📄 গরিব আমীর
হযরত ওমর ১৬৬ হযরত সাঈদ বিন আমের ১৬৬-কে ইয়ামানের সহযোগিতা করার জন্য আহ্বান করলেন।
তিনি বললেন, হে সাঈদ! আমি আপনাকে হিমসবাসীদের আমীর হিসেবে নিয়োগ দিলাম।
হযরত সাঈদ ১৬৬ বললেন, হে ওমর! আমি তোমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বললে আমাকে পরীক্ষায় ফেললে না।
তার এ কথায় হযরত ওমর ১৬৬ খুব রাগান্বিত হয়ে বললেন: কি আশ্চর্য...........! তোমরা আমার ঘাড় খিলাফতের দায়িত্ব দিয়ে আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছ! আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে ছেড়ে দেব না। এরপর তিনি তাঁকে হিমস শহরের গভর্নরের হিসেবে নিযুক্ত করলেন।
হযরত ওমর ১৬৬ বললেন, আমি কি আপনার জন্য বেতন-ভাতা নির্ধারিত করে দিব না?
হযরত সাঈদ বিন আমের ১৬৬ বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! বেতন ভাতা দিয়ে আমি কি করব? কেননা বায়তুল মালের বেতন-ভাতা আমার প্রয়োজনের চেয়েও বেশি। তারপর তিনি হিমসে চলে গেলেন।
কিছুদিন পর না হতেই আমীরুল মুমিনীন বিশ্বস্ত হেমসের কিছু লোক তার কাছে আসল।
হযরত ওমর ১৬৬ তাদেরকে বললেন, তোমরা গরিব লোকদের নামের তালিকা দাও যাতে করে তাদের প্রয়োজন মিটিয়ে দিতে পারি।
তারা তার হাতে গরিব লোকদের একটি তালিকা দিল, সেখানে অনেক ব্যক্তির নাম ছিল তার মধ্যে হযরত সাঈদ বিন আমেরের নামও ছিল।
হযরত ওমর ১৬৬ বললেন, সাঈদ বিন আমের কে?
তারা বলল, আমাদের গভর্নর।
হযরত ওমর ১৬৬ আশ্চর্য হয়ে বললেন, তোমাদের গভর্নর গরিব!
তারা বলল, হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ! এমন অনেক দিন অতিবাহিত হয় তাঁর চুলায় আগুন জ্বলে না।
এ কথা শুনার পর হযরত ওমর ১৬৬ কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি এত বেশি কাঁদলেন যে, তাঁর দাড়ি মোবারক চোখের পানিতে ভিজে গেল। তিনি তাঁর নিকট এক হাজার দীনার পাঠানোর ইচ্ছা করলেন। সে দীনারগুলো একটি থলেতে দিয়ে বললেন, তোমরা তাঁকে আমার পক্ষ থেকে সালাম জানাবে আর বলবে, আপনার প্রয়োজন মেটানোর জন্য এগুলো আমীরুল মুমিনীন আপনাকে দিয়েছেন।
হযরত ওমরের পাঠানো প্রতিনিধি দল দীনারের থলে নিয়ে তাঁর কাছে গেল। হযরত সাঈদ ১৬৬ দীনারের থলেটি দেখার সাথে সাথে ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন বলে তা দূরে নিক্ষেপ করলেন। মনে হয় যেন তাঁর ওপর বিশাল কোনো মুসিবত নেমে এসেছে অথবা মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। তার এ আকুতিতে হযরত ওমর ১৬৬ বললেন, সাঈদ! আপনার কি হয়েছে?...... নাকি আমীরুল মুমিনীন ইন্তিকাল করেছেন?
তিনি বললেন; বরং এ থেকেও ভয়ানক।
তিনি বললেন, মুসলমানরা কি কোথাও আক্রান্ত হয়েছে?
তিনি বললেন; বরং এ থেকেও ভয়ানক।
তিনি বললেন, এ থেকেও ভয়ানক কি ঘটেছে?
তিনি বললেন, আমার আখিরাত নষ্ট করার জন্য দুনিয়া আমার নিকট চলে এসেছে। ফিতনা আমার ঘরে এসে উপস্থিত হয়েছে।
তিনি বললেন, আপনি তা থেকে মুক্ত হোন।
অথচ তখন দীনার সম্পর্কে কিছুই জানেননি!
তিনি বললেন, তুমি কি আমাকে এতে সাহায্য করবে?
