চাচা, এটা আল্লাহ্র দ্বীন, তাঁর ফেরেশতাদের দ্বীন, তাঁর রাসূলগণের দ্বীন আর আমাদের পিতা ইবরাহীম (আ)-এর দ্বীন। আল্লাহ্ আমাকে তাঁর বান্দাদের প্রতি রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন। আর যাদেরকে আমি নসিহত করেছি এবং যাদেরকে আমি হেদায়েতের দিকে আহ্বান করছি তাঁদের মধ্যে আপনি সবার অগ্রগামী হওয়ার যোগ্য, আমার দিকে সওয়াব দেওয়া, আমাকে এ বিষয়ে সহযোগিতা করা, এসব ক্ষেত্রে আপনি সবার অগ্রে থাকার কথা।
নবী ﷺ-এর এমন কথাউত্তরে আবু তালিব বললেন, আমার ভাতিজা, আমি আমার বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করতে পারব না。
টিকাঃ
৩০৫। আস সিরাতুন নাববীয়্যাহ্ লি ইবনি হিশাম, ১ম খণ্ড, ২৪৯ পৃঃ।