📄 উসমান রা.-এর বিচক্ষণতা
ঊনত্রিশ হিজরীতে আমীরুল মুমিনীন উসমান (রাঃ) হজ্জ্ব করতে মক্কায় গমন করেন। তিনি যখন মিনায় অবস্থান করছিলেন তখন নামায কসর না করে পূর্ণ চার রাকাত আদায় করলেন। এ খবরটি আব্দুর রহমান বিন আওফ (রাঃ)-এর কানে গিয়ে পৌঁছে। তখন আব্দুর রহমান বিন আওফ (রাঃ) তাঁর সাথীদেরকে নিয়ে নামায কসর করে চার রাকাতের পরিবর্তে দুই রাকাত আদায় করলেন। তারপর তিনি উসমান (রাঃ)-এর কাছে গেলেন। তিনি তাঁকে বললেন, আপনি কি রাসুল (সাঃ)-এর সাথে এ স্থানে নামায দুই রাকাত পড়তেন? উসমান (রাঃ) বললেন, হ্যা, পড়েছি। তিনি বললেন, আবু বকরের সাথে কি দুই রাকাত করে পড়তেন? উসমান (রাঃ) বললেন, হ্যা, পড়েছি। তিনি বললেন, আপনি কি ওমরের সাথে কি দুই রাকাত করে পড়তেন? উসমান (রাঃ) বললেন, হ্যা, পড়েছি। তিনি বললেন, আপনি কি আপনার খিলাফতও শুরুত এখানে দুই রাকাত করে পড়তেন? উসমান (রাঃ) বললেন, হ্যা, পড়েছি। তারপর উসমান (রাঃ) বললেন, আবু মু’আয (আব্দুর রহমান বিন আওফ), তাহলে আমার কথা শুন, আমি খবর পেয়েছি ইয়ামান ও জুফার কিছু মানুষ গত বছর বলেছে, নামায স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্যে দুই রাকাত। কেননা উসমান বিন তোমায়ের ইমাম যিনি মক্কায় স্থায়ী হিসেবে অবস্থান নেওয়ার পরেও দুই রাকাত পড়েছেন। আর এ কারণেই মানুষের ভুল ভাঙ্গানোর জন্যে আমি কসর না করে পূর্ণ চার রাকাত আদায় করেছি। যখন আব্দুর রহমান বিন আওফ (রাঃ) দেখলেন মানুষকে ফেতনা থেকে বাঁচানোর জন্যে উসমান (রাঃ) ঠিক কাজ করেছেন তখন তিনিও মানুষকে নিয়ে নামায কসর না করে পূর্ণ চার রাকাত আদায় করেছেন。
টিকাঃ
১৬১ তারীখে তাবারী, ৩য় খণ্ড, ২৮০ পৃঃ。
১৬২ তারীখে তাবারী, ৩য় খণ্ড, ৩০৬ পৃঃ।
📄 এ উম্মতের নাজাত কিসে নিহিত?
সবাইকে কাঁদিয়ে একদিন রাসুল (সাঃ) পবিত্র মুখ মোবারক তাঁর প্রতিপালকের কাছে চলে গেছে। তাঁর বিদায়ে মদিনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সাহাবায়ে কেরামদের চোখের বুক ভেসে গেছে। সকল হৃদয় এক বিশাল বেদনায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। তখন খিলাফতের দায়িত্ব আবু বকর (রাঃ)-এর হাতে নামলো। এরই মধ্যে একদিন উসমান (রাঃ) ভ্রমণে বেরিয়েছেন। এমন সময় তাঁর পাশ দিয়ে ওমর (রাঃ) গমন করলেন। ওমর (রাঃ) তাঁকে বসে সালাম দিলেন, কিন্তু তিনি সালামের উত্তর দিলেন না। তাঁর থেকে সালামের উত্তর না পাওয়ার পর ওমর (রাঃ) গিয়ে আবু বকর (রাঃ)-এর কাছে অভিযোগ করে বললেন, হে আল্লাহর রাসুলের খলিফা, আমি উসমানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে সালাম দিয়েছি, কিন্তু তিনি আমার সালামের উত্তর দিলেন না। আবু বকর (রাঃ) এ কথা শুনে ওমর (রাঃ)-এর হাত ধরে তাঁর কাছে আসলেন। আবু বকর (রাঃ) তাঁকে বললেন, উসমান, তোমার পাশ দিয়ে তোমার ভাই যাওয়ার সময় তোমাকে সালাম দিয়েছে, কিন্তু তুমি সালামের কোনো উত্তর দাওনি। কী কারণে তুমি এমন করেছ? উসমান (রাঃ) বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি টেরই পাইনি, সে যে আমার পাশ দিয়ে গিয়েছে আর আমাকে সালাম দিয়েছে। আবু বকর (রাঃ) বললেন, তুমি