তিনি বললেন, হ্যাঁ।
এরপর তিনি থলেটি নিয়ে গরিব মুসলমানদের মাঝে সবগুলো দীনার বিলিয়ে দিলেন। নিজের জন্য একটি দীনারও রাখলেন না。
টিকাঃ
১৩৭ মুয়াজ্জামুল বিন ইয়াজিদিল সাওয়াবী, ৬৭ পৃ:।
📄 মধুর পাত্র
একদিন ওমর ১৬৬ বললেন, তিনি খুবই অসুস্থ। তখন তাঁকে মৌমাছির মধু খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলো। বাইতুল মালে তখন মধুর একটি ছোট পাত্র ছিল। তখন তিনি লাঠিতে তার দিয়ে মসজিদের মেঝেতে পৌঁছে বললেন, যদি তোমরা পাত্র থেকে মধু নেওয়ার অনুমতি প্রদান কর তবে আমি তা নিব। আর তা না হলে এটি আমার জন্য হারাম।
উপস্থিত সকলে সন্তুষ্টি চিত্তে অনুমতি দিল。
টিকাঃ
১৩৮ মুসনাদু ফারুফিল উম্মাত, ৪খঃ ৮০, ৪৬৬ পৃ:।
📄 সাঈদ বিন আমের রা. ও হিমসবাসী
এরপর কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর হিমসের মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হতে হযরত ওমর ১৬৬ হিমস শহরে যাত্রাবৃত্তি করেন। এ শহরকে ‘কুহায়বা’ বা ছোট কুয়া নামেও ডাকা হতো। এটি কুফা শহরের ভাগীদার এবং হিমসের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। কেননা এ শহরের অধিবাসীরা তাদের গভর্নর ও সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যাপারে অধিক অভিযোগ করত যেমনিভাবে কুফাবাসীরা করত।
হযরত ওমর ১৬৬ শহুরে পা রাখার পর শহরের অধিবাসীরা তাঁকে সালাম ও স্বাগতম জানাতে ছুটে আসল।
তিনি তাদেরকে বললেন, তোমাদের গভর্নর কেমন?
তারা হযরত সাঈদের ব্যাপারে তার কাছে চারটি অভিযোগ করে। এগুলো একটি অন্যটির চেয়েও মারাত্মক ছিল।
হযরত ওমর ১৬৬ বলেন:
এরপর আমি সাঈদকে ও শহরের অধিবাসীদেরকে একত্রিত করলাম। আর আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম আল্লাহ যেন সাঈদের ব্যাপারে আমার সুধারণাকে নষ্ট না করে দেয়। কেননা তার ব্যাপারে আমি অনেক ভালো ধারণা করতাম। যখন তাদের গভর্নর ও তারা আমার কাছে একত্রিত হলো তখন আমি তাদেরকে বললাম, তোমাদের গভর্নরের ব্যাপারে তোমাদের কী কী অভিযোগ?
তারা বলল, সূর্য পূর্বকাশ ছেড়ে উপরে না উঠা পর্যন্ত তিনি আমাদের নিকট আসেন না। অর্থাৎ প্রত্যহ দেরি করে দরবারে উপস্থিত হন।
আমি বললাম, হে সাঈদ! এ অভিযোগের ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কি?
হযরত সাঈদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বললেন: আল্লাহর শপথ! আমি এ কথা বলতে অপছন্দ করি, কিন্তু আমি এমন বলতে বাধ্য, তা হচ্ছে আমার কোনো খাদেম নেই আর এ কারণেই আমি সকালে আমার পরিবারের জন্য গম পিসে ময়দা বানিয়ে দিই। তারপর তা সিদ্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করি। এরপর তা দ্বারা আমার পরিবারের জন্য রুটি বানাই। রুটি বানানো শেষ করে আমি আবু হুরায়রা মানুষের নিকট থেকে বের হয়ে আসি।
হযরত ওমর ১৬৬ বললেন, তারপর আমি তাদেরকে বললাম: তার ব্যাপারে তোমাদের আর কী কী অভিযোগ আছে?
তারা বলল, তিনি রাতে কারো ডাকে সাড়া দেন না।
আমি বললাম, হে সাঈদ! এ অভিযোগের ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কী?
হযরত সাঈদ বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি এ বিষয়টি প্রকাশ করা অপছন্দ করছি...। আর তা হচ্ছে আমি দিনকে জনকল্যাণকর কাজের জন্য নির্ধারণ করেছি আর রাতকে আল্লাহ তা’আলার ইবাদত করার জন্য নির্ধারণ করেছি।
আমি বললাম, তার ব্যাপারে তোমাদের আর কী কী অভিযোগ আছে?
তারা বলল, তিনি মাসে একদিন আমাদের নিকট আসেন না।
আমি বললাম, হে সাঈদ! এ অভিযোগের ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কী?
হযরত সাঈদ বললেন, আমার কোনো খাদেম নেই আর আমার পরিচিত এ জামা ব্যতীত আর কোনো জামাও নেই। এ কারণে আমি মাসে একবার জামাটি ধৌত করি। এরপর জামাটি শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করি। দিনের শেষে জামাটি শুকানোর পর আমি তাদের কাছে আসি।
আমি বললাম, তার ব্যাপারে তোমাদের আর কী কী অভিযোগ আছে?
আমি বললাম, তবে সময় তিনি সত্যই সেবাকে অন্যমনস্ক হয়ে যান।
আমি বললাম, হে সাঈদ! তুমি এমন কর কেন?
হযরত সাঈদ ১৬৬ বললেন, আমি খুবাইব বিন আদীকে হত্যা করার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তখন আমি মুসলিম ছিলাম। আমি কোরাইশদেরকে তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে টুকরো টুকরো করতে দেখেছি। তখন তারা তাকে বলল, তোমার পরিবর্তে মুহাম্মদকে হত্যা করা হবে আর তোমাকে মুক্তি দেওয়া হবে, তুমি কি তা পছন্দ কর। হযরত খুবাইবও তখন বললেন, আল্লাহ্ শপথ করে বলি, আমি নিরাপদে আমার পরিবার ও সন্তানদের কাছে ফিরে যাব আর মুহাম্মদ -কে একটি কাঁটার আঘাত সইতে হবে তাও আমি পছন্দ করি না। আল্লাহ্র শপথ! যখনি আমার এ ঘটনা মনে পড়ে আমি কেন তাঁকে সাহায্য করলাম না তখনি আমার মনে হয় আল্লাহ্ আমাকে ক্ষমা করবেন না, আর এ চিন্তা আমাকে অন্যমনস্ক করে ফেলে। হযরত সাঈদ বিন আমের -এর থেকে অভিযানের এ জবাবগুলো শুনে হযরত ওমর -এর বাবা ওমার -এর কাছে অভিযোগ করলেন। এতে ওমার -এর ধারণা সাঈদকে সঠিক করেছেন。
টিকাঃ
২১৮ বুখারী মুসলিম হায়াতিন সাহাবা, ১খ পৃ.
📄 যা খেয়ে তুমি পরিতৃপ্ত হবে তা খাইয়ে মুসলমানদেরকে
আজরাবাইজান উতবা বিন ফারক্বাদের কাছে এক প্রকার খাদ্য আসল। যে খাদ্যের নাম ‘খবীছ’। তিনি তা দেখে দেখলেন তা খুবই মিষ্টি ও মজাদার। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ্র শপথ! আমরা যদি আমীরুল মুমিনিনের জন্যে এ খাবার তৈরি করতাম! তখন তারা দুই পাত্র খাবার তৈরি করে তা একটি উট বহন করে দুইজন লোক দ্বারা পাঠিয়ে দিলেন। ওই দুই লোক যখন ওমর -এর কাছে গিয়ে পৌঁছল। তখন তিনি তাদেরকে বললেন, এটি কী? তারা বলল, খবীছ। ওমর -এর তা থেকে সামান্য মুখে দিয়ে দেখলেন তা খুবই সুস্বাদু ও মজাদার। এরপর তিনি ওই দুই লোককে লক্ষ্য করে বললেন, প্রত্যেক মুসলমান কী এটি খেয়ে পরিতৃপ্ত হতে পারবে? তারা বলল, না। তখন তিনি খাবার ফিরিয়ে নিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন এবং উতবা বিন ফারক্বাদকে লিখে বললেন, এটি তোমার বাবার বা তোমার মায়ের বাতিল নয়। তুমি যা খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়েছ তা মুসলমানদেরকেও খাইয়ে পরিতৃপ্ত কর。
টিকাঃ
২১৯ মানাকিবু আমিরিল মুমিনীন, ১৫৫ পৃ.