সত্য বলছ, আল্লাহর শপথ! আমার মনে হয়, তুমি মনে মনে কোনো বিষয়ে ভাবছিলে যা তোমাকে অন্যমনস্ক করে রেখেছে। তিনি বললেন, হ্যা। আবু বকর (রাঃ) বললেন, তা কী? তিনি চিন্তিত মনে বললেন, রাসুল (সাঃ) ইন্তিকাল করেছেন অথচ আমি রাসুল (সাঃ)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে পারিনি যে, এ উম্মতের নাজাত কিসে নিহিত? আমি এ বিষয়টি মনে ভাবছিলাম, কিন্তু আমি অবাক হয়েছি আমি জিজ্ঞেস করতে দেরি করে ফেলেছি। তখন আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) হাসোজ্জ্বল চেহারায় বললেন, আমি তা জিজ্ঞেস করেছি, তিনি আমাকে তা বলেছেন। উসমান (রাঃ) এ কথা শুনে খুশি হয়ে বললেন, তা কী? তিনি বললেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! এ উম্মতের নাজাতো (মুক্তি) কিসে নিহিত? রাসুল (সাঃ) বললেন, আমি যে কালিমা আমার চাচার সামনে পেশ করে পর তিনি তা গ্রহণ করেননি, যে ব্যক্তি এ কালিমা গ্রহণ করবে, সে ক্বিয়ামাহ তার জন্যে নাজাতো হবে। যে কালিমা রাসুল (সাঃ) তাঁর চাচা আবু তালিবের সামনে পেশ করেছেন সে কালিমা হচ্ছে এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল। لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ ٱللَّهِ
টিকাঃ
১৬৩ ইবনু আহমদ হাদিসটি এনেছেন, ১ম খণ্ড, ৬৫ ও মাজমাউস যাওয়াদ, ১ম খণ্ড, ৬৪।
📄 উসমান রা. নিজের ওপর সাথিদেরকে প্রাধান্য দিলেন
আমীরুল মুমিনীন উসমান (রাঃ) তাঁর কিছু সাথীদের নিয়ে ওমরা করার নিয়তে আল্লাহ তা'আলার ঘরের উদ্দেশ্যে বের হলেন। এরই মধ্যে কেউ একজন তাঁকে একটি পাখি রান্না করে হাদিয়া দিল। তখন তিনি তাঁর সাথীদেরকে বললেন, তোমরা খাও ...কিন্তু তিনি নিজে সেখান থেকে খেতে চাইলেন না। তখন আমর বিন আ'স (রাঃ) অবাক হয়ে বললেন, আমরা কী এমন খাবার খাব যা আপনি নিজে খাবেন না! এভাবেই উসমান (রাঃ) নিজে না খেয়ে তাঁর সাথীদেরকে প্রাধান্য দিয়ে তাদেরকে খাওয়ালেন。
টিকাঃ
১৬৪ আহকামুল সাহারা, ২য় খণ্ড, ৬৭ পৃঃ.
📄 আবু বকর রা.-এর অসিয়ত
আবু বকর (রাঃ) মৃত্যুশয্যায় শায়িত হয়ে আছেন। তিনি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের অপেক্ষায় আছেন। মৃত্যুর আগ মুহুর্তে তাঁর অসিয়ত লেখার জন্য তিনি উসমান (রাঃ)-কে ডেকে পাঠালেন। তিনি আসার পর আবু বকর (রাঃ) অসিয়তগুলো বলতে লাগলেন আর তিনি লিখতে লাগলেন। কিন্তু তাঁর পরবর্তী খলিফার নাম বলার আগেই তিনি বেহুঁশ হয়ে জ্ঞান হারালেন। উসমান (রাঃ) তাঁর পরবর্তী খলিফা হিসেবে ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ)-এর নাম লিখলেন। তাঁর জ্ঞান ফিরে আসলে তিনি বললেন, তুমি কী লিখেছ? উসমান (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ, আমি লিখেছি। তিনি বললেন, কার নাম লিখেছ? উসমান (রাঃ) বললেন, আমি ওমরের নাম লিখেছি। তখন আবু বকর (রাঃ) মুচকি হেসে বললেন, আমি যার নাম লিখতে বলার ইচ্ছে করেছি তুমি তার নামই লিখেছ। তুমি তোমার নিজের নামও লিখতে তবে তুমিও সেটির যোগ্য। অর্থাৎ তাহলে কোনো সমস্যা হতো না কেননা তুমিও খিলাফতের যোগ্য。
টিকাঃ
১৬৫ তাইরীখুল মাদীনাহ সিরাতে উসমান বিন আফফান, ২০ পৃঃ.